Sunday, October 11, 2020

সত্যের বিকাশ

 

সত্যের বিকাশ

(মূল ইংরাজি থেকে অনূদিত)

শ্রী দেবকুমার চৌধুরী

সভ্যতার আদিকাল থেকেই মানুষ সত্যকে সন্ধান করেছেন। দার্শনিক ও জ্ঞানীরা ইতিহাসের বিভিন্ন কালক্রমে সত্যের নানা ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁদের ব্যাখ্যার মধ্যে প্রচুর ফারাক দেখা গেছে। প্রত্যেকেই তাঁর নিজের প্রজ্ঞার আলোয় সত্যের কথা বলেছেন, বলেছেন জীবনের পরমার্থর কথা, কিন্তু মানুষ তা লাভ করেনি। অন্যভাবে বলতে গেলে, মানবজীবনের সেই চিরন্তন রহস্য – আমি কে? এবং আমার সামনে এই বিশাল মনুষ্যজাতির সঙ্গেই বা আমার সম্বন্ধ কি? এই রহস্য সেই অজ্ঞানের অন্ধকারেই রয়ে গেছে।

        বর্তমানে আমরা এই সত্য সন্ধানে এক নতুনতর পরীক্ষায় রত হয়েছি আমরা। এই পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীরা পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে আছে। তারা ভিন্ন ভিন্ন ধর্ম, ভাষা ও জাতির মানুষ। সমাজের ভিন্ন ভিন্ন স্তর থেকে উঠে এসেছে।

        এইসব মানুষ জাগতিক দূরত্ব সত্ত্বেও একে অন্যের কাছে এসেছে এবং অনন্য অনুভূতির আস্বাদে ঋদ্ধ হয়েছে। এই অনুভূতি বাস্তবজীবনের রূঢ়তা সত্ত্বেও তাদের এক পরমজীবনের অধিকারী করেছে। প্রতিদিনের কঠোর জীবনযাত্রা এবং ব্যক্তিগত একটি সত্ত্বেও পৃথিবীর বুকে তারাই আজ সবচেয়ে ভাগ্যবান মানুষ। তাদের এবং আমার এই অনন্য অনুভূতির অভিজ্ঞতার বিকাশ হয়েছে এক বাঙালি ভদ্রলোককে কেন্দ্র করে। তিনি আমাদের অতি প্রিয় শ্রীজীবনকৃষ্ণ।

        আমার স্মৃতিমেদুরতা জাগছে। আমি দেখতে পাচ্ছি। আমি দেখতে পাচ্ছি সেই ছোট্ট ঘরখানা-সেই বলিষ্ঠদেহী বৃদ্ধকে, যার অদ্ভুত শক্তিমত্বা, ও অসাধারণ রসিকমন- যার অদ্ভুত আকর্ষণী শক্তি – তাঁর সাহচর্যে যে অদ্ভুত অতুলনীয় শাস্তি ও আনন্দ।

        আমরা তাঁকে এক মুহূর্তের জন্যেও চোখের আড়ালে করতে চাইতাম না। আমরা তাঁর উচ্চারিত প্রতিটি শব্দকে নিপুণ ভাবে লিখে রাখতেও প্রয়াস করিনি। প্রতিটি সঙ্গকারীর তাঁর সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতের অভিজ্ঞতা ভিন্ন। আর তাই, তাঁর সঙ্গে প্রথম আলাপের প্রেক্ষাপট প্রত্যেকের ক্ষেত্রে আলাদা। কিন্তু একটা ব্যাপারে সকলেই সহমত হবেন যে, এত দিনে তাঁদের সন্ধান শেষ হয়েছে। তারা যা এতকাল অস্থির হয়ে খুঁজে এসেছেন সেই পরম বস্তুটির সন্ধান পেয়েছেন।

        ‘কি চাইছিস রে? ভগবান কে? ওরে বাবা, সে তোর মধ্যেই!’ অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি যে, মাত্র এই ক’টি সহজ কথাতেই সেই নবাগত নিজের মধ্যে ভগবানের দর্শন পেয়েছে। আসলে সে স্বপ্নে শ্রীজীবনকৃষ্ণের দর্শন পেত। পরের দিন, সেই বৃদ্ধ নবাগতকে জিজ্ঞেস করতেন, - হ্যাঁ বাবা, কোনও স্বপ্ন টপ্ন দেখেছিস? উত্তর আসত- স্বপ্ন? হ্যাঁ, তা স্বপ্নে তো আমি আপনাকেই দেখেছি। - বাঁচালি বাবা। আর আমার চিন্তা নেই। ভগবান নিজে তোর ভার নিয়েছেন। বৃদ্ধ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতেন। ‘কি রহস্য! স্বপ্নে ওঁকে দেখার ওপরে উনি এত জোর দেন কেন?’ যুবক অবাক হয়ে ভেবেছে। খুশি হতে পারতনা সে। কিন্তু এক অদ্ভুত আকর্ষণে এই ঘর ছেড়ে যেতেও পারতনা। বক্তা যেন অদ্ভুত! তাঁর কথা অপূর্বতর!

        নবাগত যুবক যে কথাটি প্রথম শুনত তা হ’ল – ভগবানকে পাবার জন্য কোনও সাধনার দরকার নেই, বাবা। একদম কিচ্ছুটি করার দরকার নেই। চুপ করে বসে শুধু ভগবানের লীলা দেখে যা। সুতরাং সে চুপটি করে বসে থাকে। তাঁর কথাও সেভাবে শুনতে চেষ্টা করেনা। তিনি যে কেন এমন সমাহিত তাও সে বুঝতে পারেনা। “আয় একটু ধ্যান করি”। যুবক ইতস্তত করে। সে তো কোনোদিন ধ্যান করেনি। “চুপ করে বোস। কিচ্ছু না, মনটা এইখানে নিয়ে আয়”। তিনি কপালে আঙুল দিয়ে নির্দিষ্ট বিন্দুটি দেখিয়ে দেন। আর মাত্র দু এক মিনিটের মধ্যেই ধ্যানে ডুবে যান।                                                               “ধ্যানে কোনও দর্শন হ’ল বাবা?” যুবকের কানে আসে মধুর কথা ক’টি। সে বলে- হ্যাঁ। তারপর দর্শনটি বলে। হয়ত শ্রীরামকৃষ্ণ কিংবা বিবেকানন্দকে দেখেছে। বা হয়ত নিতান্তই সাধারণ কিছু। জনে জনে দর্শনে বিস্তর পার্থক্য, কিন্তু প্রায় সবার দর্শনেই শ্রীজীবনকৃষ্ণের উপস্থিতি অনিবার্য।                                  তাঁর ঘরে শ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত পাঠ হতো প্রতিদিন। তিনি কথামৃতর কথার অন্তর্নিহিত অর্থ যোগে ব্যাখ্যা দিতেন। এই সব সময় তাঁর দেহে যোগৈশ্বর্য ফুটে উঠত। উপস্থিত সকলে অবাক হয়ে দেখতেন। এমনকি এমনও হয়েছে যে কথামৃত স্পর্শেই তিনি সমাধিস্থ হয়ে পরেছেন। সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার যে, তাঁর একটি মাত্র শব্দেই ঘরে উপস্থিত এক বা একাধিক শ্রোতার একযোগে কুণ্ডলিনী জাগ্রত হয়েছে। তাঁর কয়েক মুহূর্তের সঙ্গই মনকে নিম্নভূমি থেকে উচ্চে তুলে দিতো যা ঈশ্বর আস্বাদনের জন্য প্রয়োজনীয়। পণ্ডিত নিরক্ষর শ্রমিক বুদ্ধিজীবী নিরপেক্ষে সকলেই এই আনন্দের সমান ভাগীদার হতো। এই যোগীর সংস্পর্শে আসার সঙ্গে সঙ্গেই দেহে এই পরিবর্তন শুরু হয়ে যেত।                                              

জীবনকৃষ্ণ সঙ্গকারীদের আমরা আলোচনার সুবিধের জন্য কয়েকটি ভাগে ভাগ করতে পারি। ব্রহ্মচর্য পালন করে তথাকথিত ধর্মীয় রীতিনীতি পালন করে লক্ষ্যে পৌঁছনোয় বিশ্বাসী ছিলেন প্রথম দল। দ্বিতীয় দল এই প্রথাগত ধর্ম ও নব্য দৃষ্টিভঙ্গীর একটি সামঞ্জস্য রক্ষা করে চলত। যারা যুক্তিপূর্ণ চিন্তাধারা নিয়ে ঈশ্বরের অস্তিত্ব রস্যের সমাধান চাইতেন তারা ছিলেন তৃতীয় দলে। চতুর্থ দল জীবনে সব কিছু পেয়েও কোনও এক অজানা অপ্রাপ্তির কারণে অস্থির থাকত। পঞ্চম দলে ছিল সেই সব মানুষ, যাদের ভগবানকে নিয়ে কোনও মাথাব্যথাই ছিলোনা। তারা শুধু কৌতূহলের বশেই শ্রীজীবনকৃষ্ণের কাছে এসেছেন। পরবর্তী পর্বে আমরা দেখব এইসব ভিন্ন ভিন্ন মানসিকতার মানুষ কিভাবে শ্রীজীবনকৃষ্ণের কাছে এলেন এবং কিভাবে তাঁর ঈশ্বরত্ব তাঁদের ব্যক্তিগত অস্তিত্বকে গ্রাস করে ফেলল। আর তার ফলই বা কি দাঁড়ালো।

 

        যে পাঁচটি ভাগে ভাগ করেছিলাম, সেই দলনির্বিশেষে, জীবন সম্পর্কে তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি নির্বিশেষে প্রত্যেকেই শ্রীজীবনকৃষ্ণের সঙ্গে তাঁদের প্রথম সাক্ষাৎকে একটি স্মরণীয় ঘটনা বলে অভিহিত করেছেন। সকলেই যে তাঁকে দেখার জন্য খুব উৎসুক হয়েছিলেন তা নয়, বরং শ্রীজীবনকৃষ্ণের মতো এমন এক অদ্ভুত সাধুর কথা শুনে তাঁদের দারুণ কৌতূহল হয়েছিল। পরে তাঁর কাছ থেকে শুনেছি যে পঞ্চভূতের দ্বারা আত্মিক পরিবর্তনের সঞ্চারের মধ্যে দিয়েই এমন কৌতূহল জন্মেছে। এ সম্বন্ধে পরে আলোচনা করা যাবে। তাঁকে সবসময় সহজভাবে নেওয়া সম্ভব ছিল না। তাঁর নতুন নতুন ব্যাখ্যাগুলো যতই অপূর্ব ও যুক্তিগ্রাহ্য হোক, পুরনো সমস্ত ধারণাকে তা তছনছ করে দিচ্ছিল। ব্যষ্টিতে যা এতকাল সযত্নে লালন করা হয়েছে। অবশ্যই এসবই তাঁর উপলব্ধিসঞ্জাত। সকলে তাঁর বৈজ্ঞানিকসুলভ দৃষ্টিভঙ্গিতে চমকিত। উপস্থিত প্রত্যেকে নিজের দেহে অনুরূপ অনুভূতি লাভ করায় তাঁর ব্যাখ্যা গতিলাভ করল। পাঁচটি চেতনস্তরে অনুভূতির প্রকাশ শুরু হল। জাগ্রত, ধ্যান, স্বপ্ন, সমাধি, সুষুপ্তি বা তুরীয় বা অতিচেতন অবস্থা। প্রাথমিকভাবে উপস্থিত কেউই এসবের অ আ ক খ ধারণা করতে পারেননি। মস্তিষ্কে ক্রিয়ার ফলে নতুন নতুন কোষ জন্মানোয় এই রহস্যের ক্রমউন্মোচন শুরু হয়। একথা উনিই পরে বলেছিলেন। এরপরে ওঁর আপাতকঠিন কথাগুলো সকলে সহজে গ্রহন করতে পেরেছিলেন এবং রসাস্বাদনে সক্ষম হয়েছিলেন।            এভাবেই পার্থিব জগতের একজন মানুষ রাজযোগের মাধ্যমে যোগী বা ঈশ্বরে পরিবর্তিত হলে অধ্যাত্ম জগতে নতুন পরিবর্তনের সূত্রপাত হয়। পুরনো ধারণা সরে গিয়ে নতুন ধারণাকে স্থান দেয়। বহুদিন পর সেই ধীর ও স্থির পরিবর্তন অন্তর্জগতে বিপ্লব আসে। ফলে, ঈশ্বর নিঃশব্দ পদসঞ্চারে অথচ দৃঢ়ভাবে তাঁর অস্তিত্ব সম্পর্কে সকল ভ্রান্তি দূর করেন।

        এবার পূর্বে উল্লিখিত বিভিন্ন মানুষের অনুভূতি সম্বন্ধে আলোচনা করব। তাঁদের প্রত্যেকের নাম উল্লেখ করার প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। তবু আলোচনার সুবিধের জন্য অক্ষর ব্যবহার করে তাঁদেরকে আলাদা করে বোঝাতে পারি।                                                                    

প্রথম দলে যারা ছিলেন তাঁরা স্পষ্টতই মনে করতেন, ব্যবহারিক জগতের সব আকর্ষণকে ত্যাগ না করলে ঈশ্বর উপলব্ধি অসম্ভব। তাঁরা একজন প্রকৃত সাধু বা গুরুর সন্ধান করতেন। তাঁরা এমন একজনকে তখনও খুঁজে পাননি। এমনই একজন যখন সন্ন্যাস নিতে চলেছেন তখন শ্রীজীবনকৃষ্ণের নাম জানতে পারলেন। (তাঁকে অ-বাবু বলে অভিহিত করা হচ্ছে)। তিনি শ্রীজীবনকৃষ্ণকে দেখতে আগ্রহী হলেন। স্থির করলেন, এঁকে দেখার পরদিন তিনি গৃহত্যাগ করবেন। যে ভদ্রলোক তাঁকে শ্রীজীবনকৃষ্ণের কাছে নিয়ে যাবেন তিনি তাঁকে নিয়মিত কথামৃত পাঠ করতে ও কিছুদিন অপেক্ষা করতে বললেন। তার মধ্যে যদি কোনো দিব্যস্বপ্ন হয় সেই জন্যেই অপেক্ষা। অ-বাবু সেইমতো চলেও কিন্তু কোনো স্বপ্ন দেখলেন না। অগত্যা তাঁর মানসিক অবস্থা বুঝে ও তাঁর আকুতিতে শ্রীজীবনকৃষ্ণের কাছে নিয়ে গেলেন।                  উনি তখন খাটে বসেছিলেন। তাঁর সহৃদয় ব্যবহারে ভদ্রলোক অবাক। তাঁর স্নেহের কথা ভদ্রলোকের মন ছুঁলো।  তিনি অর্ধেক দাঁড়ানো ও অর্ধেক অবস্থাতেই শ্রীজীবনকৃষ্ণ তাকে প্রশ্ন করলেন ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছে, যদি কেউ ঈশ্বরলাভ করতে চায় তবে তাকে নির্জনে কঠোর সাধন করতে হয়। তা তুমি কি করবে বাবা? পাহাড়ের গুহায় ঢুকবে, নাকি বনে যাবে? অ-বাবু স্তম্ভিত। শ্রীজীবনকৃষ্ণ কীভাবে তাঁর মনের কথা টের পেলেন? তিনি তো তাঁর উদ্দেশ্য কাউকে জানাননি? কিছুক্ষণ পর শ্রীজীবনকৃষ্ণ আবার বললেন বাবা, পৃথিবীতে এমন একটি জায়গা বলতে পারো যেখানে সংসারের বন্ধন কিছু নেই? অ-বাবু চুপ। শ্রীজীবনকৃষ্ণ বলে চলেছেন তুমি যদি বনেও যাও বাবা তোমাকে আহার আর বস্ত্রের জোগাড় করতেই হবে। তাহলেই বনের পরিবেশ আর সংসারের পরিবেশে আর কোনো তফাত রইল না। কেমন না?

        এরপর শ্রীজীবনকৃষ্ণ নিজেই নিজের প্রশ্নের উত্তর দিলেন। বললেন না বাবা, ঈশ্বরকে পেতে সংসার ত্যাগ করতে হবে না। আচ্ছা বলো দেখি, ভগবান কোথায়? তিনি কি বনের গভীরে, পাহাড় চুড়োয় নাকি আকাশে থাকেন? অ-বাবু নির্বাক। শ্রীজীবনকৃষ্ণ নিজেই উত্তর দিচ্ছেন ভগবান এই দেহে। কথা কটি উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে তিনি গভীর সমাধিতে নিমগ্ন হলেন। সমাধি থেকে নেমে জিজ্ঞেস করলেন আচ্ছা তুমি শ্রীরামকৃষ্ণকে স্বপ্নে দেখেছ?                               

        - না                                                                           

        - আচ্ছা ঠিক আছে। কথামৃত পড়েছ?                                                                - আজ্ঞে হ্যাঁ।                                                                                             - খুব ভালো। কথামৃত বারবার পড়বে।                                                              প্রতিদিন কথামৃত পাঠই শ্রীজীবনকৃষ্ণের একমাত্র শিক্ষা ছিল। কিছুক্ষণের জন্য কথামৃত পড়া থেমে আছে। শ্রীজীবনকৃষ্ণ নবাগতকে বললেন যেহেতু তুমি এ বিষয়ে একেবারে কিছুই জানো না, তাই আমাদের একটি রহস্য নিয়ে তোমাকেই প্রশ্ন করব। বলতে পারো, এই সব লোক, যারা আদতে ঠাকুরের ভক্ত, তারা আমাকে তাদের মধ্যে দেখে কেন? তিনি বলতে থাকলেন কত কষ্ট করেই না তারা এখানে আসে। শুধু ঠাকুরের কথা শুনবে বলে। অথচ তারা আমাকে দেখে কেন? অ-বাবু নিরুত্তর।                 তিনি প্রায় আটটা পর্যন্ত রইলেন। যতক্ষণ না প্রাত্যহিক আসর শেষ হয় তিনি রইলেন। এই সময়ে সারাক্ষণ তাঁর মনে উঠতে থাকল, তবে কি ইনি শ্রীরামকৃষ্ণ? আবার জন্ম নিয়েছেন?                

জীবনকৃষ্ণকে প্রণাম করে বিদায় নিলেন। নিজের মনের কথা বললেন না। তাঁর মনের মধ্যে অবশ্য সারাক্ষণ চিন্তা উঠতে লাগল কে ইনি? মাঝে মাঝে নিজের মন থেকে চিন্তাটা সরাতে চাইলেও পারলেন না। প্রভাব বড়ই গভীর।                                                          

যে ভদ্রলোক তাঁকে শ্রীজীবনকৃষ্ণের কাছে নিয়ে যান তিনি একদিন জানতে চাইলেন এর মধ্যে অ-বাবু কোনো স্বপ্ন দেখেছেন কিনা। দুটো আপাত গুরুত্বহীন স্বপ্ন তিনি দেখেছেন বলে তাঁর মনে হয়েছিল। অনুরোধ করায় স্বপ্ন দুটি বলেন। কিন্তু তাঁর সামান্য দুটি স্বপ্নের ব্যাখ্যা শুনে অবাক হয়ে যান। ব্যাখ্যাগুলি শ্রীজীবনকৃষ্ণের উপলব্ধির জ্বলন্ত উদাহরণ। আধারভেদে তাঁর সঙ্গকারীদের ওপরে এই ব্যাখ্যাগুলি ক্রিয়া করত। স্বপ্ন ও শ্রীজীবনকৃষ্ণের ব্যাখ্যাগুলি এরকম -                                

প্রথম স্বপ্ন দ্রষ্টা একটি ষাঁড়কে জ্বলন্ত অবস্থায় দেখেছেন।                                           ব্যাখ্যা দ্রষ্টার জীবত্ব নষ্ট হচ্ছে। (ষাঁড় কামের প্রতীক)                                              দ্বিতীয় স্বপ্ন দ্রষ্টা একটি নদীতীর ধরে ছুটছে। নদীটি মাত্র একহাত চওড়া। নদীর তীরে মাটির পরিবর্তে বালি। সেখানে বালির ওপরে দ্রষ্টার প্রতি পদবিক্ষেপে পায়ের চিহ্নর বদলে পদ্ম ফুটে উঠছে। 

ব্যাখ্যাঃ- ছোটো নদী ব্যবহারিক জগতের ক্ষীয়মানতা বোঝায়। অর্থাৎ, দ্রষ্টার মন জগত থেকে গুটিয়ে ভেতরে প্রবেশ করছে। পায়ের চিহ্ন পদ্মচিহ্নে পরিবর্তিত হওয়ার অর্থদ্রষ্টা হয় নারায়ণত্ব লাভ করেছেন অথবা ভবিষ্যতে করবেন। নারায়ণবিষ্ণুপালনকর্তা।                                

এরপর অ-বাবু সংসার ত্যাগের সংকল্প ত্যাগ করলেন। এবং নিয়মিত জীবনকৃষ্ণের কাছে আসতে থাকলেন। একমাস পরে তিনি প্রথম শ্রীজীবনকৃষ্ণকে স্বপ্নে দেখেন। বহু স্বপ্ন হয়েছিল তাঁর। প্রত্যেকটি বৈচিত্র ও সৌন্দর্যে অনুপম। কিন্তু এখানে সেসব স্বপ্নের কথা সবিস্তারে বলা আমদের উদ্দেশ্য নয়। উদ্দেশ্য, তাঁর ঘরে আগত মানুষদের কীভাবে পরিবর্তন ঘটেছিল তাই জানা। যার মধ্যে এই পরিবর্তন ঘটছে তিনি জানতে পারতেন না কীভাবে ধীরে ধীরে তাঁর ভিতরে পরিবর্তন ঘটছে। এভাবে সত্যের স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ ও প্রতিষ্ঠা হত। আমূল পরিবর্তন ঘটে যাবার অবেক পরে অনুভবে আসত তা। আমি আগেই বলেছি যে, আমরা যারা সৌভাগ্য ক্রমে শ্রীজীবনকৃষ্ণের অন্তরঙ্গ সংস্পর্শে এসেছি, তারা প্রত্যেকেই এই পরিবর্তন অনুভব করেছি। মস্তিষ্কে নতুন নতুন কোষের উন্মেষ অনুভব করেছি।                                                শ্রীজীবনকৃষ্ণের পূর্ণ বিকশিত প্রাণশক্তির সংস্পর্শে এসেই যে আমাদের মধ্যে প্রাণশক্তির বিকাশ ঘটত  একথা বলার অপেক্ষা রাখে না। শুনতে যত অদ্ভুত লাগু, আমরা প্রত্যেকে আমাদের মধ্যে একটিই মানুষের অস্তিত্ব অনুভব করতাম। তিনি জীবনকৃষ্ণ। তিনি কথা বলেন, শিক্ষা দেন, নিরদেশ দেনঅন্তর থেকেকখনও স্বপ্নে, কখনও ট্রান্সে, কখনও বা ধ্যানে এবং মাঝে মাঝে জাগ্রত অবস্থায়ও। আমরা শ্রীজীবনকৃষ্ণকে স্বপ্নে দেখার গুরুত্ব খুব অল্পই বুঝতাম।                                                      

    এক সময় সকলে তাঁকে অন্তরে দেখার জন্য খুব ব্যাকুল হয়ে উঠল। আমাদের অ-বাবু তাঁকে বিভিন্নভাবে স্বপ্নে দেখতে থাকলেন। এই দর্শনগুলি ক্রমে তাঁর ধর্মসম্পর্কে পূর্বের যাবতীয় ধারণা বদলে দিলো।  তবু, এত দর্শনের পরেও, তিনি যে দেহবান ব্রহ্মের সঙ্গ করছেন এবং শ্রীজীবনকৃষ্ণ তাঁর অন্তর্জগৎ পরিচালনা করছেন এ কথা তাঁর বিশ্বাস হল না। সত্য অবশ্য অসত্যের চেয়ে বেশি ক্ষমতা ধরে। এখানে অসত্যের অর্থ, জন্মান্তরীণ সংস্কার ও ধর্ম ও ঈশ্বর সম্পর্কে ভুল ধারণাসমূহ। একজন মানুষ যে রাম, কৃষ্ণ, কালী, যিশু, জরথ্রুশ্টের অবস্থা লাভ করেছেন তা কল্পনা করতেও অবাক লাগে।

এরপরে অ-বাবুর তাঁর প্রতি আকর্ষণ অত্যন্ত বেড়ে গেল। এই আকর্ষণ একজন ধুতিপরা সাধারণ বাঙালি ভদ্রলোক শ্রীজীবনকৃষ্ণের জন্য মনে হলেও তা আসলে মূর্তিমান সত্যের জন্য, পরম শান্তির একমাত্র উৎসের প্রতি।                         

        কীভাবে তাঁর ব্যক্তিসত্ত্বাকে ছাপিয়ে জীবনকৃষ্ণ অ-বাবুর মধ্যে প্রকাশিত হলেন সেকথা বোঝাবার জন্য আমি তাঁর অগণিত স্বপ্ন থেকে কয়েকটা উদ্ধৃত করব। উনি দেখছেনশ্রীজীবনকৃষ্ণ আলমারি থেকে একটি বই বের করেছেন। তারপর ওঁর দিকে চেয়ে বলছেনবাবা, আমাদের অবস্থা হসন্তর মতো। অ-বাবু একটি ঘরে দাঁড়িয়ে। তাঁর হাত পা ঘাড় কিছুই নাড়তে পারছেন না। তাঁর সমস্ত দেহ অবশ। হীরুবাবু (শ্রীজীবনকৃষ্ণের অন্যতম অন্তরঙ্গ পার্ষদ) তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে নীচু স্বরে বলছেন—‘না, আমাদের অবস্থা এর মতো

 অ-বাবু জিজ্ঞেস করলেন সে কিরকম? উত্তরে হীরুবাবু কিছু নাম বললেন, যার মধ্যে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের নাম ছিল। শ্রীজীবনকৃষ্ণ এই কথা শুনে রেগে হীরুবাবুকে ব্লেন—‘কর্তা সেজো না। আমি যখন ওর ভার নিয়েছি তখন আমিই ওর চিন্তা করব। তুমি এখন আসতে পারো। হীরুবাবু মাথা চুলকে সেখান থেকে সরে গিয়ে দূরে দাঁড়িয়ে রইলেন। শ্রীজীবনকৃষ্ণ তখন একটি বই বার করে দ্রষ্টার হাতে দিলেন। সেই মুহূর্তে অ-বাবু  স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে পেলেন। তিনি আনন্দে দুটি হাত তুলে বললেনঈশ্বর দয়াময়।              অ-বাবু কিন্তু এক অদ্ভুত রহস্যের কথা ভেবে স্থির হতে পারেন না। সেটি হল, শ্রীজীবনকৃষ্ণ কে? কেনই বা তাঁর প্রতি এমন অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণ বোধ হয়? সারাক্ষণ তাঁর চিন্তায় মন ভরে থাকে কেন? ১৯৫৮ সালের ডিসেম্বরের এক রাতে শোবার আগে তিনি একান্তে প্রার্থনা করলেন হে জীবনকৃষ্ণ, দয়া করে তোমার রহস্যের পর্দা সরাও। আমি দেখি।                        

সে রাত্রে তিনি দেখলেন শ্রীজীবনকৃষ্ণ তাঁর খাটের পাশে। তিনি অর্ধশায়িত অবস্থায় আছেন। তাঁর দেহ স্নিগ্ধ জ্যোতিতে ভরা। খাটের ধারে কাঠের ওপরে একটি হাত চক দিয়ে লিখে দিলো জ্যোতির্ময়। অ-বাবু এই স্বপ্নের অর্থ জিজ্ঞেস করলে জীবনকৃষ্ণ তাঁকে উপনিষদে উল্লেখিত জ্যোতির্ময় শব্দটি দেখতে বললেন। অ-বাবু উপনিষদ দেখলেন বটে কিন্তু নিশ্চিন্ত হতে পারলেন না। তাঁর আরও বিশদে বুঝতে ইচ্ছে রইল।                                                                                    ১৯৫৯ সালের মার্চ মাসে তিনি আর একটি স্বপ্ন দেখলেন। দেখলেন খুব বৃষ্টি পড়ছে। অ-বাবু ছুটে একটি টিনের শেডের তলায় আশ্রয় নিলেন। সেখানে একজন অচেনা লোক তিনটি লোককে দেখিয়ে তাঁকে বললেন এরা জীবনকৃষ্ণের কাছে যায়। তাই এরা সব সাধু। অ-বাবু বললেন আমিও যাই। এই স্বপ্নটি অবশ্য তাঁর কাছে জীবনকৃষ্ণের স্বরূপ প্রকাশ করল না।

        আবার ৬ই এপ্রিল ১৯৫৯ এ জীবনকৃষ্ণকে স্বপ্নে দেখলেন তিনি। তিনি যেন মনুমেন্টের মতো উঁচু। তিনি বললেন আমি পরমব্রহ্ম। এ বিশ্বের আমিই একমাত্র বিধাতা। ধ্যান আরাধনা বা যা কিছু তুমি করো, সবই আমাতে সমর্পণ করবে। নাহলে...।                                  

        অ-বাবু জেগে উঠে শেষ কথাগুলি আর মনে করতে পারলেন না। স্বপ্নটি এত স্পষ্ট ও উচ্চারিত কথাগুলির ক্রিয়া এত তীব্র যে তা তাঁর মধ্যে গভীর ছাপ ফেলল। তিনি এ স্বপ্নের গুরুত্ব  অস্বীকার করতে পারলেন না।                                                                             অতঃপর জীবনকৃষ্ণ অ-বাবুর হৃদয়ে স্থায়ী আসন লাভ করলেন। সব রকমের দ্বন্দের এখানেই শেষ। অ-বাবু সর্বশক্তিমান ব্রহ্মের কাছে নিবেদিত হলেন। এরপর থেকে তিনি জীবনকৃষ্ণের প্রতিটি কথাকে মনেপ্রাণে গ্রহণ করতে থাকলেন এবং নিজে প্রভূত কৃপার অধিকারি হলেন। তাঁর ব্যবহারিক জীবন নিতান্তই যান্ত্রিক ও সংসারের প্রতি বিরাগে পূর্ণ হয়ে দাঁড়ালো। জাগ্রত অবস্থায় তিনি শ্রীজীবনকৃষ্ণের আনন্দময় সঙ্গলাভের জন্য সদাই ব্যাকুল হয়ে থাকতেন। তাঁর দিনগুলো যে কী মধুর ও আনন্দময় হয়ে উঠল! যদিও সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ বা অনুসরণ হল  না, তবু তাঁর মন অপরিমেয় আনন্দে ভরে থাকত। শ্রীজীবনকৃষ্ণ অ-বাবুর বাসার ছোট্ট ঘরে, তাঁর অফিসের টেবিলে, এমনকি ভিড় বাসে ট্রামেও সর্বদা তাঁর সঙ্গে রইলেন। এসবই অবশ্য অ-বাবুর অন্তরে দর্শন।                                                          

ঘুমের মধ্যে এই অতিপ্রিয় বৃদ্ধ নানাভাবে দর্শন দিতেন। কখনও হেসে, কখনও বিশালদেহে, কখনও বা কোনও নির্দেশ দিতে। আশ্চর্যের কথা এই যে, শ্রীজীবনকৃষ্ণকে এই দর্শনগুলির কথা না বলা হলে তিনি এবিষয়ে কিছু জানতেই পারতেন না।                                  

অ-বাবুকে বাইরে থেকে দেখে কিছু বোঝা যেত না। কিন্তু কেউ যদি তাঁকে ধর্ম ও ঈশ্বর সম্বন্ধে কোনও প্রশ্ন করতেন তাহলেই তাঁর পরিবর্তন টের পাওয়া যেত। তাঁর স্বভাব ছিল লাজুক ও অন্তর্মুখ। নির্জনতা পছন্দ করতেন। জীবনকৃষ্ণের ঘরে তাঁর নতুন বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনায় অবশ্য তিনি কিছুটা সহজ হতেন। এসব আলোচনা প্রধানত সকলকার দর্শন নিয়ে, যার কেন্দ্রে ছিলেন আমাদের প্রিয় সেই বৃদ্ধ। সেই সব প্রত্যেকটি দর্শন ছিল বৈচিত্রে ও রহস্যে ভরা।                 

শ্রীজীবনকৃষ্ণ সম্বন্ধে আলোচনার জন্য আমি কোনও ধর্ম বা দর্শনের প্রচলিত বই অনুসরণ করিনি। তাঁর অন্তরঙ্গ মানুষজন যারা দীর্ঘদিন তাঁর সঙ্গ করেছেন, তাদের দর্শন অনুভূতির ইতিহাসের ওপরেই নির্ভর করেছি।                                                                                

অ-বাবু আমার প্রথম নির্বাচন। তিনি যেভাবে জীবনকৃষ্ণের কাছে প্রথম আসেন, অদ্ভুত সব স্বপ্ন দেখতে থাকেন এবং ধীরে ধীরে জীবনকৃষ্ণের সঙ্গ পেয়ে যে আনন্দ ও সন্তোষ লাভ করেন সেসব কথাই বলতে চেষ্টা করেছি।                                                                               

পরের পর্বে আমি তাঁর পরবর্তী জীবনে শ্রীজীবনকৃষ্ণের প্রভাব সম্পর্কে আলোচনা করব। 

        ১৯৬৭ সালের ১৩ই নভেম্বর। শ্রীজীবনকৃষ্ণ আর আমাদের মধ্যে সশরীরে নেই। আমরা যারা এতকাল তাঁর প্রত্যক্ষ সঙ্গ পেয়ে এসেছি তাদের কাছে এটি একটি অচিন্ত্যনীয় ব্যাপার। এই শোকের কোনও মানসিক প্রস্তুতি আমাদের ছিল না। স্বাভাবিক ভাবেই মনে প্রশ্ন জাগ্ল যে এই প্রিয় বৃদ্ধ বিহনে জীবন কাটবে কি করে? যদিও তাঁর লেখা জীবনের অপার রহস্যকে ধীরে ধীরে উন্মোচিত করছে। তিনি আমাদের অনন্ত শান্তি ও আনন্দের সন্ধান দিয়েছেন। তাঁর কাছ থেকে সহজেই আমরা ধ্যান করতে শিখেছি। তিনি আমাদের পাঠচক্রে পাঠ করা ও শোনার নির্দেশ দিয়েছেন। এখানে শ্রোতা ও পাঠক উভয়েরই মন বাইরের জগতের নানা দ্বন্দ্ব কোলাহল থেকে মুক্ত হয়ে উচ্চতর স্তরে উঠে যেত। কিন্তু তাঁর সশরীর উপস্থিতির শূন্যতা কিভাবে পূরণ হবে? সশরীরে তিনি যতটা আকর্ষণীয় ও আনন্দদায়ক ছিলেন স্বপ্নেও ঠিক তেমনই। স্বপ্নে তিনি তাঁর দিব্য স্পর্শ দেন। অফুরন্ত কৃপা বর্ষণ করেন। তবুও তাঁর জীবৎকালে যে সঙ্গ পেয়েছি, স্বপ্নে তেমন সহজ সঙ্গ হয়না। কেউ যদি অভিভূত হয়ে তাঁর কাছে ছুটে যেতে চায়, তবে এখন তার কি করণীয়? কার কাছে সে মনের কথা বলবে? এমন প্রিয় বন্ধু আর কে আছে? স্বভাবতই আমরা নিদারুণ শোকে অস্থির হয়ে পড়লাম।                     

এই অবস্থায় আমরা যারা শ্রীজীবনকৃষ্ণের সঙ্গধন্য, তারা একে অপরের কাছে আসার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকতাম। যারা তাঁর সঙ্গ করেনি বা তাঁর কৃপা লাভ করেনি সেরকম বন্ধু বা আত্মীয়ের কাছে নিজের মনের কথা প্রকাশ করা অবান্তর। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ তাঁর বলা কথাগুলি দিনলিপির আকারে লিখে রেখেছিলেন। এই ডায়েরিগুলোই আপাতত তাঁর পরিবর্তে কিছুটা প্রলেপ দিলো। যদিও সামান্যই। কোনও একজন নিজের ডায়েরি থেকে পড়ে শোনাতেন। অন্য সকলে একাগ্র হয়ে শুনতেন। এমন পরিবেশে সকলে তাঁর উপস্থিতি অনুভব করতেন। সেই সময় আমরা একটি পত্রিকার প্রয়োজনীয়তা বোধ করি। যে পত্রিকাতে ওঁর বিষয়ে সব কিছুর সঙ্গে ওঁকে জড়িয়ে আমাদের অভিজ্ঞতার কথা থাকবে। আমরা সাপ্তাহিক সভার আয়োজন করলাম। অ-বাবু সেখানে নিত্য উপস্থিত। তিনি চুপ করে ঘরের এক কোণে বসে থাকতেন। বেশি লাজুক ও অন্তর্মুখ হবার কারণে কথা বলতেন কম। তবুও এখানেই তিনি তাঁর অবসর সময় কাটাতে ভালোবাসতেন। উপস্থিত অন্যান্য সকলের কথা তিনি মন দিয়ে শুনতেন। শ্রীজীবনকৃষ্ণের দেহ যাবার পরে স্বপ্নে তাঁকে দেখা বন্ধ হয়নি। বরং এক নতুন পথে তার বিস্তার ঘটল। অ-বাবুকে জিজ্ঞেস করলে স্বপ্নে জীবন্তভাবে শ্রীজীবনকৃষ্ণকে তাঁর দর্শনের কথা জানান। ওঁকে কেন্দ্র করে স্বপ্নদর্শনের একটি তুলনামূলক আলোচনা অন্য সময়ে করাই যায়, যাতে স্বপ্নের অশেষ বৈচিত্র্য এবং অসীম গভীরতা উপলব্ধি করা যায়।

        এখানে শ্রীজীবনকৃষ্ণের ইহদেহ ত্যাগের পর অ-বাবুর জীবনের কথাই আলোচনা করব। আগেই বলেছি যে অ-বাবুর ব্যবহারিক জীবন কোনও সাধারণ মানুষের থেকে আলাদা ছিল না। সকাল বেলায় তিনি চা খেয়ে খবরের কাগজ পড়ে অফিসে যাবার জন্য তৈরি হতেন। দিনের শেষে কাজের পরে বিশ্রাম নিতেন। গল্প উপন্যাস পড়ার ঝোঁক তাঁর ছিল না। অবসর সময়ে তিনি কথামৃত ছাড়া শ্রীরামকৃষ্ণদেবের পার্ষদদের নিয়ে লেখা নানা বইপত্র পড়তেন।                             

তাঁর স্বভাবের একটা বিশেষত্ব ছিল এই যে, যে ব্যক্তি শ্রীজীবনকৃষ্ণের কথায় আগ্রহী নয় তাদের সঙ্গে তিনি কথা বলতে ভালোবাসতেন না। অন্য সব অন্তরঙ্গ পার্ষদদের মতই অ-বাবুও মনে মনে শ্রীজীবনকৃষ্ণের সঙ্গপূত অতীতের দিনগুলি ফিরে পেতে চাইতেন। কী সহজেই না কি অসাধারণ বস্তু লাভ হয়েছে! কিছু না জেনেও তাঁর ঘরে গিয়ে তাঁর কথা শুনলে আপনা থেকে মন সহস্রারে চলে যেত। অনন্তে মিশে যেত। শ্রীজীবনকৃষ্ণের দেহরক্ষার পর আগের পরিবেশ প্রায় এক থাকলেও অ-বাবু কখনও আর তাঁর সেই ছোটো ঘরটিতে জাননি। সেই অদ্ভুত চৌম্বক শক্তি, সেই আকর্ষণ অ-বাবু যেন আর অনুভব করতেন না। তবু সেই মধুর জীবনের আস্বাদ পেতে মন উন্মুখ হত। সাধ্য ও সাধকের এই বিচ্ছেদ তাঁকে অস্থির করে তুলতো। অ-বাবু অবিবাহিত ছিলেন। তাঁর অবসর ছিল প্রচুর। অবসর সময়ে তিনি শ্রীজীবনকৃষ্ণের সঙ্গ ও নিজের দর্শনাদির কথা ভাবতেন। যদিও নিজের সম্পর্কে তাঁর ধারণা একেবারেই উঁচু ছিল না। জীবনকৃষ্ণের কথা অনুযায়ী দ্রষ্টার আধার অনুপাতে তার স্বপ্নগুলি দেহেতে বর্তায়। অ-বাবু তাই নির্দিষ্টভাবে স্বপ্নের ফল পেতে চাইতেন। এইভাবে ভাবতে গিয়ে কখনও কখনও তিনি ওঁর কথাগুলি ভিত্তিহীন মনে করতেন। তবুও সেই অমোঘ আকর্ষণ থেকে তিনি মুক্ত হতে পারতেন না। যেমন, স্বপ্নে তিনি মাতৃযোনি দেখেছিলেন। শ্রীজীবনকৃষ্ণের ব্যাখ্যা অনুসারে এর অর্থ তাঁর দেহ থেকে কাম উবে যাবে। তবে কেন এখনও তাঁর মধ্যে কামভাব জাগে? যদিও জীবনকৃষ্ণ বলেছিলেন এসব দর্শন দেহে বর্তাতে সময় নেয়, আর বর্তায়ও আধার অনুপাতে।                         

শ্রীজীবনকৃষ্ণ সঙ্গকারীদের ব্যবহারিক জীবনে ঠিক কতটা পরিবর্তন হয়েছিল সে বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আমরা যেন বিস্মৃত না হই যে তারাও রক্তমাংসের মানুষ। সুতরাং দেহের যা ধর্ম তা থেকে তারা সম্পূর্ণ মুক্ত নন। দুর্বল মুহূর্তে কখনও কখনও ইন্দ্রিয় প্রবল হয়। তাই, আমাদের কোনও পার্থিব আকর্ষণ নেই একথা ঘোষণা করা মিথ্যে।                                          

এ সত্ত্বেও সাধারণ মানুষ বা গোলা লোকের সঙ্গে শ্রীজীবনকৃষ্ণের পার্ষদদের বিস্তর ফারাক ছিল। উনি নিজে যখন আমাদেরকে এ পর্যন্ত জন্ম নেওয়া পৃথিবীর সবচেয়ে ভাগ্যবান মানুষবলে অভিহিত করেছেন তখন নিশ্চয় তার কিছু কারণ আছে। শ্রীজীবনকৃষ্ণ বজ্রকণ্ঠে বলেছেন, ধর্ম বাস্তব। ধর্ম প্রমাণসাপেক্ষ। সত্য অতি সহজেই নিজেকে প্রকাশ করে। কষ্টিপাথরের দুর্বোধ্য চিত্রাক্ষর এখন বইয়ের অক্ষরের মতই সহজবোধ্য। কী আশ্চর্য! একজন দিনমজুর পর্যন্ত ঈশ্বরকে অনুভব করে! আরও আশ্চর্যের এই যে, ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের মানুষও এই একজনকেই ভিতরে দর্শন করে!                                     

সত্যের এই নবতম আবির্ভাব, জাতি, ধর্ম, নারী, শিশু ও পুরুষ নির্বিশেষে প্রত্যেকের তাঁকে দেখা অতি বিস্ময়কর ঘটনা।                                                                                      শুধুমাত্র অতীত সংস্কার থেকে মুক্ত হতে পেরেছি বলেই যে আমরা খুশি তা নয়। আমরা খুশি কারণ আমাদের অগ্রগতির প্রমাণ আমরা দিতে পেরেছি। কোনও তথাকথিত বিশ্বাস বা ব্যক্তিগত অনুভবের কথা বলছিনা। আমরা বলছি সেই বৈজ্ঞানিক সত্যের কথা যা সমাজের প্রতিটি মানুষ অন্তরে বহন করছে। অন্তরের সেই মানুষটি সদা নির্দেশ দিচ্ছেন। প্রত্যেক ব্যক্তির আধার অনুপাতে স্বপ্নে তাঁকে দেখা ও তার প্রভাব দেহে বর্তানো, চলতে থাকে। বাইরে তাঁর কথা শোনা, আর অন্তরে জাগ্রত হয়ে তাঁর নির্দেশ শোনার মধ্যে তফাত আছে। অন্তর্দর্শন শ্রেয়। বেশি শক্তি ধরে। মানুষটা নিজে বুঝতে না পারলেও আত্মিক পরিবর্তন চলতে থাকে। বাইরে এবং ভেতরে শ্রীজীবনকৃষ্ণের এমন সঙ্গ পার্ষদদের ওপরে অফুরন্ত কৃপার প্রমাণ দেয়।             

তবু জোয়ার ভাঁটা আছেই। কখনও আনন্দে মন ভরে ওঠে। কখনও বা কোনও দর্শনকে কেন্দ্র করে সংশয় উপস্থিত হয়। তবু তাঁর সান্নিধ্যে যে স্বর্গীয় আনন্দ পাওয়া গেছে তার কাছে বিষয় রস আলুনি লাগে। এঁরা কেউই আর পূজার নামে প্রতিমার সামনে মাথা ঝোঁকাবেন না। বা, পূর্ব সংস্কার অনুযায়ী পুজো পার্বণ করবেন না। ব্যবহারিক জীবনেও তাঁদের জীবন যাপন ও ধারণাসমূহ অন্যদের থেকে আলাদা। ভবিষ্যতে কখনও শ্রীজীবনকৃষ্ণের এই রাজযোগ সম্পর্কে বিস্তারিত লেখা যাবে। এখন এই রচনার মূল উদ্দেশ্য ছিল, কিছু সাধারণ মানুষ, যারা শ্রীজীবনকৃষ্ণের সান্নিধ্যে না এলে জীবনের এই অদ্ভুত রহস্য সম্পর্কে অজ্ঞই থেকে যেতেন, তাঁদের কথা বলা। তাঁদের বহু দর্শনের কথা জানা সত্ত্বেও ওঁর দেওয়া প্রামাণ্য ব্যাখ্যা ছাড়া আমার পক্ষে কোনও স্বপ্ন বা দর্শনের উল্লেখ করা সম্ভব নয় বলেই স্বীকার করছি।                                  একথাও বলা দরকার যে, আমার সীমিত তথ্যসূত্রের ওপরে নির্ভর করেই রচনাটি লিখেছি। এ সত্যি যে নির্বাচিত মানুষটির জীবনের প্রতিটি খুঁটিনাটি ঘটনা ও তথ্য আমার কাছে না থাকার জন্য তাঁর সমস্ত আত্মিক জীবনের ইতিহাস আমার জানা সম্ভব নয়।                                           

কিন্তু আগ্রহী পাঠক মাত্রই শ্রীজীবনকৃষ্ণের আবির্ভাবে সত্যের বিকাশের সম্পূর্ণ ইতিহাস জানতে ইচ্ছে করতে পারেন।

দ্বিতীয় ভাগ

 

এবার আমরা দ্বিতীয় দলটি থেকে খ- বাবুকে বেছে নেব দ্বিতীয় দলের সদস্যরা পুরনো ও আধুনিক ধর্ম জীবনের একটি সামঞ্জস্য খুঁজতে চেষ্টা করছিলেন মানুষ মাত্রই পরিস্থিতির দ্বারা প্রভাবিত ইতিহাসখ্যাত মৌলিক চিন্তার দার্শনিকরা ও তাদের পরিবেশের প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হতে পারেননি।

বিভিন্ন ধর্ম সম্প্রদায়ের মানুষ শ্রীজীবনকৃষ্ণের ঘরে সহজেই আসতে পারতেন এবং তিনিও তাদের সাদর অভ্যর্থনা করতেন। তারা তাদের পারিবারিক রীতিনীতির সম্পূর্ণ বিরোধিতা করতেন না।  গীতা সম্বন্ধে হিন্দুরা, কোরআন নিয়ে মুসলমানেরা এবং বাইবেল সম্পর্কে খ্রিস্টানরা গভীর শ্রদ্ধা পোষণ করতেন । কিন্তু তারা নিজেদেরকে সেই গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ করেননি। বরং কেউ যদি তাদের ঈশ্বর সম্পর্কে আরেকটু আলোকিত করেন এমন কাউকে খুঁজেছেন। প্রকৃতপক্ষে সর্বধর্মের সমন্বয়ের জন্য একটি যুক্তিপূর্ণ মত তারা সন্ধান করেছিলেন যা তাদের জীবন রহস্যের আরো গভীরে ডুব দিতে সাহায্য করবে।

একথা বলা দরকার যে অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে কিছু ধর্মীয় রীতিনীতি পালন করে গেলেও তারা সন্তুষ্ট হতে পারেননি । কারণ এগুলি তাদের বিন্দুমাত্র ঈশ্ব-লাভে সাহায্য করেনি। এরকমই মন নিয়ে তিনি শ্রীজীবনকৃষ্ণের কাছে আসেন। তিনি একজন সমর্পিতপ্রাণ হিন্দু এবং শ্রী রামকৃষ্ণ মঠ থেকে দীক্ষিত। একদিন তার প্রায় সমবয়সী মামা তাকে বললেন, তিনি একজন অবতারের সংস্পর্শে এসেছেন । ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসের সঙ্গে তাঁর অনেক মিল আছে । খ-বাবু উৎসাহিত হলেন । তিনি এই ভদ্রলোককে দেখতে চাইলেন । কিন্তু মামা তাকে দুটি শর্তের কথা বললেন যার মধ্যে অন্তত একটি পূর্ণ হতেই হবে। প্রথমত তার স্বাস্থ্যের উন্নতি প্রয়োজন।দ্বিতীয়তঃ শ্রীরামকৃষ্ণদেবকে স্বপ্নে দর্শন। কোন নবাগতর জন্য এই দুটি প্রধান শর্ত ছিল জীবনকৃষ্ণর। তাই তার মামা যতদিন না শর্ত পূরণ হয় ততদিন তাকে অপেক্ষা করতে বললেন। খ-বাবু হতাশ হলেন। কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই তিনি একটি অদ্ভুত সুন্দর স্বপ্ন দেখলেন। 

তিনি দেখলেন, তিনি উত্তর ভারতের একটি শহরের এক জনবহুল রাস্তায় হাঁটছেন। এমন সময় একটি টাঙ্গা তার দিকে আসতে দেখা গেল। গাড়িটা তার কাছে এসে থামল। তিনিও দাঁড়িয়ে পড়লেন। মনে হলো টাংগার যাত্রীদের তিনি ভালই চেনেন। এবং তাদের সঙ্গে যেন অনেকদিন পর দেখা হল। খ-বাবুর অনুমান সত্য হলো। তিনি খুশি হলেন, যাত্রী দুজন হলেন ঠাকুর ও শ্রীম।  ঠাকুর তাঁর পরিচিত ভঙ্গিতে সহাস্যে তাকে তার ও তার পরিবারের কুশল জিজ্ঞাসা করলেন। খ-বাবু ও কুশল জানালেন। তাঁর আরও কথা বলার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু স্বপ্ন ওইখানেই ভেঙে গেল। 

এত অল্প সময়ে স্বপ্ন দর্শনের পরীক্ষা উতরে গিয়ে খুব খুশি হলেন। এবার শ্রীজীবনকৃষ্ণের কাছে যাওয়ার আর বাধা রইল না।

 প্রায় একমাস পর তার মামার সঙ্গে শ্রীজীবনকৃষ্ণের কাছে এলেন। জীবনকৃষ্ণ তাদের ডেকে নিলেন। ভিড়ের মধ্যে মিশে থাকলেও শ্রীজীবনকৃষ্ণের উপস্থিতি অনন্য ছিল। তিনি কথায় কথায় জানতে পারলেন যে খ-বাবু রামকৃষ্ণ মঠ থেকে দীক্ষিত। জীবনকৃষ্ণ তাকে কাকে ঠোকরানো আম  বলে চিহ্নিত করলেন ও দেবসেবায় লাগবেনা বলে দুঃখ প্রকাশ করলেন। স্পষ্ট কথা বলতে গেলে  তাঁর কথায় একজন মানুষের থেকে দীক্ষিত হওয়ার ফলে খ-বাবুর প্রভূত ক্ষতি হয়েছে।  তাঁর দেহে আত্মার স্বতস্ফূর্ত বিকাশ থেকে তিনি বঞ্চিত।

নিশ্চিতভাবেই তাঁর উক্তিটি শ্রীরামকৃষ্ণের বাণী থেকে উদ্ধৃত ছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে অন্য একটি স্বপ্নে তিনি জীবনকৃষ্ণের কথার মর্ম উপলব্ধি করে আশ্বস্ত হলেন। তাঁর সেদিনের সেই নেতিবাচক কথাটি আসলে দ্রষ্টার তথাকথিত সংস্কারে আঘাত করেছে। ফলে এটি যেন তিরস্কারের আড়ালে আশীর্বাদ। শ্রীজীবনকৃষ্ণের করে প্রায় তিন-চার ঘণ্টা থাকায় খোবাবু অনেকটা চিন্তার রসদ পেলেন। জীবনকৃষ্ণর উপস্থিতি আকৃষ্ট। করে তার ব্যাখ্যা গুলি অভিনব এতদিন ছাপার অক্ষরে ভাবসমাধি অর্ধবাহায়দশা ইত্যাদি সম্বন্ধে তিনি যা জেনে এসেছিলেন জীবনকৃষ্ণের মধ্যে তার জীবন্ত প্রকাশ চাক্ষুষ  করলেন।

তার মনে বিদ্যুতের মতো একথা উদয় হলো যে রামকৃষ্ণ মঠ থেকে লিখিত পরীক্ষার নিষ্ঠা সহকারে করেও তিনি ঠাকুরকে স্বপ্ন দেখেননি, কিন্তু তার মামার সঙ্গে শ্রী জীবন কৃষ্ণের কথা  আলোচনা করে তিনি প্রথম ঠাকুরকে স্বপ্নে দেখলেন।

খ-বাবু হতবাক হয়ে গেলেন ঘরে কথামৃত পাঠ পায় কিন্তু পাঠের ব্যাখ্যা চেয়েও ব্যাখ্যাতা আর মনোযোগ বেশি আকর্ষণ করেন-বাবু দেখে অবাক হলেন যে সাধুটি এই মুহূর্তে মজা করছেন  হাসছেন আর পরমুহুর্তেই গভীর সমাধিতে নিমগ্ন হচ্ছেন।

শ্রীজীবনকৃষ্ণ আগ্রহভরে স্বপ্নগুলি শুনতেন এবং তার অপূর্ব ব্যাখ্যা দিতেন। এর আগে খ-বাবু  কাউকে এমন দেখেননি যিনি অন্যের স্বপ্ন এত আগ্রহ ভরে শোনেন এবং সেগুলির ব্যাখ্যা করেন। ব্যাখ্যাও কী অপূর্ব! "তোকে রোজ কথামৃত পড়তে আদেশ করছে রে", জীবনকৃষ্ণ বললেন। খানিক পরে কথামৃত পাঠের মধ্যেই স্বপ্নটির বাকি ব্যাখ্যা উচ্চারিত হলো। তিনি বললেন, ওই যে ঠাকুর বলছেন না? যারা তাঁর কাছে কিছু চায় বাবু তাদের এক গাড়িতে নেয় না। তা হোক খুব ভালো স্বপ্ন।  

সন্ধ্যা নামতেই প্রত্যেকটি আলো নিভিয়ে দেওয়া হল এবং প্রত্যেকেই নিজের নিজের জায়গায় বসে ধ্যানে মগ্ন হলেন। বলা বাহুল্য শ্রীজীবনকৃষ্ণেরই সবচেয়ে গভীর ও দীর্ঘ সময় ধরে ধ্যান হল। ধ্যান ভাঙতে আলো জালানো হল।

প্রায় প্রত্যেককেই ধ্যানে কোনো দর্শন হয়েছে কিনা জিজ্ঞেস করলেন। খ-বাবুও ছাড় পেলেন না। কিন্তু তার তো ধ্যানই হয়নি! অনুভূতি দূরের কথা।

 প্রথম দলের অ-বাবুর মতই দ্বিতীয় দলের এই খ-বাবুকেও তিনি প্রশ্ন করলেন -ভগবান কোথায় রে বাবা ? উত্তরটি জনপ্রিয়, ও বেশ উচ্চস্তরের। কিন্তু একেবারেই পুঁথিগত ধারণা। বলাবাহুল্য যে এ উত্তর তাঁকে সন্তুষ্ট করল না। জীবনকৃষ্ণ তাঁর নিজস্ব পদ্ধতিতে খ-বাবুর থেকেই সঠিক উত্তরটি বের করে নিলেন।

-- তুই বললি তুই ঠাকুরকে দেখেছিস ঠিক না? কোথায় দেখলি? খ-বাবু স্বপ্নে দেখা সেই নির্দিষ্ট  জায়গাটির নাম করলেন কিন্তু শ্রীজীবনকৃষ্ণের মুখ দেখেই বুঝলেন উত্তরটা সন্তোষজনক হল না। কিন্তু তার মুখের মধুর হাসিটি আশ্বস্ত করল ভয় পেলেন না জীবনকৃষ্ণ তাঁকে দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে নিয়ে যেতে থাকলেন-বাবুর স্বপ্নটি যেখানে তার হাতে একটি উদাহরণ হয়ে রইলো উত্তরগুলি এরকম হবেঃ  ঠাকুরকে স্বপ্নে দেখা গিয়েছে স্বপ্ন মাথায় হয়, ব্রেনে মাথা শরীরের মধ্যেঠাকুর অবতার অবতার কে দেখাও যা ভগবানকে দেখাও তা। ভগবান মানুষের দেহে শ্রীজীবনকৃষ্ণ আবেগভরা কণ্ঠে বললেন মামার দিকে চেয়ে হাসতে হাসতে বললেন,  তাহলে ভাগ্নে পরীক্ষায় পাশ করে গেল?

 রাত ন'টা নাগাদ পাঠ শেষ হলে তাঁকে প্রণাম করে খ-বাবু বিদায় নিলেন। তিনি আবার আসতে বললেন তাঁর ঘরে যাতায়াত শুরু করলেন শ্রী জীবনকৃষ্ণকে স্বপ্নে দেখার আগে কতগুলো ছোট ছোট স্বপ্ন দেখলেন তিনি। কিন্তু আপাত গুরুত্বহীন স্বপ্নগুলো শ্রীজীবনকৃষ্ণের ব্যাখ্যার গুণে অনুপম হয়ে উঠলো, এবং ঘরের আবহাওয়ায় অদ্ভুতনন্দ এনে দিলো

কতগুলো স্বপ্ন ও তার ব্যাখ্যা এখানে দেওয়া যাক।

 

খ-বাবুর স্কুল পড়াকালে সংস্কৃতের প্রধান শিক্ষক ছিলেন প্রসন্নকুমার কাব্যতীর্থ। তিনি তাঁকে স্বপ্নে দেখলেন। জীবনকৃষ্ণ বললেন, ভগবান দ্রষ্টার প্রতি প্রসন্ন হয়েছেন। তিনি তার দেহে ক্রমে ক্রমে প্রকাশিত হবেন। স্বপ্নে যিনি শিক্ষক তিনি আসলে সচিদানন্দ গুরু। পরম সত্যের জ্ঞান দান করেন। এবং প্রসন্ন অর্থে ভগবান প্রসন্ন হয়েছেন।

 আরেকটি স্বপ্নে দেখলেন তিনি তার মামার বাড়ি গিয়েছেন। তিনি দেখলেন বাড়িটি যেন সাদা মার্বেলে মোড়া। যদিও স্বপ্নে তার মনে হলো যে মামা তাকে শ্রীজীবনকৃষ্ণর কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন এটি তারই বাড়ি। তবু বাস্তবের সঙ্গে তার মিল নেই। তিনি সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার সময় লক্ষ্য করলেন দেওয়ালে শ্বেত পাথরে বেদমন্ত্র খোদাই করা। তিনি কতগুলি মন্ত্র পড়লেন। একটি ঘরে ঢুকে তিনি দেখলেন তার দাদামশাই বসে আছেন।

-তোর দাদা মশাই এর নাম কি রে? শ্রীজীবনকৃষ্ণ প্রশ্ন করলেন।

- অমরনাথ।

তবে তো বাবা এর ব্যাখ্যা এতেই নিহিত! নাম ও নামী অভেদ বাবা। শ্রীজীবনকষ্ণ একথায় বোঝাতে চাইলেন যে দ্রষ্টা অমরত্বের সীমায় প্রবেশ করলেন।অন্যভাবে বলা যায়, ভগবান আধার অনুপাতে দ্রষ্টার দেহে প্রকাশ হলেন। কারণ একমাত্র তিনিই অমর।

স্বপ্নটার আরো অর্থ আছে, শ্রীজীবনকৃষ্ণ বললেন।"মামার বাড়িতে গেছিস মানে ঈশ্বরের কাছে গেছিস। এটি শ্রীরামকৃষ্ণের সেই মার্কামারা কথা ধরে ব্যাখ্যা। চাঁদা মামা সকলেরই মামা। ( বাঙালিরা আমার বাড়ি কে আদরের জায়গা মনে করে বাচ্চারা সেখানে নিরন্তর উপায় ভালোবাসার জায়গা)। ঠিক যেমন ঈশ্বরের কাছে নিরন্তর স্নেহ পাওয়া যায় ঠাকুর মামার বাড়ি কে ঈশ্বরের কাছে যাওয়ার সঙ্গে তুলনা করেছেন।

শ্রীজীবনকৃষ্ণ -স্বপ্নে যে বেদের মন্ত্র দেখেছিস, ও তোর পূর্ব পূর্ব জন্মের সঞ্চিত সংস্কার ফুটে উঠেছে। এরপরে জীবনকৃষ্ণ তার দীক্ষা সম্বন্ধে যা বলেছিলেন তার ব্যাখ্যা পাওয়া গেল।

তিনি স্বপ্ন দেখছেন যে তিনি তার গুরুদত্ত বীজ মন্ত্রটি কি জপ করতে বসেছেন। বুঝতে পারছেন যে কি ভুল মন্ত্র সমানে জপ করে চলেছেন। স্বাভাবিকভাবেই তার এটি চরম অপরাধ বলে মনে হতে লাগলো। সঙ্গে সঙ্গে তিনি দৌড়ে একজনের কাছে গেলেন, যিনি নিশ্চিত তাকে সঠিক মন্ত্রটি বলে দিতে পারবেন। সে ব্যক্তি বহুবার তার সামনে মন্ত্রটি উচ্চারণ  করলেন।বাড়ি ফেরার পথে খবাবু এই মন্ত্রটি জপ করতে করতে আসলেন।

 স্বপ্ন ভেঙে গেলে তিনি দেখলেন তিনি ভুল মন্ত্র জপ করে চলেছেন।

 বহু পরে তার নিজের গুরুদত্ত বীজটি মনে পড়ে। জীবনকৃষ্ণ স্বপ্নটি শুনে হাসলেন। এর কোনো ব্যাখ্যা দিলেন না।

তিনি জিজ্ঞেস করলেন যে খবাবু কি বুঝেছেন। খবাবু বললেন যে তার মন্ত্রের সংস্কার, দীক্ষার সংস্কার চলে গেল।

 শ্রীজীবনকৃষ্ণের মুখের ভাবে বোঝা গেল যে তিনি এই ব্যাখ্যায় খুশি হয়েছেন।

No comments:

Post a Comment

শ্রীজীবনকৃষ্ণের অমৃত কথাসার প্রথম অংশ

১৯৫০ থেকে ১৯৫৩ সালের কিছু কথা সংকলিত করা হয়েছে শ্রীজীবনকৃষ্ণ সংশ্রয় থেকে। যেহেতু সেখানে দিনলিপিতে তারিখের উল্লেখ নেই, তাই এখানে তারিখের উল্ল...