ত্বং জাতো ভবসি বিশ্বতোমুখঃ
আমাদের
এক সুত্রে বেঁধে দিয়েছেন আমাদের পরমধন শ্রীজীবনকৃষ্ণ। তাঁর নামে মধু, তাঁর কথায়
মধু।তাঁকে নিয়ে আলোচনায় মধু। আজ বিভিন্ন ভাবে তাঁর প্রকাশ ও সঙ্গকারীদের উদ্দেশে
তাঁর কিছু কথা এবং সঙ্গকারীদের তাঁকে নিয়ে অনুভব ও প্রকাশ আলোচনা করছি।
পরম শ্রদ্ধেয় শ্রীমহাপুরুষ মহারাজ
একবার তাঁর শিস্যদের উপদেশ দিয়েছিলেন যে যখন ধ্যানে বসবে তখন ঠাকুরকে সহস্রারে
বসাবে ও তাঁর পার্ষদদের তাঁকে ঘিরে বসাবে। তাঁরা যেন ঠাকুরকে ভজনা করছেন এই ছবিটি
মাথায় রেখে ধ্যান করবে। শ্রীজীবনকৃষ্ণ বলছেন – বাবা, চোখ দুটি বন্ধ করে, দুটো হাত
এমনি করে জোর করে কোলের উপর ফেলে রাখ। কাপড়ের কষি আলগা কর। নে, এবার মনটা কপালে রেখে বসে থাক। দর্শন, অনুভূতি, ধ্যান,
যা হবার আপনা থেকে হবে। এরপর পার্ষদ সম্বন্ধে বলছেন, - জল খেলুম আমি নয়, আনন্দ।
পেচ্ছাব গেলুম, দেখলুম আনন্দ পেচ্ছাব করল। বলছেন – তেল মাখতে বসেছি, দেখি রাম। তা
দিলুম বেশ করে তেল মাখিয়ে। খেতে শুতে তোদের কেউ না কেউ সঙ্গে থাকবেই। আবার কখনও
প্রশ্ন করছেন – কার মুখ হয়েছি বলতো? জিতেন বাবু (মৃদু স্বরে) – রতনবাবুর?
শ্রীজীবনকৃষ্ণ (চোখ বন্ধ করে)- না তোদের পাঁচটারই।
আলাদা করে ওঁকে সহস্রারে সপার্ষদ
কল্পনা করতে হলনা। তিনি ধারণা করিয়ে দিলেন। এরপর বলি আমাদের প্রিয় বিভাদির একটি
অনুভূতির কিছু অংশ। অনুভূতিটি বেশ বড় ও বহুলাংশে ব্যক্তিগত। শুধু নির্বাচিত অংশটি
উল্লেখ করছি। বিভাদি দেখছেন তিনি কদমতলায় গেছেন। এবং স্বপ্নেই মনে হচ্ছে শ্রী জীবন
কৃষ্ণ স্থূলে আর নেই। তবু এই ঘরে কত আলোচনা, কত অনুভূতি। সে আকর্ষণ এত তীব্র যে
তিনি অসুস্থ শরীর অগ্রাহ্য করে ছুটে গেলেন ভেতরে। একতলায় তখন শ্রদ্ধেয়া আশালতা
দেবী বিধি মাফিক ঠাকুর পুজর জোগাড় করছেন। উনি তাঁকে পাশ কাতিয়ে সিঁড়ি বেয়ে সোজা
ছাতে উঠে গেলেন। দেখলেন শ্রী জীবন কৃষ্ণ ছাতে বসে। তিনি যেন মধ্য মনি। তাঁকে ঘিরে
তাঁর পার্ষদ রা বসে। বিভাদি জড়িয়ে ধরলেন তাঁর কোমর। এই তো তিনি। কে বলে তিনি নেই?
কল্পনা করে সহস্রারে বসাতে হলনা। তিনি আপনিই বস্লেন এবং পার্ষদ দের ও বসালেন। আজ
কিছু কথা শ্রীজীবনকৃষ্ণ তাঁর পার্ষদদের সম্বন্ধে যা বলেছেন ও পার্ষদরা তাঁর
সম্বন্ধে বলেছেন – আলোচনায় রাখব।
৭/০৩/১৯৫৬, আলপুকুর।
বিকেল পাঁচটা। গ্রাম সংলগ্ন শ্মশান। তার
পাশের মাঠ। সেখানে গিয়ে শ্রীজীবনকৃষ্ণ বসার সঙ্গে সঙ্গে সমাধিস্থ হলেন। সঙ্গে গেছেন – সুধীনদা, অরুণ, বিনয়,
আনন্দ, রঞ্জিত, সৌরেন ও দিলীপ। সকলে তাঁর সঙ্গে মাঠে বসলেন। ও একে একে ধ্যানস্থ
হতে লাগলেন। ধ্যানের আমেজ লেগে গেছে। চোখ খুলতে ইচ্ছে করছেনা। প্রায় আধঘণ্টা পর,
চোখ খুলে দিলীপ দেখেন যে তিনি প্রত্যেক কে নিরীক্ষণ করছেন। সৌরেন ও অরুণ এখনও
ধ্যানস্থ। বিনয় ও রঞ্জিতের প্রতি দৃষ্টিপাত করে বললেন আহা, এ তো ধ্যান নয়, ধ্যান
সমাধি। সব কটারই তাই। এখনও ও দুটি জমে আছে। তমাদের দেখে কি মনে হচ্ছিল জানলে
সুধীন? মনে হচ্ছিল সপ্তর্ষির কথা। ওরে, এই তো সেই সপ্ত ঋষি! বলতে বলতে তিনি
সমাধিস্থ হয়ে পরলেন। আমরা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে বসে আছি। অরুণ ও সৌরেনের দীর্ঘশ্বাস
পড়ার শব্দ হল । তাঁদের ধ্যান ভাঙছে। সমাধি ভঙ্গের পর বললেন – আহা, তোদের স্পর্শে
শ্মশান আজ ধন্য হল। এ পর্যন্ত কেউ এখানে বসে ঈশ্বরচিন্তা করেনি। (সুধাকুম্ভ)
শ্রীআনন্দমোহন ঘোষের স্মৃতিচারণঃ-
পাঠ
করলাম thou hast made me endless । উনি চুপ করে আবৃত্তি শুনলেন। সেদিন সভা শেষে আমি ও
রামকেস্টদা রয়েছি। সকলে সেই সময়টি কে উপসংহার আখ্যা দিয়েছিলেন। উনি বললেন – দ্যাখ,
তোর আবৃত্তি খুব প্রানবন্ত হয়েছিল। আমার সর্বাঙ্গে পুলক হচ্ছিল। এটা ওই কবিতার
অনুবাদ, আমারে তুমি অশেষ করেছ। এখানে এসে তুই অশেষ হয়েছিস। (কত কথা পড়ে মনে)
সেদিন
বিকেল থেকে অবিরাম বৃষ্টি। ভিজতে ভিজতে রামকেস্টদার সঙ্গে ডালহাউসি স্কোয়ার থেকে
হাঁটতে হাঁটতে হাওড়া ষ্টেশনে পৌঁছে দেখি কদমতলার বাস বন্ধ। অগত্যা পায়ে হেঁটে
পঞ্চাননতলা হয়ে ওঁর ঘরে গিয়ে হাজির। তখন রাত আটটা। আমাদের দেখেই খাট থেকে নেমে
দাঁড়ালেন। ধমকের সুরে বললেন – বলিহারী তোদের ধম্মের বাই! এই বৃষ্টিতে মানুষ ঘর
থেকে এক পা ও বেরুতে পারেনা আর তোরা সপাটে ভিজে এলি? তোরা যে একেবারে ঘরছাড়া জাগাত
ছাড়া রে! পর ক্ষণেই ব্যাস্ত হয়ে বললেন – নে নে, জামা কাপড় সব খুলে ফেল। খাটের বাজু
থেকে মুখ মোছার গামছাটা ছুঁড়ে দিলেন। বললেন – গামছা দিয়ে হাত পা মুছে ফেল। আলনায়
আমার কাপড় নিয়ে বদলে ফেল। বাস টাস বন্ধ শুনে বললেন – কত কষ্ট হল বাবা তোদের আসতে!
এই জল বৃষ্টিতে কেন আসতে গেলি? একদিন কি না এলেই চলত না? রামকেস্টদা বললেন – একদিন
আপনাকে না দেখলে মনে হয় দিন টা বৃথা গেল। আপনাকে না দেখে থাকতে পারিনা। উনি স্নেহ
পূর্ণ স্বরে বললেন – তা তো হবেই বাবা। মৃদু হাস্যে বললেন, তাই ভাবি, আমি মরে গেলে
তোরা কি করবি! রামকেস্টদা বিনীত স্বরে বললেন – আমরা জানি আপনি চিরকাল বেঁচে থাকবেন
আর আমরা আপনার কাছে এসে বসব। এছাড়া অন্য কিছু ভাবিনা। এ কথা শুনে উনি ছলছল
দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। একটু পড়ে বললেন- তোদের প্রণাম হই বাবা! ভগবান তোদের সর্ব
বিধ কল্যাণ করুন।(কত কথা পড়ে মনে)
এ প্রসঙ্গে শ্রী অরুণ কান্তি ঘোষের একটি
স্বপ্নের উল্লেখ করি। তিনি দেখছেন শ্রী জীবন কৃষ্ণ দেহ রেখেছেন। প্রজ্বলিত চিতার
আগুন। তিনি দেখছেন আর দুঃখে হৃদয় বিদীর্ণ হচ্ছে। এমন সময় সেই জ্বলন্ত চিতার থেকে
শ্রী জীবন কৃষ্ণ উঠে এলেন। এসে স্নেহের সাথে বললেন, সব্বাই চলে গেছে তুই এখনও এখানে
দাঁড়িয়ে কেন বাবা ? উত্তর এল – আপনি নেই আমি কার কাছে যাব ? সাথে অঝোরে কান্না ।
উনিই তখন পিঠে মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত করলেন। ভক্তটি প্রার্থনা করলেন – যেন ভগবান
ভগবান করে দিন যায় । বললেন তাই হবে বাবা।
শ্রীযুক্ত ধীরেন মণ্ডল দেখছেন – শ্রী জীবন
কৃষ্ণ দেহ রেখেছেন। সংবাদ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর মনে হল ঘরে পাঠের আয়োজন করতে
হবে । আয়োজন সম্পূর্ণ করে ফিরছেন, আর অনুভব করছেন শরীরের ভেতরটা যেন শুকিয়ে গেছে।
শ্রী অনাথ নাথ মণ্ডলের স্মৃতিচারণ – মনে
পড়ে ১৯৫৬ সালের কোজাগরী পূর্ণিমার দিনের কথা। সেদিন বিকেলে কাশীতে শ্রী জীবন
কৃষ্ণের বিদায় নিয়ে হাওড়ায় আমরা কজন মিলে ফিরছিলাম । সেদিন উনি হাওড়ায় আর ফিরবেন
না, এই সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে দিলীপ ওঁকে বলল – আপনি আমাদের আশীর্বাদ করুন ।
উনি তার জবাবে বললেন – আমাকে আশীর্বাদ করতে নেই । তখন দিলীপ বলল – আমরা কি তবে
রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াব? উনি উত্তরে বললেন – তা কেন বাবা? রাস্তার লোক তোদের
কাছে আসবে। আবার ১৯৬৬ সালের একদিন। বলছেন – আজ আমি ভাবছিলুম্ম আমি চলে গেলে এঁদের
কি হবে? পর ক্ষণেই মনে হল, কেন, আমি তো এঁদের দেগে দিয়েছি। এরা এই নিয়েই জীবন
কাটাবে। (শ্রী জীবন কৃষ্ণ সংশ্রয়)
পুরী থেকে ফেরার পালা। ভারাক্রান্ত মন।
শ্রীযুক্ত আনন্দমোহন ঘোষ লিখছেন। এবার স্বর্গ হতে বিদায়ের পালা। আগামীকাল পুরীধাম
হতে কলকাতা যাত্রা। ... বলছেন, কবে জয়েন করবি অফিসে? বললাম- পরশু। আবার কিছু ক্ষণ
চুপচাপ। সমুদ্রে জোয়ার এসেছে। ঢেউয়ের গর্জন শোনা যাচ্ছে। হঠাৎ বললেন – এখানে থেকে
যা না! কী হবে চাকরি করে? আচম্বিতে এমন প্রশ্নে বিহ্বল। পরক্ষণেই আদেশ সম্বরন করে
বলছেন – না বাবা, না বাবা। তোর যে মা আছেন রে! প্রসঙ্গ বদলে বলছেন – তোদের কথা
ভাবি। আমি মরে গেলে তোরা কি করবি? দ্যাখ, এত বড় একটা জিনিস হল, তা ব্যর্থ হবেনা।
এইসব কথা লোকেদের বলবি। তাতে তোদের অশেষ কল্যাণ হবে। আমি বললাম ওসব ঝামেলা আমি
পারব না। আমি কাউকে বলতে যেতে কিম্বা পাঠ করতে যেতে পারবনা। উনি আশ্চর্যান্বিত হয়ে
ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন। বললেন – সে কি রে! এসব কথা লোককে বলবিনা? তাঁর দু চোখ দিয়ে
জলের ফোঁটা গড়িয়ে পরল। আমি তো হতবাক। এমন ব্যপার কখনও দেখিনি। ওর চোখ দিয়ে জল
গড়িয়ে পড়ছে, তাড়াতাড়ি হাত জোড় করে বললুম – আজ্ঞে হ্যাঁ। বলব। আমার কাছে যারা আসবে
তাদের বলব। উনি আনন্দিত হয়ে বললেন – হ্যাঁ, হ্যাঁ, যারা তোর কাছে আসবে তাদের বলবি।
আম খেয়ে কেন মুখ পুঁছে বসে থাকবি বাবা? আবার নেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ। তারপ্র বলতে
লাগলেন- দ্যাখ, স্বামীজি ছিলেন আধিকারিক পুরুষ। ঠাকুর স্বামীজি দের সেই অধিকার
দিয়েছিলেন। এঁরা কোনও অন্যায় কাজ করতে পারেন না। তাই এঁদের কখনও বৈষ্ণব অপরাধ
হয়না। তোদের আমি সেই অধিকার দিয়ে যাচ্ছি। তোরাও আধিকারিক পুরুষ। এই কথা বলে
হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন। সমস্ত দেহ কেঁপে উঠল। তিনি সমাধিস্থ হলেন। সমাধিভঙ্গ হলে
দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন- ওদের সবাইকে বলবি, বিয়ে করেছে বলে কিছু যায় আসেনা। এ
ব্রহ্মবিদ্যা। এর নাশ নেই। (কত কথা পড়ে মনে)
শ্রীদেবকুমার চৌধুরীর স্মৃতিচারণ – কদমতলায়
তাঁর ঘরের একটা অদ্ভুত আকর্ষণ ছিল। এটা প্রথম দিনেই অনুভব করেছিলাম। তাঁর কাছে
জেতাম অথচ তাঁর সব কথা নিতে পারতাম না। তাঁর কাছে যাবার পর একটা অদ্ভুত কথা শুনলাম
তাঁর মুখে। বাবা! যতক্ষণ বলি, ভগবান দয়াময়, তত ক্ষণ তাঁকে ভোগের বস্তু করে রেখে
দিয়েছি। খুব ভালো লাগল কথাটা। সত্যিই তো ভগবানকে দয়াময় বলার অর্থই হল তাঁর কাছে
দয়া চাওয়া। অর্থাৎ কোনও না কোনও কামনা নিয়ে তাঁর কাছে হাজির হওয়া। বেলা তিনটের
থেকেই মনে হত কখন আপিসের ছুটি হবে, কখন তাঁর কাছে গিয়ে বসব। শনিবার আপিস থেকে সোজা
ছুটতাম তাঁর কাছে। কদমতলায়। সেদিন বেলা দুটো থেকে রাত্রি নটা পর্যন্ত কাটত তাঁর
ঘরে। অথচ তাঁর অনেক কথাই বুঝতাম না তখন, আর মনে রাখার প্রয়োজন ও বোধ করতাম না। এ
শুধু আমার একার নয়, অল্প বিস্তর সকলেই এই আকর্ষণ বোধ করেছেন। এই ভাবে স্থির হয়ে এক
জায়গায় বসে দিনের পর দিন একই কথা শোনা সম্বন্ধে তিনি একদিন বলেছিলেন, এই বিদ্যা
লাভ হলে মানুষটা ধৈর্যশীল হয়। তা নাহলে এমনভাবে দিনের পর দিন একই কথা বলতে পারতুম
না। আর তোদেরও ধৈর্য লাভ হয়েছে। তা নাহলে এমনভাবে তোরাও বসে থাকতে পারতিস না।
কদমতলার ঘরে আমার সমবয়েশী বন্ধুদের অনেককে পেয়েছি। তখন তখন খুব ধ্যান করতে বলতেন।
ঘরের লোকেরাও ধ্যান করতেন। ধ্যান এবং আধ্যাত্মিক অনুভূতি যে সকলেরই হওয়া সম্ভব, এ
আমার ধারণা ছিলনা। তাঁর ঘরে এসব হওয়া খুবই সহজ ছিল। তাঁর ঘরে গেলে ধ্যানের সময়ে
সহজেই ধ্যানের প্রবনতা আসত। বাড়িতে এমন হতনা। একদিন প্রশ্ন করছেন শ্রী ক্ষিতীশ
চন্দ্র রায় চৌধুরী কে- হ্যাঁ ক্ষিতীশ, ধর্ম কি মুখের কথা না কথার কথা? ক্ষিতীশ দা
– আজ্ঞে না, ধর্ম হল মানুষের দেহে অনুভূতি আর ভগবানের প্রকাশ। আমাদের যেমন দর্শন ও
অনুভূতি হচ্ছে। উনি তখন বলছেন- দ্যাখ ক্ষিতীশ, বর্তমান জগতে যদি ধার্মিক লোক থাকে
তো তোরা। ওরে আমি কি বলব। আর তোরা কে কতটুকু বুঝবি? তোদের মত ধার্মিক লোক বর্তমান
জগতে নেই।
এ কথার প্রমাণ পাই শ্রদ্ধেয়
শ্রীক্ষিতীশচন্দ্র রায়চৌধুরীর একটি স্বপ্নে। স্বপ্নটি দেখছেন ১৬/১০/৭৬ তারিখে।
“আমি ও আমার দাদা, দুজনে চলেছি দূরে কোনও এক জায়গায়। কে একজন থাকেন সেখানে, যিনি
সোনা তৈরি করতে জানেন। উদ্দেশ্য তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করা। এসেছি এক পল্লী গ্রামের
পথ ধরে। পথের দুদিকে বেড়া দেওয়া। বৃষ্টির জলে ধুয়ে গাছপালার সবুজ রং বেশ খুলেছে।
মনটা খুবই উৎফুল্ল। বেড়া থেকেই কয়েকটা ডাল ভেঙ্গে হাতে নিয়ে চলেছি। আর কিছু না হোক
এই ডালগুলো কেই সোনা করিয়ে নেব। যিনি সোনা তৈরি করেন তাঁর বাড়ির নাম্বার চল্লিশ।
নম্বর খুঁজতে খুঁজতে চলেছি। অনেক পড়ে বাড়িটা খুঁজে পেলাম । নম্বর সদরে স্পষ্ট করে
লেখা। চালা ঘরের সামনে মাটিতে উঁচু দাওয়ায় একটি বয়স্কা স্ত্রীলোক বসে আছেন। তাঁকে
জিজ্ঞাসা করলাম – যিনি সোনা তৈরি করেন তাঁর কি এই বাড়ি? বললেন – হ্যাঁ, কেন? বললাম
আমরা সোনা তৈরি করাব, তাই। সেই সময়ে ঘরের মধ্যে থেকে আরও কয়েকটি স্ত্রীলোক উঁকি
মেরে দেখতে লাগল এবং আমাদের লক্ষ করে হি হি করে হাসতে লাগল। এমন সময়ে আমার স্ত্রী।
(এতক্ষণ তাঁর উপস্থিতি বিন্দুমাত্র টের পাইনি) তাদের প্রচণ্ড ধমক দিয়ে বললেন –
সোনা তৈরি করাব, এতে হাসির কি আছে? কোথায় তিনি আছেন বলুন। তারা ধমক খেয়ে চুপ করে
ভেতরে ঢুকে গেল। যিনি দাওয়ায় বসেছিলেন তিনি সামনে একটা ক্ষেতের মত জমির দিকে আঙুল
দিয়ে দেখিয়ে বললেন, ওই যে। পিছন ফিরে দেখলাম একটি বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে, হাতে গাছের ছোট
ছোট কয়েকটি ডাল বা চারাগাছই হয়ত, নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখছেন। কাছে গিয়ে দেখি তিনি আর
কেউ নন, শ্রীজীবনকৃষ্ণ স্বয়ং। এখন আর আমার স্ত্রীকে দেখতে পাচ্ছিনা। তাঁর কাছে
গিয়ে আনন্দে উদ্দেশ্য ব্যাক্ত করলাম। বললেন, আচ্ছা, চল চল। এই বলে আমাদের নিয়ে
চললেন তাঁর বাড়িতে। সেই বাড়িতে ওর সঙ্গে এসে দাঁড়াতেই আমার মনে হঠাৎ কি একটা ভাব
এল। অনেকটা আত্ম ধিক্কারের মত। ছি ছিঃ, ওঁর কাছে সোনা চাইতে এলাম? সঙ্গে সঙ্গে ওঁর
পায়ের কাছে সাষ্টাঙ্গ হয়ে পড়লাম। পায়ের ওপর মুখ রেখে পা ধরে অঝোরে কাঁদতে লাগলাম-
আমি সোনা চাইনা, আপনি আমাকে সোনা করে দিন – আমাকে সোনা করে দিন। কিছুক্ষণ পরে যখন
মাথা ওঠালাম তখন দেখি শ্রীজীবনকৃষ্ণ সেখানে নেই। দাদাকে জিজ্ঞেস করলাম – উনি কোথায়
গেলেন? দাদা দেখিয়ে দিলেন একটি শিব লিঙ্গ । তার মাথার চাঁদি টা খোলা। তার ভেতরে
একটা সুড়ঙ্গের মুখের মত দেখা যাচ্ছে । দাদা বললেন উনি ওর মধ্যে ঢূকে গেছেন। তখন
আমার মনে হল , ওহ ঠিক, সহস্রারের মধ্যে প্রবেশ করলেই সোনা হওয়া যায় । আমিও তখন তার
মধ্যে ঢূকে গেলাম ।
ক্ষিতীশ চন্দ্র রায় চৌধুরীর
স্বপ্নটি পড়ে নানা জনের মনে নানা অর্থ জাগবে। নিজের মনে ভাবতে ভাবতে হঠাৎ মনে হল
ওঁর সোনা বানানোর অর্থ বলতে আত্মা সাক্ষাৎকার। দ্বৈতবাদের ধর্ম। গুরুর কাছে
প্রার্থনা। আর সোনা করে দেওয়ার অর্থ অদ্বৈতবাদ। অস্তিত্বের পৃথক কোনও অবস্থান
থাকছেনা। ওঁতে মিলে যাচ্ছে।
এরপর উল্লেখ করি শ্রীযুক্ত রামকৃষ্ণ
ঘোষের স্মৃতিচারণ। ঋতম বদিষ্যামির লেখক। অদ্ভুত অভিনিবেশ সহকারে প্রত্যহ এক জায়গায়
বসে থাকতে থাকতে ওঁর কথা শুনতেন। এ প্রসঙ্গে শ্রী অরুণকান্তি ঘোষের মুখে শোনা কিছু
কথা। রামকৃষ্ণদা জলের কুঁজো যেখানে থাকত তাঁর কাছে জানলার পাশটিতে এসে বসতেন। কোনও
কথা বিশেষ একটা বলতেন না। চুপ করে ওঁর দিকে তাকিয়ে থাকতেন। ওঁর কথা শুনতেন। একদিন
ঘরে কথা হচ্ছে। উনি প্রশ্ন করছেন – কার মুখ হয়েছি বলতো? রামকৃষ্ণদা টুক করে বলে
দিচ্ছেন। শ্রী রঘুনাথ সেন এটি লক্ষ করে জিজ্ঞেস করলেন – আচ্ছা, রামকৃষ্ণদা কি করে
এমন টপ করে বলে দিতে পারেন? শুনে, উনি বললেন – ওরে, ও কেমন চুপটি করে এক জায়গায় বসে
একভাবে শুনে যায় দেখেছিস? এভাবে ওর একটা তেজ জন্মিয়েছে। বেদোজ্জ্বলা বুদ্ধি হয়েছে।
রামকৃষ্ণদা বলছেন – তাঁর কাছে না
গেলে ঠাকুর রামকৃষ্ণদেব যে কি ও কে, তা কোনোদিনই বুঝতাম না। তাঁর কাছ থেকেই শিখলাম
ঠাকুরকে কিভাবে ভালবাসতে হয়। তিনি এমন রসময় করে ঠাকুর সম্বন্ধে বলতেন যে অতি মধুর
লাগত। মনে হত ঠাকুর যেন নিজেই বলছেন। শেষের দিকে যখন একেবারে ওপরের স্টেজে উঠে
আছেন, তখন বলতে আরম্ভ করলেন – দ্যাখ, আমি ভগবান। প্রতি তন্তুতে তন্তুতে, প্রতি
লোমকূপে আমি ভগবান। সত্যিই তাঁর কাছে যারা না গিয়েছে, ওঁর সামনে থেকে কথা না
শুনেছে, তারা ধারণাই করতে পারবেনা কত উচ্চ অবস্থায় থেকে তিনি ঠাকুরের সম্পর্কে
বিভিন্ন মন্তব্য করতেন। তাঁর কথার মাধুর্য প্রতিটি লোমকূপ দিয়ে অনুভব করতাম।
এখানে রামকৃষ্ণদার একটি স্বপ্নের
উল্লেখ করি। “দেখছি আমাদের মধ্যে অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন, তাদের কিছু হয়নি বলে।
এই সময়ে শ্রীজীবনকৃষ্ণ ঘরে এলেন। সকলকে উদ্দেশ করে বললেন – বাবা! তোদের যে কী
হয়েছে তা আর কী বলব! তোরা দিনে অন্তত একবারও ভাববি, আমায় কতভাবে স্বপ্ন দেখেছিস।
তাহলেই হবে”।
ওঁর অবস্থার পরিবর্তনের সময়ে দেখতে পাই
উনি মানুষের সঙ্গ নিতে পারতেন না। অথচ ঘর বন্ধ থাকলে নিত্য সঙ্গ কারীরা ফিরে যাবে।
সঙ্গ থেকে বঞ্চিত হবে, এ ভাবনাও তাঁকে ব্যথিত করত। শ্রদ্ধেয় শ্রী ধীরেন্দ্রনাথ
রায়ের চিঠির অংশ বিশেষঃ
ঠাকুর খাটে বসে বাইবেল অব দা ওয়ার্ল্ড
বইখানা পড়ছিলেন। আমার বিষণ্ণ মুখ দেখে বললেন – তোরা যদি চাস তাহলে কাল থেকেই আবার
পাঠ শুরু কর। আমার আপত্তি নেই। এই দেহটা ফেটে যাবে? তা যাক না! যথেষ্ট বয়স হয়েছে।
এখন গেলেই হয় । খালি গা। তেজঃপুঞ্জ চেহারা। বেশিক্ষণ সহ্য হয়না। তিনি তা বুঝলেন।
পাঞ্জাবীটা গায়ে দিলেন। তেজ ঢাকা পড়ল। আমি তখন বললাম – আপনার দেহ থাকে এটাই চাই।
আমরা এখন আর আসব না। চামুণ্ডাদর্শনের ফলে যে অদ্ভুত তেজ হয়েছে, দেহ তা absorb করে সাম্যে আসার পর আমরা বরং আবার
আসব। তিনি বললেন- সেই ভালো। আসার সময় আবার বললেন – I leave it for you. যখন তোরা আসতে চাইবি, আসবি, পাঠ
করবি। আমার দেহের জন্য ভাবিস না। না আসতে পারলে তোদের কষ্ট হবে। সেকথা ভাবলেও আমার
কষ্ট হয়। আমি আবার বললাম – আমরা এখন আর আসব না। আপনার শরীর দীর্ঘকাল অটুট থাকুক
এটাই চাই।
কেন এমন আকর্ষণ? এ কিন্তু দু পক্ষেই। ওঁর
ও আকর্ষণ ছিল, তাই এমন করে বলছেন। একদিন বলছেন, কালকে ওরা (ঘরে উপবিষ্ট শ্রোতাদের)
যখন সব চলে গেল, তখন অনেকবার মনে হয়েছিল এরা সব কে? এদের মত ভক্তি তো দেখা যায়না।
অপরপক্ষে শ্রী উপেন মুখার্জীর
স্মৃতিচারণে অপার্থিব এই আকর্ষণের উল্লেখ পাই। উপেনবাবু বলছেন – কী আকর্ষণে তাঁর
কাছে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতাম! আমাদের জীবত্ব দিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা কয়েছি
দিনের পর দিন। এমন কতদিন গেছে, যানবাহন বন্ধ, হাঁটতে হাঁটতে ভবানীপুর থেকে কদমতলায় গেছি। আবার হাঁটতে হাঁটতে বাড়ী ফিরেছি
রাত দশটায়। ...এই হাতে ওঁকে প্রণাম করেছিলুম, তাই প্রণামও কাউকে করিনা। এমন একজনকে
জীবনে পেলাম, আর তাঁকে ছেড়ে কাকে স্থান দেব?
ওঁর সংস্পর্শে এসে কার কিরকম পরিবর্তন হয়েছিল
তার একটা উদাহরণ পাই এই আলাপটির মধ্যে দিয়ে।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ সত্যদাকে বললেন – তুই কত বছর
আসছিস?
সত্যদা – তিনবছর হল। সামনের অক্টোবরে তিনবছর
পূর্ণ হবে।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ
– চারবছর আগের কথা ভাব দিকিনি! তখন তুই কি করতিস আর এখন কি করছিস।
সত্যদা
– থিয়েটারের রিহার্সাল দিতুম আর বাজে কাজ করে বেড়াতুম।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ
– সুরেশ মিত্তিরের বাড়িতে ত্রৈলোক্য ঠাকুরকে জিজ্ঞাসা করছেন, মহাশয়ের কাছে যারা
আসছে, তাদের কিছু উন্নতি হচ্ছে কি? এখানে তিনি যদি আসতেন, আমি বলতুম যে, আপনি এদের
পায়ের ধুলো নিন। উদ্ধার হয়ে যাবেন।
কি অদ্ভুত উন্মত্ত আকর্ষণ জন্মাত যে সৌরেন দা
চিঠিতে লিখছেন –
মানুষ ভগবান ভগবান করে, কিন্তু যখন সেই ভগবান
তাঁর সামনে অহোরাত্র থাকে, একসঙ্গে বাস করে তখন সেই মানুষ কি করে তাঁকে ছেড়ে চলে
আসতে পারে ! আর কেউ না জানুক, আমরা তো অন্তত জানি যে উনি কে? তিনি তো আমাদের
প্রত্যেক্ কে দেখিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন। তবে কেন আমরা তাঁর পা ধরে পড়ে থাকিনা?
এমন নানা ঘটনা, অনুভূতি ঋদ্ধ আলাপ আমরা
জানতে পারি দিনলিপিগুলি থেকে। বলাবাহুল্য এসবই প্রকাশ পেয়েছে জগতের মানুষের আত্মিক
কল্যানের জন্য। এ ওঁরই ইচ্ছায় হয়েছে। ঠিক যেমন সৃষ্টি হয়েছে পাঠচক্রের। যে দুটি
পন্থায় ব্রহ্মত্ব ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে ওঁর মনে উথেছিল তাঁর একটি পত্রিকা ও অপরটি
পাঠচক্র। দীর্ঘকাল ধরে কোনও কোনও পাঠচক্রে নিষ্ঠার সঙ্গে পাঠ হয়ে চলেছে। কোনও
কোনটি আবার অজ্ঞাত অঙ্গুলিহেলনে বন্ধ হয়েছে। কিন্তু ওঁর তেজক্রিয়া করে চলেছে। এই
যে বিপুল সংখ্যক মানুষ ব্রহ্মবিদ্যা লাভ করছেন, কোনোরকম মঠ, বিহার, সঙ্ঘ বা ধর্ম
আন্দোলন ছাড়াই সেখানে পত্রিকা ও পাঠচক্রের ভুমিকাই মুখ্য। এখানে উল্লেখ্য যে এই
পাঠচক্রের প্রতিষ্ঠাকাল থেকে যিনি একক নেতৃত্বে এগুলির সৃষ্টি ও পরিচালনায় অগ্রণী
ভুমিকা নিয়েছিলেন তিনি শ্রদ্ধেয় শ্রীসুশীল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। এত বড় গুরু
দায়িত্ব প্রতিদিন নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করা যে কি কী অসীম কৃপায় সম্ভব হয় তা কল্পনায়
ও আনতে পারিনা। তিনি নিজে তাঁকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন ও দিয়ে নিশ্চিন্ত হয়েছিলেন।
কোথায় কখন কবে পাঠ হবে, পাঠক কে, প্রতিটি ব্যপারে সুশীলবাবুর সুচিন্তিত পদক্ষেপ
ছিল। এ বড় কঠিন কাজ ছিল। আজ এসময়ে বসে সে সময়কার সেই সব দুরুহ কাজ সম্পন্ন করা
আমরা ধারণা করতে পারিনা।
এই প্রসঙ্গ অশেষ। অনন্তের থেকে এক গণ্ডূষ
জল পান করে তৃপ্তি লাভ করা। এই অমৃতের স্বাদ জীবন ভরে যেন সকলে পেতে পারি তারই
উপায় করে রেখে গেছেন স্বয়ং আমাদের পরম মিত্রটি। আরও একবার তাঁকে আমার প্রণতি
জানাই।
জয়তু জীবনকৃষ্ণ
(অমৃত
সম্ভার থেকে পুনর্মুদ্রিত)
No comments:
Post a Comment