Sunday, October 11, 2020

ব্রহ্মসূত্র ও শ্রীজীবনকৃষ্ণ

             

ব্রহ্মসূত্র ও শ্রীজীবনকৃষ্ণ

 

পরিণত বয়সে পরিপূর্ণ আত্মিক জীবনে শ্রীজীবনকৃষ্ণ দেখেছিলেন শাস্ত্রবচন, অর্থাৎ বেদান্ত আদি, তাঁর দেহে এবং দেহ অতিক্রম করে জগতে কিভাবে প্রমাণিত হয়ে চলেছে। যদিও উনি এসবের বিন্দুবিসর্গ জানতেননা তবু এই স্বতঃস্ফূর্ত গতি রুদ্ধ হয়নি কখনও। আর তাঁর বুঝবার অপেক্ষায় থেমেও যায়নি কোনোদিন। অদ্ভুতভাবে শাস্ত্রগ্রন্থ আপনা থেকে তাঁর ঘরে এসে পড়েছে। কিছু শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত মানুষ এসেছেন তাঁর ঘরে সেইসব শাস্ত্রের ব্যাখ্যার কারণে। আর উনি অবাক হয়ে শুনেছেন যে কিভাবে লিপিবদ্ধ উপলব্ধির কথা তাঁর মধ্যে রূপ নিয়েছে। তবে তাঁর পূর্ববর্তী কোনও আচার্য এই অবস্থায় পৌঁছননি। কারণ তাহলে এসবের ব্যাখ্যা আগেই পাওয়া যেত। শুধু তাই নয়, মুখের কথা বা পাণ্ডিত্য দিয়ে নয়, ডাহা দেহে বর্তাত। তা হয়নি। সুতরাং আমরা তাঁর মধ্যে দিয়েই আপ্তবাক্যের প্রমাণ গ্রহন করব। উনি ১৯৬৪ সালে ঘাটশিলায় যখন রয়েছেন তখন সেখানে দেখছি ব্রহ্মসুত্র থেকে পাঠ হচ্ছে আর উনি তার ব্যাখ্যা করছেন। তাঁর রেকর্ডেড কণ্ঠস্বরে সেই ব্যাখ্যাই আমরা শুনতে পাই। উপনিষদের বহু শ্লোক তো উনি তুলেই ধরেছেন আমাদের কাছে, আর সেসব বিস্তারিত আলোচনার দাবীও রাখে, যা কিনা সীমিত সময়সীমার মধ্যে শোনানো অসম্ভব, এখানে তাই ব্রহ্মসুত্রের কয়েকটি শ্লোক আলোচনায় রাখছি। উনি বিভিন্ন অন্তরঙ্গজনের কাছে উপনিষদ ও ব্রহ্মসুত্রের একখানি ভাষ্য লিখে যাওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন। ডায়েরি ও চিঠিপত্রে তাঁর বিভিন্ন উক্তির মধ্যে সেকথার উল্লেখ আছে। ভাষ্য ছাড়াও নানা সময়ে তাঁর ব্যাখ্যার মধ্যে অনুভূতির মধ্যে আমরা সেসবের প্রমাণ পাই। ব্রহ্মসুত্রের যে কটি সূত্র উনি নিজে বেছে ব্যাখ্যা দিয়েছেন ও তার সঙ্গে সম্পর্কিত যে কটি, শুধু সেই কটি সূত্র তুলে আনলাম। 

 ব্রহ্মসুত্র সম্পর্কে কটি কথা। ব্রহ্মসুত্র হোল উপনিষদের সার। সূত্রগুলি যেন কোড। একেকটি সূত্রের মধ্যে বেদান্তের বেশ কিছু শ্লোকের সারমর্ম নিহিত আছে। শঙ্করাচার্য ও রামানুজ যথাক্রমে অদ্বৈতবাদ ও বিশিষ্টাদ্বৈতবাদে এর ভাষ্য দিয়ে গেছেন। শ্রীজীবনকৃষ্ণের বলে যাওয়া ব্যাখ্যা এ দুটির সঙ্গে একেবারেই মিল নেই। কারণ নিছক পাণ্ডিত্যের কারণে বিচারাত্মক ব্যাখ্যা তিনি দেননি। 

 

  শ্লোকমালা

 

  অথাতো ব্রহ্মজিজ্ঞাসা  (১/১/১)

       

ব্রহ্মজিজ্ঞাসা – ইহার প্রাথমিক প্রয়োজন। অতঃপর ব্রহ্ম কি জিজ্ঞাসিত রইল। শ্রীজীবনকৃষ্ণ বলছেন পূর্ববর্তী আচার্য সবাই কিছু শর্ত আরোপ করেছেন। যেন সেগুলি পুরন নাহলে ব্রহ্মকে ধরা যাবেনা। অর্থাৎ বিবিদিষা। কিন্তু ব্রহ্ম নিঃশর্ত। সূর্য যেমন স্বয়ংপ্রকাশ ব্রহ্মও তেমন স্বয়ংপ্রকাশ। সূর্যের আলো যেমন খালবিল নদীনালা ডোবা আবার সাগরেও পড়ে তেমনি ব্রহ্মত্বের প্রকাশ কোনও শর্ত ছাড়াই ঘটে। অতএব স্বয়ংপ্রকাশ ব্রহ্মের স্বরূপ জিজ্ঞাসার কোনও কারণই রইলনা। শ্রীজীবনকৃষ্ণ বলছেন ব্রহ্মের একটি মাত্র গুণের উল্লেখ আমরা পাই, তা হল স একঃ। 

কথামৃতে পাঠ হচ্ছে, ঠাকুর বলছেন পরব্রহ্ম, ইনিই নিজের স্বরূপ।

শ্রীজীবনকৃষ্ণ – ঠাকুর কি মিন করছেন বলতে পারিস? প্রতিটি লোক তার নিজের রূপকেই পরমব্রহ্মের স্বরূপ বলে মনে করবে নাকি? নিজ নিজ রূপও যে দেখা যায়না তা নয়। তাকে বলে স্বস্বরূপ দর্শন। কিন্তু এই দর্শনে মানুষের পিপাসা মেটেনা বাবা! সেই স্বামীজির কথা – granted that you attain personal liberation by means of the realization of the advaita, but what matters it to the world? কিন্তু দ্যাখ তোরা আমাকে তোদের দেহের মধ্যে দেখছিস (এই বলে ঘরের সকলের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে বলতে লাগলেন) তুই আমায় দেখিস তুই আমায় দেখিস তুই আমায় দেখিস...তাহলে কী হচ্ছে? আমার এই রূপটাই তোদের তথা জগতের সকল মানুষের স্বরূপ হচ্ছে। আর এই হোল পরমব্রহ্মের স্বরূপ। ৯/০৪/১৯৬০ তারিখে ওঁর মুখের কথা। বলছেন – ঋষি বললেন, অহম ব্রহ্মাস্মি। কিন্তু জগত তাকে ব্রহ্ম বলে গ্রহন করলনা। তাই ব্রহ্মসূত্রে তোরা দেখলি, অথাতো ব্রহ্মজিজ্ঞাসা। অনন্তর ব্রহ্ম যে কী তাই জিজ্ঞাসিত রইল। আমিও বাবা আগে ঋষির ওপর উল্টো চার্জ করতাম এই বলে যে ঋষি বলল বটে অহং ব্রহ্মাস্মি, কিন্তু সেকথার প্রমাণ দিতে পারলনা। আজ এই মুহূর্তে বুঝলাম, সেকথার প্রমাণ ঋষিকে করলে তো হবেনা। জগতের লোক সেকথার প্রমাণ দেবে। তাইতো আমরা দেখছি। আমি ব্রহ্মাস্মি বলিনা। আমি বলি অহমস্মি। আমিই আছি। তাও কখন? যখন জগত আমায় গ্রহন করে বলল তখন। মানুষ ব্রহ্ম, জগত একথা আজ গ্রহন করল। তখন জগতের মানুষই বলল আমি ব্রহ্ম। অর্থাৎ মানুষ ব্রহ্ম। ঋষি মানুষ – মানুষ হয়েও তিনি যখন বললেন – অহম ব্রহ্মাস্মি – তখন তাঁকে মানুষ গ্রহন করুক বা না করুক – মানুষ ব্রহ্ম অন্তত এটুকু জানা গেল – বিচারাত্মক। তাই পণ্ডিতেরা সুযোগ পেয়ে ফলাও কারবার করে গেলেন – ব্রহ্ম এই, ব্রহ্ম সেই, ব্রহ্ম অবাঙমানসোগোচরম। কেউ বলে দ্বৈতম কেউ বলে অদ্বৈতম, কেউ বা বলে দ্বৈতাদ্বৈতবিবর্জিতম। এসব বলার অর্থ যথার্থ বস্তুটি তো তারা পায়নি! সেই রবীন্দ্রনাথের ভাষায় – সেই মানুষকেই মানুষ নানা নামে পুজো করে এসেছে। কেন করেছে? যথার্থ বস্তু পায়নি বলেই করেছে। আর এখানে কী হোল? নরনারী শিশুবৃদ্ধ, আপামর সাধারণ আমায় তাদের অন্তরে দেখেঅদ্বৈতএবংবিশিষ্টাদ্বৈত’ both at the same time , reconciliation করল। 

                যদিও নিজেদের জীবনে এই বাণীর সত্যতা আমরা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করি, তবুও তিনি এখনও অধরা। পরম বিস্ময়। যতই অন্তরে তিনি ফুটে উঠুননা কেন, তাঁকে সম্পূর্ণরূপে সম্যক ধারণা করা অসম্ভব। ঠাকুর নিজেকে বলতেন অচিনে গাছ। শ্রীজীবনকৃষ্ণ বলতেন মাথার অসংখ্য সেল খোলার অপেক্ষায়। নিজের দর্শন অনুভূতি সম্বন্ধে বলতেন এরও পর আছে। তোরা ধরতে পারবিনা তাই বলিনা। কিম্বা বলতেন, সপ্তম ভুমির কথা বেদে আছে। এরও পর যে কত ভূমি আছে আমাকে তা দেখিয়েছে। কিন্তু এরপর তোদের ধারণা হবেনা। অতএব আমাদেরও অতঃপর জীবনকৃষ্ণ যে কি জিজ্ঞাসিত রইল। 

 আরও কটি ওঁর মুখের কথা এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য।  

শ্রীজীবনকৃষ্ণ – দ্যাখ কোন অতীতযুগে ঋষি বলেছিলেন আত্মা অরে দ্রষ্টব্যঃ। অর্থাৎ আত্মাসাক্ষাৎকারের কথা। তারপর মাঝে কত হাজার হাজার বছর কেটে গেছে। আমরা এসে ঠাকুরকে দেখতে পাচ্ছি। তিনি বলছেন –মাইরি বলছি, ভগবানকে দেখেছিundoubtedly most wonderful assertionকিন্তু কী হয়েছে জানিস? এটা incompleteআমি ভগবানকে দেখেছি, না – আমি ভগবান হয়েছিভগবান যে হয়েছি সেকথা শুধু মুখে বললে তো হবেনা। মুখে বললে হবেনা তার প্রমাণ? আরে ওইতো রে ঋষি বললেন অহং ব্রহ্মাস্মি! ঋষি বললেন বটেআমি ব্রহ্মকিন্তু তিনি প্রমাণ রেখে যেতে পারেননি বলেই ব্রহ্মসূত্রের প্রথম কথাই হোল অথাতো ব্রহ্মজিজ্ঞাসা। ব্রহ্ম যে কি জিজ্ঞাসিত রইল। বেদে এই প্রমানের কথা পাই- 

      এবমেষ সম্প্রসাদঃ অস্মাৎ শরীরাৎ সমুত্থায় পরমজ্যোতিঃ উপসম্পদ্য, স্বেন রূপেন অভিনিস্পদ্যতে। সঃ উত্তমপুরুষঃ। ছান্দোগ্য ৮/১২/৩

 একথার প্রমাণ আজ তোদের কাছে, তোদের অনুভূতির মধ্যে। কিন্তু আমি কিছু জানিনা বাবা। যতক্ষণ তোরা এসে না বলছিস। তোরা আমায় প্রমাণ দিলি – তোরা আর আমি এক। হ্যাঁ বাবা। মানুষই ভগবানে পরিবর্তিত হয়। তার প্রমাণও দেয় মানুষ। ভগবান বলে আর কোনওখানে কিছু নেই। সে এই জ্যান্ত মানুষ। (১০/০১/১৯৬১)

শ্রীজীবনকৃষ্ণ – আজ সকালে ঘুম ভাঙল এই বলতে বলতে, অহং ব্রহ্মাস্মি। ঠিক এই কথা বলছি, তারপরে নিজেই বলছি – কে একথা বলছে? এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গেই চোখ পরিষ্কার হয়ে ঘুম ভাঙল। আর ভাঙার পর ভাবলাম – ও! ঋষি একথা তো বলে গেছে! তা ব্রহ্ম কী তা বলেননি, তাই আমাকে দেখাচ্ছে। অতীতে অথাতো ব্রহ্মজিজ্ঞাসা রয়েই গেছে, ফোটেনি। একমাত্র এইখানেই ফুটেছে।  

  

২ জন্মাদ্যস্য যতঃ (১/১/২)

 

এটি ব্রহ্মসূত্রের দ্বিতীয় শ্লোক। অর্থ – জগতের সৃষ্টি স্থিতি লয় জাহা হইতে, তিনিই ব্রহ্ম। শ্রীজীবনকৃষ্ণ এ সূত্রের অর্থ বলেছেন জন্মসিদ্ধ। জন্মাৎ অস্য যতঃ। জন্ম হইতেই যিনি সিদ্ধ। তিনি তাঁর পূর্বের একটি অনুভূতির প্রসঙ্গে বলেছেন – আমায় বলেছিল, আমি জন্মসন্ন্যাসী। জন্ম থেকেই এইরকম। সন্ন্যাসী – ন্যাসী – ন্যাসী – জগদগুরু। (নভেম্বর ১৯৫৮ সাল)                                

শ্রীজীবনকৃষ্ণ – কারো কারো সাধনের আগে ঈশ্বরলাভ হয়। ঈশ্বরলাভ মানে ঈশ্বর হওয়া। আমায় লোকে দেখছে আমার সাত বছর বয়স থেকে। আর বারোবছর চারমাস বয়স থেকে আমার দেহেতে সাধন হয়েছে। আর সেও আপনা হতে। আমি কিছু করিনি বাবা। এর দ্বারা ব্যাস্তিতে প্রমাণ হয় আমি জন্মাদস্য। চব্বিশ বছর আটমাস বয়সে যখন আমার আত্মাসাক্ষাৎকার হোল তারপর থেকে লোকে আমায় দেখলে সেটা জন্মাদস্যের প্রমাণ হতনা। দেহ আত্মা পৃথক নিয়েই আমি জন্মেছি।, তাই আমায় শিশুকাল হতেই লোকে দেখছে।                          পাঠ – শ্রীমতীর অবস্থা সখীগণ বলছেন – তাহে কূলবধূ বালা।                        শ্রীজীবনকৃষ্ণ – আজ ৬০০ বছর চণ্ডীদাসের এই গান মানুষ গেয়ে যাচ্ছে, - কেউ বললনা এইকুলবধূ বালাভাগবতী তনু। কেন রে? ধীরেন রায় – চণ্ডীদাস, যিনি নিজে এই গান গাইলেন, তিনি নিজেই যখন বললেন না, তখন অপরকে কেন আর ধরেন? শ্রীজীবনকৃষ্ণ – তা বলতে পারিসনা তুই। তাহলে আমি কিকরে ধরছি রে? তা নয়। এর অর্থ – এ পর্যন্ত কেউ জন্মাদস্য হয়নি। ধীরেন রায় – দেখা যাচ্ছে সবাইকে কিছু না কিছু সাধন করতে হয়েছে। তাঁরা জন্মাদস্য হবেন কী করে? শ্রীজীবনকৃষ্ণ – তুই বুঝতে পেরেছিস? হ্যাঁ তাই। (১১/০৮/১৯৬৪) শ্রীজীবনকৃষ্ণ – আমি যখন কাশ্মীরি শৈববাদ পড়ি, তাতে একটা কথা পাই। তারা বলছে – স্বচ্ছন্দদর্শন বলে একটা দর্শন আছে। তার থেকেই তারা নিয়েছে। কিন্তু স্বচ্ছন্দদর্শন কি? তা তারা বলতে পারেনি। আমি যাই একথা পড়েছি, তদ্দণ্ডেই বুঝতে পেরেছি কী জিনিস। ওরা ক্রমমুক্তির কথাও বলেছে। ক্রমমুক্তি কি জানিস? এই প্রাণময় কোষে জল দেখলাম – ও একরকম মুক্তি। তারপর চতুর্থ ভূমিতে জ্যোতি দেখলাম। ক্রমমুক্তি। আর স্বচ্ছন্দদর্শনে সদ্যোমুক্তি। স্বচ্ছন্দদর্শন – spontaneous revelationএই দ্যাখ না, আমাকে কী করে দেখলি? আপনা হতে তোদের হলো নয় কী? আমাকে দেখা – এই হলো স্বচ্ছন্দদর্শন।

শ্রীজীবনকৃষ্ণ ঠাকুরের কথা তুলে বহুবার বলেছেন, নিত্যসিদ্ধের সাধন করতে হয়না। তাঁকেও কখনও সাধন করতে হয়নি। তিনি বলেছেন – ঠাকুর বলতেন, আমি কারুকে মন্ত্র দিইনা। তার অর্থ ঠাকুর মন্ত্র জানতেন। কিন্তু আমি তো মন্ত্রই জানিনা। বলতেন- এত যে প্রিয় ঠাকুর – তাঁর পায়ে কখনও একটা ফুল পর্যন্ত দিইনি। জীবনে কখনও পূজা জপতপ করেছেন বলে যানা নেই। বলতেন সাধন করে ঈশ্বরলাভ হয়না বাবা। ঈশ্বর যদি কৃপা করে দেহ থেকে মুক্ত হন তবে মুক্তি। এ প্রসঙ্গে উপনিষদের শ্লোকটি আবৃত্তি করতেন বারবার। নায়মাত্মা বলহীনেন লভ্য, ন মেধয়া, ন বহুনা শ্রুতেন, যমেবৈষ বৃনুতে তেন লভ্য। স্তষ্যৈস আত্মা বিবৃনুতে তনূ স্বাম। অর্থাৎ শাস্ত্রপাঠ, আরাধনা বা সাধনায় আত্মাসাক্ষাৎকার হয়না। আত্মা যাকে বরণ করে তাঁরই হয়। আত্মার এই বরণ করাকে তিনি বলছেন বিদ্বৎ বা আপনা থেকে হওয়া। তাঁর সমস্ত জীবন পর্যালোচনা করলে এই আপনা থেকে হওয়ার লক্ষণটিই পরিস্ফুট হয়। তিনি নিত্যসিদ্ধ, তাই তাঁকে সাধন করতে হয়নি। জন্মাবধি দেহের গথন এইরূপ যে তাতে বিশ্বব্যাপিত্ব আপনা হতে প্রকাশ পেয়েছে। কানু অনুগত তনূ। তিনি বলতেন নিত্যসিদ্ধ ভগবানের বিশেষণ। নিত্যসিদ্ধ বা জন্মসিদ্ধ এক। জন্মসিদ্ধ কথাটির বেদে কোনও উল্লেখ নেই। ব্রহ্মওসুত্রে আমরা এই কথাটি পাই। জন্ম থেকেই তাঁর এমন দৈব যে যখন যা হবার সময়ানুসারে ষোল আনা আপনি হয়েছে। তিনি ভগবান হয়েছেন। বিশ্বকে নিজের মধ্যে পেয়েছেন। এর আগে এরকম প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এই প্রথম জগতে জন্মসিদ্ধের প্রমাণ পাওয়া গেল।       

 

  ভূমা সম্প্রসাদাৎ অধি উপদেশাৎ ।।১।৩।৮।।

 

[সম্প্রসাদ-অতিক্রান্ত অবস্থায় ভূমা ব্রহ্ম। শ্রুতিতে এইরূপ উল্লেখ আছে।]

 

        সম্প্রসাদ কথাটির উল্লেখ আছে ছান্দোগ্যের যে শ্লোকে, সেখানে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে, একজন মানুষ, যিনি সম্প্রসাদ হবেন, তিনি পরমজ্যোতিতে পরিবর্তিত হবেন ও তারপর তাঁর চিন্ময়রূপ ফুটে উঠবে অসংখ্য মানুষের মধ্যে। 

        “এবমেষ সম্প্রসাদ অস্মাৎ শরীরাৎ সমুত্থায় পরমজ্যোতিঃ উপসম্পদ্য, স্বেন রূপেণ অভিনিষ্পদ্যতে 

        এখানে সম্প্রসাদ অর্থ-যিনি প্রসাদ বা কৃপা পেয়েছেন। অর্থাৎ আত্মা যাঁকে কৃপা করেছেন বা বরণ করেছেন, তিনি পরম জ্যোতিতে পরিবর্তিত হন। অর্থাৎ আত্মার সাক্ষাৎকার ঘটছে। এই অবস্থার পরবর্তী অবস্থাকে সম্প্রসাদ-অতিক্রান্ত অবস্থা বলা হয়েছে। স্বেন রূপেণ অভিনিষ্পদ্যতে। ব্যষ্টিতে আত্মা সাক্ষাৎকারকেই চরম বলে ধরা হয়েছে। পরবর্তী অবস্থা হল সমষ্টি। যেখানে এই সম্প্রসাদের চিন্ময় রূপ অসংখ্য মানুষের দেহে ফুটে উঠেছে। অসংখ্য মানুষ বা এই মনুষ্যজাতিই ভূমা। এই ভূমার মধ্যে যিনি ফুটে উঠছেন তিনি ভূমাকে নিজের মধ্যে পাচ্ছেন ও ভূমা তাঁতে পরিবর্তন হচ্ছে। তিনি ব্রহ্মত্বে উপনীত আবার তিনি মনুষ্যজাতিকে ব্রহ্মত্ব দান করছেন। ভূমাই ব্রহ্ম হচ্ছে। এ অবস্থাটি জগদ্ব্যাপী না হলে আসে না। তাই সম্প্রসাদ-অতিক্রান্ত অবস্থা।

 এ প্রসঙ্গে জগৎকে ব্রহ্মত্ব দান করা ও জগৎ ব্রহ্মে পরিবর্তিত হচ্ছে--এ সম্বন্ধে তাঁর কথা উল্লেখ করা যেতে পারে।

 ভূমৈব সুখম - এ কথায় তিনি বলছেন বহুত্বে একত্বই প্রকৃত জ্ঞান। শ্রীজীবনকৃষ্ণ - ঈশ্বরের স্বরূপ কী? যদি কেউ ঈশ্বরত্ব প্রাপ্ত হয়, তাহলে জগতের মানুষের দেহে তাঁর রূপ ফুটে উঠে সব মানুষকে তাঁর স্বরূপে পরিবর্তিত করে এক করে। তা, সে স্বরূপত্ব তো মরে গিয়ে তো নয় বাবা। আমাদের দেখাচ্ছে কী? এই জীবদ্দশাতেই ঈশ্বরের স্বরূপ পাচ্ছে। ওরে আমি তো একটা জ্যান্ত মানুষ। আমার রূপ তোদের মধ্যে ফুটে উঠছে - তোরা ঈশ্বরতত্ত্ব প্রাপ্ত হচ্ছিস। সে তোদের জীবদ্দশাতেই হচ্ছে। মরে গিয়ে নয়।

 যদি তোমারক্ষর’ - জীব, ‘অক্ষরবা পরমাত্মায় পরিবর্তিত হয়ে থাকে, তাহলে তুমি লক্ষ লক্ষ মানুষকে একত্ব বিতরণ করবে। সেহেতু এই শুদ্ধ অবস্থা লাভের পরে তোমার সঙ্গে একত্ব স্থাপনের কথা ঘোষণা করবে। প্রকৃতির স্বভাবগত নিয়মে নির্বাচিত মানুষ ব্রহ্ম হন (সম্প্রসাদ - নির্বাচিত মানুষ) এবং তিনি নিজের সঙ্গে অন্যান্য মানুষকেএককরে তাদের ব্রহ্মে পরিবর্তিত করেন। এছাড়া ব্রহ্মে পরিণত হওয়ার অন্য কোনো উপায় নেই। 

বিশ্বব্যাপিত্বে বা বেদমতে প্রতিটি মানুষই ব্রহ্ম বাএকযেহেতু ব্রহ্মএক 

  

৩১/৫/১৯৬২ সকাল সাতটা। 

শ্রীজীবনকৃষ্ণের ট্রান্সের দর্শন হল - কে যেন হাতে একটা বড় পেঁপে দিয়ে গেল, পেঁপেটা খুব বড়। আবার বেলা বারোটায় স্বপ্ন দেখছেন - কে যেন একটা বড় আম দিয়ে গেল, আর জোর করেই দিলো। এবার এর মানে কী তোরা বলতে পারিস? আমের একটা বীচি… । আম হচ্ছে ইন্ডিভিজুয়ালিজম। তোরা সকলেই আমাকে দেখেছিস - তোদের ব্রহ্মানন্দ। একটা ইন্ডিভিজুয়ালিজম, আর একটা ইউনিভারসালিজম। শঙ্করের অদ্বৈতবাদ যে ভুল এইটাই আমাকে দেখাচ্ছে প্রতীক দেখিয়ে। 

৩রা জুন স্বপ্ন দেখছেন ভূমানন্দ স্বামীকে। বলছেন, যখন আমি ও বাড়িতে, অর্থাৎ লক্ষণ দাস লেনে থাকি, তখন সে আমার কাছে আসত। … যাই হোক আমি ভূমানন্দকে দেখলুম, আর তার কি সুন্দর চেহারা হয়েছে, বীমিং উইথ হেলথ এন্ড হ্যাপিনেস - কী সুন্দর চেহারা হয়েছে। আমার ঘরটায় যেন জিনিস থই থই করছে। এমনকি আমার খাটের ওপরও জিনিস রয়েছে। আমি ভূমানন্দকে কোথায় বসাই, কোথায় বসাই ঠিক করতে পারছিনা। আমি ভূমানন্দকে দেখে তার হাতটা ধরে যেন তাকে নিয়ে আসছি, আর এই অবস্থায় আমার স্বপ্ন ভেঙে গেল। তার হাত ধরা অবস্থায় আমার স্বপ্ন ভেঙে গেল। তাকে বসতে দিলে তো ছাড়াছাড়ি হত রে। আমি যদি তাকে বসাতুম, তাহলে আলাদা হয়ে যেত, এক হতো না। তাই তার হাত ধরে রইলুম আর আমার ভেঙে ঘুম ভেঙে গেল। আচ্ছা, এই ভূমানন্দকে দেখিয়ে আমাকে কী বোঝালো বল দিকিনি? ওই পেঁপের প্রতীক দেখিয়ে কী বোঝাতে চাইছে? প্রথমে আমি বুঝতে পারিনি। অত বড় পেঁপে। এর মানে কী? কিন্তু দ্যাখ কী আশ্চর্য! আমায় দেখিয়ে দিলো ভূমানন্দ কী। ওই যে আমি এখন আমার ভেতর তোদের দেখি, অর্থাৎ জগতের সব মানুষ এখন আমার ভেতর, এইই ভূমানন্দ। এইটেই আমায় বুঝিয়েছিল। হ্যাঁ, ওই যে আমায় পেঁপে দেখালে, এইটে ভূমানন্দ, আর ওই যে আম এটা হচ্ছে ব্রহ্মানন্দ।      

 

৪ কল্পনোদেশাচ্চ মধ্বাদিবদবিরোধ ।। ১। ৪। ১০।। 

(কল্পনা উপদেশাৎ চ মধ্বাদিবৎ অবিরোধ)

        অর্থঃ মধুবিদ্যার ক্ষেত্রে যেমন সূর্যকে মধু কল্পনা করা হয়েছে সেই রূপ উপমা দ্বারা উপদেশেও কোনও অসঙ্গতি হয় না।                                                                                        

ছান্দোগ্য উপনিষদে সূর্যকে মধু দ্বারা উল্লেখ করা হয়েছে। ব্রহ্মবিদ্যাকে মধুবিদ্যা বলা হয়েছে। ব্রহ্মসূত্র বা বেদান্তসূত্র ছান্দোগ্যের এই মধুবিদ্যাকে লক্ষ করে এই সূত্রের উল্লেখ করেছেন। মধু সূর্যের রূপক। এটি যথাযথভাবে প্রযুক্ত।                          শ্রীজীবনকৃষ্ণ – বিশ বাইশ বছর আগে একটি স্বপ্ন দেখেছিলাম (চৈতন্য সাক্ষাৎকারের পরে)। স্বপ্নটা এই। এই যে আমার বিছানা--সাদা ধবধবে চাদর পাতা। তার ওপরে চার পাঁচ ফোঁটা মধু পড়ে গেল। বিছানাটা নষ্ট হবে তাই হাত দিয়ে মুছে ফেলতে গেলুম, কিন্তু মুছতে গিয়ে বেড়ে বেড়ে যেন সারা বিছানাটা মধুতে আপ্লুত হয়ে গেল। জেগে উঠে ব্যাখ্যা করলুম--হ্যাঁ, মধুর রং লালচে। চৈতন্য সাক্ষাৎকারের সময় যে দীপকের লাল আলো দেখেছি—অনেকটা তারই মতো। তাহলে মধু চৈতন্যের প্রতীক আর মধু দেখা চৈতন্য সাক্ষাৎকারের দ্বিতীয় স্তরের অনুভূতি হবে।          তারপর নগেন বাবু স্বপ্নে দেখলেন—বাজারে সরু নল দিয়ে মধু বিতরণ হচ্ছে। আমি সেখানে দাঁড়িয়ে। অর্থ করেছি—চৈতন্যের দ্বিতীয় স্তরের অনুভূতি।                      

আবার বছর তিনেক আগে সত্য এসে বলল—স্বপ্ন দেখলুম—আপনার মাথাটা জুড়ে একটা মৌচাক তাতে মৌমাছিরা এসে বসছে। বললুম—তা হবে। ঠাকুরের কথা আছে, ফুল ফুটলে মধুকর আপনি এসে সেখানে বসে। 

আর কয়েকদিন আগে পাড়ার একটি ছেলে এসে বলল ভয়ে ভয়ে -  কি একটা স্বপ্ন দেখুলুম। আপনার সারা দেহটা একটা মৌচাক হয়ে গেছে, আর সাদা ধবধব করছে। (শুক্লযজুর্বেদীয় বৃহদারণ্যক)। ভয় হলো, বসন্ত নয়তো। 

সত্য আর ওই ছোকরার স্বপ্নের আগে - অভয় থেকে আরম্ভ করে ১৪ জনকে স্বপ্নে দেখিয়েছে সূর্যমণ্ডলের ভেতর আমি রয়েছি।

 দু-তিন দিন আগে ব্রহ্মসূত্রে (ইংলিশ ট্রান্সলেসান) খুলে এক জায়গায় পেলুম, “দ্য সান ইনডিড ইজ দ্য হানি অ্যাজ ইন মধুবিদ্যা” - ব্রহ্মসূত্র ১/৪/১০ (স্বামী বিবেকানন্দ কৃত)। 

ভাবলুম, হ্যাঁ, সূর্য জ্ঞানের প্রতীক। জ্ঞানের অপর পরিভাষা চৈতন্য। তাই মধু বলছে, দ্বিতীয় স্তরের অনুভূতি। কিন্তু সেই সঙ্গে মনে হল - এ একটা কি বলছে - মধুবিদ্যা। 

আমার পণ্ডিতমশাইকে (শ্রীধীরেন্দ্রনাথ রায়) জিজ্ঞেস করলুম। সে বললে, হ্যাঁ, ছান্দোগ্যে মধুবিদ্যার কথা আছে। নিয়ে আসব। ও আবার ঋগ্বেদের মধুমতী সুক্ত থেকে পড়ে শোনালো -মধু বাতা ঋতায়তে, মধু ক্ষরন্তি সিন্ধবঃ ইত্যাদি। কী একটা ব্যাখ্যা করল ঠিক বুঝতে পারলুম না। পরের দিন সকালে ফের একবার পড়লুম। পড়েই বুঝতে পারলুম, ওঃ ওই মধুবিদ্যার এফেক্ট বলে গেছে। কবে কোন যুগে কার হয়েছিল - শ্রুতিতে চলে আসছে। সে বাইরে মধুমতী দেখছে। ভিতরের কথা বলতে পারছেনা। চোখে ন্যাবা না লাগলে তো আর বাইরে চারিদিকে ন্যাবা দেখা যায়না। 

ছান্দোগ্য এলো। মধুবিদ্যার একটা চ্যাপ্টারে একটা শ্লোকের ব্যাখ্যায় দেখলুম, “সাধ্যগণের সহিত এক হইয়া প্রণবকে অগ্রণী করিয়া এই অমৃতকে উপভোগ করিয়া তৃপ্ত হনবুঝলুম সংস্কৃতমুখেনকথার অর্থ করেছেপ্রণবআরএক হইয়াকথাটির অর্থ করেছে চিন্তায় এক হয়ে।এক হইয়ামানে যে আত্মিক এক্ত্ব লাভ করেওয়ান অ্যান্ড ওয়াননেস”, এই তোদের আমাকে অন্তরে দেখা, সে ভদ্রলোক জানবে কি করে? না হলে তো আর জানবার বা বোঝবার যো নেই! আরপ্রণবকে অগ্রণী করিয়া”, সর্বক্ষণ অনুশীলনের দ্বারা - এখানে যা দিনের পর দিন চলেছে আজ বিষ একুশ বছর ধরে। 

স্বপ্নে ওই যে অনেকক্ষণ ধরে হাত দিয়ে মধু মুছতে লাগলুম - ওর অর্থ হল অনুশীলন এবং জগদব্যাপিত্ব। (ওই বড় চাদরটা হলো জগত, অর্থাৎ আমার চৈতন্যের দ্বারায় জগত আপ্লুত হচ্ছে - তথা আমার বিশ্বব্যাপিত্ব)

 তারপর ধীরেন নিয়ে এলো ছান্দোগ্যের শঙ্কর ভাষ্যের আনন্দগিরির টীকা। তাতে দেখলুম একটা মেটাফর রয়েছে - মধুপিষ্ট। বলছে প্রথমে দ্যৌ বা দ্যুলোক। তার নিম্নে অন্তরীক্ষ - অন্তরীক্ষ যেন মধুচক্র - অপুপঃ। তার নিম্নে সূর্যকিরণ সমূহ -  মধু। 

ছান্দোগ্য ব্যাখ্যা করেছে ম্যাক্রোকজমে। আমি ব্যাখ্যা করে নিলুম দেহতত্ত্বে, মাইক্রোকজমে।

দ্যুলোক অর্থাৎ নির্গুণ - তুরীয় - তার নিম্নে অন্তরীক্ষ - মধুপিষ্ট। অর্থাৎ আমিই অন্তরীক্ষ (শূন্য)। আমি - নেই। অর্থাৎ আমারক্ষুদ্র আমিনেই। বিশ্বব্যাপীআমিইউনিভার্সাল সেলফ। অন্তরীক্ষে - সূর্য। আমার প্রাণশক্তির বিশ্বব্যাপী প্রতীক।

সূর্যমণ্ডলস্থ পুরুষ। আমারই প্রাণশক্তির সারীভূত রূপ। পরমাত্মা, পরমব্রহ্ম, পরমেশ্বর। ১৪ জন নরনারী সূর্যমন্ডলে আমার সুবর্ণময় রূপ দেখেছে। সূর্যমন্ডলস্থ সুবর্ণময় পুরুষের কথা ছান্দোগ্যে উল্লেখ আছে।

সূর্যের কিরণে যেমন জগত প্লাবিত হয়, তেমনি আমার প্রাণশক্তি জগতকে প্লাবিত করছে।

জগত কোথায়? আমার ভেতরে -রাআমার প্রাণসূর্যের কিরণ ছড়িয়ে পড়েছে সেই ভেতরের জগতে। আবার ভিতরের জগত্ বাইরের জগত এক।

 

৫ জ্যোতির্দর্শনাৎ ।।১। ৩ । ৪০।।

 

 ভগবান দর্শনের কথায় শ্রীজীবনকৃষ্ণ বলছেন--একেবারে সীন ওপেন করছে। ঠাকুর আঙ্গুল বাড়িয়ে আমায় দেখাচ্ছেন - এই ভগবান, এই ভগবান দর্শন। আর আমি সেই আত্মার ভেতর থেকেই দেখছি। আমি কী দেখছি জানিস? জ্যোতিঃপুঞ্জ, তার ভেতর সূক্ষ্ম ব্লু লাইন দিয়ে ডিমারকেশন করা, একটা বুড়ো আঙ্গুলের মত জায়গা। তার ভেতর দেখছি একটা বিন্দু, আর সেই বিন্দুকে কেন্দ্র করে এটম টাইপ কতগুলো বিন্দু ঘুরছে। এরপর সেই জ্যোতিটা পেছনদিকে ঘুরে গেল। ঠিক ধূমকেতুর লেজের মত হয়ে।

এই জ্যোতিঃপুঞ্জই ভগবান। পরমজ্যোতি। অনুভূতিতে শ্রীজীবনকৃষ্ণের যে রূপটি অন্তরে ফুটে ওঠে সেটি চিন্ময় বা জ্যোতির্ময়। অসংখ্য মানুষের অনুভূতিতে জ্যোতির্ময় মূর্তি, জ্যোতির সাগর ইত্যাদি ফুটে উঠেছে। এই জ্যোতিই ভগবান বা ব্রহ্ম।

শ্রীরামকৃষ্ণ--কালী মানলেই ব্রহ্ম মানতে হয়।

শ্রীজীবনকৃষ্ণ--ঠাকুর এই ব্রহ্ম বলে কাকে মিন করছেন বলতে পারিস? বল না কেউ।

ভোলা--লাইফ পাওয়ার।

শ্রীজীবনকৃষ্ণ--না, ও হলো না। লাইফ পাওয়ার তো কুণ্ডলিনী। কুণ্ডলিনী আর দেহ ওতপ্রোত। আরে এ ব্রহ্ম হচ্ছে জ্যোতি রে জ্যোতি। ওই তো রে গানে আছে না? ‘কেহ কেহ কয় ব্রহ্ম জ্যোতির্ময়, সেও তুমি নগতনয়া জননী।

(অমৃত জীবন ১৪/১২/১৯৬০)

 শ্রীজীবনকৃষ্ণ বলছেন, পরমজ্যোতিতে পরিবর্তিত হওয়া হলো ব্যষ্টির ভগবান দর্শন। কিন্তু সমষ্টিতে জ্যোতিরূপে নয়, একটি মানুষের রূপে ব্রহ্ম প্রকাশিত হবেন।

শ্রীজীবনকৃষ্ণ--শোন, ব্যষ্টির ভগবান - ইন দ্য শেপ অফ আ লাইট - তার প্রমাণ দেওয়া যাবে না। এটা সংস্কারজ। সমষ্টির ভগবান - ইন দ্য শেপ অফ আ লিভিং পারসন। সোল কটা? একটা। আর সে ইউনিভার্সাল হলে - দ্যাট সোল, দেহ সমেত মানুষটা আত্মা হল - ইজ সিন ইন দ্য শেপ অফ আ লিভিং পারসন। যা তোরা দেখছিস। 

(অমৃত জীবন ২০/১০/১৯৬০)

 

 সুত্রটি নতুন করে লিখতে হলে, লিখতে হবে, উত্তমপুরুষো দর্শনাৎ। সেই এক পুরুষের রূপই ব্রহ্মের স্বরূপ। সেই উত্তমপুরুষ শ্রীজীবনকৃষ্ণ। 

 

          ৬ আত্মকৃতেঃ পরিণামাৎ ।।১ । ৪ । ২৬।।

তৈত্তিরীয় উপনিষদে উল্লিখিত শ্লোকটিসোহকাময়ত - বহুস্যাং প্রজায়েয়েতি২/৬

অর্থঃ তিনি কামনা করিলেন আমি বহু হইব, আমি উৎপন্ন হইব।

শ্রীজীবনকৃষ্ণ--এই তো উপনিষদকার তৈত্তিরীয় উপনিষদে এই কথা বলছে। কিন্তু আমার জীবনে এই যে তোরা আমার বহুত্বের সাক্ষী দিচ্ছিস, আমাকে অন্তরে দেখিস, সে কি আমি কামনা করেছিলুম? কী করে করব? জানিনা যে এরকম হতে পারে। তাতে কামনা কথা থেকে আসবে? তারপর তোরা দেখলি, তোরা বললি, তখন আমি বুঝলুম, ওরে! এইই তো একোহহম বহুস্যাম! একা আমি বহু হচ্ছি। আরে এই কথাই তো স্বামীজি বলছেন -- একা আমি হই বহু হেরিতে আপন রূপ। তাহলে এই তৈত্তিরীয় ওরকম বলছে কেন, যে, তিনি কামনা করলেন, যে তিনি বহু হবেন? কোথায় গোলমাল হচ্ছে? ওরা ব্রহ্মকে বাইরে দেখছে, ম্যাক্রোকজমে ধরছে। আমরা মাইক্রোকজমে অর্থাৎ দেহতত্ত্বে, অর্থাৎ বাস্তবে আমাদের জীবনে যা হয়েছে সেই কথা বলছি। 

(শ্রীজীবনকৃষ্ণের অমৃতবাণী, যা ঘাটশিলায় রেকর্ডেড হয়েছিল, তার অংশবিশেষ)

 

শ্রীজীবনকৃষ্ণ--জগত যে আমার ভিতর তার প্রমাণ? আমি জন্মাবার সাথে সাথে জগতকে বিক্ষেপ করছি। তার প্রমাণ ব্যষ্টিতে আমি পেলাম আমার বয়স যখন ২৪ বয়স ৮ মাস। যখন আমার ভগবান দর্শন হল। তারপর যখন সেই আত্মার মধ্যে বিশ্বরূপ দেখলাম, তখন বুঝলাম - জগত আমার ভিতর। কিন্তু জগতের লোক সেকথা বিশ্বাস করে নেবে - এইমাত্র। কিন্তু জগতের তার প্রমাণ জগতকে কেউ দিতে পারেনি।  (অমৃত জীবন)

 

শ্রীজীবনকৃষ্ণ--আজ ভোরে ঘুম ভাঙার আগে আমি এই বাণীটি শুনলাম -অহম ব্রহ্মাস্মিআমার মাথার মধ্যে আমিই যেন এ কথা বললাম। ঘুম ভেঙে উঠে ভাবছি - এ কথা জগতে প্রথম কে বলেছিল? ঋষি। তারপর স্বামীজির ওয়ার্কস খানা খুলে দেখি - এক জায়গায় স্বামীজি লিখছেন - ইফ ইউ আর নট আ ডুয়ালিস্ট বাট আর মনিস্ট, ইউ ক্যান স্টিল হ্যাভ দ্য পার্সোনাল গড। দেয়ার ইজ দ্য ওয়ান উইদাউট আ সেকেন্ড। দ্যাট ওয়ান ওয়ান্টেড টু লাভ হিমসেলফ। দেয়ারফোর, আউট অফ দ্যাট ওয়ান হি মেড মেনি। 

মোটামুটি এর বাংলা অনুবাদ করলে এই দাঁড়ায় - যদি তুমি দ্বৈতবাদী না হও, তাহলে তুমি মানুষের রূপে ভগবান লাভ করতে পারো। একই আছে, দুই নেই। সেই এক নিজেকে ভালোবাসতে চাইল, তাই বহু হল। 

আচ্ছা, বলতে পারিস জগতে সবচেয়ে মানুষ কাকে বেশী ভালোবাসে? (ক্ষণকাল নীরব থেকে) সে নিজেকে যত বেশী ভালোবাসে তার চেয়ে অপর কাউকে না। আমি নিজেকে ভালোবাসি। তাই জগতের মানুষকে আমি আত্মসাৎ করলাম, অর্থাৎ আমাতে পরিবর্তিত করে নিলাম। আর নিচ্ছি যে, সে প্রমাণ দিচ্ছিস তোরা। 

 

              

৭ উপপদ্যতে চাপ্যুপলভ্যতে চ ।।২। ১। ৩৬।।

 

অর্থঃ এই জগত যে অনাদি তাহা যুক্তিসম্মত, এবং ইহা শাস্ত্রাদিতেও দৃষ্ট হয়।

 

ব্রহ্মকে শাস্ত্রাদি পাঠ করে যেমন বোঝা যায় উপলব্ধিতেও সেরকম ধারণা করা সম্ভব। ব্রহ্মসূত্রে এমনটাই বলা হয়েছে। 

 স্বয়ং প্রকাশ ব্রহ্ম। বেদে বলছেস্বে মহিম্নি  তিনি নিজ মহিমায় প্রকাশিত হন। কোন রূপ পূজা জপ ধ্যানই হোক, আর শাস্ত্রাদির পাঠ আলোচনা ও মর্ম উপলব্ধিই হোক--ব্রহ্মকে ধারণা করা যায় না।

 স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশই উপলব্ধি। একমাত্র তার দ্বারাই ব্রহ্মের ধারণা সম্ভব। উপরিউক্ত সূত্রটি থেকে অনুমান করা যায় যে শাস্ত্রাদি অধ্যয়ন শুধু নয়, শাস্ত্রের মর্মকে অনুভূতির দ্বারা যদি কেউ ধারণা করতে পারেন, তবেই সঠিক ব্রহ্মোপলব্ধি হয়। এই কথাই বলা হয়েছে।

 কিন্তু শ্রীজীবনকৃষ্ণে এসে দেখা গেল তিনি কোন মন্ত্র তন্ত্র শাস্ত্র বিচার এসব সম্বন্ধে কিছুই জানতেন না। শুধুমাত্র দর্শনানুভূতির দ্বারায় তাঁর মস্তিষ্কে তিনি জগতকে ধারণ করেছেন। বহু পরে, জীবনের প্রায় শেষ প্রান্তে কিছু শাস্ত্র, যেমন উপনিষদ, ব্রহ্মসূত্র, কাশ্মীরি শৈববাদ ইত্যাদি গ্রন্থ তাঁর ঘরে আসে। যেন শাস্ত্রে বর্ণিত প্রমাণগুলি মিলিয়ে নেওয়াই একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল।

 তিনি বলেছিলেন, বাবা জীবনে পুজো কাকে বলে জানতাম না। জপ ধ্যান তো দূরের কথা। অথচ আমরা তাঁর জীবনে দেখতে পেলাম এক অভূতপূর্ব ঘটনার প্রকাশ। যা তাঁর মধ্যেই দেখা গেল এবং তা প্রমাণিত হলো তাঁর কাছে আসা অসংখ্য মানুষের মধ্যে তাঁর রূপ ফুটে ওঠায়। 

অনাদি ও অনন্তের প্রকাশ তাঁর কথা অনুযায়ী শুধু স্থান নয় কাল ব্যেপেও।  তাঁর রূপ জগতব্যাপি হবে, এটাই হয়তো অনাদি ও অনন্তের প্রকাশ বলে আমরা মনে করতে পারি।

 

৮ বিপর্যয়েণ তু ক্রমোহত উপপদ্যতে চ ।।২ । ৩ । ১৪।।

 

অর্থঃ যে ক্রমানুসারে ভূতবর্গ সৃষ্ট হয়, তাহার বিপরীতক্রমে উহারা লয়প্রাপ্ত হয়। এইরূপ সিদ্ধান্ত যুক্তিসম্মতও বটে। 

 

যে ক্রমে সৃষ্টি হইয়াছে তার বিপরীত ক্রমে প্রলয় হয়। প্রলয়ের উপক্রম হইলে পৃথিবী জলে পরিণত হয়, জল অগ্নিতে পরিণত হয়, অগ্নি বায়ুতে পরিণত হয়, বায়ু আকাশে পরিণত হয়, আকাশ ব্রহ্মে পরিণত হয়।

 উপপদ্যতে চ -- যে ক্রমে সৃষ্টি হয় তাহার বিপরীতক্রমে প্রলয় হয়। ইহাই যুক্তিযুক্ত। মৃত্তিকা হইতে ঘট হয়।  ঘট ভাঙিলে মৃত্তিকায় পরিণত হয়। 

শ্রীজীবনকৃষ্ণ-- ভারী সুন্দর বলছে! মৃত্তিকা হতে ঘট হলো। ঘট ভাঙ্গলে মৃত্তিকায় পরিণত হল। বেদে ঠিক এই কথাই বলছে। কোনখানে? -- ন জায়তে ম্রিয়তে বা কদাচিৎ, নায়ং ভুত্বা ভবিত্বা ন ভুয়ঃ অজো নিত্য শাশ্বতোহয়ং পুরাণঃ ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে।

ঘট কি? না, এই দেহ। ঘট ভেঙে গেল। আমার মৃত্যু হল কি? না। কেন না? না, আমি জগত থেকে এসেছি অর্থাৎ বাপ মার দেহ হতে এসেছি। তারপর’, আমার আত্মাসাক্ষাৎকার হল। তারপররাআত্মার মধ্যে এই বিশ্বরূপ দর্শন করলাম। তারপর আমার তাতে কী জ্ঞান জন্মাল? না, আমিই এই জগত। তখন খাঁটি মানে পাচ্ছি যে, আমার শরীর গেলেও আমি যে জগত থেকে এসেছিলুম সেই জগতেই রইলুম -- চমৎকার!

(শ্রীজীবনকৃষ্ণের অমৃতবাণী, যা ঘাটশিলায় রেকর্ডেড হয়েছিল, তার অংশবিশেষ)

 

 অধিকরণ ১ - স্বপ্নাবস্থায় জীব   

৯ সন্ধ্যে সৃষ্টিরাহ হি ।।৩। ২। ১।। 

 

[ সন্ধ্যে মধ্যবর্তী অবস্থায়, অর্থাৎ জাগ্রত এবং সুষুপ্তির মধ্যাবস্থায়, অর্থাৎ স্বপ্নাবস্থায় সৃষ্টি - প্রকৃত সৃষ্টি। আহ - শ্রুতি বলেন, হি - যেহেতু।]

 স্বপ্নাবস্থায় যথার্থ সৃষ্টি হইয়া থাকে, শাস্ত্রে এইরূপ উল্লেখ আছে।

কথামৃতে উল্লেখ আছে, ঠাকুর বলছেন স্বপ্নের দর্শন শুদ্ধতর। বলছেন, স্বপ্নসিদ্ধ যেই জন মুক্তি  তার ঠাঁই। 

শ্রীজীবনকৃষ্ণ বলছেন, ছান্দোগ্য ও বৃহদারণ্যকে স্বপ্নতত্ত্ব আছে। সচিদানন্দগুরু দেহীকে কৃপা করেন স্বপ্নে।

 এ প্রসঙ্গে ছান্দোগ্যে উল্লিখিত যে শ্লোকটি উনি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করতেন সেটি হল--

 য এষ সুপ্তেষু জাগর্তি কামং কামং পুরুষো নির্মিমানঃ।

তদেব শুক্রং তদ ব্রহ্ম তদেবামৃতমুচ্যতে।।                                         

অর্থঃ ইন্দ্রিয়াদি নিদ্রিত হইলে এই যে পুরুষ জাগরিত থাকিয়া অভিপ্রেত বিষয় নির্মাণ করিতে থাকেন, তিনিই অমৃতরূপে বর্ণিত হন। 

এ প্রসঙ্গে শ্রীজীবনকৃষ্ণের উক্তি---

 

শ্রীজীবনকৃষ্ণ (পাঠক পাঠ করলেন, য এষ সুপ্তেষু …) তাহলে এটাই শুধু মনে রাখিস, ওই পুরুষ আর আত্মা তাহলে আইডেন্টিক্যাল হচ্ছে। তাহলে আত্মা বলব কেন? যে আত্মা জগতে দু-একজন ছাড়া আর কেউ দেখেনি ব্যষ্টিতে? অথচ সেই পুরুষকে--আত্মাকে--লক্ষ লক্ষ নরনারী দেখেছে। এটা কল্পনারও নয়, অনুমানেরও  নয়, আর বোধে বোধ হওয়াও নয়। এ প্রত্যক্ষ বাস্তব।

 প্রতিটি মানুষের অন্তরে আছেন এক  পুরুষ। সুপ্ত। তিনি স্বপ্নে জাগ্রত হন মানুষের দেহে (সহস্রারে)।

 আমার অবস্থা যে স্বপ্নবৎ--তারও প্রমাণ তোরাই। আমার অবস্থা স্বপ্নবৎ না হলে তোরা তোদের স্বপ্নে আমায় দেখতিস না। লাইক প্রডিউসেস লাইক। এ অবস্থার কথা তোদের আমি বহু আগেই বলে গেছি।

 এই অ্যাবসোলিউট টা কি  বলতে পারিস? 

 ধীরেনদা--নির্বীজ সমাধি। 

শ্রীজীবনকৃষ্ণ--ও যে এক্সটারপিটেশান হচ্ছে রে! তারপর? ওরে যখনই খেতে হচ্ছে পঞ্চভূত যে তখনই আবার তাকে তেড়ে ধরছে। অ্যাবসোলিউট মানে যে শূন্য রে! আর ইউনিভার্সাল ইগো কী জানিস? বহুবার তোদের আমি বলে গেছি। শূন্যতত্ত্ব, শূন্যতত্ত্ব থেকে নাদতত্ত্ব, নাদতত্ত্ব থেকে মহৎতত্ত্ব, মহৎতত্ত্ব থেকে আদ্যাশক্তি তত্ত্ব।  এই মহৎতত্ত্বই হচ্ছে ইউনিভার্সাল ইগো। তাহলে অ্যাবসোলিউট কী করে ইউনিভার্সাল ইগো হচ্ছে? দুটো কি  আইডেন্টিক্যাল? (ধীরেনকে লক্ষ্য করে) কিছু বলার থাকে তো বল?

 ধীরেন--আজ্ঞে না, আমার কিছু বলার নেই। আপনি বলুন।

 শ্রীজীবনকৃষ্ণ--মহৎতত্ত্বটা কী বুঝলি না? বেদের ওই কথা রে--য এষ সুপ্তেষু জাগর্তি … -- ওই মহৎতত্ত্ব। হ্যাঁ রে, অ্যাবসোলিউট আর ইউনিভার্সাল ইগো  আইডেন্টিক্যাল।  ওতঃপ্রোত। 

 

১০ আনন্দাদয়ঃ প্রধানস্য ।।৩। ৩ । ১১।।

ব্রহ্মের গুণ বলিতে আনন্দ ও অন্যান্য গুণসমূহকে বোঝায়। 

        এখানে আনন্দকেই প্রধান গুণ বলে বর্ণনা করা হচ্ছে। ব্রহ্মের গুণ অর্থাৎ ব্রহ্মের স্বরূপ। আনন্দময় পুরুষ ব্রহ্ম। উপনিষদ বলছেন - আনন্দরূপমমৃতম যদ্বিভাতি। এ সূত্রের প্রমাণ হিসেবে শ্রীজীবনকৃষ্ণের বাণী উল্লেখ করা হল।

 

৯/৭/৫৮

তোরা যে আমাকে দেখিস তার স্বরূপ কী? ঘনীভূত আনন্দ। জগতের ঘনীভূত আনন্দ চিদঘনকায়ে একটা রূপ ধারণ করে ফুটে ওঠে। তাই ব্রহ্মের স্বরূপ হচ্ছে আনন্দ। 

 

৯/১১/৫৮

কোনো নতুন লোক আমাকে দেখে এসে (স্বপ্নে) জানালে আমার খুব আনন্দ হয়। ওর মানে কী জানিস? বেদ নিয়েই ধর - আনন্দ কার স্বরূপ? ব্রহ্মের স্বরূপ। 

 

১০/৪/৬০

আজ ওইখানটায় পায়চারি করছি। দেখছি আনন্দকে। (আনন্দ নামের এক যুবককে)। ভেতরে এলুম, তখনও দেখছি আনন্দকে। ব্রহ্মের স্বরূপ আনন্দ। বুঝলুম আনন্দই আমার স্বরূপ, তাই দেখাচ্ছে। এ কি শুধু আমার বেলায়? না। ‌যারাই আমাকে দেখেছে তাদেরই স্বরূপ হচ্ছে আনন্দ। 

 

১২/৪/৬০

এখন কেবল হাসছিলুম কেন জানিস? জল খেলুম, আমি নয়, আনন্দ জল খেল, পেচ্ছাব গেলুম, দেখলুম আনন্দ পেচ্ছাব করল‌। চান করতে - আনন্দ, খেতে আনন্দ, পাশ ফিরতে আনন্দ। আর কী আশ্চর্য! আমি আনন্দকে দেখব, তাই একজন ছেলে জন্মাবে, তার নাম রাখবে আনন্দ - এ সব দৈব! একে দৈবী মানুষ বলে। ব্রহ্মের স্বরূপ আনন্দ কিনা! তাই আমি দেখছি জ্যান্ত আনন্দ। কী দৈব বল দিকিনি! 

 

২৪/১১/৬১

মানুষ যে  ব্রহ্ম  রে।  ব্রহ্ম কি? ‘আনন্দরূপমতারপরেই বলছেঅমৃতমকেন বলছে বল দেখি? আরে মৃত্যুভয় যদি থাকে ব্রেনে, তাহলে আনন্দরূপমবলছে না। সেখানে আনন্দের ততখানি কম পড়ে যায়। তারপর বলছে, যদ্ বিভাতি। ধীরেন, ‘বিভাতিকথার অর্থ কী রে?

 ধীরেন--প্রকাশ পাওয়া।

 শ্রীজীবনকৃষ্ণ -- তাহলে পুরো কথাটির অর্থ কি? “আনন্দরূপম অমৃতম যদ বিভাতি 

ধীরেন -- সমষ্টিগত ভাবে এর অর্থ হল -- আনন্দরূপের দেহেতে প্রকাশ হলে সে অমৃতত্ব লাভ করে। 

 

১১ উর্দ্ধরেতঃসু চ, শব্দে হি ।। ৩ । ৪ । ১৭।।

 

        শাস্ত্রে আছে উর্দ্ধরেতা এই বিদ্যা লাভ করতে পারেন। উর্দ্ধরেতা শব্দটির আক্ষরিক অর্থ, রেতঃ যার উর্দ্ধমুখী। 

শ্রী জীবনকৃষ্ণ উর্ধ্বরেতা সম্পর্কে একটি অনুচ্ছেদ যুক্ত করেছেন তার ধর্ম ও অনুভূতি গ্রন্থের সেটিই এইরূপ--

 এই রেতঃ বহির্মুখী বা নিম্নগামী হয়ে সন্তান উৎপাদন করে। মানুষ নিজেই নিজেকে সৃষ্টি করে সন্তানরূপে। আত্মজ। পুত্রদর্শনে পিতার গাঢ় আনন্দ। পিতা নিজেকেই দেখছেন বহুরূপে। পিতা--সৃষ্টিকর্তা--এক। পুত্র বহু,  আর বহুরূপ।

রেতঃ  অন্তর্মুখী  হয়ে  সহস্রারে গমন করে।  তখন সহস্রারে মধুপাত  দর্শন হয়। 

মধুপাতের পরিণতি মধুবিদ্যার মাধ্যমে -  একোহহম বহুস্যাম। নিজেকে নিজের বিশ্বব্যাপী অসংখ্য রূপদান। বাইরে নয়, অন্তরে। আত্মিক একত্ব।

  যিনি ঊর্ধ্বরেতা হয়েছেন মনুষ্যজাতি তাঁর চিদঘনকায় জীবন্ত রূপ অন্তরে দেখবে আর বলবে।

 সংখ্যা--সংখ্যাতীত। বিশ হাজার হলেও নয়। উর্দ্ধরেতা  হওয়ার এই প্রমাণ। 

এ পর্যন্ত জগতে ধর্মের ইতিহাসে উর্ধ্বরেতা হওয়ার এই প্রমাণ কেউ দিতে পারেনি। অতএব উর্ধ্বরেতা কেউ হননি। একমাত্র দেখতে পাওয়া যায় শ্রীজীবনকৃষ্ণের জীবনে। তাঁর উর্ধ্বরেতা হওয়ার প্রমাণ স্বরূপ তিনি অজস্র নর-নারীর দেহে ফুটে উঠেছেন। জগত ঘোষণা করেছে, - ত্বং স্ত্রী, ত্বং পুমানসি, ত্বং কুমার উত বা কুমারী, ত্বং জীর্ণো দন্ডেণ বঞ্চসি, ত্বং জাতো ভবসি বিশ্বতোমুখঃ। 

 কিন্তু তাঁর কি এসব চেষ্টা করে হয়েছে? না। জন্ম থেকেই তিনি এমন একটি দেহ নিয়ে এসেছেন যাতে আপনা থেকে সব ফুটেছে। একেই বলা হয়কানু অনুগত তনুজন্মসিদ্ধ, বা জন্মাদস্য যতঃ।

 ব্রহ্মচর্য অনুশীলন করে ঊর্ধ্বরেতা হওয়া যায় না। বাইবেলে আছে, সাম আর বর্ন ইউনাচেস, অ্যান্ড সাম মেক দেমসেল্ভস ইউনাচেস। যারা চেষ্টা করে সাধনার দ্বারা উর্দ্ধরেতা  হতে চান তাঁরা তা হতে পারেন না। যারা জন্ম থেকে উর্দ্ধরেতা হন তাঁদেরই ব্রহ্মবিদ্যা লাভ হয়। শ্রীজীবনকৃষ্ণ একেই বলছেন - বিদ্বত। 

 

   ১২ অনাবিস্কুর্বন, অন্বয়াৎ ।।৩ । ৪ । ৫০।। 

 

ব্রহ্ম বিষয়ক প্রসঙ্গে নিজেকে প্রচার না করে, আত্মশ্লাঘা না করে, অহমিকাশূন্য থাকা। 

সূত্রটির ব্যাখ্যায় শাস্ত্রকার বৃহদারণ্যকে বর্ণিত আত্মজ্ঞানীর লক্ষণের উল্লেখ করেছেন। আত্মজ্ঞানী বালকের ন্যায় নিরহঙ্কার হবেন। তাঁর কোনোরূপ আত্মশ্লাঘা থাকবে না। তিনি সরল হবেন। এ প্রসঙ্গে শ্রীজীবনকৃষ্ণের কিছু কথা উদ্ধৃত করা চলে। 

৩০/৮/৫৮

শ্রীজীবনকৃষ্ণ -- এখানে যা ফুটেছে, খোদা কসম, এতে আমার কিছু বাহাদুরী নেই। এ আপনা হতে হয়েছে। তবে হয়ত কেউ প্রশ্ন করতে বসবি - মশাই, আমাদের যাদের আপনার এখানে এসে, আপনাকে দেখে, আপনার কথা শুনে সাধন আরম্ভ হয়েছে? তা হোক, কিন্তু তাও জানবি এও আপনা থেকে হয়েছে। 

 

ধর্ম ও অনুভূতি 

সূত্রঃ ৬২৯ - বেদান্তবাদে অবতার নেই - ঠাকুর বারবার বলছেন। আবার তিনি আকুলি ব্যাকুলি করে সকলকে জিজ্ঞাসা করছেন -আমাকে তোমার কী বোধ হয়?” তিনি নিজেকে অবতার বলে প্রচার করতে সদাই সচেষ্ট ও ব্যগ্র। 

 

সূত্রঃ ৬৩৫ - লোকশিক্ষা - শূন্য অহংকার - একটা ফলস ভ্যানিটি। আদেশ - সেলফ ইলিউশান - আত্ম প্রবঞ্চনা। নিজের অন্তর্নিহিত বাসনা মূর্ত হয়ে নিজেকে প্রতারিত করে। 

 

সূত্রঃ ৬৮০ - ধর্মজগতে আচার্য বলে কিছু নেই। মানুষকে প্রতারিত করে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার একটি স্বকপোলকল্পিত শূন্যে উড্ডীয়মান অহংকারের পতাকা। 

 

সূত্রঃ ৭০২ -অহংকারের লেশ থাকলে ভগবানকে পাওয়া যায় নাআমি অবতার” - “মুই সেই” - এর চেয়ে দীর্ঘ অহংকারের নিশান - ঝাণ্ডা - আর কিছুই নেই। অহংকার নাশের প্রকৃত রূপ - বেদে নির্দেশিত এই একত্ব। 

 

সূত্রঃ ৭৪৯ -আমি মলে ঘুচিবে জঞ্জালঅহং” - ক্ষুদ্র আমি। পিগিশ ইগো - বজ্জাত আমি। একত্বে নাশ। 

 

ঋতম বদিষ্যামি - ১৬/৩/৬১

এই যে আমার এই ব্যষ্টির সাধন হয়েছে এর কোনো মূল্য নেই। যখন জগত এসে আমার সম্বন্ধে বলবে তখনই। যখন অহং জগতে পরিব্যপ্ত হয়ে পড়বে তখনই। দ্যাখ, এই যে ঘরসুদ্ধ লোক, তোরা আমায় ভেতরে দেখছিস। এ কী বল দিকিনি! 

 

ঋতম বদিষ্যামি - ২৩/৫/৬১

কথামৃতে পড়া হচ্ছিল - বঙ্কিমবাবু শ্রীরামকৃষ্ণকে বলছেন - মশাই, আপনি প্রচার করেন না কেন? শ্রীজীবনকৃষ্ণ পাঠ শুনে বললেন - দ্যাখ, বঙ্কিমবাবুর মতো লোক এসব ধরতে পারেনা। … ঠাকুরকে যে তিনি জিজ্ঞেস করছেন, ;মশাই আপনি প্রচার করেন না কেনকিন্তু তিনি ধরতেই পারছেন না যে ঠাকুর এই যে ভক্তবাড়ি গেছেন, তা তে হচ্ছে কী, প্রচার করাই হচ্ছে না কি? হ্যাঁ, এতে প্রচার করাই হচ্ছে। আর ঠাকুর আমার বলছেন, ‘তিনি যদি প্রচার করেন তবেই প্রচারহ্যাঁ, ব্যষ্টির সাধনে এসব হয়। ভগবান দর্শন হল, তারপর আদেশ হল, কিন্তু এ যে কী করে হয় তোরা জানিস - সে নিজেই নিজেকে আদেশ দিচ্ছে। 

 

১৩ আবৃত্তিঃ অসক্দুপদেশাৎ ।। ৪ । ১ । ১।।

 

শাস্ত্রে বলা হয়েছে পুনঃ পুনঃ অভ্যাস ও পুনঃ পুনঃ উপদেশের ধারণা প্রয়োজন। 

শ্রীজীবনকৃষ্ণ বারবার একথার উল্লেখ করে গেছেন। বলে গেছেন ব্রহ্মবিদ্যার অনুশীলনই একমাত্র পন্থা। বলেছেন, দর্শন অনুভূতি হয়ে যায়, কিন্তু এ জিনিস ধরে রাখতে গেলে প্রয়োজন অনুশীলন। বারবার চর্চায় যেমন রস রিফাইন হতে থাকে ঠিক তেমনই ব্রেন পরিস্কার হতে থাকে। বলছেন, এ হল জীবন যজ্ঞ। জীবনব্যাপী এই সাধনা। এও এক প্রাণান্তকর ব্যাপার। তাঁর নিজের জীবন দেখলেই বোঝা যায় কী ঐকান্তিক অনুশীলন চলেছিল গোটা জীবন ধরে। কত সময়ে দেখা গেছে তিনি তাঁর নিজের কোনো একটি বহু পূর্বেকার দর্শনের আরও গভীর কোনো অর্থ হঠাৎ উপলব্ধি করেছেন। সেটি ব্যক্ত করার পর বলছেন - এতদিন পর মাথায় ফ্ল্যাশ করল। সেই কবেকার কথা! কী বল দিকিনি? একটা দর্শন হয়ে যায়। সেটা ফুটতে এতটা সময় লাগে। তোরা ভাবিস কী দেখলুম না কী দেখলুম। 

মার্চ ১৯৬২

ব্রহ্মসূত্রে এক জায়গায় পড়ে দেখি, অ্যাজ ইন মধুবিদ্যা দ্য সান ইনডিড ইজ হানি। এই কথা বলছে আর ছান্দোগ্যের রেফারেন্স দিচ্ছে। ব্যাস, শুধু এই কথা। আর কিছু নয়। সান ইনডিড ইজ হানি, এই কথা দেখেই আমি বুঝতে পেরেছি যে হানি বলে চৈতন্যকে বোঝাতে চাইছে। ছান্দোগ্যে মধুবিদ্যা বলে একটা চ্যাপ্টার আছে। উপনিষদ নিয়ে এলো। তাতে দেখি এই কথা বলছে, যে যার মধুবিদ্যা লাভ হয়েছে সে অনুশীলনের দ্বারা এই জিনিস উপভোগ করে তৃপ্ত হয়। এই মধুবিদ্যার পরিণতি দেখিয়েছে। আচ্ছা, এই প্রণবকে অগ্রণী করিয়া (উপনিষদের) মানে তোরা কি করবি? ওরে অনুশীলন করা রে -- এই জিনিস অনুশীলন করা!

 মধু আমার বিছানায় পড়ল, আর আমি যতই হাত দিয়ে মুছতে চাইছি ততই বেড়ে বেড়ে গোটা বিছানাটাকে আপ্লুত করে দিল। আমি এখন বুঝতে পেরেছি এ হচ্ছে অনুশীলন। মধুবিদ্যার অনুশীলন। আজ একুশ বাইশ বছর ধরে এই জিনিসের অনুশীলন হয়েছে। তোরাই বল, এইরকম অনুশীলন আজ পর্যন্ত কোথাও কখনো কি হয়েছে? না বাবা। এরকম অনুশীলন কখনো কোথাও হয়নি। 

 

১৪ ন প্রতীকে, ন হি সঃ ।।৪ । ১ । ৪।।

 

প্রতীকাপন্ন লোক প্রতীকই প্রাপ্ত হয়। বস্তুত যারা প্রতীক পূজা করেন তাঁদের ব্রহ্মবিদ্যা লাভ হয়না। 

উপনিষদ বলছে নিজেকে পূজা না করে যারা অপরকে বা মূর্তি অর্থাৎ প্রতীক পূজা করে তারা যজ্ঞের বলির পশুর সমান, অর্থাৎ তারা বধ্য। দক্ষরাজা শিবহীন যজ্ঞ করেছিল। অর্থাৎ তাঁর মন প্রটীকাপন্ন ছিল। শিব ঐক্য সাধনে। অর্থাৎ দক্ষরাজার অদ্বৈতজ্ঞান হয়নি। ব্রহ্মত্ব লাভ করেননি। সুতরাং একত্ব লাভ করেননি। মন সপ্তমভূমিতে না গিয়ে ষষ্ঠভূমিতে আটকে থাকলে সাধকের নানাবিধ রূপ দর্শন হয়। বিবিধ রূপ দর্শন, অর্থাৎ কারণ শরীরের লীলা। কেউ দেখছেন কালী, কেউ কৃষ্ণ দেখছেন, কেউ দেখছেন যীশু, কেউ বা মহম্মদ। ফলে বিভেদ। আর বিভেদ থেকেই বিবাদ। অথচ যিনি আত্মজ্ঞান লাভ করেছেন তিনি নিজের স্বরূপ জানেন। তিনি জানেন তিনি ও তাঁর সামনে এই বিশাল জগৎ আসলে এক। এক বৈ দুই নেই। তিনি অভয়পদ প্রাপ্ত হন। অভয়ং বৈ জনকঃ প্রাপ্তোহসি। শ্রীজীবনকৃষ্ণ বলছেন, ব্রহ্মের স্বরূপ তিনটি। প্রথমত আনন্দ। দ্বিতীয়তঃ অভয়, ও তৃতীয়তঃ অমরত্ব। দুই নেই সুতরাং ভয় নেই।

 ষষ্ঠভূমির নানাবিধ রূপ দর্শনের মধ্যে দিয়ে সমন্বয় সাধন নয়। বহু পরের কথা। যিনি ব্রহ্ম হবেন তিনি নিজেকে ছাড়া আর কোনো অস্তিত্বই অনুভব করবেন না। 

বলছেন, রামায়ণ-মহাভারত প্রতীক তত্ত্ব। সেখানে শুধু মানুষ, আর মানুষের দেহে কীভাবে আপনা হতে সাধন হয়, সেই কথা বলছে, তখন এরা সেই সত্যকে প্রতীকতত্ত্বের রূপ দিয়ে বেদবিদ্রোহী কল্পনার বস্তু দিয়ে মানুষের অকল্যাণ করল।

 দক্ষ রাজার ছাগমুণ্ড। অর্থাৎ পশুর মাথা। মানুষের সহস্রারে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ব্রহ্মের প্রকাশ ঘটে। যাদের মাথায় অ্যানিমালিটি ছাড়া আর কিছুই নেই তারাই মূর্তি বা প্রতীক পূজা করেন। কেউ বলতে পারেন যে মূর্তি কথা বলে, আবদার করে, খেলে, খায়। যেমন, গোপালের মার গোপাল। সেক্ষেত্রে বলতে হবে যে তাঁর কল্পনা রূপ ধারণ করে তাঁর সাথে লীলা করেছে। এ কথার উল্লেখ পাই, যখন ধ্রুব বলছেন যে ঠাকুর তোমার কুণ্ডল কেন দোলে না? ঠাকুর বলছেন, তুমি দোলালেই দোলে। অর্থাৎ ধ্রুবের শক্তিতে তার সৃষ্ট কৃষ্ণের কানের কুণ্ডল দুলবে।  অতএব ধ্রুব বড়। কল্পনার চেয়ে জীবন্ত মানুষটা বড়। এ জানতে পারলেই আপন স্বরূপ জানা হবে। তখন সে আর প্রতীকে লিপ্ত হবে না।    

জন উডরফের দ্য সারপেন্ট পাওয়ার বইটি ধীরেনের (রায়) হাতে দিলেন। বললেন, একবার নয়, দুবার পড়বি। তারপর আমায় বলবি। আমি প্রশ্ন করব। 

ধীরেনের পড়া শেষ হলে শ্রীজীবনকৃষ্ণ বললেন -- ওই যে ওরা বলছে আকাশ - এলিফ্যান্ট - কী তফাত বল। 

ধীরেন - ওরা বস্তুর কথা বলছে না। প্রতীকের কথা বলছে। এ ঘরে সকলেরই প্রায় আকাশ দর্শন হয়েছে। অ্যান্ড্রোজিন (উভলিঙ্গ) এর কথায় বললেন - ওরা প্রতীক বলছে, কিন্তু আমি বাবা, দিনদুপুরে, রোদ্দুর কটকট করছে, হঠাৎ নিজের দিকে চেয়ে দেখি যে আমার নিম্নাঙ্গ যোনি হয়ে গেছে - এই না দেখে আমি হ্যাক থু হ্যাক থু করতে করতে বিছানা থেকে লাফিয়ে পড়ে ঘরের বাইরে গেলাম। 

একটা কথা জিজ্ঞেস করব? ওই যে ঠাকুর বলছেন - দ্বাদশ দল পদ্ম, ষোড়শ দল পদ্ম, অধোমুখ হয়েছিল, ক্রমে ক্রমে উর্দ্ধমুখ হল - এর মানে কী করবি?

    ধীরেন -- এ প্রতীকে হচ্ছে। 

শ্রীজীবনকৃষ্ণ -- হ্যাঁ রে, ঠিক বলেছিস। আমি কী বলেছি? এগুলো বাবা চক্র। পদ্ম নয়। আমি বাবা দেখেছি চক্র কভারড উইথ লাইট। ঠাকুর কিন্তু এধারে বলবার সময় বলছেন চক্র, ভূমি। কিন্তু অনুভূতির সময় বলছেন - পদ্ম। 

 

১৫ মুক্ত আত্মা কিছু লাভ করেননা। তিনি তাঁহার যথার্থ স্বরূপ উদ্ভাসিত করেন মাত্র। 

সম্পদ্য আবির্ভাবঃ, স্বেন শব্দাৎ ।।৪। ৪ । ১।।

 

যিনি পরম  জ্যোতি  ব্রহ্মকে লাভ করেন তাঁহার যথার্থ স্বরূপের প্রকাশ হয়। শ্রুতিরস্বশব্দের ব্যবহারেই বুঝিতে পারা যায়।

 মুক্ত আত্মা তাঁরই যাঁর পরমজ্যোতি  লাভ হয়েছে। এই ঘোষণাটি প্রথম পাওয়া যায় এই মন্ত্রটির মধ্যে - 

এবমেষ সম্প্রসাদঃ পরমজ্যোতিরুপসম্পদ্য স্বেন রূপেন অভিনিষ্পদ্যতে। 

 

সম্প্রসাদ একটি জীবন্ত মানুষ। তিনি আত্মার প্রসন্নতা লাভ করেছেন। এই সম্প্রসাদ শুধু মাত্র আত্মার প্রসন্নতা নয়, স্বয়ং আত্মা সাক্ষাৎকার করেছেন, পরম জ্যোতিই সেই আত্মা। এরপরও সম্প্রসাদের গতি অনিবার্য। তাঁর জীবন্তরূপটি চিন্ময়  আকারে অসংখ্য মানুষের মধ্যে ফুটে উঠছে। এই শেষোক্ত অবস্থাটি তাঁর মুক্তির প্রমাণ। শাস্ত্রে যে সমস্ত মুক্তির কথা আছে সেগুলির মধ্যে এটিই শ্রেষ্ঠ। একে নিত্যমুক্ত বা বিদেহমুক্ত অবস্থা বলা যায়। নিত্যমুক্ত অবস্থা অর্থাৎ জন্মেছেন এমন দেহ নিয়ে যে কখনো মায়াজালে বাঁধা পড়বেনই না উপরন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর  এই ব্রহ্মত্ব অনিবার্যরূপে প্রকাশ পাবে। কারণ এ তাঁর দেহের স্বাভাবিক গতি। এই স্বাভাবিকতাজন্মাদস্য যতঃসূত্রটির দ্বারাই পরিস্ফুট। সুতরাং তিনি নিত্যমুক্ত। বিদেহমুক্ত কথাটির অর্থ হল যাঁর দেহ থেকে আত্মা সম্পূর্ণরূপে পৃথক হয়েছে। সম্যকরূপে ন্যাস। সন্ন্যাস। দেহ ও আত্মা পৃথক হলে তাঁর জীবন্তরূপ চিদঘনকায়ে  ফুটে ওঠে অসংখ্য নর-নারীর মধ্যে। এই প্রকৃত বিদেহ অবস্থা। শাস্ত্রে এইরূপই বলা হয়েছে। আজ পর্যন্ত ধর্মের ইতিহাসে শ্রীজীবনকৃষ্ণের পূর্বে এই অবস্থা আর কোনো আচার্যের মধ্যে দেখা যায়নি।

(অমৃতবাণী থেকে)

এই জীবনেই মুক্তি লাভ করা - জীবন্মুক্ত হওয়া। জীবন্মুক্তির কথা, কিরকম করে জানব যে লোকটা জীবন্মুক্ত? বেদ বলছে … স্বেন রূপেন অভিনিষ্পদ্যতে সঃ উত্তমপুরুষঃ। এই যে পুরুষোত্তমের কথা বলছে, এ পুরুষোত্তম নিজেই নিজের প্রমাণ দিয়ে যাচ্ছে। কোথায়? সহস্র সহস্র নরনারীর অন্তরে, যে সে মুক্ত। মুক্ত হলেই মানে হল কী? না ব্রহ্ম। এই যে সব পথ সত্য বলছে … পথ একটি মাত্র। সেটি হল মানুষের দেহ - এই সপ্তভূমি। সেইখান থেকে সম্প্রসাদ - সচ্চিদানন্দ বিগ্রহ ব্রহ্মপুর থেকে আসার পর তার মহাবায়ু বা কুণ্ডলিনী জাগ্রত হয়ে ধীরে ধীরে পঞ্চকোষ বা সপ্তভূমির মধ্য দিয়ে সহস্রারে গিয়ে তবে সে ত্রিপুটি অবস্থায়, অর্থাৎ জ্ঞান, জ্ঞেয়, জ্ঞাতা - যাকে খ্রিশচানিটিতে ট্রিনিটি বলে, যদিও তারা এর অর্থ কিছু বোঝেনা -- একে আত্মা বা ভগবান বা ব্রহ্ম সাক্ষাৎকার করাচ্ছে। এটি হল তন্ত্রমতে। বেদমতে বলছে পরমজ্যোতিঃ উপসম্পদ্য, অর্থাৎ তাঁর ব্রহ্মত্ব লাভ হলো। আবার এই যে ব্রহ্মত্ব লাভ হল, কী করবে সে? না স্বেন রূপেণ অভিনিষ্পদ্যতে। হাজার হাজার লোকের হৃদয়ে সে উদ্ভূত হয়ে তাঁর যে ব্রহ্মত্ব লাভ হয়েছে তার প্রমাণ দেবে। রবি ঠাকুর বেশ একটি কথা বলেছেন -- তুমি যে মহাত্মা সেটি তোমায় প্রমাণ করতে হবে। ঠিক রবি ঠাকুরের ভাষায় সে প্রমাণ করছে যে সে মহাত্মা। রবি ঠাকুর বলেছেন যে, সদা জনানাং হৃদয়ে সন্নিবিষ্ট। এতেও ঠিক কী বলছেন প্রমাণ পাওয়া যায় না। বেদ বেশ চমৎকার করে বলছে -- স্বেন রূপেণ অভিনিষ্পদ্যতে। তারপর কী? ব্রহ্মসূত্রের ওই কথা-- সম্পদ্য আবির্ভাবঃ। তারপর সদা জনানাং হৃদয়ে সন্নিবিষ্টঃ।

 সরলার্থঃ যিনি সম্প্রসাদ তাঁর চিন্ময় রূপ অসংখ্য মানুষের দেহে ফুটে উঠে তাঁর ব্রহ্মত্বের প্রমাণ দেবে। এই ব্রহ্মত্ব লাভেই তাঁর যথার্থ স্বরূপের প্রকাশ হয় ও  অবশেষে জনগণের হৃদয়ে তিনি সদাসর্বদা অবস্থান করেন। সূত্র তিনটি এক করে নিলে এই অর্থ দাঁড়ায় যা শ্রীজীবনকৃষ্ণ বলেছেন।  

 

৪/৯/১৯৬৬

আচ্ছা, দ্যাখ, বেদে যে পরাবিদ্যার কথা আছে, সার কী তার? ‘তত্বমসিআর তার ব্যাখ্যা কোথায় পাই? ত্বং স্ত্রী ত্বং পুমানসি,  ত্বং কুমার  উতো বা কুমারী, ত্বং জীর্ণোদণ্ডেন বঞ্চসি, ত্বং জাতো ভবসি বিশ্বতোমুখঃ। (শ্বেতশ্বতর উপনিষদ) 

 

 তারপর ব্রহ্মসূত্র বলছে -- সম্পদ্য আবির্ভাবঃ স্বেন শব্দাৎ। বেদ তাহলে কী বলল? সম্প্রসাদই সম্পদ্য হচ্ছে না কি? সম্প্যসাদ কে? একটা জ্যান্ত মানুষ। বেদে কিন্তু এই জ্যান্ত মানুষের প্রমাণ নেই। আমিই সেই সম্প্রসাদ। আমিই সেই জ্যান্ত মানুষ।

 

 সেই জীব অর্থাৎ মানুষ, নিজের শরীর থেকে উত্থিত হয়ে সহস্রারে পরমজ্যোতি লাভ করে, নিজের দেহের চিন্ময়রূপে সংখ্যাতীত নর-নারীর অন্তরে, তথা সম্পদ্য আবির্ভাবঃ, অর্থাৎ আবির্ভূত হন 

                         

No comments:

Post a Comment

শ্রীজীবনকৃষ্ণের অমৃত কথাসার প্রথম অংশ

১৯৫০ থেকে ১৯৫৩ সালের কিছু কথা সংকলিত করা হয়েছে শ্রীজীবনকৃষ্ণ সংশ্রয় থেকে। যেহেতু সেখানে দিনলিপিতে তারিখের উল্লেখ নেই, তাই এখানে তারিখের উল্ল...