Sunday, October 11, 2020

অষ্টাবক্র সংহিতা ও শ্রীজীবনকৃষ্ণ

 

অষ্টাবক্র সংহিতা ও শ্রীজীবনকৃষ্ণ

৫ই মে ১৯৫৮

শ্রীজীবনকৃষ্ণ দিলীপের প্রতি কহিলেন ওরে তোদের স্কুল থেকে অষ্টাবক্রসংহিতা যদি থাকে তো নিয়ে আসিস। তাতে অহমস্মির কথা আছে। একবার দেখবো। তাঁহার পর সকলের প্রতি বলিলেন - ঠাকুরের ঘরে একখানা অষ্টাবক্রসংহিতা থাকত।

১১/০৬/১৯৫৮  

শ্রীজীবনকৃষ্ণ এই দিলীপ বল, ব্রহ্ম কী রূপ?                 

দিলীপ আমরা সবাই আপনার যে মূর্তি ভেতরে দেখি, তাইই ব্রহ্ম।  

শ্রীজীবনকৃষ্ণ হ্যাঁ। শুনলেন? (ঘরে উপস্থিত এক নবাগতকে উদ্দেশ্য করে) ওই হল আপনাদের স্বরূপ। পরমব্রহ্ম। অষ্টাবক্রসংহিতায় আমি এর রেফারেন্স পেয়েছি।

দিলীপ একোহহং দেহবানপি। অহো! অহং নমো মহ্যং একোহং দেহবানপি। ক্কচিন্ন গন্তা না গন্তা ব্যাপ্যবিশ্বমবস্থিতঃ।        

              - অষ্টাবক্রসংহিতা, দ্বিতীয় প্রকরনম - ১২   

শ্রীজীবনকৃষ্ণ হ্যাঁ, শরীর ধারণ করে পরমব্রহ্ম থাকেন। আবার এই শরীরধারণ বাইরেও বোঝায়, ভেতরেও বোঝায়। পরমব্রহ্ম মানুষের আকৃতি নিয়ে মানুষের ভেতর ফুটে ওঠেন তোরা স্বপ্নে যা দেখিস। .........

. সংসারী অসংসারীর মধ্যে পার্থক্য অষ্টাবক্র করেছে, যতক্ষণ কামনাবাসনা ততক্ষণ সে সংসারী, নির্বাসনা হলেই অসংসারী। এ খুব ভালো ডেফিনেশান।   ( অন্য একদিন কথা প্রসঙ্গে ) ঠাকুর একটি রূপ দেখতে চেয়েছিলেন। তা যখন চেয়েছিলেন তখন সেটি দর্শন না হয়ে অপর সময়ে দর্শন হয়, সেই কথা এখানে বলছেন। তারপর একটু থামিয়া কহিলেন অষ্টাবক্রমুনি এক জায়গায় বলছেন, যে ব্যক্তি আমি এটা হব বলে ইচ্ছা করে, সে জ্ঞানী নয়। এইরূপটা দর্শন হোক ঠাকুর এইটা ইচ্ছা করছেন, তাই না? সকলে হ্যাঁ।                                 

শ্রীজীবনকৃষ্ণ তাহলে অষ্টাবক্রমুনির মোটে ঠাকুরের অবস্থা কি দাঁড়াচ্ছে?           

ফণী, হারু, ও বঙ্কিমবাবু জ্ঞানী নন।

শ্রীজীবনকৃষ্ণ তাক হইতে অষ্টাবক্রসংহিতা খানি পাড়িয়া বলিতেছেন শান্তি শতকমের শ্লোকটি পড়ছি, শোন।             

পাঠ ন ধাবতি জনাকীর্ণং, নারণ্যমুপশান্তধীঃ, যথা তথা যত্র তত্র সম এবাবতিস্ঠতে।

পাঠের পর বলিলেন, এরা যা মানে করেছে তা হোল যিনি জ্ঞানী তিনি জনাকীর্ণ অঞ্চলে যাননা। বা জনশূন্য অংশেও গমন করেননা। তিনি কারোর নিকট যাননা। তারপর বই মুড়িয়া কহিলেন এখন তোরা বোল এই কদমতলাটা কি? (হাস্য) সকলে জনাকীর্ণও নয় আবার জনশূন্যও নয়।      

  শ্রীজীবনকৃষ্ণ এ শ্লোকটার সঙ্গে আমার কিছু মেলে কিনা?      

  ফণী হ্যাঁ। আপনি কোথাও গমনাগমন করেননা।            

  শ্রীজীবনকৃষ্ণ কেন? বাজারে যাই। বেড়াতে যাই।            

  ফণী ভক্তদের বাড়ি যাননা।  শ্রীজীবনকৃষ্ণ হ্যাঁ, খুলে বল। শিষ্য করতে বেরুইনা। ...আবার বেশ বলেছে, জনশূন্য স্থানেও গমন করেননা।

শ্রীজীবনকৃষ্ণ আজই সকালে ভাবছিলুম বই দুখানাকে বিদায় করে দেবো। তারপর চান করতে যাবার আগে কী খেয়াল হল আজ একবারও বইটা খুলিনি, একটু খুলি। তারপর খুলবি তো খোল, একেবারে এই শ্লোকটাই ! (শান্তি শতকমের শততম)!  (হাস্য)যা তে রুদ্র শিবা তনূরঘোরা, পাপকাশিনী। ত্বয়া নস্তনুবা শন্তময়া

গিরিশন্তাভিচাকশীহি।।(শ্বেত ৩/৫)                       

অর্থ ওগো রুদ্র, ওগো গিরিশন্ত (দেহে অবস্থানপূর্বক সুখবিধানকারী) তোমাদের যাহা শিব, অঘোরা ও পূর্ণাভিব্যাঞ্জক তনূ, সেই পূর্ণানন্দরূপ তনুর দ্বারা আমাদের স্নেহযুক্ত করো।    

 শ্রীজীবনকৃষ্ণ দেখ, অষ্টাবক্রসংহিতায় পেলুম, আত্মাসাক্ষাৎকার ও আত্মসাক্ষাৎকার দুটো আলাদা কথা। আত্মাসাক্ষাৎকার মানে ওই বেদের সত্যং আর আত্মসাক্ষাৎকার ইট কভারস এনিথিং এন্ড এভরিথিং । তবে একটা মানে হল স্বস্বরূপ দর্শন। কিন্তু ব্যষ্টিতে নয়, সমষ্টিতে হওয়া চাই, এই যেমন তোরা আমায় সবাই দেখিস। তারপর কহিলেন উঃ, দারুন গরম! হ্যাঁরে মেঘ হয়েছে কি দ্যাখ তো ? তোরা কেউ বলনা জল হোক, দেখবি তাহলে হবে। ওরে তোরা সব ব্রহ্মবিদ হয়ে গেছিস। তোদের কি কম শক্তি !

২৬/০৬/১৯৫৮

অম্বর আচ্ছা, আমি আগে আপনাকে না দেখে দেখেছিলাম। তা এ জিনিসটাকে সায়েন্সের নিয়ম ধরেও তো বিচার করা যায়? শ্রীজীবনকৃষ্ণ ও আমি ধরবনা। তোর বেদান্তের সাধন হয়নি বলে আমাদের এই জিনিসটা বুঝতে পারছিসনা। বিশ্ব বিরাট আবার বীজও বটে । (অষ্টাবক্র সংহিতা থেকে একখানি শ্লোক পাঠ করে ) এই শুনলি? তার কোথাও গমনাগমন নেই। একই স্থানে সদা বর্তমান। এ হচ্ছে ব্রহ্মবিদ্যা। এ এক অতি অদ্ভুত জিনিস।

পুরীধামে শ্রীজীবনকৃষ্ণ সঙ্গে

শ্রীজীবনকৃষ্ণ – (কথাপ্রসঙ্গে) সেই অষ্টাবক্র সংহিতার কথা। যাকে অসংখ্য লোকে তাদের মধ্যে দেখে তাঁরই একজ্ঞান হয়েছে। ঠাকুর অহংনাশ বলতে কি বোঝাচ্ছেন জানিনা। তিনি শেষজীবনে বলে গেছেন প্রসাদ খাওয়া উঠে গেলো। এর মানে শুনবেন? – হি ডিসকারডেড হিস ব্যষ্টির সাধন। তাঁর ব্যষ্টির সাধনের মূল্য রইলনা।

কত কথা পড়ে মনে

০৮/০৭/১৯৬০ কথামৃতে পাঠ হল মনেতেই বদ্ধ, মনেতেই মুক্ত। শ্রীজীবনকৃষ্ণ বললেন একথা তোদের উপনিষদে আছে। কী বলে তোদের শাস্ত্রে ওই? আমি ধরিয়ে দিতে বললাম অষ্টাবক্রে আছে ( মন এব মনুষ্যানাং কারণং বন্দ মোক্ষশেঃ)। শ্রীজীবনকৃষ্ণ কেন, তোদের উপনিষদেও আছে। কিন্তু একথাটি কি ঠিক? মনেতেই বদ্ধ, মনেতেই মুক্ত? মুক্ত হওয়া কি তাতো ঠিক করে বলতে পারছেনাএই একত্বই মুক্ত হওয়া। ওঁদের মনেতেই মুক্ত অর্থাৎ বিচারাত্মক। আর আমদের অনুভুতিমুলক। বিচার করে নয়।

বিনয় শতক ৩১/০৮/১৯৫৮

প্রসঙ্গঃ সাইয়েরা বলে আলেখ! আলেখ! বেদমতে বলে ব্রহ্ম, ওরা বলে আলেখ । জীবদের বলে আলেখে আসে আলেখে যায় । অর্থাৎ জীবাত্মা অব্যক্ত থেকে এসে তাইতে লয় হয় । ৪/১৮/১          

শ্রীজীবনকৃষ্ণ এই আলেখ মানে, ঠাকুরও ব্রহ্ম বলছেন । এ হোল ব্যাস্তির কথা। ঠিক আছে। ওঁদের ওই অব্যক্ত থেকে এসে মানে শূন্য থেকে এসে। তাই শূন্য থেকে এসে শূন্যেই লয় হয়, এই কথা বলছে। অষ্টাবক্র সংহিতায় বলছে হিরণ্যগর্ভ পুরুষ শেষে ওই সূর্যমণ্ডলস্থিত পরমব্রহ্মে লয় হয়। আমাদের এখানে এই পরমব্রহ্মে লীন হওয়ার মানে পরমব্রহ্মে পরিবর্তিত হওয়া ।

১৭/০২/১৯৫৯

দ্যাখ, Dr Urquhart, Pantheism – এ বলছেন, “The moral life thus becomes Universal (এইভাবে নৈতিক জীবন বিশ্বব্যাপী হয়). To live in perfect goodness is to realise Oneself in all” (শুদ্ধাচারে থাকলে নিজেকে সকলের মধ্যে অনুভূত হয়). একজন মানুষ যিনি Perfect goodness এ আছেন, তিনি নিজেকে সকলের মধ্যে অনুভব করেন। কিন্তু তিনি যে নিজেকে সকলের মধ্যে অনুভব করছেন তার প্রমাণ? এ হচ্ছে অষ্টাবক্র সংহিতার যে আত্মজ্ঞানীর কথা আছে, তাই।

মুক্তাধারা ৮/০৭/১৯৬০

কথামৃতে পাঠ হোল মনেতেই বদ্ধ, মনেতেই মুক্ত।

শ্রীজীবনকৃষ্ণ বললেন একথা তোদের উপনিষদে আছে। কী বলে তোদের শাস্ত্রে?

আমি ধরিয়ে দিতে বললাম, অষ্টাবক্রে আছে (মন এবং মনুষ্যানাং কারনং বন্দ মোক্ষশেঃ)

শ্রীজীবনকৃষ্ণ কেন, তোদের উপনিষদেও আছে। কিন্তু একথা কি ঠিক? মুক্ত হওয়া কি তাতো ঠিক করে বলতে পারছেনা। এই একত্বই মুক্ত হওয়া।

২৩শে জুন, ১৯৬১

 সর্বভূতে সমান দয়া, কথামৃতে একথা পাঠ হলে শ্রীজীবনকৃষ্ণ রহস্য করে বললেন কীরকম দয়া বাবা! ...দ্যাখ দয়া কি জিনিস জানিনা। ও জিনিস আমার মনেই ওঠেনা। কীরকম একটা আছে যেজন্য এসব আমার মনেই ওঠেনা। তাইতো আমি একদিন দুঃখ করে সুশীলবাবুকে বলেছিলাম দেখুন সুশীলবাবু, আমি দয়া কি জিনিস জানিনা। তারপর যখন অষ্টাবক্র সংহিতা এলো তখন খুলে দেখি তাতে বলছে এই ধীরর দয়া বলে কোনও জিনিস নেই।

অগাস্ট ১৯৫৭

শ্রীজীবনকৃষ্ণ- জানিস বাবা, আমাকে ঠাকুর জানিয়ে দিয়েছিলেন যে আমার শরীরে বত্রিশটি শুভ চিন্হ আছে। আমি বই দেখে মিলিয়ে ছিলাম। তার মধ্যে আঠাশটা পেয়েছিলাম, আর পাইনি। স্বাধীনতার সময়ে আমি যে কী ছটফট করেছি কী বলব! এই তিনটে দিন যেন আমার দেহ থাকে। যেন ওই তিনটে দিন বেঁচে থাকি। স্বাধীনতার দিন সকালেও যদি মরি তাতেও শান্তি। কেন যে এত ব্যাকুলতা হয়েছিল তখন বুঝতে পারিনি। অষ্টাবক্র সংহিতা পড়ে বুঝলুম।

 

২৪/০৬/১৯৫৮

শ্রীজীবনকৃষ্ণ ধর্মগ্রন্থ কখনও বাড়িতে এনে পড়িনি। সেলফের ওই বইগুলো দেখে ভাবিসনি যে, আমি সারাজীবন ওই কর্ম করে এসেছি। ওইগুলো কেন এসেছে? তার জবাব হোল অষ্টাবক্র সংহিতায় বলেছে সাধন ভজন হয়ে গেলে শাস্ত্রের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে হয়। এখন বুঝলি তো?

 

( শ্রীজীবনকৃষ্ণের দ্বারা অষ্টাবক্র সংহিতার আত্মজ্ঞান ও মুক্তিলাভ নতুন অর্থ পেল। আমরাও তাঁর নির্দেশিত আলোকে শাস্ত্রের নতুন অর্থ পেলাম, হৃদয়ঙ্গম করলাম, এবং তাঁর মধ্যে দিয়ে নিজেদের মধ্যেও এই অনন্য মুক্তির স্বাদ উপলব্ধি করলাম। )      

No comments:

Post a Comment

শ্রীজীবনকৃষ্ণের অমৃত কথাসার প্রথম অংশ

১৯৫০ থেকে ১৯৫৩ সালের কিছু কথা সংকলিত করা হয়েছে শ্রীজীবনকৃষ্ণ সংশ্রয় থেকে। যেহেতু সেখানে দিনলিপিতে তারিখের উল্লেখ নেই, তাই এখানে তারিখের উল্ল...