শ্রী জীবনকৃষ্ণ বিচিন্তা
শ্রীঅবলাকান্ত দত্ত
১২/০২/১৯৭৩
জন্মসূত্রে মনুষ্য জীবন। এ সত্য অস্বীকারের উপায় নেই। তবে ঈশ্বর বা ভগবানত্বে উত্তরণই যে এ জীবনের উদ্দেশ্য, ঈশ্বরই একমাত্র বস্তু ও বাস্তব সত্য, এই বোধ এসেছে প্রচলিত ধর্মের ঘোলা জলে হাবুডুবু খেয়ে জীবনের সম্ভাবনাপূর্ণ বছরগুলো পেরিয়ে প্রৌঢ়ত্বের প্রথম পাদে ভগবান শ্রীজীবনকৃষ্ণের কৃপা সান্নিধ্যের পর।
অহেতুকী এই কৃপা। কিন্তু কুড়িয়ে পাওয়া এই মহা প্রাপ্তিকে জীবন্ত ও জাগ্রত রাখার জন্য কী করেছি বা কতটুকু সময় দিতে পেরেছি তার অনুশীলনে?
এটি আমাদের প্রতিদিনের জিজ্ঞাসা। শ্রীমুখ উচ্চারিত অমোঘ সত্য বারবার শুনেছি, "বাবা ষোলআনা দিলে তবে ষোলআনা লাভ"। নির্মম নিক্তি-মাপা হিসেব আত্মিক গণিতশাস্ত্রের পরিমাণে প্রাপ্তির নিরূপণ।"
তাই বড় সংকোচ বড় দ্বিধাজড়িত মানসিকতা দেখা যায় শ্রীজীবনকৃষ্ণ কেন্দ্রিক কোনো ভাবনাকে ভাষার রূপ দিতে গেলে। ভয় হয় পাছে সত্যকে করি খর্ব। বাস্তব কল্পনার ধোঁয়ায় হয় মলিন।
শ্রীজীবনকৃষ্ণের অভিনব আত্মিক দর্শনের সম্যক উপলব্ধি বোধের প্রমাণ, হওয়া, পাওয়া নয়। আবার সেই হওয়া ও কিন্তু সাক্ষ্য-প্রমাণ সাপেক্ষ। আমার আত্মিক উন্নয়নের স্তর বা পর্যায়ের স্বরূপ কী, আপনার কাছে প্রতিভাত হবে স্বপ্নে বা ধ্যানে দর্শনের মাধ্যমে। আবার আপনার অবস্থাও একই ভাবে দেখে আমি দেবো সাক্ষী। তবে ঠিক হলো যেমনটি আমরা দেখেছি স্বয়ং শ্রীজীবনকৃষ্ণের প্রতিটি অনুভূতির বেলায়। একাধিক লোকের সাক্ষ্য প্রমাণ ছাড়া কোন দর্শন অনুভূতিকে তিনি মুক্তমনে গ্রহণ করতেন না।
ভগবান শ্রী জীবনকৃষ্ণের প্রাণের প্রদীপটি সদা অনির্বাণ। অগণিত মানুষের আঁধার ঘর আলোকিত হয়েছে সেই দীপশিখার স্নিগ্ধ আত্মিক আলোয়, তাঁর মানবদেহে অবস্থানকালে--তাঁকে দেখে আর না দেখে, বিনা আয়াসে আপনা থেকে। আবার তাঁর মরদেহ ত্যাগের পর যারা তাঁকে দেখেছেন, তাঁদের সঙ্গ করে বা তাঁর জীবনবেদ 'ধর্ম ও অনুভূতি' গ্রন্থ অধ্যয়ন করে কত মানুষের কত না দর্শন ও অনুভূতি হয়েছে ও হচ্ছে 'মাণিক্যে' প্রকাশিত পাঠচক্রের অনুভূতিতে এ কথার সত্যতা প্রমাণিত। এ এক অভিনব আত্মিক সংক্রমণ। ধর্মজগতে এর দ্বিতীয় নজির আছে বলে জানা নেই।
এতসব দেখার পরও সেই জিজ্ঞাসার জট খোলে কই? এই আত্মিক ধর্ম-যজ্ঞে নিজের কী ভূমিকা? ভগবান শ্রীজীবনকৃষ্ণের আত্মিক অবদানকে বোধ করে, উদ্বুদ্ধ হয়ে কর্মের দ্বারা তাকে প্রতিষ্ঠার প্রয়াস বা জীবনের দ্বারা সেই অমোঘ সত্যের প্রচারের প্রচেষ্টা কতটুকু করেছি, এই জিজ্ঞাসার জবাবে বলতে হয়--করিনি। কিছু করতে পারিনি। আত্মসমীক্ষা বলে, যতটুকু কৃপা পেলে ব্যক্তি জীবনে তাঁর প্রচারের সনদ মেলে ততটুকু প্রাপ্তি হয়নি। তাই এই ব্যর্থতা। তাই বলতে হয় জীবনকৃষ্ণের ভাবধারার কেবল আলোচনা করতে পারি। তাঁর সম্যক রূপায়ন অপরের কাছে লেখার মাধ্যমে পরিবেশনের যোগ্যতা থেকে আমি বঞ্চিত।
সেইজন্যই যোগসুত্র শূন্য খাপছাড়া এই আলোচনার চেষ্টা।
যদি কেউ প্রশ্ন করেন -শ্রীজীবনকৃষ্ণের সঙ্গ করে কি পেয়েছো? বিনা দ্বিধায় সঙ্গে সঙ্গে বলবো কদমতলার ঘরে ভগবান দর্শনের সৌভাগ্য লাভ করেছি। বিনা সাধনে দীর্ঘকালের সঞ্চিত ধর্মীয় সংস্কাররূপী বন্ধন, যেগুলোকে এতকাল শাশ্বত ও সনাতন বলেই প্রতীতি ছিল, সেগুলো থেকে মুক্ত হয়েছে মন। মুক্তকণ্ঠে ঘোষণার সামর্থ্য লাভ করেছি, মানুষের দেহে নিদ্রিত ভগবানের অস্তিত্ববোধ ও তাঁর মহাজাগরণের প্রথম পথিকৃৎ ভগবান শ্রীজীবনকৃষ্ণ।
মঠ মন্দিরে দেবতা ও ঈশ্বরের উপস্থিতির অন্ধবিশ্বাস আর দীক্ষা আর গুরুবাদের মোহমুক্তি ঘটেছে। তাছাড়া বেশ কিছু সংখ্যক বিভিন্ন বয়সের সাধারণ মানুষের সঙ্গে পরিচয় ঘটেছে যারা শ্রীজীবনকষ্ণের কৃপাধন্য। তাঁদের অনুভূতি অসাধারণ। এই অশান্ত সামাজিক ও রাষ্ট্রিক পরিবেশেও তাঁরা নিরুদ্বিগ্ন জীবনযাপন করে চলেছেন।
মাঝে মাঝে তাঁদের কাছে বসতে পেয়ে এ সংসারের উত্তাপ থেকে সাময়িক মুক্তি মেলে।
এই খাপছাড়া বিচিন্তার ছেদ টানার আগে একটি করে শ্রীজীবনকৃষ্ণ কেন্দ্রিক দর্শন ও বাস্তব ঘটনার উল্লেখ করছি। কয়েক মাস মাত্র কদমতলার ঘরে যাওয়া আসা করছি। স্বপ্নে ও ধ্যানে নিত্য নতুন দর্শন ও অনুভূতি হয়ে চলেছে। একদিন ধ্যান বেশ জমেছে। মুদ্রিত চোখে দেখছি স্নিগ্ধ আলোয় আলোকিত ঘর। আমাকে বেষ্টন করে বিভিন্ন বয়স ও পরিচ্ছদের কয়েকটি আমারই জীবন্ত মূর্তি ধ্যানস্থ। চোখ খুলেও দেখি তারা আমাকে ঘিরে বসে আছে। মুদ্রিত তাদের চোখ। প্রত্যেকের শরীর থেকে আলোক ঠিকরে পড়ছে।
স্বপ্নটি হচ্ছে -ধ্যানস্থ আমি। সামনে একই সূত্রে গাঁথা কয়েকটি বিভিন্ন বর্ণের পদ্ম শূন্যে ঝুলছে। উর্দ্ধে যেখানে মালাটি শেষ হয়েছে সেখানে পদ্মাসনে আসীন শ্রীজীবনকৃষ্ণ। মুখে মৃদু হাস্য। আমি মালা বেয়ে উপরে উঠে চলেছি। কষ্ট হচ্ছিল, তিনি স্মিত হাস্যে আমাকে তাঁর কাছে পৌঁছনোর প্রেরণা দিচ্ছেন। চেষ্টা করেও কাছে পৌছতে পারিনি। কাছাকাছি যেতেই স্বপ্ন ভেঙে গেল। এই স্বপ্ন ও দর্শনের কথা তাঁকে বলেছি। ব্যাখ্যাও তিনি দিয়েছিলেন, কিন্তু আজ তা মনে নেই।
ঘটনাটি হচ্ছে, প্রথম দর্শনের পর নানা অনুভূতি ও দর্শন হলেও পুরো তৃপ্তি পাচ্ছিলাম না। শ্রীজীবনকৃষ্ণের স্বরূপটি জানার বড় বাসনা। সংসারের নানা দায়-দায়িত্ব মাথায় নিয়ে দপ্তরের কাজের পর ক্লান্ত দেহে যেতাম কদমতলায়। তাই কোনো কোনো দিন পাঠ শেষ হবার আগেই উঠে আসতে হতো। একদিন পাঠ চলেছে। সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। উনি বাইরে থেকে ফিরে খাটে বসতে যাচ্ছেন, এমন সময় বিনীতভাবে ঘরে ফেরার অনুমতি চাইতে শ্রীজীবনকৃষ্ণ দ্রুতপায়ে আমার দিকে এগিয়ে এসে আমাকে সবলে বুকে চেপে ধরে কম্বু কণ্ঠে কঠোর নির্দেশের ভঙ্গিতে ঘোষণা করলেন, "কোথায় যাবি বাবা? আমি যে তোকে গ্রাস করেছি!" ওঁর সেই আলিঙ্গনের প্রতিক্রিয়া ভাষার রূপ দেওয়া অসম্ভব।
আমার সারা দেহে কী রোমাঞ্চ! সে কী শিহরণ! চেষ্টা করেও চোখের জল চাপতে পারিনি।সারা দেহমনে সে কী অনাস্বাদিত পুলক!
পঞ্চম বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা
No comments:
Post a Comment