Sunday, October 11, 2020

রিলিজিয়ন এন্ড রিয়ালাইজেশান

 

রিলিজিয়ন এন্ড রিয়ালাইজেশন

কুড়িয়ে পাওয়া মাণিক বিরচিত

 

সূচনা – ১

বেদের সত্য অথবা মানব দেহে রাজ যোগের স্ফুরণ অথবা মানব দেহের অন্তর নিহিত প্রানশক্তির বিকাশ ও ব্যাস্টি জনিত অনুভূতি এবং জগতব্যাপিত্ব এর মাধ্যমে  সেই মানবের বিশ্বমানবে বা উত্তম পুরুষে উত্তরণ

এই সুন্দর বিশ্বে, প্রতিটি মানব হৃদয়ে যে সত্য অতীতে ধ্বনিত হয়েছে ও ভবিষ্যতে ও হবে, আমি সেই শাশ্বত সত্যের কথাই বলব ।

এই সত্য চিরন্তন । অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ তিন কালেই এর প্রকাশ । এই সত্যের কথাই এখানে লিখব ।

এটি মানব দেহের শাশ্বত ও চিরন্তন রীতি, ধর্ম

সাধারণ ভাবে একে ধর্ম বলা হয় প্রথমে একটি মানব দেহে এর জন্ম হয় এবং তারপরে এটি সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে ।

বেদে এই সত্যের কথাই বলা হয়েছে । যে বৈদিক সত্য একটি মানব দেহে স্ফুরিত হয়ে পূর্ণতা পায় তার কথা বলা হবে। কীভাবে এটি ক্রিয়াশীল হয় ও পুর্ণতাপ্রাপ্তির পর ই বা কি অনুভূতি হয় তারই ঐ বিবরণ দেওয়া হবে । বেদে একেই ঋতম্ বলা হয়েছে । অতএব এটি সত্য । এই সত্যের প্রমাণ পাওয়া যায় যখন বিশ্বব্যাপিত্বে উত্তীর্ণ হওয়া যায় । ( স্বেন রূপেণ অভিনিস্পদ্যতে ) । ঋতবান এই মানুষটির  রূপ অসংখ্য নরনারী শিশুর দেহে ফুটে ওঠে ও এর সত্যতা প্রমাণ করে । এই বিশ্বব্যাপিত্ব সার্বজনী্ন  । যুবা বৃদ্ধ সকল কার । কারণ যাঁর সহস্রারে এই পরম জ্যোতি প্রকাশিত তিনিই বিশ্ব মানব ।

ইহাই  ‘অহম ব্রহ্মাস্মি’

   আহা, বেদের ঋষিরা জগত কে কি বস্তুই দান করেছেন ! আমিই সেই সৎ এবং পরম পুরুষ । অতীতে ঋষিরা এই সত্য উপলব্ধি করেছেন ও উদার হৃদয়ে তাঁদের এই ঐশ্বর্য মানব জাতি কে দান করেছেন ।

    আমরা বিস্মিত ও পুলকিত চিত্তে এখন ও অনুভব করছি জগতের প্রতিটি মানব হৃদয়ে কীভাবে এই সত্য মধ্যাণ্হ সূর্যের দীপ্তিতে উদ্ভাসিত হচ্ছে আর মানব জাতিকে এই এক ও একত্বের দ্বারা পরম শান্তি দান করছে । এই সত্য অপ্রতিহত, কেননা এটি ব্যাক্তিগত অনুভূতিতে ঋদ্ধ । মানুষ নিজেই অনুভূতিতে এই সত্য কে উপলব্ধি করে ও একত্বের প্রমাণ বহন করে । দ্রষ্টা তখন শুধু সাক্ষী থাকেনা বরং নিজেও এই বৈদিক সত্য কে মুক্তকণ্ঠে ঘোষণা করে ।

  ‘তত্বমসি’ শুধুই একজনের ব্যাক্তিগত উপলব্ধি হয়ে না থেকে বরং পরিণত হয় –

  ত্বং স্ত্রী , ত্বং পুমানসি , ত্বং কুমার উত বা কুমারী , ত্বং জীর্ণ দণ্ডেণ বঞ্চসি , ত্বং জাতো ভবসি বিশ্বতোমুখঃ । (শ্বেতাশ্বতর উপনিষষদ / ৪/৩ ) – এই উপলব্ধিতে ।

অর্থাৎ যদি কারো ব্রহ্মত্ব লাভ হয় তবে হাজার হাজার মানুষের দেহে ৺তার জীবন্ত রূপ ফুটে উঠবে ও ঘোষণা করবে বেদের সেই সত্য --- ত্বং জাতো ভবসি বিশ্বতোমুখঃ ।

     বেদের এই সত্য সমগ্র মনুষ্যজাতির জন্য । এটি কোন মতবাদের গণ্ডী তে সীমিত নয় । মানুষের জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত এই আত্মিক নিয়মের দ্বারা পরিচালিত হয় । শুধু তাই নয় , এটি তার হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন । এই সত্য প্রমাণ করে যে বেদ শুধু হিন্দুদের একার সম্পদ নয় । পুনরায় বলছি এটি নির্দিষ্ট কোন জাতি বা ভারতের একার নয় । এটি সমাজের নিম্নবর্গ বা উচ্চবর্গ সবার জন্য । সমগ্র বিশ্বের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত পর্যন্ত এর প্রকাশ ।

    ‘অহম ব্রহ্মাস্মি’ । বেদে তাই বলা হয়েছে । কীভাবে এই সত্য একজন মানুষের দেহে প্রতিষ্ঠিত হয় এখন তাই দেখা যাক । বেদ বলছে --- এবম এষ সম্প্রসাদঃ অস্মাৎ শরীরাৎ সমুত্থায় , পরম জ্যোতিঃ উপসম্পদ্য , স্বেণ রূপেণ অভিনিস্পদ্যতে , সঃ উত্তমপুরুষঃ ।                                                                         ছান্দোগ্য উপনিষদ ৮/১২/৩                                                           

    এই মন্ত্রটির আক্ষরিক অর্থ এইরূপ – এবং এই মানুষটি নিম্নভুমি থেকে সপ্তম ভুমিতে গিয়ে সেই পরম জ্যোতি লাভ করেন ও তাঁর চিন্ময় রূপ অসংখ্য  মানুষের দেহে ফুটে ওঠে ও তাঁর ব্রহ্মত্বের প্রমাণ দেয় , যেহেতু তিনি সেই সৎ ও এক । (একং সৎ , স একঃ ) ।                                                                                                                                                          

    এই মন্ত্রটির পাঁচটি ভাগ । প্রাণশক্তির নিম্নভূমি থেকে সপ্তম ভূমিতে সহস্রারে ব্রহ্মত্বের যাত্রা পথে অসংখ্য অনুভূতি হয় ।  বৈচিত্র্যে সেগুলি নানা রকমের । এবং জগৎব্যাপিত্বে এই ব্রহ্মত্বলাভকারী নিজের ব্রহ্মত্বের প্রমাণ বহন করেন  ও উত্তম পুরুষে পরিবর্তিত  হন -------                                                                                                                                                                                                                                      

১) এবম এষ সম্প্রসাদঃ,

২) অস্মাৎ শরীরাৎ সমুত্থায় ,

৩) পরম জ্যোতিঃ উপসম্পদ্য ,

৪) স্বেণ রূপেণ অভিনিস্পদ্যতে ,

৫) সঃ উত্তমপুরুষঃ ,                          ছান্দোগ্য উপনিষদ ৮/১২/৩

    এই মন্ত্রটির মর্মার্থ এই যে – প্রাণশক্তি মহাবায়ু রূপে সপ্তম ভূমিতে প্রবেশ করে ও পরম জ্যোতি লাভ করে এবং প্রমাণ স্বরূপ সেই ব্রহ্মত্বলাভকারীর চিন্ময় রূপ অসংখ্য নরনারীর সহস্রারে ফুটে উঠে জানিয়ে দেয় তিনিই সেই এক – ব্রহ্ম ।          

সংক্ষেপে, বেদের এই মন্ত্রটি কীভাবে একজন জীবন্ত মানুষ ব্রহ্মত্ব লাভ করেন তার প্রমাণ দেয় । এটি হল --- ক) বেদের পরাবিদ্যা, একে খ) ব্রহ্ম বিদ্যা, গ) অগ্নিবিদ্যা, ঘ) আত্মবিদ্যা, ঙ) শারীরবিদ্যা, চ) মধুবিদ্যা, ইত্যাদি নামেও উল্লিখিত । 

 

প্রথম পরিচ্ছেদ

 

১) এবম এষ সম্প্রসাদঃ --- এবং সেই মানুষটি, অতএব – কে এই মানুষ ? হ্যাঁ , তিনি একটি মার্কামারা মানুষ । এই মার্কা বা চিহ্ন অন্তর থেকে সেই পরমব্রহ্ম বা এক তাঁকে দিয়েছেন ।

       যমেবৈষ বৃণুতে তেন লভ্যঃ । বেদের এই মন্ত্রের অর্থ প্রকাশিত হয় অনুভূতিতে ও এই চিণ্হে প্রমাণিত হয় । আত্মা যাঁকে বরণ করেন তিনিই সেই আত্মাকে লাভ করেন । এর অর্থ  অন্তর্যামী আত্মার স্বতঃ স্ফূর্ত প্রকাশ । এর ব্যাখ্যা একমাত্র বংশগতি ছাড়া আর কিছু দিয়েই করা যায়না । তাই বেদের অনুভূতি বলছে --                                            মানব দেহে ব্রহ্ম পুর থেকে সেই উত্তম পুরুষ চিন্ময় রূপে দ্রষ্টার কাছে আসেন ও রাজযোগ শিক্ষা দেন । এই মানুষটি সম্প্রসাদ । ইনি একজন সাধারণ মানুষ নন । পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি ধর্ম গ্রণ্থেই ঈশ্বর এবং দেবদূতেদের আগমন ও বানীর উল্লেখ আছে । আসলে এটি দেহের মধ্যে হয় । দ্রষ্টা বাইরে প্রতিফলিত করে দেখে । এই চিন্ময় মূর্তি ঈশ্বরীয় জ্যোতিতে তৈরী । এই মূর্তি কথা বলেন ও নির্দেশ দেন । এমন কি ইনি একটি জীবন্ত মানুষের মূর্তি তে দেখা দেন । কিন্তু তাঁকে দেহ থেকে বার হতে দেখা যায় ও তিনি পুনরায় দেহেতে মিশে যান । এই দর্শন বাইরে হয়না । দ্রষ্টা নিজের দেহের মধ্যে এই দর্শন করেন । বাইরে কেউ এই দর্শন করিয়ে দিতে পারেননা । এই মনুষ্য দেহই সমস্ত অনুভূতির আধার । ব্রহ্মপুর থেকে দেহে আত্মার প্রথম প্রকাশ ও সাধনার ক্রম গুলি আলোচনার প্রয়োজন । দ্রষ্টার প্রাণশক্তি স্বতঃস্ফূর্ত ও নির্বাধ গতিতে তার অজ্ঞাতে তার সহস্রারে যায় ও একটি মানুষের রূপে নেমে এসে দ্রষ্টার কারণ শরীরে দেখা দেয় । দ্রষ্টা এইভাবে কৃপালাভ করেন ।

 

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

 

   শুরু করা যাক দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ।                                                                                                                                    

     ) অস্মাৎ শরীরাৎ সমুত্থায়এর আক্ষরিক অর্থ হল শরীর হইতে উত্থান করিয়া --, অর্থাৎ সম্প্রসাদের মন এবার যাত্রা শুরু করল । কীভাবে এবং কেন সম্প্রসাদের মন উর্দ্ধগতি লাভ করে --- ।                                                                                           প্রথমেই মনে উদয় হবে , ব্রহ্মপুর থেকে আগত সেই পরম পুরুষ সম্প্রসাদ কে রাজযোগ শিক্ষা দিয়েছেন । এর ফলে সম্প্রসাদ এমন একটি যোগপযোগী দেহ লাভ করেছেন যে প্রাণশক্তি ঊর্ধ্বগতি লাভ করেছে । এভাবে প্রাণশক্তি দেহের পাঁচটি কোষ ও সাতটি ভূমি অতিক্রম করে । বেদে এই পাঁচটি কোষের নাম আছে । এগুলি হল ----

ক) অন্নময় কোষ  , স্থুল দেহ ।

খ) প্রাণময় কোষ , বা প্রাণশক্তি এই কোষে দেখতে পাওয়া যায় ।

গ) মনোময় কোষ , এখানে নানারূপ জ্যোতি দর্শন হয় ।

ঘ) বিজ্ঞানময় কোষ , এই কোষে মন এলে ব্রহ্মপুর থেকে আগত মানুষটি ভগবান দর্শন করিয়ে দেন ও দ্রষ্টার জ্ঞান হয় – আমি এই দেহ নই , আমি ই সেই ( সোহহম ) ।

ঙ) আনন্দময় কোষ , এটি হল ব্রহ্মানন্দের স্থান ।

ক) অন্নময় কোষের কোন ভূমি নাই ।

 খ) প্রাণময় কোষে মন থাকে লিঙ্গ গুহ্য নাভিতে । প্রাণময় কোষের অনুভূতি হল এইরূপ – পেটের ডানদিকে স্বচ্ছ নীলাভ জ্যোৎস্না জড়িত জল কলকল করতে দেখা যায় ।

 গ) মনোময় কোষ হল চতুর্থ ভূমি হৃদয় । অনুভূতি – একটি জ্বলন্ত দীপ বা মশাল বা প্রজ্জ্বলিত অগ্নি, বা উদীয়মান সূর্য । কেউ কেউ একটিই দেখে কার বা সব কটি দর্শন হয় । এছাড়াও চতুর্থ ভূমির একটি বাহ্যিক দর্শনও হয় । দ্রষ্টা যেদিকেই তাকান ঈশ্বরীয় জ্যোতিতে সব কিছু চিন্ময় দেখে । আসলে তার চোখেই এই জ্যোতি আর তাই চোখে ন্যাবা লাগলে যেমন হয় তার সেইরূপ চিন্ময় দর্শন হয় ।

  ঘ) বিজ্ঞানময় কোষে তিনটি ভূমি – পঞ্চম, ষষ্ঠ, ও সপ্তম । পঞ্চম ভূমিতে মন কণ্ঠে আসে । অনুভূতি হল – ১) দ্রষ্টা নিজে নিজেকে আধখানা পুরুষ ও আধখানা নারী দেখে । এটি হল অর্ধনারীশ্বর দর্শন । ২) আকাশ দর্শন হয় । একে বলে ‘খ’ । এর অর্থ বিশ্বব্যাপিত্ব । এটি প্রতীকে সমষ্টির অনুভূতি ( একটি মানুষের রূপ অসংখ্য মানুষের দেহে ফুটে ওঠে ) । ৩) পঞ্চম ভুমিতে মন উঠলে আর একটি বিশেষ অবস্থা হয় । যার মন পঞ্চম ভূমিতে উঠেছে সে ঈশ্বরীয় কথা ছাড়া অন্য কথা বলবে না । অন্য কথা হলে সে সেখান থেকে উঠে যাবে ।  ষষ্ঠ ভূমি – প্রাণশক্তি আর ও উপরে উঠে কপালে দুই ভ্রুর মাঝখানে আসে । অনুভূতি হল – ১) দ্বিদল পদ্ম – আক্ষরিক অর্থে একজোড়া পদ্ম, কিন্তু আসলে একজোড়া আধ ইঞ্চি ব্যাসের চক্র । চক্র গুলি ঈশ্বরীয় জ্যোতিতে পূর্ণ বা আবৃত । চক্র দুটি ওপরে উঠে দুই ভ্রূর মাঝে মিলিয়ে যায় ও একটি মাত্র চক্র ভেসে ওঠে । সেই চক্রটির মাঝে একটি ছোট বুদ্ধমুর্তিদেখা যায় । এই চক্রটিকে বলে জ্ঞাননেত্র বা তৃতীয় নয়ন । ২) প্রাণশক্তি এবার সপ্তম ভুমির দ্বারে উপনীত । কিন্তু সেই দ্বারে এক অতি সুন্দরী নারী আছেন । তাঁর গায়ের রঙ প্যান্সি ফুলের মত নীল । তিনি নৃত্যপরা , এরপর তিনি অদৃশ্য হয়ে যান । ৩) অবশেষে, একটি রেশমের পর্দার আড়ালে জ্যোতির্ময় উদীয়মান সূর্য

তৃতীয় পরিচ্ছেদ

 

   এরপর বৈদিক মন্ত্রটির তৃতীয় অংশ – পরমজ্যোতিঃ উপসম্পদ্য , অর্থাৎ সেই পরম জ্যোতি কে লাভ করিয়া ।    

    সপ্তম ভূমি – সম্প্রসাদের মন সপ্তম ভূমিতে পৌঁছিয়েছে । এখানে ভগবান দর্শন হয় । একে ত্রিপুটী অবস্থা বলা হয় । খ্রিস্টান ধর্মে একেই ট্রিনিটি বলে । এই ত্রিপুটী অবস্থায় তিনটি বস্তু বিজড়িত থাকে ।

   ১) জ্ঞান – জ্ঞানের ঘনমুর্তি । তিনিই সেই মানুষ যিনি সহস্রার বা ব্রহ্মপুর থেকে দ্রষ্টার দেহে নেমেছিলেন অথবা এই প্রথম এক অজানা পুরুষের রূপে দেখা দিলেন । কিন্তু দ্বিতীয় প্রকার দর্শন টিতে ভুল আছে এবং এটি অত্যন্ত দুর্বল ও বেদে এর স্বীকৃ্তি নেই ।

     ২) জ্ঞেয় – জ্ঞানের বিষয় । এটি ভগবান স্বয়ং ।                                                                                                                   

     ৩) জ্ঞাতা – যিনি জ্ঞানলাভ করবেন ।                                                                  একটি অনন্ত জ্যোতিঃ সমুদ্র , খুব  সুন্দর ও শান্ত , যেন আনন্দ সাগর --- এই সমুদ্রের একদিকে ব্রহ্মপুর থেকে আগত মানুষটি দাঁড়িয়ে । তিনি তাঁর ডান হাতটি তুলে তর্জনী দিয়ে দেখিয়ে দেন একটি সুক্ষ নীল রেখা দ্বারা সীমায়িত বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠবৎ জ্যোতি সেই জ্যোতি সমুদ্রের মধ্যে , ও বলেন – এই ভগবান , এই ভগবান দর্শন । এই বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠবৎ জ্যোতিঃপুঞ্জের মধ্যে জ্ঞাতা ও জ্ঞেয় দুজনেই আছেন । জ্ঞাতা এর মধ্যে থেকেই সবকিছু দেখছেন ও শুনছেন । এরপর ব্র্রহ্মপুরের মানুষটি এর মধ্যে মিলিয়ে যান ।

 

চতুর্থ পরিচ্ছেদ

 

                চতুর্থ  অংশে পৌঁছলাম । এটি এখন আর সম্প্রসাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় । বরঞ্চ সম্প্রসাদ এখন সেই পরমপুরুষে পরিবর্তিত । প্রতিটি মানুষের বিজ্ঞানময় কোষে অথবা কারণ শরীরে বা ষষ্ঠ ভূমিতে এখন তাঁর অবস্থান । সুতরাং বৈদিক মন্ত্র ‘স্বেন রূপেন  অভীনিস্পদ্যতে ’ বা ব্রহ্মসূত্রের ‘ সম্পদ্য আবির্ভাবঃ ’ প্রতিষ্ঠিত হল অর্থ হল – একটি মানুষের ব্রহ্মত্বলাভের প্রমাণ স্বরূপ অগণিত মানুষের দেহে সেই ব্রহ্মত্বলাভকারীর চিন্ময় রূপ ফুটে উঠে জানিয়ে দেবে এই সত্য । জৈমিনি বলছেন – বিশ হাজার হলেও হবেনা, সংখ্যাতীত হওয়া চাই ।                              ব্রহ্মত্বলাভকারীর রূপ ফুটে উঠবে অগণিত মানুষের দেহে। তারা জানবে তাঁকে । যারাই তাঁর সংস্পর্শে আসবে তারাই তাঁকে দেখবে ও তিনিও সকলকে তাঁর অন্তরে দেখবেন             সর্বভূতস্থম্ আত্মানং সর্ব ভূতানি চ আত্মনি / সম্পশ্যন ব্রহ্ম পরমং যাতি নান্যেন হেতুনা ।(কৈবল্য উপনিষদ)        

   যিনি ব্রহ্মপদ লাভ করিয়াছেন তিনি প্রমাণ বহন করিবেন যে এক ই বহু হইয়াছে ও বহু এক হইয়াছে। কাশ্মিরী শৈববাদ। Pantheismএটি কাশ্মিরী শৈববাদের ঈশ্বর তত্ব ও সদবিদ্যা তত্ব । বৈদিক মন্ত্রটির অর্থ হল – ‘হাজার হাজার মানুষ তাঁকে অন্তরে দেখবে ও তিনিও অসংখ্য মানুষকে নিজের ভিতরে দেখবেন। এটি পরমব্রহ্মের বৈশিষ্ট্য। অন্য আর কিছুই নয়’ এটি একটি অলৌকিক রহস্য, যেহেতু একটি জীবন্ত মানুষকে হাজার হাজার মানুষের অন্তরে দেখাটা রহস্যএই রহস্যের সমাধান ও এর প্রকৃতি প্রকাশের কাজটি বিজ্ঞানীদের জন্য তোলা রইল

 

পঞ্চম পরিচ্ছেদ

 

এবার এর পঞ্চম পর্য্যায় । এটি হল – সঃ উত্তমপুরুষঃ । অর্থ হল – তিনি সেই উত্তমপুরুষ । সনাতন ঋষিরা মানবজাতি কে এই সত্য দান করেছেন । প্রতিটি মানুষের মধ্যে ব্রহ্মত্ব প্রচ্ছন্ন আছে । কখন তা প্রকাশ পায়  ও ‘ত্বং জাতো ভবসি বিশ্বতোমুখঃ’ দ্বারা প্রমাণিত হয় । বেদ বলছে এটি শাশ্বত সত্য ।

                                                        

                          শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ

 

             সূচনা - ২                                        ব্যাষ্টি  ও সমষ্টি 

এখানে যৌগিক ব্যাষ্টি  ও সমষ্টির কথা আলোচনা করব । এটি রাজযোগের উপর প্রতিষ্ঠিত । একটি মানুষের জীবনে রাজযোগের স্ফুরণ স্বতঃস্ফুর্ত ভাবে ঘটে । সাধনার দ্বারা লব্ধ হয়না কখনো । সমষ্টি বা বিশ্বব্যাপিত্ব সম্বন্ধে বেদ বলছে –  

         সর্বভুতস্থম্ আত্মানম্ সর্ব ভুতানি চ আত্মনি , সম্পশ্যন ব্রহ্ম পরমং যাতি নান্যেন হেতুনা ।       অর্থ – সেই একজন মানুষ সকলের মধ্যে নিজেকে ও সকলে তাঁকে নিজেদের মধ্যে দেখবেন । এটিই পরমব্রহ্মের প্রমাণ। এছাড়া আর কিছুই নেই । সাদা কথায় , যদি কোন মানুষের ব্রহ্মত্ব লাভ হয় তাহলে অসংখ্য মানুষ তাঁকে নিজেদের মধ্যে দেখবেন ও তিনিও জগতের মানুষকে তাঁর নিজের মধ্যে দেখবেন । বেদে একেই ব্রহ্মত্ব বলা হয়েছে । এখন কথা হল, কীভাবে একটি জীবন্ত মানুষ ব্রহ্মত্ব লাভ করেন বা পরমব্রহ্ম হন -- মানব দেহে রাজযোগের মূল নীতি অনুসরণ করে । বেদে এর বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ আছে । সেটি হল – এবম্ এষ সম্প্রসাদ অস্মাৎ শরীরাৎ সমুত্থায় পরম জ্যোতিঃ উপসম্পদ্য স্বেন রূপেণ অভীনিস্পদ্যতে। ---- ছান্দোগ্য উপনিষদ  ৮/১২/৩ ।


বেদের এই মন্ত্রটির দুটি তাৎপর্য্য । একটি ব্যাষ্টি অন্যটি সমষ্টি । ১) ব্যাষ্টিকে ব্যাখ্যা করেছে – এবম্ এষ সম্প্রসাদোঃ অস্মাৎ শরীরাৎ সমুত্থায় পরম জ্যোতিঃ উপসম্পদ্য ।              ২) যেখানে সমষ্টির কথা বলা হয়েছে , টা হল --- স্বেণ রূপেণ অভীনিস্পদ্যতে , সঃ উত্তমপুরুষঃ ।

       ক) ব্যাষ্টি  কি ?    ------- একটি মানুষের নিজস্ব অনুভূতি হল ব্যাষ্টি । তিনি নিজেই এই দর্শনের কথা বলেন । তোমাকে তা শুনে বিশ্বাস করে নিতে হবে । কোনো সাধারন মানুষ বা শ্রোতার পক্ষে এই অনুভূতি বা উপলব্ধি হওয়া সম্ভব নয় । কোনো প্রমাণ বক্তা দিতে পারেন না তাঁর এই অনুভূতির সপক্ষে । মানুষকে তাঁর কথা বিশ্বাস করে নিতে হবে । তারা বিশ্বাস করে ও যেহেতু এই উপলব্ধি তাদের পক্ষে হওয়া অসম্ভব তাই তারা অন্ধ ভাবেই বিশ্বাস করে । সকলের হয়না বলে মানুষ নিঃশর্ত ভাবে মেনে নেয় ও স্বস্বম্মোহিত হয়ে ভুল পথে পরিচালিত হয় ।    

       খ) সমষ্টি কি ? --------বেদের ঋষিরা বলছেন যে বেদে উল্লিখিত ‘যমেবৈষ বৃণুতে তেন লভ্যঃ’ । অর্থাৎ বিদ্বতে যদি তোমার দেহে পূর্ণ রূপে নিখুঁৎ ব্যাষ্টির সাধন বা অনুভূতি হয় , যার অর্থ হল আপনা হতে তমার মধ্যে ব্রহ্মের বিকাশ , তাহলে পরবর্তী স্তর হল বিশ্বব্যাপীত্ব । এটি অবশ্যম্ভাবী । বিশ্বব্যাপিত্বের চিন্হ কি ? 

          বেদ অনুসারে ------- ১) সর্বভূতস্থম্ আত্মানং সর্ব ভূতানি চ আত্মনি / সম্পশ্যন ব্রহ্ম পরমং যাতি নান্যেন হেতুনা । ব্রহ্মত্বলাভকারীর রূপ সকলে তাদের অন্তরে (তাদের দেহের মধ্যে) দেখবেন এবং তিনি নিজে সকলকে তাঁর মধ্যে (নিজ দেহে) দেখবেন । এছাড়া অন্য কিছুই নয় । ২) যস্তু সর্বানি ভূতানি আত্মন্যেবানুপশ্যতি / চাত্মানং সর্ব ভূতেষু ন ততো বিজুগুপ্সতে । --- ব্রহ্মত্বলাভকারী ব্যাক্তি সকলের মধ্যে নিজেকে ও নিজের মধ্যে সকলকে যখন দেখেন তখন তিনি নিজেকে আর গোপন রাখতে পারেন না । তাঁর এই ব্রহ্মত্ব জগতে ফোটে ও তাঁর প্রমাণ বহন করে । বস্তুতঃ কোন শুদ্ধ ও পবিত্র মানুষের জীবনে এমন একটি আশ্চর্য প্রমাণ জগতে প্রথম  ৩) ত্বং স্ত্রী , ত্বং পুমানসি , ত্বং কুমার উত বা কুমারী , ত্বং জীর্ণ দণ্ডেণ বঞ্চসি , ত্বং জাত ভবসি বিশ্বতোমুখঃ । যাঁর ব্রহ্মত্ব লাভ হয়েছে তাঁকে পুরুষ দেখবে , নারী দেখবে, কুমার দেখবে , কুমারী দেখবে , বৃ্দ্ধ দেখবে । সংক্ষেপে , ব্রহ্মত্বলাভকারী ব্যাক্তিকে  সমগ্র মানব জাতি তাদের দেহের মধ্যে (আত্মিকে) দেখবে । উপরিউক্ত মন্ত্রগুলির বক্তব্য এক, সুর ও এক । কিন্তু তারা সমষ্টির এক আশ্চর্য ও রহস্যময় প্রমাণ বহন করেছে – তা এক ই সঙ্গে subjective (ব্যাক্তিগত) ও objective (সমষ্টিগত) ।

       ক) subjective – তারা সকলে আমাকে দেখে , এ তাদের কাছে ব্যাষ্টির অনুভূতি । তারা যখন আমাকে বলে আর আমি শুনি তখন সেটা আমার কাছে objective ।

       খ) আমি এদের আমার মধ্যে দেখি – তারা হল subject । তারা আমার কাছ থেকে শোনে তখন তারা object । এটি পারস্পরিক । এটি বৈদিক pantheism – বাস্তব ও সত্যের উপর নির্ভরশীল । কল্পনাপ্রসূত নয় । জগতে pantheism  নামক দর্শনটি ঘোষণা করে যে এক বহু হয় ও বহু এক হয় । এই ‘এক’ কে ? যদি ভাষা সৃষ্টির থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত সন্ধান করা যায় তাহলে আমরা দেখব যে এতা একটা কল্পনা এবং এই ‘এক’ এর কোন নির্দিষ্ট প্রমাণ নেই এটি অতি পুরাতন ধারণা – এক বা ‘স একঃ’ । কিন্তু অতি অস্পষ্ট ও জগতের বুকে এর কোন নির্দিষ্ট অস্তিত্ব নেই । জগতে ঋক্ বেদেই সবচেয়ে প্রাচীন গ্রন্থ বলে বিদিত । ঋক্ বেদ বলছে ‘একং সৎ’ অর্থাৎ ‘তিনিই এক’। কিন্তু এর কোন প্রমাণ নেই অতএব আলোচনা নিষ্প্রয়োজন । এবার দেখ – জগৎসভায় দাঁড়িয়ে ঋষি যাজ্ঞবল্ক্য সমস্ত মানুষের কাছে কী ঘোষণা করছেন – তিনি মুক্তকণ্ঠে একটি অশ্রুতপূর্ব কথা ঘোষণা করছেন – ‘অহম ব্রহ্মাস্মি’ – অর্থাৎ একটি মানুষ ই ব্রহ্ম । আর তাই পিতা উদ্দালক শ্বেতকেতুকে বলছেন ‘তত্বমসি’, তুমিই সেই । পরবর্তী কালে উদ্দালক ব্যাখ্যা করছেন – তুমি পুরুষ , নারী, যুবা, যুবতী, লাঠি হাতে বৃদ্ধ । এই মানবজাতির প্রতিটি মানুষ ই তুমি ।

এই হল বিশ্বব্যাপীত্ব । এ কোন কবির কল্পনা, চিন্তা, বা আদর্শবাদ নয়, বরং এ বাস্তব ও প্রামাণিক । কারো দেহে আপনা হতে যদি রাজযোগের স্ফুরণের মাধ্যমে ব্রহ্মত্বলাভ হয় তবে বিশ্বব্যাপীত্ব প্রকাশ পাবেই ।আর রাজযোগের মাধ্যমে এই ব্রহ্মত্বলাভকারীর চিন্ময় রূপ হাজার হাজার মানুষের দেহে ফুটে উঠবে আর তারা সে কথা ঘোষণা করে তাঁকে পরম ব্রহ্মত্বে  অভিষিক্ত করবে, বা বেদের ভাষায় -- ত্বং জাত ভবসি বিশ্বতোমুখঃ ।            বেদে একে pantheism বলেছে । এটি আশ্চর্য একটি বাস্তব ঘটনা । অসংখ্য মানুষ তাদের দর্শনের কথা জানিয়ে এই পরমব্রহ্মত্বের প্রমাণ দেয় ও এই একত্বের কথা জানায় । এই বিশ্বব্যাপীত্ব ও পরমব্রহ্মত্ব ঘোষণা করে --- মানুষ প্রথম , মানুষ শেষ, ও মানুষ ই চিরকালীন, বেদের এই সত্যের ধারক বাহক ও প্রতিষ্ঠাতা ।



                                      ভূমিকা 

          কোন নূতন লোক তাঁর কাছে এলে তিনি প্রথমেই বলতেন – তুই আমাকে প্রণাম করছিস কেন ? তুই ভগবানকে চাস ? আচ্ছা, তিনি তোর ভেতরেই আছেন । প্রার্থনা কর । বল – হে ভগবান , তুমি প্রকাশ হও , আমাকে জানিয়ে দাও তুমি কেমন । দেখবি , তিনি রূপ ধারণ করে তোর কাছে আসবেন । কিছুদিন পরে লোকটি এসে জানায় – ‘মশাই, আমি আপনাকে স্বপ্নে দেখেছি’ । যারাই তাঁর সংস্পর্শে এসেছে তারাই একথা বলেছে । কেউ স্বপ্নে, কেউ ট্রান্সে , কেউ ধ্যানে , কেউ বা জাগ্রতে তাঁকে দেখেছে ।শুধু তাই নয় , তাঁর কাছে না এসে, তাঁর কথা না জেনেও অনেকে তাঁকে পঞ্চাস বছর, পঁচিশ বছর, বা বার বছর আগে তাঁকে দেখেছে । কেউ বা স্টেশনে , বাজারে , রাস্তার মোড়ে , বা ভিড় বাসে , ডাহা জাগ্রত অবস্থায় তাঁকে দেখেছে । কিন্তু যাঁকে নিয়ে এত দর্শন তিনি এসবের কিছুই জানেননা । বলেন – কই আমার সঙ্গে তো দেখা হয়নি কারু ।         মেয়েদের তাঁর কাছে আসা নিষেধ । কিন্তু তারা নিজেদের ঘরে বসে এই চার অবস্থাতেই তাঁকে দেখে । কেউ তাঁর কাছে এলে পরিবারের বাকী সকলের তাঁকে দেখা শুরু হয়ে যায় । মা, বাবা, স্ত্রী, ভগ্নী, কন্যা, পুত্র, দাসদাসীরা পর্যন্ত তাঁকে দেখে । স্বামী তাঁর কাছে আসেন , স্ত্রী থাকেন ঘরে। কিন্তু কোন কোন ক্ষেত্রে প্রথমে স্ত্রীই তাঁকে দেখেন, স্বামী দেখেন পরে। একটি ছেলে বিশ্বাস করতনা যে মেয়েরা তাঁকে দর্শন করে । একদিন সকালে, সে ঘুম থেকে ওঠা মাত্র ছেলেটির মা এসে বললেন – দেখ্, কাল রাতে , তুই হাওড়ায় যাঁর কাছে যাস তাঁকে স্বপ্ন দেখেছি । স্বপ্নে এক মহিলা আমাকে তাঁকে দেখিয়ে বললেন – এই সেই , যাঁর কাছে রোজ সন্ধ্যেবেলা তোমার ছেলে যায়। তাঁকে উচ্চনীচ, ধনী গরীব, শিক্ষিত মূর্খ নির্বিশেষে হাজার হাজার মানুষ দেখে । হিন্দু দেখে । মুসলমান দেখে, খ্রিস্টান, পারসী, বৌদ্ধ, ইহুদী, সকলেই তাঁকে দেখে । জাতি ধর্ম বর্ণ কোন বাধা নয় । পেশাগত মর্য্যাদা বা লিঙ্গ ভেদ ও বয়সের ফারাক এসব কিছুই গুরুত্বহীন । বংশানুক্রমের সংস্কার ও অপ্রয়োজনীয় । তাঁকে দেখার জন্য দরকার শুধু একটি মনুষ্য দেহ ।                             

              কিন্তু কেউই বলতে পারেনা কি করে এটি সম্ভব হয় । এই রহস্য ঘনীভূত যখন তিনি নিজে জানতে পারেননা যে এত লোক কি করে তাঁকে অন্তরে দেখে । যখন কেউ এসে বলে-  মশাই, আপনাকে দেখেছি, একমাত্র তখনই তিনি জানতে পারেন । তাঁকে ঘিরে এক রহস্যময় জগতের সৃষ্টি হয়, অথচ তিনি এ বিষয় সম্পূর্ণ অজ্ঞ । কী বিচিত্র !       

      আশ্চর্য এই যে, এই মানুষটির আত্মিক জীবনের সূত্রপাত মাত্র বারো বছর চার মাস বয়সে । তিনি নিজে জানতে না যে ভগবান কে দেখা যায় । কখনো প্রার্থনা করেননি বা ধর্মের জন্য কোন গুরু খোঁজেননি । তাঁর দর্শন অনুভূতি সব আপনা থেকে হয়েছে । কোন কৃচ্ছসাধন বা ব্রত পালন করেননি কোনোদিন । বরং অতি সাধারণ জীবন যাপন করেছেন । তাঁর নিত্যব্যবহার্য শয্যাই ছিল তাঁর আসন আর সেখানেই যা কিছু সব আপনা হতে তাঁর হয়েছে । তাঁকে কিছুই করতে হয়নি । এখনও এই তিয়াত্তর বছর বয়সেও তাঁর আত্মিক অনুভূতি হয়ে চলেছে ।      সূচনাতে তাঁর এইসব অনুভূতির কিছু কিছু বলা হয়েছে । কীভাবে আত্মা দেহ থেকে পর্য্যায় ক্রমে মুক্ত হন তার একটি ধারাবাহিক বিবরণ দেওয়া হয়েছে । সংক্ষেপে , কীভাবে মনুষ্য দেহে আপনা হতে অনন্ত শক্তির বিকাশ ঘটে তাই বলা হয়েছে । একজন মানুষ কীভাবে ভগবানে পরিবর্তিত হন তাই বলা হয়েছে । এ হল আত্ম জ্ঞান । আর এর প্রমাণ বহন করে হাজার হাজার মানুষ তাঁকে অন্তরে দেখে ।    এই বইয়ে তাঁর নিজের অনুভূতির আলোয় কুড়িয়ে পাওয়া মাণিক শ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃতে বর্ণিত শ্রীরামকৃষ্ণ দেবের অমৃত বানীর যৌগিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন । পৃথিবীর ধর্মের ইতিহাসে এটি একটি শ্রেষ্ঠ অবদান হিসেবে পরিগণিত হবে বলে আমরা বিশ্বাস করি ।

জে, এন, চ্যাটার্জী

  ১৯, ভি রোড , হাওড়া    পোঃ দাশনগর, হাওড়া , ভারত বর্ষ ,          

  ১৫ই জুলাই ১৯৬৫ 

 

       

                                                                    

জয় শ্রী জীবনকৃষ্ণ


 

ভগবান শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণদেবের অমৃত বানীর যৌগিক রূপ

জীবাত্মার পরমাত্মায় পরিবর্তন বা আনন্দময় সত্ত্বায় উত্তরণ

কুড়িয়ে পাওয়া মাণিক বিরচিত

                                                        


মাণিক হল বহুমূল্য হীরে । ভারতবর্ষে একটি কিংবদন্তী আছে যে মাণিক নাগের ( বিষধর সাপ ) মাথায় জন্মায় । নাগ সবথেকে বিষধর সাপ । এটি হল কুণ্ডলিনীর প্রতীক । কুণ্ডলিনী হল প্রানশক্তির নির্যাস । এই কুণ্ডলিনী শক্তি সর্প রূপে মেরুদণ্ডের মধ্যে জেগে উঠলে জীবাত্মা যোগের পথে ভগবানে পরিবর্তিত হতে থাকে । শ্রীরামকৃষ্ণদেব দেখেছিলেন যে কুণ্ডলিনী হতেই ভগবান , বহুমূল্য মাণিক জন্মায় । অর্থাৎ ভগবান এই দেহে ।                     

                             মাণিক কিনতে মেলেনা । ভগবানের কৃপায় পাওয়া যায় । মাণিক অমূল্য । সাধনার দ্বারা দেহে সচ্চিদানন্দের উদয় হয়না । সচ্চিদানন্দের কৃপায় তাঁকে দর্শন হয় । কখনও কখনও বাইরেও ঈশ্বরীয় মূর্তি তে দর্শন হয় । দেহ থেকে ঈশ্বর কৃপা করে আপনা হতে ( বিদ্বৎ ) মুক্ত হন । সাধনায় ( বিবিদিষা ) নয় । যদি ঈশ্বর কৃপা করে নিজে মুক্ত হন তবেই এই দেহ থেকে মুক্তি ।


এক

“আমার এসব গোপন ঈশ্বরীয় অনুভূতির কথা বলায় কি কিছু অপরাধ হচ্ছে মা?”----- শ্রীরামকৃষ্ণ                                            “না অপরাধ কেন হবে? আমি ওদের (মানুষের) ভক্তি বিশ্বাস বাড়বে বলে বলছি।”     ----- শ্রীরামকৃষ্ণ 

   ধারনা অনেকের অনুভূতির কথা বললে অপরাধ হয় । ঠাকুরের পাঁচ খানি কথামৃত ঠাকুরের দেহে ভগবানের লীলার কাহিনী । দেহেতে শ্রীভগবান । তিনি কৃপা করে দেহে প্রকাশ হন । দেহের নানা স্তরে শ্রীভগবানের প্রকাশ কে লীলা বলে । এর অপর নাম সত্যের প্রতিষ্ঠা বা স্বয়ম্ভূ আত্মার ( পাতাল ফোঁড়া শিবের ) স্বয়ং প্রকাশ । সত্য স্ফুরিত হয় প্রচারের জন্য । ‘চাপরাশ’ বা ‘আদেশ’ অথবা দুই প্রাপ্তির পর এই প্রচার । ‘চাপরাশ’ লিখিত দলিল । শ্রী ভগবান মূর্তি ধারণ করে লিখে দেখান । ‘আদেশ’ দু প্রকার ।

১) মূর্তি ধারণ করে সচ্চিদানন্দ বলেন ।

২) মাথার মধ্যে দৈব বাণী । আর দু রকম দৈব বাণীর কথা আছে ।

ক) শিশুর মুখ দিয়ে , অথবা  খ) পাগলের মুখ দিয়ে ।   

ঠাকুরের দেহে আত্মার প্রকাশ । এই প্রকাশের নাম ভাগবত । তিনি এই ভাগবত প্রকাশ করেছেন । এতে কোনোরকম অপরাধ হয়না । ঠাকুর বলছেন এতে মানুষের সুপ্ত বিশ্বাস জেগে ওঠে । গোপনতা অষ্ট পাশের একটি পাশ । গোপনের জন্য সত্যের প্রতিষ্ঠা বা আত্মিক স্ফুরণ হয়না । ঈশ্বর যদি ইচ্ছা করেন তবে কাকেও ব্রহ্মজ্ঞান দেন । তাঁর ইচ্ছায় দেহেতে নিম্নলিখিত স্তরে ঈশ্বরীয় লীলার প্রকাশ হয় ।

 ১) সচ্চিদানন্দ গুরু – অজানা মানুষের রূপে দেহেতে ভগবানের উদয় । তিনি সাধারণ রক্তমাংসের মানুষ নন ।  তিনি চিন্ময়    মূর্তি।  এই সচ্চিদানন্দ গুরু সাধকের সাথে কথা কন ও শিক্ষা দেন । এ সময় সাধক এর অবর্ণ কবর্ণ বোঝেনা । সে শুধু দ্রষ্টা মাত্র ।    

   ২) তারপর আত্মার স্ফুরণ, সংকলন, ও বিকাশ ঘটে সপ্তম ভূমিতে বা মস্তিষ্কের সহস্রারে। এরপর সচ্চিদানন্দ গুরু দ্রষ্টা কে আত্মা সাক্ষাৎকার করিয়ে আত্মায় লীন হয়ে যান। দ্রষ্টা জ্ঞান লাভ করেন যে আত্মাই সচ্চিদানন্দ গুরু ।

  ৩) বিভিন্ন ভূমিতে ভগবানের অনন্ত লীলা ।                                                 

   ৪) তারপর দ্রষ্টা কে চাপরাশ দান ।  

  ৫) দ্রষ্টার দেহে ভগবানের লীলার ধারাবাহিক কাহিনী প্রকাশ ।

   “কেউ কেউ মানুষের জন্য ব্রহ্মজ্ঞান লাভের পর ভক্তি ও ভক্ত নিয়ে থাকেন । যাতে তাঁকে দেখে অন্যরাও ভক্তি লাভ করেন” । “যেমন কুম্ভ পরিপূর্ণ হল , অন্য পাত্রে জল ঢালাঢালি করছে।”

 “তাঁরা কি করে ভগবান দর্শন করেছেন ও দেহেতে ভগবান কে লাভ করেছেন সেকথা মানুষ কে বলেন , এতে মানুষের               অশেষ কল্যান হয়।”

এগুলি ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের বাণী । এর দ্বারা তিনি জানিয়েছেন যে ভগবান দর্শন ও লাভের কথা প্রকাশ করলে কোন অপরাধ হয়না ।

দুই

কারু কারু সাধন না করেও ঈশ্বর লাভ হয় , তাদের নিত্যসিদ্ধ বলে । ------- শ্রীরামকৃষ্ণ ।

যারা জপতপাদি সাধন করে ঈশ্বর লাভ করেছে, তাদের বলে সাধন সিদ্ধ । ------ শ্রীরামকৃষ্ণ ।  

আবার কেউ কেউ ভগবানের কৃপায় ভগবান লাভ করে , এদের বলে কৃপাসিদ্ধ । যেমন হাজার বছরের অন্ধকার ঘর , প্রদীপ নিয়ে গেলে এক ক্ষণে আলো হয়ে যায় । -------- শ্রীরামকৃষ্ণ ।

আবার আছে, হঠাৎ ভগবানের দর্শন ও লাভ হল, এরা হঠাৎসিদ্ধ । যেমন গরীবের মেয়ে বড় মানুষের নজরে পড়ে গেছে । বাবু তাঁকে মেয়ে বিয়ে দিলে – সেই সঙ্গে বাড়ী ঘর গাড়ি দাস দাসী, সব হয়ে গেল । ------- শ্রীরামকৃষ্ণ ।

আর আছে স্বপ্নসিদ্ধ, স্বপ্নে দর্শন হল । -------- শ্রীরামকৃষ্ণ ।

নিত্যসিদ্ধ  -- যাঁর দেহে আপনা হতে ভগবানের উদয় হয় (আত্মা সাক্ষাৎকার) তিনিই নিত্যসিদ্ধ । নিত্যসিদ্ধ দু প্রকার , 

ক) নিত্যসিদ্ধ ঈশ্বরকটি অবতার , খ) ঈশ্বরকটি নিত্যসিদ্ধ ।            

    ঈশ্বরকটি   -- ঈশ্বর চৈতন্য রূপে কটি দেশ পর্যন্ত অবতরণ করেন । এটি দেখা যায় । এরুপ অবতরণ শুধু অবতারের দেহেই হয় । তাই তাঁকে বলে ঈশ্বর কটি । আর এক প্রকার ঈশ্বর কটি আছেন যাঁদের মেরুদণ্ডের ফুটো বড় । “ কোনও কোনও বাঁশের ফুটো বেশী, কারু কম ” । শ্রীরামকৃষ্ণ ।

      ক) অবতার --- যিনি দেহের মধ্যে মানুষ রতন দর্শন করেছেন তিনিই অবতার । কপালে শ্বেত চন্দনের ফোঁটা। ইনি হাততালি দিয়ে হরিনাম করেন । দ্রষ্টা দেখতে ও শুনতে পান । দ্রষ্টার হাতের তালু কিরকির করে। এই নিত্যসিদ্ধ ঈশ্বর কটি অবতার ভিতরে ও বাইরে দুই ভাবেই ভগবানের লীলা আস্বাদন করেন । সিদ্ধ – যিনি সিদ্ধিলাভ করেছেন , অর্থাৎ যিনি দেহেতে ভগবান কে লাভ করেছেন । পাঁচ প্রকারের সিদ্ধ হয় । অবতার আপনা হতে এই পাঁচ প্রকারের সিদ্ধি লাভ করেন । কখনও কখনও ভগবান সাকার রূপে সামনে এসে বলেন তুমি তো কৃপাসিদ্ধ বা ধ্যানসিদ্ধ । দেহেতে আত্মার স্ফুরণ ও বিকাশের যে সাধন বেদে উল্লিখিত তা শ্রেষ্ঠ । বেদ মতে পঞ্চ কোষের সাধনেই সিদ্ধি ।    

               ১) অন্নময় কোষ – হল স্থূলদেহ । ২) প্রাণময় কোষ – এখানে প্রাণ শক্তির দর্শন হয় । ৩) মনোময় কোষ – এখানে নানারুপ জ্যোতি দর্শন হয় । ৪) বিজ্ঞানময় কোষ – সচ্চিদানন্দ গুরু এখানে ভগবান দর্শন করিয়ে দেন ও সাধকের এই বোধ হয় যে ‘আমি দেহ নই , আমি আত্মা’ । ৫) আনন্দময় কোষ – এটি ব্রহ্মানন্দের স্থান ।

তিন

     এক কোষ থেকে আর এক কোষে প্রাণশক্তির পরিবর্তনের সূত্রপাত হল । দেহ থেকে প্রাণশক্তি সংকলিত হয়ে ঊর্ধ্বমুখী হল ও চতুর্থ ভূমিতে দ্রষ্টা বাইরে ও দেহের ভিতরে নানা রূপ ঈশ্বরীয় জ্যোতি দরশ করতে থাকে । এই ভাবে এই পরিবর্তন ব্রহ্মানন্দ লাভ পর্যন্ত চলতে থাকে । এটি দেহের মধ্যে ভগবানের সগুণ প্রকাশ । সগুণ ব্রহ্ম ।দেহেতে এই পঞ্চকোষের সাতটি ভূমি আছে । প্রতিটি ভূমির অনুভূতি ভিন্ন । এই ভূমি গুলি দেহকে কাতলেও দেখা যায় না । দেহেতে ঈশ্বরীয় জ্যোতিতে নির্মিত ভাগবতী তনু লাভ হয় আর সেই ভাগবতী তনুতে দর্শন হয় ।

             ১/ অন্নময় কোষের কোন ভূমি নাই ।

             ২/ প্রাণময় কোষে তিন ভূমি –  প্রথম – লিঙ্গ, দ্বিতীয় – গুহ্য, তৃতীয় – নাভি । দর্শন ও অনুভূতি  - “আলেক লতার জল পেতে পড়লে গাছ হয়” । শ্রীরামকৃষ্ণ । আলেক লতা – নির্গুণ ব্রহ্ম । নিরাকার ঈশ্বর । অলক্ষ্যে যে আত্মা দেহকে ওতপ্রোত ভাবে লতার মতন জড়িয়ে আছেন । তিনি দেহ থেকে কৃপা করে মুক্ত হয়ে, পেটের দক্ষিণ দিকে স্বচ্ছ নীলাভ জলে, স্নিগ্ধ জ্যোৎস্না কিরণে জড়িত হয়ে দেখা দেন ।

       ৩/ মনোময় কোষ হল চতুর্থ ভূমি , হৃদয় । দর্শন ও অনুভূতি – এই প্রথম ঈশ্বরীয় জ্যোতি দর্শন হয় । যে দিকেই চাওয়া যাবে দেখা যাবে সমস্ত কিছু এই জ্যোতিতে আবৃত । একটা গাছের ডালের দিকে নজর পড়ল , ডালের ভিতর পারা কিংবা রূপা গলার মত দেখা যায় । দক্ষিণেশ্বরে ঠাকুর কালীঘরে মায়ের পুজা করছেন, মা দেখিয়ে দিলেন দুয়ার, চৌকাঠ, ছাদ, প্রতিটি জিনিস চিন্ময়, জ্যোতির্ময় । 

             ৪/ বিজ্ঞানময় কোষ – পঞ্চম ভূমি, ষষ্ঠভূমি, ও সপ্তমভূমির কিয়দংশ । বিজ্ঞানময় কোষে বিশেষ রূপে জ্ঞান হয় – ‘আমি কে ?’ প্রাণশক্তি দেহ থেকে মুক্ত হয়ে নানা পরিবর্তনের শেষে আত্মায় পরিণত  হয় । দ্রষ্টা দেহেতে ভগবানের এই লীলা দেখেন ও তাঁর বিশেষ রূপে জ্ঞান হয় যে তিনি এই দেহ নন, তিনি আত্মা ।

           প্রথম – পঞ্চম ভূমি হল কণ্ঠে । দর্শন ও অনুভূতি – দ্রষ্টা দেখেন যে তাঁর দেহ আধখানা নারী ও আধখানা পুরুষে পরিণত । নিম্নাঙ্গ নারী ও ঊর্ধ্বাঙ্গ পুরুষ , প্রায় দুই থেকে তিন মিনিট এমন অবস্থা থাকে । দ্রষ্টা দিন দুপুরে এই দর্শন করেন । এর ফলে তাঁর এই জ্ঞান হয় যে আত্মার কোন লিঙ্গ ভেদ নেই । তিনি পুরুষ ও নন, নারী ও নন । এই হল প্রথম অবস্থা যখন দেহ থেকে কাম উপে যায় । “তাই সচ্চিদানন্দ প্রথমে অর্ধনারীশ্বর মূর্তি ধারণ করলেন ।” – শ্রীরামকৃষ্ণ । সচ্চিদানন্দ, আত্মা, ভগবান, ব্রহ্ম, আসলে এক, শুধু অবস্থা ভেদে অনুভূতির তারতম্য । সচ্চিদানন্দ দেহেতে । তিনি দেহ থেকে মুক্ত হয়ে অর্ধনারীশ্বর মূর্তি ধারণ করেন । দ্রষ্টা দিন দুপুরে খলা চোখে দেখেন । এর দ্বিতীয় স্তরের অনুভূতি হল, ভক্ত সচ্চিদানন্দ গুরুর মূর্তি অর্ধনারীশ্বর রূপে দেখেন । প্রথম স্তরের অর্ধনারীশ্বর মুরতির অনুভূতি দ্রষ্টার স্থুলদেহে বর্তায় আর দ্বিতীয় স্তরের অনুভূতি হয় দ্রষ্টার কারণ শরীরে । দ্বিতীয় – ষষ্ঠ ভূমি হল কপালে , দুই ভ্রূর মাঝখানে । অনুভূতি - একটি ডাঁটিতে এক জোড়া পদ্ম দেখা যায় । দ্বিদল পদ্ম । চক্ষু হতে দুটি আধ ইঞ্চি পরিমাণ ব্যাসের জ্যোতির্ময় চক্র বেরিয়ে আসে । চক্র দুটি কিছুটা উপরে উঠে ভ্রূর কাছে এসে নেমে যায় ।  তারপর তারা মিলে গিয়ে এক হয়ে যায় । ও তার পরিবর্তে একটি চক্রের উদয় হয় । সেই চক্রের মাঝখানে জ্ঞান মূর্তি যেন ধ্যান রত বুদ্ধের মূর্তি দেখা যায় । এই বুদ্ধ মূর্তি দর্শন সপ্তম ভূমিতে প্রবেশ নির্দেশ করে । এই চক্রটিকে বলে জ্ঞান নেত্র বা তৃতীয় নয়ন বা জ্ঞান নয়ন । এটি প্রথম স্তরের অনুভূতি। দ্বিতীয় স্তরের অনুভূতিও আছে । এটি সচ্চিদানন্দ গুরুর দেহেতে দেখতে পাওয়া যায় । সচ্চিদানন্দ গুরুর শরীরে জ্ঞান চক্ষু বা ত্রিনেত্র পরিস্ফুট হয়, আর ঈশ্বরীয় রূপ ও কল্পতরু দেখতে পাওয়া যায় ।   

            তৃতীয় – সপ্তম ভূমির প্রবেশ দ্বারে, সহস্রারে, এক অতি সুন্দরী নারীমূর্তি দেখা যায় । ইনি রহস্যময়ী মায়া মূর্তি । এই মায়াই মানুষকে ভগবানের থেকে দূরে রাখে । দিন দুপুরে খোলা চোখে দ্রষ্টা নিজের বিছানায় শুয়ে । তিনি দেখছেন এই নারী মূর্তি । গায়ের রঙ ঈষৎ নীল । যেন স্নিগ্ধ ঘাস ফুলের রঙ । পরনে নীলাম্বরী । নাসায় নীল পাথরের বেশর । দৃষ্টি ভূমিতে আনত ও আবদ্ধ । ভ্রু মধ্যে ডান হাতের বুড়ো আঙ্গুল ঠেকিয়ে নৃত্য পরা । নৃত্য ধীর কিন্তু সুছন্দিত । মুরতিতে আনন্দ যেন সর্বাঙ্গ দিয়ে উচ্ছলিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে । আনত ও আবদ্ধ দৃষ্টিতে বুঝিয়ে দিলেন যে তিনি এই জগত ও ভগবান, এবং জীবন মৃত্যুর রহস্যের দ্বার আগলে রেখেছেন । মায়ার রহস্য ভেদ হলে তবেই ভগবান দর্শন ও ভগবানত্ব প্রাপ্তি । জীবন মৃত্যুর রহস্য ভেদ হলে পূর্ণ ব্রহ্ম জ্ঞান । চতুর্থ – সপ্তমভূমি – শিরোমধ্যে । সপ্তম ভূমিতে আত্মা সাক্ষাৎকার হয় । “ কেউ এসে বলবে এই – এই ” । শ্রীরামকৃষ্ণ । এই কেউ হলেন সচ্চিদানন্দ গুরু । তিনি দেখা দেন, কথা কন, এবং আত্মাকে দেখিয়ে দেন – “ এই ভগবান ! এই ভগবান দর্শন !” এই বলে । তারপর আত্মায় লীন হয়ে যান । দ্রষ্টার জ্ঞান হয় যে আসলে সচ্চিদানন্দ গুরু আত্মারই এক রূপ । দ্রষ্টা তাঁর নিজের মাথার মধ্যেই এসব দর্শন করেন । একমাত্র দেহেতেই ভগবান দর্শন হয় । এরপর ধীরে ধীরে জ্ঞান হয় ভগবান কে বা কী ! শেষে দ্রষ্টা জানতে পারেন যে তিনি এই দেহ নন, তিনি আত্মা । এই হল বিজ্ঞানময় কোষের অনুভূতি – অর্থাৎ বিশেষ রূপে জ্ঞান হল নিজের স্বরূপের । সমাধির আরম্ভ এবং একপ্রকার সমাধি ।  

৫/ আনন্দময় কোষ – ব্রহ্মানন্দের অনুভূতি । এখানে দ্রষ্টা সচ্চিদানন্দ লাভ করেন । সচ্চিদানন্দে পরিবর্তিত হওয়া । “ বাবা সচ্চিদানন্দ লাভ না হলে কিছুই হলনা ” । শ্রীরামকৃষ্ণ । এই আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করা যায়না । “ ঘি কেমন ? না ঘি যেমন ।” ঠাকুর । “ পাঁচ বছরের শিশুকে রমণ সুখ বোঝানো যায়না ।” ঠাকুর ।

ঈশ্বরকটি নিত্যসিদ্ধ                     অবতারের পর ঈশ্বরকটি নিত্যসিদ্ধ । এঁরাও দৈবী মানুষ । তবে অবতার নন । যাঁর দেহ থেকে আত্মা মুক্ত হন, তবে পূর্ণ ভাবে নয়, তিনিই দৈবী মানুষ। এঁরা অবতারের প্রয়োজনে তাঁর সঙ্গে আসেন । এঁদের কেউ অখণ্ডের ঘর, কেউ বা উঁচু সাকারের ঘর । অখণ্ড হল নিরাকার – অরূপ । উঁচু সাকারের ঘর হলে ঈশ্বরকে নানারূপে দর্শন হয় ও দ্রষ্টার ধারণা হয় যে ভগবান এক কিন্তু তিনি নানারূপে দেখা দেন ।

“ নরেনের (স্বামী বিবেকানন্দ ) অখণ্ডের ঘর ” । ঠাকুর ।

“ রাখালের (স্বামী ব্রহ্মানন্দ ) উঁচু সাকারের ঘর ” । ঠাকুর ।          

চার   কৃপাসিদ্ধ যিনি কেবলমাত্র ঈশ্বরের কৃপায় ঈশ্বর লাভ করেছেন, তিনি কৃপাসিদ্ধ । কৃপাসিদ্ধের দুই অবস্থা । প্রথম অবস্থা হল, অজানা পুরুষের রূপে সচ্চিদানন্দ গুরু দেখা দেন । দ্রষ্টা আগে কখনো তাঁকে দেখেননি । তিনি চিন্ময়মূর্তিতে এসে কথা কন, শিক্ষা দেন । দ্রষ্টার এই দর্শন হঠাৎ হয়, কারণ তিনি এর কিছুই জানেননা । আত্মা দেহ থেকে মুক্ত হয়ে মূর্তি ধারণ করেন । তিনি কৃপা করে লীলা করেন । দ্রষ্টার সম্পূর্ণ অজ্ঞাতে এসব হয় । দ্রষ্টা আনন্দে ও বিস্ময়ে পরিপূর্ণ হয়ে যান । অবশ্য ক্রমে এই রহস্য উদ্ঘাটিত হয়।  “হাজার বছরের অন্ধকার ঘরে আল নিয়ে গেলে একক্ষণে আলো হয়”। ঠাকুর ।দ্বিতীয় অবস্থা হল – “ তিনি সাক্ষাৎকার হয়ে বলবেন তবে জানবি ঠিক হয়েছে” । ঠাকুর । স্বস্বরূপ দেহ থেকে বেরিয়ে বলেন – “তোর ওপর ভগবানের কৃপা আছে”। ঈশ্বরের কৃপা মনে ভাববার বিষয় নয়। সাক্ষাৎকার, অনুভূতি, ও শ্রীভগবানের শ্রীমুখের বাণী সাপেক্ষ ।

পাঁচ সম্পূর্ণ অযাচিত ও অচিন্ত্যনীয় ভাবে ভগবানের সাক্ষাৎকার ও কৃপালাভ করে যিনি সিদ্ধ হন তিনি হলেন হঠাৎসিদ্ধ । শ্রীরামকৃষ্ণ মাত্র এগার বছর বয়সে এভাবে সিদ্ধ হন । তাঁর গ্রামের সংলগ্ন মাঠের অপর প্রান্তে দেবী বিশালাক্ষীর মন্দির । এক বিশেষ দিনে উৎসবে গ্রামের মহিলারা চলেছিলেন দেবী দর্শনে । ঠাকুর ছিলেন সাথে । মাঠ পার হওয়ার সময় তাঁর জ্যোতিদর্শন করে সমাধি হয় । এগার বছরের পাড়াগাঁয়ের ছেলের মনে কল্পনায় এ অনুভূতির কথা উদয় হয়নি । কিংবা অপরের কাছেও কখনো শোনেনি । কৃপাসিদ্ধ ও হঠাৎসিদ্ধ প্রায় একই রকমে সিদ্ধ । হঠাৎ ও অযাচিত ভাবে সিদ্ধ । সচ্চিদানন্দ গুরু আসেন ও কৃপা করেন । সে সময়ে তিনি যে সচ্চিদানন্দ গুরু তা জানা যায়না । তিনি এক অজানা পুরুষ । তাঁকে আগে কখনো দেখা যায়নি । তিনি চিন্ময় রূপে এক অজানা পুরুষের মূর্তিতে আসেন । দেখা দেন । কথা কন । দ্রষ্টা অবাক হয়ে যান । একজন রাস্তা দিয়ে চলে যাচ্ছিলেন । তিনি একটি মাণিক কুড়িয়ে পেলেন । এই হল হঠাৎসিদ্ধের উপমা ।  যিনি মাণিক কুড়িয়ে পেয়েছেন তিনি তো জানেনই, কিন্তু এখানেই শেষ নয়, মাণিক নিজেই এর প্রচার করে । ভগবান এক বন্ধু কে স্বপ্নে জানান । তিনি এসে বলেন – “ দেখ, আমি দেখেছি যে তুমি একটি মাণিক কুড়িয়ে পেয়েছ ।” আবার প্রথম বন্ধুর দর্শনের প্রমাণ স্বরূপ দ্বিতীয় অন্তরঙ্গ দেখে বলবে সেও অনুরূপ একটি স্বপ্ন দেখেছে । স্বপ্নদ্রষ্টা এসে তাঁকে বলবে “আপনি অমূল্য রত্ন কুড়িয়ে পেয়েছেন, আমি দেখেছি।”  দ্বিতীয় স্বপ্নটিতে ষোল আনা প্রচার । ঠাকুরের হঠাৎসিদ্ধের উপমা – এতে কুণ্ডলিনীর আত্মায় পরিণত হওয়ার পূর্ণ ব্যাখ্যা দেওয়া আছে ।                  

   বড়লোক বা বাবু – শ্রীভগবান , নির্গুণ ব্রহ্ম । গরীবের ছেলের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দিলেন – ঈশ্বরীয় জ্যোতিতে নির্মিত ভাগবতী তনু । দেহেতে মেয়ের জন্ম হল । দেহ ছেড়ে মেয়ে বেরিয়ে এল । ভাগবতী তনু দেহের মধ্যে ও বাইরে দুই ভাবেই দেখা যায় । বাবুর মেয়ে । বাবু ভগবান । যদিও বাবুর মেয়ে তবু সে দ্রষ্টার স্ত্রী । কারণ সে দ্রষ্টার সারাজীবনের সঙ্গিনী ।   

   বাড়ী – সাততলা বাড়ী , দেহ । প্রতিটি তলায় একটি করে ভূমি আছে । সাততলা অর্থাৎ সপ্তভূমি । আসবাব – প্রতি স্তরের অনুভূতি ।

    গাড়ী – কুণ্ডলিনীর গতি । প্রাণশক্তি বা কুণ্ডলিনী দেখতে পাওয়া যায় ।ঠাকুর দেখেছিলেন সর্পাকৃতি চিন্ময়ী কুণ্ডলিনী । দাসদাসী – ইন্দ্রিয়গণ দাস হয়, অর্থাৎ ইন্দ্রিয় বশ হল । দাসী – মায়া বা দেহ দাসী । অর্থাৎ দেহ সম্পূর্ণ রূপে দ্রষ্টার বশে এল ।                        

ছয়

    স্বপ্নসিদ্ধ

স্বপ্নসিদ্ধ – যে ভাগ্যবান স্বপ্নে ভগবানের দর্শন পান ও ভগবানে পরিবর্তিত হয়ে যান তিনিই স্বপ্নসিদ্ধ । “ স্বপ্নসিদ্ধ যেই জন মুক্তি তার ঠাঁই ।” ঠাকুর । 

    কথামৃতে উল্লিখিত শ্রী বিশ্বনাথ উপাধ্যায়, যাকে সবাই কাপ্তেন বলত, নেপালের মহারাজার কন্সাল, প্রথম ঠাকুরকে স্বপ্ন দেখেন । তখন ঠাকুরকে তিনি চিনতেন না । আগে কখনো দেখেননি বা তাঁর কথা শোনেননি । তাঁর স্বপ্ন – ঠাকুর দক্ষিণেশ্বরের মন্দিরের বাগানের খিড়কির দরজায় দাঁড়িয়ে । পাশে বিরাট এক গোবরের স্তুপ । সেই স্তুপের উপর পূর্ণ বিকশিত এক সহস্রদল পদ্ম । ঠাকুর সেই গোবরের স্তুপের পাশে দাঁড়িয়ে কাপ্তেন কে সেই প্রস্ফুটিত পদ্মটি দেখিয়ে দিচ্ছেন । এরপর প্রায় দুমাস কেটে গেছে । একদিন বিশ্বনাথ দক্ষিণেশ্বরে তীর্থ দর্শনে এলেন । ঠাকুরকে এই প্রথম দর্শন করলেন । আর অবাক হয়ে গেলেন । সঙ্গে সঙ্গে তাঁর সেই স্বপ্নের কথা মনে পড়ল । আরে ইনিই তো সেই, যাকে তিনি স্বপ্নে দেখেছেন । সেই থেকে তিনি ঠাকুরের শরন নিলেন ও আজীবন ঠাকুরের প্রতি অচলা ভক্তি ছিল । 

            গোবরের স্তুপ প্রথমত হল এই দেহ, তারপর জগত । সারাজগত জুড়ে কামিনীকাঞ্চন ও ভোগের বিপুল আয়োজন, স্বার্থপর দলাদলি, তবু তারি মাঝে এ যুগে মানুষের সহস্রার পদ্ম ফুটবে । আত্মার বিকাশ ও লীলা হবে । তাঁর ইচ্ছা তাই এই লীলা । ঠাকুর বিশ্বনাথ কে কৃপা করে দেখালেন এযুগে তাঁর ইচ্ছায় এই লীলা হবে । শ্রী রামচন্দ্র দত্ত কলকাতা মেডিকেল কলেজের একজন ডাক্তার ও কেমিস্ট ছিলেন । তিনি প্রথম ঠাকুরের কাছ থেকে স্বপ্নে মন্ত্র পেয়েছিলেন । তিনি দক্ষিণেশ্বরের কালীবাড়ি থেকে প্রায় পাঁচ মাইল দূরে শিমলে তে তাঁর বাড়িতে ঘুমিয়েছিলেন । স্বপ্নে তিনি দেখলেন ঠাকুর তাঁকে মন্ত্র দিচ্ছেন । তিনি দক্ষিণেশ্বরে এসে ঠাকুরকে একথা জানালেন । ঠাকুর বসেছিলেন, উঠে দাঁড়িয়ে নাচতে লাগলেন । ছান্দোগ্য ও বৃহদারণ্যকে   (দুটি উপনিষদ, বেদের অংশ), দৈব স্বপ্নের কথা আছে। তারা বলছে জাগ্রত অবস্থার চেয়ে স্বপ্নের অনুভূতি শুদ্ধতর। জোসেফ মিশরের ফারাও-র স্বপ্নতত্ব ব্যাখ্যা করতেন। শ্রী ভগবান জোসেফ কে বলেছিলেন – ‘এরপর থেকে আমি সাক্ষাৎকার হয়ে কথা বলবনা। স্বপ্নে আদেশ দেব’।

           বৌদ্ধ ধর্মে আছে মায়াদেবী শ্রীবুদ্ধ জন্মাবার বহু পূর্বে একটি স্বপ্ন দেখেছিলেন, স্বর্গ থেকে একটি সাদা হাতি নেমে এসে তাঁর গর্ভে প্রবেশ করল। এরপর স্থূলে শ্রীবুদ্ধের জন্ম হল। এযুগে ঠাকুরের পিতা স্বপ্নে দেখেছিলেন তাঁর গৃহদেবতা শ্রীরঘুবীর তাঁকে বলছেন যে তিনি তাঁর পুত্র হয়ে জন্মাবেন। ওল্ড টেস্টামেন্ট স্বপ্ন কাহিনীতে পূর্ণ। নিউ টেস্টামেন্টেও বহু স্বপ্নের কথা আছে। মহম্মদ স্বপ্নে সাত ঘোড়ায় তানা রথে খোদাতালার কাছে যেতেন ও আদেশ নির্দেশ পেতেন। বিশিষ্টাদ্বৈতবাদের জনক, বিখ্যাত দার্শনিক শ্রীরামানুজ (১০১৭ – ১১৩৭ খ্রিস্টাব্দ), স্বপ্নে দিল্লী যাবার নির্দেশ পান। তখন দিল্লী পাঠান সম্রাটের অধীন। তিনি স্বপ্নে সম্রাটের প্রাসাদ থেকে বিগ্রহ আনার নির্দেশ পেয়েছিলেন এবং সেই স্বপ্নলব্ধ বিগ্রহ তিনি মাদ্রাজের কাছে শ্রীরঙ্গপত্তনমে মন্দিরে স্থাপন করেন। স্বপ্নে মন্ত্র পাওয়া বহু ভাগ্যে হয় – ঠাকুর । শ্রীচৈতন্যদেব স্বপ্নলব্ধ মন্ত্র তাঁর গুরু শ্রীকেশব ভারতীর কানে প্রদান করে পুনরায় সেই মন্ত্র গুরুর থেকে গ্রহণ করেন। স্বপ্নে মন্ত্র পেলে আর মন্ত্র নিতে নেই। শ্রীভগবান দেহেতে। তিনি কৃপা করে বাণী রূপে ফুটে উঠলেন এবং দ্রষ্টাকে নাদের দ্বারা ধারণ করলেন ও তাঁর গুরু হলেন। গম্ভীরায় (উড়িষ্যায় পুরীতে যেখানে শ্রীচৈতন্যদেব বাস করতেন) থাকার সময়ে স্বপ্নে তাঁর সম্পূর্ণ ভাগবত উপলব্ধি হয়। স্বপ্নে আত্মা মহাপ্রভুর দেহে শ্রীকৃষ্ণ মূর্তিতে দেখা দেন ও বিবিধ লীলা করেন। শ্রীবৃন্দাবনদাশ ঠাকুর, শ্রীচৈতন্যদেবের একজন ভক্ত, মহাপ্রভুর আর এক ভক্ত শ্রীপুন্ডরীক বিদ্যানিধির স্বপ্নকথা দিয়ে তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ শ্রীচৈতন্যভাগবত শেষ করেন। বিদ্যানিধি শ্রীচৈতন্য কে দর্শন করতে পুরী যান। তিনি ও মহাপ্রভুর আর এক ভক্ত শ্রীস্বরূপ দামোদর পুরীতে শ্রীজগন্নাথদেবের মন্দিরে যান। সেখানে বিগ্রহের পূজা পদ্ধতিতে তাঁরা কিছু ত্রুটি লক্ষ করেন। এবং তাই নিয়ে নিজেদের মধ্যে ব্যাঙ্গ করেন। রাতে পুণ্ডরীকাক্ষ স্বপ্নে দেখেন শ্রীজগন্নাথ ও বলভদ্র কে। তাঁরা এসে তাদের মন্দিরকক্ষে এই ধরনের অধার্মিক কাজের জন্যে তাঁর গালে চড় মারেন। এতে তাঁর গাল ফুলে ওঠে ও আংটি সমেত আঙ্গুলের দাগ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সকালে স্বরূপ দামোদর এসে দেখেন পুণ্ডরীকাক্ষের এই অবস্থা। বম্বে অঞ্চলের বিখ্যাত সাধক তুকারামের জীবন ও অসংখ্য স্বপ্ন কাহিনীতে পূর্ণ। তুকারামের গৃহদেবতা ছিলেন বিঠোবা। আত্মা তুকারামের দেহে বিঠোবার মূর্তিতে ফুটে উঠে লীলা করেন। স্বপ্নে বিঠোবা তুকারামের সচ্চিদানন্দ গুরু রূপে তাঁকে বরন করেন। তুকারাম ছিলেন নিরক্ষর। একটি অদ্ভুত ঘটনা হল স্বপ্নে বিঠোবা তাঁকে লিখতে পড়তে এমনকি দোঁহা (প্রার্থনাসঙ্গীত)লিখতেও শিখিয়েছিলেন। সেগুলি আজ ও মারাঠি ভাষায় লিখিত শ্রেষ্ঠ দোঁহা বলে বিদিত। স্বপ্নসিদ্ধ লুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। ঠাকুর একে প্রাণদান করে পুনরায় প্রতিষ্ঠা করলেন। কথামৃতকার শ্রীম কে ঠাকুর বলেছিলেন- স্বপ্নে যদি আমায় উপদেশ দিতে দেখ তবে জানবে সে সচ্চিদানন্দ। আত্মা দেহ থেকে মুক্ত হয়ে চিন্ময় সাকার রূপে দেখা দেন ও কৃপা করেন। “বাবা ছেলের হাত ধরেছে”- ঠাকুর। রামবাবু, মাষ্টার মশায় (শ্রীম), বাবুরাম মহারাজ (স্বামী প্রেমানন্দ), এবং আরও কেউ কেউ ঠাকুরের কাছ থেকে স্বপ্নে মন্ত্র পেয়েছিলেন। মানুষের জীবনের চারটি অবস্থা। জাগ্রত স্বপ্ন সুষুপ্তি ও তুরীয়। তুরীয়ের অর্থ হল কুণ্ডলিনীর জাগরন থেকে ব্রহ্মে পরিণতি। তুরীয়ের প্রতীক হল ফিকে জ্যোৎস্নায় জড়িত কুয়াশা। এই কুয়াশার মধ্য থেকে মানুষ মূর্তি বেরিয়ে আসে। তারা ক্রীড়াচ্ছলে দৌড়য় কথা কয় জল খায় ও একে অপরের সঙ্গে খেলা করে। এপ্রসঙ্গে ঠাকুরের একটি অনুভূতির উল্লেখে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। (শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত- চতুর্থভাগ- ঠাকুরের অমৃতবাণী, ২২শে অক্টোবর ১৮৮৫)। 

   শ্রীরামকৃষ্ণ- ভাবে আমার কি দর্শন হল জান? ছয়/আট মাইল জোড়া মাঠ। সেই মাঠ দিয়ে শিহরে (ঠাকুরের দেশ কামারপুকুরের নিকটবর্তী একটি গ্রাম) যাওয়ার রাস্তা। মাঠের মধ্যে আমি একা । সেখানে একটি ষোল বছরের পরমহংস বালক মূর্তি, ঠিক যেমনটি দক্ষিণেশ্বরে দেখেছিলুম । চারিদিকে আনন্দের কুয়াশা। সেই কুয়াশার মধ্যে থেকে একটি তের চোদ্দ বছরের বালক বেরিয়ে এল । প্রথমে শুধু মুখটি দেখলাম । মুখটি পূর্ণর । (পূর্ণ ঠাকুরের এক বালক ভক্ত)। আমাদের কারো গায়ে কাপড় নেই । আমরা সেই মাঠে মহা আনন্দে দৌড়াদৌড়ি করে খেলতে লাগলাম । দৌড়াদৌড়ি করে পূর্ণর জলতেষ্টা পেল । সে নিজে একটি গেলাস থেকে জল খেয়ে আমাকে খেতে দিল । আমি বললাম- ভাই তোর এঁটো খেতে পারবনা । শুনে, সে হেসে, গ্লাসটি ধুয়ে আমাকে জল দিল । এটি কোন সাধারণ ভাবাবস্থার দর্শন নয় । এটি ঠাকুরের তুরীয়ের অনুভূতি । 

[ * ভাব- কোন একটি অবস্থাতে আবদ্ধ নয় । ভাব নানাপ্রকার । কোনটি হালকা কোনটি গভীর । 

  ** পরমহংস হল যার দেহ থেকে আত্মা সম্পূর্ণ ভাবে পৃথক হয়েছেন । তিনি পরমহংসত্ব লাভ করেছেন । যিনি এই অবস্থা লাভ করেছেন তাঁকে যদি প্রশ্ন করা যায় যে- আপনার দেহ আর আত্মা কি পৃথক হয়েছে ? তিনি উত্তর দেবার পূর্বেই তাঁর দেহে পরিবর্তন দেখা যাবে । সাথে সাথে তাঁর দেহে মহাবায়ু ঊর্ধ্বমুখী হয়ে সহস্রারে যাবে ও তাঁর মুখমণ্ডল ঈষৎ স্ফুরিত হবে ।]

সুষুপ্তি হল গাঢ় নিদ্রা । নিদ্রায় প্রবেশের পূর্বে অথবা নিদ্রার শেষে অনুভূতি হয় । কিন্তু গাঢ় নিদ্রায় বা ডাহা জাগ্রত অবস্থায় নয় । এই অনুভূতিকে সুষুপ্তির দর্শন বলে । মনুষ্যদেহের এই চারটি অবস্থা । যথা- জাগ্রত, স্বপ্ন, সুষুপ্তি, ও তুরীয় । এই চার অবস্থাতেই দর্শন হয় ও ভগবানের নানালীলা দেহেতে দেখা যায় । কোন কোন ভাগ্যবান এই চার অবস্থাতেই ঈশ্বরলীলা দেখেন । কারো জাগ্রত স্বপ্ন ও সুষুপ্তিতে দর্শন হয়। কারো জাগ্রত ও স্বপ্নাবস্থায় দর্শন হয়। কারো বা শুধু স্বপ্নে অনুভূতি হয়। এঁদের বলে স্বপ্নসিদ্ধ। স্বপ্নে এঁদের দেহশুদ্দি, চিত্তশুদ্ধি হয়ে সচ্চিদানন্দ গুরু লাভ হয়, ও ঈশ্বরীয় জ্যোতি দর্শন করে সমাধি থেকে শেষে দেহে মানুষ রতন রূপে চৈতন্যের অবতরণ পর্যন্ত হয়। স্বপ্নে ঈশ্বর দর্শন থেকে শুরু করে নানা ঈশ্বরীয় লীলা ও সগুণ ব্রহ্ম দর্শন ও সর্বাঙ্গীণ সাধন হওয়া ঠাকুরের যুগেই প্রথম। তিনি স্বপ্নে ভগবান দর্শন করেছেন, তাই তিনি স্বপ্নসিদ্ধ। দ্রষ্টার সম্পূর্ণ অজান্তে স্বপ্নে দর্শন হয়, সুতরাং তিনি হঠাৎসিদ্ধ। তিনি সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ভাবে কৃপা পান। ভগবানের কৃপা ছাড়া কেউ দেবস্বপ্ন দেখেনা। অতএব তিনি কৃপাসিদ্ধ। এই স্বপ্নসিদ্ধ কৃপাসিদ্ধও, কারণ তাঁর দেহ থেকে আত্মা আপনা হতে মুক্ত হয়ে প্রথমে সচ্চিদানন্দ গুরু রূপে দেখা দেন। সচ্চিদানন্দ গুরু বিনা ঈশ্বর দর্শন অসম্ভব। আবার স্বপ্নসিদ্ধ সাধন সিদ্ধ বা ধ্যানসিদ্ধ ও বটে, কারণ কোনোরকম সাধন বিনাই আত্মা দেহ থেকে মূর্তি ধারণ করে বেরিয়ে আসেন ও বলেন- তুমি তো ধ্যানসিদ্ধ।   

                               সাত

বিবিদিষায় ঈশ্বরদর্শন ও ঈশ্বরলাভ সুকঠিন। ধ্যানসিদ্ধ হওয়ার পূর্বে দেখা যায় খরস্রোতা নদী। বাঁকা পথে ঘুরে সাধককে গন্তব্যে জেতে হবে। সিদ্ধির পরিমান আছে। আত্মার দেহ থেকে যে পরিমান মুক্তি হবে সেই অনুপাতেই সিদ্ধি হবে। বিভিন্ন মাত্রায় এই সিদ্ধি লাভ হয়। ঠাকুর একে আনা দিয়ে বোঝাতেন। যেমন- এক আনা, দউ আনা, চার আনা, ও আট আনা। ষোল আনা হল পূর্ণ মাত্রা বা একটি রৌপ্যমুদ্রা। তিনি কথামৃতকার শ্রীম কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন- আমার কয় আনা জ্ঞান হয়েছে?

                         সাধনসিদ্ধ বা ধ্যানসিদ্ধ

সাধনসিদ্ধ বা ধ্যানসিদ্ধ আসলে একই। এঁরা দুজনেই চেষ্টা করে ভগবানকে লাভ করতে চায়। এর অর্থ, জগত থেকে মন তুলে নিয়ে, জৈবীভাবের বিলুপ্তি ঘটিয়ে দেহের সপ্তভূমি পার করে সমাধি লাভ ও ঈশ্বর দর্শন করে সগুণ ও নির্গুণব্রহ্ম কে বোধে বোধ করা। পবিত্র ভাগবত গীতায় বলছে- হাজারের মধ্যে একজন ঈশ্বর চিন্তা করেন, আবার সেই হাজারের মধ্যে একজন ঈশ্বর দর্শন করেন। এমন হাজার জন দ্রষ্টার মধ্যে একজন ঈশ্বর (সচ্চিদানন্দ) লাভ করেন। আবার এইরূপ হাজার জনের মধ্যে একজনের সগুণ ও নির্গুণ ব্রহ্মের উপলব্ধি হয়। বৈষ্ণব সাধক চণ্ডীদাস বলেছেন ‘কোটিতে গুটিক’। মাতৃসঙ্গীত রচয়িতা, মা কালীর ভক্ত, বাঙ্গালী সাধক রামপ্রসাদ বলেছেন- ‘ঘুড়ি লক্ষের দুটা একটা কাটে, তুমি হেসে দাও মা হাত চাপড়ি’। শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছেন- ‘বহু কষ্টে কেউ বা সাধন করে তাঁকে লাভ করেছে’। ঠাকুর অস্তি জ্ঞানে কথা বলতেন। তিনি অস্তি ছাড়া নাস্তি জানতেন না। তিনি ছিলেন নিত্য চৈতন্যময় পুরুষ। তিনি স্বামী বিবেকানন্দকে বলছেন- ‘দুটি আছে, অস্তি আর নাস্তি। নাস্তি ছেড়ে অস্তি নাও’। যেখানে তিনি ‘তত সোজা নয়’, ‘বহু কষ্টে’, ‘কঠিন’ ইত্যাদি কথা বলেছেন সেখানে সে বাক্যের অর্থ ‘না’- অর্থাৎ হয়না। শ্রীভগবানের কৃপায় শ্রীভগবান দর্শন- (চেষ্টায়) বিবিদিষায় নয়। বেদ বলছে বিদ্বতে বস্তুলাভ, বিবিদিষায় নয়। বিবিদিষায় বস্তুলাভ হয়না, তাই সাধনসিদ্ধ ও হয়না। ধ্যানসিদ্ধ হলে শ্রীভগবান চিন্ময় মূর্তিতে সামনে এসে বলেন- তুমি তো ধ্যানসিদ্ধ। দ্রষ্টা নিঃসংশয় হন ও পরম শান্তি লাভ করেন। কিন্তু এ শুধু নিত্যসিদ্ধ ঈশ্বরকটি অবতারের ক্ষেত্রেই হয়। নিত্যসিদ্ধ ঈশ্বরকটি ধ্যানে বসলেই মন অখণ্ডে লীন হয়ে যায়। ঠাকুর স্বামীজি সম্বন্ধে বলতেন- নরেন ধ্যানসিদ্ধ। তিনি আরও বলতেন- ধ্যানসিদ্ধ যেই জন মুক্তি তার ঠাঁই। 

                            আট

এই লেখা লেখবার ছাব্বিশ বছর আগে একটি দৈব স্বপ্ন হয়। এতে কথামৃতে উল্লিখিত ঠাকুরের বাণীর মর্মার্থ স্পষ্ট হতে থাকে। এই প্রতীক ও তার মর্মার্থ গুলিতে দেহেতে যোগের দ্বারা দেহীর ব্রহ্মে পরিবর্তন ও নানা ঈশ্বরীয় লীলার অর্থ প্রকাশ পায়। কিছু না ভেবে, কারো থেকে কিছু না শুনে, বইয়ে না পড়ে, সম্পূর্ণ অজ্ঞাতে দ্রষ্টা একটি স্বপ্ন দেখেন। সেটি এইরূপ- একটি সুন্দর বাগান। অপরূপ সৃষ্টি। বর্ণনা অসাধ্য। বাগানের মাঝে একটি চমৎকার বাড়ি। ছবি অত সুন্দর না। বাড়ির আকার গলাকার। খুব উঁচু ভিতের ওপর বাড়িটি। বারান্দা সুসজ্জিত। নিপুণতা ও রুচির আদর্শ। বৃহৎ একখানি ঘর বারান্দার মাঝে। ঘরখানি কল্পনার ইন্দ্রসভা। ঘরের মাঝে অতি সুন্দর একখানি খাট। খাটে সুন্দর শয্যা। বাগানের মালিক, বাবু, বিছানায় শুয়ে আছেন। মাথায় তাকিয়া। দেখলেই বোধ হয় তিনি বাবু। আকার- মাঝামাঝি স্থুল। মুখটি ছাড়া সমস্তই সাদা চাদরে ঢাকা। মেঝেতে বৃহৎ একটি গড়গড়া ও নল। ভাষা নেই গড়গড়া ও নলের অপরূপত্ব বর্ণনা করি। নলটি বাবুর মুখে, শুধু লাগানো আছে। মুখটি অতি নিখুঁত ভাবে কামানো। বাবুর মুখের রঙটি মাদাম তুসোর মোমের পুতুলের রঙ। বাবু বয়স্ক। তিনি নীরব, নয়ন মুদ্রিত। স্বপ্নদ্রস্টা করজোড়ে খাটের পাশে দাঁড়িয়ে। দৃষ্টি বাবুর শ্রীমুখে গাঢ় ভাবে নিবদ্ধ। দ্রষ্টা ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন বারান্দায়। বারান্দার কোলে অনেকগুলি সিঁড়ি। সিঁড়ির কোলে ছবির মত রাস্তা। স্বপ্নদ্রষ্টা সিঁড়ি দিয়ে রাস্তায় নেমে এলেন। রাস্তা সোজা। রাস্তা দিয়ে খানিকটা গিয়ে বাগানের ফটকের দ্বার। ফটকের দ্বারে লোহার দণ্ড ও দণ্ডের মাথায় গোল চক্র সারি সারি পোঁতা আছে। পথ রুদ্ধ। সামনে জগতের রাস্তা। স্বপ্নদ্রষ্টার শরীরে বিশেষ শক্তি। তিনি একটানে চক্র সমেত একটি দণ্ড তুলে ফেললেন। বাগানের রাস্তার সঙ্গে জগতের রাস্তা এক হয়ে গেল। আর স্বপ্ন ভেঙ্গে গেল।

                দ্রষ্টা বুঝলেন তাঁকে ঠাকুরের অমৃত বাণীর যৌগিক রূপ বর্ণনা করতে আদেশ করছেন। ঘরটি ছোট। থাকা সেখানে। বারো তেরটি বন্ধুর সঙ্গে সেখানে নিত্য কথামৃত পড়া। প্রায় সর্বক্ষণ- সকাল, দুপুর, বিকাল, রাত্রি- পাঁচ বছর যাবত- ১৯৪৩ জুলাই থেকে ১৯৪৮ জুলাই মাস পর্যন্ত। বন্ধুগুলি বহুকালের পরিচিত। পঁচিশ বছর আগে থেকে, কেউ কেউ তারও চেয়ে বেশী। মাত্র দুটি ছাড়া। তাদের একটি স্বপ্নে আদেশ পেয়ে এসছেন ও আর একটি তার সাথী। এঁদের সকলকার স্বপ্নে সচ্চিদানন্দ গুরু লাভ হয়েছে। স্বপ্নে, ধ্যানে, ট্রান্সে (নিদ্রার আবেশে-চন্ডীদাশ) নানারকম অনুভূতি হয়েছে। ঠাকুর কৃপা করেছেন এই বন্ধুগুলিকে। দেখিয়েছেন- তাঁর কৃপায় গোবরে পদ্মফুল ফোটে। এঁরা সিদ্ধপুরুষ। ভারী মজা করে ঠাকুর এঁদের অবস্থা জানিয়েছেন। একজনের অবস্থা আর একজনকে জানিয়েছেন, আবার দ্বিতীয়ের অবস্থা জানিয়েছেন তৃতীয়কে- স্বপ্নে। আবার কেউ নিজের অবস্থা নিজে জেনেছেন- স্বয়ংবেদ্য। একজন স্বপ্নে দেখেছেন- আর একজন সাততলা বাড়ির সাততলার ঘরের মধ্যে বসে সমাধিস্থ। আবার কেউ স্বপ্নে জ্যোতিদর্শন করে সমাধিস্থ হয়ে গেলেন- নিজেই দেখছেন। দ্রষ্টার মনে স্বপ্নটি গভীর রেখাপাত করে। একটি ঘরে নিত্য শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত পাঠ হত। কথামৃত পড়বার সময়ে ঠাকুরের যৌগিক রূপের কাহিনী বলা হত। এই রূপগুলির অর্থবোধ হয়েছিল ঠাকুরের কৃপায় স্বপ্নে আর অনুভুতিতে। একটি উদাহরণ- “সূর্যের কিরণ মাটিতে পড়লে একরকম, জলে পড়লে আর একরকম, আবার আয়নায় পড়লে অন্য একরকম”। এই ছোট ঘরে ঠাকুর এর রূপ দেওয়ালেন- দেহে সর্বত্র ব্যেপে শ্রীভগবান আছেন। এই হল- ‘মাটিতে পড়লে একরকম’। শ্রীনারায়ন ক্ষীরোদ সাগরে নিদ্রিত। কারনশরীরে ভাগবতীতনু ইষ্টমূর্তি ধারণ করেন বা নানাবিধ দেবদেবীর মূর্তিতে দেখা দেন। এই হল- জলে পড়লে আর একরকম। সহস্রারে সচ্চিদানন্দগুরু আত্মাসাক্ষাৎকার করিয়ে দেন। এই হল- আয়নায় পড়লে অন্য একরকম। কথামৃত পড়া এখন ঢিলে হয়ে গেছে। সেও স্বপ্নে জানতে পারা গিয়েছিল। একটি বন্ধু স্বপ্নে দেখেছেন পাঠকের মূর্তিকে । সেই মূর্তি তাঁকে বলছেন- আর কথামৃত পড়তে পারিনা । ঠাকুর কৃপা করে এই লিখে খাওয়াতে আদেশ করেছেন ।  এই লিখে খাওয়াবার আদেশের আগে তিনটি বন্ধু লেখা সম্বন্ধে কতগুলি স্বপ্ন দেখেছিলেন। একজন দেখলেন- তিনি ট্রেনে করে চলেছেন। ট্রেনে অনেক লোক। তাদের সঙ্গে বহুক্ষন হরিকথা হল। দ্রষ্টার হাতে একটি পেন্সিল। শেষ স্টেশনে ট্রেন থামতে দ্রষ্টা নেমে গেলেন। হাতে কিছু নেই। প্লাটফর্ম দিয়ে তিনি যাচ্ছেন, এমন সময়ে একটি লোক ট্রেন থেকে নেমে ছুটে এসে হাতে পেন্সিলটি দিয়ে গেল। পেন্সিলটি হাতে রইল, স্বপ্ন ভেঙ্গে গেল। এই স্বপ্নের অর্থ আগে বোঝা যায়নি। লেখবার আদেশে স্বপ্নের অর্থ বোঝা গেল । একটি সন্ন্যাসী বন্ধু (পূর্বে কথিত বারো তের জনের একজন) স্বপ্নে দেখলেন- আমাদের আর একটি বন্ধু তাঁকে বলছেন, “ভগবানের লীলার কথা ছাপিয়ে দেওয়া হোক। নূতন কাকেও কাছে আসতে মানা”।  আবার এই সন্ন্যাসী বন্ধুটি স্বপ্ন দেখলেন- এই পাঠকের মূর্তি বিছানায় বসে লিখছেন। তিনি অবাক হলেন কারণ ইনি সচরাচর লেখালিখি করেননা। বন্ধুটি তাঁর কাছে আসতে ইতস্ততঃ করছেন। তাঁর মনে উদয় হল- ইনি তো আমাদের আপনার লোক। এঁর কাছে যেতে কিসের ভয়? আরেকটি বন্ধু দূরের গ্রামে থাকতেন। তিনি স্বপ্ন দেখলেন- ‘যা হবার তা হয়েছে- এখন নূতন করে ঠাকুরের কাছে কবুলতি দিতে হবে’। এই তিনটি স্বপ্নের সম্পূর্ণ অর্থ লেখবার আদেশের স্বপ্নে বোঝা গেল। এগুলি ঠাকুরের আদেশের সমর্থন।

  নয় 

দলের তিনজন বন্ধু আপত্তি করেছিলেন লেখার। যেহেতু নিজের অনুভূতির কথা অপরাধ বলে গণ্য। স্থির হল- দ্বিতীয় আদেশ না পাওয়া পর্যন্ত, লেখকের মুখ থেকে নয়, অপরের মুখ থেকে, লেখা বন্ধ থাকবে। এই কথা হতে না হতেই ঘরের একটি বন্ধু বললেন, ‘আমি একটা স্বপ্ন দেখেছি, এখনও বলা হয়নি, তাতে লেখার কথা আছে’।তিনি স্বপ্নটি বললেন- তিনি ও আর একটি বন্ধু একটি ঘরে পাশাপাশি বসে আছেন। একটি উঁচু বেদীর ওপর বসে যিনি নিত্য কথামৃত পাঠ করেন, তিনি ব্যাখ্যা করছেন। এমন সময়ে হঠাৎ একটি উগ্র আলো দ্বারের কাছে দেখা গেল। দ্রষ্টা সেদিকে চাইতে দেখলেন আলোর মধ্যে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেব দাঁড়িয়ে। তিনি পাঠককে লক্ষ করে বললেন- আমায় শুনিয়ে খাইয়েছিস? ঠিক এই কথার সঙ্গে সঙ্গেই পাঠক মুখ ফিরিয়ে প্রশ্ন করলেন – এবার কি লিখতে হবে? শ্রীশ্রীঠাকুর – হ্যাঁ। পাঠক- দলিল কোথায়? শ্রীশ্রীঠাকুর – মহিন্দর মাষ্টারের (শ্রীম) কাছে। এই সময়ে দ্রষ্টা যেন কি বলতে গিয়ে ঠাকুরের পদতলে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন। স্বপ্ন ভেঙ্গে গেলেও অনেকক্ষণ পর্যন্ত অসাড় হয়ে পড়েছিলেন। দেহজ্ঞান ফিরে পেয়ে দেখলেন খুব ঘেমে গেছেন। বন্ধুর এই স্বপ্নটি প্রথম আদেশের সমর্থন। কিন্তু এতেও পূর্ণ সমর্থন পাওয়া হলনা। যে তিনজন বন্ধু লিখতে প্রথম আপত্তি তুলেছিলেন, অন্ততঃ তাদের একজনের মুখ থেকে আবার আদেশ শনবার জন্য লেখা বন্ধ রইল। রবিবার এই আপত্তি উঠেছিল। যিনি প্রথম আপত্তি তুলেছিলেন তিনি সোমবার এই স্বপ্নটি দেখেন- স্থান বাজার। বাজারের একটি দেওয়ালে একটি বিশেষ ধরনের মোটা টিনের নল। সেই নলের নীচে একটি চৌকো টিনের পাত্র। অপরের নলটি দিয়ে নিচের চৌকো পাত্রটিতে অবিচ্ছিন্ন ধারায় মধু পড়ছে। দুটি লোক পাশে দাঁড়িয়ে। তাঁরা বন থেকে ওই মধু আহরণ করে এনেছেন। তাঁরাই ওই নলের মধ্যে মধু ঢালছেন। নীচের বড় পাত্রটিতে সরু রবারের নল লাগানো আছে। ওই সরু নল থেকে খুব জোরে ওই মধু বাজারে বিতরণ হচ্ছে। মধু চৈতন্যের প্রতীক। স্বপ্নে মধু দর্শন- চৈতন্যের দ্বিতীয় স্তরের অনুভূতি। স্বপ্নের ষোল আনাই ব্যাক্তিগত বলে সম্পূর্ণ অর্থ বলা হলনা। এই স্বপ্নদ্রষ্টা আপত্তি তুলে দ্বিতীয় দিনে স্বপ্নটি দেখেন। আর চতুর্থ দিনে স্বপ্নটি আমাদের বলেন, আর ছ দিনের দিন এসে আমাদের বলেন- এ স্বপ্নের অর্থ আমি বুঝেছি। এতে লেখবার আদেশ আছে। স্বপ্নে জোরের সঙ্গে বিতরণ হচ্ছে মধু। দ্বিতীয় আপত্তিকারী বন্ধু দেখলেন স্বপ্নে- একটি প্রশস্ত রাস্তা। সোজা চলে গেছে। রাস্তাটি দ্বিতল। উপরতলা আর নিচের তলা। একই রকম দুটি রাস্তা সমান্তরাল চলে গেছে। উপরের রাস্তাটির অনেক গলি উপগলি ও ফোঁকর আছে। সেই সব ফোঁকর দিয়ে নিচের রাস্তার সব দেখা ও শোনা যায়। স্বপ্ন দ্রষ্টা উপরের রাস্তায় আর তাঁর সচ্চিদানন্দ গুরু নিচের রাস্তায়। উভয়ে পরামর্শ করে এই ব্যবস্থা। উভয়েই চলেছেন। রাস্তার প্রতিটি ফোঁকর থেকে একে অপরকে দেখতে পাচ্ছেন ও কথাবার্তা হচ্ছে। সচ্চিদানন্দ গুরু নিচের রাস্তা থেকে চেঁচিয়ে স্বপ্নদ্রষ্টা কে জিজ্ঞাসা করলেন- তুমি কোথায়? দ্রষ্টা- আমি এই যে। সচ্চিদানন্দ গুরু যেন পূর্বের ব্যবস্থা মত নিচের রাস্তা থেকে উপরের রাস্তায় এলেন ও উভয়ের মিলন হল। “আমার কথার দুটি অর্থ, একটি শব্দার্থ (ব্যবহারিক) ও অন্যটি মর্মার্থ (আত্মিক)। মর্মার্থ যা দেহে উপলব্ধি হয়”। শ্রীরামকৃষ্ণ। 

স্বপ্নটি ঠাকুরের শব্দার্থ ও মর্মার্থের যৌগিক রূপ। তৃতীয় আপত্তিকারী বন্ধু ধ্যানে এইটি দেখেছেন। তিনি গাঢ় ধ্যানে মগ্ন। সেই অবস্থায় অন্তরে পূর্ণচন্দ্র দেখছেন। চাঁদ গলে মাটিতে পড়ছে। চাঁদ শুদ্ধাভক্তির প্রতীক – ঠাকুর। ভক্তি চন্দ্র আর জ্ঞান সূর্য – ঠাকুর। তিন জন আপত্তিকারী বন্ধু যথা ক্রমে দেখলেন -

১ মধু জগতে বিতরণ হচ্ছে।

২ ঠাকুরের উপদেশ ও বাণীর মর্মার্থ যা কৃপা করে সচ্চিদানন্দ গুরু আত্মিকে অনুভূতির দ্বারা বুঝিয়ে দেন। 

৩ চন্দ্র গলে পড়ছে – এই দর্শনে মানব মনে ভগবৎ প্রেমের উদয়।           এই বন্ধুদের সংশয় ঠাকুর কৃপা করে দূর করলেন।


No comments:

Post a Comment

শ্রীজীবনকৃষ্ণের অমৃত কথাসার প্রথম অংশ

১৯৫০ থেকে ১৯৫৩ সালের কিছু কথা সংকলিত করা হয়েছে শ্রীজীবনকৃষ্ণ সংশ্রয় থেকে। যেহেতু সেখানে দিনলিপিতে তারিখের উল্লেখ নেই, তাই এখানে তারিখের উল্ল...