দিনলিপি
খগেন্দ্রনাথ ঘোষ
২০শে জানুয়ারি ১৯৬১
কদমতলায়
যেতে শ্রীজীবনকৃষ্ণ জানালেন, ধীরেন ঘাটশিলায় তার বড়দার কাছে গিয়েছে। বললাম-জানি।
কারণ সেদিন অফিস যাবার পথে ধীরেন আমাকে বঙ্কিম মাস্টারের ডায়েরির কিছু অংশ পড়তে
দিয়ে গেছে। তখনই সে আমাকে তার ঘাটশিলা যাবার কথা বলে। এরপর তিনি জিজ্ঞেস করলেন,
নলিনী আমার কাছে প্রায় আসে কিনা। জানালাম যে, সে আসে। তবে গত কয়েকদিন সে আসছেনা।
এরপর তিনি মণিবাবুর কথা জানতে চাইলেন। তার উত্তরে তাঁকে জানালাম, মণিবাবুর চোখে বড়
সমস্যা হয়েছে। তিনি দেখতে পাচ্ছেননা, ফলে তাঁর চলাফেরা খুব বেশিরকমের নিয়ন্ত্রিত।
কিছুক্ষণ ধরে কথামৃত পাঠ ও ব্যাখ্যা শুনে ফিরে এলাম।
২৭শে জানুয়ারি ১৯৬১
কদমতলায় তাঁর ঘরে গিয়ে তাঁকে
নমস্কার করে বসতে তিনি জিজ্ঞেস করলেন- অখণ্ড সচ্চিদানন্দ বলতে আমি কী বুঝি।
কিছুক্ষণ চিন্তা করে বললাম- আমি শুধু অখণ্ড কথাটার আক্ষরিক অর্থ বলতে পারি। অখণ্ড
বলতে সম্পূর্ণ ও অবিভাজ্য বোঝায়। আর সচ্চিদানন্দ অর্থ-চির শান্তি, চির আনন্দ।
সেদিন
উনি এর কি ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন আজ আর মনে নেই। পরে কদমতলার আমার বাকি বন্ধুরা, যারা
সেইসময় আলোচনা শুনেছিল, তাদের কাছ থেকে জানতে পারি, মনুষ্যদেহ ছাড়া অখণ্ড
সচ্চিদানন্দের উপলব্ধি হয়না। শেষ পর্যন্ত প্রতিটি মানুষই তাই অখণ্ড সচ্চিদানন্দ।
এরপর
আলোচনায় উঠে এলো দুটি শব্দ। অমৃত এবং অমর। অমর কথার অর্থ অবিনশ্বর। শ্রীজীবনকৃষ্ণ
জিজ্ঞেস করলেন অমর কি কেউ হয়েছে? আমাদের মধ্যে কেউ কেউ পৌরাণিক চরিত্র বিভীষণ,
অশ্বত্থামা, হনুমান, ইত্যাদি নামের উল্লেখ করলেন। উনি শুনলেন। তারপর বল্লেন-তিনি
এদের জানেননা।
তিনি
তাঁর দেখা দুটি স্বপ্নের উল্লেখ করলেন। প্রথমটি ছাব্বিশে জানুয়ারি বৃহস্পতিবার
সকালে দেখেছেন। তিনি দেখছেন তাঁর হাতে একটি আম। পরেরটি শুক্রবার সাতাশে দেখেছেন।
একটি লালমুখো হনুমানকে দেখছেন ও দৈববানী শুনছেন- নেমে আসতে হবে।
যতদিন
যেতে লাগলো আমি বুঝতে পারলাম, ওঁর কাছে পৌরাণিক তথ্যের একফোঁটা মুল্য নেই। দেহের
মধ্যে আত্মিক উপলব্ধির বিভিন্ন প্রতীক হিসেবে তিনি এগুলিকে ধরেন। যেমন আম-অমৃত ফল।
অমরত্বের প্রতীক। তাঁর কথা অনুযায়ী অমরত্ব লাভ হবে তবে কিছুদিন পরে। কারণ আমটি
দেখার একদিন পরে দৈববানী শুনেছেন। সঙ্গে সঙ্গে নয়। লালমুখো হনুমানটিও অমরত্বের
প্রতীক।
৩রা ফেব্রুয়ারি ১৯৬১
শ্রীজীবনকৃষ্ণ
আমার হাতে দুটি চিঠি দিয়ে বললেন- ঘোষ সাহেব, আপনি তো বেশ কিছুদিন অ্যামেরিকায়
ছিলেন। চিঠিগুলো পড়ে বলুন দেখি কি বুঝলেন? ঘরে তখন যথারীতি কথামৃত পাঠ চলছে। আমি
তার মধ্যেই চিঠি পড়ছি। দেখলাম, অ্যামেরিকার হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ থেকে জনৈক শ্রীযুক্ত
এলি আর মারোজ্জি, এম এ, চিঠি দুটি দিয়েছেন। তিনি হাওয়াই রামকৃষ্ণ মিশন থেকে
দীক্ষিত। তিনি ও তাঁর স্ত্রী সেখানে মিশনের কর্মের সঙ্গে সঙ্গে একটি বেদান্ত
সোসাইটি পরিচালনা করেন।
তাঁরা
১৯৪২ সালে স্বামী নিখিলানন্দ অনূদিত ইংরাজি শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত প্রকাশের সময়
থেকেই নিয়মিত পাঠ করে আসছেন। তাঁরা রিলিজিয়ন এন্ড রিয়ালাইজেশন বইটির ভূয়সী প্রশংসা
করেছেন। (সে সময় এটি একটি ক্ষুদ্র পুস্তিকা মাত্র ছিল)। বইটি কিছুদিন আগে তাঁদেরকে
পাঠানো হয়েছিল। সেটিতে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের কথার যৌগিক ব্যাখ্যা তাঁদেরকে মুগ্ধ
করে। তাঁরা কিভাবে যেন বুঝতে পেরেছিলেন যে, বইটি একবার মাত্র পড়ে খুব সামান্যই
বোঝা সম্ভব। বইটির সমস্ত কথা উপলব্ধি করতে গেলে তাঁদের নিজেদের আত্মিক বিকাশও
সেইমত প্রয়োজন। তাই তাঁরা জানতে চেয়েছেন যে, শ্রীজীবনকৃষ্ণ ‘দর্শন’ দেন কিনা। বা,
শিক্ষা দেন কিনা। তাঁরা আরও এক ডজন পুস্তিকা চেয়ে পাঠিয়েছেন।
আমার
চিঠি পড়া শেষ হয়েছে লক্ষ করে তিনি জানতে চাইলেন আমার অভিমত। বললাম- আমার তো মনে
হচ্ছে তাঁরা ঠাকুরের একনিষ্ঠ ভক্ত। বইটি পড়ে তাঁদের এরকম মনে হয়েছে এটিই বোঝার
পক্ষে যথেষ্ট যে তাঁদের আত্মিক জীবন বেশ উন্নত। স্বামী নিখিলানন্দ যে কথামৃতর
ইংরাজি অনুবাদ করেছিলেন এবং সেটি অ্যামেরিকাতে প্রকাশ হয়, একথা আমি জানতামনা। আরও
বললাম- স্বামীজির সঙ্গে নিউ ইয়র্ক শহরে ১৯৩৬ সালে আমার আলাপ হয়েছিল। সঙ্গে ছিলেন
আমার সহপাঠী বন্ধু ডঃ মেঘনাদ সাহা। মিশনে সমাগত কিছু ভক্ত ও অন্যান্যদের দুচার কথা
বলার জন্য ডঃ সাহাকে আহ্বান করা হয়েছিল। তিনি তখন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনশত
বছর উপলক্ষে আয়োজিত উৎসবে বক্তৃতা দিতে গিয়েছিলেন।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ
মন দিয়ে শুনছিলেন। আমার বলা শেষ হলে তিনি আবার কথামৃত পড়তে বললেন। কথামৃত শুঞ্ছি,
এমন সময় তিনি আমার হাতে হিন্দুস্তান স্ট্যান্ডার্ড কাগজটি দিলেন। সেখানে রিলিজিওন
এন্ড রিয়ালাইজেশন বইটি সম্পর্কে লেখা বের হয়েছে। আমি এরপর তাঁকে প্রণাম জানিয়ে
বেরিয়ে এলাম।
আমার
বাড়িতে নলিনী, অবলা, ধীরেন, অরুণ এবং আরও কেউ কেউ প্রায়ই আসত। আমরা সবাই মিলে বসে
ওঁর কথা আলোচনা করতাম। ওঁর ঘরে আসতেন যারা, তাঁদের স্বপ্ন ও অনুভূতির কথা আলোচনা
হতো। ওরা আমাকে কদমতলার ঘরের বিভিন্ন কথাবার্তা জানাতো। বিশেষত, কোনও বিশেষ অতিথি
যদি আসতেন তবে তারা সেইসব ঘটনা ও কথাবার্তা আমাকে বলত। ওয়াকিবহাল করত।
আমার
আত্মিক জীবনের উন্নতির আশায় তারা যে কত উদগ্রীব ছিল! একদিন তারা সকলে আমার ঘরে
ভারী শোরগোল তুলল। কেন আমার ঘরে ঠাকুরের একখানা ছবি নেই? ধীরেন তখনই অরুণকে আদেশ
দিয়ে দিলো, যে, সে যেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ঠাকুরের একখানা মাপসই ছবি এনে আমার ঘরে
টাঙিয়ে দেয়।
২৭শে ফেব্রুয়ারি ১৯৬১
ওঁর ঘরে যেতে
উনি জানালেন, ২৬ তারিখ, অর্থাৎ গতকাল, ঘাটশিলা থেকে ধীরেনের বড়দা, দ্বিজেন এসেছেন
ওঁর কাছে। রবিবার রাত ন’টায় কদমতলা থেকে ফেরার পথে ধীরেন অরুণ আর অবলা ধীরেনের
দাদাকে আমার সঙ্গে আলাপ করাতে আমার বাড়িতে আনে। এরকম সুভদ্র, তীক্ষ্ণমেধাসম্পন্ন
এবং উদারহৃদয় ও সংস্কারমুক্ত মানুষের সঙ্গে আলাপ করে খুব আনন্দ পেলাম।
আজ
শ্রীজীবনকৃষ্ণ আমাকে হাওয়াই থেকে আসা আরেকটি চিঠি পড়তে দিলেন। এটি সেই
মারোজ্জিরই লেখা। চিথির তারিখ বাইশে
ফেব্রুয়ারি। এতে দুটি স্বপ্নের কথা লেখা। একটি তিনি অনেক আগে দেখেছেন। দেখেছিলেন-
ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ পরনের কাপড়টি বগলে নিয়ে একঘোর থেকে মারোজ্জির ঘরে এলেন। একটি
পাত্রে রাখা গঙ্গাজলে ঠাকুর আঙুল ডোবালেন। তারপর তর্জনীটি শ্রী মারোজ্জির কপালে
ছোঁয়ালেন। অন্য দর্শনটি রিলিজিওন এন্ড রিয়ালাইজেশন পড়বার পর হয়েছে। তিনি দেখছেন
বর্জ্য ধাতুস্তুপের ওপরে এক ঝলক উজ্জ্বল আলোকরশ্মি পড়েছে। এছাড়াও, তিনি একজন সাদা
জামাকাপড় পরা লম্বা লোককে স্বপ্নে দেখেছেন। কিন্তু তিনি তাঁর মুখ দেখতে পাননি।
শ্রী মারোজ্জির বিশ্বাস, তিনি যীশুকে দেখেছেন। কিন্তু সম্ভবত তিনি
শ্রীজীবনকৃষ্ণকেই দেখেছেন। সেই মানুষটি হাত বাড়িয়ে তাঁকে স্বাগত জানিয়েছেন।
স্রীজীবনকৃষ্ণ
একটি লম্বা চিঠি পড়ে শোনালেন। চিঠিটি তিনি শ্রী মারোজ্জিকে লিখেছেন। সম্পূর্ণ শনার
পর সংক্ষিপ্ত আলোচনায় আমি তাঁকে বললাম- এঁরা খুব একনিষ্ঠ এবং উচ্চস্তরের সাধক বলেই
মনে হয়।
তাঁর প্রশ্নে জানালাম যে, গত ২৫শে
ফেব্রুয়ারি রাতে আমি তাঁকে স্বপ্নে দেখেছি। স্বপ্নটি এরকম- আমি অস্ট্রেলিয়ান
ক্রিকেট টিমের ক্যাপ্টেন রিচি বিনোদের যেন খুব বন্ধু। তিনি আমাকে তাঁদের হয়ে
কৃষ্ণনগর কলেজের বিপক্ষে খেলতে ডেকেছেন। আমি তাঁকে বললাম যে, আমার লোহার বুলোঅয়ালা
ক্রিকেট খেলার জুতো নেই। তিনি সেকথা উড়িয়ে দিয়ে আমাকে অস্ট্রেলিয়ান টিমের ক্লাব
হাউজে তৈরি হতে ডাকলেন।
স্বপ্নটি
এখানে শেষ। শুনে উনি বললেন, আমি আচার্য হতে চলেছি। ব্যাখ্যা জানতে চাইলে, বললেন,
জুতোর তলায় বুলো না থাকার মানে, মাটির সঙ্গে যোগ কম। এর অর্থ নির্লিপ্তি। পার্থিব
ব্যাপারে নির্লিপ্ত।
একথায়
উৎসাহিত হয়ে বললাম- গত যুদ্ধের সময়, যখন আমি ডায়েরেক্টর জেনারেল অফ মিউনিসান
প্রোডাকসানে ছিলাম তখন আমার এক সহকারী কোষ্ঠীবিচার করে বলে ষাট বছর বয়স থেকে আমার
মধ্যে আধ্যাত্মিক চেতনার উন্মেষ দেখা দেবে। তখন আমি পঞ্চাশ। আমার আরেক বন্ধুও
১৯৫৭-৫৮ সাল নাগাদ বিচার করে বলেছিল যে, ১৯৬১ সালে আমি একজন সাধুর সংস্পর্শে আসব।
এবং নতুন ধরনের আধ্যাত্মিক দর্শনে আমার কিছু অবদান থাকবে। তিনি শুনে খুশি হলেন
কিন্তু কোনও মন্তব্য করলেননা। কথামৃত পাঠের নির্দেশ দিয়ে কয়েক মিনিটের জন্য ঘরের
বাইরে গেলেন।
উনি
বাইরে গেলে আমি সুশীলবাবু ও বঙ্কিমবাবুর কাছে ক্ষমা চাইলাম। বললাম- আমি বড্ড বেশি
সময় ধরে নিজের কথা বললাম। একথার উত্তরে ওরা দুজনেই আমাকে জানালেন, মোটেই এমন কিছু
নয়। বরং কথাগুলো শুনতে তারা খুবই আগ্রহ বোধ করছিলেন। ভবিষ্যতেও আমি যেন এভাবেই
শ্রীজীবনকৃষ্ণর কাছে নিজের কথা বলি।
২৮শে ফেব্রুয়ারি ১৯৬১
অরুণ এসে আমার ঘরে শ্রীরামকৃষ্ণের
ছবি টাঙিয়ে দিলো। সে প্রায় দু’ঘণ্টার ওপর রইল এবং শ্রীজীবনকৃষ্ণের সঙ্গে প্রথম
পরিচয়ের পর তার বিভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা শোনালো। শ্রীজীবনকৃষ্ণের আল্পুকুর ও বেনারস
ভ্রমণের কথাও বলল। তাঁর সঙ্গে যে ছেলেছোকরার দোল গিয়েছিল, অরুণ তাদের মধ্যে একজন।
তাঁর
সঙ্গে যারা গিয়েছিল, তাদের মধ্যেই কারো কারো উচিত ওই সময়ের সব অভিজ্ঞতা বিস্তারিত
ভাবে লিখে রাখা। আমার তাই মনে হয়।
৮ই
মার্চ ১৯৬১
শ্রীজীবনকৃষ্ণ জিজ্ঞেস করাতে আমি
সেদিন দুপুরে তন্দ্রার ঘোরে যে স্বপ্নটি দেখেছিলাম সেটি বললাম। স্বপ্নঃ বাড়ি যাবার
জন্য একটি ছ্যাকরা গাড়ি ভাড়া করা হয়েছে। সকলে গাড়ির ভেতরে বসলেও আমি কোচ বাক্সে
বসেছি। বাড়ির কাছাকাছি এসে দেখতে পেলাম, পথ চড়াই। বাড়িটা বাংলো প্যাটার্নের।
জায়গাটা যেন সিমলা পাহাড়ের মতো। শ্রীজীবনকৃষ্ণ শুনে বললেন- গাড়ি অর্থ গতি। কুণ্ডলিনী
জাগছেন। তবে এখনও অনেক পথ বাকি। কোচ বাক্সে উন্মুক্ত আকাশের তলায় বসার অর্থ
‘মুক্ত’।
জাতীয়
অধ্যাপক শ্রীসত্যেন বোসের সঙ্গে কোনও সূত্রে আলাপ ছিল। শ্রীজীবনকৃষ্ণ বললেন- ঘোষ
সাহেব, যান, আপনার বন্ধুর (সত্যেন বোস) কাছে এই বইটি (রিলিজিয়ন এন্ড রিয়ালাইজেশন)
হাতে নিয়ে যান। দেখুন তিনি কি বলেন। আমি সম্মতি জানালাম।
১১ই
মার্চ ১৯৬১ শনিবার
ধীরেন ও অরুণ এলো। চা খেয়ে আমরা
তিনজনে হাওড়া গেলাম। আমি শ্রীজীবনকৃষ্ণকে অধ্যাপক বোসের সঙ্গে সাক্ষাতের কথাটা
বললাম। সেখানে আরও একজন পরিচিত বন্ধু থাকায় সাধারণ কথাবার্তা হলো। এখানকার কথা বলে
অধ্যাপক বোসের হাতে বইটি দিতে তিনি আমার সাধু হওয়া নিয়ে মজা করলেন। বললেন, বিখ্যাত
লেখক ও ভজন গায়ক, শ্রীদিলীপ রায়ও নাকি ধর্মে মন দিয়েছেন। তারপর মজা করে বললেন, হয়ত
আমি শুনে থাকব যে ধর্ম ও যুক্তিবুদ্ধি পরস্পর বিরোধী। যাই হোক, তিনি বইটি রাখলেন
এবং জানালেন যে অবশ্যই বইটি পড়তে চেষ্টা করবেন। শ্রেজীবনকৃষ্ণ সব শুনে আমাকে আবার
তাঁর সঙ্গে দেখা করতে বললেন।
কথামৃত
পাঠকালে আমরা শুনতে পেলাম একটি কথা- ঈশ্বরত্বের বিকাশ। শ্রীজীবনকৃষ্ণ আমাকে
একথাটির ব্যাখ্যা করতে বললেন। বলার সঙ্গে তিনি আমার বাঁ হাঁটুতে তাঁর ডান হাতটি
দিয়ে চাপ দিতে থাকলেন। আমি বললাম- এর অর্থ সকলের সঙ্গে এক হওয়া। তিনি খুশি হলেন।
প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই জিজ্ঞেস করলেন যে আমার তখনই কোনও দর্শন হলো কিনা। বললাম- না,
দর্শন হয়নি। তবে বোধ হলো আমি যেন সকলের সঙ্গে এক হয়েছি। তিনি এবং ঘরের আর সকলে
একথা শুনে খুব খুশি হলেন।
১২ই
মার্চ ১৯৬১ রবিবার
নলিনী, অবলা ও ধীরে বাড়িতে এসেছে।
চা খেয়ে আমরা হাওড়ার দিকে রওনা দিলাম। শ্রীজীবনকৃষ্ণের ঘরে পৌঁছতেই তিনি বললেন যে
আমার দর্শনটি নিয়ে তিনি চিন্তা করছিলেন। গতকাল রাতে তিনি যখন আমাকে জিজ্ঞেস
করছিলেন যে আমার কোনও দর্শন হলো কিনা, আমি না বলেছিলাম কারণ স্বপ্নটি এতই
ব্যক্তিগত ছিল যে সকলের সামনে বলতে ইতস্তত করেছি। মনে করেছিলাম, উনি নিশ্চয় এই
সংকোচ ক্ষমা করবেন।
২৪শে
মার্চ ১৯৬১
গতকাল রাতের দেখা স্বপ্নটি আজ
ওঁকে বললাম। স্বপ্নঃ আমি যেন বিদেশে যাবার প্ল্যান করেছি। আর তাই, দোতলার আমার এক
সহপাঠী চৌধুরীর সঙ্গে ফিজিক্সের কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা চালাচ্ছি। আমি তার নাম
জানিনা বলে জিজ্ঞেস করলাম যে তার নাম কি নিতেন্দ্র? নাকি নিত্যানন্দ? এমন সময়ে
নীচের তলা থেকে রোল কল শুনতে পাচ্ছি। আমার নাম দুবার ডাকা হলো। নীচে গিয়ে দেখলাম
আমাকে ‘প্রেজেন্ট’ করা হয়েছে। প্রফেসরের সঙ্গে দেখা করলাম। তিনি তখন চলে
যাচ্ছিলেন। ঝাড়ুদারেরাও সব পরিষ্কার করে চলে যাচ্ছে। প্রফেসর বললেন, পরেরদিন তিনি
আমার বিষয়টা দেখবেন। স্বপ্ন এখানে শেষ। শ্রীজীবনকৃষ্ণ শুনে বললেন- গত সতেরোই
জানুয়ারির স্বপ্নটির পর (I*R) এই স্বপ্নটির মাধ্যমে নিত্যানন্দ অবস্থা
বোঝাচ্ছে। উনি তারপর হাওয়াই থেকে মিসেস মারোজীর পাঠানো একটি চিঠির কথা বললেন।
ধীরেন এলে চিঠিটি আমার হাটে দিয়ে সকলকে পড়ে শোনাতে বললেন। আমি পড়লাম। তিনি ওই
চিঠির একটি কপি দিলেন আমাকে। ১৫ই মার্চ ১৯৬১ তারিখে লেখা ওই চিঠিতে তাঁর দু’খানি
স্বপ্নের কথা আছে। দ্বিতীয় স্বপ্নে তিনি একটি অজানা লোককে দেখেন ও জিজ্ঞেস করেন –
আপনি কি জীবনকৃষ্ণ? উত্তরে লোকটি বলে- হ্যাঁ। তাইতে মিসেস মারোজী তাঁকে হাত জোড়
করে প্রণাম করেন। স্বপ্নটি পড়ে আমি অভিভূত হয়ে গেলাম। ওঁকে বললাম- কি অদ্ভুত!
ভদ্রমহিলা তো হিন্দু পরিবারে জন্মাননি! একজন খ্রিষ্টান! সাতহাজার মাইল দূরে বসে
তিনি ওঁকে নিজের মধ্যে দেখছেন! ওঁর জীবন্ত বর্তমান চেহারা ফুটে উঠছে। ওঁর দেহকে
কেন্দ্র করে এই যে নতুন অবস্থা ফুটে উঠছে, মানুষের ধর্মের ইতিহাসে এ একেবারেই
নতুন।
২রা
এপ্রিল ১৯৬১
নলিনী ধীরেন অরুণ রঘু আর সউরেন
এসেছে। চা খেয়ে আমরা গন্তব্যে রওনা দিয়েছি। রবিবার বলে ঘর একেবারে ভরা। গরমকাল বলে
প্রায় সকলেই মেঝেতে শ্রীজীবনকৃষ্ণের কাছে বসে। উনি দক্ষিণের জানলা বরাবর দরজার
কাছে মেঝেতে বসে। আমরা কথামৃত পাঠ ও তার ব্যাখ্যা শুনতে পাচ্ছি। শ্রীজীবনকৃষ্ণের
সান্নিধ্যে বেশ ক’ঘণ্টা বুঁদ হয়ে কাটাবার পর আমি ফিরব বলে বেরিয়ে এলাম। চারু
ভট্টাচার্যও সেই সঙ্গে বেরিয়েছে। বাসে আমাদের দেখা হলো। বাসে বসে সে আমাকে তার
দেখা একটি স্বপ্নের কথা বলল। স্বপ্নটি নাকি আমাকে নিয়ে। এই স্বপ্নের কথা সে গতকাল
নলিনীকে বলেছে। সম্ভবত নলিনী বাকিদের বলেছিল। আর তাই আজ সকলে আমাকে দেখতে এসেছিল
মনে হলো।
৪ঠা
এপ্রিল ১৯৬১(মঙ্গলবার)
হাওড়া এসে ওঁর কাছে বসে আমি
প্রথমেই চারুর স্বপ্নটির কথা ওঁকে বললাম। সে স্বপ্নটি চারু ক’দিন আগে দেখে রবিবার
আমাকে জানিয়েছিল। চারুর স্বপ্নটি এরকম- শ্রীজীবনকৃষ্ণ তাঁর ঘরে খাটে শুয়ে খবরের
কাগজ পড়ছেন। রামকৃষ্ণ ঘোষ, তাঁর অন্যতম নিত্য সঙ্গকারী, ঘরের দরজার কাছে বসে খবরের
কাগজ থেকে আবহাওয়ার খবর বলছেন। এরপর চারু দেখছে, একটি সুন্দর বাগানে এক অপরূপা
রমণী। বাগানের মাঝখানে একটি সুন্দর কাঁচেড় বাড়ি। সূর্যালোকে সেটি ঝকঝক করছে।
বাড়িটিতে বাথরুম ইত্যাদি আধুনিক বন্দোবস্ত আছে। তিনি দেখলেন ধুতি পাঞ্জাবী পরিহিত
‘ঘোষ সাহেব’ (আমি) সেই কাঁচেড় বাড়ির দরজা খুলে বেরিয়ে আসছেন। তাঁর মুখে সেই পরিচিত
হাসি, যেমনটি কদমতলার ঘরে দেখা যায়। স্বপ্নটি শেষ। চারু এলে তিনি চারুর কাছে
স্বপ্নটি আবার শুনতে চাইলেন। চারু ঘরে উপস্থিত সকলকে স্বপ্নটি আবার বলল।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ বললেন, কাঁচের ঘর ও তার থেকে বেরিয়ে আসার অর্থ, ব্রহ্মজ্ঞান ও
সন্ন্যাসীর অবস্থা। ব্রহ্মজ্ঞান অর্থ পরম জ্ঞান, আর সন্ন্যাসী হলেন তিনিই যার
সম্যক রূপে ত্যাগ হয়েছে। সংক্ষেপে, এই মানব শরীরই আমাদের একমাত্র সম্পদ। তাই এই
ত্যাগের অর্থ দেহ ও আত্মা পৃথক হওয়া। তিনি আরও বললেন- শ্রীজীবনকৃষ্ণ ও
শ্রীরামকৃষ্ণ দৃশ্যটি দেখছিলেন। এর অর্থ, ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ হয়ত আমার বাবাকে
বীজটি ডান করেছিলেন। বীজ অর্থাৎ আত্মিক শক্তি।
শ্রীজীবনকৃষ্ণের
এই ঠাকুর কর্তৃক আমার বাবাকে শক্তি সঞ্চারের ধারনাটা সম্ভবত কয়েকদিন আগে আমার থেকে
শোনা কিছু কথা থেকে হয়েছে। আমি জানিয়েছিলাম যে, ঠাকুরের অন্যতম অন্তরঙ্গ, নাট্যকার
শ্রীগিরিশচন্দ্র ঘোষ ও আমার বাবা একই পাড়ার লোক ও বাল্যবন্ধু ছিলেন। শ্রীরামকৃষ্ণ
কলকাতায় বলরাম বোসের বাড়ি থেকে বেরিয়ে যখন অন্যান্য ভক্তবাড়ি যেতেন তখন আমাদের
বাড়ির সামনে দিয়েই যেতেন। বলরাম বোসেদের বাড়ি আমাদের বাড়ি থেকে একশো গজের মধ্যে।
৭ই মে ১৯৬১
ধীরেন অবলা ও অরুণ এসেছে আমার
এখানে। চা খাওয়ার পর আমরা কদমতলা রওনা হলাম। সেখানে পৌঁছে পরস্পর কুশল বিনিময়ের পর
শ্রীজীবনকৃষ্ণ আমাকে মিস্টার মারোজীর আর একখানা চিঠি হাতে দিলেন। এ চিঠিতে কতগুলি
স্বপ্নের কথা আছে। সাত হাজার মাইল দূরে, হাওয়াইতে বসে তিনি এগুলি দেখেছেন।
৮ই মে ১৯৬১
দুপুর আড়াইটের সময় ধীরেন এলো। তার হাতে তখন
শ্রীজীবনকৃষ্ণের লেখা কথামৃতর যৌগিক ব্যাখ্যার পাণ্ডুলিপি। চা খেয়ে হাওড়া গেলাম।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ আবার সেদিন বললেন, ছেলেছোকরাদের অজ্ঞাতেই কোনো নারীসঙ্গ, তা যত কম
সময়ের জন্যই হোক না কেন, তাদের ক্ষতি করছে। তিনি
জিজ্ঞেস করলেন, আমি কোনো স্বপ্ন দেখেছি কিনা। উত্তরে জানালাম, গতরাতে একটি স্বপ্ন
দেখেছি। স্বপ্নঃ আমি যেন ধ্যানের জন্য আসনে বসেছি। কিছুতেই একাগ্র মনোযোগ আনতে
পারছি না। এইরকম অসন্তোষের মধ্যে চোখ খুলে দেখি আমার বাঁ দিকে জীবনকৃষ্ণ আসন করে
বসেছেন। তিনি আমার দিকে চেয়ে মধুর স্বরে বললেন – না, ওভাবে হবেনা। আমি আবার চোখ
বন্ধ করলাম, এবং সফল না হওয়াতে চোখ খুলে ওঁকে জিজ্ঞেস করলাম – আমার হচ্ছেনা কেন?
তিনি আবার বললেন – ওভাবে হবেনা। তখন আমি জানতে চাইলাম – কি করতে হবে? কিন্তু এ
প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে তিনি অদৃশ্য হয়ে গেলেন। স্বপ্ন এখানে শেষ। আমি তাঁর দিকে
চেয়ে আছি, তিনি কি ব্যাখ্যা দেন। তিনি বললেন – বিবিদিষায় সফল হওয়া যায় না। বিদ্বতে
হয়। আপনা থেকে হয়। আমি আর তাঁকে জিজ্ঞেস করতে পারলাম না যে একটু তবে বিশদে বলুন কি
করে স্বতঃস্ফূর্ত বিকাশ ঘটে। বোধ হয় তখন আমি সচেতনে মনকে স্থির করতে চাইছিলাম।
এভাবেই নিজের অজান্তে অবাঞ্ছিত চিন্তা ঢুকে পড়ছিল মনে। যখন সেই আজেবাজে চিন্তাকে চিহ্নিত
করতে পারলাম তখন রমন মহর্ষির শিক্ষাপদ্ধতি অনুযায়ী তার উৎস বিশ্লেষণ করতে লাগলাম। দেখলাম, কামনা এবং অবচেতনের ইচ্ছাই এর
জন্মদাতা।
১২ই মে ১৯৬১, শুক্রবার
কদমতলার ঘরে গিয়ে বসেছি, লক্ষ্য
করলাম শ্রীজীবনকৃষ্ণ বেশ চড়া অবস্থায় রয়েছেন। প্রায় সময়ই কথামৃত ব্যাখ্যা করতে
করতে সমাধিস্থ হয়ে পড়ছেন। এ অবস্থায় তিনি কথামৃতর কিছু কিছু কথার কঠোর সমালোচনা
করছেন। ঠাকুরের পাঁচটি কথার উল্লেখ করে বললেন, এগুলি প্রমান কর। পাঁচটির মধ্যে
দুটি হল, ১ – সচ্চিদানন্দ গুরু, ২ – ‘সহজ না হলে সহজকে যায় না চেনা’। শ্রী রাম
দত্তের বাগানে এক সাধুর সঙ্গে সাক্ষাতের পর ঠাকুর দ্বিতীয় কথাটি বলেছিলেন। আমি যা
বুঝতে পারলাম, ঠাকুর ‘সচ্চিদানন্দ’ বলতে দেহের মধ্যে সচ্চিদানন্দ গুরুর অস্তিত্বকে
বোঝাননি। আর দ্বিতীয় কথাটিও কদমতলায় শ্রীজীবনকৃষ্ণের কাছ থেকে আমরা যে একত্বের
ধারনা পেয়েছি তার অনুসারী নয়।
১৮ই মে ১৯৬১, বৃহস্পতিবার
সকালবেলায় নলিনী এসে তার একটি
অদ্ভুত স্বপ্নের কথা জানালো। সে জীবনকৃষ্ণের শরীরের মধ্যে বিশ্বরূপ দর্শন করেছে।
এমনকি সেই বিশ্বের মধ্যে সে নিজেকেও দেখতে পেয়েছে। তাইতে ভীষণ আনন্দ হয়েছে। আমাকে
অনুরোধ করেছে আমি জেন ওঁকে স্বপ্নটা বলি। সেদিন
বিকেলে কদমতলায় গেলাম। বড্ড গরম পড়েছে। সবাই মেঝেতে বসেছিল। বেশির ভাগেরই খালি গা।
আমাকেও জামা খুলে মেঝেতে বসতে বলা হল। কিছুক্ষণ পরে শ্রীজীবনকৃষ্ণকে নলিনীর দেখা
স্বপ্নটি বলার সুযোগ হল। উনি শুনে খুব খুশি হলেন ও বললেন এটি ভগবান দর্শন। এরপর
দেবকুমার এসে নলিনীর স্বপ্নটি বলতে উনি খুব হাসলেন। কারণ নলিনীর অনুরোধে তাঁকে একা
একা গোপনে স্বপ্নটি শুনিয়েছিলাম। রাতে বাড়ি ফেরার পর পর ধীরেন আর রঘু
এলো। তারা নলিনীর স্বপ্নটি সবিস্তারে শুনতে চায়। বিশ্বরূপ দর্শন একটি অত্যন্ত বিরল
অনুভূতি। তাই এরা এত উৎসুক।
২০শে মে, ১৯৬১, শনিবার
কদমতলায় যতক্ষণ ছিলাম ততক্ষণই
শ্রীজীবনকৃষ্ণকে খুব চড়া অবস্থায় থাকতে দেখলাম। তিনি আমাকে স্বামী বিবেকানন্দের যে
চিঠিতে একত্বের কথা আছে সেখান থেকে পড়তে বললেন। সেদিন সন্ধ্যায় ফেরার সময় উনি
আমাকে স্পর্শ করতে আমার শরীরে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল।
২৩শে মে, ১৯৬১, মঙ্গল বার
সকালবেলা নলিনী আমাদের বাড়িতে এসে
তার আগের রাতে আমাকে নিয়ে দেখা একটি স্বপ্ন বলল। স্বপ্নঃ
“আমি দেখলাম আপনি ঘরোয়া পোষাকে আপনার বসবার ঘরে কতগুলি লোকের সঙ্গে বসে আছেন। আপনি
তাদেরকে তত্ত্বকথা বলছেন এবং তারা একে একে সমাধিতে ডুবে যাচ্ছে”। সে ঠাট্টা করে
বলল, আমি একজন সিদ্ধপুরুষ। সন্ধ্যেয়
কদমতলা যেতে শ্রীজীবনকৃষ্ণ দর্শনের কথা জানতে চাইলেন। বললাম, আমার কোনো দর্শন
হয়নি, তবে নলিনী আমাকে নিয়ে একটা স্বপ্ন দেখেছে। স্বপ্নটা তাঁকে বলতে উনি বললেন যে
এই স্বপ্নের অর্থ আমি আচার্য। আরও বললেন যে সমাধি কখনও আন্তরিক হতে পারে কখনও বা
সমাধির বাহ্যিক চিহ্নও প্রকট হয়। স্বপ্নে লোকগুলির প্রথম ধরণের সমাধি হয়েছিল। আমি
তাঁকে বললাম, এ কথার অর্থ বোধগম্য হল না। উনি বললেন – কেন? স্বপ্নই তো বোঝাচ্ছে যা
কিছু হয়েছে তা ভেতরে! সকালে
শশাঙ্ক সিংহের সঙ্গে দেখা হওয়ার কথা বললাম। তিনি বললেন, গত রবিবার শ্রীযুক্ত সিংহ
এসেছিলেন। তাঁর দুই মামা রামকৃষ্ণ মিশনে দীক্ষা নিয়েছেন। শ্রীজীবনকৃষ্ণ তাঁর
অল্পবয়সে শ্রীশ্রীসারদা মাকে দেখেছিলেন ও তাঁর হাত থেকে প্রসাদ খেয়েছিলেন। খানিক
আলোচনার পর শ্রীজীবনকৃষ্ণ আমাকে দু’বার তাঁকে কৃপা করতে বললেন। আমি কিছু না বুঝতে
পেরে চুপ করে রইলাম। ওখানে তড়িৎবাবুর একটা স্বপ্নের কথা শুনলাম, যার অর্থ, বিদেশে
স্বামিজী ও শ্রীজীবনকৃষ্ণ খুব প্রচারিত হবেন। আমরা কেউ কেউ ভাবলাম, উনি হয়তো
বিদেশে যাবেন।
৪ঠা জুন, রবিবার
ধীরেন আম ও সন্দেশ নিয়ে এলো। তারপর আমরা কদমতলা রওনা হলাম।
আমি মে মাসের তেইশ তারিখের পর কদমতলা যাইনি। ধীরেন তাই আমাকে ওর সঙ্গে যেতে বলল।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ পরম আদরে আমাদের
ডেকে নিলেন এবং আমরা বসার পর জিজ্ঞেস করলেন এর মধ্যে কোন নতুন স্বপ্ন দেখেছি কিনা।
আমার একটি স্বপ্ন ছিল দিনের বেলায়, সেটি বললাম। স্বপ্নটি এরকমঃ ভূপতি ঘরে এসে
আমার সামনে চেয়ার টেনে বিছানার উপর ঝুঁকে বসলো। রাখাল তখন বাইরের জানলা দিয়ে
রাস্তা থেকে ওর সঙ্গে কথা বলল। এখানে দৃশ্য শেষ। কিন্তু তারপরেই আমি আপনাকে (শ্রীজীবনকৃষ্ণকে)
দেখলাম। হাতে একটি লাঠি এবং পরনের ধুতিটা লুঙ্গির মতন করে পরা। চেয়ারে এসে বসলেন।
আপনাকে একটু বয়স্ক দেখাচ্ছিলো। কোনো কথা হল না। স্বপ্নটি এখানেই শেষ।
তিনি স্বপ্নের অর্থ বললেন আমি ভূপতি হয়েছি।
কিন্তু তাঁকে দেখা সম্পর্কে তিনি কিছু বললেন না। কিছু পরে তিনি জিজ্ঞেস করলেন যে, তাঁকে
কি খুব বেশি বয়স্ক লাগছিল? উত্তরে আমি বললাম -না।
কথামৃত পড়া শেষ হলে, তিনি আমায় আমার মঙ্গলের
জন্যই, শিকাগোতে স্বামীজীর বেদান্ত সম্পর্কে বক্তৃতা পড়তে বললেন। আমি জোরে জোরে
পড়তে শুরু করলাম। পড়ার মাঝে তিনি প্রায়ই ব্যাখ্যা দিতে থাকেন। ফলে পাঠ শেষ হতে
সন্ধ্যে সাড়ে সাতটা বেজে গেল। তারপর বাড়ি ফিরলাম।
সাতাশে জুন বুধবার ধীরেন
ফোন করে কদমতলা যাবার কথা বলতে রওনা হলাম। আমি পৌঁছানো মাত্রই জীবনকৃষ্ণ শ্রীযুক্ত
মারোজির সদ্য আসা চিঠিটি হাতে দিলেন ও পড়তে বললেন। চিঠিতে শ্রীমারোজি আমেরিকায়
ভারতীয় সাধুদের প্রভাব সম্পর্কে লিখেছেন। তিনি খুব স্পষ্ট ভাষায় তাঁর শোনা কথা কটি
ও সেবিষয়ে তিনি নিজে কি ভাবছেন তা লিখেছেন। এছাড়া চিঠিতে তাঁর তিনটি স্বপ্ন আছে
যেখানে তাঁর আগম ও নিগমের অনুভূতির কথা আছে। একটি স্বপ্নে তিনি স্বামী
বিবেকানন্দকে দেখেছেন, আর দেখেছেন একটি গোলকের মধ্য দিয়ে বিশ্ব তাঁর সহস্রারে
প্রবেশ করল।
আমাকে জিজ্ঞেস করা হলে আমি খোলাখুলি বললাম যে, তাঁর
ভিতরে সাধুদের সম্পর্কে যে ধারণা জন্মেছে তা প্রকাশ করতে চাইছিলেন। কারণ ওই চিন্তা
তাঁকে অস্থির করছিল।
আমেরিকায় আমার বসবাসকালে (১৯২০-১৯৩৯)
আমি এমন বহু সাধুর কথা শুনেছি এবং কয়েকজনকে দেখেওছি। রামকৃষ্ণ মিশনের সাধু ছাড়া
বাকিরা জানো ওখানে পর্যাপ্ত উপার্জনের আশায় গিয়েছেন।
স্বপ্ন সম্পর্কে অবশ্য আমি ব্যাখ্যা দিতে অপারগ,
সেকথা জানালাম। আরো একটি চিঠি এক বিহারী ভদ্রলোক দিয়েছেন। তিনি একজন ডেপুটি। সদ্য
শ্রীজীবনকৃষ্ণর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছে। চিঠিতে তিনি তার চাকরি জীবনে উন্নতি ও আরো
কিছু সাফল্যের ইঙ্গিতের উল্লেখ করেছেঙ।
১৮ই জুন, রবিবার
ধীরেন, অবলা ও অরুণের সঙ্গে কদমতলা গেলাম।
রবিবার বলে ঘরে বহু লোকের সমাবেশ। কেউ একজন স্বপ্ন দেখেছেন জীবনকৃষ্ণ হাতে দস্তানা
পড়ে একটি কাঁঠাল ভেঙে ঘরে সবাইকে দিচ্ছেন। কাঁঠালের আধখানা তখনও অবশিষ্ট। পাকা রসালো
কোয়া হলো অগণিত মস্তিষ্কের কোষ।
সন্ধ্যে সাতটা নাগাদ আমি বেরিয়ে এলাম। শ্রীজীবনকৃষ্ণের
কাছে বিদায় নেবার সময় তাঁকে জানিয়ে এলাম, আমি কয়েক সপ্তাহের জন্য শিমুলতলা
যাচ্ছি।
No comments:
Post a Comment