১৯৫০ থেকে ১৯৫৩ সালের কিছু কথা সংকলিত করা হয়েছে শ্রীজীবনকৃষ্ণ সংশ্রয় থেকে। যেহেতু সেখানে দিনলিপিতে তারিখের উল্লেখ নেই, তাই এখানে তারিখের উল্লেখ সম্ভব হলনা। মাস অনুসারে মোটামুটি একটা ভাগ অনুসরণ করা হল। এই দিনলিপির লেখক শ্রীঅনাথ নাথ মণ্ডল। এছাড়া শ্রীযুক্ত আনন্দমোহন ঘোষের স্মৃতিকথা, ‘কত কথা পড়ে মনে’ থেকেও উক্ত সময়ের স্মৃতির উল্লেখ রইল। বলা বাহুল্য, উনিও দিনের সূচী রাখেননি। বর্ষক্রম অনুসরণ করে ও অন্যান্য লেখার সঙ্গে মিলিয়ে এখানে সামঞ্জস্য রেখে উদ্ধৃতি দেওয়া হল। ১৯৫৩ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত শ্রীজীবনকৃষ্ণের কথাগুলি একত্র করার জন্য মাণিক্যে প্রকাশিত যাবতীয় দিনলিপি থেকে সংকলিত করা হলো। এর ফলে তাঁকে কেন্দ্র করে এই বারো বছরের আধ্যাত্মিক বিবর্তনের একটি স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যাবে। যেহেতু দিনলিপিগুলি আলাদা করে প্রকাশিত হয়েছে তাই ব্যক্তিগত স্বপ্নদর্শন ও কথা এই সংকলনে যোগ করা হয়নি। দিনলিপিগুলির দিনানুক্রমিক সূচী, মাণিক্য বর্ষ ও সংখ্যা, লেখকের নাম, ও পৃষ্ঠাসহ পরিশিষ্টে উল্লেখ রইল। ইচ্ছে হলে যাতে মাণিক্য থেকে অংশটি পড়ে নেওয়া যায়।
১৯৫০ খৃষ্টাব্দ
ডিসেম্বর মাস
১) সে সময় শ্রীজীবনকৃষ্ণের মুখ প্রায় অপর কারোর মুখ হয়ে যেত। উনি ঘরের সকলকেই প্রায় জিজ্ঞাসা করতেন,’'বলুন তো এবার কার মুখ হয়েছি?” গৌরবাবু (বড় গৌর) সঙ্গে সঙ্গে বলে দিতে পারতেন। এ অবস্থাটা গৌরবাবুর মাস ছয়েক স্থায়ী হয়েছিল।
(শ্রীজীবনকৃষ্ণ তখন চাকুরিজীবি। সেসময় তিনি কেবল শনি রবি ও ছুটির দিনগুলোতে মেলানি দিতেন। ঘরে আসছেন অনাথ নাথ মণ্ডল, নগেনবাবু, সত্যবাবু, বিষ্টুবাবু (পাল), গৌরবাবু, লোকেনবাবু, প্রমুখ হাতে গোনা কয়েকজন।)
২) এক রবিবার। সত্যবাবু ওঁর খাটে মাথা ঠেকিয়ে দাঁড়াতেই উনি বললেন, ‘আসুন আসুন, খাটে বসুন।‘ সত্যবাবু বললেন—না না, আমি চেয়ারেই বসছি। সত্যবাবু চেয়ারে বসার পর উনি বললেন—দেখুন, যাদের অহংকার আছে তাদের আমি খাটে বসাই। তা দেখলুম আপনার অহংকার নেই।
(ঘরে আরও যারা সেসময় এসেছেন, তারা আগে উল্লিখিত মানুষ ছাড়াও ফেলুবাবু, মহারাজদা (কেষ্ট মহারাজ), বসন্তবাবু, নিমাই ইত্যাদি)
লোকেনবাবু তাঁর একটি স্বপ্ন নিবেদন করলেন। স্বপ্নটি আমার মনে নেই। স্বপ্নটি শুনে উনি খাটে বসে একরকম ব্যাখ্যা করলেন। তারপর খাট থেকে নেমে মেঝেতে দাঁড়িয়ে আর একরকম ব্যাখ্যা করলেন। আবার বাইরে থেকে ফিরে এসে অন্যরকম ব্যাখ্যা করলেন। তারপর খাটের দক্ষিণদিকে জল খেতে গিয়ে একরকম ব্যাখ্যা করলেন, আবার জল খেয়ে খাটে বসে আর একরকম ব্যাখ্যা করলেন। সবশেষে বললেন, ‘দেখ, স্বপ্নের ঠিক ঠিক ব্যাখ্যা করা ভারি শক্ত। ও যে দেখিয়েছে, সেই ব্যাখ্যা দিয়ে দেবে। স্বপ্নের কোনোদিন যেন ব্যাখ্যা করতে যেও না।‘
কথা প্রসঙ্গে বললেন—যে চৈতন্য মসেসের ভেতর অবতরণ করেছিল, সেই চৈতন্য মহম্মদের ভেতর অবতরণ করেছিল, সেই চৈতন্য ঠাকুরের ভেতর অবতরণ করেছিল আবার সেই চৈতন্য এখানে অবতরণ করেছে। আমরা দেখতে পাচ্ছি কী? না, ফারদার ফারদার ডেভলাপমেন্ট হয়ে চলেছে।
বললেন, অবতারত্ব সাধনের একটা শ্রেষ্ঠ অঙ্গ।
‘সক্রেটিসও অবতার’, এই কথা বলে তিনি একদিন সমাধিস্থ হয়ে গেলেন।
বললেন—জগতের আর কোনও আচার্যের (ঠাকুরের মতো) এরকম ঘন ঘন সমাধি হতে দেখা যায় না। মহাপ্রভুর হতো, তবে বেশির ভাগ সময়েই দশাপ্রাপ্তি। আর ইউরোপে দেখা যায় সক্রেটিসের ছ সাত ঘণ্টা ধরে অজ্ঞান হয়ে থাকা, যাকে ওরা নাম দিয়েছে এপিলেপ্টিক ফিট। ঋষিদের মধ্যে এসব ছিল। তাঁরা বলছেন শারীরী বিদ্যা। তাঁদের কাছে এ বস্তু করামলকবৎ ছিল। অর্থাৎ করতলে একটা আমলকীকে রেখে যেমন ইচ্ছে নাড়াচাড়া করা যায়, তেমনি এই বিদ্যাকেও তাঁরা কন্ট্রোল করতেন।
জানুয়ারী ১৯৫১
মাস্টারমশাই কথামৃতে একজায়গায় বলছেন, ‘নরেন্দ্র যখন আসে যেন একটা কাণ্ড সঙ্গে করে আনে।’ ঠাকুর তার উত্তরে বলছেন—হ্যাঁ, একটা কাণ্ডই বটে। শ্রীজীবনকৃষ্ণ শুনে বললেন—এখানে ঠাকুর বলতে চাইছেন, তিনি যেন গুঁড়ি, আর স্বামীজি যেন তাঁর কাণ্ড। মাস্টার মশাই কিন্তু অন্য কথা বলেছেন। (সম্ভবত মাস্টার মশাই বলতে চেয়েছেন একটা হইহই ব্যাপার)।
কথায় কথায় বললেন, মাস্টার মশাই খুব ইনটেলিজেন্ট ছিলেন।
এক জায়গায় পড়ছি, ঠাকুর স্বামীজিকে বলছেন—নরেন্দ্র, ধর এক খুলি রস রয়েছে, আর তুই মাছি হয়েছিস। তুই কোথায় বসে রস খাবি? স্বামীজি উত্তরে বলছেন—কেন? আমি খুলির কিনারে বসে রস খাব!
উনি তখনই বললেন—দেখুন দেখুন, স্বামীজির কতদূর হবে, ঠাকুর সেকথা স্বামীজির মুখ দিয়ে বলিয়ে নিচ্ছেন। মশাই, মানুষ জানে না যে, সে যখন কথা বলে, তার কথার মধ্য দিয়েই তার অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে সমস্ত বলে যায়। এ বড় অদ্ভুত কথা।
ঘরে লোকেনবাবু হরেনবাবু ইত্যাদি সব আছেন। একটি প্রসঙ্গে লোকেনবাবু ওঁকে প্রশ্ন করলেন—আচ্ছা, যদি আমাদের কেউ আপনার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে, উনি আপনাদের কে হন? তখন কী বলব? উনি উত্তরে বললেন—কেন গো? বলবে যে, “উনি আমাদের পরম বন্ধু।”
মে ১৯৫১
হরেনবাবু এসময় প্রায়ই নিজেকে রাধা রূপে ও ওঁকে কৃষ্ণ রূপে দেখতেন। নানারকম দর্শন হয়েছে ওঁর। এ প্রসঙ্গে উনি একদিন বললেন—গত পরশুদিন ধ্যান করছি। হঠাৎ ধ্যান ভেঙে গিয়ে দেখি ‘হরেন হরেন’ জপ করছি। তারপর ‘রাধা রাধা’ জপ করছি। তখন ভাবলুম তবে কি হরেন ‘শ্রীরাধা’? ও মশাই, কিছুই বলা যায় না। দেখুন না, মহাপ্রভু অমন দশাসই গদাধর প্রভুকে বলছেন—তিনি শ্রীমতীর অবতার। যাই হোক, আপনি কিছু বলবেন না। হরেন আজ এলে আমিই ওকে জিজ্ঞেস করব, দেখি ও কী বলে।
হরেনবাবু এসে ডেক চেয়ারে বস্তে যেতেই উনি চিৎকার করে বললেন—এই হরেন, বল তুই কে? …হরেনবাবু কাঁপা গলায় জবাব দিলেন—আমি মেয়ে। উনি আবার প্রশ্ন করলেন—ঠিক করে বল, তুই কে? হরেনবাবু ভাবস্থ হয়ে বললেন—আমি শ্রীমতী।
অক্টোবর ১৯৫১
শারদীয়ার পর বিজয়া দশমীতে লোক সমাগমের পর হরেনবাবু একগ্লাস সিদ্ধি ও একবাক্স সন্দেশ নিয়ে গিয়ে ওঁর খাটের ওপর রাখলেন। উনি ওই দেখে ভীষণ রেগে গিয়ে বড় গৌরবাবুর জামাই শৈলদাকে বললেন—বাবা শৈল, এসব নীচে সরিয়ে রাখ তো। …কেউই সন্দেশ নিলে না। সকলের মাথায় তখন অপরিগ্রহের বীজ গজগজ করছে। এরপর হরেনবাবু যখন বিদায় নেবার সময় ওঁকে প্রণাম করতে ওঁর সম্মুখে দাঁড়ালেন, তখন বললেন—জীবুদা, তুমি আমার সন্দেশ খেলে না। ও যে ঠাকুরের প্রসাদ। আজ সকালে ধ্যান করার সময় ঠাকুর দৈববাণী করে বলেছিলেন, তুই ওখানে প্রসাদ নিয়ে যাস।
…উনি সন্দেশের কোণা ভেঙে জিভে ফেলে বললেন—হরেন তুই আজ আমার মাথা হেঁট করালি।
এরপর সকলেই সেই প্রসাদ গ্রহণ করলেন।
ডিসেম্বর ১৯৫১
ওঁর ঘরে কিছুদিন যাবার পর উনি সুধীনদাকে ‘আপনি’ থেকে ‘তুমি’ বলে সম্বোধন করতে লাগলেন। এক শনিবার পাঠের পর সুধীনদার সঙ্গী হয়ে জি টি রোড পর্যন্ত গিয়েছি। সুধীনদা বললেন—উনি অমূল্য রতন নিয়ে বসে আছেন।
একদিন কথামৃতে পড়া হচ্ছে—শঙ্করাচার্য চণ্ডালকে বলছেন, ‘এই তুই আমায় ছুঁলি!’ তখন উনি সুধীনদাকে বললেন—“দেখো দেখো সুধীন, শঙ্করের ব্রহ্মজ্ঞান হয়নি।” এ প্রসঙ্গে জগু (বারীন চট্টোপাধ্যায়, প্রায় এই সময়েই ওঁর কাছে গেছিলেন) ওঁকে বলেছিল, “আচ্ছা, শঙ্করের তো ব্রহ্মজ্ঞান হয়নি?” সে কথা শুনে বলেছিলেন—“কে তোকে বলেছে যে, শঙ্করের ব্রহ্মজ্ঞান হয়নি? শঙ্করের ব্রহ্মজ্ঞান হয়েছিল, তবে দেহে বর্তায়নি।”
(এই সময় দুলাল ও জগু আসে।)
১৯৫২
এক গ্রীষ্মের রবিবারে প্রায় দুপুর আড়াইটে নাগাদ আমি আর জগু গিয়েছি। উনি খাটে বসেছিলেন। আমরা দরজার সামনে দাঁড়াতেই বললেন—আয় বাবা আয়। …ওরে, ঋষিরা ব্রহ্মবিদ্যা দান করার জন্য এইরকম ‘হাঁ’ করে বসে থাকত। তবে ব্রহ্মবিদ্যা দানগ্রহণকারীর বয়স কত হওয়া চাই জানিস? আট বছর।
তারপর বললেন, “খাওয়া দাওয়ার পর একটু কাত হয়ে শুয়েছি। অমনি ট্রান্সে দেখছি যে তোদের, নব আর দুলালকে নিয়ে জগতের লোকের দ্বারে দ্বারে অতি দীনহীনভাবে ঘুরে ঘুরে ভিক্ষা করে বেড়াচ্ছি। আর গতকাল রাত্রে স্বপ্নে দেখলুম, আমি দুলালের হাত ধরে একটা বাড়ির ছাদে ঘুরে বেড়াচ্ছি। আর জগু সেই বাড়ির দেওয়ালে লাগানো রাজমিস্ত্রিদের ভারার ওপর দাঁড়িয়ে নানারকম অঙ্গভঙ্গি করছে আর আমরা হাসছি।”
(প্রসঙ্গত, জগুর মধ্যে মুসলমানি সংস্কার খুব প্রবল ছিল। ভারি সরল ছিল। সে ঠাকুরের মুখে দৈববাণী শোনে যে সে শিবরামদাদা, ঠাকুরের ভাইপো, আবার জন্মেছে। এসব বিশদে শ্রীজীবনকৃষ্ণ সংশ্রয়তে আছে।)
১২ই জানুয়ারি ১৯৫৩
কথামৃত পাঠ করছি। এক জায়গায় পড়ছি, যেখানে ইঁদেশের গৌরী পণ্ডিত দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে এসে ঠাকুরকে উদ্দেশ করে বলছেন—কোথা গো পরমহংস বাবু? উনি এই কথা শুনে বললেন—“একে বলে দৈব। এই কথা রেকর্ড রেখে যাচ্ছে যে, এযুগে আর গেরুয়া পরা পরমহংস হবে না। বাবুর বেশে পরমহংস আসবে।”
এক জায়গায় পড়ছি, ঠাকুর বলছেন—“দেখ, সাগর পার হবার জন্য স্বয়ং রামচন্দ্রকে সাগর বাঁধতে হল। কিন্তু তাঁর ভক্ত হনুমান শুধু ‘রাম’ নামের জোরে একলাফে সাগর পার হয়ে গেল।” উনি ঘরে বসা হিন্দুস্থানি সাধুটিকে সহজ ভাষায় বলতে লাগলেন—সুনিয়ে মহারাজ, ভগবানকো সাধন কর কে তব ভগবান হোনে হোতা হ্যায়। পরন্তু উনকা ভকত উনকা নাম লেকে ভগবান বোন জাতা। ভগবান কিধার হ্যায় জি? ভগবান অন্তরমে হ্যায়। এই কটি সে লেকর মস্তক তক ভবসাগর কহতা হ্যায়। জব মনুষ্য কা মন কটি মে রহেতা হ্যায় উসকো কহতা হ্যায় সাধারণ মনুষ্য। কিন্তু জব মনুষ্য কা মন মস্তক মে আতা হ্যায়, তব উহ ভগবান জাতা।”
মার্চ ১৯৫৩
“জড় সমাধিতে সমস্ত প্রাণশক্তি একটি মাত্র বিন্দুতে জড়ো হয়। ঠিক যেন ইউক্লিড’স পয়েন্ট। দ্য পয়েন্ট হ্যাস আ পজিশান, বাট নো ম্যাগ্নিচিউড। …আপনারা ঠাকুরের যে ছবি দেখেন সে হল জড় সমাধির ছবি। কম্ত এর ফিলোসফি ওই ইউক্লিড এর পয়েন্ট এর ওপরে বেস করে। কম্ত বলছেন—পয়েন্ট এন্ড ইটস এক্সিস্টেন্স। আমার সামনে এই বিরাট বিশ্ব। আমি জগত থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে একটি মাত্র পয়েন্ট এ ফিক্সড করছি। তাহলে কী দেখতে পাচ্ছি? এই বিরাট বিশ্বের আরেকটি রূপ হল একটি পয়েন্ট মাত্র। ঠিক বেদান্তের বিরাট ও বীজ।”
ঘর নিস্তব্ধ। বিষ্টুবাবু পাঠ করছেন—কলিতে নারদীয় ভক্তি। উনি বলে উঠলেন—ও মশাই…নারদীয় ভক্তি মানে কি? আমি চুপ করে আছি দেখে বললেন—ওরে বাবা, নারদ ভদ্রলোকের কটা বাড়ি আর কত টাকা ব্যাংক ব্যালেন্স ছিল বল না। নারদীয় ভক্তি মানে সর্বত্যাগীর ভক্তি। …তবে বাবা, ঠাকুরের শিক্ষা হল, খেটে খেতে হবে। রোজগার পেট চলা পর্যন্ত। তা নইলে সর্বত্যাগী সেজে জোচ্চুরি করে পেট চালাতে হবে। বুঝলি?
পড়া হচ্ছিল, কাম যেন মূল, কামনা তার ডালপালা। উনি শুনে বললেন, “আহা ঠাকুরের কী অদ্ভুত দৃষ্টি! ঠাকুর এখানে ফ্রয়েডিয়ান লাইটে কথা বলছেন। এটাই ফ্রয়েডিয়ান সাইকলজির মূল তত্ত্ব। আজ যদি ফ্রয়েড বেঁচে থাকত, আমি তার কাছে গিয়ে বলতুম, দেখো তুমি ঠিক ধরেছ। কিন্তু আরেকটা বস্তু তুমি ধরতে পারো নি। সে বস্তু সম্বন্ধে ঠাকুর যা বলেছেন—কামের উল্টো রাম। তুমি রাম অর্থাৎ ডিভিনিটি সম্বন্ধে কিছুই জানো না।
এপ্রিল ১৯৫৩
বৌদ্ধ দর্শনে বলছে, মানুষ মরে গেলে তার দেহের ফাইভ এলিমেন্টস ডিসইন্টিগ্রেটেড হয়ে যায়। অথচ তারা বলতে পারেনি যে আবার কী করে সেগুলো ইন্টিগ্রেটেড হয়। অথর্ব বেদে কিন্তু একটা উদাহরণ দিচ্ছে, সেটা হল ‘জলৌকা’। জলৌকা (জোঁক) যেমন পরের স্থানটা ধরে তবে পূর্বের স্থানটা ছাড়ে, সেইরকম মানুষেরও দেহের পঞ্চভুত ডিসইন্টিগ্রেটেড হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আবার ইন্টিগ্রেটেড হয়। (পরবর্তী কালে এই অভিমত তিনি আর পোষণ করতেন না।
মশাই এক কথা বারবার বলা মানে অনুশীলন হওয়া। আর, এককথা বারবার বলে আপনাদের মাথায় হ্যামার না করলে আপনারা বুঝতেন আমার ‘যৌগিক রূপ’?
(এই পর্যায়ের সংকলন শ্রীঅনাথ নাথ মণ্ডলের দিনলিপি থেকে।)
****
১৯৫৩ খৃষ্টাব্দ
১৪ই জুন
গতকাল সুধীনবাবুর বন্ধু এসেছিলেন। তিনি স্বপ্ন দেখেছেন, মা কালী ছোট হয়ে এসে কাটারি দিয়ে তাঁকে কোপাচ্ছেন। তারপর দেখছেন মাথার ওপর পায়রার ঝাঁক। শ্রীজীবনকৃষ্ণ আগের দিন এর ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন, কাটারি দিয়ে কোপানো অর্থাৎ গাঁট ছাড়াচ্ছেন, দেহ আত্মা পৃথক। পায়রার ঝাক—বড় আধার।
আর একটা স্বপ্নে দেখছেন—দক্ষিণেশ্বরের মন্দির প্রাঙ্গনে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর আগে আগে চলেছেন। মা কালী ছোট মেয়ের রূপে পেছনে, ও তার পেছনে তাঁর মৃতা স্ত্রী। উনি ব্যাখ্যা দিলেন, বিদ্যাস্ত্রী। স্ত্রী হচ্ছে ধর্মের সহায়।
১৫ই জুন
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—মহাপ্রভু নদীয়ায় বিষ্ণুপ্রিয়া ছাড়া সকলকে দর্শন দিলেন। আর ঠাকুর—তিনি যখন শুনলেন যে মা (সারদা) দক্ষিণেশ্বরে এসেছেন, চটি পায়ে গলবস্ত্র হয়ে মাকে আহবান করছেন আর বলছেন—তুমি এসেছ? মথুর নেই, কে তোমার আদর আপ্যায়ন করবে? তোমার কত কষ্ট হবে—বলে নিজে ঘরে মাকে তুললেন। আর তার কিছুদিন পরে সেই মাকে ষোড়শী পূজা করলেন।
“ভক্ত নিজেকে যত গোপন রাখে তার পক্ষে ততই ভালো।”
“মন যোগযুক্ত হলে অজ্ঞাতে মনের মধ্যে নামজপ সদা সর্বদা হতে থাকে।”
১লা জুলাই
শ্রীজীবনকৃষ্ণ মিডল্যান্ড হোটেলে উঠেছেন। বেঙ্গল বোর্ডিং এ অসুবিধে বুঝে সুধীনবাবু ও কেষ্টদা বহু চেষ্টা করে ওঁকে এখানে আনেন।
রাত আটটা। শ্রীজীবনকৃষ্ণের ভাবাবস্থা। …
বলছেন—বাবুরাম মহারাজের সচ্চিদানন্দগুরু লাভ হয়েছিল। সচ্চিদানন্দগুরু লাভ হবার পর যদি সাধন হয় তাহলে দেহে সব ঠিক মত ফোটে। …মুরারি গুপ্তকে মহাপ্রভু রামনাম ছেড়ে কৃষ্ণনাম করতে বলেছিলেন। কিন্তু সারারাত চেষ্টা করে বিফল হয়ে মহাপ্রভুর কাছে গেলেন। মহাপ্রভু তখন তাঁকে রামনাম ছেড়ে কৃষ্ণনাম জপতে বারণ করেন।
মহাপ্রভুর বিবিদিষার কথায় বললেন—মহাপ্রভু নদীয়ায় এলেন, কিন্তু এক কড়ারে—বিষ্ণুপ্রিয়া ছাড়া আর সকলকে দর্শন দেবেন। আর সে জায়গায় সন্ন্যাসী ঠাকুর নিজের স্ত্রীর জন্য গয়না গড়াতে দিচ্ছেন। মা দক্ষিণেশ্বরে এলেন, ঠাকুর তখন চটি পায়ে গলবস্ত্র হয়ে অভ্যর্থনা করছেন। ওই আমাদের ঠাকুর। মহাপ্রভুকে প্রণাম। এরকম বিবিদিষা মহাপ্রভুর পক্ষেই সম্ভব।
২রা জুলাই
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—পুঁথিতে এমন অনেক কথা আছে যেগুলো কথামৃতে নেই। মাস্টার মশাই শিক্ষিত লোক ছিলেন কিনা, তার ওপর লজিকের মাস্টার ছিলেন। যে জন্য অনেক জিনিস লজিক দিয়ে বিচার করে লেখা। পুঁথি লেখক মুখ্যু লোক কিনা, তাই যেমনটি শোনা তেমনটি লেখা।
…ধ্যান ভাঙার পর জিজ্ঞেস করলেন, কিছু দেখলি নাকি? বললাম—দেখলাম যে অনাথ আপনাকে কথামৃত পড়তে দিচ্ছে। ব্যাখ্যা দিলেন—কথামৃত ছাড়া আমি অনাথ রে।
…কথামৃত পাঠের মাঝে বললেন—ঠিক সাধন হয়ে সহস্রারে মন চলে গেলে সাধারণ মানুষ বাঁচে না। ব্রহ্মজ্ঞানের পর একুশ দিন বাঁচে। যারা বেঁচে থাকে জীবন্মুক্ত হয়ে থাকে আর সদাসর্বদা ঈশ্বরীয় আনন্দ ভোগ করে। তারপর বললেন—কৃষ্ণ অর্থ শূন্য। নির্গুণ ব্রহ্ম। কালো কখন? যখন লাল নয় হলুদ নয় বেগুনি নয় নীল নয়, অর্থাৎ কিছুই নেই।
চাটুজ্যে একখানা গীতা এনেছে। শ্রীজীবনকৃষ্ণ বললেন—গীতা কী হবে? না, পকেটে রাখ। যখনই কারুর হাতে একখানা বই দেখবি সে রাজর্ষি জানবি।
৭ই জুলাই
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—যদি তোর ১৮/১৯ বছর বয়সে এইসব অনুভুতি হতো তাহলে জিজ্ঞাসার দরকার হতো না। এ সমস্ত আপনিই দেহে ধারণা হয়ে যেত। বয়সের জন্য এগুলো ভেতরে অনুভুতি হলেও দেহে ঠিক মতো ফোটে না। রোজ একটু ধ্যান করবার সময় করে নিবি। আর তা নাহলে এখানে সন্ধ্যেবেলা চলে আসবি।
…দাশুবাবু, ফেলুদা ও হরেনবাবুর আসা সম্বন্ধে বললেন, ওদের আর আসবার দরকার নেই। শুধু ভিড় বাড়িয়ে কী হবে? ফেলুবাবুর স্বপ্নে সিস্টেমেটিক (ধারাবাহিক) অনুভুতি প্রসঙ্গে বললেন, ভদ্রলোক ঠাকুরের কৃপায় একেবারে স্বপ্নসিদ্ধ। ওরকম আর দেখা যায়না।
২০শে জুলাই
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—ভগবান ভক্তের ভার নেওয়া মানে তার খাওয়া পরার ভার নেওয়া নয়, দেহকে তাঁর ভার বহনের উপযোগী করার ভার নেন—অর্থাৎ গুরুদেহে সাধন।
২৩শে জুলাই
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—ঠাকুর গেরুয়াধারী লোক পছন্দ করতেন না। মহাপ্রভু সন্ন্যাস নিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দণ্ড কমণ্ডলু ও গেরুয়া ছেড়ে যেটুকু প্রয়োজন অর্থাৎ শ্মশানের ন্যাকড়া ব্যবহার করতেন। মহাপ্রভুই প্রথম বেদের ধর্ম বুঝতেন আর কিছুটা প্রচার করেছিলেন। তাঁর সাধন কিন্তু তন্ত্রমতে। শঙ্করকে যদিও বেদের প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়, কিন্তু বেদের কোন ধারণা তাঁর ছিল না। প্রচ্ছন্নভাবে তিনি বৌদ্ধ ধর্মই প্রচার করেছেন। নারদের ছিল বিজ্ঞানীর অবস্থা। বিজ্ঞানীর অবস্থা নিগমে হয়।
এখন দেখতে পাচ্ছি, ঠাকুর আবার একটা নতুন ফেজ দেখাচ্ছেন। এখানে না এলে কারো দর্শন হচ্ছে না।
২৪শে জুলাই
ভেকের কথায় শ্রীজীবনকৃষ্ণ বললেন—মহাপ্রভু গর্দভকে ভেক দিয়ে প্রণাম করেছিলেন, অর্থাৎ যারা ভেক নেয় তারা গর্দভ।
ঠাকুর পাঁচ টাকা দিয়ে, টাকা মাটি মাটি টাকা, বলে জলে ফেলেছিলেন। আমি দশ টাকা দিয়ে তাই করেছিলাম।
শিবজ্ঞানে জীব সেবা সম্বন্ধে বললেন—আগে শিবজ্ঞান লাভ করো, তারপর না হয় সর্বজীবে দয়া করো। ভগবানকে লাভ করবার পর লোকের আর কি কিছু চাইবার না থাকে, না চায়?
আড়াই হাজার বছর আগে বুদ্ধ বলেছিলেন, যেখানে বোধিসত্ত্ব লাভ হয়, সে স্থান ত্যাগ করে আর কোথাও যাওয়া উচিত নয়। অর্থাৎ বলতে চাইছেন, সেখানে সাধনের উচ্চ অবস্থায় আসা যায়। অন্য জায়গায় গেলে তার হবে না। ঠাকুরও কাশী গিয়ে এই কথা বলেছিলেন—এ আমায় কোথায় নিয়ে এলি মা, দক্ষিণেশ্বরে ছিলাম, বেশ ছিলাম।
পরে বললেন—মহাপ্রভুর মুহুর্মুহু সমাধি হতো। তবে ঠাকুরের সমাধি ও মহাপ্রভুর সমাধিতে তফাত আছে।
ঋষি অরবিন্দের প্রসঙ্গ ওঠায় বললেন—অরবিন্দের তন্ত্রের সাধন। ইষ্ট সাক্ষাৎকার হয়েছিল। এসব হলে কেউ কেউ ভবিষ্যৎ বলতে পারে। তবে সে খুব নীচু অবস্থা। ভগবান লাভের পর কি কেউ আশ্রম করতে চায়? ঠাকুর শম্ভু মল্লিককে বলছেন না, ঈশ্বর যদি সাক্ষাৎকার হয়, তুমি কি হাসপাতাল ডাক্তারখানা এই চাইবে?
সাধুর ব্যবহারিক লক্ষণ দুটো। ১) স্ত্রীলোক হতে সর্বদা দূরে থাকবে। ২) কারো কিছু গ্রহণ করবে না। ঠাকুর এতবার বলে গেছেন এসব কথা। বিজয় গোঁসাইকেও বলছেন—গুরুগিরি বেশ্যাগিরি। কিন্তু শিষ্যরা কি ঠাকুরের কথা বুঝেছিল? বিজয় গোস্বামী কি গুরুগিরি বাদ দিয়েছিল? আর বর্তমানেই বা মঠে আমরা কী দেখছি? সবই উল্টো।
স্বামীজী অত অল্প বয়সে দেহ রাখলেন। তিনি যখন বুঝলেন কর্মই সব নয়, তখন খুবই দেরি হয়ে গেছে। নরনারায়ণের সেবা। নিজে কি নরনারায়ণ হতে বাদ?
২৫শে জুলাই
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—বুদ্ধদেব বেদবিদ্রোহী ছিলেন। আড়াই হাজার বছর আগে বুদ্ধের সময় হতে এই গুরুগিরি চলে আসছে। একমাত্র মহাপ্রভু খানিকটা ভুল বুঝতে পেরেছিলেন। তাই নিজের স্বপ্নে পাওয়া মন্ত্র কেশব ভারতীকে দিয়ে নিজে গ্রহণ করেছিলেন। কঠোর বিবিদিষার মধ্যে থাকতেন বলে কেউ বুঝত না।
শঙ্করের মত প্রতিভাবান পুরুষ আজ পর্যন্ত বোধ হয় কেউ জন্মগ্রহণ করেনি। বেদেতে যে আত্মার মধ্যে জগত এর কথা আছে, সেটাকে তিনি নেবেন না বলেই ‘মনেই জগত’ বলছেন। ঠাকুর এক জায়গায় বলছেন, শঙ্করের ব্রহ্মজ্ঞান হয়নি।
ঠাকুরই এই অদ্ভুত অর্থ করলেন যে ‘ম’ মানে ঈশ্বর, ‘রা’ মানে জগত।
২৬শে জুলাই
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—সচ্চিদানন্দগুরু লাভ হলে অবতার পর্যন্ত সাধন হয়। আত্মা সাক্ষাৎকার না হলে সব সংশয় যায় না। ঈশ্বর কৃপা করে দেহ থেকে মুক্ত হলে তবে মুক্তি। আত্মার মধ্যে জগত দর্শনের নাম বিশ্বরূপ দর্শন। এই যে তোরা দেখছিস, এ একটা কত বড় অদ্ভুত বল তো! ঠাকুর যা সব বলে গিয়েছিলেন, তাই এখন সব তোদের মধ্যে দিয়ে ফুটে উঠছে। ঠাকুরের সময় এসব অনুভূতি কারো হয়নি।
ওসবে কোনও প্রয়োজন নেই। শুধু দুবেলা হাত জোড় করে বেশ করে ঠাকুরকে দুটো প্রণাম করবি। আর শুধু ঠাকুর ঠাকুর করবি।
ওরে সব শেষে কর্ম থাকে না। তোদেরও একসময় কর্ম ত্যাগ হয়ে যাবে। এমনি ছাড়বে না।
৩০শে জুলাই
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—সহস্রারে মন গেলে আর দেহ থাকে না। তাই নগেনবাবু যখন জ্যোতি দেখেছিল আমার ভয় হয়েছিল। আবার নব’র (ত্রিলোচন দত্ত) কথায় বলছেন—ওর প্রাক্তন সংস্কার আছে বুঝতে পারছি। কিন্তু লন্ঠনের চিমনীর কাঁচ ফাটলে আর জোড়া লাগেনা।
আমাদের কথায় বললেন—তোরা নিত্যসিদ্ধ আবার ঈশ্বরকটিও। তবুও আমার ভয় হয়।
আবার নব’র কথায় বলছেন—ওর এই অল্প সময়ের মধ্যে অনুভূতি। ঠাকুরের কথা আছে না—একরকম তুবড়ি আছে, খুব জোরে উঠে হঠাৎ ভস করে ফেটে যায়। বলছি, এত অনুভূতিও ভালো নয়। ও আবার একেবারে নেমে যায়।
…স্ত্রীলোকের সাধন কত দূর—ঠাকুর গোপালের মা’র দ্বারা তার উদাহরণ সৃষ্টি করে গেছেন।
মঠের কথায় বললেন—ওঁরা সব মাস্টার মশায়ের ওপর সদয় ছিলেন না। কারণ কথামৃত বিক্রির টাকা মঠ তৈরিতে দেননি। মাস্টার মশাইকে ঠাকুর রসদদারদের একজন বলে গেছেন। কিন্তু মঠের ওরা অন্য একজনের নাম করে।
ঠাকুর বলেছিলেন, অনুভূতির কথা বলতে নেই। সেই কথাটা কীরকম ভাবে হয়ত বের হয়ে গিয়েছে। ওরা (মঠ) ওই কথাটাই এখন নিজেদের সুবিধেয় লাগাচ্ছে…।
১লা আগস্ট
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—বৈরাগ্য, সংসারে বিরাগ, ঈশ্বরে অনুরাগ। সংসারে যে বিরাগ এসেছে অনেকে বুঝতে পারেনা। তাই ঠাকুর ঈশ্বরে অনুরাগের কথা দিয়ে বুঝিয়ে গেছেন। ঈশ্বরে অনুরাগ হবার সাথে সাথে সংসারে বিরাগ এসেছে বুঝতে হবে।
সহজিয়া সমাধি একমাত্র ঠাকুর ছাড়া পূর্ববর্তী কোনও অবতারের দেখতে পাওয়া যায় না। ঋষিদের মধ্যে দুরকম ছিলেন। একরকম, যারা ঈশ্বর সম্বন্ধে প্রশ্ন করলে বলেন। আর একরকম, যারা কিছুই বলেন না। দাঁতে দাঁত দিয়ে থাকেন। এঁরা বলেন যে, এদের এসব ধারণা হবার নয়। সক্রেটিসের জীবনে দেখতে পাই, তাঁর অনেকদিন অন্তর মাঝে মাঝে সমাধি হতো আর দীর্ঘস্থায়ী হতো। সমাধি মহাপ্রভুর জীবনেও দেখা যায়।
ঠাকুর এই সচ্চিদানন্দগুরুর কথা বলেছিলেন, তা কি তাঁর শিষ্যরা বুঝেছিল? না, বোঝেনি। তাহলে তারা এরকম গুরুগিরি করত না। ঠাকুর জানতেন যে এ যুগে মানুষের অন্নগত প্রাণ। সেইজন্য তিনি স্বপ্নসিদ্ধের প্রচলন করে গেলেন। সাধন ভজন করবার মতো সময়ের অভাব।
আমি একসময় সকলকে বলতাম যে এ হয় না (ওঁর নিজের অবস্থা)। এমনকি আমার কাছে কাউকে আসতেও দিতাম না। তারপর যখন ঠাকুর সব আস্তে আস্তে বোঝালেন, তখন তোদের আসতে দিই।
২রা আগস্ট
সুধীনবাবু কথামৃত পড়ছেন—ঈশ্বরকটি যেমন চৈতন্য ছিলেন।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ বললেন, চৈতন্য শ্রীকৃষ্ণ রূপে কটিদেশ পর্যন্ত অবতরণ করেন। রামানুজের কথায় বললেন, রামানুজকে যারা খাবার পরিবেশন করত তারা তাঁকে দু’বার বিষ খাইয়েছিল। প্রথমবারে যখন খাওয়ায় তিনি যোগবিভূতির দ্বারা বিষের ক্রিয়া নষ্ট করেছিলেন। যারা খাইয়েছিল তাদের বলেছিলেন, ওটা এবার হজম করে নিলাম। দ্বিতীয়বার ওঁর বৃদ্ধ বয়সে খাইয়েছিল। তখন উনি কবিরাজ ডাকতে বলেছিলেন। কবিরাজ ওষুধ দিয়ে সে যাত্রা রক্ষা করেছিলেন।
…নিজের ছেলেকে দেখে আনন্দ হয়, কারণ সে তো তোরই অংশ। এটি হল বাইরের আনন্দ। আবার এই আনন্দ যখন অন্তর্মুখী হয়ে সহস্রারে অবস্থান করে তখন ব্রহ্মানন্দ অর্থাৎ বাইরের এই দেহব্যাপ্ত আনন্দকে যখন সহস্রারে সন্নিবেশিত করা যায় তখনই সমাধি।
১৬ই আগস্ট
শ্রীজীবনকৃষ্ণ সুফী সম্প্রদায়ের কথায় বললেন—মনসুরকে মরুভূমির মাঝে বেঁধে আজ এই অঙ্গের কিছু অংশ কাল অন্য অঙ্গের কিছু অংশ কেটে ফেলে তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল। তাঁকে যখন এইরকম করে হত্যা করা হচ্ছিল তখনও তিনি ‘আনউল হক’ (আমিই সত্য) একথা বলতে ছাড়েননি। এমনকি তাঁর প্রতি রক্তবিন্দু মরুভূমির বালির ওপর যেখানে যেখানে পড়েছিল সেখানেও এই কথা লেখার অক্ষরে ফুটে উঠেছিল।
২২শে আগস্ট
শ্রীজীবনকৃষ্ণ আজ দু তিনদিন হল হাওড়ায় ফিরেছেন।
২৬শে আগস্ট
শ্রীজীবনকৃষ্ণ লীলাপ্রসঙ্গ পড়ছিলেন। বললেন, লীলাপ্রসঙ্গ পড়ি না কে জানিস? ঠাকুরের কথাগুলো বেশ বিশদে বলে যাচ্ছে, কিন্তু যখন নিজে কিছু বলতে যাচ্ছে তখনই সব গোলমাল করে ফেলছে। তাই এই বই পড়তে বসে ভদ্রলোকের আদ্যশ্রাদ্ধ করছি।
এই দেখ না, ঠাকুর নিজে বলছেন আত্মা সাক্ষাৎকার না হলে সব সংশয় যায় না, কিন্তু ভদ্রলোক সে কথা না বলে অন্য বোঝাবার চেষ্টা করছেন। ঠাকুর কি সব খুলে বলতেন যে সকলে সব বুঝবে? ঠাকুর বিশ্বরূপের কথা বলতে ‘মরা’ বললেন। ‘ম’ মানে ঈশ্বর, ‘রা’ মানে জগত। আত্মার মধ্যেই জগত।
এখানে সকলের বেদান্তের অনুভূতি হয়েছে। বেদমতে পঞ্চকোষের সাধন না হলে আত্মা সংকলিত হয়না। সে কি জোর করে কেউ করতে পারে? ঠাকুর যেরকম কৃপা করবেন তা দিয়ে ঠিক সেরকম করিয়ে নেবেন।
২৭শে সেপ্টেম্বর
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—আমি দেখলাম আমার বাঁ পাশের একটা দরজা খুলে গিয়েছে (অনুভূতিতে)। তাতে দেখলাম বহু লোক। …এখন যারা আসছে তারা সবাই ঠাকুরের কৃপা পেয়ে আসছে বুঝছি, কিন্তু তাদের এদিককার কত দূর কী হবে বুঝতে পারছিনা।
মহাপ্রভুর কথা হল। বললেন, নীলাচলে থাকার সময় একদিন মহাপ্রভু দেবদাসীদের গান শুনে মনে করলেন শ্রীকৃষ্ণ বাঁশি বাজাচ্ছেন। ছুটলেন মন্দিরের দিকে। গোবিন্দ গিয়ে তাঁকে ধরতেই মহাপ্রভু তাঁকে বললেন, কৃষ্ণ আমায় ডাকছিলেন, তুমি কেন আমায় ধরলে? গোবিন্দ বললেন, ও কৃষ্ণের বাঁশি নয়, দেবদাসীদের গান। তখন মহাপ্রভু বললেন, তুমি আমায় বাঁচালে গোবিন্দ। কারণ মহাপ্রভু সেই ভাবাবস্থায় শ্রীকৃষ্ণ বলে দেবদাসীদের আলিঙ্গন করতেন, আর নারীস্পর্শে তাঁর দেহ চলে যেত।
ঠাকুর তো বার্নিশ করা জুতো পরতেন, মোজা পরতেন, আবার বনাতের কোট পরতেন। মা ঠাকরুন, মা, ভাইপো, নিয়ে দক্ষিণেশ্বরে থাকতেন। ঠাকুর কি সন্ন্যাসী? শুধু তাই নয়, মা ঠাকরুনকে বলছেন, দেশে তিনখানা ঘর আছে, একখানা তোমার। যা জমি আছে তাতে বছরেরটা হয়ে যাবে। তবুও কি ঠাকুর সন্ন্যাসী? এ তো পুরো সংসারীর কথা—তাই কি? না, তা নয়। ঠাকুর সন্ন্যাসী। তিনি এর দ্বারা বোঝাচ্ছেন যে বিবিদিষার দ্বারা সন্ন্যাসের কোনও প্রয়োজন নেই। মহাপ্রভুর সঙ্গে ঠাকুরের এইখানে তফাৎ। মহাপ্রভু বলছেন, ‘শুন শুন নিত্যানন্দ ভাই, সংসারী জীবের কভু গতি নাই’। এই বলে মহাপ্রভু অভিসম্পাত করছেন বলা চলে। কিন্তু ঠাকুরের যুগে ঠাকুর সেই কথাকে একেবারে উল্টে দিলেন।
২রা অক্টোবর
কথামৃত পাঠের সময় বললেন, ঠাকুরের কথা আছে, কালো পাঁঠা, তার গায়ে একটুও ঘা থাকলে চলবে না। আমি বলি, দেহের প্রত্যেকটা ফাইবারটা (তন্তু) পর্যন্ত শুদ্ধ হওয়া চাই। তবেই সেরকম সিদ্ধ হওয়া যায়। আমি দেখেছিলাম, আমি যেন অবতারদের ঘরে গিয়েছি। আমার গায়ে কোট। তাঁরা যেন দেখে বলছেন, এরকম কাপড় আজকাল হয়না।
১৪ই অক্টোবর
এই মনুষ্যদেহ না হলে ভগবানকে লাভ করা যায়না। ভগবানকে লাভ করার উপযোগী একমাত্র এই দেহ।
১৮ই অক্টোবর, বিজয়া দশমী
শ্রীজীবনকৃষ্ণ একসময় বললেন, দেখ, ঠাকুরের সময় সূর্যমণ্ডল থেকে লোক এসেছিল তার রেফারেন্স পাই। একদিন দক্ষিণেশ্বরে হৃদয়বাবু মায়ের পুজো করছেন, এমন সময় একজন সুপুরুষ লোক, বাঙালির মতো ধুতি পরা, গায়ে একটা চাদর, এসে জিজ্ঞাসা করছে, এখানে রামকৃষ্ণ পরমহংস কোথায় থাকেন? হৃদয়বাবু ওইরকম সুন্দর চেহারা দেখে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কোথা থেকে আসছেন? তার উত্তরে সেই লোকটি বললে, সূর্যলোক থেকে আসছি। হৃদয়বাবুর প্রথমে একথা ঠিক স্ট্রাইক করেনি। তিনি তো তাকে ঠাকুরের ঘর দেখিয়ে দিলেন। তারপর সেই লোকটি প্রাঙ্গণ পার হয়ে ঠাকুরের ঘরের কাছে গেছে, তখন হৃদয়বাবুর হঠাৎ স্ট্রাইক করাতে ছুটে বাইরে এসে দেখলেন, ঠাকুর যেন আগেই দরজা খুলে ওই লোকটির জন্য অপেক্ষা করছিলেন। লোকটি ঘরে ঢুকতেই ঠাকুরও ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলেন। প্রায় তিন ঘণ্টা সেইভাবে ঘরের মধ্যে তাঁদের কথাবার্তা হল। তারপর কেউ সেই লোকটিকে ঘর থেকে বার হতে দেখেনি। কোথায় গেল কেউ বলতেও পারেনি। পরবর্তীকালে ঠাকুরের ছোকরা ভক্তরা হৃদয়বাবুর কাছ থেকে এসব শুনে ঠাকুরকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন। কিন্তু ঠাকুর বলেছিলেন, সে সময় ওরকম অনেক অলৌকিক ব্যাপার ঘটত। সে সমস্ত কথা বলতে নেই।
বললেন—ঠাকুরের দেহ হতেই ওই লোকটি বের হয়েছিল।
২৫শে অক্টোবর
এ যুগে শুধু প্রার্থনা করা। ঠাকুর তোমায় যেন ভাবতে পারি। ডাকতে পারি। এই সুযোগ করে দাও। আর কিছু চাই না। আর এ যুগে সাধন হবেই বা কেমন করে! একদিন না খেতে পেলে সব সাধন উবে যায়। কলিতে ক্ষীণজীবী, অন্নগত প্রাণ, তাই ঈশ্বরকে ডাকা আর তাঁর নাম করা ছাড়া আর কোনও গতি নেই। বুদ্ধের আগে পর্যন্ত সব বিদ্বতে সাধন। অর্থাৎ আপনা হতে সাধন হয়েছে। বুদ্ধ হতেই বিবিদিষার শুরু।
বুদ্ধ বলছেন, এ দেহ পাত হোক অথবা বোধি লাভ হোক। এই বিবিদিষা আমরা মহাপ্রভুর জীবনেও দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু আমাদের ঠাকুর আমাদের এই ক্ষীণজীবী প্রাণ দেখে নরম বন্দোবস্ত করে গেলেন। তিনি সংসারে থেকে ঈশ্বরকে লাভের কথা আমাদের কৃপা করে বলে গেলেন। শুধু তাই নয়, আশীর্বাদ করে গেলেন।
(রামানুজের কথা প্রসঙ্গে একটি কাহিনী বললেন।)
শ্রীরঙ্গমের মন্দিরের পাশে তিন চারটে কবর আছে। তার মধ্যে একটা আলভারের। একটা পাঠান রাজকুমারীর, আর একটা পালোয়ানের স্ত্রীর। এই আলভার একদিন শ্রীরঙ্গমের মন্দিরের বাইরে (মন্দিরে ঢোকার অনুমতি নেই তাঁদের), কাবেরী নদীর ধারে শ্রীরঙ্গমের ধ্যানে মগ্ন। ওই সময় মন্দিরের পূজারী শ্রীরঙ্গমের পুজোর জন্য নদী থেকে জল নিতে গিয়ে দেখে যে আলভারের ছায়া নদীতে পড়েছে। অতএব নদীর জল তো ঠাকুর পুজোর জন্য নেওয়া চলে না যতক্ষণ ছায়া রয়েছে। তখন তাকে সেখান থেকে সরাবার জন্য ডাকাডাকি করতে লাগল। তাতে সাড়া না পেয়ে তাকে একটা পাথর ছুঁড়ে মারল। পাথরের আঘাতে আলভারের মাথা দিয়ে রক্ত ছুটতে লাগল। ধ্যান ভাঙতেই সে বুঝতে পারল কী ঘটেছে। কিছু না বলে সে সেখান থেকে চলে গেল। সেই রাতে সেই পূজারী স্বপ্ন দেখল, শ্রীরঙ্গম এসে তাকে ভর্ৎসনা করে বলছেন, তোরা কি? আমার একজন পরম ভক্তকে এরকম ভাবে আঘাত করলি? তোরা এখনই আমাকে যেরকম ভাবে ঢাক ঢোল বাজিয়ে রোজ নদীতে নিয়ে যাস আবার আসিস, সেরকম করে ওই আলভারকে অভ্যর্থনা করে এই মন্দিরে নিয়ে আয়। তা নাহলে বৈষ্ণব অপরাধে অপরাধী হয়ে যাবি। তখন সেই পুরোহিত পরদিন সেই আলভারকে খুঁজে সেই রকম জাঁকজমকের সঙ্গে মন্দিরে নিয়ে এল। সেই থেকে সেই আলভার মন্দিরে বাস করতে লাগল। দেহ যাবার পর তার কবর সেখানেই দেওয়া হয়।
পাঠান রাজকুমারীর সম্বন্ধে বললেন, দিল্লির প্রাসাদে (পাঠান যুগে) এক রাজকুমারীর খেলনা পুতুলের সাথে এক গোবিন্দ মূর্তি ছিল। রাজকুমারীর এই মূর্তিটি খুব প্রিয় ছিল। সারাদিন রাত এইটে নিয়ে ব্যাস্ত থাকত। এই সময় রামানুজ একদিন স্বপ্ন দেখলেন, গোবিন্দ এসে বলছেন, তুই আমায় এই দিল্লির প্রাসাদ থেকে নিয়ে যা। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। আমি পাঠান রাজকুমারীর খেলার পুতুল হয়ে বাস করছি। রামানুজ স্বপ্নের কথা বুঝতেন। তখনই তিনি শ্রীরঙ্গম থেকে দিল্লি রওনা হয়ে গেলেন। দিল্লি এসে সম্রাটকে রাজি করিয়ে সেই গোবিন্দ মূর্তি নিয়ে যাবেন। কিন্তু রাজকুমারী সেই মূর্তি দিতে কিছুতেই রাজি হলেন না। তিনি তো খাওয়াদাওয়া বন্ধ করে খুব কান্নাকাটি করতে লাগলেন। তখন এইসব দেখে রাজকুমারীর ভাই রাজকুমারীর সাথে যুক্তি করে রামানুজের পিছু নিলেন কাউকে না জানিয়ে। তারপর একেবারে শ্রীরঙ্গমে এসে সেখানেই থেকে গেলেন। রামানুজের দেহ যাবার আগে রাজকুমারী মারা যান। এই ভক্তিমতী রাজকুমারীর কবর এইখানেই দেওয়া হয়। রামানুজ তাঁর দেহ যাবার আগে বুঝতে পেরেছিলেন রাজকুমারকে তাঁর শিষ্যরা যবন বলে ঘৃণা করতে পারে, তাই তিনি রাজকুমারকে পুরী গিয়ে থাকতে বলেন।
শেষে পালোয়ানের প্রসঙ্গে বললেন, একদিন শ্রীরঙ্গমের মেলায় রামানুজ মন্দিরের ভেতর থেকে দেখলেন ওখানকার যে সবচেয়ে পালোয়ান, সে তার স্ত্রীর মাথায় ছাতা ধরে পেছন পেছন মেলা থেকে ফিরছে। তাদের দেখেই রামানুজ বুঝতে পারলেন যে এদের সময় হয়েছে আর এরা পরম ভক্ত। তিনি তো তাদের ডেকে কাছে বসালেন। তারপর সন্ধ্যে হয়ে রাত হয়ে গেল, তারা আর উঠতে চায় না সেখান থেকে। তখন রামানুজ অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দিলেন। কিন্তু তারপর থেকেই তারা রোজ সকালে ওই মন্দিরে আসতো আর সন্ধ্যে না হওয়া পর্যন্ত বাড়ি ফিরত না। এই রকম ভাবে দিন যেতে লাগল। রামানুজের শিষ্যরা তো রামানুজের তাদের ওপর স্নেহ দেখে মনে মনে খুব চটে গেল।
রামানুজ একদিন তাদের ডেকে বললেন, তোমরা এক কাজ করো। আজ রাতে এই পালোয়ানের বাড়িতে চুরি করো। তাহলে পালোয়ান খুব জব্দ হয়ে যাবে। শিষ্যরা তো কখনও চুরি করেনি। তার ওপর পালোয়ানের বাড়ি, আবার খুব ধনী লোক। তাই তাদের বাড়িতে ঢোকাও খুব সহজ নয়। এইসব কারণে তারা ইতস্তত করতে লাগল। কিন্তু রামানুজ তাদের বোঝালেন, তোমাদের কোনও ভয় নেই, দেখ না কী হয়। তাই শুনে তারা সেই রাতেই পালোয়ানের বাড়ি চুরি করতে গেল। কিন্তু চুরি করতে গিয়ে তারা তো আশ্চর্য হয়ে গেল। দেখে বাড়ির সব দরজা খোলা রয়েছে। পালোয়ান এক ঘরে ঘুমোচ্ছে। তার স্ত্রী আর এক ঘরে ঘুমোচ্ছে। তারা তখন ভাবছে কী করা যায়। দেখল যে পালোয়ানের স্ত্রীর গায়ে অনেক গহনা। অপটু হাতে তারা তো গয়না খুলতে লাগল। তারপর এক পাশের গয়না খোলার পর ভাবতে লাগল কী করে আর এক পাশের গয়না খোলা যায়। ভাবছে, এমন সময় পালোয়ানের স্ত্রী পাশ ফিরে শুলো। তখনই সুযোগ বুঝে তারা সে পাশের গয়নাগুলো খুলে নিলো।
তারপর দিন সকালে আবার যখন পালোয়ান আর তার স্ত্রী রামানুজের কাছে গেলেন। তিনি পালোয়ানের স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন, তার গায়ে গয়না নেই কেন? স্ত্রী তখন গতরাতের ঘটনা বলে বললেন, আমি ঘুমোইনি, ভান করে পড়েছিলাম। যখন দেখলাম তারা দুঃখী, তখন তাদের চুরি করার সুযোগ করে দিলাম। এখন আমার আর অলংকারের প্রয়োজন নেই। ওগুলো গিয়েছে ভালোই হয়েছে।
এদের কবরও ওখানেই আছে।
৬ই নভেম্বর
কদমতলার নতুন বাসাবাড়ি। রঞ্জিত কথামৃত পাঠ করছে। ব্রহ্মবিদ্যার কথা ওঠায় বললেন, এ কীরকম জানিস? কেউ যদি মুখে বলে বা কানে শোনে সঙ্গে সঙ্গে দেহে ফুটে উঠবে। স্থান কাল পাত্র কিছু মানে না। একদিন, লন্ডনে পিকাডিলি সার্কাসের মতো জায়গায় একটা বড় রেস্টুরেন্টে বসে আছি আমার রুমমেট এস বি সিনহার সঙ্গে, আর এইসব কথা হচ্ছে। কিন্তু তার মাঝেই আমার মুহুর্মুহু ভাব পুলক হচ্ছে। তাহলে বুঝে দেখ…।
একসময় ভাবতাম এসব তোদের সকলের হোক। কিন্তু দেখ ঠাকুর হরেনকে দিয়ে জানিয়ে দিলেন এসব হবার নয়। হরেন দেখেছিল, আমি যেন তাকে ধরে ঠাকুরের কাছে নিয়ে গেছি, আর ঠাকুরকে বলছি, হরেনের যদি হয় তো হোক না। ঠাকুর কিছুতেই রাজি হলেন না।
মহেন্দ্র সরকারের কথায় (কথামৃতের ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকার) বললেন, ভ্যানিটি। ভদ্রলোক মেথরকে ঘৃণা করেন না বললেন, কিন্তু যদি মেথর এক পাতে খেতে চায় তাহলেই সব গোলমাল।
মহাপ্রভু ওই রূপ নিয়ে শ্মশানের ন্যাকড়া পরে আছেন, এর মধ্যেও ভ্যানিটি। আপনি আচরি ধর্ম শিখায় অপরে। এসবের মধ্য হতেই অহংকার এসে যায়। কাউকে শিক্ষা দিতে গেলেই তাকে ছোট বলে গ্রহণ করা হয়ে যায়। আর নিজেকে বড় মনে করা হয়। এইখানেই ভুল। তত্ত্বজ্ঞান হলে ‘আমি’ বোধ থাকে না। তখন সব তিনি। সাধু অপরকে বলবে, ঈশ্বর তোমার মধ্যে, আর তিনি যদি কৃপা করেন তাহলেই মুক্তি। তাই ঠাকুর আমাদের সোজা ভাষায় বুঝিয়ে গেলেন—ঈশ্বর কৃপা করে দেহ হতে মুক্ত হলে তবেই মুক্তি।
আত্মা সাক্ষাৎকার হবার পর সাধক তত্ত্বজ্ঞানে না নামা পর্যন্ত ‘আমি’ আর ‘তুমি’ বোধ থাকে। তারপর যখন তত্ত্বজ্ঞানে আসে তখন আর আমি থাকে না, সবই ‘তুমি’। নিজে কেবল দ্রষ্টা।
এই যে গুরুগিরি বা ধর্মগ্লানি, এই ভারতে আড়াই হাজার বছর আগে বুদ্ধ প্রতিষ্ঠা করলেন। আর এই ধর্মগ্লানি ঠাকুরের আগে পর্যন্ত চলে আসছে। ঠাকুর এলেন এই ধর্মগ্লানি বিনাশের জন্য। আর এই সচ্চিদানন্দগুরুর কথা বলে গেলেন। মনুষ্য দেহেই তিনি গুরুরূপে সাক্ষাৎকার হন। তারপর আধার বিশেষে যার যা সাধনের প্রয়োজন তিনি দেহমধ্যে অবস্থান নিজেকে দিয়ে করে নেন। গুরুদেহে সাধন।
তুলসীদাসের কথায় বললেন, তিনি বাড়ির দরজা কখনও বন্ধ করতেন না। এমন কি বাইরে যখন যেতেন তখনও খোলা থাকত। এক ভক্ত তুলসীদাসকে কিছু বাসন দিয়েছিল। তিনি সেগুলো ব্যবহার করতেন। এক চোর জানত যে তুলসীদাস দরজা খুলে বাইরে যায়। চোর একদিন সুযোগ বুঝে ঘরে ঢুকে পড়ল, কিন্তু যেমন ঢোকা, দেখল যে দরজার দু পাশে দুজন তীরধনুক নিয়ে তাকে মারবে বলে বসে আছে। সে তাই দেখে ছুটে পালাল। পথে তুলসীদাসের সঙ্গে দেখা। তখন চোর তাকে বলল—এদিকে দেখি দরজা খুলে রাখা হয়, কিন্তু ওদিকে সাধু ঠিক আছে, ভেতরে আবার দু’জন পাহারা বসিয়ে এসেছে। তুলসীদাস একথা শুনে চোরকে দু’জনের চেহারা কী রকম জিজ্ঞাসা করল। সে বলল, একজনকে দেখলাম শ্যামবর্ণ আর একজনকে দেখলাম গৌরবর্ণ, দু’জনের হাতে তীরধনুক। তুলসীদাস তখন বলল, আমি রামলক্ষণকে দেখতে পেলাম না, আর তুমি দেখতে পেলে? চলো আমার বাড়ির সব দিয়ে দিচ্ছি। … একেই বলে প্রারব্ধ। বা, ঈশ্বর নিজে চোর হয়ে এসে তুলসীদাসকে বুঝিয়ে দিয়ে গেল।
অমূল্যবাবু আশীর্বাদ চাওয়ায় বললেন, এই যে এতক্ষণ ঠাকুরের কথা বলছিস, এর চেয়ে আর কি বেশী আনন্দ আছে বল? এই যে বাড়িতে না থেকে কিংবা অন্য কোথাও না গিয়ে এখানে এতক্ষণ রয়েছিস এর চেয়ে বড় জিনিস কী আছে? শুধু প্রার্থনা কর—ঠাকুর তোমাকে যেন সর্বদা ডাকতে পারি, এর বেশি আর কিছুরই প্রয়োজন নেই।
১৫ই নভেম্বর
নানকের কথায় বললেন, নানক কখনও কারোর সাহায্য নিতেন না। পরিব্রাজক অবস্থায় নিজের অন্নের সংস্থান নিজেই করতেন। বড় ভালো সাধু ছিলেন। অপরকে কষ্ট দিতে চাইতেন না। তবে শেষ সময়ে আশ্রমে তাঁর একজন শিষ্যের সেবা নিতেন।
২২শে নভেম্বর
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—ভক্তি-সকাম, নিষ্কাম, অহৈতুকী। সকাম ধ্রুবের, নিষ্কাম প্রহ্লাদের, অহৈতুকী হল গোপীদের—প্রেমাভক্তি। এর পরও আর একপ্রকার আছে, সে খুব কম—ত্রিগুণাতীত। গোপীরা যেখানে চোখের জলে ভাসছে রাধার সেখানে চোখে এক বিন্দু জল নেই।
তুলসীদাস প্রসঙ্গে, তাঁর সন্ন্যাসের বারো বছর পর দেশে ফেরার কথা বললেন। তুলসীদাস তাঁর সেই পূর্বসংস্কার মতো ভুল করে শ্বশুরবাড়িতেই বিশ্রামের জন্য অতিথি হলেন। …তিনি নিজের ঝোলাতে যা আছে তাই দিয়েই একটু রান্না করে খেয়ে বিশ্রাম নিয়ে চলে যাবেন জানালেন। আর কেউ চিনতে না পারলেও তাঁর স্ত্রী তাঁকে চিনতে পেরেছিলেন। তিনি এসে বললেন, ঝোলায় সব আছে ঠিক শুধু বানানোর লোকের অভাব। তাঁকে যদি ঝোলায় নেওয়া হয় তাহলে সে অভাব পুরন হয়। তুলসীদাস বুঝতে পেরে তখনই সেখান থেকে দৌড় দিলেন।
*নভেম্বর ১৯৫৩
(কত কথা পড়ে মনে)
তখন কেবল রবিবার বিকেলে কদমতলার ঘরে যেতাম। একদিন শনিবার সন্ধ্যায় বিনয়ের (রায়) বাড়ির কাছে দিলীপ, বিনয়, রঞ্জিত, ও সৌরেনের সঙ্গে দেখা। ওরা ঘিরে ধরল—কী দাদা? আপনি ঠাকুরের ঘরে যান না কেন? বললাম—রবিবার যাই তো! ওরা বলল—একদিন গেলে কী হবে, রোজ যেতে হয়। …রোজ যাওয়া শুরু হল।
সেসময় অনেক নতুন ও আশ্চর্য ঘটনা ঘটত। অনেকে ওঁকে নানা স্থানে সশরীরে দর্শন করতেন। উনি শুনে বলতেন, সেই সময় আমি বাবা এই কদমতলার ঘরে, তাছাড়া এই দিন আমি বাড়ির বাইরে বের হইনি। উপেনবাবু যেমন দেখেছিলেন চলন্ত বাসে। তিনি পলার আংটি দেখে বলেছিলেন এসব প’রে কী হয়? তারপর বাসের ভাড়াও দিয়েছিলেন।
একথায় শ্রীজীবনকৃষ্ণ বলেছিলেন—তোর দেহ থেকে ওই মূর্তি বেরিয়েছিল।
উপেনবাবু—কিন্তু বাসের ভাড়া দিয়েছিলেন?
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—ভগবানে সবই সম্ভব।
পাড়ার মণিবাবু অনেক পূর্বে তাঁকে দেখেছিলেন চেতলার হাটে। …শ্রীজীবনকৃষ্ণ হেসে বলেছিলেন, মণিদা, চেতলার হাটে তো গরু বিক্রি হয়। এই প্রসঙ্গে উনি বলেছিলেন—লোকে তো জানে না, ওই সূর্যমণ্ডলের লোক, ভৈরবী, ন্যাংটা, তোতাপুরী, এরা সকলে ঠাকুরের দেহ থেকে বেরিয়েছিল। পুঁথিকার (শ্রীঅক্ষয় সেন) ঠিক ধরেছিল।
No comments:
Post a Comment