Sunday, October 11, 2020

রিলিজিয়ন এন্ড রিয়ালাইজেশান ২য় পর্ব

 

 

মার্চ ১৮৮২

স্থান- দক্ষিণেশ্বরের মন্দির

[এরপর থেকে কথামৃত অনুসারে শ্রীরামকৃষ্ণদেবকে ‘ঠাকুর’ বলে অভিহিত করা হবে]

 

১)          মাষ্টার দাঁড়াইয়া অবাক হইয়া দেখিতেছেন।

শ্রীভগবানকে দেখলে সকলে বাক্যশূন্য হয়ে যায়। বাক্য শূন্য হওয়া অর্থাৎ সমাধিস্থ হওয়া। শ্রীরামকৃষ্ণকে দেখে শ্রীম বাক্য শূন্য হয়েছেন। নিজের অজান্তে। তবে এখানে সমাধির আভাস মাত্র। শ্রীরামকৃষ্ণের কথায় শ্রীম’র দেহে ভগবানের প্রকাশ। ঠাকুর কে দেখে ও ঠাকুরের কথা শুনে শ্রীম অবাক হয়েছেন। ঠাকুর যে সচ্চিদানন্দ বিগ্রহ। নররূপে শ্রী ভগবান।

২)          যেন সাক্ষাৎ শুকদেব ভাগবত কথা বলছেন।

শ্রীঅশ্বিনীকুমার দত্ত (ঠাকুরের এক ভক্ত ও বাংলার দেশসেবক) একবার ঠাকুরকে শ্রীকেশবচন্দ্র সেনের(ব্রাহ্মসমাজের নেতা)সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলেন। ঠাকুর বলেছিলেন- ওগো, সে যে দৈবীমানুষ! এতে জানা গেল যে দৈবীমানুষ আছেন। আমাদের শ্রীম ও একজন দৈবীমানুষ। অবতারের সঙ্গে তাঁর সাঙ্গপাঙ্গরাও আসেন। ঠাকুর খালি চোখে শ্রীচৈতন্যের (বাংলায় বৈষ্ণব ধর্মের প্রবর্তক ও অবতার) সংকীর্তনের দলে শ্রীম ও শ্রীযুক্ত বলরাম বোস(ঠাকুরের এক ভক্ত)কে দেখেছিলেন। সেই দৈবী মানুষ মাষ্টার মশাই দিব্যচক্ষে জগত দেখছেন। তিনি সত্য দেখছেন ও সত্য বলছেন- ‘সাক্ষাৎ শুকদেব’শুকদেব হলেন ব্যাসের পুত্র। তাঁর দেহে চৈতন্যের ভগবানে পরিবর্তিত হওয়া ও ভগবৎলীলার (ভাগবত) কথা তিনি ব্যাক্ত করেছিলেন। ভারত বর্ষে পুরাণ কথিত শুক একজন আদর্শ সাধু বলে পরিগনিত। শুক ব্রহ্মর্ষি, জ্ঞানের ঘন মূর্তি। সাধন করে হয়নি – আপনা হতে হয়েছে। পুরাণের শুক নিত্য। সেকালে ছিল, আর হবেনা, তা নয়। যে দেহীকে কৃপা করে আত্মা পূর্ণ রূপে বরন করবেন তিনিই হবেন ব্রহ্মর্ষি শুক – জ্ঞানের ঘন মূর্তি, আর তিনি মানুষের দেহে ভগবানের লীলার কাহিনী (ভাগবত) বলবেন। এগার বছর বয়সে ঠাকুরের আনুর গ্রামে যাবার মাঠের ওপর দিয়ে যেতে জ্যোতি দর্শন করে সমাধি হয়। আত্মা ঠাকুরকে বরন করলেন। দেহেতে ছিলেন, প্রকাশ হলেন। ঠাকুরের অন্তরে ভ্রুনাকারে শুকের জন্ম হল। ঠাকুরের এই অবস্থা জগতে প্রথম। স্বয়ং শুকদেব ও এমন অবস্থা প্রাপ্ত হয়েছিলেন বলে কোথাও লেখা নেই। পুরাণের শুক বার বছর চার মাস গর্ভবাসে ছিলেনতারপর জন্মালেন। বার বছর চার মাস বয়সে, সচ্চিদানন্দ গুরু, চিৎ ঘনকায় মূর্তি ধারণ করে দেহে প্রকাশ হন। দেহীকে আশীর্বাদ করেন ও সমগ্র ভবিষ্যৎ জীবনটি একটি মাত্র শব্দে জানিয়ে দেন। সম্পূর্ণ রাজযোগ দেহেতে ধারণা করিয়ে মিলিয়ে যান। মানুষ জানেনা যে শ্রীভগবান এই দেহেতেই আছেন। তিনি উদয় হয়ে দেহীকে দেহস্থ চৈতন্যের কথা জানান। দেহী দেখেন। দেহে শুকের জন্ম হল ভ্রুনাকারে। দেহেতে সাধনের শুরু ও ভগবানে পরিবর্তিত হওয়া শুরু। দেহস্থ চৈতন্য বহুবিধ অবস্থার মধ্যে দিয়ে গিয়ে শুন্যে লীন হয় এবং শেষে জড় সমাধি ও পূর্ণ ব্রহ্মজ্ঞান। এরপর চৈতন্যের অবতরণ। প্রথমে সহস্রার থেকে কণ্ঠ ও তারপর সহস্রার থেকে কটিদেশ পর্যন্ত। শেষে মানুষ রতন দর্শন। এই মানুষ রতন ভাগবত কথা শোনান। ‘মা, আমি বলছি না তুমি বলছ’- শ্রীরামকৃষ্ণ। ঠাকুর ভগবানকে মা বলতেন। শুকের জীবনের দুটি অধ্যায়। প্রথম হল দেহেতে আত্মার বরন থেকে মানুষ রতন হওয়া পর্যন্ত। দ্বিতীয়, ভাগবত কথা অন্য কে শোনানো ও ধারণা করানো। যারা শুকের মুখ থেকে এই ভাগবত কথা শোনেন তাঁদের ও অনুভূতি হয়। আর যারা এই ভাগবত কথা পড়েন তাঁদের ও দ্বিতীয় স্তরের অনুভূতি হয়। তবে অনুভূতির তারতম্য আছে। অবস্থা বিশেষে দেহে ঈশ্বরীয় লীলার প্রকাশ। তবে সম্পূর্ণ স্বতঃস্ফূর্ত ভাবেই এই প্রকাশ ঘটে।

৩)           “সর্বতীর্থের সমাগম...”

বেদ অনুসারে দেহে সপ্তভূমি, আর তন্ত্র মতে ষড়চক্র। এই ভূমি এবং চক্র গুলি ঈশ্বরীয় জ্যোতিতে পূর্ণ ও সপ্তম ভূমি ছাড়া বাকীগুলি এক রকম দেখতে, তন্ত্রে সপ্তম ভূমির উল্লেখ নেই। বেদ বেদান্তে যত অনুভূতির কথা আছে, তন্ত্রে নেই। তন্ত্র হল মাতৃভাবে সাধনা ও সিদ্ধিলাভের আরাধনা। এই ভূমি বা চক্র গুলিকে তীর্থ বলে, কারণ ভগবানের লীলার এইখানেই প্রকাশ। তাই এগুলি পবিত্র তীর্থ। কুণ্ডলিনী ষষ্ঠ ভূমি অতিক্রম করে সপ্তম ভূমিতে প্রবেশ করে ও আত্মায় পরিবর্তিত হয়, ও দেহীর আত্মাসাক্ষাৎকার হয়।

৪)          “শ্রীচৈতন্য পুরী ধামে রামানন্দ স্বরূপ আদি ভক্ত সঙ্গে বসিয়া আছেন ও ভগবানের নাম গুন কীর্তন করিতেছেন”

এটি শুকের দ্বিতীয় অবস্থা। ভাগবত ভক্ত ও ভগবান, তিন মিলে হরিকথা হয়।

৫)         “যখন একবার হরি বা একবার রামনাম করলে রোমাঞ্চ হয়, অশ্রুপাত হয়...”

ভারতে ভগবানকে কেউ ‘হরি’ কেউ বা ‘রাম’ বলে ডাকেন। শ্রীভগবান ও তাঁর নাম, নাম ও নামী অভেদ। কারণ সগুণ ব্রহ্ম নাদে পরিবর্তিত হন এবং নাদ ও সগুণ ব্রহ্মে পরিবর্তিত হন। শ্রীভগবানের স্মরনে তাঁর উদয় হয়। দেহেতে শ্রীভগবান – যেমন স্মরন, ওমনি উদয়। দেহেতে শ্রীভগবানের উদয়ে দেহ আনন্দে পরিপুরন। আনন্দের প্রকাশ হয় পুলক আর অশ্রুতে। দেহের পুর্বাবস্থার পরিবর্তন- দেহেতে শ্রীভগবান সারা দিছছহেন, তাই দেহব্যাপ্তি আনন্দ।

৬)          “ভগবানের নামে নামীর উদয় হয়। সন্ধ্যা গায়ত্রীতে লয় হয়। গায়ত্রী আবার ওঙ্কারে লয় হয়”। (অম = নাদ)

সন্ধ্যা – সান্ধ্যকালীন প্রার্থনা – স্থূল।

গায়ত্রী হল কুণ্ডলিনীর মূলাধার থেকে সহস্রারে যাবার সময় দেহে অনন্ত অনুভূতি ও শেষে নাদে পরিবর্তিত হওয়া। ওঁ হল নাদ। সরবশেশ ধ্বনি। নাদ ভেদ হলে চৈতন্যের লয় হয়। শুধু মাত্র জীব চৈতন্যের লয় নয়, জৈবীসত্ত্বার ও লয় হয়।

৭)           “পরমহংস আছেন”।

পরমহংস হল রাজহংস। বেদান্ত মতের সাধনে পূর্ণ ভাবে যিনি সিদ্ধ হয়েছেন তাঁকে পরমহংস বলে। এঁর দেহে বেদ ও বেদান্ত মতে সাধন হয়েছে। বেদ মতে দেহেতে পাঁচটি কোষ।ীগুলি অনুভূতিতে দর্শন হয়। প্রাণশক্তি প্রতিটি কোষে পরিবর্তিত হয় ও দেহী অনন্ত অনুভূতি লাভ করে। প্রাণশক্তি ঊর্ধ্ব গতি লাভ করে সহস্রারে যায়- একে বলে আগম আত্মা দেহ থেকে উত্থিত হচ্ছেন দুধ জল থেকে আলাদা হচ্ছে এখানে জল দেহ ও দুধ আত্মা (ভগবানের সাকার রূপ হল দুধ)দুধ সগুণব্রহ্মের প্রতীক   দুধ থেকে মাখন অর্থাৎ আত্মায় পরিবর্তন । দুধ জল থেকে সম্পূর্ণ ভাবে পৃথক হয় ও তা থেকে মাখন  হয় । এই দেহ ও আত্মা পৃথক হল । এই পৃথক হওয়া দেহেতে বর্তায় । ঘাড় থেকে মাথাটি ঈষৎ দুলতে থাকে ও তা থেকে শুকনো সুপারি বা খোড়ো নারকেলের মত খট খট শব্দ হতে থাকে । সেটা শুনতে পাওয়া যাবে । যাঁর দেহ ও আত্মা পৃথক হয়েছে তাঁকে একথা জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তর দেবার আগেই তাঁর ঘাড় সমেত মাথা দুলতে দেখা যাবে । এটি ব্রহ্মবিদ্যা । প্রকৃষ্ট রীতি । যাঁর এই ব্রহ্মবিদ্যা লাভ হয়েছে তিনি এই কথা শোনা মাত্র আপনা হতে তাঁর দেহে ব্রহ্মবিদ্যার প্রকাশ ঘটবে ( আরও বিভিন্ন প্রকাশ ভঙ্গিমা আছে)এটি দেহের অন্তর্নিহিত সত্যের প্রকাশ । “কেউ দুধের কথা শুনেছে, কেউ দুধ দেখেছে, আবার কেউ বা দুধ খেয়ে হৃষ্টপুষ্ট হয়েছে” -শ্রীরামকৃষ্ণ ।

দুধ দেখা – আত্মা সাক্ষাৎকার হওয়া ।

দুধ খেয়ে হৃষ্টপুষ্ট হওয়া – ঈশ্বরকে বিশেষ রূপে জানা । এঁকে বিজ্ঞানী বলে । অর্থাৎ ইনি ঈশ্বরকে বিশেষ রূপে জানেন । যিনি আত্মা সাক্ষাৎকার করেছেন ও ঈশ্বরকে বিশেষ রূপে জেনেছেন তাঁকে পরমহংস বলে ।

৮) “ আহা কী সুন্দর স্থান ! কি সুন্দর মানুষ ! কি সুন্দর কথা ! এই স্থান আমাকে মুগ্ধ করেছে ”।

জাগ্রত শ্রীভগবান ঠাকুরের দেহে ।তিনি এখানে স্বর্গীয় সুষমায় প্রকাশ পাচ্ছেন । তাই এখানে সমস্ত মধুময় । সব সুন্দর । চুম্বক লহাকে আকর্ষণ করেছে । নড়বার সাধ্য নেই ।

৯)           “ আর বাবা বই টই ! সব ওঁর মুখে ” ।

    এটি বৃন্দার উক্তি । এই মন্দিরের দাসী । ঠাকুরের সান্নিধ্যে তাঁর সংস্পর্শ বশত তার মুখ দিয়ে সত্য প্রকাশ পাচ্ছে । বই – জ্ঞানের প্রতীক । জগতের সমস্ত জ্ঞান ঠাকুরের ভিতর । মানুষের অন্তরে আত্মা । আত্মার মধ্যে জগত । সেই জগত যার চৈতন্যে চৈতন্য, সেই চৈতন্য অবতীর্ণ হয়ে ঠাকুরের ভিতর থেকে কথা কইছেন ।

১০)         “ ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বই পড়েন না শুনে আরও অবাক হলেন ”

  শ্রীম ইংরাজী পড়া লোক । ইয়োরোপের লোকেদের ধারণা জ্ঞান বাইরে থেকে আসে । তাঁরা জগত বিশ্লেষণ করে সত্যে পৌঁছতে চান । মাষ্টারমহাশয়ের তখনও সেই ধারণা । তাই ঠাকুর বই পড়েন না শুনে অবাক হয়েছেন । ঠাকুর দুটি মাত্র অক্ষরে ইয়োরোপের পণ্ডিতদের এই মত উল্টে দিয়েছেন । অক্ষর দুটি হল ‘ম’ আর ‘রা’ । ‘ম’ মানে ঈশ্বর , ‘রা’ মানে জগত । আগে ঈশ্বর তারপর জগত ।

           দেহে প্রথমে আত্মা সাক্ষাৎকার, তারপর আত্মার মধ্যে জগত । এটি হল বিশ্বরূপ দর্শন । ঈশ্বর জগত রূপে প্রতীয়মান অথবা এই জগত ও ঈশ্বরের রূপ । ভক্তের মধ্যে ভগবান । শুধু তাই নয়, ভক্তই ভগবান । সে নিজের দেহের মধ্যেই এই জগত দেখে । এই হল বেদান্তের প্রথম স্তরের বিদেহ সাধনের অনুভূতি । দেহ থেকে আত্মা পৃথক হয়ে দেহে প্রকাশ হন । আত্মা নিজেই নিজেকে সৃষ্টি করেন । দেহেতে আত্মার এই প্রকাশকেই লীলা বলে ।

১১)        শ্রীম লক্ষ্য করিলেন ঠাকুর মাঝে মাঝে অন্যমনস্ক হইতেছেন । পড়ে জানিলেন এরই নাম ভাব । শরীরে শ্রীভগবানের আংশিক প্রকাশ ।

       এই অবস্থাকে বলে অর্ধবাহ্য । অর্ধেক ভগবান, অর্ধেক মানুষ । শ্রীভগবান শরীরের অর্ধেকে বিকাশ হয়েছেন । পূর্ণ ভাবে নয় । আধখানা দেহের পরিবর্তনে (লম্বিত ভাবে) এর লক্ষণ প্রকাশ পায় ।এটি দেহের দক্ষিণ দিকেই লক্ষ্য করা যায় । মুখের ডানদিকে গালটি বেঁকে ফুলে ওঠে, চক্ষু বুজে যায়, জিভের আধখানা অসাড় হয় ও বাক্য স্ফূর্তি হয়না । মাথার ডানদিকের চুল খাড়া হয়ে যায় ।

১২)        ঠাকুরের সন্ধ্যার পর এইরূপ ভাবান্তর হয় । কখনও কখনও তিনি একেবারে বাহ্য শূন্য হন ।

  যে দেহে কামের লেশমাত্র নেই , সেই রকম নিষ্কাম দেহ হল দিব্য দেহ । ঠাকুরের দেহটি হল শ্রীভগবানের শ্রীমন্দির । তাঁর দেহে শ্রীভগবানের পূর্ণ প্রকাশ । এমন শুদ্ধ দেহে সন্ধ্যায় (দিবা ও রাত্রির সন্ধিক্ষন) বাহ্যিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আপনা থেকে ভগবানের প্রকাশ হয় । এতে তাঁর কোনরূপ চেষ্টা নেই। বাহ্যশুন্য – পূর্ণ সমাধিস্থঅখণ্ড সচ্চিদানন্দে লীন, বা অখণ্ড চৈতন্যে লীন ।

 

১৩)        “ না, সন্ধ্যা – তা এমন কিছু নয় ” ।

   সন্ধ্যা একটি বৈধী  কর্ম । ধর্মের প্রদর্শন । এটি প্রবর্তকের জন্য । ঠাকুরের ব্রহ্মবিদ্যা করামলকবৎ ছিল । স্মরণ মনন শ্রবণ মাত্র দেহেতে শ্রীভগবানের প্রকাশ । কখনও আংশিক কখনও পূর্ণ ভাবে । ঠাকুর সমাধিস্থ হতেন । শ্রীভগবান কে স্মরণ মাত্র দেহেতে প্রকাশ ও সমাধি – এটি যাঁর হয় তিনি কোন বৈধী ধর্ম পালন করতে পারেননা ।                                                                ত্রিসন্ধ্যা যে বলে কালী পূজা সন্ধ্যা সে কি চায় ,                                         সন্ধ্যা তার সন্ধানে ফেরে কভু সন্ধি নাহি পায় ।

১৪)          “ এ সৌম্য কে ? – যাঁহার কাছে ফিরিয়া যাইতে ইচ্ছা করিতেছে – বই না পড়িলে কি মানুষ মহৎ হয় ? কি আশ্চর্য ! আবার আসিতে ইচ্ছা হইতেছে । ইনিও বলিয়াছেন – আবার এসো । কাল কি পরশ্ব সকালে আসিব ।”

নররূপে শ্রীভগবান, ঠাকুরের সংস্পর্শে এসে শ্রীম’র চিত্তশুদ্ধি আরম্ভ হয়েছে । শ্রীম ঠাকুরের কথা চিন্তা করছেন । শ্রীভগবানের চিন্তায় চিত্ত ও দেহশুদ্ধি হচ্ছে । বাদুলে পকা আলো দেখেছে । আলোয় ঝাঁপ সে দেবেই । তবে এ মনির আলো, আগুন নয়, ঝাঁপ দিলেও পোড়েনা ।

মার্চ ১৮৮২

স্থান দক্ষিণেশ্বরের মন্দির

১৫)             “ তাঁহার গায়ে মোলেস্কিনের র‍্যাপার  ।”

পূজনীয় মাষ্টার মশাইয়ের এই প্রথম ঠাকুরের ব্যবহারিক জীবনের বর্ণনা । ঠাকুর অত বড় নাম জাদা সাধু (সাধু – শ্রীভগবান দেহেতে অর্ধেকে বিকশিত ) , সন্ন্যাসী ( দেহ ও আত্মা পৃথক হয়েছে যাঁর ), পরমহংস ( যিনি বেদান্তমতে সিদ্ধ )না আছে তাঁর জটা , না আছে ঝকঝকে তকতকে গেরুয়া, না আছে খড়ম , না আছে দণ্ড , না আছে কমণ্ডলুনা আছে সাধুর এমন কোনও বাহ্য চিন্হ, যা দিয়ে তাঁকে চেনা যায়পোশাক পরিচ্ছদে ও দেখতে ঠাকুর একজন আপাদমস্তক দেশীয় ভদ্রলোকএ আবার কিরকম পরমহংস? ঠাকুর হলেন যুগাবতার                                                                                                                 প্রত্যেক যুগের প্রয়োজন ভিন্ন । যুগাবতার সেই আবশ্যকতা অনুযায়ী জীবন যাপন করেন । ঠাকুর যুগের প্রয়োজন অনুসারে , পরিবেশ ও সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি আদর্শ জীবন যাপন করে মানুষকে তাঁর জীবন অনুসরণ করতে শিক্ষা দিয়ে গেছেন ।                                            বৌদ্ধ যুগ ... । শ্রী বুদ্ধ বসে আছেন । পরিচ্ছদ শ্রমণের । পীতাভ হরিদ্রা বর্ণের কাপড়ে সমস্ত দেহ আবৃত । ব্রাহ্মণ গণের ও সেই এক ই রকম বেশ । জগতের লোক শ্রীবুদ্ধ ও শ্রমণ দের দেখল । গভীর শ্রদ্ধায় ভক্তি ভরে তাঁদের প্রণাম করল, দূরে দাঁড়িয়ে রইল, তাঁদের পাশে গিয়ে বসল নাশ্রীবুদ্ধ ও শ্রমণরা সাধারণ মানুষ নন শ্রী বুদ্ধ শ্রমণ দের, জগতের ননআমার আপনার লোক আমার জীবন যাপন করেতার ওসব ঝকঝকে তকতকে গেরুয়া পোশাকের প্রয়োজন নেই।                             ইনি শ্রীশঙ্কর (শ্রী শঙ্করাচার্য – ৭৮৮ খ্রীঃ – ৮২০ খ্রীঃ) । মুণ্ডিত মস্তক, লাল গেরুয়া আপাদমস্তক । প্রতিভা সর্বাঙ্গ দিয়ে ফেটে ফোয়ারার মত চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ছে । অনন্য সূর্যের কিরণের মতন বিদ্যা সারা জগতকে আলোকিত করছে । শ্রীশঙ্কর বসে আছেন । সঙ্গে তাঁর প্রতিভাধর শিষ্য গণ । পদ্মপাদ, মণ্ডনমিশ্র, ত্রোটক, ইত্যাদি । কে বড় কে ছোট এ বিচার প্রলাপ মাত্র । জগত এই আশ্চর্য দৃশ্য দেখল, সশিষ্য শ্রী শঙ্কর । মানুষ দূর থেকে তাঁদের প্রণাম জানাল আর হতাশ হয়ে দীর্ঘ শ্বাস ফেললশ্রী শঙ্কর ও তাঁর শিষ্যরা জগতের নন । এমন বিদ্যা, প্রতিভা, তপস্যা তারা কোথায় পাবে ! মানুষ দূরে সরে গেল । আর ভাবল ভগবান শুধু শ্রী শঙ্কর ও তাঁর শিষ্য বর্গের । সাধারণ মানুষের জন্য নন ......।                                                             শ্রীশঙ্করের নূতন সংস্করণ, শ্রীরামানুজ, এলেন প্রায় দুশ বছর পর উপরন্তু কঠোর আচার । আবার মানুষের সেই একই রকম ভক্তি ও দূরে সরে যাওয়া । মানুষ তার সাধারণ জীবন জাপনের কোনও চিন্হ দেখতে পেলনা সেখানে । প্রত্যাশা নিয়ে গিয়ে হতাশ হয়ে ফিরে এল ।                                                                                  স্থান – পুরী , উড়িষ্যা               বসে আছেন শ্রীচৈতন্য । তিনি তাঁর ভক্ত দের কাছে শ্রীরাধার (এক নারী ভক্ত) কৃষ্ণ প্রেম বর্ণনা করছেন । তাঁর দেহে একাধারে ইন্দ্র ও মদনের রূপ । কিন্তু কটিদেশে কৌপীন, তাও আবার শ্মশানের ছেঁড়া ন্যাকড়া । শ্রী বুদ্ধ ও শ্রী শঙ্কর বিবিদিষার ( কঠোর তপস্যা ও কৃচ্ছসাধনের দ্বারা ভগবান কে লাভ করবার চেষ্টা) প্রবর্তক । কিন্তু বিবিদিষা তাঁদের জীবনে অত মূর্ত হয়নি যত মূর্ত হয়েছিল মহাপ্রভূর জীবনে। জগত দূর হতে শ্রী চৈতন্য দেবের সেই প্রতিভাদীপ্ত অপরূপ কান্তি দেখলএকটা গভীর দীর্ঘ শ্বাস ফেলে হতাশ হয়ে চলে গেল। শুধু মনে হল – এ আমার নয়।                                               ঠাকুরের গায়ে র‍্যাপার। পায়ে চটি জুতা। তবু তিনি বেদান্তমতে সিদ্ধ। পরমহংসশ্রীম জগতকে আশ্বস্ত করলেন এই বলে যে ঠাকুর ও সাধারণ মানুষের মতন পোশাক পরেনশীতে আমিও গায়ে গরম কাপড় দিই, পায়ে চটি পরি। ঠাকুরের জীবন আমার জীবনঠাকুর ভগবানকে পেয়েছেন, তবে আমি কি করে পাই?                   জগতে প্রতিটি মানুষেরই এই আশা ও প্রত্যাশার অবকাশ আছেতাই ঠাকুরের শ্রীমুখের বাণী স্মরণ করি – “চাঁদা মামা সকলের মামা”। ঈশ্বর সকলকার( ভারতবর্ষে চাঁদ কে পুরুষ বলা হয়, রোমান পুরাণের ডায়ানার মতন নারী বলা হয়না)  ঠাকুর শ্রীভগবান কে পেয়েছেন এবং তাঁর কৃপায় আমিও পাবো

    ১৬)  “ কেশব না থাকলে (মারা গেলে) আমি কলকাতায় গেলে কার সঙ্গে কথা কব ?”

    শ্রীভগবানের প্রকাশ হয় শুধু ভক্তের দেহে । তিনি কৃপা করে ভক্ত সৃষ্টি করে নেন । ঠাকুর কেশব কে ভালবাসতেন । ( শ্রীকেশব চন্দ্র সেন ব্রাহ্ম সমাজের একটি শাখার প্রবর্তক ও নেতা ) । কেশব ঠাকুরের কৃপায় কালী রূপ দর্শন করেছিলেন । তাই তিনি কালী মেনেছিলেন । কেশব একজন সত্যিকারের ভক্ত । তাই ঠাকুর তাঁকে অত ভালবাসতেন ।

    ১৭)      “ হ্যাঁ গা, কুক সাহেব নাকি একজন এসেছে ? সে নাকি লেকচার দিচ্ছে ? ”

    ঠাকুর ঠিক জানতেন যে লেকচার দিয়ে ধর্ম হয়না ঈশ্বর দর্শন হয়না । লেকচার হল সাময়িক । লোকে তোমার কথা মন দিয়ে শুনবে ঠিকই, কিন্তু পরক্ষনে ভুলে যাবে । শ্রোতার মনে আজীবন কোনও ছাপ ফেলতে পারবেনা । ঈশ্বরের প্রত্যক্ষ আদেশ ব্যাতিরেকে লেকচারে কোনও ফল হয়না । শ্রোতার দেহে বর্তায় না । “ আত্মা যদি কৃপা করে দেহ থেকে মুক্ত হন তবে মুক্তি ” । অর্থাৎ ধর্ম ।

    ১৮)          “ প্রতাপের ভাই এসেছিল । এখানে কয়দিন ছিল কাজ কর্ম নাই, বলে, আমি এখানে থাকব । শুনলাম মাগছেলে সব শ্বশুরবাড়িতে রেখেছে । অনেক গুলি ছেলে পিলে । আমি বকলুম , দেখ দেখি , ছেলেপিলে হয়েছে । তাদের আবার কি ও পাড়ার লোক এসে খাওয়াবে দাওয়াবে , মানুষ করবে ? লজ্জা করেনা যে , মাগছেলেদের আর একজন খাওয়াচ্ছে , আর তাদের শ্বশুরবাড়িতে ফেলে রেখেছে । আমরা অনেক বকলুম আর কর্ম কাজ খুঁজে নিতে বললুম ” ।

    ঠাকুর এখানে সাধারণ মানুষ কীভাবে জীবন কাটাবে তার একটি ছবি এঁকে দিয়েছেন । সে খেটে খাবে । সে যদি বিবাহিত হয় তবে সে নিশ্চয়ই তার পরিবারের দেখাশুনা করবে এবং সাথে সাথে ভগবানের কাছে ভক্তি প্রার্থনা করবে ও তাঁকে ভালবাসবে । “গাছের পাতা টি ও নড়ে তাঁর ইচ্ছেয়”। প্রতাপের ভাই সংসার করেছেন, এটি দৈব । রামের ইচ্ছাতিনি ঠাকুরের কাছেও আসেন। অর্থাৎ তিনি ভক্তিমান ও বটে । ঠাকুর সৎপথে থেকে খেটে খেয়ে, সংসার                                     প্রতিপালন করতে ও ধর্ম করতে বলছেন।                                                              ঠাকুরের জীবন খতিয়ে দেখলে বোঝা যাবে। ঠাকুর শুরুতে কি করতেন? দক্ষিণেশ্বরে এসে ঠাকুর মা কালীর পূজার কাজে যোগ দিয়েছিলেন । তার জন্য তিনি মাসহারা পেতেন । তারপর ঠাকুরের আমূল পরিবর্তন অন্তরে ও বাইরে । পূজারী নিজেই ভগবান । দক্ষিণেশ্বরের কর্তৃপক্ষ তাঁকে পেনসান দিয়েছিলেন। ঠাকুর নিজেই বলতেন “আমি তো পেন্সিল (পেনসান) খাই” ।

 

মার্চ ১৮৮২

স্থান দক্ষিণেশ্বরের মন্দির

১৯)  “যাঃ বিয়ে করে ফেলেছে।”

দেহে ভগবানকে পেতে গেলে অটুট ব্রহ্মচর্য চাই । দেহ থেকে আত্মার মুক্ত হওয়ার পথে যে কোনও প্রকার জীবত্বই প্রতিবন্ধক । “যে মাগ সুখ ত্যাগ করেছে সে সব সুখ ত্যাগ করেছে”। শ্রীরামকৃষ্ণ।      জগতে যা কিছু হয় সবই ঈশ্বরের ইচ্ছায় হয় । ঈশ্বরের ইচ্ছায় মানুষটির বিয়ে হয়েছে, স্ত্রী আছেন। অতএব এখানে দৈবকৃপা অল্পদৈব যদি বিশেষ কৃপা করত তাহলে বিবাহ আদপেই হতনা

২০) “ওহো! শুধু বিয়েই নয়, ছেলেও হয়ে গেছে”।

পুত্রে দেহের দ্বিতীয় জন্ম । “তুমিই এক রূপে ছেলে হয়েছ”শ্রী রামকৃষ্ণ। দেহ থেকে পুত্রের জন্মে দেহেতে আত্মিক শক্তির ক্ষয় হয়। তাই অতি অল্প আত্মিক স্ফূরন হবে। শ্রীভগবানের পূর্ণ লীলার আস্বাদন তোমার দেহেতে হবেনা। পূর্ণ জ্ঞান হবেনা । ষোল আনা দেহ চাই, তবে ষোল আনা আত্মা মুক্ত হবে । দেহে পূর্ণ আত্মিক স্ফূরন হবে । জীবন মৃত্যুর রহস্য , জগতের সঙ্গে তোমার সম্পর্কের রহস্য উদ্ঘাটিত হবে । যেমন – এই জগত যা  তুমি দেখ, মনে কর বুঝি বাইরে । কিন্তু আদপে তা নয় । যেমন এই জগত, মনে কর বুঝি বাইরে। আদপে তা নয়। তুমি ভগবানকে দেহের ভিতরে দেখবে, তারপর আত্মার মধ্যে এই জগত কে দেখতে পাবে । তোমার অহং ও দেহবোধ আসলে একটি আয়না, যার মধ্যে এই জগত প্রতিফলিত হচ্ছে । সুতরাং এই জগত, যা তুমি বাইরে দেখছ, আসলে একটি মরীচিকা স্বরূপ যার কোনও অস্তিত্ব নেই, অথচ যা সত্য ও বাস্তব বলে মনে হয় ।

 

২১) “বিদ্যাশক্তি না অবিদ্যাশক্তি”?

 

“বিদ্যাশক্তি” –বিবেক বৈরাগ্য, ঈশ্বরানুরাগ, ইত্যাদি

“অবিদ্যাশক্তি” –বিষয়বাসনা, দেহসুখ, ধর্ম বিরহিত, অন্যায়ে আনন্দ, ঈশ্বরে ভক্তি কম ইত্যাদি।             আত্মা দেহেতে প্রাণশক্তি রূপে বিরাজ করছেন। কোনোখানে তিনি বিদ্যাশক্তি রূপে, আবার কোনোখানে তিনি অবিদ্যাশক্তি রূপে প্রকাশ পান । কেন এরকম ফারাক? সংস্কার বশতঃ। সংস্কার কি? ভারতবর্ষের পৌরাণিক গ্রন্থ মহাভারতের প্রহ্লাদের কাহিনীতে এর উল্লেখ আছে ।

          শিশুকালে প্রহ্লাদকে বিদ্যালয়ে পাঠানো হয় । তিনি বর্ণ মালার প্রথম বর্ণ ‘ক’ দেখামাত্রই চোখ দিয়ে জল পড়তে থাকে । (বর্ণ মালার প্রথম অক্ষর ‘ক’ দিয়ে কৃষ্ণ, ভগবানের নাম)। প্রহ্লাদের ‘ক’ দেখে কৃষ্ণ মনে পড়ত । শিশু প্রহ্লাদের ভগবানের সম্বন্ধে কোনও জ্ঞানই ছিলনা । আপনা হতেই এই শিশুর চোখ দিয়ে জল পড়ত । এই আপনা থেকে হওয়াই সংস্কার ।

 

২২) “তুমি কি জ্ঞানী”?

 

      যাঁর আত্মাসাক্ষাৎকার হয়েছে তিনিই জ্ঞানী । তিনি কে? চব্বিশ/পঁচিশ বছরের পূর্ণ যৌবন প্রাপ্ত দেহ হবে । নিখুঁত নিখাদ । তবে ষোলোআনা আত্মা দেহ থেকে নিঃসৃত হয়ে সহস্রারে সংকলিত হবে । সচ্চিদানন্দ গুরু সেই আত্মাকে দেখিয়ে দেবেন । এরপর ভগবানের বহুবিধ লীলা আস্বাদন হয়ে কাল ও স্থানের নাশ হবে । তখন এই উপলব্ধি হবে, তখন আত্মার মধ্যেই বোধ হবে –আমি দেহ নই, আমি আত্মা । এই অবস্থাকে বলে জ্ঞান হওয়া । আর যার এই জ্ঞান হয়েছে তাঁকে বলে জ্ঞানী । এটি জ্ঞানের প্রথম স্তর । পূর্ণ জ্ঞানে বধের সম্পূর্ণ লোপ হবে (জড় সমাধি) ও এরপর চৈতন্যের অবতরণ ও তত্ত্বজ্ঞানে ‘আমি না, তুমি (ঈশ্বর)’ ।

 

২৩)    “তোমার সাকারে বিশ্বাস না নিরাকারে?”

আত্মা দেহ থেকে মুক্ত হয়ে জড় সমাধিতে অহং এর লয় হয় ও তারপর আবার জড় সমাধি থেকে সাকারে নেমে আসেন। “লীলা থেকে নিত্য, আবার নিত্য থেকে লীলা”। ঠাকুর।                      ষষ্ঠভূমি বা চতুর্থকোষ – বিজ্ঞানময় কোষে সাকারে বহুবিধ দেবদেবীর রূপ দর্শন হয়। যদি তুমি যীশুর ভক্ত হও তাহলে আত্মা কৃপা করে তোমার দেহ থেকে মুক্ত হয়ে যীশুর মূর্তিতে তোমাকে দেখা দেবেন। তুমি তাঁর সঙ্গে কথা কবে, যদিও সবসময় এমন হয়না।                                                 আর একটি উচ্চ স্তরের সাকার অনুভূতি আছে। তুমি প্রথমে যীশুমূর্তি দেখলে আর তোমার চোখের সামনেই সেই মূর্তি মা মেরীতে রূপান্তরিত হোলো। তখন বোধ হোলো যে ভগবান এক কিন্তু বহু রূপে সাকার মূর্তিতে দেখা দেন। আত্মা সাক্ষাৎ কার থেকে নিরাকারের আরম্ভ আর নানা সাকার দর্শনের পর জড়সমাধিতে ‘আমি না তুমি তুমি’।    

২৪)    “তোমার যেটি বিশ্বাস, সেইটিই ধরে থাকবে”।

 শ্র্রীভগবান যদি কৃপা করে সমস্ত বুঝিয়ে দেন তবে জানতে পারা যায়, তিনি কী। স্বয়ম্ভূ আত্মা যদি কৃপা করে দেহের মধ্যে পূর্ণ ভাবে প্রকাশ পান। আর প্রত্যেক স্তরের অনুভূতি তে প্রকাশ পান, তবে ঠিক দেখতে দেখতে পাওয়া যায়, বুঝতে পারা যায়, বলতে পারা যায়, ঈশ্বর কে বা কী। কেউ জানেনা ভগবান কি, ভগবান যদি নিজে কৃপা করে জানিয়ে দেন, তবে জানতে পারা যায়।

২৫)    “মাটি কেন গো? চিন্ময়ী প্রতিমা।”

    একজন সত্যি কারের ভক্ত দেখেন চিন্ময়ী প্রতিমা। প্রথমে প্রতিমার চার ধারে জ্বলজ্বল করে জ্যোতি। তারপর সেই জ্যোতি প্রতিমায় লিপ্ত হয়ে প্রতিমাকে আবৃত করে। তখন মনে হয় প্রতিমা জ্যোতিতেই নির্মিত। এই জ্যোতি বাইরে থেকে আসেনা । ভক্তের চোখ থেকেই প্রতিফলিত হয় । প্রথমে প্রতিমার একটি জ্যোতি নির্মিত রেখাচিত্র ফুটে ওঠে, তারপর সেই জ্যোতি সম্পূর্ণ অবয়বটিকে ছেয়ে ফেলেশ্রীভগবান দেহেতেতাই চক্ষু থেকে আত্মিক জ্যোতি বেরিয়ে প্রতিমাকে চিন্ময়ী করে প্রথমে মনে হয় এই চিন্ময়ী প্রতিমা বুঝি বাইরে দর্শন হচ্ছে, কিন্তু ভালো করে ধারণা হলে বুঝতে পারা যায় যে ভক্ত নিজের সহস্রারে এই চিন্ময়ী প্রতিমা দেখছেন আর এই দর্শন তাঁর নিজের অভ্যন্তরীণ অবস্থার প্রতিফলন মাত্র। এই অবস্থায় ভক্ত বুঝতে পারেননা যে তিনি বাইরে দেখছেন না। ভক্ত জানেন তিনি বাইরে দেখছেন।                                                 ঠাকুরের একটি অনুভূতির উল্লেখে এই ভিতর বাইরের দ্বন্দের ছবিটি পরিষ্কার হবে। ঠাকুর দেখলেন তাঁর দেহ থেকে কালপুরুষ (পুরুষ রূপে মহাকাল) বেরুল। তিনি মাকে বললেন, ‘মা, ওকে কেটে ফেল’। মা তখুনি খাঁড়া দিয়ে কালপুরুষকে কেটে ফেললেন। কই, রক্ত পড়লনা তো?                        আর একটি অনুভূতির উল্লেখে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে। আত্মাকে দেখা যায়। আত্মার লীলা দর্শন হয়। ক্রমাগত আত্মিক স্ফুরনে দেহ হালকা হয়ে পড়ে। এই অবস্থায় দেহ থেকে আত্মাকে মুক্ত হতে দেখা যায় ও পুনরায় তিনি দেহেতে মিশিয়ে যান। দেহেতে ভগবান জানিয়ে দেন যে সাকার রূপ যা দেখা যায় আসলে তা বাইরে নয়, তা নিজের দেহ থেকেই বেরিয়ে আসে।

 

২৬) “ হাজার লেকচার দাও কিন্তু ভগবান কি তা বোঝানো যায়না”।

ভগবান যদি নিজে প্রকাশ পেয়ে জানিয়ে দেন, তবেই ভগবানের বিষয়ে জানতে পারা যায়। না হলে নয়। তুমি নিজেই শ্রীভগবানের লীলার কথা, যা লেকচার দিচ্ছ, সে সম্বন্ধে কিছুই জাননা। তাহলে অপরকে কি বুঝাবে? যদি কারো দেহে ঈশরলীলার পূর্ণ প্রকাশ ঘটে, সে চুপ করে যাবে। তবে যারা প্রত্যক্ষ আদেশ পান, তাঁদের কথা আলাদা। তাঁরা বক্তৃতা দেননা। তাঁরা শুধু তাঁদের দেহে ঈশ্বরীয় লীলার কাহিনী, ভাগবত কথা, বলেন। শুধু তাই নয়, তাঁরা জানেন, শ্রীভগবান তাঁদের ভেতর থেকে কথা বলেন ও অপরকে শিক্ষা দেন, তাঁরা নয়।

 

২৭) “যদি বুঝাবার দরকার হয় তিনিই বুঝাবেন। তিনি তো অন্তর্যামী। যদি ওই মাতির প্রতিমা পূজা করাতে কিছু ভুল হয়ে থাকে, তবে তিনি কি জানেননা যে তাঁকেই ডাকা হচ্ছে? তিনি ওই পুজাতেই সন্তুষ্ট হন। তোমার এ জন্য মাথা ব্যাথা কেন?”                                                  অন্তর্যামী ভগবান তোমার অন্তরের কথা জানেন। যদি তোমার প্রার্থনা আন্তরিক হয়, তিনি তা জানেন। তিনি তাইতেই সন্তুষ্ট হন । “মাটির প্রতিমা হল এই দেহ।

 

২৮) “ নানা রকম পূজা ঈশ্বরই আয়োজন করেছেন । যার জগত তিনিই এমন করেছেন । অধিকারী ভেদে । যার যা পেটে সয় মা সেইরূপ খাবার বন্দোবস্ত করেন ।” 

    এখানে দেহ থেকে আত্মার মুক্ত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। আত্মা দেহ থেকে বিভিন্ন পরিমাণে মুক্ত হন । কোথাও এক আনা, কোথাও দু আনা, কোথাও চার আনা। কোথাও তন্ত্র মতে সাধন, (একটি যোগ শাস্ত্র – যে মতে সাকার রূপে ভগবান দর্শন হয়। তবে এখানেই তন্ত্রের শেষ নয়। ইষ্ট সাক্ষাৎকারের পর দেহে নানা প্রকার আত্মিক অনুভূতি হয়। মৃত্যু কালে অহং মহা কারণে মিশে যায় । তন্ত্র মতে দেহে ছটি ভূমি ও চারটি কোষ।)                                                      কোনও দেহে বেদের সাধন, পাঁচটি কোষ ও সাতটি ভূমির অনুভূতি । আবার কোথাও বেদ ও বেদান্তের (বেদান্ত – জ্ঞানের শেষ) সাধন । অর্থাৎ আমার ক্রম বিকাশের পর মহাকারনে অহং তত্বের লয় । এরপর আত্মার সাধন বা বিদেহ সাধনআত্মার মধ্যে থেকে আত্মার দর্শন । বেদান্ত মতে সাধন হয় পাঁচটি স্তরে –

    ১ দেহেতে আত্মাসাক্ষাতকার

    ২ আত্মার মধ্যে জগত

    ৩ আত্মা বা জগত বীজবৎ

    ৪ বীজ স্বপ্নে পরিনত

    ৫ স্বপ্নের লয় হল । তত্বজ্ঞানের উদয় । এখানে কি আছে কেউ জানতে পারেনা । মুখে বলতে পারা যায় না । এখানে আগমের শেষ । এরপর নিগম । নিগমের অনন্ত অনুভূতি ।

মার্চ ১৮৮২

স্থান – দক্ষিণেশ্বরের মন্দির

২৯)     ঈশ্বরের নাম গুণগান সর্বদা করতে হয় ।

    শ্রীচৈতন্য সর্বক্ষন ভগবানকে কৃষ্ণ বলে ডাকতেন ।(কেউ জানেনা ভগবানের আসল নাম কি । যেকোনও নামেই হোক, ভগবানকে আন্তরিক প্রার্থনা করলে তিনি শুনবেনই শুনবেন । তুমি যে রূপে ডাকবে তিনি সেইরূপেই আবির্ভূত হবেন ও কথা কবেন।)সর্ব ক্ষন নাম জপ করলে জিভে ও তালুতে পরস্পর আঘাত করে । এই স্পর্শে দেহে যোগের সূত্র পাত হয় । যোগ – পরিবর্তন । দেহেতে শ্রীভগবান যোগ নিদ্রায় নিদ্রিত । তাঁর যোগনিদ্রা ভাঙতে হবে । অন্য ভাবে বললে, এঁর ফলে আত্মা নিঃসৃত হতে পারেন । দেহের দুটি স্থানে যোগের সূত্রপাত হয় । হাতে হাত তালি দিয়ে হরিনাম করলে ও ভগবানের নাম জপলে । হাতে ও জিভ এবং তালুর আঘাতে যোগের সূত্রপাত । সকাল সন্ধ্যেয় হাততালি দিয়ে হরিনাম করবে – ঠাকুর ।

৩০)   ঈশ্বরের ভক্ত বা সাধুকে সর্বদা দর্শন করতে হয় ।

সাধু কে? শ্রীভগবানের নামে যার মন প্রাণ তাতে লীন হয় । অর্থাৎ সমাধিস্থ হন – তিনি সাধু । ধ্যানেও সমাধি হয় । তবে এটি সময়সাপেক্ষ । মুহুর্মুহু সমাধি হওয়া বা করামলকবৎ – এই হল সহজিয়া । এ খুব উচ্চাঙ্গের লক্ষণ । যার ভগবান দর্শন হয়েছে তিনিও সাধু তবে পূর্ণ রূপে নন । ভক্ত কে? যিনি নিজের দেহের মধ্যে মানুষ রতন কে দেখেছেন, আর বয়ে নিয়ে বেড়ান, তিনিই ভক্ত । দেহের ভিতরে শ্রীভগবান । তিনি নিজে ভক্ত রূপ ধারণ করে হাততালি দিয়ে হরিনাম করেন ।                              ভাগবত, ভক্ত, ভগবান, তিনে মিলে এক (অবতার) ।

৩১) "বড় মানুষের বাড়ির দাসী সব কাজ করছে কিন্তু দেশে নিজের বাড়ির দিকে মন পড়ে আছে”

     দাসী দেহ । বড় মানুষের বাড়ি হল জগৎ । নিজের বাড়ি – ভগবান । এই জগতের ঐশ্বর্যের তুমি দ্রষ্টা মাত্র । তুমি শ্রীভগবানের কাছ থেকে এসেছ ও তাঁর কাছেই আবার ফিরে যাবে, একথা স্মরণ রাখা উচিত ।

৩২)  "ঈশ্বরে ভক্তি রূপ তেল লাভ করে, তবে সংসারের কাজে হাত দিতে হয়” ।

     তেল – প্রথম স্তরের ভক্তির প্রতীক । তেল – দ্বিতীয় স্তরের চৈতন্যের প্রতীক । চৈতন্যের প্রথম স্তরের প্রতীক হল মধু । চৈতন্যের অনুভূতিতে একে তীব্র লাল জ্যতির মত দেখা যায় । তত্ত্বজ্ঞানে চৈতন্য রূপ তেল । তত্ত্বজ্ঞান – অহং বোধের লয় ও সর্বদা চৈতন্যে স্থিতি । তত্ত্বজ্ঞানে বেঁচে থাকা মানে সেই মানুষটি শুধু দেহে ঈশ্বরের প্রকাশ ও লীলা দেখবে ও সে কথা বলবে ।

৩৩)  “মাখন তুলতে গেলে নির্জনে দই পাততে হয় । দইকে নাড়ানাড়ি করলে দই বসেনা । তারপর নির্জনে বসে, সব কাজ ফেলে সূর্যোদয়ের পূর্বে দই মন্থন করতে হয় । তবে মাখন তলা যায়” ।

     মাখন ঈশ্বর, আত্মা । নির্জনে দুধকে দই পাতা – একলা হওয়া, অর্থাৎ জগত থেকে মন কে কুড়িয়ে এনে দেহে আবদ্ধ করা । এমন কিছু না দেখা, না স্পর্শ করা, না শোনা – যাতে রক্ত চাঞ্চল্য ঘটে । এই নিষ্ঠা না থাকলে দই বসেনা । সূর্যোদয়ের পূর্বে – পঁচিশ বছরের মধ্যে । মাখন তুলতে চাই পূর্ণ যৌবন । অন্তরে বাহিরে একটি নিখুঁত দেহ চাই । ষোল আনা দেহ দান । ষোল আনা আত্মা দেহ থেকে মুক্ত হবেন । জীবত্ব পূর্ণ ভাবে আত্মায় বা ভগবানে পরিবর্তিত হবে । মন্থনদণ্ড – কুণ্ডলিনী । কুণ্ডলিনী সহস্রারে যান ও নৃত্য করে আত্মার জন্য স্থান তৈরি করেন । “কমলে কমলে নাচ মা পূর্ণ ব্রহ্ম সনাতনী” ।

 

৩৪) “এই মাখন সংসার জলে ফেলে রাখলেও মিশবেনা । ভেসে থাকবে ।”

    তত্বজ্ঞানে এই অবস্থা লাভ হয় । সেখানে অহংবোধ লয়প্রাপ্ত হয়ে তত্বজ্ঞানে আমি না –তুমি, তুমি – এই বোধ হয় ।

 

৩৫) “ঈশ্বরকে কি দর্শন করা যায়?”

    হ্যাঁ, ঈশ্বরকে সাকার নিরাকার, বহুরূপে দর্শন করা যায় । দেহেতে সচ্চিদানন্দগুরু দর্শন ও লাভ থেকে এর শুরু । তুমি যদি কোনও রূপ ভালবাস ও তাঁকে ঈশ্বর বলে পূজা কর তবে ঈশ্বর সেই মূর্তি ধারণ করে তোমাকে দেখা দেবেন। “ইষ্ট সাক্ষাৎকার হল – ঈশ্বর দর্শন হল” ।                      সচ্চিদানন্দ গুরু তোমাকে আত্মা সাক্ষাৎকার করালেন – ঈশ্বর দর্শন হল । আত্মার মধ্যে জগত দর্শন হল – ঈশ্বর দর্শন হল । এই বিরাট জগত বীজে পরিণত হল । ঈশ্বর দর্শন হল । সেই বীজ আবার স্বপ্নে পরিণত হলঈশ্বর দর্শন হল । তারপর কি আছে কিছু জানবার জো নেই, বলবার জো নেই । অজ্ঞাত ও অজ্ঞেয় । বুদ্ধের শুন্যম । এখন আর দর্শন নেই । এরপরে যখন জ্ঞান এল তখন আমি না, শুধু তুমি, তুমি। “বাবু আমার আমি খুঁজতে যাই, খুঁজে পাইনা” – ঠাকুর । এই ‘তুমি’ চৈতন্য রূপে লাল জ্যোতির আকারে জ্বলে উঠবে – “অন্ধকারে লাল চীনে দেশলাইয়ের আলোর মতন” । এও ঈশ্বর দর্শন । এরপর অবতরণ দর্শন। চৈতন্য রূপ ধারণ করে অবতরণ করেন, দেখতে পাওয়া যায়। এঁকে বলে চৈতন্যের অবতরণ । এরপর মানুষ রতন দর্শন। তারপর লীলা ও নিত্য। আবার নিত্যলীলা। একই বস্তুর দুই প্রকাশ। এতেও ঈশ্বর দর্শন আছে। ইতি নেই।

 

৩৬) “ব্যাকুলতা হলেই অরুণোদয় হল । এরপর সূর্য দেখা দেবেন । ব্যাকুলতার পরই ঈশ্বর দর্শন” ।

    অরুণোদয় – ষষ্ঠ ভূমিতে জ্যোতি দর্শন। আর সূর্য দর্শনের দুটি স্তর।                ১- সপ্তম ভূমির দ্বার দেশে রেশমের পর্দার আড়ালে উজ্জ্বল উদীয়মান সূর্য । ২- তারপর ঈশ্বর দর্শন – সপ্তম ভূমিতে আত্মা সাক্ষাৎকার ।

 

৩৭) “তিন টান এক সঙ্গে হলে তবে ঈশ্বর দর্শন হয়। বিষয়ীর বিষয়ের উপর টান, মায়ের সন্তানের উপর টান, আর সতীর পতির উপর টান”।

  তিন টান – ১) স্থূল, ২) সুক্ষ্ম, ৩) কারণ শরীর বা ভাগবতী তনু যা ষষ্ঠ ভূমিতে দেখা যায় । এখানে তন্ত্র মতে দেহের ভাগ হয়েছে, বেদমতে নয় । যদিও এই দুটি মতের মিল আছে ও বস্তুগত বিভেদ নেই, তবু বেদমতে প্রাণশক্তির আত্মায় পরিবর্তিত হওয়ার পন্থাটি সহজবোধ্য ।           ১) বিষয়ীর বিষয়ের উপর টান – দেহ। মানুষ নিজেকেই সবচেয়ে বেশী ভালবাসে। দেহ থেকে আত্মা যত মুক্ত হতে থাকেন দেহীর ততই দেহের প্রতি আকর্ষণ কমতে থাকে।                   ২) মায়ের সন্তানের উপর টান – সুক্ষ্ম শরীর। একে স্থূল দেহ থেকে বেরিয়ে আসতে দেখা যায় । সুক্ষ্ম শরীর কি? মানুষ স্বপ্নে নিজেকে উড়তে দেখে। স্বপ্নে যে নিজেকে উড়তে দেখা যায়, সে হল সুক্ষ্ম শরীর।                                                     ৩) সতী – কারণ শরীর, ভাগবতী তনু। কারণ শরীর সপ্তম ভূমিতে আত্মায় পরিবর্তিত হয়, দেখা যায়।

 

 ৩৮) বিড়াল ছানা কেবল মিউ মিউ করে মাকে ডাকতে জানে।

শ্রীভগবানকে দেখার জন্য শুধু তাঁকে ডাকতে হয়, প্রার্থনা করতে হয়। শ্রীচৈতন্য শুধু ‘কৃষ্ণ কৃষ্ণ’ করতেন, ঠাকুর ‘মা মা’ করতেন। যীশু ‘ফাদার ফাদার’ করতেন । মহম্মদ বলতেন ‘আল্লাহ আল্লাহ’। এই সব অনুভূতি স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে হয়। একে বেদে বলছে বিদ্বত। যার দেহে দেহে ঈশ্বরের কৃপায় এসব অনুভূতি হয় তিনি দ্রষ্টা মাত্র, সাক্ষী মাত্র।

 

মার্চ – ১৮৮২

স্থান – দক্ষিণেশ্বরের মন্দির

 

৩৯) “হাতী নারায়ণ – ও মাহুত নারায়ণ” ।

হাতী নারায়ণ – মন । মাহুত নারায়ণ – আত্মা ।বিবেক রূপে দেহেতে প্রকাশ । মন ভোগের দিকে নিয়ে যেতে চায় । তাই মনকে সংযত করতে হয়। ঠিক যেমন মাহুত হাতীকে চালনা করে, তেমন বিবেক যা বলে শুনতে হয় যাতে ভোগে মন না যায়।

 

৪০) “জল নারায়ণ – এর নিজস্ব আকার আছে” ।

প্রত্যেক মানুষেই নারায়ণ আছেন। তিনি কোনও মানুষে বিদ্যাশক্তি রূপে, কোথাও অবিদ্যাশক্তি রূপে প্রকাশ । সৎ লোকের সঙ্গে মেলামেশা, অসৎসঙ্গ ত্যাগ।

 

৪১) “এক মাঠে রাখালেরা গরু চরাতসেখানে একটি বিষ ধর সাপ ছিল। সবাই তাকে ভয় পেত।  কেউ তার কাছে যেত না। একদিন এক ব্রহ্মচারী সেই পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। রাখালেরা তাঁকে ওই পথে যেতে বারণ করল। তিনি তবুও সেই পথে গেলেন। পথে সাপটির সাথে দেখা। তাঁর সংস্পর্শে এসে সাপটির সুমতি হল। তিনি তাকে মন্ত্র দিলেন। আর বললেন যে এক বছর পর তিনি আবার এ পথে আসবেন। সাপটির হিংসা চলে গেল। রাখালেরা তা লক্ষ্য করল। একদিন তারা সাপটির লেজ ধরে তুলে মাটিতে আছাড় মারতে লাগল। সাপ্তি খুব আহত হল । দিনের বেলায় সে আর তার গর্ত থেকে বেরোতে সাহস পেতনা। এইভাবে একেবারে কঙ্কালসার হয়ে গেল। একবছর পর ব্রহ্মচারী ফিরে এলেন ও রাখালদের কাছে সাপটির কথা জানতে চাইলেন। তারা বলল সাপটি মারা গেছে। ব্রহ্মচারী জানতেন তা অসম্ভব। তিনি গর্তের কাছে গিয়ে সাপটি কে দাক্লেন। সাপটি বেরিয়ে এসে তাঁকে প্রণাম করল। ব্রহ্মচারী তার এ অবস্থা দেখে দুঃখিত হয়ে তাকে এর কারণ জিজ্ঞেস করলেন। সে সব জানাল। ব্রহ্মচারী তখন বললেন – নিজেকে কি করে রক্ষা করতে হয় তা তোমার অবশ্য জানা উচিত। আরও বললেন – হিংসা করে ছোবল না মারলেও প্রয়োজনে ফোঁস করা উচিত ।”

    রাখাল বালকেরা – দেহের রিপুগণ। এরা মানুষ কে ভোগ ও কুকর্মের পথে প্রলুব্ধ করে।     গরু দেহ। দেহ রিপু নির্দেশিত পথে চলে। সাপ – প্রাণশক্তি। ব্রহ্মচারী – সচ্চিদানন্দগুরু। কুণ্ডলিনী বা প্রাণশক্তি বহির্মুখী হয়ে জগতে ক্রিয়াশীল হয় অথবা অন্তর্মুখী হয়ে সহস্রারে যায়। প্রাণশক্তি যখন বহির্মুখী তখন ভোগ চলেছে। রাখাল বালকেরা খুব খুশী। কারণ তারাই এই দেহের নিয়ন্তা। সচ্চিদানন্দগুরু আসলেন ও কৃপা করলেন। ভগবানের কৃপায় প্রাণশক্তি অন্তর্মুখী হল। রিপু আর তীব্র আক্রমণ করতে পারবেনা। এই অবস্থায় সাবধান হতে হয়। সচ্চিদানন্দগুরু কৃপা করেছেন, জয় হবেই। ‘বাপে ছেলেকে ধরলে সে ছেলে আর পড়েনা’ – ঠাকুর।

    

৪২) জীব চার প্রকার। ক) বদ্ধজীব – যাদের দেহ থেকে আত্মা মুক্ত হয়না। খ) যাদের ঈশ্বরে মতি আছে অথচ দেহ বোধ যায়না, বা যদিও বা যায় খুব অল্প মাত্রায়। এরা হল মুমুক্ষু জীব। গ) কারো কারো দেহ থেকে আত্মা সম্পূর্ণ রূপে মুক্ত হন। কেউ জীবিতাবস্থায় কেউ বা মৃত্যুকালে মুক্ত হন। বেঁচে থেকে দেহ থেকে আত্মার মুক্তি সুদুর্লভ। যারা এই অবস্থা লাভ করেন তারা মুক্তজীব। ঘ) যাঁদের জন্ম থেকেই দেহ আত্মা পৃথক, তাঁরা হলেন নিত্যজীব। (নিত্যমুক্ত, জন্মাদস্য)। 

  ক) বদ্ধজীব – সাধারণ মানুষ। কামিনী কাঞ্চনে আবদ্ধ। ‘উত কাঁটা ঘাস খায়, দর দর করে মুখ দিয়ে রক্ত পড়ে, তবু মনে করে বেশ আছি’। - ঠাকুর                        খ) মুমুক্ষুজীব দেহ থেকে আত্মার মুক্তির স্বাদ অনুভব করেছেন, কিন্তু মুক্ত হবার পরিমান অতি অল্প। সাধক। কখনও তিনি এই বোধ ফিরে পান, কখনও ভুলে যান।             গ) মুক্তজীব দুরকম।                                      ১) আত্মা দেহ থেকে সম্পূর্ণ রূপে মুক্ত হলেন। সহস্রারে সচ্চিদানন্দ গুরু আত্মাকে দেখিয়ে দেন, দ্রষ্টা দেখতে পান। এটি হল পূর্ণ মুক্তি।                                   ২)দ্বিতীয় স্তরের অনুভূতি হল – আত্মা দেহ থেকে মুক্ত হয়ে নিজের ছায়া মূর্তি তে দুহাত তুলে আনন্দে নাচতে থাকেন ও বলেন – ‘আমি মুক্ত হয়েছি, আমি মুক্ত হয়েছি’। এটি দ্রষ্টার চোখের সামনে ঘটে, তিনি দেখতে পান। ‘ভগবান মূর্তি ধরে সামনে এসে বলবেন, তবে জানবি ঠিক’ – ঠাকুর                                                   ঘ) নিত্যজীব – যার দেহ থেকে আত্মা সচ্চিদানন্দ গুরু রূপে উদয় হন ও দেহীকে বরণ করেন এবং সেই দেহে লীলা করেন, তিনি নিত্যজীব।নিত্যজীব নিত্য সাকার ও ব্রহ্মলীন। ফলে, আত্মা, যখন প্রয়োজন তখন ভক্তের কাছে এই নিত্যজীবের রূপে উদয় হন। সাড়ে তিনহাজার বছরের মজেস কে এখনও ভক্তেরা দেখেন। আড়াই হাজার বছরের বুদ্ধ কেও দেখেন। দু হাজার বছরের যীশু কেও দেখেন। পনেরশ বছরের মহম্মদ কে দেখে। শঙ্কর, শ্রীচৈতন্য, এবং বর্তমানে শ্রীরামকৃষ্ণ কেও দেখা যায়। কী করে দেখে? আত্মা দেহের মধ্যে। আত্মার মধ্যে জগত। জগত তিন ভাগে বিভক্ত। ত্রিকাল – অতীত, বর্তমান, ও ভবিষ্যৎ। সচ্চিদানন্দ গুরু অতীতের কোনও মূর্তি তে উদয় হয়ে দেহীকে কৃপা করেন। একজন ইহুদী মসেস কে সচ্চিদানন্দ গুরু রূপে লাভ করবে। একজন বৌদ্ধ বুদ্ধদেব কে, ও একজন খ্রিষ্টান যীশুকে। আত্মা যদি কৃপা করে দ্রষ্টাকে বুঝিয়ে দেন যে মসেস বুদ্ধ ও যীশু হল ঈশ্বরের বিভিন্ন রূপ মাত্র, তবে দ্রষ্টা বুঝতে পারেন। অবশ্য পূর্ণ সাধন হওয়া চাই।                       

                                                                                                                   

মার্চ ১৮৮২

স্থান দক্ষিণেশ্বরের মন্দির

৪৩) “বিশ্বাস হলেই হোল”

বিশ্বাস – দেহ থেকে আত্মার মুক্তি ও দর্শন। তা না হলে প্রকৃত বিশ্বাস হল না। দর্শন দুরকম । আংশিক ও পূর্ণ । আংশিক – ইষ্ট সাক্ষাৎকার ও জ্যোতি দর্শন, কিংবা ইষ্ট ও জ্যোতি দুই দর্শন। পূর্ণ দর্শন – সচ্চিদানন্দ গুরু যখন আত্মা কে দেখিয়ে দেন। ঠাকুর ছোট নরেনকে বলেছিলেন – না দেখলে ভালবাসবি কাকে?

৪৪) “বিশ্বাসের কত জোর তা তো শুনেছ? পুরাণে আছে, রামচন্দ্র যিনি সাক্ষাৎ পূর্ণ ব্রহ্ম নারায়ণ, তাঁকে লঙ্কায় যেতে সেতু বাঁধতে হল। কিন্তু হনুমান রাম নামে বিশ্বাস করে সমুদ্রের পারে গিয়ে পরল। তার সেতুর দরকার হল না।”

লঙ্কা – সহস্রারযেখানে প্রাণশক্তি আত্মায় পরিণত হয়। সেতু বাঁধা – যোগের প্রতিটি স্তর, প্রতিটি ভূমির সাধন।                                                 শ্রীরামচন্দ্র অবতার, তবুও তাঁকে সাধন করে প্রতিটি ভূমির মধ্যে দিয়ে গিয়ে ভগবান লাভ করতে হয়েছিল। শ্রী হনুমান প্রকৃত ভক্ত। তিনি শ্রীরামচন্দ্র, সচ্চিদানন্দ বিগ্রহকে অন্তরে দেখেছিলেন। ‘অবতার কে দেখাও যা, ভগবান কে দেখাও তা’। শ্রীভগবানের কৃপায় হনুমানের পূর্ণ বিশ্বাস হয়েছিল। শ্রীরামচন্দ্রের নামে হনুমান একলাফে সাগর পেরিয়েছিলেন। তিনি ভগবান দর্শন করেছিলেন, তাই তাঁকে সাধন করতে হয়নি। তাঁর নাম ও নামী অভেদ এই জ্ঞান হয়েছিল। ‘একবার ভগবানের নাম করলেই যদি সমাধি হয়, তবেই ঠিক’ – ঠাকুর। কুণ্ডলিনী তখন এক লাফে হনুমানের ন্যায় সহস্রারে যায়। শ্রীহনুমানের ভগবান দর্শন হয়েছিল আর তাই তাঁর নামে পূর্ণ বিশ্বাস হয়েছিল। এখানে শ্রীরামচন্দ্র ও শ্রীহনুমানের রূপকে অবতার ও প্রকৃত ভক্তের দেহে প্রাণশক্তির বিকাশের তারতম্যের কথা বলা হয়েছে। অবতারের দেহে ষোল আনা সাধন আর ভক্তের দেহে আকস্মিক আত্মিক স্ফুরণ। প্রথমটি হল পূর্ণাঙ্গ সাধন ও দ্বিতীয়টি ফল মাত্র।

 

৪৫) “বিভীষণ একটি পাতায় রাম নাম ঐ পাতাটি একটি লোকের কাপড়ের খুঁটে বেঁধে দিয়েছিল। সে লোকটি সমুদ্রের পারে যাবে। বিভীষণ তাকে বললে – তোমার ভয় নাই। তুমি বিশ্বাস করে জলের ওপর দিয়ে চলে যাও, কিন্তু দেখো, যাই অবিশ্বাস করবে ওমনি ডুবে যাবে। লোকটি বেশ সমুদ্রের ওপর দিয়ে যাচ্ছিল। এমন সময় তার ইচ্ছে হল কাপড়ের খুঁটে কি বাঁধা আছে দেখে। খুলে দেখে যে কেবল রাম নাম লেখা রয়েছে। তখন সে ভাবলে – একী! শুধু রাম নাম একটি লেখা রয়েছে। যাই অবিশ্বাস ওমনি ডুবে গেল”।

    ঈশ্বর যদি কৃপা করে নিজে দেহ থেকে মুক্ত হন তবে মুক্তি – শ্রী রামকৃষ্ণ। শ্রী রাম চন্দ্র ভগবান। বিভীষণ একজন প্রকৃত ভক্ত। ভগবান নন। তিনি আর একজন কে কৃপা করে ভবসাগর পাড় করিয়ে সহস্রারে পৌঁছে দিতে চাইলেন। কিন্তু তা হল না। একমাত্র ভগবানের কৃপা তেই মানুষ ভবসাগর পার হতে পারে।

 

৪৬) “যার ঈশ্বরে বিশ্বাস আছে, সে যদি মহাপাতক করে, গো ব্রাহ্মণ স্ত্রী হত্যা করে, তবু ও শ্রী ভগবানের এই বিশ্বাসের বলে ভারি ভারি পাপ থেকে উদ্ধার হতে পারে। সে যদি বলে ‘আমি আর এমন কাজ করব না’ তার কিছুতেই ভয় হয় না”।

    ঈশ্বর অপরাধ একবার ক্ষমা করেন, বার বার করেন না - শ্রী রামকৃষ্ণ। অপরাধ করা – নিজেকে আঘাত করা। ঈশ্বর অন্তর্যামী। আঘাত করলে আত্মা আরও অন্তরে চলে যান। আত্মিক স্ফুরণ হয় না। অপরাধের ফলে দেহের উপর অভিশাপ হয়, দেহ শক্ত হয়ে যায়, ও আত্মিক স্ফুরণ হয় না। এটি চরম শাস্তি। জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য এতে ব্যর্থ হয়।

 

 ৪৭) “দুরন্ত ছেলে বাবার কাছে যখন বসে, যেন জুজুটি, আবার হাটে যখন খেলে তখন আর এক মূর্তি” ।

    এটি স্বামী বিবেকানন্দের সম্বন্ধে বলা হয়েছে। দুরন্ত ছেলে – শক্তি বেশী, বড় আধার। বাবার কাছে – শ্রীভগবানের কাছে। অর্থাৎ ধ্যানমগ্ন। মন সপ্তম ভূমিতে। সব নিশ্চল। সমাধিস্থ। হাটে অপরের সঙ্গে খেলে – ঠাকুর এখানে স্বামী বিবেকানন্দের সম্বন্ধে ভবিষ্যদ্বাণী করছেন। চিকাগো ধর্ম মহাসভায় সবচেয়ে উজ্জ্বল উপস্থিতি।

৪৮) “বেদে আছে হোমাপাখীর কথা। খুব উঁচু আকাশে সে পাখী থাকে। তাই আকাশেই ডিম পাড়ে। ডিম পাড়লে ডিমটা পড়তে থাকে। ডিম পড়তে পড়তে ফুটে যায়। তখন ছানাটা পড়তে থাকে। পড়তে পড়তে তার চোখ ফোটে ডানা বেরোয়। চোখ ফুটতেই দেখতে পায় যে সে পড়ে যাচ্ছে। মাটিতে পড়লে একেবারে চুরমার হয়ে যাবে। তখন সে পাখী মার দিকে একেবারে চোঁচা দৌড় দেয়। আর উঁচুতে উঠে যায়”।

    এটি সচ্চিদানন্দ গুরুর বর্ণনা। হোমাপাখী ভগবান। নির্গুণ ব্রহ্ম। হোমাপাখীর ছানা সচ্চিদানন্দ গুরু। তিনি নির্গুণ থেকে নেমে আসেন ও দেহে অবতরণ করেন। আবার উর্দ্ধগতি প্রাপ্ত হন। নাহলে দেহে বদ্ধ হয়ে যাবেন। এই আরোহণের সময়ে দেহে ভগবানের নানাবিধ লীলা দর্শন হয়। কারণ সচ্চিদানন্দগুরুই ভগবান। নির্গুণ থেকে সগুণে আসেন ও রূপধারণ করেন।  

শ্রীজীবনকৃষ্ণের অমৃত কথাসার প্রথম অংশ

১৯৫০ থেকে ১৯৫৩ সালের কিছু কথা সংকলিত করা হয়েছে শ্রীজীবনকৃষ্ণ সংশ্রয় থেকে। যেহেতু সেখানে দিনলিপিতে তারিখের উল্লেখ নেই, তাই এখানে তারিখের উল্ল...