Wednesday, May 25, 2022

জীবন উপনিষদ

 

জীবন-উপনিষদ
 
শ্রীজীবনকৃষ্ণ ১৯৫৯ সালের শেষ থেকে বিশেষভাবে উপনিষদ নিয়ে আলোচনা শুরু করেন। তাঁর আত্মিক বিবর্তনে উপনিষদের সূত্র কতটা ফলিত সেটা অনুধাবনের উদ্দেশ্য তো ছিলই, এছাড়াও বিশ্বব্যপিত্বের যে অবকাশ সেসময় তৈরি হয়েছিল সেখানে সঙ্গকারী মানুষজন, যারা তাঁর এই সাধনের অঙ্গ, তাঁদের মধ্যেও কীভাবে ক্রিয়া হয়েছিল, সে সম্পর্কেও জানা তাঁর উদ্দেশ্য ছিল। এক অদ্ভুত দৈব তাঁর ঘরে এনে হাজির করেছিল এইসব বই ও কিছু শাস্ত্রজ্ঞ মানুষকে। সেই সব আলোচনা থেকে আহরণ করা হল তাঁর চর্চিত কিছু সূত্র ও আলোচনা। পুরী থাকাকালে তিনি শ্রীযুক্ত আনন্দমোহন ঘোষকে বলেছিলেন, তোদের উপনিষদ পর্যন্ত দিয়ে গেলাম, এর ওপরে তোদের ধারণা হবে না।
 
শান্তিপাঠ
ওঁ পূর্ণমদঃ পূর্ণমিদং পূর্ণাৎ পূর্ণমুদচ্যতে।
পূর্ণস্য পূর্ণমাদায় পূর্ণমেবাবশিষ্যতে।।
ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ ।। ঈশোপনিষদ
 
অর্থঃ ওঁ উহা (অর্থাৎ পরব্রহ্ম) পূর্ণ, ইহাও (অর্থাৎ নামরুপস্থ ব্রহ্মও) পূর্ণ। পূর্ণ হইতে পূর্ণ উদ্গত হন, পূর্ণের (অর্থাৎ পরব্রহ্মই) মাত্র অবশিষ্ট থাকেন। ওঁ ত্রিবিধ বিঘ্নের শান্তি হউক।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—আত্মা, যে আত্মা সহস্রারে ত্রিপুটি অবস্থায় ব্রহ্মপুর হইতে আগত অজানা লোক দেখিয়ে দেয় আর বলে দেয়, সেই আত্মা—চিরকালই পূর্ণ। সৌকালীন গোত্রের সৃষ্টিকর্তা সৌকালীন ঋষির দেহেতে যে আত্মা—আজ হাজার হাজার বছর অতীত হয়ে গেছে—তবুও সেই একই আত্মা আমার দেহেতে। ওজন কম বেশি হবে না।                                                                                সেই পূর্ণ থেকে পূর্ণই এসেছে। আর চিরকাল আসবে। সেই একই আত্মা বিভিন্ন নাম রূপ ধারণ করে আমার বৃদ্ধ বৃদ্ধ বৃদ্ধ প্রপিতামহের দেহেতে ছিল আর আমার দেহেতে সেই আত্মার সাক্ষাৎকার হইয়াছে।                                   আত্মা এক। “স একঃ” আর আত্মার অমরত্মের প্রমাণ এইতেই প্রতিষ্ঠিত।
…নিজের সহস্রারে যে আত্মার সাক্ষাৎকার হয়—সে ব্যষ্টির আত্মা। ইন্ডিভিজুয়াল সেলফ। “পরমজ্যোতিঃ উপসম্পদ্যঃ”। এই ব্যষ্টির আত্মা তোমার সাক্ষাৎকার হয়েছে—তার প্রমাণ দেবে—”স্বেন রূপেন অভিনিষ্পদ্যতে”—অসংখ্য নরনারী দেহের ভিতর দেখবে আর বল্বে,--এই হল ইউনিভার্সাল সেলফ।
ধর্ম ও অনুভূতি তৃতীয় ভাগ 
জীবনবাণী

 

  • বেদান্ত হচ্ছে—আমি কী—আর এই জগত, এরা কে? জগত মানে মনুষ্যজাতি—এইটেই জানা। ওরে এই একত্ব। অর্থাৎ এইটিই জানা যে, বাইরে বহু দেখছি বটে, কিন্তু ভেতরে তোরা ও আমি এক। আত্মিক জগতে এইটি জানাই বেদান্ত।  
  • দেখ একটা কথা বলি শোন। তোদের এই বেদ—এটা কোনো গ্রন্থ নয়। শাস্ত্র নয় বাবা। এটা হচ্ছে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মানুষের মধ্য দিয়ে যে সত্য আবিষ্কার হয়েছে, সেই আবিষ্কৃত সত্যসমূহের সঞ্চিত ভাণ্ডার।
  • দেখ, এতদিন মানুষ কীভাবে জীবনযাপন করে এসেছে বল দেখি? অর্থাৎ উইদাউট গড মানুষ তার জীবন যাপন করে এসেছে। এ জিনিস কখনও ফোটেনি। মানুষ কখনও ভগবান হয়নি। এই প্রথম মানুষ ভগবান হয়েছে। তবে তোরা বলবি, ওই যে ঋষি বলছে “অহম ব্রহ্মাস্মি”। কিন্তু তার প্রমাণ কই? তারা এর প্রমাণ দিতে পারেনি।
  • গড ইজ নো হোইয়ার এলস একসেপ্টিং ইন ইউ। তুইই সব। দেখ, আমি এই মানুষকে সত্য বলছি, আর জগতে যা কিছু সব মিথ্যে। মানুষই সব। আর কিছু নেই। এই যে কথা বললাম নট ইন সেন্স অফ বেদান্ত, বাট হোয়াট ইউ পারসু। ( এর অর্থ বেদান্তে নয়, এর অর্থ তোদের যা হচ্ছে তাইতে।)
  • আরণ্যক মানে হচ্ছে পশুর মাথা। দেখ, আমি একথা নিজে বলছি না, তোদের এই উপনিষদের কথা বলছি। উপনিষদে কী কথা বলেছে বল না ক্ষিতীশ? যারা নিজেকে পুজো না করে অপরকে পুজো করে তারা যজ্ঞের বলির পশু। অর্থাৎ তারা পশু।
  • আমি ঈশ্বর বলতে কিছু ধরব না। ‘সঃ একঃ’, ‘সদা জনানাং হৃদয়ে সন্নিবিষ্টঃ' এই একত্বই ঈশ্বরত্ব। আর কিছু নয়। ওরা ঈশ্বরলাভ বলে গেছে। কিন্তু ঈশ্বরলাভ বলে গেছে। কিন্তু ঈশ্বরলাভ কী তা বলতে পারেনি।
  • কেন ওরা পদ্ম বলছে? আমি দেখেছিলাম চক্র, আর তা ফিলড উইথ গড’স লাইট। আমি তো পদ্ম দেখিনি!                                                ধীরেন—ওরা শাস্ত্রে যা আছে তাইই বলে গেছে, অনুভূতি হয়নি। এই দেখুন না, ওরা বলছে, ‘আত্মা বা অরে দ্রষ্টব্যঃ শ্রোতব্যঃ নিদিধ্যাসিতব্যঃ’ ইত্যাদি। কিন্তু আত্মাকে যে দেখা যায় একথা বলেনি।                         শ্রীজীবনকৃষ্ণ—আচ্ছা, এই যে ব্রহ্মসূত্র, এ অনুভূতিমুলক না বিচারাত্মক?                                                                ধীরেন—না, ও অনুভূতিমুলক নয়, সব বিচারাত্মক।                   শ্রীজীবনকৃষ্ণ (ধীরেনকে)—দেখো বাবা, এই যে অদ্বৈতবাদ দেখছ, এ তোমাদের হিন্দুধর্ম নয়, একেবারেই নয়। তোমরা যে ভেবেছ হিন্দুরা বেদ নেয়, অতএব এ হিন্দুধর্ম, মোটেই নয়। এ হচ্ছে জগতের সকলের। এখানে জপ নেই, তপ নেই, তন্ত্র নেই, মন্ত্র নেই, পুজো নেই, ভগবান নেই। আছে কী? মানুষের দেহ। দ্য লাইফ পাওয়ার—জীবনীশক্তির বিকাশ। শক্তি বলব না বাবা—লাইফ পাওয়ার। শক্তি বললেই তোমরা একটা কালী খাড়া করবে, তারপর খাঁড়া আসবে। তারপর কচি কচি মেষ শিশু।
  • কথামৃতের ব্রহ্ম সত্য জগত মিথ্যা—এই কথায় বলছেন, আচ্ছা ঋষিদের ধর্ম কী বাবা? ঋষি বলছে—‘অহং ব্রহ্মাস্মি’—আমি সেই ব্রহ্ম। নাও এদজাস্ট। ঠাকুর আর ঋষিবাক্য। ওরে আমি সত্য হলে এই জগত সত্য হয়ে যাচ্ছে।
  • অতীত যুগে আমরা পাই ঋষিতে—‘আত্মা অরে দ্রষ্টব্য…’। কিন্তু দেখ, তার কত হাজার হাজার বছর পরে ঠাকুর বলছেন—‘মাইরি বলছি ভগবানকে দেখা যায়’। অতীতে ঋষিদের কল্পনা সার্থক হয়ে ঠাকুরের দেহে ফুটে উঠল।
  • ঋষিদের নিষ্কামী মন ছিল। সেই জন্যই তারা একে পরাবিদ্যা বলে গেছে, আর প্রকৃত নিষ্কামী মন না হলে এ জিনিস হয় না। দ্বৈতবাদে যা কিছু বলা হবে সব ভুল বলা হবে।
  • অদ্বৈতজ্ঞান কী জানিস? প্রথমে আত্মা সাক্ষাৎকার, তারপর এই আত্মার ভেতর বিশ্বরূপ, তারপর সেই বিরাট বিশ্ব বীজে পরিণত হল, বীজ স্বপ্ন হল, তারপর লয় হয়ে গেল—এই হচ্ছে বেদান্তের সাধন।
  • উপনিষদ কী বলেছে? পরমাত্মা মানে কী করেছে? ইন দ্য বিগিনিং দেয়ার ওয়াজ সেলফ আলোন ইন দ্য শেপ অফ আ পারসন। (আদিতে মানুষের রূপে আত্মাই ছিলেন)। তোরা যে চিন্ময় রূপ দেখিস সেটা কি শুধু আত্মিক?   ধীরেন—আত্মিক তো বটেই, কেন না আমরা ভেতরে আগে দেখেছি, তারপর বাইরে মিলিয়ে নিয়েছি।                                             শ্রীজীবনকৃষ্ণ—কী রকম? যদি দেহ না থাকত তবে রূপ কোথা থেকে আসত রে? দেহ আছে বলেই রূপ দেখা যাচ্ছে। তাহলে কী হচ্ছে? দেহটাও বটে।
  • আমায় যদি কেউ চার্জ করে, আমি তাকে দেখিয়ে দেব—যে দেখ, আমি কিছু না, এই জগত এসে আমায় বলছে। এই জগতের লোকগুলি আমায় দেখে বলছে।
  • কাল রাত্রে শোবার সময় মনে ফুট কাটছিল যে, এই দ্বৈতবাদ থাকবে না। জগত থেকে দ্বৈতবাদ নাশ হয়ে যাবে। বলাইয়ের দোকানের এক কর্মচারী, সে আজ সকালবেলা এসে, আমায় জিজ্ঞাসা করছে—আচ্ছা ‘বেম্মোস্মি’ মানে কী? আমি তো শুনেই অবাক! জিজ্ঞাসা করি—কী হয়েছে রে? সে বলল—কাল রাত্রে স্বপ্ন দেখছি—খই ছড়াচ্ছে, আর বলছে ‘বেম্ম অস্মি’। কী আশ্চর্য বল দেখি! কী আর হবে পড়ে টড়ে। বন্ধ করে দে। আর কিছু করবার দরকার নেই। ওরে দেখ, আমায় জানিয়ে দিচ্ছে—ওই যে মনে ফুট কেতেছিল—সাধারণ মানুষের ধারণা করবার শক্তি হয়েছে—এ জিনিস আমায় জানিয়ে দিচ্ছে।    
 
উপনিষদের শ্লোকগুলির আলোচনাঃ-    
 
বেদাহমেতং পুরুষং মহান্তম, আদিত্যবর্ণং তমসঃ পরস্তাৎ।
তদেব বিদিত্বাহতি মৃত্যুমেতি, নান্যঃ পন্থা বিদ্যতে অয়নায়।। (৩/৮ শ্বেতাশ্বেতর)
 
(অন্বয়ঃ স্বপ্রকাশ ও অজ্ঞানাতীত এই সর্বব্যাপী পুরুষকে আমি জানি। তাঁহাকে জানিলেই (শোক) মৃত্যুকে অতিক্রম করা হয়। কারণ, পরমার্থ লাভের আর কোনো উপায় নেই।)
 
v  শ্রীজীবনকৃষ্ণ—সে আত্মা নয়। আত্মিক রূপ। মূলাধার থেকে কুণ্ডলিনী সড়াৎ করে ভ্রূ’র মধ্যে আসে আর ভ্রূ-মধ্য ভেদ করে সহস্রারে যায় এবং দপ করে জ্বলে ওঠে ওই আত্মিক রূপ। সহস্রার থেকে কণ্ঠদেশ পর্যন্ত। তবে সেটা আদিত্যবর্ণই বটে। এটা ঠিক।
v  শ্রীজীবনকৃষ্ণ—ভগবান দর্শনের কথা গীতাকার বলতে পারেনি, আর যা বলেছে সেটা উপনিষদ থেকে নিয়েছে। “বেদাহমেতং…”। আমি দেখছি মূলাধার থেকে একটা জ্যোতি সড়াৎ করে উঠেই কণ্ঠ পর্যন্ত দপ করে জ্বলে উঠল। এ আমার বলতে যতটুকু সময় লাগল তার সিকির সিকিও সময় লাগেনি। পলকের মধ্যে হয়ে যায়।
v  শ্রীজীবনকৃষ্ণ—আমার যে এই অনুভূতি হয়েছিল আমি জানতুম। আমি সেই কথা পয়েন্ট আউট করেছি থার্ড পার্টে (ধর্ম ও অনুভূতি)। আর বলছি, এ ভগবান বা আত্মা বা ব্রহ্ম সাক্ষাৎকার নয়। এ হল যোগজ মূর্তি। মূলাধার থেকে সড়াৎ করে কুণ্ডলিনী বা মহাবায়ু ওই ভ্রূ-মধ্যে এসে আটকায় আর ভ্রূ-মধ্য থেকে সোজা সহস্রারে চলে যায়, আর দপ করে সহস্রার থেকে কণ্ঠদেশ পর্যন্ত ওই আদিত্যবর্ণ পুরুষকে সাক্ষাৎকার করা যায়। বলেই তার নীচে লিখছি, এ কিন্তু ভগবান দর্শন নয়। ত্রিপুটি অবস্থায় ভগবান দর্শন হয়, -বলে ত্রিপুটি অবস্থার বর্ণনা দিয়েছি। কারণ, এমনি বহু লোকেই ভাববে যে এইটি ভগবান দর্শন। তাই ঠাকুরও কথামৃতে ওই বলছেন না—কোনো এক অজানা লোক এসে বলবে—এই—এই! ওই যে ব্রহ্মপুরের থেকে লোক আসে, ঠাকুরের মূর্তি যেমন আমার কাছে এসেছেন, তখন তিনি আমার অজানা লোক ছিলেন। যখন ভগবান দর্শন করাচ্ছেন, অবশ্য তখন তিনি আমার অজানা লোক নন।
 
য এষ সুপ্তেষু জাগর্তি কামং কামং পুরুষো নির্মিমাণঃ
তদেব শুক্রং তদ ব্রহ্ম তদেবামৃতম উচ্যতে।
তস্মিল্লোকাশ্রিতাঃ সর্বে তদু নাত্যেতি কশ্চন। (কঠ উপনিষদ – ২/২/৮)
 
অর্থঃ ইন্দ্রিয়াদি নিদ্রিত হইলে এই যে পুরুষ (স্বপ্নাবস্থায়) দেহে জাগ্রত থাকিয়া আপনার অভিপ্রেত বিষয় সকল নির্মাণ করিতে থাকেন, তিনিই শুক্র (প্রাণ), তিনিই ব্রহ্ম, তিনিই অমৃতরূপে বর্ণিত হন। পৃথিবী আদি সমস্ত লোক তাঁহাতে আশ্রিত। কেবল তাঁহাকেই কেহ অতিক্রম করিতে পারে না। ইনিই সেই।
 
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—জগতে কেউ আচার্য আছে নাকি রে! আচার্য গুরু সে সবই এক কথা। জগতে কেউ আচার্য নেই বাবা। সেই ‘এক’ বহু হয়েছে। আবার ‘বহু’ এক হয়েছে। যদি কেউ বলে সেই ‘এক’ই বহুর আচার্যগিরি করবে, তা বাবা ‘এক’ তো আর বাইরে এক হয়নি, হয়েছে আত্মিকে, যা আমরা পেয়েছি, যা আমরা দেখছি। তাই মানুষের দেহমধ্যেই সেই এক লীলা করেন, সাধন করেন, শিক্ষা দেন। তোরা প্রশ্ন তুলতে পারিস আমরা তো সেই ‘এক’কে আপনার রূপে দেখছি। তাহলে আপনিই আমাদের আচার্য। সে তো তোদের ভুল বলা হবে। কারণ মানুষের দেহে যিনি লীলা করেন তিনি যে ব্রহ্ম স্বয়ং।
 
v  আমার অবস্থা যে স্বপ্নবৎ তারও প্রমাণ তোরাই। আমার অবস্থা স্বপ্নবৎ না হলে তোরা তোদের স্বপ্নে আমায় দেখতিস না। লাইক প্রডিউসেস লাইক। এ অবস্থার কথা তোদের আমি বহু আগেই বলে গেছি। বহু আগেই আমি তা বুঝেছিলাম আর তোদের তা বলে গেছি।
 
v   পাঠক পাঠ করলেন—“য এষ সুপ্তেষু…” শ্রীজীবনকৃষ্ণ—তাহলে এটাই শুধু মনে রাখিস, ঐ পুরুষ আর আত্মা তাহলে আইডেনটিকাল হচ্ছে। তাহলে আত্মা বলব কেন? যে আত্মা জগতে দু একজন ছাড়া আর কেউ দেখেনি ব্যষ্টিতে? অথচ সেই পুরুষকে—আমাকে—লক্ষ লক্ষ নরনারী দেখেছে, এটা কল্পনারও নয়, অনুমানেরও নয়, আর বোধে বোধ হওয়াও নয়। এ প্রত্যক্ষ বাস্তব।
 
v  প্রতিটি মানুষের অন্তরে আছেন এক পুরুশ—সুপ্ত। তিনি স্বপ্নে জাগ্রত হন মানুষের দেহে (সহস্রারে)।
 
v  পাঠ হল, ‘য এষ সুপ্তেষু’। শ্রীজীবনকৃষ্ণ—এই এবসলিউট টা কী বলতে পারিস?                                                               ধীরেন—নির্বীজ সমাধি।  
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—ও যে এক্সটারপিটেশান হচ্ছে রে! তারপর? ওরে, যখনই খেতে হচ্ছে পঞ্চভূত যে তখনই আবার তাকে তেড়ে ধরছে! এবসলিউট মানে যে শূন্য রে! আর ইউনিভার্সাল ইগো মানে কী জানিস? বহুবার তোদের আমি বলে গেছি—শূন্যতত্ত্ব থেকে নাদতত্ত্ব, নাদতত্ত্ব থেকে মহৎতত্ত্ব, মহৎতত্ত্ব থেকে আদ্যাশক্তিতত্ত্ব। এই মহৎতত্ত্বই হচ্ছে ইউনিভার্সাল ইগো। তাহলে এবসলিউট কী করে ইউনিভার্সাল ইগো হচ্ছে রে? দুটো কি আইডেনটিকাল? (ধীরেনকে লক্ষ করে) কিছু বলার থাকে তো বল?
ধীরেন—আজ্ঞে না, আমার কিছু বলার নেই, আপনি বলুন।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—মহৎতত্ত্বটা কি বুঝলি না? বেদের ওই কথা রে—য এষ সুপ্তেষু জাগর্তি কামং কামং পুরুষো নির্মিমানঃ…। এই মহৎতত্ত্ব। হ্যাঁ রে, এবসলিউট আর ইউনিভার্সাল ইগো আইডন্টিকাল। ওতপ্রোত।
 
v  দেখ, স্বপ্ন সম্বন্ধে তোদের একটা কথা বলে রাখি শোন। স্বপ্নটা কী আত্মার? না, আত্মার বলব না। আত্মা বললেই এক অজ্ঞাতবস্তুর কল্পনা মাথায় ঠাঁই করে বসবে—প্রাণের স্বতঃস্ফূর্ত বিকাশ। আমি কিন্তু এ শুধু দৈবী স্বপ্নের কথাই বলছি। …প্রাণেরই বা বলি কেন? তোরা কি তোদের প্রাণকে দেখেছিস কেউ? না। দেখেছিস আমার চিন্ময় রূপটাকে। তাই আমার রূপই তোদের প্রাণ। বেদ বলছে, প্রাণের এই স্বতঃস্ফূর্ত বিকাশ হবে কখন? যখন মানুষ ঘুমোবে। তাকে স্বপ্ন বলাও ঠিক নয়। বেদ বলছে, সুপ্তির মধ্যে যে পুরুষ মানুষের মধ্যে জেগে ওঠেন তিনি ব্রহ্ম। এই পুরুষেরই বহুবিধ লীলা দেখিস তোরা তোদের দেহে সুপ্তির মধ্যে। এই বিকাশ যখন আগম হয় (অর্থাৎ সুষুপ্তিতে যাবার পথে) তখন সে স্বপ্ন কখনও সত্য হতে পারে, না-ও হতে পারে। কিন্তু সুষুপ্তি থেকে ফেরার পথে যখন কোনো স্বপ্ন হয়, তখন সেটা সর্বৈব সত্য হয়।
 
v  ছান্দোগ্য ও বৃহদারণ্যকে স্বপ্নতত্ত্বের কথা আছে। জাগ্রত অবস্থার চেয়ে স্বপ্নের অনুভূতি শুদ্ধতর। …স্বপ্নসিদ্ধ লুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। ঠাকুর আবার প্রাণদান করে প্রতিষ্ঠা করেছেন। মাস্টারমশাইকে ঠাকুর বলছেন—যদি স্বপ্নে আমায় উপদেশ দিতে দেখো, জানবে সে সচ্চিদানন্দ। স্বপ্নসিদ্ধ একাধারে পঞ্চসিদ্ধ। তাঁর স্বপ্নে সাক্ষাৎকার হচ্ছে, অতএব তিনি স্বপ্নসিদ্ধ। এই স্বপ্ন হঠাৎ হয়। অতএব তিনি হঠাৎসিদ্ধ। কৃপা ব্যতীত এই দেবস্বপ্ন কেউ দেখেনা। অতএব তিনি কৃপাসিদ্ধ। আবার স্বপ্নসিদ্ধ নিত্যসিদ্ধও বটে। …স্বপ্নসিদ্ধ সাধনসিদ্ধ বা ধ্যানসিদ্ধও হন। সচ্চিদানন্দগুরু তাঁকে দিয়ে সাধন করান এবং সাক্ষাৎকার হয়ে বলেন, “তুমি তো ধ্যানসিদ্ধ”।                                     স্বপ্ন আসে বেদান্তের চতুর্থ ভুমি থেকে। স্বপ্নসিদ্ধ বেদান্তমতে সিদ্ধ। আত্মা সাক্ষাৎকারের পর—আমি দেহ নই—আমি আত্মা—সোহং—আর ক্রমে আত্মার বিকাশ, বিশ্বরূপ, বীজবৎ, স্বপ্নবৎ, লয়।
 
v  ব্রহ্ম স্বপ্নবৎ। আমি স্বপ্নবৎ অবস্থায় আছি বলেই তোরা আমায় স্বপ্নে দেখিস। আর এই স্বপ্ন কোথায় ফোটে? বেদান্তের চতুর্থ স্তরে।
 
v  ওরে, তোরা যে সমস্ত স্বপ্ন দেখিস সে সবের অদ্ভুত অদ্ভুত অর্থ। আমরা সঙ্গে সঙ্গে তা ধরতে পারি না। ঐ একটা যা তা করে খাপ খাইয়ে মানে করে নিই। কিন্তু তাতে ঠিক বোঝা যায় না।                                   (স্বপ্নে) আমি এই এত বড় (ইঞ্চি ছয়েক লম্বা) একটা পাকা আম খাচ্ছি, আর চেষ্টা করছি আঁটিতে দাঁত ঠেকাবো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছুতেই আঁটিতে দাঁত ঠেকানো গেল না। শুনবি এর কী অদ্ভুত অর্থ? এই দেহ অনন্ত শক্তির অধিকারী। মনুষ্যদেহ এমনই অদ্ভুত তা আর কী বলব! এই দেহে অনন্ত, অফুরন্ত অমৃতত্ত্ব আছে। এ খেয়ে শেষ করতে পারা যায় না। তাই আমি আঁটিতে কিছুতেই দাঁত ঠেকাতে পারিনি।
 
v  তুই ভগবানকে চাস? তিনি তো তোর দেহের ভেতর; তাঁকে ডাক, বল—ওগো, আমায় দেখা দাও—দেখবি তিনি কৃপা করে তোর ডাকে দেহের ভেতর থেকে সাড়া দেবেন, তোর সঙ্গে কত কথা কইবেন।…স্বপ্নটা হচ্ছে কোথায়? তোর ব্রেনে, কেমন না? তাহলে তোরই প্রাণশক্তি সহস্রারে গিয়ে ওই রূপ ধারণ করে তোর সঙ্গে কথা কইছে।
 
শ্রীয়ানন্দমোহন ঘোষের স্বপ্ন—১৭/০৪/১৯৯৭
একটা গাছের গুঁড়িতে ঠেসান দিয়ে শ্রীজীবনকৃষ্ণ বসে আছেন। খালি গা, পরনে সাদা ধুতি। আমি তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে আছি। গাছটা পাতাবহুল। মনে হচ্ছে কদম অথবা আম গাছ। শ্রীজীবনকৃষ্ণ জিজ্ঞাসা করলেন—ব্রহ্মের স্বরূপ বল। উত্তর দিলাম, সব তো জানিনা, কেবল একটা লক্ষণ জানি। শ্রীজীবনকৃষ্ণ বললেন—সব কে জানে? তাঁর এক অংশে এই জগত প্রতীয়মান। যা জানিস বল। আবৃত্তি করলাম—‘য এষ…ব্রহ্মণো নাম সত্যমিতি’। তারপর বললাম—সে তো আপনি! শ্রীজীবনকৃষ্ণ বললেন—আমি নয়। টোকা দিয়ে দেখছিলাম ধারণা হয়েছে কিনা। ধারণা হওয়া মানে তাই হয়ে যাওয়া। তাই হয়ে গেছিস। বলছিলাম—সে আমি নয়, তুই! তুই! তুই!
 
অতীন্দ্রগোপাল সিংহরায়ের স্মৃতিচারণ থেকে।
বললাম—উপনিষদ যে বলছে প্রতীকে দর্শন করতে করতে লোকটা প্রতীকাপন্ন হয়ে যায়। তা স্বপ্নও তো ‘প্রতীকে দর্শন’? শ্রীজীবনকৃষ্ণ বললেন—স্বপ্নে যে প্রতীকে দর্শন করায় তা আত্মিককে বাস্তবে রূপ দেবার জন্য। আর বাইরে প্রতীক দর্শন করে প্রতীকাপন্নই থেকে যায়। যেমন কালী কৃষ্ণ ইত্যাদি দর্শন করতে করতে তারা তাই নিয়েই থাকে। আর ওপরে উঠতে পারে না। আর স্বপ্নে প্রতীকে আম, আম খাওয়া, সাপ বাঘ ইত্যাদি দর্শন করে মানুষ কি তাতে লিপ্ত হয়? তাই উপনিষদ বলছে, ‘য এষ সুপ্তেষু…’। তিনি নিজের ইচ্ছা অনুসারে নির্মাণ করেন।  

অসতো মা সদগময়, তমসো মা জ্যোতির্গময়, মৃত্যোর্মা অমৃতম গময়।।
বৃহদারণ্যক ১। ৩ । ২৮
 
শ্রীজীবনকৃষ্ণ – অসৎ থেকে আমায় সতে নিয়ে চলো, অন্ধকার থেকে আলোয় নিয়ে চলো, মৃত্যু থেকে আমায় অমৃতে নিয়ে চলো। প্রথম দুটি তার জীবদ্দশার কথা বলল, আর তৃতীয়টির বেলায় বুঝি মরে গিয়ে অমর হবার কথা বলল? না বাবা, পণ্ডিতেরা সব কদর্থ করে। দেখ না, যে মানুষটা বলছে আমায় অসৎ থেকে সতে নিয়ে চলো, এ প্রার্থনা তো তার জীবদ্দশাতেই। যে বলছে আমায় অন্ধকার থেকে আলোয় নিয়ে চলো, সেও তার জীবদ্দশাতেই। আর মৃত্যু থেকে আমায় অমরত্ব দাও—এটির বেলায় মরে গিয়ে কেন? সেও তো তার জীবদ্দশাতেই চিরকাল দেহ নিয়ে বেঁচে থাকার প্রার্থনাই জানাচ্ছে না কী?
       ঋষির এই প্রার্থনা আজও রূপ নেয়নি, কিন্তু নিতে পারে। তখন প্রমাণ সমেত আত্মা অবিনশ্বর। এই থেকেই মানুষের মাথায় আসছে জন্ম ঢুকিয়েছে। বেদান্তে জন্মান্তরবাদ নেই।
·        মৃত্যুর পর আর কিছুই নাই—কথামৃতের এই কথায় বলছেন—ওরে শোন শোন, মৃত্যুর পর আর কিছুই নাই! হ্যাঁ, ঠিক কথা। এই ধর্ম, যা কিছু হবে এই জীবনে। লোকটা যতদিন বাঁচে ততদিনই ধর্ম। দেখ, তোরা সবসময় ভাববি যে তোরা অমর হয়ে থাকবি। ওরা মৃত তাই মৃত্যুর কথা বলবে। আমরা কেন মরার কথা বলব!
·        ২৮শে সেপ্টেম্বর বুধবার মহাষ্টমী ১৯৬০—
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—ওরে আমাকে দেখিয়েছে যে রে। রূপধারণ করে, আমার হাত ধরে একটার পর একটা করে দেখিয়েছে। ওই যে শ্লোকটা—অসতো মা সদগময়, তমসো মা…। গোটা শ্লোকটা আমায় রূপধারণ করে দেখিয়েছে। দেখছি, আমি যেন ফাঁকা জায়গা থেকে একটা বাড়ির মধ্যে ঢুকলুম (অসতো মা সদ্গময়)। সেই বাড়িটার মধ্যে একটা ঘরে ঢুকতে আদিত্য বলে একজন লোক—সে তখন মৃত—আমার হাত ধরে একতলা থেকে দোতলা পার করে দিলে (তমসো মা জ্যোতির্গময়)। তারপর অমৃতবাবু বলে একজন লোককে দেখলাম। তিনি ছিলেন ডেপুটি ইন্সপেক্টার অফ স্কুল। তিনিও তখন মৃত। অমৃতবাবু আমার হাত ধরে তেতলা পার করে দিলেন। (মৃত্যোর্মা অমৃতম গময়)। এইভাবে আমার হাত ধরে ধরে একটার পর একটা দেখিয়েছে।    শ্রীজীবনকৃষ্ণের কথা শেষ হলে ধীরেনদা বললেন—আপনি যখন অমরত্বের কথা বলছিলেন আমি তখন ঘড়ি দেখছিলুম। দেখলুম—সন্ধি পুজার সময় শেষ হতে চলেছে আর আপনিও অমরত্বের কথা বলছেন। মরজগত থেকে অমর জগতের সন্ধিই সন্ধি পুজার উদ্দেশ্য। ধীরেনদার কথা শুনে শ্রীজীবনকৃষ্ণ বিস্ময়-বিজড়িত স্বরে বললেন—তোর কথা শুনে অবাক হয়ে যাচ্ছি। …এরকম কো-ইন্সিডেন্স হয় কি করে? বড় আশ্চর্য তো?
·        তোরা যে আত্মিক জগতে অমর হয়েছিস তার প্রমাণ চাই। দেখ, যদি ‘এক’কে মুছে ফেলা যায় তো কী থাকে? কিছুই না। ওই যে স্বামীজীর কথা—‘গিভ মি ওয়ান অ্যান্ড আই শ্যাল গিভ ইউ মিলিয়ন’। তা হলেই হল—জগতে ‘এক’ই হচ্ছে শাশ্বত সত্য। ‘এক’ই জগতে আছে, ছিল, থাকবে। একত্ব লাভ করলেই অমরত্ব লাভ করা হল। তোরা ‘এক’কে কী করে ছাড়বি? পারবি না, কেননা তুই যে রয়েছিস! তুই আছিস বলেই তো ‘এক’ আছে। অতএব ‘এক’কে কী করে ওড়াবি? (ফেব্রুয়ারি ১৯৬০)
·        নচিকেতা যমের কাছে মৃত্যুর রহস্য কী, জানতে গিয়েছিল। অর্থাৎ মৃত্যুর পর কী আছে জানবার জন্য। তারা জীবনটাকে দেখতে চায়নি, জীবন যে এক অপূর্ব বস্তু তা তারা জানে না। এতে কী প্রমাণ হয়, যে তাদের এসব কিছুই হয়নি। আর দেখ, আমি তোদের কী বলি? আমি চিরকাল এই দেহ নিয়ে বাঁচব। যাদের এই সব হয়েছে তারা মৃত্যু কী জানতে চায় না। মৃত্যুর কথা তারা ভাবে না, দেখে না। এই দেহটা, তাতে কী হয়েছে বল দিকিনি। কী এক অপূর্ব বস্তু! ওরা কী করেছে? ওরা আলোতে যা আছে তা দেখতে চায়নি, অন্ধকারে কী আছে তাই খুঁজছে।
·        দেবতারা অমর একথা কারা বলছে? মানুষ বলছে। কাল্পনিক দেবতার সৃষ্টি করে মানুষ একদিন অমর হবে এই আশা করেছিল। বেদে দেখা যায় ঋষি প্রার্থনা করছেন—'মৃত্যোর্মা অমৃতম গময়’। সে তোদের কাল্পনিক দেবতার অমরত্বের জন্য প্রার্থনা করছেনা, করছে তার নিজের জন্য। আমিও তো কতবার বলেছি—দেখ বাবা, মানুষের মাথায় অমরত্বের কোষ আছে। সে কোষ আমি দেখেছি, এখনও মুক্ত হয়নি। তবে হ’তে পারে। (২০শে অক্টোবর ১৯৬০)
·        ‘অসতো মা সদ্গময়’—ন্যাচারাল সেলফ ইভলিউশান (স্বাভাবিক আত্মবিবর্তন) ! সে ইভলিউশান চেক (রোধ) করছে কে? আমারই সুপারস্টিশান (কুসংস্কার)।
·        বেদে বলছে 'মৃত্যোর্মা অমৃতম গময়’, অর্থাৎ এই দেহেতে অমৃতত্ব রয়েছে, সেটা ফুটতে পারে। মৃত্যু হচ্ছে অমৃতের কন্ট্রা (উল্টো)। আমার দেহেতে একটা কন্ট্রা ফুটেছে। সেটা কী বলতে পারিস? জগত এতদিন ব্যষ্টি নিয়েছিল—ব্যষ্টির কন্ট্রা সমষ্টি। এই সমষ্টির সাধন যদি আপনা হতে সম্ভব হয় তাহলে--মৃত্যুর কন্ট্রা অমৃত—সেটাও ফোটা সম্ভব। আরও দেখ অ্যানিম্যালিটির কন্ট্রা ডিভিনিটি। “টু লিভ ইন পারফেক্ট গুডনেস ইজ টু রিয়ালাইজ ওয়ানসেলফ ইন অল”। এইটেই ডিভিনিটির প্রমাণ—তাও ফুটেছে। শৈলেনের (রায়) একটা স্বপ্ন শোন—দেখছে, নির্মল আকাশে পূর্ণচন্দ্র ফুটে রয়েছে অথচ তার আলো পৃথিবীর কোথাও পড়েনি। তার সমস্ত কিরণটা—আমি বসে আছি; আমাতে আবদ্ধ। এর ব্যাখ্যা—পূর্ণচন্দ্রের পূর্ণকিরণ অর্থাৎ পূর্ণ স্নিগ্ধতা অর্থাৎ অমৃতত্ব আমার দেহেতে আবদ্ধ। জগতে কোটি কোটি মানুষে আমার এই অমৃতত্ব ফুটলে তবে আমি এই দেহ নিয়ে চিরটা কাল বাঁচব। নচেৎ--অমৃতত্ব আছে আমার মাথায়—সেটা ফোটার অপেক্ষায় থাকতে হবে। কিন্তু ততদিনে যদি আমি চলে যাই, তাহলে এ প্রশ্ন—আবার ব্যাক টু দ্য প্যাভিলিয়ন। রিভাইভ করতে কেউ আসবে? তোদের হিন্দু শাস্ত্র কী বলে?
·        দেখ বাবা, আজ দুপুরে ধ্যানে বসলাম। ধ্যানের মধ্যে ফর্সা কবরেজকে (শৈলেন্দ্রনাথ রায়) দেখলাম। তারপরই দেখলাম স্বামীজীকে—ধ্যানস্থ। তখন মনে উঠল—রূপের ঘরে। মন চলে গেল সহস্রারে। তারপরেই লয়। কতক্ষণ ছিলাম জানিনা। ধ্যান ভেঙে গেল। যোগনিদ্রায় অভিভূত হলাম। সেই নিদ্রার মাঝে দেখছি, এক বিরাট হাতি। অত বড় হাতি দেখা যায় না। সেই হাতিটার দাবনার কাছে আমি দাঁড়িয়ে। ছুটতে ছুটতে এলো অমর (ফুড সাপ্লাইয়ের)। আমি তখন ভাবছি—এই রে! হাতিটাকে ছোঁবে নাকি? অমর হাতিটাকে স্পর্শ করল। অমনি হাতিটা অমরকে শুঁড়ে জড়িয়ে ওপরে তুলে ধরে রইল। এর কী ব্যাখ্যা দিতে পারিস? ওরে, ওই বিরাট হাতি—জগতের মানুষের মন—সেই মনে আমার অমরত্ব। আমার মৃত্যু নেই। মানুষের মধ্যে যতদিন আমি জীবন্ত—আমি অমর।
·        …এই দেহে অমরত্ব আছে। বিবিদিষায় হবেনা। বিদ্বতে যদি এই কোষ মুক্ত হয়। হ্যাঁ বাবা, কোষ মুক্ত হয়েছে। কিন্তু কী হয়েছে জানিস? ব্যষ্টিতে তা আবদ্ধ হয়ে আছে। ও তো কোনও কাজের কথা নয়।
·        ঠাকুর বলছেন, সে সমুদ্রে পড়লে মানুষ মরে না। অমর হয়। সেটা কী সমুদ্র বাবা? এই জনসমুদ্র। এই জনসমুদ্রে আমি পড়েছি তার প্রমাণ তোরাই দিয়েছিস। প্রশ্ন এইবার—ভগবান কি মরে? না। তাহলে আমি অমর। আর অমর হতে গেলে এই দেহ নিয়ে চিরকাল বেঁচে থাকতে হবে। আত্মার মৃত্যু নেই, ভেগ (অস্পষ্ট কথা)। ঋষি প্রার্থনা করছে দেহ নিয়ে চিরকাল বেঁচে থাকার জন্য। থাকেনি তারা। ফুটবে তবে বলা যাবে। তবু বলে যাই মৃত্যুকে জয় করার কথাই ভাববি। মৃত্যুকে স্যালুট করে নয়।

    


No comments:

Post a Comment

শ্রীজীবনকৃষ্ণের অমৃত কথাসার প্রথম অংশ

১৯৫০ থেকে ১৯৫৩ সালের কিছু কথা সংকলিত করা হয়েছে শ্রীজীবনকৃষ্ণ সংশ্রয় থেকে। যেহেতু সেখানে দিনলিপিতে তারিখের উল্লেখ নেই, তাই এখানে তারিখের উল্ল...