Thursday, November 3, 2022

কাশীতে শ্রীজীবনকৃষ্ণ

 

কাশীতে শ্রীজীবনকৃষ্ণ

 

       ১লা অক্টোবর ১৯৫৬ সালে শ্রীজীবনকৃষ্ণ কাশী যান। দুর্গাপুজার সময় তাঁর কাশীযাত্রা হয়। সেখানে স্থায়ী বসবাসের ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন তিনি। এমনটা আমরা লক্ষ করেছি যে তাঁর আত্মিক জীবনের বড় কোনো পরিবর্তনের সময় তিনি নির্জনে চলে যেতেন। ঘর অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ হয়ে যেত। এবং প্রত্যেক বারেই তিনি বলতেন এবার তিনি একলা থাকবেন।

       ১৯৫৬ সালের অক্টোবর মাসে কাশী যাবার কথা ও দিনলিপির অংশ থেকে সেসময়ের বর্ণনা তুলে আনা হল।

 


       পয়লা অক্টোবর সোমবার ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দ

 

বেশ কিছু লোক সন্ধ্যার পর সমবেত হয়েছেন হাওড়া স্টেশনের নির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্মটিতে। আজ শ্রীজীবনকৃষ্ণ অনির্দিষ্টকালের জন্য সকলকে ছেড়ে চলেছেন। আপাতত তিনি কিছুদিন থাকবেন কাশীধামে। পরে অন্য কোথাও চলে যাবেন। আজ সকলের বিষন্নবদন। কারো বা চোখ দুটি অশ্রুসজল। কোনো কোনো বাড়ির মেয়েরা এসেছেন সকলের অলক্ষ্যে থেকে শ্রীজীবনকৃষ্ণকে একটু দর্শনের আশায়। তৃতীয় শ্রেণীর নির্দিষ্ট কামরায় বসে আছেন তিনি। তাঁর পরনে ধুতি পাঞ্জাবি পায়ে জুতা। সকলের সঙ্গে কথা বলতে বলতে মুখমন্ডল রক্তিমাভ হয়ে উঠেছে। আজ সারাদিন অগণিত মানুষ এসেছে তাঁর কাছে। তবু ক্লান্তি নেই অবসাদ নেই। স্টেশনে এসেও সকলকে হাসিমুখে কাছে ডাকছেন সকলের সঙ্গে কথা বলছেন। কথাপ্রসঙ্গে বারবার ফিরে আসছেন তাঁর জীবন সংগীতের মূল সুরে। “বাবা ভগবান বাইরে কোথাও নেই, ভগবান তোর ভেতরে।” ক্রমশ ট্রেন ছাড়ার সময় হয়ে এলো কিন্তু প্রাণের দেবতাকে বিদায় দিতে মন চায় না। বিচ্ছেদের চরম সময় অনেকে অশ্রু সংবরণ করতে পারলেন না। শ্রীজীবনকৃষ্ণ মুহুর্মুহু সমাধি মগ্ন হতে লাগলেন। জয় রামকৃষ্ণ জয় ঠাকুর জয় জীবনকৃষ্ণ ধ্বনিতে মুখরিত হলো রেলওয়ে প্লাটফর্ম। ট্রেন ধীরে ধীরে গতি বাড়িয়ে এগিয়ে চলল গন্তব্য পথে।

শ্রীজীবনকৃষ্ণের অনুমতি পেয়ে তাঁর সঙ্গে চলেছেন আরও সাতজন। কেষ্ট মহারাজ, মৃত্যুঞ্জয় রায়, রঘুনাথ সেন, সৌরেন ভট্টাচার্য, কালিপদ বন্দ্যোপাধ্যায়, জিতেন চট্টোপাধ্যায় ও সৌমেনবাবু। নবাগত সৌমেনবাবুর এক নিকটাত্মীয়ের বাড়িতে শ্রীজীবনকৃষ্ণের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। এবার যারা সঙ্গে চলেছেন তাদের মধ্যে কয়েকজন বিবাহিত লোক আছে। এটি এক উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম।

ট্রেনটি স্টেশন এলাকা ছেড়ে যাবার পর সকলে জিনিসপত্র একটু গুছিয়ে নিয়ে শ্রীজীবনকৃষ্ণের সামনের সারিতে আশেপাশে নিবিড় হয়ে বসলেন। সকলকে উদ্দেশ্য করে তিনি বললেন—দেখলি বাবা! এই হচ্ছে মায়ার রাজ্য। আরেক মায়ার বন্ধনের মধ্যে ঠাকুর ফেলেছিলেন। এদেরকে যে ছেড়ে পালিয়ে আসতে হয়নি, বলে জানিয়ে আসতে পেরেছি, এই ঠাকুরের অশেষ কৃপা। তারপর প্রবাহিত হলো ভগবৎকথার মন্দাকিনী ধারা।

শ্রীজীবনকৃষ্ণ বললেন—দেখ আজ পাঁচশ বছর ধরে ভগবান বাঙালি জাতকে কৃপা করে আসছেন। পাঁচশ বছর আগে এই বাঙালির ঘরে জন্মেছিলেন মহাপ্রভু। আবার পাঁচশ বছর পরে এই বাংলাদেশেই লীলা করলেন ঠাকুর। বাঙালির ওপরে ভগবানের কী কৃপা বল তো!

ট্রেনের গতির মতোই আলোচনার ধারাও বিভিন্নমুখী হতে লাগলো। আজ এক স্বর্গীয় আনন্দের বাহন হয়েছে ট্রেনের কামরাটি। বর্ধমানের কাছে আসতে গাড়ির গতি মন্দীভূত হলো শ্রীজীবনকৃষ্ণ পকেট থেকে তিনটি টাকা বার করে মহারাজদাকে সীতাভোগ মিহিদানা আনতে বললেন। মাত্র দেড় টাকাতে দু চ্যাংড়া মিষ্টি পাওয়া গেল। শ্রীজীবনকৃষ্ণ সকলকে একরকম জোর করেই সীতাভোগ মিহিদানা খাওয়ালেন। বর্ধমান স্টেশন ছাড়লে তিনি বিছানার এক প্রান্তে ঠেসান দিয়ে বসে রইলেন। নিজের জায়গাটি ছেড়ে দিলেন অপর সকলের শোবার জন্য। রিজার্ভ সিটের কামরা। অনুরোধ-উপরোধ করেও কোন ফল হলো না। শ্রীজীবনকৃষ্ণ অতন্দ্র প্রহরীর মতো সারা রাত জেগে বসে রইলেন। তাঁর কাছে শোনা শ্রীরামকৃষ্ণের কথা মনে পড়ে গেল। একদিন রাত্রে সেবক লাটু (পরে স্বামী অদ্ভুতানন্দ) ঠাকুরের পদসেবা করছেন। শ্রীরামকৃষ্ণ স্নেহ মাখা স্বরে প্রশ্ন করলেন—হ্যাঁরে লেটো? ভগবান কখন ঘুমোন বল তো? লাটু বললেন, হামনে ক্যামনে জানবে। শ্রীরামকৃষ্ণ বললেন—ওরে লেটো ভগবান কখনো ঘুমোন না রে। তাইতো আমরা সকলে ঘুমিয়ে বাঁচি।

ভোর প্রায় ছটার সময় একটি স্টেশনের কাছে এসে সিগন্যাল না পাওয়ায় গাড়ি থেমে গেল। একাদিক্রমে প্রায় ৪০ মিনিট গাড়ি এখানে দাঁড়িয়ে রইলো। শোনা গেল আমাদের আগের ট্রেনের ইঞ্জিন বিকল হয়ে যাবার জন্যই এই অবস্থা। পরে গাড়ি ছাড়লো বটে কিন্তু যত বেলা বাড়ে তত আরো দেরি হয়। নির্দিষ্ট সময়ের প্রায় চার ঘণ্টা পরে বেলা ১ টা ৩৫ মিনিটে কাশীধামে এসে পৌঁছনো গেল। মৃত্যুঞ্জয়বাবুর তত্ত্বাবধানে সমস্ত জিনিসপত্র নামিয়ে দুখানি গাড়ি ভাড়া করা হলো। পথ দেখিয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় নিয়ে যাবার জন্য একটি গাড়িতে রইলেন সৌমেনবাবু, আর একটি গাড়িতে রঘুনাথ। রঘুনাথ কয়েকবার কাশীতে এসেছেন এবং এখানে অনেক দিন কাটিয়ে গেছেন। তাই শ্রীজীবনকৃষ্ণ তাকে বলেছিলেন কাশী-এক্সপার্ট। রঘুনাথ ভাই নিজেই আরেকটি উপাধি গ্রহণ করেছিলেন। এই দলে ছিলেন মোট আটজন। রঘুনাথ ভাই নিজের সম্বন্ধে বলতেন আট পাগলের এক পাগল। ক্রমে দুটি গাড়ি এসে পড়ল ২০৯ নম্বর রামাপুরায় শ্রীনাথ ভবনে। উঁচু ভিতের ওপর বাড়িটি উত্তর-দক্ষিণে লম্বা। উঁচু রক। মাঝখান দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করার সিঁড়ি। সিঁড়ির কোলে বড় দালান। দালানের ডানদিকে দোতলায় ওঠার সিঁড়ি। দোতলায় দু’খানি ঘরেই আপাতত সকলের থাকার ব্যবস্থা। পাশাপাশি দু’খানি প্রশস্ত ঘর। ঘর দুটির পূর্বদিকে লোহার রেলিং দেওয়া সুন্দর বারান্দা। ভিতরের দালান দিয়ে ও বাইরের বারান্দা দিয়ে ঘর দু’খানির মধ্যে যাতায়াত করা যায়। দালানের উত্তর পশ্চিম প্রান্তে স্নানঘর, ও পরে রান্নাঘর। বাড়িটির পূর্ব দিকে রাস্তার পারে একটি ছোট মন্দির ও মন্দির সংলগ্ন একটি ধর্মশালা। কিন্তু এই বাড়িতে এসে শ্রীজীবনকৃষ্ণ খুব আনন্দিত হতে পারলেন না। বাড়ির একতলায় যারা থাকে তারা সংসারী মানুষ। মেয়েরা ওই দালান ব্যবহার করে। তাদের মধ্য দিয়ে যাতায়াত করা শ্রীজীবনকৃষ্ণের আদৌ মনঃপুত নয়।

নিবেদিতপ্রাণ মৃত্যুঞ্জয়বাবু শ্রীজীবনকৃষ্ণের অসুবিধার কথা উপলব্ধি করে বাড়ির লোকদের সঙ্গে কথা বললেন। ঠিক হলো যে শ্রীজীবনকৃষ্ণের যাতায়াতের সময় মেয়েরা দালান থেকে সরে যাবেন। আপাতত একটি কঠিন বাধা অতিক্রম করা গেল। উত্তর প্রান্তের ঘরটি তাঁর জন্য নির্দিষ্ট হলো। এবার ধোয়া মোছা ও পরিষ্কার করার পালা। সকলের আপ্রাণ চেষ্টায় বাড়ির এই অংশটি এক নতুন শ্রী ধারণ করল। ক্রমে স্নানাদি-পর্ব শেষ হলে দোকান থেকে খাবার কিনে আনা হল। সামান্য জলযোগেই সারাদিনের মতো শ্রীজীবনকৃষ্ণের আহার শেষ হলো। তিনি একটু স্থির হয়ে বসেছেন বিছানা পাতা চৌকির ওপর। ঘরে দু’তিন জন লোক আছেন। এমন সময় কোথা থেকে তিনটি ছোট বড় হনুমান তাঁর ঘরের উত্তরের জানালায় এসে হাজির হলো। হনুমান দর্শন মাত্র চোখের নিমেষে শ্রীজীবনকৃষ্ণের সমস্ত দেহ তোলপাড় করে মহাবায়ু জাগ্রত হয়ে উঠলো। তাঁর বরবপু এক বিচিত্র রূপ ধারণ করল। তাঁর এই রকম অবস্থা আর কখনো দেখার সৌভাগ্য হয়নি। কিন্তু কী আশ্চর্য! হনুমানগুলোকে তাড়িয়ে দেওয়া হলে তিনি আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এলেন।

একদিন হাওড়ায় কেদার দেউটি লেনের ঘরখানিতে তিনি বলেছিলেন, দেখ গঙ্গায় কেউ স্নান করে নিজে পবিত্র হবার জন্য, আবার কেউ স্নান করে গঙ্গার জলকে পবিত্র করার জন্য। বারানসী তীর্থভূমির মহিমা অম্লান উজ্জ্বল রাখার জন্যই যেন শ্রীজীবনকৃষ্ণ এখানে আগমন করেছেন। উল্লেখযোগ্য যে এর আগেও শ্রীজীবনকৃষ্ণ একবার কাশীধামে এসেছিলেন। মানিক্য পত্রিকার ষষ্ঠ বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা হতে তাঁর নিজের কথার উল্লেখ করা যেতে পারে এই প্রসঙ্গে—১৯২৬ সালে যখন কাশী যাই তখন একদিন মাত্র বিশ্বনাথ দর্শনে গিয়ে ছিলাম। কচুরি গলির ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছিল। খুব ভিড় ছিল। তাই আর কখনো মন্দিরের দিকে পা বাড়াই নি। তবু দেখতুম যখনই বেরোতুম, আপনা হতেই জপ হতো। অহল্যা বাই ঘাটে ধ্যান করতে বসতুম। মন আপনা থেকে হু—হু করে উঠে যেত। খুব ধ্যান হতো। তখনই বুঝেছিলাম যে স্থান মাহাত্ম্য আছে।

শ্রীজীবনকৃষ্ণের ইচ্ছানুসারে অনেকে বিকালের দিকে একটু বেড়াতে বেরোলেন। ক্রমে দিবা অবসান হলো। মন্দিরে মন্দিরে সন্ধ্যারতির মাঙ্গলিক ধ্বনিতে বারানসী মুখরিত হলো। শ্রীজীবনকৃষ্ণের নির্দেশে যথারীতি পাঠ শুরু হবার সঙ্গে সঙ্গে জীবন নাট্যের আরেকটি অংকের যবনিকা উত্তোলন হলো। এবার নিরবচ্ছিন্নভাবে শ্রীজীবনকৃষ্ণের সঙ্গসুখ উপভোগ এবং তাঁর শ্রীমুখ নিঃসৃত বাণী সুধা পান।

রাত্রি সোয়া আটটার পর পাঠ শেষ হলো, এক নতুন পরিবেশে শ্রীজীবনকৃষ্ণের সান্নিধ্যে ভজনানন্দের পর ভোজনের জন্য আবার বাইরে বেরোতে হবে। কাশী ভ্রমণের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল যে এবার রান্নার কোনো আয়োজন ছিল না। মা অন্নপূর্ণার ভাণ্ডার কাশী। এখানে অন্নের অভাব নেই। প্রচুর হোটেল, খাবারের দোকান, ভাত, রুটি, পুরি, লুচি, মাছ, মাংস, দই-মিষ্টি—যার যেমন অভিরুচি, যার যেমন সামর্থ্য, যার যেমন ইচ্ছে। শ্রীজীবনকৃষ্ণের জন্য আলাদা কোনো ব্যবস্থা করতে তিনি দেননি। এমনকি দুবেলা চায়ের জন্য তাঁর নির্দেশে জামার পকেট থেকে পয়সা নিয়ে রাস্তার দোকান থেকেই চা কিনে আনা হয়েছে, মহানন্দে তাই তিনি গ্রহণ করেছেন। শ্রীজীবনকৃষ্ণ প্রায়ই বলতেন—ওরে, আমি তোদের মতোই একজন সাধারন মানুষ, সামান্য, নগণ্য আমি। শুধু মুখের কথায় নয়, ব্যবহারিক জীবনের সর্বক্ষেত্রে সে প্রমাণ তিনি রেখে গিয়েছেন।

এক নতুন আনন্দে অনাস্বাদিত মাধুর্যে প্রথম দিনটি অতিবাহিত হল। পরদিন বুধবার তেসরা অক্টোবর ১৯৫৬। ভোররাত্রে শ্রীজীবনকৃষ্ণের কণ্ঠস্বর শুনে ঘুম ভেঙে গেল, বারানসী তখনও নিদ্রামগনা, আকাশ অন্ধকার। দূর হতে পাখির কলগীতিতে ভেসে আসছে ঊষার আগমনী সংগীত, পূবদিকের বারান্দা দিয়ে তাঁর ঘরের বাইরে গিয়ে দাঁড়ালাম। তাঁর ঘরের পশ্চিম দেওয়ালে শ্রীরামকৃষ্ণ ও সারদামণি দেবীর দুইটি ক্যালেন্ডারের ছবি টাঙ্গানো হয়েছিল। সেই ছবি দুটির কাছে গিয়ে শ্রীজীবনকৃষ্ণ হাত তুলে নাচছেন আর বলছেন— জয় ঠাকুর, জয় মা, জয় ঠাকুর, জয় মা! নাচের ভঙ্গি বিচিত্র। দু’পায়ের গোড়ালি তুলে আঙুলের উপর ভর দিয়ে দুই হাত তুলে নৃত্য। নৃত্যের পর প্রণাম। ছবির পা দু’খানিতে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম। কী প্রাণঢালা আত্মনিবেদন। প্রণামের সঙ্গে যেন তাঁর সমস্ত সত্তাকে নিবেদন করছেন ঠাকুরের শ্রীচরণে, এমনিভাবে কয়েকবার। শ্রীরামকৃষ্ণ বন্দনা শেষ হলে ঘরের মধ্যে প্রবেশ করলাম। খাটে বসিয়ে ধ্যান করতে বললেন। তিনিও ধ্যান শুরু করলেন। ধ্যানে কিছু দর্শন হলো না। কিন্তু অনুভব করলাম ধীরে ধীরে জৈবী অস্তিত্ব লোপ পাচ্ছে। হাত নেই, পা নেই, কোন অঙ্গ প্রত্যঙ্গ নেই, কিছু নেই। শুধু আছে একটু বোধমাত্র। এই বোধটুকু যেন অসীম আনন্দলোকে ভেসে বেড়াচ্ছে। সেদিন বিশেষভাবে উপলব্ধি করেছিলাম যে শ্রীজীবনকৃষ্ণ-সান্নিধ্যই হচ্ছে স্বর্গ এবং তাঁর পূত সঙ্গে যে আনন্দ অনুভূতি তাই স্বর্গসুখ।

ধ্যান ভাঙলে সকলকে ঘরে ডাকা হল। শ্রীজীবনকৃষ্ণ নিজে কথামৃত পাঠ শুরু করে অপরকে পড়তে দিলেন। প্রায় সোয়া ছটা পর্যন্ত পাঠ চলল। তারপর প্রাতঃকৃত্য আদি সারা হলে ভ্রমণের পালা। সকলে একসঙ্গে বেড়াতে গেলে কাজের অসুবিধা হবে, তাই পালা করে দুজন বাড়িতে থাকতেন। তারা ঘর ঝাঁট দিয়ে ধুয়ে মুছে পরিপাটি করে ঘর গুছিয়ে রাখতেন। আজ মহালয়া। শ্রীজীবনকৃষ্ণ ও অপর সকলে গঙ্গাস্নান সেরে বিশ্বনাথ দর্শন গেলেন। ফিরে এসে শ্রীরামকৃষ্ণ পুঁথি পাঠ চলল বেলা প্রায় দশটা পর্যন্ত, তারপর মধ্যাহ্ন আহারের বিরতি।  কেষ্ট মহারাজ ও আরো কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে শ্রীজীবনকৃষ্ণ চললেন ‘বেনারস লজ’ নামে এক হোটেলে। পথে এক ভাঁড় করে দই কেনা হলো, হোটেলের খাবার খুব ভালো নয়, কোনরকমে খাওয়া চলে এইমাত্র। শ্রীজীবনকৃষ্ণ সেই অন্নই গ্রহণ করলেন। সাধারণ মানুষের মতোই খাওয়া তাঁর। কেবল এক টুকরো করে মাছ অতিরিক্ত নেওয়া হয়েছিল। খাওয়া শেষ হলে সকলে নিজের নিজের পয়সা মিটিয়ে দিয়ে বাড়িতে ফিরে এলেন। এরপর বেলা প্রায় আড়াইটা পর্যন্ত বিশ্রাম। কিন্তু শ্রীজীবনকৃষ্ণ একটানা এতক্ষণ বিশ্রাম করতেন না। একটু বিশ্রাম করে অবশিষ্ট সময় তিনি ধ্যান করে কাটাতেন। বিকেলে পাঠ শেষ হলে তিনি আর বেড়াতে বের হতেন না। কিন্তু অপর সকলকেই বেড়াতে যেতে বললেন।

সন্ধ্যায় বেড়িয়ে ফিরলে তাঁর কাছে বিবরণ দিতে হতো-- কোথা দিয়ে কিভাবে বেড়িয়ে আসা হলো। শুনে হয়তো বলতেন—ওঃ, ওখানে গিয়েছিলি, বাঃ বেশ হয়েছে! তাঁর এই আনন্দ-উচ্ছ্বাসে বিকালের বেড়ানোটাও আনন্দময় হয়ে উঠত। সকলের দিকে সমান নজর। নৈশ আহার শেষ করে এসে প্রত্যেককে তাঁর কাছে খাওয়ার পূর্ণ বিবরণ দিতে হতো। কোথায় খাওয়া হলো, কেমন দোকান, কি খেলি, রুটি? বেশ বেশ। ক’খানা রুটি খেলি? ওমা! মোটে চারখানা—ওতে কি হবে রে? কালকে খাওয়া আর একটু বাড়াবি। মাংস খেয়েছিস? খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সমস্ত বিবরণ দিতে হতো। তবে সেদিনের মতো সবার ছুটি। সন্তানের কাছ থেকে সব খবর নেওয়ার জন্য বাবা-মা কি প্রতিদিন এই ভাবে প্রতীক্ষা করেন? কাশীতে শ্রীজীবনকৃষ্ণ এক অভিনব সংসার পেতেছিলেন—কিছুই নেই অথচ সবই আছে!

৪ঠা অক্টোবর, বৃহস্পতিবার, শেষ রাত্রে দর্শন হল, বিশ্বনাথ শিবলিঙ্গের ভিতর থেকে উদয় হলেন শ্রীজীবনকৃষ্ণ, পরনে ধুতি পাঞ্জাবি। স্বপ্নটি নিবেদন কড়া হলে শ্রীজীবনকৃষ্ণ বললেন—কাশী আসার ফল পেলি। আজ সকালে অসি নদীর সঙ্গমস্থল পর্যন্ত বেড়াতে যাওয়া হলো। শ্রীজীবনকৃষ্ণের সঙ্গে চলেছেন কেষ্ট মহারাজ, সৌরেন, সৌমেনবাবু ও আরো কয়েকজন। ইতিমধ্যে প্রভাতের স্নিগ্ধ বাতাস প্রখর হয়ে উঠেছে। চোখে মুখে রোদ লেগে শ্রীজীবনকৃষ্ণের কষ্ট হচ্ছে দেখে একজন তাঁর মাথায় ছাতা ধরলেন। অমনি তিনি প্রতিবাদ করে উঠলেন। তাঁর নির্দেশে ছাতা বন্ধ করতে হল। শ্রীজীবনকৃষ্ণ বললেন, মথুরবাবু যখন কাশীতে এসেছিলেন তখন পাইক বরকন্দাজ তাঁর মাথায় ছাতা ধরত। তিনি এখানে রাজার মতো থাকতেন। তা বাবা, তোরা যে আমাকে রাজা মহারাজা করে তুলতে চাস। একথা বলেই মৃদু হাস্যে পরিবেশটিকে হালকা করে দিলেন।

৫ই অক্টোবর সকালে বেড়াতে বেরিয়ে কয়েকজনের ইচ্ছা হলো আজ শ্রীরামকৃষ্ণের সেবাশ্রমে যাওয়া যাক। শ্রীজীবনকৃষ্ণ প্রথমে একটু ইতস্তত করলেন, বললেন— ওদের (মঠের স্বামীজীদের) সঙ্গে দেখা হলে ওদের যে সব টেনে নেব রে। কিন্তু সকলের আগ্রহ দেখে তিনি রাজি হলেন। সকলকে একটি করে টাকা প্রনামী দিতে বললেন। নিজের পকেট থেকে একটি টাকা বার করে দিলেন। মঠের প্রাঙ্গণে প্রবেশ করার আগে প্রধান ফটকের দুটি থামেই মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করলেন। মঠের উত্তর-পূর্ব দিকের পথ ধরে মন্দিরে আসা হল, মন্দিরে ওঠার সিঁড়ির কাছে আসামাত্র শ্রীজীবনকৃষ্ণের শ্রীঅঙ্গে ভাবাবস্থা প্রকাশ পেল। কম্পমান বরতনু কোনরকমে সিঁড়ি কয়টি অতিক্রম করে আসার পরই, ভূলুণ্ঠিত প্রণতি। উপরে শ্রীরামকৃষ্ণের নয়নাভিরাম মূর্তি, নীচে প্রণাম শয়ানে শ্রীজীবনকৃষ্ণ। পিছনের পা দুটি তোলা অবস্থায় হাত দুটিও করজোড়ে নমস্কার নিবেদন করার সঙ্গে সঙ্গে সমাধি। প্রণাম নিবেদনের এই অপরূপ দৃশ্যটি কখনো ভোলার নয়। ফেরার সময় দেখা গেল দালানে দুর্গা প্রতিমা রং করা হচ্ছে। স্বামীজীরা দূরে আছেন, বড় বড় হাঁড়ি কড়ার বিলি বন্দোবস্ত করছেন, কেউ কিছু বুঝতে পারলেন না, জানতেও পারলেন না। শ্রীজীবনকৃষ্ণের ইচ্ছাই পূর্ণ হল।

শ্রীজীবনকৃষ্ণের খাওয়ার অসুবিধা হচ্ছে দেখে গতকাল বিকেল থেকে মৃত্যুঞ্জয়বাবু রঘুনাথ ভাই ভালো হোটেলের সন্ধানে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। আজ সকালে বেরিয়ে আসার পর যখন শ্রীরামকৃষ্ণ পুঁথি পাঠ চলছে, তখন রঘুনাথ ফিরে এসে এক আনন্দ সংবাদ জানালো। বীরেশ্বর পাঁড়ের ধর্মশালা সংলগ্ন হোটেলে আজ থেকে খাবার ব্যবস্থা হয়েছে। স্পেশাল খাবার। লোক পিছু দু’টাকা। বীরেশ্বর পাঁড়ে ছিলেন নিষ্ঠাবান হিন্দু, সুসাহিত্যিক এবং শিক্ষাব্রতী (১৮৪২—১৯১১)। তাঁর নামাঙ্কিত এই ভোজনশালাটি পরিচালনা করেন তাঁর এক প্রপৌত্র। এখানে খাবার সুব্যবস্থা হবে এই আশায় সকলে আনন্দিত হলেন। পাঠ শেষ হলে স্নানাদি সেরে যথাসময়ে খেতে যাবার জন্য শ্রীজীবনকৃষ্ণ প্রস্তুত হলেন। কিন্তু যখন শুনলেন যে আজ প্রথম দিন বলে বিশেষ খাবারের ব্যবস্থা করতে আরো আধঘণ্টা দেরি হবে, তখন তিনি অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হলেন এবং কারো কথায় কর্ণপাত না করে আজও বেনারস লজে মধ্যাহ্নভোজন সমাধা করে এলেন। অপ্রত্যাশিত এই পরিস্থিতিতে সকলের মন ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল। আগে থেকে ব্যবস্থা করা আছে বলে অনিচ্ছাসত্ত্বেও কয়েকজনকে যেতে হল ধর্মশালা সংলগ্ন ওই হোটেলে। এখানেও আরেক বিস্ময়। হোটেল পরিচালকটি বয়সে তরুণ, সুদর্শন, বিনয়-নম্র তার ব্যবহার। দেখা গেল ভালোভাবে খাওয়াবার ব্যাপারে তার আন্তরিকতার অভাব নেই। রান্নাগুলিও বেশ সুস্বাদু। হৃষ্টচিত্তে ভোজনপর্ব সমাধা করে শ্রীজীবনকৃষ্ণের কাছে সমস্ত বিবরণ নিবেদন করা হলে সব শুনে তিনি পরদিন থেকে ওখানে যেতে রাজি হলেন। রঘুনাথ ভাইয়ের বুক থেকে যেন একটা ভারী পাথর সরে গেল। পরিবেশ আবার আগের মত আনন্দোচ্ছল হয়ে উঠলো।

৬ই অক্টোবর শনিবার সকালে ঠিক হল যে আজ বরুনা নদীর সঙ্গমস্থল পর্যন্ত বেড়াতে যাওয়া হবে। পায়ে হেঁটে চলা শুরু হয়ে গেল। চকের ধার দিয়ে যাবার সময় বিশ্বনাথের মন্দির ভেঙে মসজিদ তৈরির কথা উঠল, অনেকে হয়তো জানেন যে পুরাতন বিশ্বেশ্বরের মন্দিরটি সম্রাট আওরঙ্গজেবের রাজত্বকালে বিধ্বস্ত হয়। পুরাতন মন্দিরের গায়েই গড়ে ওঠে একটি নতুন মসজিদ। শ্রীজীবনকৃষ্ণ আগ্রহ প্রকাশ করায় পুরাতন মন্দির প্রাঙ্গণে আসা হলো। পুরাতন মন্দিরের ভগ্নাবশেষ, রত্নবেদী, মসজিদ, নুতন মন্দির, সবই ওই জায়গা থেকে ভালোভাবে দেখা যায়। দেখতে দেখতে শ্রীজীবনকৃষ্ণ ভাবাবিষ্ট হলেন। বদ্ধাঞ্জলি হয়ে বলছেন—জয় মহম্মদ। জয় বিশ্বনাথ। জয় ঠাকুর। আর ক্ষণে ক্ষণে তিনি ভাবসমাধিতে মগ্ন হচ্ছেন। সে এক অপূর্ব দৃশ্য। অপূর্ব পরিবেশ। শ্রীজীবনকৃষ্ণের কন্ঠে একসঙ্গে বিশ্বনাথের, ঠাকুরের, ও মহম্মদের জয়ধ্বনি শুনে বলতে ইচ্ছে হলো—হে ভগবান তোমারই জয়, তোমারই জয়।

কিছুক্ষণ পরে আবার পদযাত্রা শুরু হয়ে গেল। ক্রমে গঙ্গানদীর মূল সেতুটির কাছে আসা হল। বড় সেতুটিতে ওঠার আগে আর একটি ছোট সেতুর উপর উঠতে হয়। রঘুনাথ ভাই এবার সানন্দে ঘোষণা করলেন এই পোলটির নীচেই বরুনা নদী। সকলে বরুনা নদী দেখার আগ্রহে নীচের দিকে চেয়ে চেয়ে পোলে উঠছেন, কিন্তু নদী কই! প্রথমে দেখা গেল সারি দেওয়া ল্যাম্প পোস্টের চূড়া, পরে ল্যাম্প ফিট করা ব্র্যাকেট গুলি, পরে গোটা ল্যাম্পপোস্ট গুলি এবং সবশেষে নীচে পিচের রাস্তা। রগুনাথ ভাই ভুলে গেছেন যে বরুনা নদী সেতুর এপারে নয়, ওপারে। হাস্য পরিহাসের এই দুর্লভ সুযোগ কেউ হারাতে রাজি নয়। সকলের সঙ্গে রঙ্গনাথ শ্রীজীবনকৃষ্ণও যোগ দিলেন। তারপর বড় পোলটির মাঝখানে আসা হল। এখান থেকে কাশীর দৃশ্য বড় নয়নাভিরাম। অসংখ্য মন্দির, ঘাট, গম্বুজ, মিনার; প্রভাতের স্নিগ্ধ আলোকে গঙ্গার জলে তার প্রতিবিম্ব। যেন মায়াময় স্বপ্নপুরী। ভারতীয় ধর্ম ও সংস্কৃতির যেন এক প্রস্ফুটিত পুষ্প। এই নয়নবিমোহন দৃশ্যাবলী দেখতে দেখতে শ্রীজীবনকৃষ্ণ সমাধিমগ্ন হলেন। স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এলে তিনি সূর্য-প্রণাম করে ফেরার পথে পা বাড়ালেন। এবারে বাসে করে ফেরা হলো। শ্রীজীবনকৃষ্ণ সকলের ভাড়া দিলেন।

গতকাল ক্ষিতীশবাবুর দাদা জ্যোতিষবাবু এবং তাঁর সঙ্গে নীরোদ ও বরাট নামে দুই ভদ্রলোক এসেছেন এলাহাবাদ থেকে, আজ বিকেলে তারা চলে যাবেন। আজ সকালে ক্ষিতীশবাবুও এসেছেন। সকলের খাবার ব্যবস্থা হল বীরেশ্বর পাঁড়ের ধর্মশালা সংলগ্ন ওই হোটেলে। যথাসময়ে আজ শ্রীজীবনকৃষ্ণ সকলের সঙ্গে সেখানে খেতে গেলেন। খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা ও আপ্যায়নে সকলেই খুব খুশি হলেন। যে যুবকটি হোটেলটি পরিচালনা করেন তাকে ডেকে শ্রীজীবনকৃষ্ণ ভোজনকক্ষে শ্রীরামকৃষ্ণের একটি ছবি রাখতে বললেন।

 দেখতে দেখতে মহা সপ্তমীর দিন এসে গেল। ১১ই অক্টোবর, বৃহস্পতিবার। শ্রীজীবনকৃষ্ণ অদর্শনে কাতর বহু লোক ঠিক করেছেন এবার পূজার ছুটির কয়েকটি দিন তাঁরা কাশীধামে শ্রীজীবনকৃষ্ণ-সঙ্গে কাটাবেন। গতকাল হাওড়া থেকে এসেছেন গণেশ, অজিত, জলধর। তাদের স্টেশন থেকে আনার জন্য কালী বন্দ্যোপাধ্যায়কে তিনি পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু ট্রেন অনেকক্ষণ লেট ছিল। তাঁদের আসতে দেরী হচ্ছে দেখে শ্রীজীবনকৃষ্ণ ব্যাকুল হয়ে উঠেছিলেন। তারা আসতে তিনি শান্ত হলেন। আজ কলকাতা থেকে বহু ভক্ত আসছেন। রঘুনাথ ভাই ও সৌরেনকে স্টেশনে যেতে নির্দেশ দিলেন শ্রীজীবনকৃষ্ণ। নিজেও যাবার জন্য খুব আগ্রহ প্রকাশ করলেন। কিন্তু সকলের ইচ্ছানুসারে তিনি স্টেশনে না গিয়ে কেষ্ট মহারাজ ও আরেকজনকে নিয়ে বেড়াতে বেরোলেন। অদ্বৈত আশ্রম ও থিওসফিক্যাল সোসাইটির পথ ধরে ক্রমাগত পশ্চিমের পথ ধরে চলতে লাগলেন। পথিমধ্যে কত কথা, কত আলোচনা। মানুষের দেহের মধ্যে ভগবান—এ কথা যখনই সে জানবে তখনই সর্ববিধ বন্ধন থেকে তার মুক্তি। কথা বলতে বলতে রেললাইনের কাছে তিনি এসে পড়লেন। নিজেই খোঁজ নিলেন বেনারস স্টেশন কতদূর? যখন শুনলেন যে পায়ে হাঁটা পথে মাত্র মাইল দেড়েক দূর আর ট্রেন আসার নির্দিষ্ট সময়ের আরও ৩৫ মিনিট বাকি, তখন ধরে বসলেন স্টেশনেই যাবেন, রেললাইনের পথ ধরে। “আহা ওরা আসছে কত কষ্ট করে, হঠাৎ যদি আমাদের স্টেশনে দেখতে পায় ওদের কত আনন্দ হবে বলতো”।

শ্রীজীবনকৃষ্ণর ইচ্ছা। ‘না’ বলে কার সাধ্য? সবাই আনন্দ পাবে তার জন্য শত কষ্ট স্বীকার করতেও রাজি। চললেন লাইন ধরে, বৃষ্টিতে পিছল পথে। কোথাও কাদাজল, কোথাও বা নানা আবর্জনা, কোনও ভ্রুক্ষেপ নেই। সেই অবস্থাতেই কথা বলতে বলতে চলেছেন। দৃষ্টি কেবল সামনের দিকে। স্টেশনের কাছে যখন এসেছেন তখন ঘামে গায়ের পাঞ্জাবিটা ভিজে গেছে। কিন্তু এখানে এসে হতাশ হতে হলো। গাড়ি আজও লেট। বেলা সাড়ে দশটা নাগাদ ট্রেন পৌঁছবার সম্ভাবনা। এই অবস্থায় অপেক্ষা করা নিরর্থক। তাই বাসে করে তিনি বাড়ি ফিরে এলেন, অধীর আগ্রহে সকলের আগমনের প্রত্যাশায় অপেক্ষা করতে লাগলেন, ট্রেনযাত্রীরা শ্রীনাথ ভবনে এসে পৌছলেন বেলা ১১টায়। এলেন সুধীনবাবু, অনাথ, অরুণ, গোপাল, জ্যোতির্ময়, দিলীপ, মুরারী, ধীরেন (বনগাঁ), বিমলবাবু এবং আরো অনেকে। সে এক অপূর্ব দৃশ্য। এতদিন অদর্শনের গোপন ব্যথা আজ আর কোনো বাধা মানে না। তাঁরা কাঁদেন, শ্রীজীবনকৃষ্ণের চোখেও জল, বেদনার্ত কণ্ঠে তিনি বললেন— ওরে তোদের সকলকে ছেড়ে আমি এতদিন কি করে ছিলুম রে!  

 (সংগৃহীতঃ বরযাত্রী, জিতু চট্টোপাধ্যায় লিখিত)  

 

১১ই অক্টোবর ১৯৫৬

বারানসী স্টেশনে শ্রীযুক্ত সৌরেন পায়চারি করছেন, আর ঘনঘন বড় ঘড়িটি দেখছেন। গত ২রা অক্টোবর ওঁরা জনা ছয় মিলে শ্রীজীবনকৃষ্ণসহ কাশীধামে আসেন। আজও হাওড়া থেকে শ্রীজীবনকৃষ্ণ সন্দর্শনে একটি দলের আসবার কথা। তাদের জন্য তিনি অপেক্ষমান। দুন এক্সপ্রেস কিছু দেরিতে প্রায় সকাল সাড়ে দশটার সময় স্টেশনে প্রবেশ করল। সৌরেন! সৌরেন! শ্রীযুক্ত অরুণের ডাক শুনে তিনি একটি কামরা দরজায় এসে দাঁড়ালেন। গাড়ি থেকে নেমে এলেন শ্রীযুক্ত সুধীন, তাঁর এক কবিরাজ বন্ধু, মৃত্যুঞ্জয়, হীরু, অমল, মুরারি, জ্যোতির্ময়, ধীরেন (বনগাঁ), অরুণ, গোবিন্দ, খগেন, অনাথ, গোপাল রায়, নিতাই ঘোষ, বিনয়, আনন্দ, রামকৃষ্ণ ও দিলীপ।

সৌরেন, দিলীপের প্রতি --তুই সবশেষে নামলি?

দিলীপ—কেন ভুলে গেলি এর মধ্যে উনি সেদিন কী বললেন মনে নেই? মা ঠাকুরানীর প্রতি ঠাকুরের উপদেশ—গাড়িতে উঠবে আগে, নামবে সবার শেষে।

সৌরেন --তোরই দেখছি ঠিক ঠিক।

সকলের কলহাস্যে প্ল্যাটফর্ম মুখরিত হলো।

শ্রীযুক্ত মৃত্যুঞ্জয় গত পয়লা অক্টোবর তারিখে শ্রীজীবনকৃষ্ণকে নিয়ে হাওড়া থেকে বারানসী আসেন ও তাঁর বসবাসের সব ব্যবস্থা করে কলকাতায় ফিরে যান। আজ আবার ছোকরাদের দলটিকে নিয়ে ফিরে এসেছেন।

মৃত্যুঞ্জয়, ছোকরাদের প্রতি --তোমরা মালপত্তর গুলোর ব্যবস্থা করে বাইরে এসো, আমি রিক্সার ব্যবস্থা করি গিয়ে। নতুন লোক দেখলে ওরা বেশি ভাড়া আদায় করবে।

অতঃপর মৃত্যুঞ্জয়ের ভাড়া করা ন’খানি রিকশো সকলকে নিয়ে গোধূলিয়া শ্রীনাথ ভবনের দরজায় এলো। তখন বেলা সাড়ে এগারো কি বারোটা। শ্রীজীবনকৃষ্ণ এই বাড়িতে এখন বাস করছেন। সৌমেনবাবু, সুধীনের বন্ধুলোক, এই বাড়ি ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।

দরজায় কোলাহল শুনে শ্রীজীবনকৃষ্ণ দোতলার ঘর থেকে দ্রুত নিচে নেমে আসছিলেন কিন্তু তার আগেই ছোকরাদের অনেকে এক রকম লাফিয়ে লাফিয়ে ওপরে উঠে এলো। তাদের মনের ভাব সচল ও জীবন্ত বিশ্বনাথকে দর্শন করে কে কত আগে ধন্য হবেন। কারণ হাওড়া ত্যাগের পূর্বে তিনি বলেছিলেন কাশীতে আমায় যে দেখবে তার বিশ্বনাথ দর্শন হবে।

শ্রীজীবনকৃষ্ণ—তোরা এসেছিস! তোরা এসেছিস! বলতে বলতে প্রেমাশ্রু বিসর্জন করতে লাগলেন। তিনি অর্ধবাহ্য অবস্থায় করজোড়ে দাঁড়িয়ে আছেন। বেত পাতার মতন পুলকে কাঁপছেন। ভাবাবেগ কিছু কমলে কম্পিত কন্ঠে বলছেন—কত কষ্ট হয়েছে, কত কষ্ট সব পেয়েছিস, বাবা! আহা! ঘুম নেই, খাওয়া-দাওয়া নেই।

সুধীন—না, তেমন আর কী কষ্ট হয়েছে! সবাইতো শুয়ে-বসে এসেছি। পুজোর সময় ভিড়ে একটু কষ্ট হবেই। আপনাকে দেখে এখন আমাদের একটুও আর কষ্ট নেই।

সকলে একে একে ভূমিষ্ঠ প্রণাম করলেন।

শ্রীজীবনকৃষ্ণ—ওরে, তাড়াতাড়ি চানটান সেরে নে। হোটেলে সব ব্যবস্থা করা আছে। চারটি খেয়ে শুয়ে পড়। খানিকটা ঘুম হয়ে গেলে সব ঠিক হয়ে যাবে।

কয়েকজন গঙ্গাস্নানের কথা পাড়লেন।

শ্রীজীবনকৃষ্ণ স্বয়ং গঙ্গা স্নান করতে খুব ভালোবাসেন। তবুও বললেন, ওরে কাল থেকে করবি খন। আজ সব ক্লান্ত, খাওয়া-দাওয়া সারতে অনেক দেরি হয়ে যাবে। তারপর বললেন, আচ্ছা তা যাবি যা। যার যা ইচ্ছে কর।

অনেকেই কোমরে গামছা বেঁধে দশাশ্বমেধ ঘাটের দিকে যাত্রা করলেন। স্নানান্তে মনোমোহন পাঁড়ের ধর্মশালা সংলগ্ন হোটেলে পরম তৃপ্তি সহকারে ভোজন পর্ব সমাপন করলেন। পাঁড়েজি ইতিমধ্যে শ্রীজীবনকৃষ্ণের কৃপাধন্য হয়েছেন।

আজ দুর্গা অষ্টমী, ২৫শে আশ্বিন, ১৩৬৩ বঙ্গাব্দ, বৃহস্পতিবার। স্বপ্নে সোনার অন্নপূর্ণা ‘মা মা বলে চিঠি দিয়েছে’—এই দৈববাণী শুনবার কিছুদিন পর ১৫ই আশ্বিন, সোমবার কৃষ্ণা একাদশীর দিন কাশীবাসের সংকল্প নিয়ে শ্রীজীবনকৃষ্ণ হাওড়া ত্যাগ করেন। সঙ্গীদের মধ্যে ছিলেন কেষ্ট মহারাজ, জিতেন (তিন নম্বর), মৃত্যুঞ্জয়, সৌমেনবাবু, রঘুনাথ ও সৌরেন। তারা ছাড়া কালী (২), গণেশ মান্না, অজিত (তবলচী), সন্তোষ গুছাইত ও জলধর টাকী কয়েকদিন পর এসে ধর্মশালায় ওঠেন। আজ তাঁরা হাওড়ায় ফিরে যাবেন। শ্রীজীবনকৃষ্ণ তাঁদের বিদায় দিচ্ছেন। ছোকরাদের তখন ঘুম ভেঙেছে। পাশের ঘর থেকে কথামৃত পাঠের শব্দ শুনে সকলে এসে বসলেন। শ্রীজীবনকৃষ্ণ একখানি তক্তপোশে কয়েকজনকে নিয়ে উপবিষ্ট। জানলার ধারে ইজিচেয়ারে বসে জিতেন (৩নং) কথামৃত পড়ছেন, মেঝেতে কম্বল শতরঞ্জির ওপর বাকি সবাই বসে আছেন।

হাওড়া যাওয়ার জন্য বাকি সকলে রওনা হয়ে গেলে শ্রীজীবনকৃষ্ণ ডান হাতটি মুখের কাছে এনে সহাস্যে দিলীপের প্রতি বললেন, কেমন হলো?

দিলীপ—ভালোই। ভাত, তরকারি, মাছ দুটো দিয়েছিল। ভাত-তরকারি রিপিট করেছিল। শুনলাম নাকি আবার স্পেশাল ও আছে।

শ্রীজীবনকৃষ্ণ—হ্যাঁ। স্পেশালে আট আনা বেশি চার্জ করে কিন্তু ভালো খাওয়ায়। আরো এক খানা মাছ বেশি দেয়, দু তিন রকমের বেশি দরকারি, একটা বড় মিষ্টি দেয়। দই মিষ্টি খেতে ইচ্ছে হলে জলযোগ থেকে হাতে করে নিয়ে যাবি।

এরপর আর প্রশ্ন নেই, উত্তর নেই, পাতার পর পাতা পড়া চলল। বিকেল যখন প্রায় সাড়ে পাঁচটা তখন তিনি পাঠককে বললেন, বন্ধ করে দে। এরা এসেছে। এদিক-ওদিক একটু বেড়াক।

কথামৃত মাথায় ঠেকিয়ে সকলে উঠে পড়লেন এবং বেড়াতে বের হলেন। তবে সুধীন, রঘুনাথ, দিলীপ ও জিতের শ্রীজীবনকৃষ্ণের সঙ্গে নানা আলাপ আলোচনা করতে লাগলেন। 

দিলীপ—আপনি চলে আসার পর থেকে আমাদের দিন যেন আর কাটতে চায় না। বিনয়, আনন্দ, নিতাই, আমি হয় গঙ্গার ঘাটে, না হয় হাওড়া ময়দানে বসে থাকতাম। আর দিন গুনলাম কবে ১০ তারিখে আসবে। আপনার কদমতলার কথা মনে পড়ে না?

শ্রীজীবনকৃষ্ণ, নারে! এই বলতে মনে পড়ল। বলে মৃদু মৃদু হাসতে লাগলেন।

ধীরে ধীরে চারদিক আবছা করে সন্ধে নামল। ঘরে বিদ্যুতের আলো ছিল। সন্ধ্যা প্রণাম হল। শ্রীজীবনকৃষ্ণের ইচ্ছে ঘরের কোলে ভেতরের দালানে সন্ধ্যাকালীন পাঠের ব্যবস্থা হোক। দালানটি বড়, সকলে হাত পা মেলে বসতে পারবে। ধ্যান জপ করার স্থান এর অভাব হবে না। তবে আলো নেই। রঘুনাথ অবিলম্বে বাইরে থেকে একটি ল্যাম্প জোগাড় করে আনলেন। সঙ্গে সঙ্গে দালান আলোয় ভেসে গেল। তারপর শতরঞ্জি পাতা হল শ্রীজীবনকৃষ্ণের পছন্দমতো। কোথাও একটু ফাঁক বা ভাঁজ নেই, মসৃণ ও সুবিন্যাস্ত। মাঝামাঝিস্থানে পাতা হলো কয়েক পাট করে একটি তোষক আর তার ওপরে একটি চাদর। স্থানটি বেদীর মত একটু উচু ও নরম হয়েছে। রঘুনাথ সকলের আড়ালে সযত্নে রচনা করলেন, ঠাকুরের যাতে বসতে কষ্ট না হয়।

শ্রীজীবনকৃষ্ণ দালানে এসেই উঁচু আসুন দেখে বুঝলেন এ কার কাজ। তারপর রঘুনাথের প্রতি বিরক্ত হয়ে বললেন, আরে এসব কী করেছিস! তুই আগে তোল ওসব! তোশক তোলা হলে শ্রীজীবনকৃষ্ণ সকলের মতো শুধু শতরঞ্জির উপর বসলেন। সাম্য বোধ তাঁর মজ্জাগত--সকল বিষয়েই। এইবার কথামৃত প্রণাম করে জিতেনের হাতে তুলে দিয়ে বললেন, পড়। 

পাঠ শুরু হলো—শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত—

কিছুক্ষণ পাঠের পর দিলীপের কয়েকটি প্রশ্ন মনে হলো। শ্রীজীবনকৃষ্ণ আধশোয়া অবস্থায় সে সবগুলোর উত্তর দিলেন। তারপর ধীরে ধীরে উঠে বসে বললেন, আরো প্রশ্ন কর, তোর যা খুশি।

প্রশ্নঃ- আত্মা সাক্ষাৎকার সম্বন্ধে কিছু বলুন।

শ্রীজীবনকৃষ্ণ তখন সচ্চিদানন্দ চিৎঘনকায় লাভ ও কুণ্ডলিনী জাগরণ থেকে একটি একটি করে পঞ্চকোষের সাধন কিরূপে হয়, প্রত্যেক কোষের বিশিষ্ট দর্শন ও অনুভূতি কী কী মোটামুটি বললেন। তারপর জ্ঞান জ্ঞেয় জ্ঞাতা যা ত্রিপুটি অবস্থায় এই ভগবান! এই ভগবান দর্শন!! এর কথা—বিশ্বরূপের কথা ও শেষে বীজে, বীজ স্বপ্নে, কিছু-না—বোধাতীত অবস্থায় পরিবর্তিত হওয়া পর্যন্ত—আগম সাধনের সকল রহস্যের ওপর অনর্গল আলোকপাত করলেন।

 এসব কথা আজই যে তিনি বললেন তা নয়। কিন্তু আজকের বাচনভঙ্গি, বিশ্লেষণ রীতি যেমন অনবদ্য, তেমনি হৃদয়গ্রাহী।

শেষে একটু থেমে বললেন, দেখ, আত্মা সাক্ষাৎকার একটা নির্দিষ্ট বয়সে হয়। ঠাকুরের কৃপায় জানলুম, চব্বিশ বছর থেকে পঁচিশ বছর বয়সের মধ্যেই হয়। ঠাকুরের হয় বাইশ তেইশে। আমার হয় ২৪ বছর ৮ মাস বয়সে। এই সময়ে ঠিক ঠিক সমাধি হয়। (সমাধিস্থ)।

প্রশ্নঃ- আচ্ছা ওই বয়স উত্তীর্ণ হয়ে গেলে কি আর আত্মা সাক্ষাৎকার হয় না?

শ্রীজীবনকৃষ্ণঃ- না। সে ঠিক ঠিক হয় না। তবে আ্যকিন টু (প্রায় কাছাকাছি) আত্মা সাক্ষাৎকার বলতে পারা যায়। যেমন তোদের এখানে ঠাকুর তিনটি রেফারেন্স রেখেছেন। ওই কেষ্টদা, নিমাই, আর শিবপুরের কিশোরী মুখুজ্জে বলে একজনের। তারপর বললেন, আত্মার সাক্ষাৎকার সাধন জগতে ফান্ডামেন্টাল (প্রধান)। যার পুরো সাধন হবে তার আত্মা সাক্ষাৎকার অবশ্যই হবে। আর পৃথিবীতে এক যুগে একজনেরই হয়। ঠাকুরের যুগে এক ঠাকুরেরই আত্মা সাক্ষাৎকার হয়। আর নজিরের জন্য মাষ্টারমশায়ের। যদি আর কারো হতো তাহলে অবশ্যই তাঁকে (অন্তরে) বারংবার দেখতুম।

প্রশ্নঃ- আচ্ছা। আত্মাসাক্ষাৎকার না-হলেও কি সমাধি অবস্থা লাভ করা যায়?

শ্রীজীবনকৃষ্ণঃ- কেন যাবে না। পুরীমহারাজের, স্বামীজীর—এঁদের তো (জড়) হয়েছিল। তবে কি জানিস—(স্বামীজীর বস্তুতে ব্রহ্মসাক্ষাৎকার প্রসঙ্গে বললেন) সে এক ঠাকুরের কৃপাতেই হয়েছিল। এখানে নগেনবাবুর তার চেয়েও উঁচু অবস্থা লাভ হয়েছিল, তার সহজিয়া সমাধি হত। (সমাধিস্থ)। কিন্তু কি জানিস, হওয়া শক্ত, তার চেয়ে আরো শক্ত বজায় রাখা। নগেনবাবুর আর সে জিনিস নেই।

তারপর গোড়ার কথায় ফিরে গিয়ে বললেন—

শ্রীজীবনকৃষ্ণঃ- আত্মা সাক্ষাৎকারই কিন্তু শেষ কথা নয়। সাধনের ইতি করা যায়না। কবে সেই ১২ বছর ৪ মাস থেকে শুরু হয়েছে। দেখ না আজ ৬৪ বছর বয়স পর্যন্ত তার ছাড়ান নেই। এখনো নতুন নতুন দর্শন অনুভূতি হয়। কিছুদিন আগেও মাথায় ব্রহ্মজ্ঞানের ফুট কেটেছে। এই ফুট কাটলেই বুঝতে পারি আবার অবস্থান্তর ঘটবে। এ তারই ইঙ্গিত। তাইতো ঠাকুর এই কাশীতে টেনে আনলেন।

তিনি বলে চললেন, আত্মা সাক্ষাৎকারের পর যদি আত্মা কৃপা করে সাধন করেন তবেই সাধন। তারপর বেদান্তের সাধন। বিদেহ সাধনও বলে। যেমন টাইম এন্ড স্পেস—এর (কাল ও স্থান) উচ্ছেদ সম্বন্ধে বহু বহু ফুট কাটতে থাকে। বিলেত যাবার আগে যে জাহাজটা করে যাব সেই জাহাজটি পর্যন্ত স্বপ্নে আগেভাগে দেখিয়ে দিয়েছিল। এছাড়া আরও বহুবিধ অনুভূতি হয়।

প্রশ্নঃ- কতদিন ধরে এই অবস্থা থাকে?

শ্রীজীবনকৃষ্ণঃ- তা ১২ বছর ৪ মাস। বিশ্বরূপদর্শন, বীজ, স্বপ্নবৎ--এই তিনটি অবস্থা একটু তাড়াতাড়ি হয়।

খানিকটা সময় একটু নিস্তব্ধতায় কাটলো। তিনি শিশি খুলে বাঁ হাতের চেটোয় নস্যি ঢাললেন। তারপর এক টান দিয়ে আবার বললেন।

শ্রীজীবনকৃষ্ণঃ- এরপর হলো চৈতন্যের অবতরণ। এই সময়ে বলে যায়। আমাকে ঋষি আকাশ পথে এসে বলে গেছিল চৈতন্যের অবতরণ হচ্ছে। তা আমি তখন কিছুই বুঝতে পারিনি। মনে করেছিলাম চৈতন্যদেব বুঝি কোথাও ফের অবতার হয়েছেন বা হবেন। পরে হতে তবে বুঝলাম। চৈতন্যের অবতরণ সম্বন্ধে বললেন, চৈতন্য সহস্রারে লাল দীপকের আলোর মতো দপ করে জ্বলে উঠে একেবার সহস্রার থেকে কন্ঠ, আরেকবার সহস্রার থেকে কটি দেশ পর্যন্ত অবতরণ করে। ঠাকুরের ছিল লাল চীনে দেশলাইয়ের আলো। তবে অবতরণের সময় লাল নয়, জ্যোতি। 

তারপর ভাবাবিষ্ট হয়ে বললেন, হ্যাঁরে! কত কী যে দেখতাম শুনতাম, তা কিছুই গ্রাহ্য করতাম না। কী হচ্ছে তো কী হচ্ছে! কী শুনছি, তো কী শুনছি! তখন বুঝতাম না কেন অমন ভাব আসতো, কেন কিছুই গ্রাহ্য করতাম না। এখন বুঝি যে, অমন ভাব ঠাকুর যদি আমায় না দিতেন তাহলে অহংকারে ফেটে মরে যেতুম। শালা, মানুষ রে, মানুষ। 

... এরপর হলো মানুষ রতন—অবতারত্বপ্রাপ্তি। ওই চৈতন্য কপালে শ্বেত চন্দনের ফোঁটা পরে (বামনমূর্তিতে) তিনি হাততালি দিয়ে বিভোর হয়ে হরিনাম করছেন, আর আমার এই দু’হাতের চেটো কর কর করছে। এই অবতরণ ব্যাপারটা দেহী দেখতে পায়। ঠাকুর এইজন্যই বলছেন—অবতার প্রত্যক্ষসিদ্ধ। দেখো সুধীন, নিগমের যা কিছু, আগাগোড়া জাগ্রতে হয়। তোমাদের এটা আগে বলিনি। এই প্রথম বলছি। তোমরা বোধহয় ভেবেছিলে এও বুঝি স্বপ্নে হয়?

সুধীন (সবিস্ময়ে)—আজ্ঞে হ্যাঁ। কোনদিন তো বলতে শুনিনি।

শ্রীজীবনকৃষ্ণ— (হাসতে হাসতে) হ্যাঁ, এই প্রথম বললুম, কীরকম মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল। অবতারত্বের পর আরো আছে—ভগবানত্ব।

সুধীনঃ- হ্যাঁ, ওকথা জানি, কদমতলায় বলেছিলেন—আমার অবতারত্ব চলে যাচ্ছে, জওহরলালের রূপ ধরে (স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী) ম্লানমুখে। আপনি তখন রাস্তার ধারে গ্যাসপোস্টের কাছে দাঁড়িয়ে। আর ভগবানত্ব আসছে।

শ্রীজীবনকৃষ্ণঃ- হ্যাঁ। এরপরেও না-জানি আরো কত কী আছে।

অনেকক্ষণ একটানা কথা বলবার পর এবার তিনি নীরব হলেন। আবার পাঠ শুরু হলো। বাইরে বেশ রাত্রি। মন্দিরে ও দেবালয়ে আরতি চলছে। দূরাগত শঙ্খ ঘণ্টা ও বাদ্যধ্বনিতে শীতের আকাশ-বাতাস মুখরিত। মন ঊর্ধ্বমুখী—ধ্যানের আমেজ আসছে। এমন সময় জুতোর মসমস ও মৃদু কথাবার্তা শোনা গেল। ছোকরারা ভ্রমণ শেষে ফিরেছেন। শ্রীজীবনকৃষ্ণ তাদের সস্নেহে নিকটে ডেকে বসিয়ে কে কোথায় গিয়েছেন কী দেখেছেন ইত্যাদি জিজ্ঞেস করতে লাগলেন। 

(সুধাকুম্ভ, দিলীপ কুমার ঘোষ লিখিত)



কোনো কারণবশত শ্রীজীবনকৃষ্ণ স্থির করলেন তিনি বেনারাস যাবেন, আর ফিরবেন না। বললেন, যারা বেনারসে তাঁকে দর্শন করবে তাদের সাক্ষাৎ শিব দর্শন হবে। আমরা ছোকরারা অকূলপাথারে পড়লাম। প্রথমতঃ, তাঁর সঙ্গসুখ হতে বঞ্চিত, দ্বিতীয়তঃ কোথায় অবসর সময় কাটাই। সকাল সন্ধ্যা রামকেষ্টপুরের গঙ্গার তীরে ও সৌরেনের ভগ্নিপতির বাসায় কথামৃত পাঠ ধ্যান ইত্যাদিতে কাল কাটাতে লাগলাম। কিন্তু শান্তি মিলছিল না। শ্রীজীবনকৃষ্ণ বিরহে কাতর। রামকেষ্টপুরের গঙ্গার জল হাতে নিয়ে মাথায় দিতাম এই ভেবে যে শ্রীজীবনকৃষ্ণ বেনারসের গঙ্গায় স্নান করেছেন, তাঁর শরীর ধৌত করে সেই গঙ্গাবারি বয়ে এসেছে, অতএব এই পূত জল আমরা মাথায় ঠেকাই।

 তাঁর যাত্রার দশদিন পর পূজা উপলক্ষে আমরা প্রায় ১৬/১৭ জন বেনারসে যাত্রা করলাম ও গোধূলিয়ার কাছে শ্রীনাথ ভবনে তিনি যেখানে অবস্থান করছিলেন সেখানে উপস্থিত হলাম। কয়েকদিন পর শ্রীযুক্ত সুধীনদার বন্ধু সৌমেনবাবু তিনি শ্রীনাথ ভবনে থাকার ব্যবস্থা করেছিলেন, বললেন বাড়ির মালিকের আত্মীয়-স্বজনদের আসার কথা আছে, অতএব শ্রীনাথ ভবন খালি করতে হবে। শ্রীজীবনকৃষ্ণ মহারাজদা ও রঘুনাথকে সঙ্গে নিয়ে কাশী যোগাশ্রমে চলে গেলেন ও দোতলায় একটি ছোট ঘরে রইলেন। আমরা ছোকরারা নিচের ছোট ঘরটিতে থাকলাম। আমরা চোদ্দজন ছিলাম ও বাকিরা শ্রীনাথ ভবনেই রয়ে গেলেন। সকাল-সন্ধ্যায় শ্রীজীবনকৃষ্ণের ঘরে কথামৃত পাঠ ও ধ্যানের সভা হতো। একদিন সকালে স্নানাদির পর শ্রীজীবনকৃষ্ণের সঙ্গে কাশীর পথে বেরিয়ে পড়লাম। আশ্চর্যের বিষয় শ্রীজীবনকৃষ্ণ ঘনঘন সমাধিস্থ হচ্ছিলেন। কিন্তু রাজপথের মাঝখান দিয়ে চলেছিলেন। মহা মুশকিল। একে তো গাড়িঘোড়ার ভিড়, তারপরে মেয়েদের যাতায়াত—আমরা কোনরকমে তাঁকে বেষ্টনী দিয়ে চলছিলাম কারন বেনারসের বড়বাজার এলাকা খুবই জনবহুল দিনের বেলায়। যাইহোক আমরা মণিকর্ণিকার শ্মশানে উপস্থিত হলাম। তখন শবদাহ চলছিল। শ্রীজীবনকৃষ্ণ দাঁড়িয়ে সমাধিস্থ হলেন, একেবারে স্থির, নিস্পন্দ। বেশ কিছু সময় পরে সমাধি ভঙ্গ হলো। এরপর কেদার ঘাটে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠলেন। পরে নানা পথ ঘুরে যোগাশ্রমে ফিরে এলেন।

 এবার বিদায়ের পালা। শ্রীজীবনকৃষ্ণকে একে একে আমরা প্রণাম করছি। বললাম, কবে আপনি কদমতলায় ফিরে যাবেন? বললেন—আমি কদমতলায় ফিরব না। সকলের চোখে জল। দিলীপ বললে—আপনি আমাদের আশীর্বাদ করুন। তিনি বললেন—ঠাকুর তোদের আশীর্বাদ করবেন। দিলীপ নাছোড়বান্দা। কিন্তু শ্রীজীবনকৃষ্ণের মুখে এক কথা। ঠাকুর তোদের আশীর্বাদ করবেন। তোরা সব ঠাকুরের ভক্ত। মহারাজদার চোখে জল। কিন্তু আশ্চর্য শ্রীজীবনকৃষ্ণের চোখে এক ফোঁটা জল নেই। সকলে ভারাক্রান্ত হৃদয়ে সজল চোখে নিচে নেমে গাড়িতে বসলাম। যে যার বাড়ি ফিরে যাবার পর হা-হুতাশ শুরু হলো। জীবন যেন দুর্বিষহ বোধ হতে লাগল। অবশেষে কালীপুজোর দিন শ্রীজীবনকৃষ্ণ কদমতলায় ফিরে এলেন। পুনরায় তাঁর ঘরে যাওয়া শুরু হল।

(কত কথা পড়ে মনে—শ্রীযুক্ত আনন্দমোহন ঘোষ)

 

১৯৫৬ সালের পয়লা অক্টোবর শ্রীজীবনকৃষ্ণ কাশীধামে যান। সেদিন ওঁর সঙ্গে যান মহারাজদা, জিতেনদা (তিন নম্বর), রঘুদা, সৌরেন, ও সুধীনদার বন্ধু সৌমেনদা, যিনি কাশীর ‘শ্রীনাথ ভবন’ ওঁর থাকার জন্য ঠিক করেন। এরপর সপ্তমীর দিন সুধীনদা ও আরো অনেকে গিয়েছিলেন। ওই দিন রাত্রে দুন এক্সপ্রেসে, আমি, গোপালদা, অরুন, রামকৃষ্ণদা ও মুরারিদা রওনা হই। আমরা বেনারসে শ্রীনাথ ভবনে ওঁর কাছে যখন পৌঁছলাম তখন সময় সকাল প্রায় সাড়ে দশটা। সেদিন ছিল দূর্গাষ্টমী তিথি। সেদিনই কালীবাবু, গণেশদা, অজিতদা সন্তোষদা,  জলধরদা প্রমুখ কয়েকজন কাশীধাম ত্যাগ করেন কলকাতা ফেরার জন্য।  রঞ্জিত বেনারসে যায় ওদের বাড়ির দূর্গাপূজার বিজয়াদশমীর পরদিন।

শ্রীনাথ ভবনের দোতলায় তিনখানি ঘরের মধ্যে সিঁড়ি দিয়ে উঠে প্রথম ঘরখানিতে শ্রীজীবনকৃষ্ণ থাকতেন। আমরা যাওয়ার পর স্থান সংকুলান না হওয়ায় জিতেনদা ও মহারাজদা ওঁর ঘরে রাত্রে শুতেন।

শ্রীজীবনকৃষ্ণ সংসর্গে আমাদের বেশ আনন্দেই দিন কাটতো। ভোর চারটের সময় উনি আমাদের কখনও কখনও ডেকে ঘুম থেকে তুলতেন, আবার কখনো আমাদের মধ্যে অনেকে আগেই ঘুম থেকে উঠে পড়ত। ভেতর দিকের দালানে রায়দা একা শুয়ে থাকতেন, ভোর থেকেই পাঠের ব্যবস্থা ওই দালানেই করা হতো। প্রথমে শ্রীরামকৃষ্ণের ভজন গান ও পরে কথামৃত পাঠ হত। পাঠক ছাড়া আর সকলেই ধ্যান করতেন। প্রায় ছ’টার সময় পাঠ ভঙ্গ হতো। তারপর প্রাতঃকৃত্য আদি সমাপন ও বাইরে বেরিয়ে যার যেমন ইচ্ছা চা দুধ জল খাবার খেতেন। কেবল ওঁর ও মহারাজদার জন্য চা-জলখাবার আনা হতো। কখনো কখনো উনিও আমাদের সঙ্গে বের হতেন এবং পথেই চা-পান শেষ করে বেড়াতে বের হতেন। তারপর বাসায় ফিরে ন'টা থেকে পুনরায় পাঠ শুরু হতো এবং বেলা এগারোটার সময় পাঠ বন্ধ হলে স্নানাদি সেরে দুপুরের আহারের জন্য আমরা সকলে যেতুম মনোমোহন পাঁড়ের ধর্মশালার সংলগ্ন হোটেলে। শ্রীজীবনকৃষ্ণও আমাদের সঙ্গে ওখানেই খেতেন, তবে তারা ওঁর জন্য একটি পৃথক ঘরের ব্যবস্থা করেছিল। অপরাহ্য আড়াইটা থেকে পাঠ শুরু হতো। বিকেল পাঁচটা থেকে ছ’টা বা সাড়ে ছ’টা পর্যন্ত বিরতি। সে সময় আমরা বাইরে বেড়াতে যেতাম ও চা জলখাবার ইত্যাদি খেতুম। আবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা থেকে রাত নটা পর্যন্ত পাঠ ধ্যান চলতো।

সন্ধ্যায় পাঠের আসরে স্থানীয় দধি ডাক্তার, মনোমোহন পাঁড়ে, হোটেলের মালিকদের একজন, রায়দার দাদা কবিরাজমশাই এবং আরো কয়েকজন আসতেন। রাত্রে পুনরায় আমরা সকলে হোটেলে খেতে যেতাম, অবশ্য শ্রীজীবনকৃষ্ণ রাত্রে আহার করতেন না। 

বিজয়াদশমীতে ওনার এবং আমাদের সকলের পয়সাতেই মিষ্টি আনা হয়েছিল। ঐদিন ওঁকে প্রণাম করে আমরা নিজেদের মধ্যে কোলাকুলি করি। মিষ্টির একটা ঠোঙ্গা দেওয়া হয়েছিল ওঁর হাতে। ওইখানেই প্রথম দেখলাম ওঁর কুণ্ডলিনী কীরকম প্রথম গ্রাসটি গ্রহণ করে। পূর্বে কালী ব্যানার্জি লেনে ও কদমতলায় ওঁকে শুধু জল খাবার সময় দেখতুম, সে সময় ঠিক বোঝা যেত না। সেদিন দেখলাম ওঁর বাঁহাতে খাবারের ঠোঙ্গা মুখ থেকে প্রায় ছ’ আট আঙুল নীচে। উনি সোজা হয়ে বসেছিলেন। সবেমাত্র ডান হাতটি দিয়ে কিছু মিষ্টি তুলেছেন, ওঁর মাথাটি সাপুড়েদের সাপের ছোবল মারার মতো ঘাড় থেকে ভেঙে ডান হাতে খাবারের ওপরে মুখটি পড়লো ও সঙ্গে সঙ্গে মাথাটি সোজা হয়ে গেল। কেবলমাত্র চায়ে চুমুক দেওয়ার মত একটা আওয়াজ আমার কানে এলো। আমি অবাক হয়ে ওঁর দিকে তাকিয়ে আছি। উনি আমার দিকে চেয়ে বললেন— “কীরে, খাবি তো”।

দ্বাদশীর দিন সংবাদ পাওয়া গেল, বাড়ির মালিকদের লোকজন আসবেন শ্রীনাথ ভবনে। আমাদের ওপরতলা ছেড়ে দিতে হবে বলে, কাছেই কৃষ্ণানন্দজীর যোগাঁশ্রমে দু’খানি ঘর ভাড়া করা হলো। ওপরের ঘরখানি ওঁর ও মহারাজদার জন্য। আর নীচের ঘরখানি আমাদের জন্য ঠিক হলো। যোগাশ্রমের বাড়িতে অন্নপূর্ণার মূর্তিপূজা হয়। ওখানে আমাদের স্থান সংকুলান না হওয়ায় সুধীনদা, অমলদা, কলকাতার কবিরাজমশাই প্রভৃতি শ্রীনাথ-ভবনের নীচের যে ঘরটিতে ছিলেন সে ঘরেই থেকে যান। আর আমি, গোপালদা, রঘুদা ও পরে আগত ললিতবাবু এবাড়িরই নীচের সদর ঘরে আশ্রয় নিই। যেদিন উনি শ্রীনাথ-ভবন ত্যাগ করে যোগাশ্রমে আসবেন, সেদিন সকালে  বিছানা ও মালপত্র নামিয়ে নীচের সদর ঘরে স্তূপাকার করা হয়েছে। কয়েকজন টাঙ্গা ডাকতে গেছে। আমি ওঁকে নিয়ে নীচে নামছি এমন সময় বিনয় এসে ওঁকে নিয়ে গিয়ে সদরঘরে বসালে ও বাইরে চলে গেল। উনি বিছানায় হেলান দিয়ে আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন—সুধীনের ঘর কোনটা? আমি বললুম—আমরা তো সুধীনদার ঘর পেরিয়ে এখানে এলুম। উনি বললেন—তবে আমাকে এখানে বসালো কেন? আমি বললাম—চলুন সুধীনদার ঘরে যাই। উনি বললেন—না। আর নাড়ানাড়ির দরকার নেই। ঠাকুর প্রথমে দক্ষিণেশ্বরের দক্ষিণ দিকের নহবতখানার কাছে থাকতেন। একবার মথুরবাবু কলি ফেরাবার জন্য ঠাকুরকে এখনকার যে ঘর সেই ঘরে স্থানান্তরিত করেন। তারপর পূর্বের ঘরটা কলি ফেরানোর পর মথুরবাবু ঠাকুরকে ওই ঘরে ফিরে আসতে বলেন। তখন ঠাকুর বলেছিলেন, “মথুর, আমাকে বিড়ালছানার মতো সাত নাড়ানাড়ি কোরো না। আমি এখানেই থাকব”। মথুরবাবু ‘তাই হবে বাবা’ বলে চুপ করে যান। আমি শুনে ভাবলুম ওঁদের নড়াচড়ায় নিশ্চয়ই শরীরে কোন কষ্ট হয়।

যোগাশ্রমের বাড়িতে পূর্বের মতোই দিন কাটতে লাগল। অন্নপূর্ণা মূর্তি দেখে উনি ভাবস্থ হয়ে যান। উনি বেনারাস রওনা হওয়ার কিছুদিন পূর্বে দৈববাণী শোনেন— “সোনার অন্নপূর্ণা মা মা বলে চিঠি দিয়েছে”।

কোজাগরী লক্ষ্মীপূজার দিন আমরা কয়েকজন বাড়ি ফেরার জন্য ওঁর কাছ থেকে বিদায় নিই। বিদায়ের প্রাক্কালে আমাদের সকলের চোখে তখন বিচ্ছেদ ব্যথার অশ্রুধারা বইছে। দিলীপ ওঁকে বলে – “আমাদের আশীর্বাদ করুন”। উনি ওর অশ্রুসিক্ত নয়নের ওপর বিনম্র দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললেন – “আমাকে আশীর্বাদ করতে নেই বাবা”।

উনি কাশীতে স্থায়ীভাবে থাকবেন স্থির করায় দিলীপ প্রশ্ন করলে, তাহলে আমরা কি রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াবো? উনি বললেন, সে কিরে, তোরা কেন রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াবি! রাস্তার লোক তোদের কাছে আসবে।

শ্রীজীবনকৃষ্ণ বলতেন, “বাবা, যখনই আমার কোনো বড় অনুভূতি হয়েছে, তখনই আমাকে নিঃসঙ্গ করেছে বা নির্জনে নিয়ে গেছে।  ১৯৫৬ সালে বেনারসে থাকাটা ঠিক নিঃসঙ্গ জীবন ছিল না, কারণ আমরা বা আমাদের মধ্যে আরো অনেকে ওঁর সঙ্গে ছিলুম। বেনারসে থাকাকালীন উনি মাঝে মাঝে বলতেন, “তোরা সব বাড়ি ফিরে গেলে আমি আর কেষ্টদা দুজনে আরো আপ-এ চলে যাব”। যাই হোক, উনি বেনারাস ত্যাগ করে অন্য কোথাও যাননি। ওই বছরেই নভেম্বরে কালীপুজোর দিন কিঞ্চিৎ শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে আবার ফিরে আসেন কদমতলা কেদার দেউটি লেনের ঘরটিতে। 

(শ্রীযুক্ত অনাথ নাথ মণ্ডল লিখিত শ্রীজীবনকৃষ্ণ সংশ্রয় থেকে সংগৃহীত)

       ৩০শে সেপ্টেম্বর, ১৯৫৬

       কাশী যাবার আগের দিন। শ্রীজীবনকৃষ্ণের কাছে যেতে আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন—হ্যাঁ রে বিমল, তোদের কবে দেখতে পাবো? আমার একটু চিন্তা ছিল যে কাশীতে ওঁর কাছে যেতে পারব কিনা। উনি নিজেই সন্দেহ ভঞ্জন করলেন। কৃপা করে উনি যাবার আদেশ দিলেন।

       ১লা অক্টোবর, ১৯৫৬

       অমৃতসর মেলে শ্রীজীবনকৃষ্ণ কাশী রওনা হলেন। সৌমেনবাবু, কেষ্টদা, মৃত্যুঞ্জয় রায়, জিতেন (৩ নং), সৌরেন ভট্টাচার্য ওঁর সঙ্গে কাশী রওনা হলেন।

       ১২ই অক্টোবর ১৯৫৬

       আমি, আমার বাবা ও পরিবারবর্গকে নিয়ে ৮/১০/১৯৫৬ তারিখে কাশী গেলাম। ১৮/১০/১৯৫৬ পর্যন্ত কাশীতে অন্য একটা বাড়িতে ছিলাম। আমরা কাশী যাবার দু’দিন পরেই শ্রীজীবনকৃষ্ণের কাছে সুধীনবাবু, অমল, অনাথ, গোপাল ও আরও কয়েকজন ছোকরা ভক্ত গেলেন। সকলকে কাছে পেয়ে ওঁর এত আনন্দ হয়েছিল যে আমাকে বললেন— দেখ বিমল, ঠাকুর আমাকে পাষাণ করে দিয়েছেন। কিন্তু কী আশ্চর্য! আজ এদের সকলকে কাছে পেয়ে আমার চোখ দিয়ে জল পড়ছে। ওরে, এরা আজ পাষাণকেও গলিয়ে দিয়েছে!

       (সংগৃহীতঃ মহাপুরুষ সঙ্গ, বিমলাকান্ত ঘোষ রচিত)

v তাঁর কাশীতে যাবার ট্রেনের টিকিট ও রিজার্ভেশানের দায়িত্ব নিয়েছিলেন শ্রীরামপুরনিবাসী শ্রীযুক্ত নীরদ বরণ রায়।

১৪ই অক্টোবর, ১৯৫৬ তারিখে শ্রীযুক্ত বিমল সরকার লিখিত এই চিঠিটি কাশীতে পৌছয়। শ্রীজীবনকৃষ্ণ তখন কাশীতে অবস্থান করছেন। চিঠিটি উদ্ধৃত করা হল।

জয় জীবনকৃষ্ণ

হে আমার সচ্চিদানন্দগুরু, হে আমার ভগবান! আজ এই বিজয়ার দিন আপনাকে শতকোটি প্রণাম নিবেদন করি। হয়ত এই বাহ্যাড়ম্বরের কোনো প্রয়োজন ছিল না। আমার মনে হয় আপনি চান না যে ভগবানের পূজা কেবল কোনো বিশেষ দিন ও সময়ের জন্য বিধিবদ্ধ থাকে। সেইজন্য এই বাহ্য শিষ্টাচার দেখাইতে আমি ইতস্তত করিতেছিলাম। যাহা হউক, সংস্কারবশত এই দিনের এই লোকাচার ত্যাগ করিতে পারিলাম না, ক্ষমা করিবেন। আমরা জানি, এই বিশেষ দিনে কেন, সকল সময়েই আমাদের অন্তরে সকল সময় বিরাজ করিতেছেন তবুও চাক্ষুষ দর্শন হইতে বঞ্চিত হইয়া আমি অত্যন্ত কাতর হইয়াছি।

   আমি অতি মূঢ়মতি, আপনার চরণে দিবার মতো হয়ত আমার সেরূপ ভক্তি নাই, তবুও আপনার পদতলে নিবেদন যে, আপনি নিজগুণে আমায় দয়া করুন এবং শীঘ্রই যেন আপনার সঙ্গ পুনরায় লাভ করি। আপনি একসময় বলেছিলেন, যতক্ষণ ঠাকুর ঠাকুর করা যায় ততক্ষণই যোগ, আর বাকি সময় বিয়োগ। আমার এখন মনে হয় আপনার সঙ্গ যতক্ষণ লাভ হয় ততক্ষণই যোগ। আর কি বলিব, আপনি আমার বিষয় সবই জানেন। আশীর্বাদ করুন মনুষ্যজন্মের উদ্দেশ্য যেন সফল হয়। ইতি

সেবক—বিমল কুমার সরকার

শ্রীঅরুণকান্তি ঘোষের বয়ানে—

 (শ্রীবিমল কুমার সরকারকে) কাশীতে আমরা আছি। আপনার একটা চিঠি এসেছে। চিঠিটা পড়ে শোনালাম তাঁকে। আপনি লিখেছিলেন, ‘এই বুঝেছি যতক্ষণ আপনার কাছে ততক্ষণই যোগ, দূরে থাকলেই বিয়োগ’। শুনেই ঠাকুর হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলেন। আমরা তো অবাক। তাঁকে কখনও এভাবে কাঁদতে দেখিনি। চণ্ডীদাসের পদাবলী পড়ে প্রেমাশ্রু দেখেছি, তবে এরকম কান্না নয়। কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘বিমল, বিমল, ওরে ওর তুলনা হয় না’।    

 

[শ্রীজীবনকৃষ্ণ কাশীতে যান ১৯৫৬ সালের শারদীয়া পূজার ঠিক আগে। সে বছর মার্চ মাসে তিনি কয়েকজন অকৃতদার যুবককে নিয়ে আলপুকুরে, তাঁর মাসিমার দেশের বাড়িতে নির্জনে বাস করেছিলেন। বিবাহিত লোকেদের সেখানে যাওয়া নিষেধ ছিল। সেই বছরেই কাশী যাবার সময় তিনি এই বাধাটি দূর করলেন। সংসারী মানুষের যাওয়ার অনুমতি দিয়ে তিনি ব্যষ্টির যে কঠোর নিয়ম, কামিনীকাঞ্চন ত্যাগ, তাকে নস্যাৎ করলেন। সেই সময় সঙ্গকারীরা এটি এভাবে উপলব্ধি না করলেও আজ আমরা যখন পিছন ফিরে চাই দেখতে পাই তিনি কেমন করে তাঁর দুয়ার জগতের জন্য ধীরে ধীরে উন্মুক্ত করছিলেন। কাশী থেকে ফেরার তাঁর ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু ফিরে এলেন। তবে তাঁর অবস্থান্তরের পরিচয় নিজ অন্তরে পেয়েছিলেন তিনি। ৫৬ সালের কালীপুজোর দিন ফিরে এলেন। ৫৭ সালের শারদীয়া পর্যন্ত তাঁর নতুন অবস্থা প্রকাশ পেল না। কিন্তু তারপরেই ঘরের দরজা পুনরায় বন্ধ হল। অসীম বিশ্বাস নামে কিশোরকে পরপর দেখেছিলেন ঠোঁটে আঙুল দিয়ে তাঁকে চুপ করতে বলছে। তিনি এর অর্থ করেছিলেন, তিনি চুপ করলে এ জিনিস অসীমে ছড়াবে। ৫৮ সালে আরও একবার আলপুকুর ভ্রমণের পর তাঁর নতুন স্বরূপ উন্মোচন হল। তিনি সমষ্টির গণ্ডি কাটলেন। কোনো বাধাই যে ব্রহ্মত্বকে আটকাতে পারে না, সেই কথা বলতে শুরু করলেন। তাঁর বিশ্বব্যাপিত্বের সাধনের সূত্রপাত হল। সেদিক দিয়ে দেখতে গেলে কাশীযাত্রা সমষ্টির সাধনের শেষ পর্যায়। এরপরেই তাঁর বিশ্বব্যাপিত্বের সূত্রপাত।]

Wednesday, May 25, 2022

জীবন উপনিষদ

 

জীবন-উপনিষদ
 
শ্রীজীবনকৃষ্ণ ১৯৫৯ সালের শেষ থেকে বিশেষভাবে উপনিষদ নিয়ে আলোচনা শুরু করেন। তাঁর আত্মিক বিবর্তনে উপনিষদের সূত্র কতটা ফলিত সেটা অনুধাবনের উদ্দেশ্য তো ছিলই, এছাড়াও বিশ্বব্যপিত্বের যে অবকাশ সেসময় তৈরি হয়েছিল সেখানে সঙ্গকারী মানুষজন, যারা তাঁর এই সাধনের অঙ্গ, তাঁদের মধ্যেও কীভাবে ক্রিয়া হয়েছিল, সে সম্পর্কেও জানা তাঁর উদ্দেশ্য ছিল। এক অদ্ভুত দৈব তাঁর ঘরে এনে হাজির করেছিল এইসব বই ও কিছু শাস্ত্রজ্ঞ মানুষকে। সেই সব আলোচনা থেকে আহরণ করা হল তাঁর চর্চিত কিছু সূত্র ও আলোচনা। পুরী থাকাকালে তিনি শ্রীযুক্ত আনন্দমোহন ঘোষকে বলেছিলেন, তোদের উপনিষদ পর্যন্ত দিয়ে গেলাম, এর ওপরে তোদের ধারণা হবে না।
 
শান্তিপাঠ
ওঁ পূর্ণমদঃ পূর্ণমিদং পূর্ণাৎ পূর্ণমুদচ্যতে।
পূর্ণস্য পূর্ণমাদায় পূর্ণমেবাবশিষ্যতে।।
ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ ।। ঈশোপনিষদ
 
অর্থঃ ওঁ উহা (অর্থাৎ পরব্রহ্ম) পূর্ণ, ইহাও (অর্থাৎ নামরুপস্থ ব্রহ্মও) পূর্ণ। পূর্ণ হইতে পূর্ণ উদ্গত হন, পূর্ণের (অর্থাৎ পরব্রহ্মই) মাত্র অবশিষ্ট থাকেন। ওঁ ত্রিবিধ বিঘ্নের শান্তি হউক।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—আত্মা, যে আত্মা সহস্রারে ত্রিপুটি অবস্থায় ব্রহ্মপুর হইতে আগত অজানা লোক দেখিয়ে দেয় আর বলে দেয়, সেই আত্মা—চিরকালই পূর্ণ। সৌকালীন গোত্রের সৃষ্টিকর্তা সৌকালীন ঋষির দেহেতে যে আত্মা—আজ হাজার হাজার বছর অতীত হয়ে গেছে—তবুও সেই একই আত্মা আমার দেহেতে। ওজন কম বেশি হবে না।                                                                                সেই পূর্ণ থেকে পূর্ণই এসেছে। আর চিরকাল আসবে। সেই একই আত্মা বিভিন্ন নাম রূপ ধারণ করে আমার বৃদ্ধ বৃদ্ধ বৃদ্ধ প্রপিতামহের দেহেতে ছিল আর আমার দেহেতে সেই আত্মার সাক্ষাৎকার হইয়াছে।                                   আত্মা এক। “স একঃ” আর আত্মার অমরত্মের প্রমাণ এইতেই প্রতিষ্ঠিত।
…নিজের সহস্রারে যে আত্মার সাক্ষাৎকার হয়—সে ব্যষ্টির আত্মা। ইন্ডিভিজুয়াল সেলফ। “পরমজ্যোতিঃ উপসম্পদ্যঃ”। এই ব্যষ্টির আত্মা তোমার সাক্ষাৎকার হয়েছে—তার প্রমাণ দেবে—”স্বেন রূপেন অভিনিষ্পদ্যতে”—অসংখ্য নরনারী দেহের ভিতর দেখবে আর বল্বে,--এই হল ইউনিভার্সাল সেলফ।
ধর্ম ও অনুভূতি তৃতীয় ভাগ 
জীবনবাণী

 

  • বেদান্ত হচ্ছে—আমি কী—আর এই জগত, এরা কে? জগত মানে মনুষ্যজাতি—এইটেই জানা। ওরে এই একত্ব। অর্থাৎ এইটিই জানা যে, বাইরে বহু দেখছি বটে, কিন্তু ভেতরে তোরা ও আমি এক। আত্মিক জগতে এইটি জানাই বেদান্ত।  
  • দেখ একটা কথা বলি শোন। তোদের এই বেদ—এটা কোনো গ্রন্থ নয়। শাস্ত্র নয় বাবা। এটা হচ্ছে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মানুষের মধ্য দিয়ে যে সত্য আবিষ্কার হয়েছে, সেই আবিষ্কৃত সত্যসমূহের সঞ্চিত ভাণ্ডার।
  • দেখ, এতদিন মানুষ কীভাবে জীবনযাপন করে এসেছে বল দেখি? অর্থাৎ উইদাউট গড মানুষ তার জীবন যাপন করে এসেছে। এ জিনিস কখনও ফোটেনি। মানুষ কখনও ভগবান হয়নি। এই প্রথম মানুষ ভগবান হয়েছে। তবে তোরা বলবি, ওই যে ঋষি বলছে “অহম ব্রহ্মাস্মি”। কিন্তু তার প্রমাণ কই? তারা এর প্রমাণ দিতে পারেনি।
  • গড ইজ নো হোইয়ার এলস একসেপ্টিং ইন ইউ। তুইই সব। দেখ, আমি এই মানুষকে সত্য বলছি, আর জগতে যা কিছু সব মিথ্যে। মানুষই সব। আর কিছু নেই। এই যে কথা বললাম নট ইন সেন্স অফ বেদান্ত, বাট হোয়াট ইউ পারসু। ( এর অর্থ বেদান্তে নয়, এর অর্থ তোদের যা হচ্ছে তাইতে।)
  • আরণ্যক মানে হচ্ছে পশুর মাথা। দেখ, আমি একথা নিজে বলছি না, তোদের এই উপনিষদের কথা বলছি। উপনিষদে কী কথা বলেছে বল না ক্ষিতীশ? যারা নিজেকে পুজো না করে অপরকে পুজো করে তারা যজ্ঞের বলির পশু। অর্থাৎ তারা পশু।
  • আমি ঈশ্বর বলতে কিছু ধরব না। ‘সঃ একঃ’, ‘সদা জনানাং হৃদয়ে সন্নিবিষ্টঃ' এই একত্বই ঈশ্বরত্ব। আর কিছু নয়। ওরা ঈশ্বরলাভ বলে গেছে। কিন্তু ঈশ্বরলাভ বলে গেছে। কিন্তু ঈশ্বরলাভ কী তা বলতে পারেনি।
  • কেন ওরা পদ্ম বলছে? আমি দেখেছিলাম চক্র, আর তা ফিলড উইথ গড’স লাইট। আমি তো পদ্ম দেখিনি!                                                ধীরেন—ওরা শাস্ত্রে যা আছে তাইই বলে গেছে, অনুভূতি হয়নি। এই দেখুন না, ওরা বলছে, ‘আত্মা বা অরে দ্রষ্টব্যঃ শ্রোতব্যঃ নিদিধ্যাসিতব্যঃ’ ইত্যাদি। কিন্তু আত্মাকে যে দেখা যায় একথা বলেনি।                         শ্রীজীবনকৃষ্ণ—আচ্ছা, এই যে ব্রহ্মসূত্র, এ অনুভূতিমুলক না বিচারাত্মক?                                                                ধীরেন—না, ও অনুভূতিমুলক নয়, সব বিচারাত্মক।                   শ্রীজীবনকৃষ্ণ (ধীরেনকে)—দেখো বাবা, এই যে অদ্বৈতবাদ দেখছ, এ তোমাদের হিন্দুধর্ম নয়, একেবারেই নয়। তোমরা যে ভেবেছ হিন্দুরা বেদ নেয়, অতএব এ হিন্দুধর্ম, মোটেই নয়। এ হচ্ছে জগতের সকলের। এখানে জপ নেই, তপ নেই, তন্ত্র নেই, মন্ত্র নেই, পুজো নেই, ভগবান নেই। আছে কী? মানুষের দেহ। দ্য লাইফ পাওয়ার—জীবনীশক্তির বিকাশ। শক্তি বলব না বাবা—লাইফ পাওয়ার। শক্তি বললেই তোমরা একটা কালী খাড়া করবে, তারপর খাঁড়া আসবে। তারপর কচি কচি মেষ শিশু।
  • কথামৃতের ব্রহ্ম সত্য জগত মিথ্যা—এই কথায় বলছেন, আচ্ছা ঋষিদের ধর্ম কী বাবা? ঋষি বলছে—‘অহং ব্রহ্মাস্মি’—আমি সেই ব্রহ্ম। নাও এদজাস্ট। ঠাকুর আর ঋষিবাক্য। ওরে আমি সত্য হলে এই জগত সত্য হয়ে যাচ্ছে।
  • অতীত যুগে আমরা পাই ঋষিতে—‘আত্মা অরে দ্রষ্টব্য…’। কিন্তু দেখ, তার কত হাজার হাজার বছর পরে ঠাকুর বলছেন—‘মাইরি বলছি ভগবানকে দেখা যায়’। অতীতে ঋষিদের কল্পনা সার্থক হয়ে ঠাকুরের দেহে ফুটে উঠল।
  • ঋষিদের নিষ্কামী মন ছিল। সেই জন্যই তারা একে পরাবিদ্যা বলে গেছে, আর প্রকৃত নিষ্কামী মন না হলে এ জিনিস হয় না। দ্বৈতবাদে যা কিছু বলা হবে সব ভুল বলা হবে।
  • অদ্বৈতজ্ঞান কী জানিস? প্রথমে আত্মা সাক্ষাৎকার, তারপর এই আত্মার ভেতর বিশ্বরূপ, তারপর সেই বিরাট বিশ্ব বীজে পরিণত হল, বীজ স্বপ্ন হল, তারপর লয় হয়ে গেল—এই হচ্ছে বেদান্তের সাধন।
  • উপনিষদ কী বলেছে? পরমাত্মা মানে কী করেছে? ইন দ্য বিগিনিং দেয়ার ওয়াজ সেলফ আলোন ইন দ্য শেপ অফ আ পারসন। (আদিতে মানুষের রূপে আত্মাই ছিলেন)। তোরা যে চিন্ময় রূপ দেখিস সেটা কি শুধু আত্মিক?   ধীরেন—আত্মিক তো বটেই, কেন না আমরা ভেতরে আগে দেখেছি, তারপর বাইরে মিলিয়ে নিয়েছি।                                             শ্রীজীবনকৃষ্ণ—কী রকম? যদি দেহ না থাকত তবে রূপ কোথা থেকে আসত রে? দেহ আছে বলেই রূপ দেখা যাচ্ছে। তাহলে কী হচ্ছে? দেহটাও বটে।
  • আমায় যদি কেউ চার্জ করে, আমি তাকে দেখিয়ে দেব—যে দেখ, আমি কিছু না, এই জগত এসে আমায় বলছে। এই জগতের লোকগুলি আমায় দেখে বলছে।
  • কাল রাত্রে শোবার সময় মনে ফুট কাটছিল যে, এই দ্বৈতবাদ থাকবে না। জগত থেকে দ্বৈতবাদ নাশ হয়ে যাবে। বলাইয়ের দোকানের এক কর্মচারী, সে আজ সকালবেলা এসে, আমায় জিজ্ঞাসা করছে—আচ্ছা ‘বেম্মোস্মি’ মানে কী? আমি তো শুনেই অবাক! জিজ্ঞাসা করি—কী হয়েছে রে? সে বলল—কাল রাত্রে স্বপ্ন দেখছি—খই ছড়াচ্ছে, আর বলছে ‘বেম্ম অস্মি’। কী আশ্চর্য বল দেখি! কী আর হবে পড়ে টড়ে। বন্ধ করে দে। আর কিছু করবার দরকার নেই। ওরে দেখ, আমায় জানিয়ে দিচ্ছে—ওই যে মনে ফুট কেতেছিল—সাধারণ মানুষের ধারণা করবার শক্তি হয়েছে—এ জিনিস আমায় জানিয়ে দিচ্ছে।    
 
উপনিষদের শ্লোকগুলির আলোচনাঃ-    
 
বেদাহমেতং পুরুষং মহান্তম, আদিত্যবর্ণং তমসঃ পরস্তাৎ।
তদেব বিদিত্বাহতি মৃত্যুমেতি, নান্যঃ পন্থা বিদ্যতে অয়নায়।। (৩/৮ শ্বেতাশ্বেতর)
 
(অন্বয়ঃ স্বপ্রকাশ ও অজ্ঞানাতীত এই সর্বব্যাপী পুরুষকে আমি জানি। তাঁহাকে জানিলেই (শোক) মৃত্যুকে অতিক্রম করা হয়। কারণ, পরমার্থ লাভের আর কোনো উপায় নেই।)
 
v  শ্রীজীবনকৃষ্ণ—সে আত্মা নয়। আত্মিক রূপ। মূলাধার থেকে কুণ্ডলিনী সড়াৎ করে ভ্রূ’র মধ্যে আসে আর ভ্রূ-মধ্য ভেদ করে সহস্রারে যায় এবং দপ করে জ্বলে ওঠে ওই আত্মিক রূপ। সহস্রার থেকে কণ্ঠদেশ পর্যন্ত। তবে সেটা আদিত্যবর্ণই বটে। এটা ঠিক।
v  শ্রীজীবনকৃষ্ণ—ভগবান দর্শনের কথা গীতাকার বলতে পারেনি, আর যা বলেছে সেটা উপনিষদ থেকে নিয়েছে। “বেদাহমেতং…”। আমি দেখছি মূলাধার থেকে একটা জ্যোতি সড়াৎ করে উঠেই কণ্ঠ পর্যন্ত দপ করে জ্বলে উঠল। এ আমার বলতে যতটুকু সময় লাগল তার সিকির সিকিও সময় লাগেনি। পলকের মধ্যে হয়ে যায়।
v  শ্রীজীবনকৃষ্ণ—আমার যে এই অনুভূতি হয়েছিল আমি জানতুম। আমি সেই কথা পয়েন্ট আউট করেছি থার্ড পার্টে (ধর্ম ও অনুভূতি)। আর বলছি, এ ভগবান বা আত্মা বা ব্রহ্ম সাক্ষাৎকার নয়। এ হল যোগজ মূর্তি। মূলাধার থেকে সড়াৎ করে কুণ্ডলিনী বা মহাবায়ু ওই ভ্রূ-মধ্যে এসে আটকায় আর ভ্রূ-মধ্য থেকে সোজা সহস্রারে চলে যায়, আর দপ করে সহস্রার থেকে কণ্ঠদেশ পর্যন্ত ওই আদিত্যবর্ণ পুরুষকে সাক্ষাৎকার করা যায়। বলেই তার নীচে লিখছি, এ কিন্তু ভগবান দর্শন নয়। ত্রিপুটি অবস্থায় ভগবান দর্শন হয়, -বলে ত্রিপুটি অবস্থার বর্ণনা দিয়েছি। কারণ, এমনি বহু লোকেই ভাববে যে এইটি ভগবান দর্শন। তাই ঠাকুরও কথামৃতে ওই বলছেন না—কোনো এক অজানা লোক এসে বলবে—এই—এই! ওই যে ব্রহ্মপুরের থেকে লোক আসে, ঠাকুরের মূর্তি যেমন আমার কাছে এসেছেন, তখন তিনি আমার অজানা লোক ছিলেন। যখন ভগবান দর্শন করাচ্ছেন, অবশ্য তখন তিনি আমার অজানা লোক নন।
 
য এষ সুপ্তেষু জাগর্তি কামং কামং পুরুষো নির্মিমাণঃ
তদেব শুক্রং তদ ব্রহ্ম তদেবামৃতম উচ্যতে।
তস্মিল্লোকাশ্রিতাঃ সর্বে তদু নাত্যেতি কশ্চন। (কঠ উপনিষদ – ২/২/৮)
 
অর্থঃ ইন্দ্রিয়াদি নিদ্রিত হইলে এই যে পুরুষ (স্বপ্নাবস্থায়) দেহে জাগ্রত থাকিয়া আপনার অভিপ্রেত বিষয় সকল নির্মাণ করিতে থাকেন, তিনিই শুক্র (প্রাণ), তিনিই ব্রহ্ম, তিনিই অমৃতরূপে বর্ণিত হন। পৃথিবী আদি সমস্ত লোক তাঁহাতে আশ্রিত। কেবল তাঁহাকেই কেহ অতিক্রম করিতে পারে না। ইনিই সেই।
 
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—জগতে কেউ আচার্য আছে নাকি রে! আচার্য গুরু সে সবই এক কথা। জগতে কেউ আচার্য নেই বাবা। সেই ‘এক’ বহু হয়েছে। আবার ‘বহু’ এক হয়েছে। যদি কেউ বলে সেই ‘এক’ই বহুর আচার্যগিরি করবে, তা বাবা ‘এক’ তো আর বাইরে এক হয়নি, হয়েছে আত্মিকে, যা আমরা পেয়েছি, যা আমরা দেখছি। তাই মানুষের দেহমধ্যেই সেই এক লীলা করেন, সাধন করেন, শিক্ষা দেন। তোরা প্রশ্ন তুলতে পারিস আমরা তো সেই ‘এক’কে আপনার রূপে দেখছি। তাহলে আপনিই আমাদের আচার্য। সে তো তোদের ভুল বলা হবে। কারণ মানুষের দেহে যিনি লীলা করেন তিনি যে ব্রহ্ম স্বয়ং।
 
v  আমার অবস্থা যে স্বপ্নবৎ তারও প্রমাণ তোরাই। আমার অবস্থা স্বপ্নবৎ না হলে তোরা তোদের স্বপ্নে আমায় দেখতিস না। লাইক প্রডিউসেস লাইক। এ অবস্থার কথা তোদের আমি বহু আগেই বলে গেছি। বহু আগেই আমি তা বুঝেছিলাম আর তোদের তা বলে গেছি।
 
v   পাঠক পাঠ করলেন—“য এষ সুপ্তেষু…” শ্রীজীবনকৃষ্ণ—তাহলে এটাই শুধু মনে রাখিস, ঐ পুরুষ আর আত্মা তাহলে আইডেনটিকাল হচ্ছে। তাহলে আত্মা বলব কেন? যে আত্মা জগতে দু একজন ছাড়া আর কেউ দেখেনি ব্যষ্টিতে? অথচ সেই পুরুষকে—আমাকে—লক্ষ লক্ষ নরনারী দেখেছে, এটা কল্পনারও নয়, অনুমানেরও নয়, আর বোধে বোধ হওয়াও নয়। এ প্রত্যক্ষ বাস্তব।
 
v  প্রতিটি মানুষের অন্তরে আছেন এক পুরুশ—সুপ্ত। তিনি স্বপ্নে জাগ্রত হন মানুষের দেহে (সহস্রারে)।
 
v  পাঠ হল, ‘য এষ সুপ্তেষু’। শ্রীজীবনকৃষ্ণ—এই এবসলিউট টা কী বলতে পারিস?                                                               ধীরেন—নির্বীজ সমাধি।  
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—ও যে এক্সটারপিটেশান হচ্ছে রে! তারপর? ওরে, যখনই খেতে হচ্ছে পঞ্চভূত যে তখনই আবার তাকে তেড়ে ধরছে! এবসলিউট মানে যে শূন্য রে! আর ইউনিভার্সাল ইগো মানে কী জানিস? বহুবার তোদের আমি বলে গেছি—শূন্যতত্ত্ব থেকে নাদতত্ত্ব, নাদতত্ত্ব থেকে মহৎতত্ত্ব, মহৎতত্ত্ব থেকে আদ্যাশক্তিতত্ত্ব। এই মহৎতত্ত্বই হচ্ছে ইউনিভার্সাল ইগো। তাহলে এবসলিউট কী করে ইউনিভার্সাল ইগো হচ্ছে রে? দুটো কি আইডেনটিকাল? (ধীরেনকে লক্ষ করে) কিছু বলার থাকে তো বল?
ধীরেন—আজ্ঞে না, আমার কিছু বলার নেই, আপনি বলুন।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—মহৎতত্ত্বটা কি বুঝলি না? বেদের ওই কথা রে—য এষ সুপ্তেষু জাগর্তি কামং কামং পুরুষো নির্মিমানঃ…। এই মহৎতত্ত্ব। হ্যাঁ রে, এবসলিউট আর ইউনিভার্সাল ইগো আইডন্টিকাল। ওতপ্রোত।
 
v  দেখ, স্বপ্ন সম্বন্ধে তোদের একটা কথা বলে রাখি শোন। স্বপ্নটা কী আত্মার? না, আত্মার বলব না। আত্মা বললেই এক অজ্ঞাতবস্তুর কল্পনা মাথায় ঠাঁই করে বসবে—প্রাণের স্বতঃস্ফূর্ত বিকাশ। আমি কিন্তু এ শুধু দৈবী স্বপ্নের কথাই বলছি। …প্রাণেরই বা বলি কেন? তোরা কি তোদের প্রাণকে দেখেছিস কেউ? না। দেখেছিস আমার চিন্ময় রূপটাকে। তাই আমার রূপই তোদের প্রাণ। বেদ বলছে, প্রাণের এই স্বতঃস্ফূর্ত বিকাশ হবে কখন? যখন মানুষ ঘুমোবে। তাকে স্বপ্ন বলাও ঠিক নয়। বেদ বলছে, সুপ্তির মধ্যে যে পুরুষ মানুষের মধ্যে জেগে ওঠেন তিনি ব্রহ্ম। এই পুরুষেরই বহুবিধ লীলা দেখিস তোরা তোদের দেহে সুপ্তির মধ্যে। এই বিকাশ যখন আগম হয় (অর্থাৎ সুষুপ্তিতে যাবার পথে) তখন সে স্বপ্ন কখনও সত্য হতে পারে, না-ও হতে পারে। কিন্তু সুষুপ্তি থেকে ফেরার পথে যখন কোনো স্বপ্ন হয়, তখন সেটা সর্বৈব সত্য হয়।
 
v  ছান্দোগ্য ও বৃহদারণ্যকে স্বপ্নতত্ত্বের কথা আছে। জাগ্রত অবস্থার চেয়ে স্বপ্নের অনুভূতি শুদ্ধতর। …স্বপ্নসিদ্ধ লুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। ঠাকুর আবার প্রাণদান করে প্রতিষ্ঠা করেছেন। মাস্টারমশাইকে ঠাকুর বলছেন—যদি স্বপ্নে আমায় উপদেশ দিতে দেখো, জানবে সে সচ্চিদানন্দ। স্বপ্নসিদ্ধ একাধারে পঞ্চসিদ্ধ। তাঁর স্বপ্নে সাক্ষাৎকার হচ্ছে, অতএব তিনি স্বপ্নসিদ্ধ। এই স্বপ্ন হঠাৎ হয়। অতএব তিনি হঠাৎসিদ্ধ। কৃপা ব্যতীত এই দেবস্বপ্ন কেউ দেখেনা। অতএব তিনি কৃপাসিদ্ধ। আবার স্বপ্নসিদ্ধ নিত্যসিদ্ধও বটে। …স্বপ্নসিদ্ধ সাধনসিদ্ধ বা ধ্যানসিদ্ধও হন। সচ্চিদানন্দগুরু তাঁকে দিয়ে সাধন করান এবং সাক্ষাৎকার হয়ে বলেন, “তুমি তো ধ্যানসিদ্ধ”।                                     স্বপ্ন আসে বেদান্তের চতুর্থ ভুমি থেকে। স্বপ্নসিদ্ধ বেদান্তমতে সিদ্ধ। আত্মা সাক্ষাৎকারের পর—আমি দেহ নই—আমি আত্মা—সোহং—আর ক্রমে আত্মার বিকাশ, বিশ্বরূপ, বীজবৎ, স্বপ্নবৎ, লয়।
 
v  ব্রহ্ম স্বপ্নবৎ। আমি স্বপ্নবৎ অবস্থায় আছি বলেই তোরা আমায় স্বপ্নে দেখিস। আর এই স্বপ্ন কোথায় ফোটে? বেদান্তের চতুর্থ স্তরে।
 
v  ওরে, তোরা যে সমস্ত স্বপ্ন দেখিস সে সবের অদ্ভুত অদ্ভুত অর্থ। আমরা সঙ্গে সঙ্গে তা ধরতে পারি না। ঐ একটা যা তা করে খাপ খাইয়ে মানে করে নিই। কিন্তু তাতে ঠিক বোঝা যায় না।                                   (স্বপ্নে) আমি এই এত বড় (ইঞ্চি ছয়েক লম্বা) একটা পাকা আম খাচ্ছি, আর চেষ্টা করছি আঁটিতে দাঁত ঠেকাবো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছুতেই আঁটিতে দাঁত ঠেকানো গেল না। শুনবি এর কী অদ্ভুত অর্থ? এই দেহ অনন্ত শক্তির অধিকারী। মনুষ্যদেহ এমনই অদ্ভুত তা আর কী বলব! এই দেহে অনন্ত, অফুরন্ত অমৃতত্ত্ব আছে। এ খেয়ে শেষ করতে পারা যায় না। তাই আমি আঁটিতে কিছুতেই দাঁত ঠেকাতে পারিনি।
 
v  তুই ভগবানকে চাস? তিনি তো তোর দেহের ভেতর; তাঁকে ডাক, বল—ওগো, আমায় দেখা দাও—দেখবি তিনি কৃপা করে তোর ডাকে দেহের ভেতর থেকে সাড়া দেবেন, তোর সঙ্গে কত কথা কইবেন।…স্বপ্নটা হচ্ছে কোথায়? তোর ব্রেনে, কেমন না? তাহলে তোরই প্রাণশক্তি সহস্রারে গিয়ে ওই রূপ ধারণ করে তোর সঙ্গে কথা কইছে।
 
শ্রীয়ানন্দমোহন ঘোষের স্বপ্ন—১৭/০৪/১৯৯৭
একটা গাছের গুঁড়িতে ঠেসান দিয়ে শ্রীজীবনকৃষ্ণ বসে আছেন। খালি গা, পরনে সাদা ধুতি। আমি তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে আছি। গাছটা পাতাবহুল। মনে হচ্ছে কদম অথবা আম গাছ। শ্রীজীবনকৃষ্ণ জিজ্ঞাসা করলেন—ব্রহ্মের স্বরূপ বল। উত্তর দিলাম, সব তো জানিনা, কেবল একটা লক্ষণ জানি। শ্রীজীবনকৃষ্ণ বললেন—সব কে জানে? তাঁর এক অংশে এই জগত প্রতীয়মান। যা জানিস বল। আবৃত্তি করলাম—‘য এষ…ব্রহ্মণো নাম সত্যমিতি’। তারপর বললাম—সে তো আপনি! শ্রীজীবনকৃষ্ণ বললেন—আমি নয়। টোকা দিয়ে দেখছিলাম ধারণা হয়েছে কিনা। ধারণা হওয়া মানে তাই হয়ে যাওয়া। তাই হয়ে গেছিস। বলছিলাম—সে আমি নয়, তুই! তুই! তুই!
 
অতীন্দ্রগোপাল সিংহরায়ের স্মৃতিচারণ থেকে।
বললাম—উপনিষদ যে বলছে প্রতীকে দর্শন করতে করতে লোকটা প্রতীকাপন্ন হয়ে যায়। তা স্বপ্নও তো ‘প্রতীকে দর্শন’? শ্রীজীবনকৃষ্ণ বললেন—স্বপ্নে যে প্রতীকে দর্শন করায় তা আত্মিককে বাস্তবে রূপ দেবার জন্য। আর বাইরে প্রতীক দর্শন করে প্রতীকাপন্নই থেকে যায়। যেমন কালী কৃষ্ণ ইত্যাদি দর্শন করতে করতে তারা তাই নিয়েই থাকে। আর ওপরে উঠতে পারে না। আর স্বপ্নে প্রতীকে আম, আম খাওয়া, সাপ বাঘ ইত্যাদি দর্শন করে মানুষ কি তাতে লিপ্ত হয়? তাই উপনিষদ বলছে, ‘য এষ সুপ্তেষু…’। তিনি নিজের ইচ্ছা অনুসারে নির্মাণ করেন।  

অসতো মা সদগময়, তমসো মা জ্যোতির্গময়, মৃত্যোর্মা অমৃতম গময়।।
বৃহদারণ্যক ১। ৩ । ২৮
 
শ্রীজীবনকৃষ্ণ – অসৎ থেকে আমায় সতে নিয়ে চলো, অন্ধকার থেকে আলোয় নিয়ে চলো, মৃত্যু থেকে আমায় অমৃতে নিয়ে চলো। প্রথম দুটি তার জীবদ্দশার কথা বলল, আর তৃতীয়টির বেলায় বুঝি মরে গিয়ে অমর হবার কথা বলল? না বাবা, পণ্ডিতেরা সব কদর্থ করে। দেখ না, যে মানুষটা বলছে আমায় অসৎ থেকে সতে নিয়ে চলো, এ প্রার্থনা তো তার জীবদ্দশাতেই। যে বলছে আমায় অন্ধকার থেকে আলোয় নিয়ে চলো, সেও তার জীবদ্দশাতেই। আর মৃত্যু থেকে আমায় অমরত্ব দাও—এটির বেলায় মরে গিয়ে কেন? সেও তো তার জীবদ্দশাতেই চিরকাল দেহ নিয়ে বেঁচে থাকার প্রার্থনাই জানাচ্ছে না কী?
       ঋষির এই প্রার্থনা আজও রূপ নেয়নি, কিন্তু নিতে পারে। তখন প্রমাণ সমেত আত্মা অবিনশ্বর। এই থেকেই মানুষের মাথায় আসছে জন্ম ঢুকিয়েছে। বেদান্তে জন্মান্তরবাদ নেই।
·        মৃত্যুর পর আর কিছুই নাই—কথামৃতের এই কথায় বলছেন—ওরে শোন শোন, মৃত্যুর পর আর কিছুই নাই! হ্যাঁ, ঠিক কথা। এই ধর্ম, যা কিছু হবে এই জীবনে। লোকটা যতদিন বাঁচে ততদিনই ধর্ম। দেখ, তোরা সবসময় ভাববি যে তোরা অমর হয়ে থাকবি। ওরা মৃত তাই মৃত্যুর কথা বলবে। আমরা কেন মরার কথা বলব!
·        ২৮শে সেপ্টেম্বর বুধবার মহাষ্টমী ১৯৬০—
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—ওরে আমাকে দেখিয়েছে যে রে। রূপধারণ করে, আমার হাত ধরে একটার পর একটা করে দেখিয়েছে। ওই যে শ্লোকটা—অসতো মা সদগময়, তমসো মা…। গোটা শ্লোকটা আমায় রূপধারণ করে দেখিয়েছে। দেখছি, আমি যেন ফাঁকা জায়গা থেকে একটা বাড়ির মধ্যে ঢুকলুম (অসতো মা সদ্গময়)। সেই বাড়িটার মধ্যে একটা ঘরে ঢুকতে আদিত্য বলে একজন লোক—সে তখন মৃত—আমার হাত ধরে একতলা থেকে দোতলা পার করে দিলে (তমসো মা জ্যোতির্গময়)। তারপর অমৃতবাবু বলে একজন লোককে দেখলাম। তিনি ছিলেন ডেপুটি ইন্সপেক্টার অফ স্কুল। তিনিও তখন মৃত। অমৃতবাবু আমার হাত ধরে তেতলা পার করে দিলেন। (মৃত্যোর্মা অমৃতম গময়)। এইভাবে আমার হাত ধরে ধরে একটার পর একটা দেখিয়েছে।    শ্রীজীবনকৃষ্ণের কথা শেষ হলে ধীরেনদা বললেন—আপনি যখন অমরত্বের কথা বলছিলেন আমি তখন ঘড়ি দেখছিলুম। দেখলুম—সন্ধি পুজার সময় শেষ হতে চলেছে আর আপনিও অমরত্বের কথা বলছেন। মরজগত থেকে অমর জগতের সন্ধিই সন্ধি পুজার উদ্দেশ্য। ধীরেনদার কথা শুনে শ্রীজীবনকৃষ্ণ বিস্ময়-বিজড়িত স্বরে বললেন—তোর কথা শুনে অবাক হয়ে যাচ্ছি। …এরকম কো-ইন্সিডেন্স হয় কি করে? বড় আশ্চর্য তো?
·        তোরা যে আত্মিক জগতে অমর হয়েছিস তার প্রমাণ চাই। দেখ, যদি ‘এক’কে মুছে ফেলা যায় তো কী থাকে? কিছুই না। ওই যে স্বামীজীর কথা—‘গিভ মি ওয়ান অ্যান্ড আই শ্যাল গিভ ইউ মিলিয়ন’। তা হলেই হল—জগতে ‘এক’ই হচ্ছে শাশ্বত সত্য। ‘এক’ই জগতে আছে, ছিল, থাকবে। একত্ব লাভ করলেই অমরত্ব লাভ করা হল। তোরা ‘এক’কে কী করে ছাড়বি? পারবি না, কেননা তুই যে রয়েছিস! তুই আছিস বলেই তো ‘এক’ আছে। অতএব ‘এক’কে কী করে ওড়াবি? (ফেব্রুয়ারি ১৯৬০)
·        নচিকেতা যমের কাছে মৃত্যুর রহস্য কী, জানতে গিয়েছিল। অর্থাৎ মৃত্যুর পর কী আছে জানবার জন্য। তারা জীবনটাকে দেখতে চায়নি, জীবন যে এক অপূর্ব বস্তু তা তারা জানে না। এতে কী প্রমাণ হয়, যে তাদের এসব কিছুই হয়নি। আর দেখ, আমি তোদের কী বলি? আমি চিরকাল এই দেহ নিয়ে বাঁচব। যাদের এই সব হয়েছে তারা মৃত্যু কী জানতে চায় না। মৃত্যুর কথা তারা ভাবে না, দেখে না। এই দেহটা, তাতে কী হয়েছে বল দিকিনি। কী এক অপূর্ব বস্তু! ওরা কী করেছে? ওরা আলোতে যা আছে তা দেখতে চায়নি, অন্ধকারে কী আছে তাই খুঁজছে।
·        দেবতারা অমর একথা কারা বলছে? মানুষ বলছে। কাল্পনিক দেবতার সৃষ্টি করে মানুষ একদিন অমর হবে এই আশা করেছিল। বেদে দেখা যায় ঋষি প্রার্থনা করছেন—'মৃত্যোর্মা অমৃতম গময়’। সে তোদের কাল্পনিক দেবতার অমরত্বের জন্য প্রার্থনা করছেনা, করছে তার নিজের জন্য। আমিও তো কতবার বলেছি—দেখ বাবা, মানুষের মাথায় অমরত্বের কোষ আছে। সে কোষ আমি দেখেছি, এখনও মুক্ত হয়নি। তবে হ’তে পারে। (২০শে অক্টোবর ১৯৬০)
·        ‘অসতো মা সদ্গময়’—ন্যাচারাল সেলফ ইভলিউশান (স্বাভাবিক আত্মবিবর্তন) ! সে ইভলিউশান চেক (রোধ) করছে কে? আমারই সুপারস্টিশান (কুসংস্কার)।
·        বেদে বলছে 'মৃত্যোর্মা অমৃতম গময়’, অর্থাৎ এই দেহেতে অমৃতত্ব রয়েছে, সেটা ফুটতে পারে। মৃত্যু হচ্ছে অমৃতের কন্ট্রা (উল্টো)। আমার দেহেতে একটা কন্ট্রা ফুটেছে। সেটা কী বলতে পারিস? জগত এতদিন ব্যষ্টি নিয়েছিল—ব্যষ্টির কন্ট্রা সমষ্টি। এই সমষ্টির সাধন যদি আপনা হতে সম্ভব হয় তাহলে--মৃত্যুর কন্ট্রা অমৃত—সেটাও ফোটা সম্ভব। আরও দেখ অ্যানিম্যালিটির কন্ট্রা ডিভিনিটি। “টু লিভ ইন পারফেক্ট গুডনেস ইজ টু রিয়ালাইজ ওয়ানসেলফ ইন অল”। এইটেই ডিভিনিটির প্রমাণ—তাও ফুটেছে। শৈলেনের (রায়) একটা স্বপ্ন শোন—দেখছে, নির্মল আকাশে পূর্ণচন্দ্র ফুটে রয়েছে অথচ তার আলো পৃথিবীর কোথাও পড়েনি। তার সমস্ত কিরণটা—আমি বসে আছি; আমাতে আবদ্ধ। এর ব্যাখ্যা—পূর্ণচন্দ্রের পূর্ণকিরণ অর্থাৎ পূর্ণ স্নিগ্ধতা অর্থাৎ অমৃতত্ব আমার দেহেতে আবদ্ধ। জগতে কোটি কোটি মানুষে আমার এই অমৃতত্ব ফুটলে তবে আমি এই দেহ নিয়ে চিরটা কাল বাঁচব। নচেৎ--অমৃতত্ব আছে আমার মাথায়—সেটা ফোটার অপেক্ষায় থাকতে হবে। কিন্তু ততদিনে যদি আমি চলে যাই, তাহলে এ প্রশ্ন—আবার ব্যাক টু দ্য প্যাভিলিয়ন। রিভাইভ করতে কেউ আসবে? তোদের হিন্দু শাস্ত্র কী বলে?
·        দেখ বাবা, আজ দুপুরে ধ্যানে বসলাম। ধ্যানের মধ্যে ফর্সা কবরেজকে (শৈলেন্দ্রনাথ রায়) দেখলাম। তারপরই দেখলাম স্বামীজীকে—ধ্যানস্থ। তখন মনে উঠল—রূপের ঘরে। মন চলে গেল সহস্রারে। তারপরেই লয়। কতক্ষণ ছিলাম জানিনা। ধ্যান ভেঙে গেল। যোগনিদ্রায় অভিভূত হলাম। সেই নিদ্রার মাঝে দেখছি, এক বিরাট হাতি। অত বড় হাতি দেখা যায় না। সেই হাতিটার দাবনার কাছে আমি দাঁড়িয়ে। ছুটতে ছুটতে এলো অমর (ফুড সাপ্লাইয়ের)। আমি তখন ভাবছি—এই রে! হাতিটাকে ছোঁবে নাকি? অমর হাতিটাকে স্পর্শ করল। অমনি হাতিটা অমরকে শুঁড়ে জড়িয়ে ওপরে তুলে ধরে রইল। এর কী ব্যাখ্যা দিতে পারিস? ওরে, ওই বিরাট হাতি—জগতের মানুষের মন—সেই মনে আমার অমরত্ব। আমার মৃত্যু নেই। মানুষের মধ্যে যতদিন আমি জীবন্ত—আমি অমর।
·        …এই দেহে অমরত্ব আছে। বিবিদিষায় হবেনা। বিদ্বতে যদি এই কোষ মুক্ত হয়। হ্যাঁ বাবা, কোষ মুক্ত হয়েছে। কিন্তু কী হয়েছে জানিস? ব্যষ্টিতে তা আবদ্ধ হয়ে আছে। ও তো কোনও কাজের কথা নয়।
·        ঠাকুর বলছেন, সে সমুদ্রে পড়লে মানুষ মরে না। অমর হয়। সেটা কী সমুদ্র বাবা? এই জনসমুদ্র। এই জনসমুদ্রে আমি পড়েছি তার প্রমাণ তোরাই দিয়েছিস। প্রশ্ন এইবার—ভগবান কি মরে? না। তাহলে আমি অমর। আর অমর হতে গেলে এই দেহ নিয়ে চিরকাল বেঁচে থাকতে হবে। আত্মার মৃত্যু নেই, ভেগ (অস্পষ্ট কথা)। ঋষি প্রার্থনা করছে দেহ নিয়ে চিরকাল বেঁচে থাকার জন্য। থাকেনি তারা। ফুটবে তবে বলা যাবে। তবু বলে যাই মৃত্যুকে জয় করার কথাই ভাববি। মৃত্যুকে স্যালুট করে নয়।

    


শ্রীজীবনকৃষ্ণের অমৃত কথাসার প্রথম অংশ

১৯৫০ থেকে ১৯৫৩ সালের কিছু কথা সংকলিত করা হয়েছে শ্রীজীবনকৃষ্ণ সংশ্রয় থেকে। যেহেতু সেখানে দিনলিপিতে তারিখের উল্লেখ নেই, তাই এখানে তারিখের উল্ল...