স্মৃতি কণা
নারায়ন নন্দী
শ্রীজীবনকৃষ্ণকে
প্রথম দর্শন করি কদমতলার কেদার দেউটি লেনের বাড়িতে। তাঁর কথা আগে শুনেছিলাম। তবে
শুধু জানতাম যে কদমতলায় একজন সাধু থাকেন। কিন্তু তাঁর নাম পরিচয় এমনকি কিরকম
দেখতে তাও জানতাম না।
আঠেরোই নভেম্বর
১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে রবিবার বিকালে দুজন বন্ধুর সঙ্গে রওনা হলাম কদমতলায় তাঁকে দর্শন করবার জন্য।
একটু খোঁজাখুঁজির পর কেদার দেউটি লেনের মধ্যে ঢুকে বাঁদিকে একটা একতলা রকওয়ালা বাড়ি
দেখতে পেলাম, রকে উঠেই ঘর। ঘরের দরজা খোলা। ভেতরে কয়েকজন লোক নিস্তব্ধ হয়ে বসে
আছেন। কি একটা বই পড়া হচ্ছিল। তাঁরা গভীর মনোযোগের সঙ্গে শুনছেন। ঘরের শেষপ্রান্তে
একটা খাটের ওপর গদিওয়ালা বিছানা পাতা, সেখানে হাতের ওপর হেলান দিয়ে অর্ধশায়িত
অবস্থায় শ্রীজীবনকৃষ্ণ শুয়ে আছেন। বয়স প্রায় ৬৪/৬৫ হবে। কিন্তু দেখলেই মনে হয়
শক্তিমান পুরুষ।
ঘরে ঢুকতে সাহস
না হওয়ায় বন্ধু দুজনকে নিয়ে রকটির শেষপ্রান্তে গিয়ে বসলাম। ঘরের মধ্যে ঢুকব কি
ঢুকব না এই নিয়ে তিন বন্ধুকে আলোচনা করছি। শেষে আমি ঘরের মধ্যে ঢুকে হাত জোড় করে
প্রণাম করে দরজার সামনেই বসতে যাচ্ছি এমন সময় স্ত্রীজীবনকৃষ্ণ হাত নেড়ে কাছে
ডাকলেন। বললেন, এসো বাবা এসো, সামনে বসো। আমি কাছে গিয়ে তাঁর শ্রীচরণ স্পর্শ করে
প্রণাম করলাম। তিনি গায়ে হাত বুলিয়ে সস্নেহে বললেন -তুই একটু এক্সারসাইজ করতে
পারিস? এই বলে তিনি খাটের ওপর বসতে বললেন।
ঘরের
মেঝেতে ১২/১৪ জন লোক বসে আছেন। আমি বললাম, না আমি নীচেই বসি। কিন্তু তিনি ছাড়লেন
না, আবার সস্নেহে বললেন—আমার কাছে খাটের ওপর বোস। আমি ইতস্তত করতে লাগলাম এই ভেবে যদি
আর কেউ কিছু বলেন। শ্রীজীবনকৃষ্ণ চার-পাঁচবার বলায় আমি একবার অন্যদের মুখের দিকে
তাকালাম। শেষে তাদের মধ্যেই একজন বসতে বলায় আমার সাহস হলো ও খাটের ওপর তাঁর কাছে
বসলাম। ঘরের মধ্যে তখনও একজন বই পড়ছেন। কি পড়ছেন ও কে পড়ছেন তা তখনও জানিনা। পরে
জেনেছিলাম শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত পাঠ হচ্ছিল ও ক্ষিতীশবাবু পড়ছিলেন।
একটু পরে শ্রীজীবনকৃষ্ণ
বাইরে গেলেন ও আমার দুজন বন্ধুকে দেখে মধুর কন্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন—তোরা কি এখানে
এসেছিস? তারা বলল, আজ্ঞে হ্যাঁ। বললেন, তবে এখানে বসে আছিস কেন? ভেতরে বসগে যা,
কেউ কিছু বলবে না। তারাও ভেতরে এসে বসলো।
আজ রবিবার
ছুটির দিন, তাই অনেকেই আসছেন। দেখতে দেখতে ঘর ভর্তি হয়ে গেলো। একটু পরেই শ্রীজীবনকৃষ্ণ
ফিরে এলেন ও খাটের ওপর বসলেন। তিনি অনেকেরই কুশল সংবাদ নিয়ে আনন্দে কথা বলছেন।
একবার হঠাৎ একটা কথা উচ্চারণ করে অদ্ভুতভাবে তার দেহটা ঝাঁকুনি দিয়ে উঠেই স্থির
হয়ে গেল। মুখভঙ্গি দেখে মনে হল হাসছেন। আমি এই দৃশ্য দেখে হঠাৎ অবাক হয়ে গেছি।
সকলেই তাঁর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন, কিন্তু আমি ভাবছি এ আবার কি? কথা বলতে
বলতে চুপ করে স্থির হয়ে গেলেন কেন? পরে জেনেছিলাম এর নাম সমাধি ও শ্রীজীবনকৃষ্ণের
এই অবস্থা নিত্যই হয়। কিছুক্ষণ পরে প্রকৃতিস্থ হয়ে পুনরায় কথামৃত প্রসঙ্গে
কথাবার্তা বলতে লাগলেন। তাঁর কথাগুলো অপূর্ব লাগছিল কিন্তু আফসোস হচ্ছিল, এসব উচ্চ
কথাবার্তা আমার বোধগম্য হচ্ছিলনা। ভাবলাম হয়তো এখানে এঁর কাছে নিত্য আসা-যাওয়া করলে এ সমস্ত কথা বোধগম্য
হবে বা ধারণা হবে।
কাছে একটি ছোট
শিশি, তাতে নস্য আছে। কথা বলতে বলতে শ্রীজীবনকৃষ্ণ এক একবার নস্য নিচ্ছেন ও রুমাল দিয়ে নাক মুছছেন। বহু লোকের বসার জায়গা
না থাকায় অনেকেই বাইরের রকে বসেছেন। শ্রীজীবনকৃষ্ণ মাঝে মাঝে পাঠ থামিয়ে
কথামৃতের ব্যাখ্যা দিচ্ছেন। ক্রমে রাত নটা হল। পাঠ বন্ধ করে সকলেই কথামৃত মাথায়
ঠেকালেন, শ্রীজীবনকৃষ্ণকে ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রণাম করে নিজ নিজ গৃহ মুখে রওনা হলেন।
আমিও এইভাবে শ্রীজীবনকৃষ্ণের চরণে প্রণাম জানালাম। তিনি গায়ে হাত বুলিয়ে সস্নেহে
বললেন—আবার আসিস বাবা। বললাম, আজ্ঞে আপনি টানলেই আসবো। তিনি আবার বললেন—আসিস।
১৯শে নভেম্বর,
সোমবার ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দ, বেলা আন্দাজ চারটে হবে, শ্রীজীবনকৃষ্ণের উদ্দেশ্যে রওনা
হলাম। ঘরে ঢুকে দেখি কয়েকজন ভক্ত আছেন ও একজন কথামৃত পাঠ করছেন। আমাকে দেখে আজও করুনামাখা
স্বরে বললেন—এসেছিস বাবা, এসেছিস বাবা! বোস। বলে মেঝের দিকে আঙুল দেখিয়ে দিলেন।
আমি তাঁর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে মেঝেতে বসলাম। কথামৃত পাঠ হচ্ছে, শ্রীরামকৃষ্ণ
বলছেন, সুতোয় একটু আঁশ থাকলে ছুঁচে ঢুকবে না। শ্রীজীবনকৃষ্ণ বললেন—তিনি এই যে ছুঁচ
আর সুতোর কথা বলছেন, এই সুতো মানে মন। একটু
কামনা-বাসনা থাকলে এখানে (কপালে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে) যায় না। সেদিন এর অর্থ ঠিকভাবে
বুঝতে পারিনি।
কথামৃত পাঠ
পুনরায় চলতে লাগল। ক্রমে সন্ধ্যার মুখে আরও কয়েকজন মনে হল অফিস ফেরতা এলেন।
সকলেই একাগ্রচিত্তে কথামৃত পাঠ শুনছেন। আমি নবাগত। সকলকে চিনিনা। মুগ্ধ হয়ে সকলকে
দেখছি, আবার কখনো কথামৃত পাঠ শুনছি। রাত প্রায় ন'টা পর্যন্ত কথামৃত পাঠ হল। শ্রীজীবনকৃষ্ণ, ঠাকুর ও অন্য
ভক্তদের উদ্দেশে প্রণাম জানালেন। ভক্তগণও যথারীতি তাঁকে প্রণাম করে যার যার বাড়ি
রওনা হলেন।
আমি যখন তাঁকে
প্রনাম করতে দাঁড়ালাম, প্রশ্ন করলেন, কোন স্বপ্ন দেখেছিস বাবা? আমি তাঁকে প্রণাম
জানিয়ে বললাম, না। এইভাবে পনেরো-ষোলো দিন গেল। আমি রোজই তাঁর পায়ে হাত দিয়ে
প্রণাম করে যাই। তিনিও সস্নেহে আমাকে আদর করেন।
এরপর পর পর
কয়েকটি দর্শন স্বপ্নে হয়।
প্রথম স্বপ্ন -
বাড়ি থেকে বেরিয়েছি শ্রীজীবনকৃষ্ণের কাছে যাব বলে। কিন্তু যতই এগিয়ে যাচ্ছি
আবার ঠিক সেই জায়গাতেই ফিরে আসছি। যাওয়া আর হলো না। ঘুম ভেঙে গেলো।
দ্বিতীয়
স্বপ্ন - কদমতলা ব্যাঁটরা পাবলিক লাইব্রেরির কাছে এসেছি শ্রীজীবনকৃষ্ণের কাছে যাব
বলে। দেখছি ভোলাদা ও আরো অনেকে যেন শ্রীজীবনকৃষ্ণের কাছ থেকে আসছেন। আমি ভাবছি ও,
ওরা ওখান থেকে (শ্রীজীবনকৃষ্ণের) আসছেন।
তৃতীয় স্বপ্ন -
দেখছি শ্রীজীবনকৃষ্ণের ঘরের কাছে গেছি। ঘরের দরজা বন্ধ। ভেতরে কথা হচ্ছে শুনতে
পাচ্ছি। লোকজন আছে বুঝতে পারছি। এরপর ঘুম ভেঙে গেল।
চতুর্থ স্বপ্ন -
আমি যেন ধ্যান করতে বসেছি। হঠাৎ দেখি ঠিক আমার সামনেই একটা বিরাট গাছ। গাছটার নিচে
একটা বেদী ও সেই বেদীর ওপর শ্রীসারদা-মা বসে আছেন। আমি বাঁদিকে মুখ ফিরিয়ে দেখলাম
শ্রীজীবনকৃষ্ণও বসে আছেন। স্বপ্নটা তাঁকে বলেছিলাম।
১২ই জুন, ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দ,
বুধবার। ভক্তেরা অনেকেই এসেছেন। উপেনবাবু আজ একটু সকাল-সকাল এসেছেন। এরপর আমিও
গিয়ে হাজির হলাম। সন্ধ্যা প্রায় ছটা বেজে গেছে। রামকৃষ্ণদা, সৌরেনদা, আনন্দদা, ভোলাদা,
হীরুদা ও আরো অনেকে এলেন। শ্রীজীবনকৃষ্ণ আজ কথাপ্রসঙ্গে বললেন, দেখ, একদিন উপেন
এসে আমায় বললে—আমি একদিন কলকাতায় দিনের বেলায় বাসে করে যাচ্ছিলাম। সঙ্গে এক
বন্ধু ছিল। আমার সামনে আপনি দাঁড়িয়ে অনেক কথা বললেন, আর বললেন, তুই গায়ত্রী জপ
করিস, তা ভালো। আমার আঙুলে একটা পলার আংটি। আংটিটা ধরে বললেন, পলার আংটি পরে কি
হবে? তারপর আপনাকে আমি আর দেখতে পেলাম না। আমার বন্ধু জিজ্ঞাসা করলে, উনি কে? আমি বললাম,
ওঁকে তো আমি জানিনা। শ্রীজীবনকৃষ্ণ
পুনরায় বললেন, আমি তো তার কথা শুনে অবাক। আবার কি আশ্চর্য আমাকে তো বাসের ভাড়াও
দিতে হয়েছিল! এই কথার পর আমিও শ্রীজীবনকৃষ্ণকে প্রণাম করে বিদায় নিলাম। বাকি কথা
আর শোনা হলো না।
৫ই জুলাই,
১৯৫৭, শুক্রবার, সন্ধ্যেবেলা ভক্তরা অনেকেই এসেছেন। শ্রীজীবনকৃষ্ণ বললেন—আমার যখন ১২ বছর ৪ মাস বয়স তখন ঠাকুরকে সচ্চিদানন্দ গুরুরূপে
পাই। তারপর ১৩ বছর ৮ মাস বয়সে পূর্ণত্ব লাভ করি। কিন্তু সেটা ফুটতে কতদিন হয়েছিল
শুনবি? ২৫ বছর ৪ মাস বয়সে আমি একবার আলপুকুরে বেড়াতে যাই। সেখানে একটা জায়গায়
রোজ চেয়ারে বসতাম। একজন মুসলমান (গোলাম) আমার কাছে আসত ও আমার কাছে বসত। একদিন
সকালবেলা আমি ওই চেয়ারে বসে আছি এমন সময় সেই লোকটি এসে আমার পায়ের তলায় শুয়ে
পড়ল। আমি তাড়াতাড়ি তাকে তুলে বললুম—তোর কি হয়েছে? সে বলল, আমি স্বপ্নে দেখলাম আপনি আমাকে
বেলুড়মঠে নিয়ে গেছেন আর সেখানে আপনি সব দেখাচ্ছেন। আমি তো শুনে অবাক। একবার কালী
ব্যানার্জি লেনের বাড়িতে সকালে ঘুম থেকে উঠে বাইরে বেরিয়েছি দেখি এক ভদ্রলোক
দরজার কাছে বসে আছে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, এত সকালে এখানে আপনি কি মনে করে এসেছেন?
সেই ভদ্রলোক বললেন, কাল রাতে আপনাকে স্বপ্নে দেখেছি। আরও অনেক কথা বললেন। আমি
বললুম, মশাই ওসব কিছু না। আপনি যান। তিনি আর আসেননি। তারপর আরো প্রায় আট দশজন
স্বপ্নে দেখেছিল আমি তা গ্রহণ করিনি।
৪৬/৪৭ বছর বয়সে একদিন আমি গঙ্গা
চান করে এসে আমার দুজন বন্ধুকে বললুম যে মানুষের দেহেতে ভগবান সচিদানন্দ গুরুরূপে উদয়
হন। তারপর দিন আমি সকালবেলা উঠেই দেখি ওই দুই বন্ধুর মধ্যে একটি এসে বলছে, আপনাকে
স্বপ্নে দেখেছি। এরপর অন্যটিও এসে বলল, আমিও আপনাকে স্বপ্নে দেখেছি। আমি শুনে
আশ্চর্য। ক্রমে ক্রমে দশ বারো কুড়ি পঁচিশ জন এই রকম দেখতে লাগল। ক্রমে দিনের পর
দিন বাড়তে লাগল। দেখনা, এখন হাজার হাজার। এখন আমার বয়স ৬৫।
কথামৃত পাঠ
চলতে লাগল। সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হলো। শ্রীজীবনকৃষ্ণ এইবার ধ্যান করতে বসলেন। উপস্থিত ভক্তগণ
অনেকেই ধ্যান করতে লাগলেন। জাহাঙ্গীরসাহেব গস্পেল অফ শ্রীরামকৃষ্ণ পাঠ করছেন।
ঘন্টাখানেক পরে শ্রীজীবনকৃষ্ণের ধ্যান ভাঙ্গলো। আমাদেরও ধ্যান ভঙ্গ হল। কিছুক্ষণ
পর শ্রীজীবনকৃষ্ণ বলে উঠলেন, শুনবি একটা সামান্য কথা? এখান থেকে চেক পাস না করলে
ব্যাংকে টাকা পাওয়া যাবে না, এর মানে শুনবি? এখান থেকে অর্থাৎ, দেহ থেকে। টাকা
মানে দেহের আত্মিক শক্তি। ব্যাংক মানে পূর্বজন্মের সংস্কার। চেক পাস অর্থাৎ
সচিদানন্দ গুরু উদয় না হলে কিছুই হবেনা। পূর্বজন্মের সংস্কার থাকলেও কিছু হবে না।
(সুধীনদার প্রতি) দেখো সুধীন, অনেকদিন আগের কথা, আমি একটা স্বপ্ন দেখেছি, তুমি তার
মানে করো। দেখছি আমি বহুবিধ আম খেয়েছি। কত রকম যে আমি বলতে পারি না। তার ভেতরে
একটা খুব বড় (হাত দিয়ে দেখালেন), আর একটা আম এত ছোট যে বলতে পারিনা (আঙুল দিয়ে
দেখালেন প্রায় এক ইঞ্চি), এর মানে করো। এই দুই আমের ভেতর আমার জীবনী আছে। সুধীনদা কিছু না বলে চুপ
করে রইলেন। শ্রীজীবনকৃষ্ণ—বড় আম খেয়েছি মানে ততটাই ঈশ্বরে পরিবর্তিত হয়েছি। ঈশ্বরে
পরিবর্তিত হওয়া মানে ঈশ্বর হওয়া। ছোট আম খেয়েছি মানে ঐটুকু জীবত্ব আছে। এই কথা
শুনে উপস্থিত সকলে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন।
পুনরায় পাঠ
চলতে লাগল। শ্রীরামকৃষ্ণ বলছেন—পুরুষ প্রকৃতি না হলে থাকতে পারেনা। শ্রীজীবনকৃষ্ণ—এর
মানে কি জানিস? দেহ ও আত্মা। দেহ আত্মা না হলে থাকতে পারেনা, আত্মা দেহ না হলে
থাকতে পারেনা। ঠাকুর বলছেন, ‘কাঠে অগ্নি আছে, তাতে ভাত করা, ভাত খেয়ে হৃষ্টপুষ্ট
হওয়া’। শ্রীজীবনকৃষ্ণ বললেন—দেহেতে প্রাণশক্তি, সেই প্রাণশক্তি সহস্রারে উঠে আত্মার
সাক্ষাৎকার, তারপর ব্রহ্মজ্ঞান হওয়া, তারপর ভগবানে পরিবর্তিত হওয়া।
কদমতলা ২০শে জুলাই, ১৯৫৭ শনিবার।
সন্ধ্যা হয় হয়। শীঘ্রই রামনাম সংকীর্তন শুরু হবে।
কথামৃত পাঠ বন্ধ হয়েছে কিন্তু কথামৃতের প্রসঙ্গ চলছে। শ্রীজীবনকৃষ্ণ—ঠাকুর বলছেন ধুনুরির
হাতে পড়লে তুঁহু তুঁহু করে। সামান্য কথা তাও যোগাঙ্গে ভরা। ধুনুরি অর্থাৎ ভগবান, তাঁত
মানে সুষুম্না, আর ধুনুরির যন্ত্রটা হলো দেহ।
রামনাম শুরু হলো। মনোজবাবু স্তব করছেন,
বর্ণানা়মার্থসঙ্ঘানাং রসানাং ছন্দসামপি-ইত্যাদি। অনাথদা হারমোনিয়াম বাজাচ্ছেন। শ্রীজীবনকৃষ্ণ
ও ভক্তেরা ধ্যানে বসলেন। স্তবের শেষে প্রার্থনা, নান্যা স্পৃহা,... ও পরে রামনাম সংকীর্তন, শুদ্ধব্রহ্ম পরাৎপর রাম...আরম্ভ
হলো। সংকীর্তনের সময় তবলা সঙ্গত করছেন অজিতবাবু। মনোজবাবু কাঠ করতাল বাজাচ্ছেন।
রামনাম সংকীর্তনের
পর খগেনবাবু কীর্তন আরম্ভ করলেন। কীর্তন শুনতে শুনতে শ্রীজীবনকৃষ্ণের দেহে
মহাভাবের কম্পন হচ্ছে। দেহ উজ্জ্বল ও রক্তবর্ণ। ভক্তেরা একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন।
কীর্তনের শেষে খগেনবাবু নাম সংকীর্তন করছেন—গুরুগৌরাঙ্গ রাধাগোবিন্দ ব্রহ্ম
নারায়ণ হরেকৃষ্ণনাম-ইত্যাদি।
নামকীর্তন হয়ে
গেলে কথা চলছে।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—মা কালী উলঙ্গ কেন জানিস? আত্মা
সাক্ষাৎকারের সময় আত্মা দেহ বিবর্জিত, অর্থাৎ তখন দেহ নয় আত্মা। এরপর
সচ্চিদানন্দ চিদঘনকায়। ‘সৎ’ ভগবান অর্থাৎ দেহস্থ চৈতন্য। তা ‘চিৎ’ অর্থাৎ যোগ আশ্রয়
করে আনন্দ রূপে ফুটে ওঠে। ওই চৈতন্য আবার ঘনীভূত হয় এবং ‘কায়’ বা রূপ ধারণ করে
অপরের দেহে ফুটে ওঠে। তোরা যে আমাকে স্বপ্নে দেখিস ও তোদের দেহস্থ চৈতন্য আমার রূপ
ধারণ করে। তাহলে আগে ফুটল না কেন? এখানে আসার পর ফুঠছে কেন? এখানে আমার সংস্পর্শে
এসে হচ্ছে। তুই আমাতে পরিবর্তিত হচ্ছিস। আমি নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে জগতকে কন্ট্রোল
করছি। কিন্তু আমি যে ইচ্ছা করে করছি তা নয়। তাহলে আমার দেহ ফেটে যাবে।
২৩শে জুলাই,
মঙ্গলবার। কদমতলার ঘরে যখন ঢুকলাম তখন বেলা চারটে বেজে গিয়েছে। শ্রীজীবনকৃষ্ণ
খাটের উপর বসে আছেন। ভক্তেরা মেঝেতে বসে আছেন। হাত জোড় করে শ্রীজীবনকৃষ্ণকে
প্রণাম করলে তিনি বসতে ইঙ্গিত করলেন। একটু পরে হীরুদা এসে প্রণাম করে বসলেন। আজ
একাদশী। শ্রীজীবনকৃষ্ণকে কীর্তন শোনাবার জন্য হীরুদা অফিসের ছুটির আগেই চলে এসেছেন—হরেকৃষ্ণ
রামকৃষ্ণ হরে হরে ইত্যাদি। চড়াসুরে কীর্তন চলছে। কীর্তনের সময় অনেকে ধ্যান করছেন।
কীর্তনশেষে শ্রীজীবনকৃষ্ণ ও ভক্তেরা সকলে প্রণাম করলেন।
ইতিমধ্যে
জাহাঙ্গীরসাহেব এসেছেন। শ্রীজীবনকৃষ্ণ জাহাঙ্গীরের হাতে গস্পেল অফ শ্রীরামকৃষ্ণ তুলে
দিলেন। তিনি মাথায় ঠেকিয়ে প্রণাম করে পাঠ শুরু করলেন।
এইবার একে একে আসছেন রামকৃষ্ণদা, সৌরেনদা, আনন্দদা,
ভোলাদা, মৃত্যুঞ্জয়দা, শৈলদা, গোপীবাবু। গোপীবাবু একটা স্বপ্ন নিবেদন করলেন—দেখছি
স্ত্রী ব্রহ্মচারিণী হয়েছে। মাথা মুড়িয়েছে, থান কাপড় পরেছে। আমি তাই দেখে বলছি,
তুমি বিধবা হয়েছে কেন? আমি তো মরিনি! স্ত্রী বললে—আমি ব্রহ্মচারিণী হয়েছি। স্বপ্ন দেখে মন খারাপ হয়ে
গেল। স্ত্রীকে বললাম। স্ত্রীরও মন খারাপ। শ্রীজীবনকৃষ্ণ স্বপ্ন শুনে বললেন, খুব
ভালো স্বপ্ন। ওর মানে কি জানিস? তোর জ্ঞান হয়েছে। দেহ থেকে ওই উপে গেছে।
‘কাম’ শব্দটি
উচ্চারণ করতে গেলে শ্রীজীবনকৃষ্ণের সমাধি হয়ে যায়, তাই শব্দটি উচ্চারণ করলেন না।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—আরো মানে আছে। তুই বিদ্যাস্ত্রী
গ্রহণ করলি।
সন্ধ্যা হয়ে গেলে শ্রীজীবনকৃষ্ণ বললেন—আয়, সকলে
একটু ধ্যান করি। ঠাকুর বলেছেন, সন্ধের সময় ঈশ্বরচিন্তা করতে। সকলে কিছুক্ষণ ধ্যান
করলেন। ইতিমধ্যে এলেন সন্তোষ গুছাইত, জিতেন চ্যাটারজি, জিতেন বৈরাগী ও আরও অনেকে। শ্রীজীবনকৃষ্ণ বললেন,
আচ্ছা তোরা কেউ শুনেছিস কলিকালে সব একাকার হয়ে যাবে? হীরুদা ভোলাদা ক্ষিতীশদা ও
আরো অনেকে বললেন, হ্যাঁ, আমরা শুনেছি। শ্রীজীবনকৃষ্ণ ক্ষিতীশদাকে জিজ্ঞাসা করলেন,
ওর মানে কি?
ক্ষিতীশদা—এইখানে
মানে আছে। একজনকে সকলে সচিদানন্দ গুরু রূপে পাবে।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—হ্যাঁ
ঠিক। কী অদ্ভুত! একাকার মানে এক আকার। একজনকে সকলে সচ্চিদানন্দ গুরু রূপে পাবে ও তাঁতে
পরিবর্তিত হবে।
একজন ভক্ত—আচ্ছা,যে
বলেছে তার কি অনুভূতি হয়েছে?
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—না
রে বাবা। অজ্ঞাতসারে বলে গেছে। ও ভগবান বলিয়েছে। দাঁড়া, আমি আগে মরি। এখন কি
হয়েছে! এর তিনগুণ জোর ধরবে। আমায় দেখিয়েছে দুই থাকবেনা এক থাকবে।
ভগবান দর্শনের
প্রসঙ্গ উঠলো
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—ভগবান দর্শন চার রকম। ইষ্ট সাক্ষাৎকার,
অবতার দর্শন, আত্মা সাক্ষাৎকার, বিশ্বরূপ দর্শন। আর ইষ্ট সাক্ষাৎকার, ও তো বিচারাত্মক।
তার ওপরে আত্মা সাক্ষাৎকার। আত্মা সাক্ষাৎকারে বলে দেবে, দেখিয়ে দেবে, বুঝিয়ে
দেবে। তারপর বিশ্বরূপ দর্শন। তারপর অবতার দর্শন।
কামিনীকাঞ্চন
ত্যাগ প্রসঙ্গে শ্রীজীবনকৃষ্ণ বললেন—ঠাকুরের ধর্ম কামিনী-কাঞ্চন ত্যাগের ধর্ম।
এখানে সচিদানন্দ গুরু মানুষের দেহে উদয় হয়ে যোগের দ্বারায় কামিনীকাঞ্চন ত্যাগ করাবে।
এতে হলো তো হল। না হলে আর হলো না।
প্রসঙ্গঃ
শ্রীরামকৃষ্ণ—বাপ একবার জন্ম দেয়, আর একবার জন্ম উপনয়নের সময়। আবার একবার জন্ম
হয় যদি কেউ সন্ন্যাস নেয়।
ভোলাদা (শ্রীজীবনকৃষ্ণের প্রতি) -আচ্ছা, উপনয়ন
কি?
শ্রীজীবনকৃষ্ণ
বললেন, উপনয়ন মানে একগোছা ঝোলালে হলো না (অর্থাৎ পৈতে)। (কপালে আঙ্গুল ঠেকিয়ে)
ত্রিনয়ন-জ্ঞানচক্ষু উদয় হলে আত্মা সাক্ষাৎকার হয়। আত্মা সাক্ষাৎকার হলে আমি দেহ
নই, আমি আত্মা, এই বোধ হয়। আর সে মানুষটাকে কুটিচক করে। কেন করে জানিস? মানুষটা
যা চাইছিল তাই পেয়ে গেছে। সেই জানবার জন্যই মানুষটা এখানে-সেখানে করে, দৌড়োদৌড়ি
করে।
৩১শে জুলাই,
১৯৫৭ বুধবার। রাত প্রায় সাতটা হবে। শ্রীজীবনকৃষ্ণ খাটের ওপর বসে আছেন। ঘরে সত্যবাবু,
বঙ্কিমবাবু, সুশীলবাবু, আনন্দদা, জলধর টাকি, গণেশ মান্না, নিতাই ও ছোট হারু
ইত্যাদি অনেক ভক্ত বসে আছেন। একটু বয়োজ্যেষ্ঠরা খাটের ওপর বসে আছেন।
জিতেন বৈরাগী (শ্রীজীবনকৃষ্ণের
প্রতি) -ব্রহ্মচারিণী মানে কি?
শ্রীজীবনকৃষ্ণ (মাথায়
হাত দিয়ে) -ব্রহ্মণি চরতি।
(তিন-চারদিন
গঙ্গায় স্নান করেছেন। এখন শ্রাবণ মাস) শ্রীজীবনকৃষ্ণ বললেন—গঙ্গা স্নান করেছি তাই
শরীরটা একটু খারাপ হয়েছে।
সৌরেনদা মৃদু স্বরে বললেন, ওষুধ খাবেন?
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—না, ও কিছু হবেনা।
সৌরেনদা আবার বললেন—ট্যাবলেট খান, এনে দি।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ পুনরায় না বললেন। ভক্তরা অনেকে
জোর করলেন। বললেন, এনে দি, খান। ভালো হয়ে যাবে।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ শেষে বললেন—আচ্ছা তোরা বলছিস, তবে
ওইখানে জামা থেকে একটা টাকা নে।
সৌরেনদা
আমার পকেট থেকে টাকা নিলেন। রঘুদা ও সৌরেনদা দুজনে মিলে কদমতলা থেকে ওষুধ আনতে
গেলেন। ওষুধ এনে শ্রীজীবনকৃষ্ণকে দিলেন। ওষুধের জল দেবার জন্য বাইরের টিউবয়েলের
টাটকা জল আনার জন্য বাইরে যাচ্ছেন এমন সময় জীবনকৃষ্ণ বলে উঠলেন, ওইখান (ঘরে রাখা কুঁজো)
থেকে জল দে। সৌরেনদা জল দিয়ে বললেন, এখন একটা খান। কাল একটা খাবেন। ওষুধ খাওয়ার
পর শ্রীজীবনকৃষ্ণ বললেন, আমাকে ৩২ বছর বয়সে দেখিয়ে দিয়েছে যে বাবুর কাছে যাবার
পথ বন্ধ। অর্থাৎ সচিদানন্দ গুরু লাভ না হলে কিছুই হবেনা। (ভক্তদের প্রতি) মানুষের
দেহ থেকে ঈশ্বর তেড়ে ফুঁড়ে বেরোয়, সেটা আপনা হতে বেরোবে। দেহস্থ চৈতন্য
সচিদানন্দগুরু রূপ ধারণ করে আপনার হতে বেরোবে। হাজার চোখ বুজে তপস্যা করলেও কিছুই
হবে না।
প্রসঙ্গঃ
শ্রীরামকৃষ্ণ—কোনও বাঁশের ফুটো ছোট। কোনও বাঁশের ফুটো বড়।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—এর মানে কি জানিস? বাঁশ মানে
মেরুদন্ড। কোন কোন ফুটো ছোট, কোনটা বড়। ঠাকুর কি কারুর মেরুদন্ড মাপতে গেছেন না তাঁকে
বলেছে? (মনোজবাবুকে দেখিয়ে—এঁকে শ্রীজীবনকৃষ্ণ দাদা বলে সম্বোধন করেন)—উনি যখন
এসেছিলেন, আগে থেকে আমাকে দেখিয়ে দিয়েছে মহাবীরের শক্তি থেকে এসেছেন। ওই জন্য
যেদিন থেকে এখানে এসেছেন সেই দিন থেকে এমনি এমনি করছেন (দুই হাত নাচিয়ে দেখালেন
অর্থাৎ রাম নাম কীর্তন করছেন)।
প্রসঙ্গঃ
শ্রীরামকৃষ্ণ—যা আছে ভাণ্ডে তাই আছে ব্রহ্মান্ডে।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—ও
হলোনা। বেদেও ওইরকম কথা আছে যে, মাকড়সার জাল তৈরি করে আর তার ভেতরে থাকে। ও তো
খালি ভাষা মাত্র। ও হলো না। প্রত্যেক মানুষটা জন্মগ্রহণ করে জগতকে বিক্ষেপ করে ও
তাতে থাকে।
সাতই অগাস্ট
১৯৫৭, বুধবার।
ঘরে অনেক ভক্ত বসে আছেন ও কথামৃত পাঠ চলছে।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ--(রাধুদার প্রতি)—আচ্ছা আমি আগে আগে
জন দি ব্যাপ্টিস্ট এর কথায় বলতাম “গড
দ্য ফাদার, গড দ্য সন, এন্ড গড দ্য
হোলি গোস্ট”।
এখন এই যে হোলি
ঘোস্ট মানে তোদের বলেছিলাম কারণ মনে আছে কি? রাধুদা চুপ করে থাকলে শ্রীজীবনকৃষ্ণ
অন্যদের প্রতি বললেন, আচ্ছা যে পারিস বল। আনন্দদা—সচ্চিদানন্দগুরু। শ্রীজীবনকৃষ্ণ
উত্তর শুনে খুব আনন্দিত হয়ে আনন্দদার প্রতি বললেন—তোর মনে আছে, কি আশ্চর্য! (অন্যদের
প্রতি) কেউ বলতে পারলি না, ওকে সকলে কাঁধে করবি। হোলি ঘোস্ট মানে নতুন জীবন। নতুন
জীবন মানে সচিদানন্দগুরু লাভ করা। লাভ করা মানে পরিবর্তিত হওয়া। আমার মনে যেন
একটা কি হচ্ছিল সেটা আজকে বেরুলো।
জিতেনদা বাইরে
রকটিতে বসে ছিলেন। তাকে ডেকে ঘরে বসালেন।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ (জিতেনদার
প্রতি)—জন দ্য ব্যাপ্টিস্ট-এর কথা আগে বলতাম মনে আছে?
জিতেনদা (মৃদুস্বরে)—হ্যাঁ।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—মানে কি?
জিতেনদা ঠিক উত্তর দেওয়ায়, শ্রীজীবনকৃষ্ণ বললেন,
শুনে ফেলেছে রে। (সকলের হাস্য)
এখন প্রায় রাত সাতটা বেজেছে। জিতেন বৈরাগী, বড়
হারু, গণেশ মান্না, কার্তিক অধিকারী, মদন কোলে, জলধর টাকি, জানকি পাল এসে উপস্থিত
হলেন।
কথামৃত পাঠ চলছে। ‘বিদ্যার আমি’, ‘ভক্তের আমি’, ‘দাস
আমি’ প্রসঙ্গে
শ্রীজীবনকৃষ্ণ
বললেন—আর একটা আমি আছে। ঠাকুর যখন বলেননি, তখন আমি বলব না। তোরা পারিস বল।
রামকৃষ্ণদা—ভগবানের
আমি আছে।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—হ্যাঁ,
ওটা কি?
রামকৃষ্ণদা—সচ্চিদানন্দগুরু।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—হ্যাঁ ঠিক হচ্ছে, ওটা ঠিক করে বল।
রামকৃষ্ণদা—আমি সব হয়েছি—ভগবানের আমি।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—হ্যাঁ ঠিক বলেছিস। (ভক্তদের প্রতি)
একটা নতুন কথা শুনে রাখ। মনে করে রাখবার চেষ্টা করবি। হনুমানের কথা প্রসঙ্গে বলে
উঠলেন হনুমানকে বড় ভক্ত বলে কেন? (এই বলে জিভ কেটে ফেললেন) এই কথা কোনদিন বলিনি।
এর মানে কি?
একজন ভক্ত—হনুমান
মহাবীর।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—হ্যাঁ
তাতো হল। (জাহাঙ্গীরের প্রতি) তুই বল তো জাহাঙ্গীর? (জাহাঙ্গীর সাহেব প্রায় ন’মাস ধরে
আসা-যাওয়া করছেন। অনেক অনুভূতি হয়েছে) এই কথা বলে শ্রীজীবনকৃষ্ণ বাইরে যাবার
জন্য দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন।
জাহাঙ্গীর—হনুমান মহাবায়ু।
জীবনকৃষ্ণ জাহাঙ্গীরের প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে
বললেন, মহাবায়ু উঠলে মানুষটা ভক্ত হয়ে যায় ও তার কাম থাকেনা। এই বলার সঙ্গে
সঙ্গে তিনি দরজার কাছে দাঁড়িয়েই সমাধিস্থ হলেন। সমাধি ভাঙলে বলছেন—হনুমান বড় ভক্ত ও মহাবীর এই দুটো আছে। মহাবীর বলে কেন?
দেহতে মহাবায়ু সমস্ত রিপুনিচয় ধ্বংস করতে করতে সহস্রারে ওঠে। (এই কথা স্পষ্ট
উচ্চারণ করতে পারলেন না, পুনরায় সমাধিস্থ হলেন) সমাধি ভাঙলে বললেন, জাহাঙ্গীরের
কেমন ধারণা হয়েছে দেখ। আমি দেখেছিলাম আমার হাতে চাকা। চাকা অর্থাৎ চক্র, মানে
ষটচক্র ও কুণ্ডলিনী আমার হাতে।
৮ই আগস্ট, ১৯৫৭
বৃহস্পতিবার—বেলা প্রায় সাড়ে চারটে হবে। অভয়বাবু শ্রীজীবনকৃষ্ণকে তাঁর দেখা একটি
স্বপ্নের কথা বলছেন—আমি একটা স্বপ্ন দেখেছি।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ (সহাস্যে) কি দেখেছিস বল না।
অভয়বাবু—আমি একটা নদীতে সাঁতার কাটতে কাটতে
যাচ্ছি। প্রথমটা একটু কষ্ট হচ্ছিল। তারপরে বেশ যাচ্ছি, যেতে যেতে খানিক দূরে একটা
ঘাট দেখতে পেলুম। সে ঘাটে তিনটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তারা যেন স্নান করবে। আমি
বললুম, তোমরা স্নান করবে, তা এসো। আমি তোমাদের স্নান করিয়ে দিচ্ছি। তারপরে আমি দু'জনকে বগলে করে নিয়ে জলে নাবলুম। এই সময় আমার
রেতঃপাত হতে যাবে, এমন সময় আমার ঘুম ভেঙে গেল।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—ও তোর কি করবে। গুরুকৃপা থাকলে,
ভগবানের কৃপা থাকলে অসম্ভব সম্ভব হয়। ও কিছু হবে না। তুই ভাবিসনি।
ইতিমধ্যে কলকাতা থেকে অফিস ফেরতা ভোলাদা, হীরুদা,
আনন্দদা, রামকৃষ্ণদা, ছোট নিতাই, সৌরেনদা, রায়দা (মৃত্যুঞ্জয়) ইত্যাদি অনেকে এসে
উপস্থিত হলেন। শ্রীজীবনকৃষ্ণ তাদের সকলের কুশল জিজ্ঞাসা করতে লাগলেন। ভক্তদের
প্রতি তিনি বলে উঠলেন আমি যার দেহতে উঠবো সে জীবন্মুক্ত। আমি জোর করে তাকে আমাতে
পরিবর্তিত করবো (এই বলেই তিনি আঃ বলে হুংকার দিয়ে লাফিয়ে উঠলেন), কোনো কথা শুনবো
না।
শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত পাঠ চলতে লাগলো।
প্রসঙ্গঃ শ্রীরামকৃষ্ণ—মনুষ্যত্বম্, মুমুক্ষুত্বম্,
মহাপুরুষসংশ্রয়ঃ।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—আমি এর কি ব্যাখ্যা দিয়েছি?
ভোলাদা—মহাপুরুষ যদি কেউ থাকে আমি তাকে দেহের
ভেতরে দেখব।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ (আনন্দিত হয়ে)—হ্যাঁ, ঠিক, লোকে মনে
করত যে, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা, কপালে তিলক, গেরুয়া কাপড় পরা সেই সাধু। তার
কাছে বসে লোকে মনে করে আমার মহাপুরুষের সঙ্গ হচ্ছে। দেখ না, এক আশ্রমে চল্লিশটা
গরু আছে। চল্লিশটা গরু থাকা মানে বিরাট একটা খাটাল। তাই শিষ্যরা গরুর পেছনে খাটে।
তারপর আরো খাটুনি আছে। মনে করে এই মহাপুরুষের সঙ্গ হচ্ছে।
১০ই অগাস্ট, ১৯৫৭ শনিবার। শ্রীজীবনকৃষ্ণ খাটের ওপর
পূর্বাস্য হয়ে বসে। ভক্তেরা কেউ মেঝেতে, কেউ খাটের ওপর বসে আছেন। রামদা, সৌরেনদা,
রামকৃষ্ণদা, আনন্দদা, জিতেনদা (চ্যাটার্জী) ইত্যাদি অনেকে আছেন। শনিবার বলে
সত্যবাবু, বিশ্বনাথবাবু, গোবিন্দদা, তুলসীবাবু, নগেনবাবু (চন্দ), মনোজবাবু,
সুধীনবাবু এঁরাও এসেছেন। ঘর প্রায় ভর্তি। বেলা প্রায় পাঁচটা হবে।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ (নগেন বাবুর প্রতি)—তুই আমার
বিষয় কি স্বপ্ন দেখেছিস বলতো।
নগেনবাবু—দেখছি,
আমি গঙ্গা স্নান করতে গেছি। স্নানের ঘাটটি পরিষ্কার। সামনে সবুজ রঙের ঘাসে আবৃত
একটি মনোরম মাঠে জামাকাপড় রেখে স্নানে নেমেছি। সেই সময় কয়েকজন লোক নৌকো হতে
নেমে যার যার গন্তব্য স্থানে চলে গেল। আমি স্নান সেরে সেই সবুজ মাঠে এসে দাঁড়িয়ে
দেখছি একজন ভদ্রলোক গায়ে লং ক্লথের পাঞ্জাবি, তিনি এক দৃষ্টিতে কিছুক্ষন আমার
দিকে তাকিয়ে থাকার পর আমাকে জিজ্ঞাসা করছেন, আপনাকে কি কোন শক্তি পরিচালনা করছেন? উত্তর করলাম, হ্যাঁ করছেন। প্রশ্ন করলেন, কে তিনি?
এই কথা শোনা মাত্র আমার ভাব হল। ভাবাবস্থায় উত্তর দিলাম, সৃষ্টি থেকে আরম্ভ করে
আজ পর্যন্ত যত অবতারের আবির্ভাব হয়েছে, সেই সকল অবতারের সমষ্টিগত শক্তি যে পুরুষে,
সেই পুরুষ শ্রীশ্রীজীবনকৃষ্ণ আমাকে পরিচালনা করছেন। একথা শোনার পরক্ষনই অচেনা
ভদ্রলোকটি কোথায় মিলিয়ে গেলেন। মনে হলো শুধু আমার এই কথা শোনার জন্যই কোন দেব-শক্তি
অজানা পুরুষের রূপ ধারণ করে এসেছিলেন। স্বপ্ন ভেঙে গেল।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ (ভক্তদের)—এর
মানে?
ফণীবাবু—সচ্চিদানন্দগুরু।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—হ্যাঁ,
সচ্চিদানন্দ গুরু। ওটা কি?
ফণীবাবু—আমরা
আপনাকে দেহেতে দেখছি। (জোর গলায়) জগতে এইরকম হয়নি।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—হ্যাঁ,
এবারে ঠিক হয়েছে। ওটা আগে বলতে হয়। কী আশ্চর্য, এইখানে না এসে দেখছে এসেও দেখছে,
এর মানে কে কি করবে? এক ভগবানই জানেন। (নগেনবাবুর প্রতি) তোকে আমার বিষয়ে দেখিয়ে
দিয়েছে।
প্রসঙ্গঃ শ্রীরামকৃষ্ণ
কেশব সেনকে বলছেন—ফিরে ফিরতি বুঝি একটা বড় কান্ড হবে।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—রাধু,
এর মানে বল।
রাধুদা—এখানকার
জন্য।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—না,
এখানে-টেখানে নয়। ভালো করে বল। রাধুদা পুনরায় একটা কথা বললেন।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—না,
ও নয়। (অন্যান্যদের
প্রতি) যে পারিস বল।
আনন্দদা—কেশব সেন
থাকবে।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—না,
আর কে পারিস বল।
জিতেন বৈরাগী—কেশব
সেন থাকবে আর অনেকে থাকবে।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—আচ্ছা,
আর কে পারিস বল।
জিতেনদা (চ্যাটার্জি)
একটা কথা বললেন। শ্রীজীবনকৃষ্ণ বললেন, ও হল না। শেষে ভোলাদা বললেন, কেশব সেন থাকবে
না। শ্রীজীবনকৃষ্ণ—হ্যাঁ , ঠিক। কেশব সেন
থাকবেনা।
১৩ই অগাস্ট, ১৯৫৭,
মঙ্গলবার। বেলা প্রায় পাঁচটা। শ্রীজীবনকৃষ্ণ খাটের ওপর ও রামদা, বঙ্কিমবাবু,
সুশীলবাবু, সত্যবাবু ইত্যাদি অনেকে মেঝেতে বসে আছেন। কথামৃত পাঠ চলছে। ইতিমধ্যে
অফিস ফেরতা অনেকেই একে একে এসে উপস্থিত হয়েছেন। সন্ধ্যা হলে অনেকেই শ্রীজীবনকৃষ্ণের
সঙ্গে ধ্যানে বসলেন। সঙ্গে সঙ্গে কথামৃত পাঠও চলছে। ধ্যান ভাঙলে শ্রীজীবনকৃষ্ণ
বললেন—আমি ধ্যান করতে করতে যেন ওকে জল আনতে বললুম (ভক্তদের একজনকে আঙ্গুল নির্দেশ
করে)। যেন ও জল নিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে আছে, তাই ধ্যানটা ভেঙে গেল। ভেঙে যাবার পর
মনে মনে ভাবছি কই আমার তো জল তেষ্টা পায়নি।
‘একং সদ বিপ্রা
বহুধা বদন্তি’ প্রসঙ্গে বললেন, এই কথা বেদে বলে গেছে কিন্তু এর মানে জানে না।
আন্দাজে ঢিল ফেলে গেছে। এর কোন মূল্য নেই। (ভক্তদের একে একে ১২/১৪ জনকে নির্দেশ
করে) তুই আমায় দেখেছিস, তুই আমাকে দেখেছিস? সকলেই হ্যাঁ বলাতে বললেন, শুধু ১২ ১৪টি
কেন? এইরকম হাজার হাজার লোকে দেখেছে। এখানে না এসে দেখেছে। ঈশ্বর এক আবার বহু। (নিজের
দেহেতে আঙুল দেখিয়ে) ঈশ্বর এক, (ভক্তদের দেখিয়ে) আবার বহু।
প্রসঙ্গঃ
শ্রীরামকৃষ্ণ—হিমালয়ের ঘরে পার্বতী জন্মগ্রহণ করলেন, আর পিতাকে তাঁর নানান রূপ
দেখাতে লাগলেন। হিমালয় বললেন, মা এসব রূপ তো দেখলাম। কিন্তু তোমার একটি ব্রহ্মস্বরূপ
আছে, সেইটি একবার দেখাও। পার্বতী বললেন, বাবা তুমি যদি ব্রহ্মজ্ঞান চাও, তাহলে
সংসার ত্যাগ করে সাধুসঙ্গ করতে হবে।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ (হাস্য করে)—হিমালয় যাব কি করে
রেলগাড়ি করে, না এরোপ্লেনে করে? (সকলের হাস্য)। নারে বাবা, ঠাকুর যা কথা বলেছেন
সব দেহতত্ত্বের কথা। হিমালয় মানে দেহ। পার্বতী অর্থাৎ ভাগবতী তনু। পার্বতী বলছে
সাধুসঙ্গ কর। ‘সাধুসঙ্গ করো’ এর মানে—সাধু
কে? একমাত্র ভগবান। ভগবান কোথায়? সহস্রারে। তাহলে সহস্রারে মনকে রাখতে বলেছে।
গিরিরাজ দর্শন করে মূর্ছিত হয়ে পড়ল। ব্রহ্মজ্ঞান হলো। মূর্ছিত মানে লয় হয়ে গেল।
১৪ই অগাস্ট, ১৯৫৭,
বুধবার। আজ জন্মাষ্টমী। সকাল প্রায় সাড়ে ছটা। শ্রীজীবনকৃষ্ণের কাছে পৌঁছে দেখি
তিনি একজন ভক্তের সঙ্গে কথা বলছেন। প্রণাম করার পর তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ভালো আছিস?’
উত্তর দিলাম, হ্যাঁ। জিজ্ঞাসা করলেন—জন্মাষ্টমী নাকি রে? এত সকাল সকাল? আবার বলছেন,
গায়কেরা আসছে না কেন, এতক্ষণ তো এসে পড়ে। হঠাৎ ফণীবাবু সম্বন্ধে বললেন—ফণী যখন
নতুন নতুন আসত, ওঃ কি বিরক্ত করত। হয়তো
পা দুটোকে মাথায় তুলে নিত। আর কি বকাত! রোজ আসত। এখন তো চুপ করে থাকে। তখন সকাল ছটা
সাড়ে ছটার সময় আসত। গত চারদিন ভক্তদের ছুটি থাকাতে তাঁকে অনর্গল বকতে হয়েছে।
ইতিমধ্যে সন্তোষবাবু (গুছাইত) উপস্থিত হলেন ও শ্রীজীবনকৃষ্ণকে ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রণাম
করে মেঝেতে এক পাশে বসলেন।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ (সন্তোষবাবুর
প্রতি)—একটু জিরিয়ে নে, তারপর কীর্তন করবি। কি হেঁটে এলি? না লাইন (রেল) দিয়ে
এলি? সন্তোষবাবুর বাড়ি কোনায়। হাওড়া
মোটর কোম্পানিতে চাকরি করেন। তিনি এইবার কীর্তন আরম্ভ করলেন।
কীর্তন—‘কহ রামকৃষ্ণ,
লহ রামকৃষ্ণ, জপ রামকৃষ্ণ নাম রে। যে ভজে রামকৃষ্ণের নাম সে হয় আমার প্রাণ রে’। একে
একে মদনদা, হারুদা, জিতেনদা (চ্যাটার্জী), নিশিবাবু, উমাপদবাবু, রামদা, সত্যবাবু এসে উপস্থিত হলেন।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ (মদনদার
প্রতি)—তুই গান কর।
মদনদা কৃষ্ণের অষ্টোত্তরশত নাম করতে লাগলেন। এরপর
হারুদা গান আরম্ভ করলেন। শ্রীজীবনকৃষ্ণ অতঃপর নিশিবাবুকে উদ্দেশ করে বললেন—আজ
জন্মাষ্টমী। মায়ের দুটো গান কর। নিশিবাবু দুটো শ্যামাসঙ্গীত গাইলেন। এরপর উমাপদবাবু
মহাপ্রভুর কীর্তন গাইলেন। গান সমাপ্ত হলে কথামৃত পাঠ আরম্ভ হল। জিতেনদা পাঠ করছেন।
আমাকে আজ হঠাৎ উঠতে হওয়ায়, শ্রীজীবনকৃষ্ণকে প্রণাম করতে বললেন—আসবি? আয়।
১৫ই অগস্ট, ১৮৫৭,
কদমতলার ঘরটিতে রামবাবু, বঙ্কিমবাবু, সত্যবাবু, সুশীলবাবু, আনন্দদা, রামকৃষ্ণদা,
নিতাই ঘোষ, সন্তোষ গুছাইত, জিতেন বৈরাগী, শৈলবাবু, ভোলাদা, হারু ঘোষ ও আরো অনেকে
মেঝেতে বসে আছেন। শ্রীজীবনকৃষ্ণ খাটের ওপর বসে। কথামৃত পাঠ চলছে।
প্রসঙ্গঃ
শ্রীরামকৃষ্ণ (মাস্টারের প্রতি)—এখানে অপর লোক কেউ নেই। সেদিন হরিশ কাছে ছিলো।
দেখলাম, খোলটি (দেহটি) ছেড়ে সচ্চিদানন্দ বাহিরে এল, এসে বললে, আমি যুগে যুগে অবতার!
তখন ভাবলাম, বুঝি মনের খেয়ালে ওইসব কথা বলছি। তারপর চুপ করে থেকে দেখলাম—তখন দেখি
আপনি বলছে, শক্তির আরাধনা চৈতন্য ও করেছিল।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—এর
মানে শক্তি পেত অর্থাৎ এক বছর যে কীর্তন করেছিলেন তা থেকে শক্তি আসত। কিরকম শুনবি?
নেচে নেচে কীর্তন করলে কুণ্ডলিনী খুব জোর ধরে। ধরে সহস্রারে যায়। আত্মা দেহব্যাপ্ত
হয়ে আছে। সেই আত্মা সহস্রারে গেলে একটা শক্তি পায়—অজ্ঞাতসারে আসে। এর মানে এই
নয় যে বৈকন্ঠ থেকে শক্তি এসে মহাপ্রভুর মাথায় বোঁ করে গর্ত করে ঢুকে পড়ল।
(জনৈককে লক্ষ করে) তুই কিছু স্বপ্ন দেখেছিস? ভক্তটি
বলল, হ্যাঁ দেখেছি। আমার বাড়িতে বিয়ের জন্য খুব চেষ্টা করছে। তাই স্বপ্ন দেখেছি
বিয়ে কেটে গেছে।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—কি বল না। ভক্তটি স্বপ্নের কথা বলায়
শ্রীজীবনকৃষ্ণ বললেন—না ও না। বিয়ে কেটে যাবার স্বপ্ন আছে। কি জানিস? আমি ছুটে
পালাচ্ছি। পেছন থেকে কেউ বলবে, পালাচ্ছে, সংসার থেকে পালাচ্ছে। তারপর সামনে একটা
খাল দেখতে পাওয়া যাবে। সেই খালটা এক লাফে পার হবে, তারপর সংসার কেটে যাবে।
(জিতেনদার
প্রতি) একটা ব্যষ্টি-চৈতন্য আছে আর একটা সমষ্টি-চৈতন্য আছে। ব্যষ্টি-চৈতন্য রূপ
ধারণ করে সমষ্টি-চৈতন্য ফুটে ওঠে। বুঝতে পারলি?
জিতেনদা ঘাড় নেড়ে
বললেন, না।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—বোঝা
বড় শক্ত।
কথামৃত পাঠ
চালিয়ে যেতে বলে তিনি একটু চুপ করে রইলেন। তারপর বলে উঠলেন, কেমন জানিস? যেমন
একটা মানুষের অসুখ হলো তারপর সেটা ছড়িয়ে গেল। তেমনি একটা মানুষের সচিদানন্দগুরু
লাভ হল, তারপর সেটা রূপ ধারণ করে জগতে ফুটে উঠল। বুঝতে পেরেছিস?
জিতেনদা মাথা
নেড়ে বললেন, হ্যাঁ।
এইবার ভক্তরা
ভাগবত মাথায় ধারণ করার পর শ্রীজীবনকৃষ্ণকে প্রণাম করে নিজ নিজ গৃহ অভিমুখে রওনা
হলেন।
২৪শে অগাস্ট, ১৯৫৭,
শনিবার, বেলা সাড়ে চারটে হবে। সত্যবাবু, সুশীলবাবু, বঙ্কিমবাবু, রামদা, ভোলাদা, হীরুদা,
সন্তোষ গুছাইত, শৈলবাবু, মৃত্যুঞ্জয় রায়, কালিবাবু, আনন্দদা, হারু ঘোষ, অনাথদা,
জিতেন চ্যাটার্জী, জাহাঙ্গীর সাহেব, রামকৃষ্ণদা ও আরো অনেকে উপস্থিত। ঘরে ঢুকে
শ্রীজীবনকৃষ্ণকে প্রণাম করে এক পাশে বসলাম। একটু পরে জলধর টাকি, গণেশ মান্না,
কার্তিক অধিকারী, মদনদা, জানকীদা, জিতেন বৈরাগী, অজিতবাবু, তুলসীবাবু, এসে উপস্থিত
হলেন।
মনোজবাবু এক
মাসের জন্য পুরী গেছেন। তাই শ্রীজীবনকৃষ্ণ জিতেন বৈরাগী, অনাথদা, অজিতবাবু ও ভোলাদাকে
বললেন—তোড়জোড় করে নে।
অনাথদা
হারমোনিয়াম বাজিয়ে প্রথমে স্তব করলেন। স্তবের সময় শ্রীজীবনকৃষ্ণ ও অনেকে ধ্যান
করতে বসলেন। স্তব শেষ হলে অনাথদা রামনাম শুরু করলেন। সঙ্গে করতাল বাজানো হচ্ছে।
ভক্তরা কেউ সঙ্গে গাইছেন, কেউ ধ্যান করছেন। গান শেষ হলে অনাথদা আবার স্তব আরম্ভ
করলেন। স্তব শেষে গান—কে তুমি এলে এবার
প্রেমিক উদাসীর ভানে।
এইবার ভোলাদা,
হিরুদা রচিত গান গাইছেন—জয় রামকৃষ্ণ, ভজ রামকৃষ্ণ, রামকৃষ্ণ, রাম রাম পতিত পাবন
তুমি নারায়ন জগদগুরু রামকৃষ্ণ। যখন গাইছেন—গুরুরূপে দেহে দেখা দিয়ে হরি ঘুচালে মনেরই
দ্বন্দ্ব, তখনই শ্রীজীবনকৃষ্ণ সমাধিস্থ হলেন। সমাধি ভাঙার পর ভোলাদাকে জিজ্ঞেস
করলেন—এ গান তুই করেছিস? ভোলাদা—না, হীরু করেছে। আরও অনেক গান তৈরি করেছে।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ (হীরুদার
প্রতি)—হ্যাঁরে হীরু তুই করেছিস? একদিন শোনাস না রে। হিরুদা ঘাড় নেড়ে বললেন,
শোনাবো। ভোলাদা এবার গান গাইছেন, ‘গুরু গৌরাঙ্গ রাধাগোবিন্দ ব্রহ্ম নারায়ন হরে
কৃষ্ণ রাম।
গান সমাপ্ত হলে শ্রীজীবনকৃষ্ণ ও সকলে বলছেন, হরি
বোল হরি বোল।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ
এইবার বলছেন—ও বেলা (সকালে) ধীরেনবাবুর সঙ্গে বেশ সচিদানন্দগুরুর কথা হলো। বললাম,
ভগবান এতদিন ধরে মানুষের হাতে ধর্ম ছেড়ে দিয়েছিল। কিন্তু তারপরে দেখলে মানুষ
ধর্ম বিক্রি ও ব্যবসা করছে। ওই জন্য ভগবান নিজে সচিদানন্দ গুরুরূপ ধারণ করে
মানুষের দেহেতে উদয় হয়ে শিক্ষা দিচ্ছেন। তাদের কন্ট্রোল করছেন। অর্থাৎ মানুষটা
ভগবানের পরিবর্তিত হচ্ছে। (কান্তিবাবুর প্রতি) একাদশী করিস?
কান্তিবাবু—না।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—কেন
রে? করিস না কেন? করবি, ও তো ভালো। এখন করবি না তো কখন করবি, বুড়ো বয়সে করবি? (কান্তিবাবুর
বয়স প্রায় ত্রিশ বত্রিশ) না হয় ভাতটা না খেলি। মিষ্টি ফিস্টি খাবি। ওতে মন শুদ্ধ
হয়। ভক্তি বজায় থাকে।
রাত হতে সকলে কথামৃত মাথায় ধারণ করে শ্রীজীবনকৃষ্ণকে
ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রণাম করে নিজ নিজ গৃহ মুখে ফিরলেন ।
২৫শে আগস্ট, ১৯৫৭, রবিবার।
সন্তোষদা, হীরুদা, জিতেনদা, সুধীনদা, ফণীদা, রাধুদা,
রামদা, আনন্দদা, রামকৃষ্ণদা, অনাথদা, রঘুদা, জয়দেবদা, দিলীপদা (দত্ত), দিলীপদা (ঘোষ),
নিতাইবাবু, আশুদা, রায়দা, সত্যবাবু, বঙ্কিমবাবু, ভকতজী, ইত্যাদি অনেক ভক্তরা শ্রীজীবনকৃষ্ণকে
ঘিরে মেঝেতে বসে আছেন। একঘর লোক। এখন বেলা প্রায় পাঁচটা। শ্রীজীবনকৃষ্ণ (সুধীনদার
প্রতি সহাস্যে) সুধীন এসেছ, এসো। আহা বাইরে বসছ! ভেতরে এসো। সুধীনদা বাইরের দিকে যাচ্ছিলেন, ঘরের ভেতরে এলেন। শ্রীজীবনকৃষ্ণ
(সুধীনদার প্রতি)—আচ্ছা দেখো, আমাদের কাল একটা কথা হয়েছে—ঠাকুর বলছেন, যে আদেশ পায়
সে লোক ডাকতে যায় না। এর মানে কী বল তো?
সুধীনদা—এখানেই
বোঝা যাচ্ছে। আর কোথাও নেই।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—হ্যাঁ
ঠিক বলেছ, আর কোন জায়গায় নেই। (ভক্তদের প্রতি) দেখেছিস সুধীনকে সাধে অমনি করি!
এই সময় দুটি নতুন ছেলে এলো। একটু পরে শ্রীজীবনকৃষ্ণ তাদের সঙ্গে কথা বলছেন।
কথামৃতে ঠাকুর বলছেন—সানাইয়ের পোঁ একজন ধরে আছে আর একজন সাত ফোকরে রং পরং তুলে
নিচ্ছে...রাধা আমার মান করেছে... ।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ (নতুন
ছেলেটির প্রতি)—আচ্ছা বাঁশিটা তোর দেহের কোনটা হতে পারে?
নতুন ছেলেটি—নাকের
সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—ওটা
একটুখানি হলো। বাঁশিটা অনেকে নাকের সঙ্গে তুলনা দেয় বটে, কিন্তু ওটা ঠিক নয়।
বাঁশিটা হলো তোর মেরুদণ্ডের প্রতীক। আর বাঁশিতে সাত ফোকর আছে তো? নতুন ছেলেটি—হ্যাঁ।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—সেটা
লিঙ্গ গুচ্ছ নাভি তিনটি, চতুর্থ ভূমি হৃদয়, পঞ্চম ভূমি কণ্ঠ, ষষ্ঠ ভূমি ভূমধ্য,
তারপর সপ্তম ভূমি সহস্রার, ঠিক হলো না? ঠাকুর বলছেন, ব্রাহ্মসমাজে খালি পোঁ ধরে
থাকা। অর্থাৎ লিঙ্গ গুহ্য নাভি, চতুর্থ ভূমি, পঞ্চম ভূমি ষষ্ঠভূমি এসবের সাধন
তাদের হয় না। একেবারে লাফ দিয়ে সহস্রারে উঠে যায় ও তাতেই হয়ে যায়। আর সাত ফোকরে
রং-পরং তুলে নিয়ে মানে লিঙ্গ গুহ্য নাভী চতুর্থ ভূমি, পঞ্চম ভূমি, ষষ্ঠ ভূমি, এসবের সাধন হয়ে সহস্রারে উঠে, আবার
চতুর্থ ভূমি থেকে ষষ্ঠ ভূমির মধ্যে থাকে। একেই বলছেন রং পরং তোলা অর্থাৎ ভগবানের
লীলা আস্বাদন করা।
(সুধীনদার প্রতি)—আচ্ছা
এখানে কী হচ্ছে বলো তো? দেখ না, উপেন বসে আছে, ও আমাকে আড়াই বছর আগে দেখেছে, এটা কী
বলো তো? দেখছে, আমি ওর সামনে জ্যান্ত দাঁড়িয়ে কথা বলছি। আরো অনেকে আছে। (ছোট)
খগেন এখানে আসবার আগে স্বপ্নে আমাকে দেখেছে। হীরুও এখানে আসবার আগে দেখেছে। দেখছে,
ও আমার কাছে বসে আছে। তারপরে কে যেন ওকে টেনে নিয়ে গেল... । আমি যখন শুনেছিলুম
তখন ওকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম তোর কি বিয়ে হয়েছে? ও বললো, হ্যাঁ।
(জনৈকের প্রতি)
তুই-ই আছিস, আর কেউ নেই। তুই-ই সব হয়েছিস। বেলুড় মঠে একবার আমি ও আরেকজন গঙ্গা
স্নান করে মন্দিরে যাবার সময় রাখাল মহারাজের মন্দিরে বসে দুজনে ধ্যান করলুম। আমার
ধ্যান ভাঙতে নাকের দিকে দেখলুম, গোটা জগতটাকে দেখতে পাচ্ছি, যদিও বিন্দুতে। বুঝতে
পারছি, সহস্রারে দর্শন করছি। ফিরে চেয়ে দেখি আমার সঙ্গীও চোখ চাইছে। আমি তার গায়ে
হাত দিয়ে বললুম কী দেখছিস? সেও ওই কথা বলল। আমি তখন বললুম সকলে দেখছেনা কেন? (ভক্তদের
প্রতি) আমি তাকে ছুঁয়ে আছি, তখন এক আত্মা। তাই দুজনের দর্শন হলো।
আচ্ছা স্বপ্নবৎ
হয়েছে তার প্রমান কী? (হাসতে হাসতে) দেখনা দুলাল ঘোষের দোকানে গিয়ে জিজ্ঞেস করগে
যা যে তোমার স্বপ্নবৎ অবস্থা? সেও বলবে, হ্যাঁ। কিন্তু ও বললে তো চলবে না। প্রমাণ
চাই। ক্ষিতীশ বল না।
ক্ষিতীশদা
ভাবছেন, এমন সময় ভোলাদা আস্তে আস্তে বলছেন, যার স্বপ্নবৎ অবস্থা হবে সে স্বপ্নেতে
পরিবর্তিত হবে। শ্রীজীবনকৃষ্ণ নিজেই বললেন—যার স্বপ্নবৎ অবস্থা হবে সে স্বপ্নে
ফুটে উঠবে। তাই তোরা আমাকে দেখছিস। ব্যষ্টি চৈতন্যের মূল্য কি! ও তো এত টুকুনি।
তাই এখানে সমষ্টি-চৈতন্য ফুটে উঠেছে।
৩০শে অগাস্ট, ১৯৫৭,
শুক্রবার। বেলা প্রায় পাঁচটা হবে। কদমতলার ঘরে সত্যবাবু, সুশীলবাবু, সৌরেনদা (ভট্টাচার্য),
আনন্দদা, ক্ষিতীশদা, হারু ঘোষ, মুরারিদা, ভোলাদা, নিতাইবাবু (ঘোষ), অসীমদা, রামকৃষ্ণদা,
প্রভাতবাবু, জাহাঙ্গীর সাহেব ইত্যাদি উপস্থিত আছেন। রায়মশাই কথামৃত পাঠ করছেন।
প্রভাতবাবু (শ্রীজীবনকৃষ্ণের
প্রতি)—আমি যখন ধ্যান করি, তখন সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ি কেন? যতবার ভালো করে বসি
ততোবারই ঝুঁকে পড়ি।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—ও
তো ভালো। কুণ্ডলিনী জোর ধরেছে তাই ওইরকম হচ্ছে।
প্রভাতবাবু—আমি
কী করবো?
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—তুই
কী করবি? তোকে কিছু করতে হবে না। সন্ধ্যে হয়ে এসেছে। শ্রীজীবনকৃষ্ণ বললেন—নে আয়
সকলে ধ্যান করি। সকলে এইবার ধ্যানে বসলেন। প্রভাতবাবু ধ্যান করতে করতে ক্রমাগত
ঝুঁকে পড়তে লাগলেন। শ্রীজীবনকৃষ্ণের ধ্যান ভাঙলে প্রভাতবাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন—কুণ্ডলিনী
খুব জোর ধরেছে। কুণ্ডলিনী সাম্যভাব নিয়ে যদি জাগে তাহলে খুব ভালো। তা না হলে
খারাপ। (সত্যবাবুর প্রতি) তখন তখন বলতুম মনে আছে? সত্যবাবু—হ্যাঁ।
কথামৃত পাঠ
চলছে। শ্রীরামকৃষ্ণ বলছেন, কামিনী কাঞ্চন ত্যাগ করলে ব্রহ্মানন্দ।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ
(ক্ষিতীশের প্রতি)—কামিনী কাঞ্চন ত্যাগ করলে ব্রহ্মানন্দ, এর মানে কী? ক্ষিতীশদা চুপ
করে থাকাতে ভোলাদা বললেন, লিঙ্গ গুহ্য নাভি থেকে মন সরিয়ে নিয়ে সহস্রারে রাখলে
ব্রহ্মানন্দ।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—হ্যাঁ
ঠিক। (ভোলাদার প্রতি) আচ্ছা আগে আমার কি হতো? মুহুর্মুহু সমাধি হতো তো? কিন্তু এখন আর হয় না কেন? না, ওই জিনিসটা দেহে
এমন হয়ে যাবে যে আর সমাধি (এই কথা উচ্চারণ করার সঙ্গে সঙ্গে সমাধিস্থ হয়ে গেলেন।
তারপরেই কথাটা শেষ করলেন) হবেনা। (সত্যবাবুর প্রতি)—এ বড় উঁচু কথা।
প্রভাতবাবু
প্রায় মাস দেড়েক ধরে আসা-যাওয়া করছেন। শ্রীজীবনকৃষ্ণকে জিজ্ঞাসা করলেন—তাহলে আমি ধ্যান করবো না?
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—না,
তোকে কিছু করতে হবে না।
প্রভাতবাবু (পুনরায়)—তাহলে
আমার কী হবে? আমি যদি ধ্যান না করি?
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—তোকে
কিছু করতে হবে না। তুই কী করবি? কিছু করিস নি।
একসময় কথা প্রসঙ্গে
বললেন, দেখ, শ্মশান দেখলে খুব ভালো। তার পুরনো সংস্কার চলে যায়। সহস্রারের সেই
সেলগুলো জ্বলে যায়। কিন্তু পুড়ে গেলে কী হবে? আবার যে কে সেই।
কথামৃত পাঠ
চলছে, ‘বিষ্ঠার পোকা বিষ্ঠাতে ভালো থাকে...’
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—আচ্ছা
ঠাকুরের এই যে সব কথা, কেশবের মতো লোক বুঝতে পারেনি, আর কাপ্তেন এর মত লোকও বুঝতে
পারেনি। কাপ্তেন হঠযোগ করত। ঠাকুর যেমন বলছেন বিষ্ঠার পোকা বিষ্ঠাতে ভালো থাকে,
তাকে যদি ভাতের হাঁড়িতে রেখে দাও সে হেদিয়ে হেদিয়ে মরে যাবে। কেশব সেনের মতো লোক শুনে
হো হো করে হাসতে লাগল। তার কী মানে করল? কিছুই নয়। আচ্ছা, ঠাকুরকে যদি বলত, এর
মানে কী, ঠাকুর কিছুই বলতে পারতেন না। যদি বলতে পারতেন তাহলে দেহতত্ত্বে বলতেন।
বোঝা যাচ্ছে তিনি কথা বলেননি, ভগবান তাঁর মুখ থেকে কথা বলছেন। আমরা ধরতে পারি না।
তিনি বলছেন, আমি যন্ত্র তিনি যন্ত্রী, আমি ঘর তিনি ঘরনী, আমি রথ তিনি রথী। এর মানে
নয় যে তিনি আমাদের কাছে দীনতা দেখাচ্ছেন, তিনি সত্য কথা বলছেন।
প্রসঙ্গঃ শ্রীরামকৃষ্ণ—ভক্ত ভগবান না হলে থাকতে পারে না, ভগবান ভক্ত
না হলে থাকতে পারেন না। শ্রীজীবনকৃষ্ণ—ভগবান ভক্ত না হলে থাকতে পারেন না, এর মানে কী?
সত্যবাবু—দেহ
না হলে ভগবান থাকতে পারেন না।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—হ্যাঁ,
দেহ না হলে ভগবান প্রকাশ হবেন কী করে? মানুষের দেহ না হলে ভগবান আর কোথাও প্রকাশ হন
না। এই যে ঠাকুর বলছেন—রামচন্দ্র লক্ষণকে বলছেন, দেখ ভাই হাতী এত বড় জন্তু, সে
কিন্তু ঈশ্বর চিন্তা করতে পারেনা।
প্রসঙ্গঃ গান—পঙ্কে
বন্ধ করো করী। পঙ্গুরে লঙ্ঘাও গিরি... ।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—এই
যে বলছেন, পঙ্কে বদ্ধ করো করী, করী এখানে হচ্ছে মন। মন জলে। জল অর্থাৎ প্রাণময় কোষ।
মন প্রাণময় কোষে বদ্ধ থাকে। পঙ্গুরে লঙ্ঘাও গিরি—এটা কত দূর? চতুর্থ ভূমি থেকে ষষ্ঠভূমি
পর্যন্ত। সহস্রারে গিরি লঙ্ঘায়—এর মানে হচ্ছে এই।
৩১শে অগাস্ট, ১৯৫৭,
শনিবার।
বেলা প্রায় পাঁচটা হবে। আজ অনেকেরই অবসর রয়েছে।
তাই অফিস ফেরতা তাড়াতাড়ি এসেছেন। সত্যবাবু, বঙ্কিমবাবু, সুশীলবাবু, ভোলাদা, রাধুদা,
হীরুদা, সন্তোষদা (গুছাইত), জিতেনদা (চ্যাটারজি), শৈলবাবু, ফণীদা, জাহাঙ্গীর সাহেব,
আনন্দদা, হারু ঘোষ, সৌরেনদা, ক্ষিতীশদা, রামকৃষ্ণদা, আশুবাবু, সত্যবাবু, মনোজবাবু,
ধীরেনদা (বনগাঁ), দিলীপদা (ঘোষ), গোবিন্দদা ও আরো অনেকে ঘরের মেঝেতে বসে আছেন।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ খাটের ওপর বসে।
দুজন নতুন লোক
এসেছেন। শ্রীজীবনকৃষ্ণ তাঁদের সঙ্গে কথা বলছেন।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—দেখ,
প্রত্যেক মানুষটা জোচ্চোর। (ক্ষিতীশদার দিকে চেয়ে) ক্ষিতীশ এই কথা বললুম, আমাকে
বুঝিয়ে দে। ক্ষিতীশদা চুপ করে থাকাতে নিজেই বলছেন, কেন রে? সে নেতি নেতি শুদ্ধ আত্মা,
কিন্তু সে ভাবে আমি হাড় মাসের দেহ। (সকলে এই কথা শুনে নিস্তব্ধ হয়ে বসে আছেন)। জানিস
আমার কী মনে হচ্ছিল, শুনবি? মনে মনে জগতের লোককে বলছি ওগো তোমরা ধর্মের জন্য
হুটোপাটি কোরো না। ভগবান তোমাদের ধর্মের ভার নিজে গ্রহণ করেছেন।
ঠাকুর বলছেন, ‘দেখলাম—খোলটি
(দেহটি) ছেড়ে সচ্চিদানন্দ বাইরে এল, এসে বললে আমি যুগে যুগে অবতার। তখন ভাবলাম,
বুঝি মনের খেয়ালে ওইসব কথা বলছি। তারপর চুপ করে থেকে দেখলাম—তখন দেখি আপনি বলছে শক্তির আরাধনা চৈতন্যও করেছিল।’—ঠাকুরের
দেহ থেকে সচ্চিদানন্দ বেরুলো, এর মানে কি রে বাবা? সচিদানন্দ একটা পোঁটলা না রে?
ঠাকুরের দেহ থেকে আর একটা জলজ্যান্ত ঠাকুর বেরুলো, বেরিয়ে ঐসব কথা বলল। আর চৈতন্য
শক্তির আরাধনা করেছিল মানে, চৈতন্য যে এক বছর কীর্তন করেছিল, তা থেকে শক্তি আসত। কী
রকম শুনবি? নেচে নেচে কীর্তন করলে কুণ্ডলিনী খুব জোর ধরে, ধরে সহস্রারে যায়।
আত্মা দেহব্যাপ্ত হয়ে আছে সেই আত্মা সহস্রারে যায়। গেলে একটা শক্তি পায় অজ্ঞাতসারে।
(সুধীনদার
প্রতি)—সুধীন একটু তাড়াতাড়ি আসবে তো! কত কথা শুনতে পাও না। (সুধীনদা চুপ করে থাকলেন) আমার মনে
একটা বড় কথা ফ্লাশ করছে। সেটা কাল রাত হোক, আজ সকালেই হোক, ঠিক মনে পড়ছে না, যাই
হোক বলি। আচ্ছা মসেসের দেহ থেকে ভগবান কথা বলতো। মসেস লোকদের বলতো আমি ভগবানের
সঙ্গে কথা কই। লোকেরা বিশ্বাস করত না। তাই মসেস একটা পাহাড়ে উঠে বলতো ভগবান, আমার
কথা বিশ্বাস করে না, তুমি ওদের দেখা দাও। ভগবান তাই করল। একটা পাহাড়ে উঠে অনেক
লোকে দেখল, সেটা কি বলতো? (এই বলে শ্রীজীবনকৃষ্ণ জিভ কাটলেন। সুধীনদা একটা কি উত্তর
করলেন।) হ্যাঁ, মসেসের ওটা কারণ শরীর।
১লা সেপ্টেম্বর,
১৯৫৭, রবিবার। বিকেল সাড়ে পাঁচটা। শ্রীজীবনকৃষ্ণ খাটে বসে, ধীরেনবাবু, সত্যবাবু,
ধীরেনদা (বনগাঁ), গণেশ মান্না, চৌধুরীদা, খগেনবাবু, গোবিন্দদা, লক্ষীবাবু, পঞ্চুদা,
বিমলবাবু, তড়িৎবাবু, বিষ্টু পাল, ও আরো অনেকে বসে আছেন।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ
বলছেন, যার সচিদানন্দ গুরু লাভ হয়েছে তারই সন্ন্যাস হয়েছে—ওই কথা মনে মনে ফুট
কাটছিল। আমি ভাত খেতে খেতে মনে করছিলুম যে, যার সচিদানন্দগুরু লাভ হয়েছে তারই
সন্ন্যাস হয়েছে। (সুধীনদার প্রতি) দেখ সুধীন, অবতারতত্ত্ব একটা আছে; আর একটা আছে
ভগবানত্ব। দেখনা, ঠাকুর অবতার তো। তিনি বলছেন, আমি দেখছি যে তিনি সব হয়েছেন।
কিন্তু আমি দেখছি (ঘরের সকলকে দেখিয়ে) আমি সব হয়েছি। ওই জন্য আমাকে খামচি কেটে
কথা বলতে হয়।
চৌধুরীদা (শ্রীজীবনকৃষ্ণের
প্রতি)—আমি একটা স্বপ্ন দেখেছি।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—কী
বল না।
চৌধুরীদা—আমাদের
পাড়া দিয়ে আপনি যাচ্ছেন। পেছনে অনেক লোক কী বলছে। তারপর আপনি তাদের একটা কথা বলে
দিলেন, তারা চুপ করে গেল। আর একজনও এসে আপনাকে কী সব বলছে। আপনি তাকেও একটা কথা বলে দিলেন, সেও চুপ করে গেল।
তারপর কিছুটা হেঁটে গিয়ে একটা পুকুরে গিয়ে ডুব দিতে একটা বেলুন উঠল।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ (সুধীনদার
প্রতি)—সুধীন এর মানে কী বল। সুধীনদা চুপ করে থাকাতে ক্ষিতীশদার প্রতি হাসতে হাসতে
বললেন—ক্ষিতীশ তুই বল, তোর মামা তো পারল না। এইবার ভাগ্নেকে দেখি। (ক্ষিতীশদা চুপ
করে থাকাতে)—ভগবান যখন আসেন তখন কেউ চিনতে পারে না। মনে করে যে হাড় মাসের দেহ, এই ভগবান!
কই ভগবানের চারটে হাত নেই। ওই জন্য স্বপ্নে ওইরকম করছিল।
কথামৃত পাঠ
চলতে লাগল।
একটু পরে শ্রীজীবনকৃষ্ণ বলে উঠলেন—গুরু ইষ্টতে লীন
হয় তো? কিন্তু এখানে ইষ্ট গুরুরূপ ধরে ফুটে ওঠে। আর একটা কথা শুনে রাখ। আহা, কোথাও
শুনতে পাবি না। ইষ্ট কিন্তু আত্মা সাক্ষাৎকার করাতে পারে না, তাই জন্য গুরু আসে আত্মা
সাক্ষাৎকার করাবার জন্য।
আচ্ছা, ঠাকুর
অনবরত মাকে দেহেতে দেখছেন ও মায়ের সঙ্গে কথা বলতেন। একটা মানুষ যদি ভগবানকে দেখে
ও তার সঙ্গে কথা বলে তাহলে মানুষটা হাতে স্বর্গ পেল না? এর জন্য এখানে সচ্চিদানন্দগুরু।
আর দেখ না প্রত্যেক মানুষটা দেখছে (ঘরে সকলকে দেখিয়ে)।
ঠাকুর বলছেন ধুনুরির
হাতে পড়লে তুঁহু তুঁহু করে। (সুধীনদার প্রতি) দেখো না, একটা সামান্য কথা সেটাও যোগের।
ধুনুরি অর্থাৎ ভগবান। তাঁত মানে সুষুম্না।
(হীরুদার
প্রতি) হীরু, তুই কি স্বপ্ন দেখেছিস বল তো? শোনো সুধীন।
হীরুদা বলতে লাগলেন—স্বপ্ন
দেখছি আপনি আর ঠাকুর দাঁড়িয়ে আছেন। ঠাকুর বলছেন আমি এক হাত ছেড়ে দিয়ে নেচেছিলাম।
আপনাকে দেখিয়ে বলছেন, এ দু হাত ছেড়ে দিয়ে নাচছে।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—সুধীন
এর ব্যাখ্যা বল।
এর মধ্যে হঠাৎ
অন্য প্রসঙ্গ হওয়াতে এই কথা চাপা পড়লো। একটু পরেই স্মরণ হওয়াতে শ্রীজীবনকৃষ্ণ সুধীনদাকে
বললেন—সুধীন তুমি ওর মানে বললে না? সুধীনদা হাসতে হাসতে বললেন—ঠাকুরের ঘটিবাটি ছিল ও পরিবার ছিল।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ (একটু
গম্ভীর হয়ে)—হ্যাঁ, ঠিক বলেছো। আর আমার ঘটি বাটি নেই।
৩রা সেপ্টেম্বর,
১৯৫৭, মঙ্গলবার। বেলা পাঁচটা।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ
খাটের ওপর ও কয়েকজন মেঝেতে বসে আছেন। এর মধ্যে হীরুদা এসে প্রণাম করে ঘরের একপাশে
বসলেন। একটু পরে শ্রীজীবনকৃষ্ণকে জিজ্ঞাসা করলেন, কীর্তন করব?
শ্রীজীবনকৃষ্ণ
ইঙ্গিত করলে হীরুদা হারমোনিয়াম সহযোগে গান ধরলেন আর একজন কর্তাল বাজালেন—নরদেহ
মাঝে প্রকাশিয়ে তুমি... । এর মধ্যে শ্রীজীবনকৃষ্ণ মেঝেতে নেমে এলেন ধ্যান করবেন
বলে। কীর্তনের সঙ্গে অনেকেই গাইছেন। শেষে ‘গুরু গৌরাঙ্গ রাধে গোবিন্দ ব্রহ্ম
নারায়ণ হরে কৃষ্ণ রাম’ এই গান গেয়ে শেষ হলো। গান শেষে শ্রীজীবনকৃষ্ণ ও সকলে
ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রণাম করলেন। এইবার অনেকেই একে একে আসতে আরম্ভ করেছেন। প্রভাতবাবু
এসে শ্রীজীবনকৃষ্ণের পায়ে প্রণাম করতে বলে উঠলেন—থাক আর পা ধরিসনি। বাবা বোস। কেমন
আছিস?
প্রভাতবাবু—ভালো,
কিন্তু বসতে পারছি না।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—হ্যাঁ,
এখন কুণ্ডলিনী খুব জোর ধরেছে। আমি যখন আগে এক্সারসাইজ করতে যেতুম তখন একটা লোক
আমাকে বলল আপনি খুব এক্সারসাইজ করেন তো? আমি বললাম, হ্যাঁ। লোকটা ভালো ছিল। বিয়ে টিয়েও
করেনি। আবার বললে আপনার কুণ্ডলিনী জাগ্রত হয়েছে। আমি বললুম আপনি ধরতে পেরেছেন?
তবে বলি শুনুন আমি যে এক্সারসাইজ করি, কুণ্ডলিনী জাগ্রত হলে যে জার্ক হয় তাকে
কন্ট্রোল করার জন্য। কিন্তু তা হয় না।
জাহাঙ্গীর
সাহেব জাতে পারসী। এখানে মাস দশেক ধরে যাতায়াত করছেন। আগে অনেক সাধু দেখেছেন,
কিন্তু এইরকম কোনও জায়গায় দেখতে পাননি। তিনি দ্য গস্পেল অফ শ্রীরামকৃষ্ণ পাঠ
আরম্ভ করলেন। পাঠ শেষে তড়িৎ বাবু এইবার হিন্দি কথামৃত পাঠ করছেন। কেননা ভকতজী হিন্দিভাষী,
মহম্মদজীও অবাঙালি মুসলমান। তাঁরা দিনকয়েক আসা-যাওয়া করছেন। তাদের জন্য হিন্দি কথামৃত
পাঠ হয়।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ (ভকতজীকে
দেখিয়ে)—এ পাতাল ফোঁড়া শিব, এখানে আসবার আগে সাতবার আমাকে দেখেছে। যারা এখানে এসে
আমাকে দেখেছে তাদের থেকে এদের জোর আছে। প্রভাতবাবু ধ্যানে বসেছেন। তাঁর শরীর খালি
সামনের দিকে ঝুঁকে পড়াতে শ্রীজীবনকৃষ্ণ প্রভাতবাবুকে দেখিয়ে ক্ষিতীশদাকে বললেন—ক্ষিতীশ
এর কী হচ্ছে বল দিকিনি? ক্ষিতীশদা কিছু না বলায়, বললেন—যোগ সমাধি হচ্ছে।
ক্ষিতীশদা—উন্মনা
সমাধি নয় তো?
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—না,
আরও ভেতরে গেলে দেহটা এমন করবে না।
প্রভাতবাবু বললেন,
আজকে আমার বড় আনন্দ হল। শ্রীজীবনকৃষ্ণ—হ্যাঁ, তা হবে, কেন না সহস্রারে মন উঠে
গেলে মানুষটা আনন্দে থাকে।
একসময় কথা
প্রসঙ্গে বলে উঠলেন, ঠাকুর যা কথা বলেন সব ঘুরিয়ে বলেন। দেখ না যেমন বলছেন—শ্যামা
মা কালো কেন? দূরে তাই কালো। কাছে গেলে কোন রং নেই। এই কথা তো বলছেন। কালো মানে কি?
ও নির্গুণ ব্রহ্ম। আবার বলছেন—কাছে আসলে শ্যামা মা আবার ঘাস ফুলের রং। সহস্রার থেকে
ষষ্ঠ ভূমিতে আসলে ওই রূপ দর্শন। আমি অত ঘুরিয়ে বলিনা। আমি চাষা, এক চোপে কাটি (বলে হাসতে লাগলেন)। এইবার গম্ভীর হয়ে বললেন—হ্যাঁ
রে, আমি ঠাকুরের কাছে বর চেয়েছিলুম। আমি যাকে বলব এক কথায় তার ভগবান দর্শন হবে।
কিন্তু তা হলো না। হলো সচিদানন্দগুরু। সচ্চিদানন্দগুরু মানুষের দেহ ফুঁড়ে বেরুলো।
ভোলাদা কথামৃত
পড়ছেন। শ্রীজীবনকৃষ্ণ—(জনৈকের প্রতি) এই দেখ তোর এইটা হয়েছে। (ভোলাদার প্রতি) ঐখানটা
পড় তো।
ভোলাদা পড়তে লাগলেন যেখানে শ্রীরামকৃষ্ণ বলছেন
ব্রহ্মজ্ঞান হলে সবই তিনি হয়েছেন বোঝা যায়। জীবজগৎ চতুর্বিংশতি তত্ত্ব হয়েছেন
বোঝা যায়। শ্রীজীবনকৃষ্ণ (ভক্তটির প্রতি)—তুই একটা বাগানে দেখছিস যে আমি সব
হয়েছি, গাছ ফুল সব হয়েছি না?
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—তোর
উঁচু সাকার ঘর, আর ব্রহ্মজ্ঞান হয়েছে।
৪ঠা সেপ্টেম্বর,
১৯৫৭, বুধবার। বেলা পাঁচটা।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ
জানলার কাছে মেঝেতে বসে আছেন। ঘরে খুব গরম। জানালার কাছে বসে একটু হাওয়া লাগে,
তাই বসেছেন। রায়মশাই কথামৃত পাঠ করছেন। ভক্তেরা একে একে এসে শ্রীজীবনকৃষ্ণকে
প্রণাম করে বসলেন। শ্রীজীবনকৃষ্ণ সকলের কুশল জিজ্ঞাসা করে বসতে বললেন। তিনি এইবার
খাটের ওপর গিয়ে বসলেন ও বললেন, সুশীলবাবু আসুন, বঙ্কিমবাবু সত্যবাবু আপনারা সব
উঠে আসুন।
এইবার ভোলাদা
পাঠ করছেন। কিছুক্ষণ পর শ্রীজীবনকৃষ্ণ ও অনেকে ধ্যান করতে বসলেন। ধ্যান ভাঙ্গার পর
বলছেন—কেউ যদি স্বপ্নে ছাদ দেখে তাহলে তার ঈশ্বরলাভ হয়। আর এর থেকে বড় আছে। ওই
যে সৌরেনের হয়েছে—ওর ভগ্নিপতিকে বলে দিয়েছে যে সৌরেনের ঈশ্বরলাভ হয়েছে। রামের ঈশ্বর
লাভ হয়েছে—ও দেখছে সিদ্ধি খেয়েছে। হারুদার ঈশ্বর লাভ হয়েছে—দেখছে, ও একটা জাল
পুকুরে ছড়িয়ে বসে আছে। আরো অনেকে আছে। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলছেন—জগতলীলা এর
একটা মানে হয়, তিনি জগতে ফুটে উঠে লীলা করছেন। আর একটা মানে আছে—তিনি মানুষের দেহে
সচিদানন্দগুরু রূপে ফুটে উঠে লীলা করছেন। এইতো সত্যবাবু বসে আছেন। এঁর সচ্চিদানন্দগুরু
পেতে দেড় বছর দেরি লেগেছে। ইনি বেলুড়মঠে মন্ত্র নিয়েছিলেন ও মহাপুরুষ মহারাজের
শিষ্য ছিলেন। তাই এত দেরি হয়েছিল। সমস্ত সংস্কারটাকে কাটতে হয়েছিল তো। যখন আমাকে
দেখে এসে বললেন তখন আমি হাতজোড় করে বললুম, আপনি আমাকে বাঁচালেন, আমাকে একটু
ভাবিয়েছিল। আমি মনে করতুম (নিজের দেহে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে) এতে বুঝি কোনো
ত্রুটি আছে।
দ্যাখ, আজ
সকালে ভবানী এসে আমাকে বলছে আপনি এক জায়গায় চলুন। খুব নির্জন স্থান। স্টিমার করে
নিয়ে যাব। আমি চুপ করেছিলাম। আবার নিজেই বলছে, গভর্নমেন্টের স্টিমার যাবে না। আমি
লঞ্চ ভাড়া করবো। খুব সুন্দর জায়গা। চলুন না ঘুরে আসি। তখন আমি বললুম, ও গুরুগিরি
হবে। তখন আবার চুপ করে।
(অম্বর বাবুর
প্রতি সহাস্যে) দ্যাখ পম্বর, এই যে ঠাকুর তর্পণ করতে গিয়ে জল হাত থেকে গলে গেল
এখন ক্ষুদিরাম চাটুজ্জে মশাইয়ের কি হবে বল দিকিনি? তিনি স্বর্গে হা-জল হা-জল করবেন
তো? এসব কী? অম্বরবাবু—মিথ্যাচার।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ (গম্ভীর
হয়ে)—হ্যাঁ ঠিক। আবার বলছেন যাগ-যজ্ঞ তন্ত্র মন্ত্র পুজো এসব করার কোন দরকার নেই।
এসব তাহলে কী?
অম্বরবাবু—এসব
মিথ্যাচার।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—হ্যাঁ,
তাই এসব উল্টে দিয়েছেন, অর্থাৎ এসব করে ভগবানকে পাওয়া যায় না। (সকলের প্রতি)
একটা লোক এসেছিল ১টার পরে। সে বলল কী করে ভগবান দর্শন হয়? ঐরকম কেউ বলেনি, প্রথম
শুনলুম। আমি তাকে বললুম, তোর ভগবান দর্শন হয়ে যাবে। (অম্বরবাবুর প্রতি) ঠাকুর ঠিক
বলেছেন, শ্রাদ্ধ, মন্ত্র, তর্পণ এসব করে কিছু হয় না। তাই মিথ্যাচার। দ্যাখ আমি ধ্যানে
এক মাস ধরে (প্রায়ই) একটা জিনিস দেখছি যে অসীম মুখে আঙ্গুল ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
তোরা পারিস এর মানে করিস, করে আমাকে পরে বলিস। আমি মনে করেছিলাম যে পঙ্গদের মধ্যে
বলবো। বিকেলে বলেছি।
এখন ন’টা বেজেছে।
ভোলাদা পাঠ শেষ করলেন। শ্রীজীবনকৃষ্ণ বলছেন, জয় রামকৃষ্ণ জয় রামকৃষ্ণ জয় সচ্চিদানন্দগুরু
জয় গুরু জয় গুরু জয় গুরু মহারাজ, তোদের সকলকে প্রণাম। (ধীরেনবাবু স্বপ্নে
দেখেছেন যে শ্রীজীবনকৃষ্ণ—‘তোদের সকলকে প্রণাম’, এই কথা বলে সকলকে শক্তি দান করেন)।
সোমবার ৯ই সেপ্টেম্বর,
১৯৫৭। বেলা পাঁচটা। শ্রীজীবনকৃষ্ণ ঘরের মেঝেতে বসে আছেন। সত্যবাবু, সুশীলবাবু, বঙ্কিমবাবু,
উপেনবাবু, বলাইবাবু ও নারাণ সকলেই মেঝেতে বসে আছেন। পি পি সিংহরায় মশাই কথামৃত পাঠ করছেন। চারজন
নতুন লোক এলেন ও আসন গ্রহণ করলেন। শ্রীজীবনকৃষ্ণ তাদের সঙ্গে সহাস্যে কথা বলছেন।
নতুন একজন ভক্ত
(শ্রীজীবনকৃষ্ণের প্রতি)—ভগবান দর্শন কী করে হবে? আমাদের কি ভগবান দর্শন হবে?
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—হ্যাঁ,
কেন হবে না? তাঁকে জোর কর না। তিনি আপনার লোক। জোর কর, দরকার হয় তাঁকে দুটো ঘুষি
মারবি (এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে বলে তাঁর শরীরটা লাফিয়ে উঠল)। তাঁর ঐ কাজ। জোর
করে বল যে ঠাকুর আমাকে দেখা দাও, ঠাকুর রে!
নতুন ভক্তটি—আমি
খালি দর্শন করব। বইতে কী আছে আমি তা বুঝতে চাইনা।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—আহা,
কথামৃতের কথা বুঝতে পারা যায় না। ঠাকুর বলছেন, বিষ্ঠাকুড়ের পোকা বিষ্ঠাতে বেশ
থাকে, তাকে যদি ভাতের হাঁড়িতে তুলে রাখে, তাহলে সে হেদিয়ে হেদিয়ে মরে যাবে।
আচ্ছা, বিষ্ঠাকুড়ের পোকা, ভাতের হাঁড়ি, এসব কী বল দিকিনি! বিষ্ঠাকুড় মানে লিঙ্গ গুহ্য
নাভি। ‘পোকা’ অর্থাৎ সাধারণ জীব। তাকে যদি ভাতের হাঁড়িতে রাখা যায়, সে হেদিয়ে হেদিয়ে
মরে যাবে। ‘ভাতের হাঁড়ি’ মানে সহস্রার। ভাত অর্থাৎ ব্রেনের এক একটা সেল। সাধারণ
জীবের মন যদি সহস্রারে ওঠে, তাহলে তার সমাধি হবে। আর সে একুশ দিনে মরে যাবে।
এদিকে সন্ধ্যায়
প্রায় ছ’টা বাজল। অফিস ফেরত ভক্তরা আসছেন। সৌরেন ভট্টাচার্য, রামকৃষ্ণ ঘোষ, ভোলানাথ মুখোপাধ্যায়, আনন্দমোহন
ঘোষ, নিতাই ঘোষ, মৃত্যুঞ্জয় রায়, উত্তরপাড়ার কালীদা, প্রফুল্লবাবু, (মেটেবুরুজের),
অনাথ মন্ডল, অনিল নাথ প্রভৃতি একে একে উপস্থিত হলেন।
পাঠ হচ্ছিল,
যেখানে শ্রীরামকৃষ্ণ কেশব সেনকে হেসে বলছেন—আঁশচুপড়ির গন্ধ না হলে কি ঘুম হবেনা?
একজন মেছুনী মালির বাড়িতে অতিথি হয়েছিল, মাছ বিক্রি করে আসছে। চুপড়ি হাতে আছে।
তাকে ফুলের ঘরে ঘরে শুতে দেওয়া হল। অনেক রাত পর্যন্ত ফুলের গন্ধে ঘুম হচ্ছে না।
বাড়ির গিন্নি সেই অবস্থা দেখে বললে, কি গো, তুই ছটফট করছিস কেন? সে বললে, কে জানে
বাবু, বুঝি এই ফুলের গন্ধে ঘুম হচ্ছে না। আমার আঁশচুপড়িটা আনিয়ে দিতে পারো? তাহলে
বোধহয় ঘুম হতে পারে। শেষে আঁশচুপড়ি আনাতে জল ছিটে দিয়ে নাকের কাছে রেখে ভস ভস
করে ঘুমোতে লাগল।
গল্প শুনে কেশবের
দলের লোকেরা হো হো করে হাসতে লাগলো। শ্রীজীবনকৃষ্ণ—এরা বুঝতে পারলেন না এসব
দেহতত্ত্বের কথা। হ্যাঁ রে বাবা। এসব দেহতত্ত্বের কথা। আঁশচুপড়ি মানে লিঙ্গ গুহ্য
নাভি। সহস্রার—ফুলের ঘর। সহস্রারে মানুষটা সত্ত্বগুণী হয়। সত্ত্বগুণে ঘুম হয়না।
ঘুম তমোগুণের। (নতুন ভক্তটির প্রতি)—এই দেখ না বাবা, ঠাকুর বলেছেন—সাধুসঙ্গে
নিষ্ঠা, নিষ্ঠাতে ভক্তি হয়, ভক্তিতে ভাব হয়। ভাবের পর মহাভাব, মহাভাবের পর প্রেম।
প্রেমের পর বস্তুলাভ। আবার বলছেন চৈতন্যদেবের প্রেম হয়েছিল। কিন্তু বস্তুলাভের
কথা বলছেন না। বস্তুলাভ অর্থাৎ ঈশ্বর দর্শন—মানে আত্মা সাক্ষাৎকার। তাহলে চৈতন্যের
আত্মা সাক্ষাৎকার হয়নি। শুধু মহাপ্রভু কেন, কারুরই হয়নি। দেখনা, ঠাকুর বলছেন, বুদ্ধ
দশ অবতারের এক অবতার। আবার বলছেন—বুদ্ধ কি জানো? বুদ্ধি বোধস্বরূপে লয় হয়ে গেলে
বুদ্ধ হয়। একেবারে চুটিয়ে কাটছেন। আবার বলছেন—যীশুখ্রীষ্ট, সে ঋষি। তাঁকে বলছেন
না—অবতার। আবার মোহাম্মদের সম্বন্ধে বলছেন—আমি দেখলাম যে একজন দেড়ে মুসলমান, হাতে
একটা শানকি, তাতে ভাত আছে, সকলকে একটু একটু দিল। আমাকেও একটু দিল। আমি খেয়ে ফেললুম।
অর্থাৎ প্রতীকে ব্রহ্মজ্ঞান হয়েছে... । আবার বলছেন—চৈতন্য অবতার, সে যা করে গেল
তারই বা কি রইল বল তো! তাহলে আমরা দেখতে পাই যে ঠাকুরেরই আত্মা সাক্ষাৎকার
হয়েছিল।
সন্ধ্যা হয়ে
এসেছে। শ্রীজীবনকৃষ্ণ বললেন—সন্ধ্যে হয়ে গেছে, ধ্যান করি। (নতুন ভক্তটির প্রতি)
ঠাকুর বলে গেছেন সন্ধ্যের পরে সব ছেড়ে ঈশ্বরচিন্তা করতে হয়। আয় সব ধ্যান করি।
সকলে কিছুক্ষণ ধ্যান
করলেন। শ্রীজীবনকৃষ্ণের ধ্যান ভাঙলে পর বলছেন—তারা (নতুন লোকগুলি) চলে গেছে? ওঃ কি
বকিয়েছে! ও একজন আছিস? আচ্ছা বোস। আঃ, কি শান্ত ছেলেটি, তুই কখন বাড়ি যাবি?
নতুন ছেলেটি—একটু
পরে।
পাঠ চলছে।
জিতেন চ্যাটার্জী, জিতেন বৈরাগী, সন্তোষবাবু, উমাপদবাবু, মদনদা, গণেশবাবু, হারুদা,
রাধুদা, জানকি পাল, জলধর টাকি, কার্তিক অধিকারী প্রভৃতি একে একে এসে উপস্থিত হলেন।
গোকুলবাবু এবং ভকতজিও একটু পরে এলেন। ঘর ও বাইরের রোয়াক ক্রমে ভর্তি হয়ে গেল।
জগুদা (বেহালা)
এসেছেন, সঙ্গে একটি ছোট বাচ্চা ছেলে এনেছেন। ছেলেটি বাড়িতে কি করে ও কি বলে তা
বলছেন। বয়স প্রায় পাঁচ বছর হবে। শ্রীজীবনকৃষ্ণ তাকে দেখে আনন্দিত হয়ে বলছেন,
কোথা থেকে আনলি রে! তাকে খাটের ওপর নিজের কাছে বসালেন।
জগুদা (শ্রীজীবনকৃষ্ণের
প্রতি)—ছেলেটির কথা বলছেন? এ বাড়িতে অনেক কথা বলে। ভগবানকে এ চোখে দেখা যায় না,
এই সব বলে।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ (সহাস্যে
ছেলেটির প্রতি)—কী চোখে দেখা যায়? ছেলেটি তার কী যেন জবাব দিলো। শ্রীজীবনকৃষ্ণ ও উপস্থিত
ভক্তেরা সকলে শুনে নিস্তব্ধ ও অবাক হয়ে গেলেন। শ্রীজীবনকৃষ্ণ ব্যাখ্যা করে বললেন—হ্যাঁ,
ঠিক বলেছে।
জগুদা—বাড়িতে
বলে রামকৃষ্ণ নাম জপ করো। আবার বলে, ভগবানের কাছে টাকাপয়সা চাইতে নেই। কখনো বলে
আমি এখানে থাকবো না, পাহাড়ে চলে যাব।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ
ছেলেটিকে ধ্যান করতে বললেন। ছেলেটি ধ্যানে ডুবে গেল। জীবনকৃষ্ণ তার ধ্যান দেখে খুব
সন্তুষ্ট হলেন।
ধ্যান ভাঙার পর শ্রীজীবনকৃষ্ণ তার গায়ে নাড়া
দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, হ্যাঁরে তুই কে? ছেলেটি তাঁর দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল।
দু’তিন বার প্রশ্ন করার পর ছেলেটি বললে, আমি চন্দর।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ আবার
প্রশ্ন করলেন, তুই দক্ষিণেশ্বরের কতদিন ছিলি? ছেলেটি বলল, আট মাস।
ক্রমে আজকের মত
কথামৃত পাঠ শেষ হলো। ভক্তরা সকলে কথামৃত মস্তকে ধারণ করে শ্রীজীবনকৃষ্ণকে ভূমিষ্ঠ
হয়ে প্রণাম করলেন ও নিজ নিজ গৃহে ফিরে গেলেন।
১০ই সেপ্টেম্বর,
১৯৫৭, মঙ্গলবার। শ্রীজীবনকৃষ্ণ তাঁর ঘরটিতে মেঝের ওপর বসে আছেন। বঙ্কিমবাবু, সুশীলবাবু,
রামবাবু, আশুবাবু, নিতাই পাত্র, নিতাই ঘোষ, সত্যবাবু প্রভৃতি শ্রীজীবনকৃষ্ণকে ঘিরে
মেঝেতে বসে আছেন। হীরুদা, সন্তোষ পাত্র, ফণী সমাদ্দার, শৈলদা, কালিদা, ক্ষিতীশদা,
রবিদা, ভোলানাথ মুখোপাধ্যায়, রাধুদা, পরেশ দাসগুপ্ত, প্রভাতবাবু, প্রফুল্লবাবু,
জিতেন চ্যাটারজি, জিতেন বৈরাগী, তড়িৎদা, কান্তিবাবু, আনন্দ ঘোষ, রামকৃষ্ণ ঘোষ, অনাথ
মন্ডল, মুরারি দে, গনেশ মান্না, কার্তিক অধিকারী, জলধর টাকি, জানকীদা, নারাণ
ইত্যাদি এক একে ঘরে উপস্থিত হলেন। এমন সময় বিমল চ্যাটার্জি এসে শ্রীজীবনকৃষ্ণকে
প্রণাম করে আসন গ্রহণ করলেন।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—ও
তুই, বোস বোস। ভালো আছিস তো?
বিমলবাবু—আজ্ঞে
হ্যাঁ।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—তুই
কিছু স্বপ্ন দেখেছিস?
বিমলবাবু—একটা স্বপ্ন
বার বার দেখেছি।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—কী?
বিমলবাবু—স্বপ্নটা
হচ্ছে, খুব জল, জলটায় ঢেউ খেলছে। আমি তার ওপর দিয়ে যাচ্ছি কিন্তু ছোট একটা জিনিসে,
সেটা নৌকো নয়, কেমন একটা জিনিস। একটু একটু ভয় করছে। কিন্তু বেশ পার হয়ে যাচ্ছি।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—বেশ
ভালো। এর মানে কি জানিস? জল-ভবসাগর। ইয়ং বয়স তো তাই ওই রকম (বয়স প্রায় ত্রিশ
বত্রিশ হবে) একটু খানি জিনিস ধরে পার হয়ে যাচ্ছিস তো, তাহলেই হল।
বিমলবাবু—আচ্ছা
আমি যদি ভগবান দর্শন করেছি তাহলে আমার এত অশুদ্ধ মন কেন? (তিনি এখানে আসবার আগে শ্রীজীবনকৃষ্ণকে
স্বপ্নে দেখেছেন)।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—হ্যাঁ, তুই ভগবান দর্শন করেছিস।
কিন্তু তোর পূর্ব সংস্কার এখনো তো যায়নি। সেটা ভগবান দর্শন করলেই একেবারে যায় না।
একটু একটু করে যায়। তিলে তিলে তিলভাণ্ডেশ্বর হয়, তা না হলে কী রকম হয় শুনবি?
আমার এক সময় মনে হত যে একটা এমন লোক আসে যে কিছু লেখাপড়া জানে না—অনেক দিনের কথা
বলছি। শেষে একটি লোক এখানে এলো। লেখাপড়া একটুও জানেনা। শেষে তার দর্শন শুনবি? ধ্যানে
দেখছে, আকাশ। আকাশ থেকে ওঁ ঝুলছে। তারপর ঠাকুর, তার নিচে মা কালী, তারপরে আমাকে।
এরই মধ্যে বেদের নিগম হয়ে গেল। পরে আমি শুনলাম যে ও ট্যাক্সি ড্রাইভার। সে আর
এখানে আসতে পারলে না। একেবারে কলকাতার বাইরে চলে গেল। বিমলবাবুর প্রতি বললেন—পূর্ব
সংস্কার তোর ব্রেন ছেলে আছে। সেগুলো খারাপ সেল, তোকে অশুদ্ধ করে দেবে। কিন্তু তুই
ভগবান দর্শন করেছিস বলে তোর ব্রেন সেলগুলো প্রত্যেকটা ভালো হয়ে যাবে। কী করে
জানিস? ভালো সেলটা যুদ্ধ করবে সেলের সঙ্গে। যুদ্ধ করে খারাপটাকে ভালো করে নেবে।
তার প্রমাণ তুই এখানে এসেছিস। তবে সব ভালো করতে একটু সময় নেবে।
বিমলবাবু—তাহলে
কাম, ক্রোধ, লোভ, পাপবুদ্ধি এসব থাকবে?
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—হ্যাঁ, ওসব থাকবে। না থাকলে দেহ
থাকবে না। আর তুই পাপ পাপ কেন করছিস?
বিমলবাবু—না,
তাহলেও পাপ করি তো।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—পাপ
পাপ বলছিস কেন? আঃ, আমাদের এসব বলতে নেই। শুদ্ধ দেহ পাপ পাপ করলে পাপীই হয়ে যায়।
তার জন্য ‘পাপ’ কথা বলতে নেই। তুই কেন ওসব কথা বলছিস? তুই ভগবানকে ডাক না।
বিমলবাবু—আচ্ছা,
আর একটা কথা বলি শুনবেন? আমি আর আমার এক বন্ধু একটা স্টেশনে টিকিট কাটছি। এমন
সময়ে সেই বন্ধুটি বলে উঠল—আরে আমি এ স্টেশনটাকে স্বপ্নে দেখেছি!
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—হ্যাঁ,
ওরকম হয়। ওকে বলে ব্রহ্মজ্ঞানের ফুট কাটা। এখানে আসে খগেন (সাঁইথিয়ার)। রাত্রিবেলায়
স্বপ্ন দেখছে যে, মাস্টার একটা কোশ্চেন করেছে কিন্তু কেউ বলতে পারেনি। শেষে খগেন
বলে দিল। পরদিন একজামিন দিতে গিয়ে ঠিক ওই কোশ্চেনটা এসেছে। । শেষে খগেন বলে দিল।
খগেন বুঝেছিল ওতে আত্মিক শক্তি চলে যায়। সেজন্য আমাকে বলেনি। অপর একজনকে বলেছে,
সে আবার আমাকে বলেছে। আমি বললুম ওতে কী হয়েছে? ও ব্রহ্মজ্ঞানের ফুট কেটেছে। আর অতীত,
বর্তমান, ভবিষ্যৎ, তিন কাল মানুষের ভেতরে আছে, তাই দেখিয়ে দেয়। মানুষটার পরে কী
হবে, এখন কী হচ্ছে, পূর্বে কী হয়েছিল, সব
দেখিয়ে দেয়। দেখ না তুই তো আমাকে এখানে আসবার আগে দেখেছিস। দেখেছিস একটা স্টেজে
তুইও আছিস আর যেন ভগবান আসবার কথা—সে জায়গায় আমি এসেছি।
বিমলবাবু—হ্যাঁ,
তাহলে আপনিই গড। (শুনবামাত্র আঃ বলে শ্রীজীবনকৃষ্ণের শরীরটা লাফিয়ে উঠল)।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—তুই
কেন, আরো অনেক আছে। ওই দেখনা, ওই যে হীরু বসে আছে, এখানে আসবার অনেকদিন আগে দেখেছে—আমি
যেন বসে বসে খাতা লিখছি। ও আমার পাশে বসে আছে। তারপর কে যেন ওকে টেনে নিল। তারপর ও
ধ্বস্তাধ্বস্তি করে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে আমার কাছে এসে বসল। জিজ্ঞাসা করল, আপনার
সামনে থেকে আমাকে টেনে নিয়ে গেল, আর আপনি কিছু বললেন না? ও যখন ঐ কথা বলল তখন আমি
শুনে ওকে বললুম—তোর কি বিয়ে হয়েছে? ও বললো, হ্যাঁ।
এই সময় অমরবাবু
এলেন।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ
(অমরবাবুর প্রতি)—কেন আসতে গেলি, আহা তোর ধম্ম থাক, কখন বাড়িতে যাবি।
(অমরবাবু অফিস
থেকে এখানে এসেছেন, এখান থেকে বাড়ি যাবেন। বাড়ি রানাঘাট।)
(বিমলবাবুর
প্রতি) এই দ্যাখ না, এখানে আসবার আগে অমর আমাকে দেখেছে। আর একজন আছে, নাম মনি, সে
আমাকে স্বপ্নে দেখেছে, আমি চেতলা হাটে বসে আছি। তারপর ঘুম ভেঙে গেছে। সকালে উঠে চেতলা
হাটে গিয়ে আমায় খুঁজছে, খুঁজতে খুঁজতে বেলা বারোটা বেজে গেছে, আমাকে পায়নি, কী করে
পাবে? আমি তো চেতলা হাটে নেই। তারপর কিছুদিন গেল। আমি একদিন মাথায় ক্ষুর দিয়েছি।
মাথা ন্যাড়া দেখে বলছে, আপনাকে আমি দেখেছি চেতলার হাটে। আমি খুঁজে এসেছিলাম,
কিন্তু পাইনি। আপনি যখন মাথা ন্যাড়া করে বসেন, তখন মনে হয় এইতো এঁকেই দেখেছিলাম তো।
এটা ২৫ বছর আগের।
এরকম আরো আছে।
কিন্তু আমি ভাবছি যে, যারা আমাকে না দেখে দেখেছে তাদের তো সচিদানন্দগুরু নয়,
তাদের আরো কি বড় জিনিস।
বিমলবাবু—এরকম
দেখছেই বা কেন, আর দেখেই বা কী হচ্ছে? বিমলবাবু মাস দুয়েকের মধ্যে তিন চারবার
এসেছেন। শ্রীজীবনকৃষ্ণ হেসে বললেন, কী করে বলবো তোকে? বিমলবাবু (পুনরায়)—একটা
স্বপ্ন দেখেছি।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ (সহাস্যে)—কী, কী, বল না।
বিমলবাবু—স্বপ্ন
দেখছি, আমি চুপ করে একটা জায়গায় বসে আছি। তারপর একটা ষাঁড় ছুটে আসছে। আমি মনে
মনে ভাবছি যে, চুপ করে বসে থাকব। কিন্তু কাছে আসতে একটু ভয় লাগলো। আরো কাছে আসল,
তারপর শিব হয়ে গেল।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—বেশ
ভালো স্বপ্ন। মানে কি জানিস? জীবত্বটা শিবত্বে পরিবর্তিত হয়ে গেল। ওই জন্য শিবের কাছে
ষাঁড় থাকে। দেখাচ্ছে যে জীবত্বটা শিবত্বে পরিবর্তিত হয়ে যায়।
বিমলবাবু—সেই
বন্ধুটি আমার কাছে এসেছিল যে এখানে খোল বাজিয়েছিল।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—হ্যাঁ
হ্যাঁ, তার খবর কী?
বিমলবাবু—আমার
কাছে সেদিন এসে চারিদিকে চাইছে। আমি বললুম, অমন করছিস কেন? সে বলল আমি বাইরে
যেখানে যেখানে গান গেয়েছি তাঁকে দেখতে পেয়েছি, তাই দেখছি এখানে দেখতে পাই যদি।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—(ভক্তদের
প্রতি), দেখুন সে এইখানে গান গেয়েছে। ভারি সুন্দর খোল বাজিয়েছিল। (বিমলবাবুর
প্রতি) তুই ওকে কিছু বলিসনি, ও যেখানে গান গায় আর আমাকে দেখে, ওর মানে আছে। এখানে
যে গান গেয়ে গেছে তাতে ওর আত্মিক শক্তি হয়েছে। আর যেখানে গান গাইবে, টাকা-পয়সা
নিলে ওই আত্মিক শক্তি চলে যাবে (একথা শুনে ঘর নিস্তব্ধ)। আমাকে দেখে এখন ওর গান
খুব ভালো হবে। পরে কিন্তু ওর গান ভালো হবে না। (বিমলবাবুর প্রতি) তুই ওকে কিছু
বলিস না। খবরদার বলবি না।
(পরেশ
দাশগুপ্তের প্রতি) কিরে তোর খবর কী? ভালো আছিস তো? কিছু স্বপ্ন দেখেছিস?
দাশগুপ্ত—হ্যাঁ,
দেখেছি। আমি একটা দর্জির দোকান থেকে বেরুচ্ছি, আর মিত্তিরবাবু (রাধু) আসছিলেন
এখানে। আমি বললুম, কোথায় যাচ্ছেন? মিত্তিরবাবু বললেন—ওখানে (শ্রীজীবনকৃষ্ণের কাছে)
চলুন।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—দর্জির
দোকান, ওর মানে আছে। দর্জি অর্থাৎ ভগবান। দর্জি যেমন জামার মাপ নেয়, ভগবান তেমনই দেহের
মাপ নেন। আর প্রভাতের খবর কী?
দাশগুপ্ত—প্রভাতের
আমাশা হয়েছে। অফিসে আসেনি।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—ভালো
হয়েছে, খুব ভালো হয়েছে। কেন জানিস? ওর কুণ্ডলিনী খুব জোর ধরেছিল, তাই আমার একটু
ভাবনা হয়েছে। যাক, এখন আর হবে না।
১২ই সেপ্টেম্বর, ১৯৫৭। আজ
বৃহস্পতিবার। শ্রীজীবনকৃষ্ণের ঘরে অনেক ভক্ত সমবেত হয়েছেন। বঙ্কিমবাবু, সুশীলবাবু,
সত্যবাবু, উপেনবাবু, হীরুদা, হারু ঘোষ, রামদা, আশুবাবু, কানাইবাবু, বলাইবাবু, কালী
পাল, নারায়ন, ইত্যাদি ভক্তরা বসে আছেন। ফণীবাবু, জাহাঙ্গীর সাহেব, দাশগুপ্ত, সন্তোষ
গুছাইত, ভোলাদা, জিতেন বৈরাগী, তড়িৎদা, মৃত্যুঞ্জয় রায়, মদনদা, রতনবাবু, রঘুদা,
দিলীপ মিত্র, আনন্দদা, নিতাই ঘোষ, ভকতজী, জলধর টাকি, জানকী পাল, উত্তরপাড়ার শৈলদা
ও কালীদা ইত্যাদি অনেকেই একে একে আসতে লাগলেন।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—আমি
ধ্যানে দেখেছি যে অসীম মুখে আঙ্গুল দিয়ে আছে। ওর ভারি মানে আছে। ওর মানে কি জানলি?
আমাকে নিঃসঙ্গ হয়ে থাকতে বলছে। এখন তোরা যদি আমাকে ছেড়ে দিস তাহলে আমি এইখানে
থাকবো। আর তা যদি না হয়, তাহলে আমাকে দূরে চলে যেতে হয়।
এই কথা শুনে
উপস্থিত সকলে একেবারে স্থির হয়ে গেলেন।
সত্যবাবু—না না,
আপনি এখানে থাকুন, কোথায়ই বা যাবেন?
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—আপনারা
যদি আমাকে ছেড়ে থাকতে পারেন তাহলে ভালো। আর, কোথায়ই বা যাব, বুড়ো মানুষ। শনিবার
যে গান হয়, তা বন্ধ থাকবে।
হীরুদা আজ একটু
সকাল সকাল এসেছেন। শ্রীজীবনকৃষ্ণ (হীরুদার প্রতি)—আজ একটু কীর্তন কর। হীরুদা
কীর্তন আরম্ভ করলেন।
কীর্তনের সময় শ্রীজীবনকৃষ্ণ
খাট থেকে নেমে মেঝেতে এসে বসলেন। কীর্তন চলছে। সকলে ধ্যানে বসলেন। কিন্তু যেন বেশ
জমল না। শেষে সকলে মিলে গান গাইছেন—
গুরু গৌরাঙ্গ রাধে গোবিন্দ, ব্রহ্ম নারায়ণ হরে
কৃষ্ণ রাম, ইত্যাদি।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ
গান বেশ মনোযোগ দিয়ে শুনছেন। গানের সময় মাঝে মাঝে ভাবি বিভোর হয়ে আনন্দে আঃ আঃ শব্দে
মেতে উঠেছেন। গান শুনতে শুনতে তিনি গভীর ধ্যানে মগ্ন হলেন। কীর্তন সমাপ্ত হল,
এদিকে সন্ধ্যা হয়ে এলো। একজন ভক্ত ঘরের লাইট জ্বালিয়ে দিলেন।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ
ও সকলে কীর্তনের শেষে প্রণাম করছেন। তিনি প্রথমে শ্রীরামকৃষ্ণের বড় পটটিকে ও পরে
আরও যে দুটি শ্রীরামকৃষ্ণর ছোট পট আছে, সেগুলির উদ্দেশে একে একে প্রণাম করলেন।
সবশেষে শ্রীশ্রীসারদামনির (ক্যালেন্ডার) ছবিটিকে প্রণাম করলেন।
কীর্তন হচ্ছিল
বলে এতক্ষণ ভক্তদের অনেকেই প্রবেশ করতে পারেননি। বাইরে বসে ছিলেন। প্রণামান্তে
শ্রীজীবনকৃষ্ণ ভক্তদের দিকে তাকিয়ে অনেককেই বাইরে দেখে সহাস্যে তাদের প্রতি সস্নেহে
বললেন—আয়, তোরা যারা বাইরে বসে আছিস, ভেতরে অ্যায়।
তাঁর কথা শুনে
রামকৃষ্ণদা, নিতাই, আনন্দদা, তড়িৎদা, কালীদা, শৈলদা, মৃত্যুঞ্জয়দা, রবিদা,
জাহাঙ্গীর সাহেব এবং পরে জিতেন চ্যাটার্জী জিতেন বৈরাগী ও আরো একজন নতুন ভক্ত ঘরের
ভেতর এসে বসলেন। শ্রীজীবনকৃষ্ণ এইবার ধ্যান করতে বসলেন। কয়েকজন ভক্তও এইসঙ্গে
ধ্যানে বসলেন। ওদিকে পাঠ চলছে। নতুন ভক্তটিও একটু ধ্যান করার চেষ্টা করলেন।
কিছুক্ষণ ধ্যানের পর শ্রীজীবনকৃষ্ণ সস্নেহে নতুন ভক্তটির প্রতি বললেন—তোর ধ্যানে
কিছু দর্শন হলো?
নতুন ভক্ত—হ্যাঁ,
দেখলুম আপনি বসে আছেন, আর একটা জ্যোতি দেখতে পেলুম।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—বেশ
তো দর্শন করেছিস। (পরে ভক্তদের দিকে তাকিয়ে) আহা, চারদিন ধরে আসছে, স্বপ্ন কিছু
দেখেনি, তাই আমি ধ্যানের সময় বলেছিলুম, তুই ধ্যান কর, তাই দর্শন হল।
হীরুদা কথামৃত
পাঠ করছেন। অন্যদিন ভোলাদা পাঠ করেন, কিন্তু তাঁর পায়ে আঘাত লাগায় অফিসে ছুটি
নিয়ে বাড়িতে আছেন, চলতে পারছেন না।
সকলেই
একাগ্রচিত্তে পাঠ শুনছেন।
ক্রমে কথামৃত
পাঠ আজকের মত শেষ হলো। শ্রীজীবনকৃষ্ণ কৌতুহলী দৃষ্টিতে রাধুদাকে খুঁজছেন। রাধুদা খাটের
সামনেই বসে আছেন। কিন্তু শ্রীজীবনকৃষ্ণ তাঁকে প্রথমে দেখতে পান নি, পরে নজর পড়াতে
রাধুদার প্রতি সোল্লাসে বললেন—কোথায় রে রাধু, এইখানে বসে আছিস আর আমি দেখতে পাইনি।
দ্যাখ রাধু,
আমাকে নিঃসঙ্গ হয়ে থাকতে হবে। তা না হলে হবে না। মনিদা পঁচিশ বছর আগে আমায় দেখেছে।
আরো আছে। পঞ্চাশ বছর আগে আমাকে দেখেছে। তাই, আমি ভাবছি, এটা একটা কী! এখানে তো,
সচিদানন্দগুরু এসব নয়! আর যারা এখানে এসে আমাকে দেখছে, তাদের আলাদা। কিন্তু তা তো
হবে না! নিশ্চয়ই এর ভেতর (নিজেকে দেখিয়ে) কিছু ত্রুটি আছে। তাই আমাকে এসব ছেড়ে
থাকতে হবে। যাক, হয়তো পূজোর ভেতরে নয়, পুজোর পরে।
শ্রীজীবনকৃষ্ণের
সিদ্ধান্ত শুনে সকলেরই মুখ শুকিয়ে গেল। ভাবছেন তাঁকে ছেড়ে কিভাবে থাকবেন।
সোমবার ৩১শে
মার্চ, ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দ। বেলা আড়াইটে।
শ্রীজীবনকৃষ্ণের ঘরে ভক্তরা আবার সমবেত হতে
পেরেছেন। বেশ কিছুদিন ঘর বন্ধ থাকার পর। শ্রীজীবনকৃষ্ণ ও কয়েকজন ভক্ত আলপুকুর
থেকে রবিবার, ২৩শে ফেব্রুয়ারি ফিরেছেন।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ সেই পূর্বপরিচিত ঘরটির
মেঝেতে ধ্যানস্থ হয়ে বসে আছেন। মেঝেতে রায়মশাই কথামৃত পাঠ করছেন। সুশীলবাবু, হারুদা
ও দুটি বাচ্চা ছেলে বসে আছেন। নারায়ন ঘরে ঢুকে শ্রীজীবনকৃষ্ণকে ভূমিষ্ঠ হয়ে
প্রণাম করল। গোপাল রায়, তড়িৎ পাল, বলাই দে, আশুদা, দিলীপ দত্ত, কার্তিক অধিকারী, মদন কোলে একে একে ঘরে
ঢুকলেন। ধ্যান ভাঙার পর শ্রীজীবনকৃষ্ণ খাটের ওপর গিয়ে বসলেন। একটু পর বড় গণেশ
এলেন। শ্রীজীবনকৃষ্ণ একটু ব্যস্ত হয়ে গণেশের প্রতি বললেন—তুই এসেছিস, বোস বোস,
ভালো আছিস বাবা? গণেশ (সহাস্যে)—হ্যাঁ, ভালো আছি।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—আচ্ছা,
একটু বিচার কর। দ্যাখ এই দুটো বাচ্চা ছেলে কী করে ঠাকুরকে স্বপ্নে দেখেছে, এর মানে
কী? গণেশ—ভগবান দর্শন করেছে।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—হ্যাঁ,
তা তো করেছে, কিন্তু এর মানে কী? এইটুকুনি বাচ্চা ছেলে কী করে ঠাকুরকে দর্শন করল?
এরা ল্যাংটো হয়ে খেলা করে (ছেলে দুটির একজনের বয়স সাত আরেকজনের আট কি নয়)।
তড়িৎ--সংস্কার
আছে, তাই দেখালো।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—হ্যাঁ,
সংস্কার টংস্কার সমস্ত কিছু মানলুম, কিন্তু এটা হচ্ছে কী করে? আগে কি এসবের
রেফারেন্স পাই, না পাওয়া গেছে? এসব তো এখনই হচ্ছে। এর মানে আছে। (রায়মশাইয়ের
প্রতি) ওই লাইনটা পড়ুন না, মানুষে তাঁর বেশি প্রকাশ। (গণেশের প্রতি) দেখছিস কী বলছেন!
মানুষে বেশি প্রকাশ, তাহলে ভগবান গোলোকে নেই, বৃন্দাবনের নেই, বৈকুন্ঠে নেই।
কথামৃতে অবতার
ও ভগবানের কথায় বললেন—আচ্ছা, চৈতন্য অবতার। অবতার আদর্শ পুরুষ। চৈতন্য বলছেন, আপনি
আচরি ধর্ম জীবেরে শেখায়। চৈতন্যদেব যা করেছিলেন, তাঁর শিষ্যরা কি তাই করেছিলেন?
কিন্তু ভগবান কী আদর্শ করবে? কিছুই নয়। (নিজের দেহকে ইঙ্গিত করে) সচ্চিদানন্দ
গুরুরূপে মানুষের দেহেতে নিজের রূপ ফুটিয়ে সেই মানুষটার অ্যানিম্যালিটি নষ্ট করে
আমাতে পরিবর্তিত করে নেব—এ অজ্ঞাতসারে হবে, মানুষটা জানতেও পারবেনা (এই কথার সঙ্গে
সঙ্গে আঃ বলে হুংকার দিয়ে উঠলেন)। এই ব্যষ্টি আর সমষ্টির ফারাক দেখ। আজকে বড় কথা
হলো, এরকম কথা হয়নি, এরকম ভাবে বলিনি। অনেক বার ব্যাখ্যা করেছি।
পুনরায় কথামৃত পাঠ চলতে লাগল। শ্রীরামকৃষ্ণ বলছেন—একটু
উদ্ধব সংবাদ শোনাও তো। উদ্ধব গোপীদের প্রতি বলছেন, তোমাদের কৃষ্ণ জগতচিন্তামণি, তাঁকে
চিন্তা করলে মানুষ মুক্তি লাভ করে।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ বললেন, তাহলে কৃষ্ণকে চিন্তা করলে
মুক্তি লাভ করা যায়, আর এখানে? মানুষকে চিন্তা করতে হবেনা। কৃষ্ণ আত্মা, কৃষ্ণ
আপনা হতেই দেহেতে ফুটে উঠে মানুষের দেহেতে লীলা করছে।
প্রসঙ্গঃ শ্রীরামকৃষ্ণ
মনমোহনের প্রতি—সব রাম দেখছি, তোমরা বসে আছো, দেখছি রামই এক একটা হয়েছেন। শ্রীজীবনকৃষ্ণ—ঠাকুর
বলছেন রামই সব হয়েছেন, কিন্তু আমি কী দেখছি জানিস? আমি সব হয়েছি, তার প্রমাণ তোরা।
তোরা সবাই আমাকে দেখিস। ঘরে এমন লোক নেই যে আমাকে দেখেনি।
(গণেশের প্রতি)
দেখ, অচিন্ত্য সেনগুপ্ত এখানে এসেছিল। কিন্তু দেখ, খুব ভাগ্যবান পুরুষ, আমাকে
দেখেছে। কী করে শুনবি? ও টিফিন করছে, আর দেখছে এজলাসে আমি ওর চেয়ারে বসে আছি।
জলজ্যান্ত আমাকে দেখছে। আচ্ছা, আমি ওর চেয়ারে বসে আছি, এর মানে কী বল তো?
অচিন্ত্য সেনগুপ্ত খুব পণ্ডিত, কিন্তু কিছুই বুঝতে পারেনি। ওতো সকলকার বিচার করে,
এইবার আমি ওর বিচার করব। দেখ বাবা, ওসব দেহ পাথর, তবে দেখ কী হয়।
বুধবার ২রা
এপ্রিল, ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দ।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ
মেঝেতে বসে আছেন। সুশীলবাবু, ফণীদা, হারু ঘোষ, বড় মদন, নারায়ন ও ছোট একটি ছেলে
বসে আছেন। আশুদা, কালী পাল, মদনদা, দিলীপ দত্ত ও চারটি নতুন ছেলে এসে উপস্থিত হলেন।
শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ
কথামৃত পাঠ হচ্ছে। গান—শিব সঙ্গে সদা রঙ্গে আনন্দে মগনা।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—এর
মানে কি রে? শিব সঙ্গে
সদা রঙ্গে আনন্দে মগনা—মানে, আত্মার সঙ্গে দেহের রমণ হলেই একটা আনন্দ হয়। আনন্দ
আবার তিন প্রকার, ঠাকুর বলে গেছেন—ব্রহ্মানন্দ, ভজনানন্দ, বিষয় আনন্দ। মানুষটা
ব্রহ্মানন্দ পেলে একটা আনন্দ হয়, ভজনানন্দ পেলেও আনন্দ, আর বিষয় আনন্দ তো আছেই।
তাহলে মানুষটা আনন্দ করতেই আসে।
প্রসঙ্গঃ গান—গণ্ডযোগে
জনমিলে, সে হয় মা-খেকো ছেলে।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—মা
কী? আদ্যাশক্তি। আদ্যাশক্তি প্রকৃতি। প্রকৃতি অধীনে সকলেই আছে। মা-খেকো মানে আদ্যাশক্তি
বা প্রকৃতি খাওয়া। প্রকৃতি কি করে খাবে? না, প্রকৃতির আত্মাতে পরিবর্তিত হওয়া।
রতনদা প্রবেশ
করলে বলে উঠলেন—আয়রে বাবা আয়। ও রতন তুই? আয় বোস। বেশি খাতির করে ফেলেছি। কেমন
আছিস, ভালো তো? রতনদা—হ্যাঁ।
একটু পর শ্রীজীবনকৃষ্ণ
বললেন, আচ্ছা দেখ, একটা কথা বলি। কালকে অধর সেনের (কথামৃতের) নাতি এসেছিল। প্রথমেই
তাকে শাস্তি করলুম। সে ভবতারিণীকে দর্শন করলে। আমাকে বললে। আমি বললুম, ওই কি তোর ইষ্ট?
সে বল্লে—না। আমি বললুম, যাক। তারপর তাকে ব্যাখ্যা দিলুম যে, ভবতারিণী দর্শন করা
মানে ভবসাগর পার হওয়া। ভবসাগর লিঙ্গ গুহ্য নাভি থেকে ষষ্ঠভূমি পর্যন্ত। এই কথা তাকে
বললুম।
পুনরায় কথামৃত
পাঠ হচ্ছে। শ্রীরামকৃষ্ণ বলছেন, মনের মানুষ হয় যে জনা, নয়নেতে তার যায় গো চেনা।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ (ফণীদার
প্রতি)—এর মানে কি রে?
ফণীদা চুপ করে
থাকায়—কেন রে? বলেছি তো। ভুলে গেছিস! মনের মানুষ কে? সে তো ভগবান রে! নয়নেতে যায়
গো চেনা, মানে ত্রিনেত্র, জ্ঞানচক্ষু।
জ্ঞানচক্ষু
দিয়ে আত্মা সাক্ষাৎকার হয়। (আশুদার প্রতি)—কালকে ঘরে কী দেখলি বল তো? আশুদা—ওই
কবিরাজকে। শ্রীজীবনকৃষ্ণ—হ্যাঁ, ঠিক ধরেছিস তো। (রতনের প্রতি)—দ্যাখ কাল একজন কবিরাজ
এসেছিল। তার সঙ্গে আগে আলাপ ছিল না। কালই নতুন আলাপ হয়েছে। আমি বললুম—আপনি কি আমাকে
দেখেছেন মনে হয়? সে বললে, হ্যাঁ, আপনাকে দেখেছি মনে হয়।
দাশগুপ্তবাবুর
ছেলে মুখ নিচু করে বসে আছে, কি যেন ভাবছে। শ্রীজীবনকৃষ্ণ তার দিকে দৃষ্টিপাত করে
বললেন—তুই কি আমাকে দেখেছিস? কি রে বল। ছেলেটি হ্যাঁ বলায় বললেন, দেখছিস, কী যেন
একটা এখানে হচ্ছে।
প্রসঙ্গঃ শ্রীরামকৃষ্ণ—হনুমান
একলাফে সাগর ডিঙ্গিয়ে লঙ্কা দগ্ধ করলে।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—হনুমান
একলাফে সাগর ডিঙ্গিয়ে লঙ্কা দগ্ধ করলে মানে? হনুমান মহাবায়ু—সাগর ডিঙ্গিয়ে অর্থাৎ, ভবসংসার লিঙ্গ গুহ্য নাভি থেকে
সপ্তমভূমিতে গেল। লঙ্কা দগ্ধ করল, সহস্রারে গিয়ে অ্যানিমালিটি নাশ করল। এই সমস্ত
কথা পুরাণকার এইভাবে লিখেছে। এইরকম করে লেখা মানে ভগবানকে দূরে রাখা হয়। আর ঠাকুরও
কী! তিনিও পুরাণকারের মতন কথা বলে যাচ্ছেন! যেমন আঁশচুপড়ি আর ফুলের ঘর। তাইতো আমার
এক এক সময় ঠাকুরের ওপর রাগ হয়। এদিনকার মত পাঠ শেষ হলো। সকলে কথামৃত মস্তকে ধারণ
করে ও শ্রীজীবনকৃষ্ণকে প্রণাম করে প্রস্থান করলেন।
শুক্রবার চৌঠা
এপ্রিল ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দ, গুড ফ্রাইডে। এখনো তিনটে বাজেনি। ভক্তদের অবসর হয়েছে
তাই অনেকেই আগে এসে পড়েছেন। শ্রীজীবনকৃষ্ণ খাটের ওপর বসে আছেন। নিতাই পাত্র, উপেনদা,
রাধুদা, রামদা, রতনদা, অসীমদা ও তাঁর দাদা, দাশগুপ্তবাবু, নাথবাবু, উত্তরপাড়ার কালীদা,
আনন্দ ঘোষ, উমাপদবাবু, দিলীপ ঘোষ, সৌরেন ভট্টাচার্য্য, হারুদা, জিতেন চ্যাটার্জির
ছেলে, এরা সকলেই ঘরের মেঝেতে বসে আছেন। রামকৃষ্ণ ঘোষ, অরুণ ঘোষ, জাহাঙ্গীর সাহেব,
অম্বরবাবু, আশুদা, দিলীপ দত্ত, নারায়ণ ইত্যাদি একে একে এসে হাজির হলেন।
শ্রাদ্ধ
প্রসঙ্গে আলোচনা হচ্ছিল। শ্রীজীবনকৃষ্ণ বললেন—দেখ, তোদের ঠাকুর কিরকম হিঁদু। তাঁর মা
মরে গেল শ্রাদ্ধ করলেন না কেন? না কি টাকা খরচার জন্য তাই! হিন্দুদের এমনই যে, সে
যদি শ্রাদ্ধ না করে তাহলে তার হাতে কেউ জল খাবে না, আর তাকে সমাজ থেকে বার করে দেবে।
দ্যাখ না, ঠাকুরকে কেউ কিছু করতে পারল না। দেখাচ্ছেন যে ব্রহ্মবিদ পুরুষের এসব
কিছু করতে হবে না। আর একটা মানে আছে যে, তোমরা শ্রাদ্ধটাদ্ধ ওসব কোরো না। দ্যাখ না,
ঠাকুর বললেন, শ্রাদ্ধের অন্ন খেও না। এর মানে তোমরা শ্রাদ্ধটাদ্ধ উঠিয়ে দাও। আর
তোদের যদি ঠাকুরের ধর্ম বলি তাহলে তোরা আমাকে টুকরো টুকরো করে কেটে ফেলবি। তোদের
ভেতর আমি আছি বলে রক্ষে, তা না হলে তোরা আমরা আমাকে টুকরো টুকরো করে কেটে ফেলতিস। আচ্ছা,
ভগবানের কি জাত আছে? বল! (জিতেনবাবুর ছেলেটির প্রতি) বল না রে, ভগবানের কি জাত আছে?
(ছেলেটি চুপ করে রইলো। ছেলেটির বয়স প্রায় ছয়-সাত বছর হবে)। হ্যাঁ রে, বলতে
পারবি না। তার কোনো জাত নেই, আর যে মানুষের আত্মিক স্ফুরণ হয়েছে, তার যে কোনো জাত
নেই। আহা কি কথা রে!
এমন সময় বিমলবাবু
ও তাঁর বন্ধু শ্যামবাবু এলেন। শ্রীজীবনকৃষ্ণ তাঁদের প্রতি—আয় আয়, এসেছিস বোস।
কেমন আছিস, ভালো আছিস তো? (শ্যামবাবুর প্রতি) হ্যাঁরে তোর শম্ভুভাই কেমন আছে?
শ্যামবাবু—সে
ভালো আছে। তাকে উদয়শংকরের দলে নিয়েছে। এখন সে অ্যামেরিকা চলে গেছে। (শম্ভু গানের
সঙ্গে খোল বাজিয়ে শ্রীজীবনকৃষ্ণকে শুনিয়েছিলেন। বাজনা এত ভাল হয়েছিল যে শ্রীজীবনকৃষ্ণ
তাকে আলিঙ্গন করেছিলেন। এরপর কিছুদিন শম্ভু যেখানে বাজাতেন সেইখানেই শ্রীজীবনকৃষ্ণকে
দেখতে পেতেন)।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—তাই
নাকি! দেখ আবার কী হয়। হয়তো সেখানে দেখতে আরম্ভ করবে আর যারা দলে আছে তারাও
হয়তো আমাকে দেখবে। হ্যাঁরে, এর রেফারেন্স আছে। এলাহাবাদে কয়েকজন লোক আমাকে না দেখে
সেখানে আমাকে দেখে, এসেছিল। এ অমোঘ বীজ রে বাবা। এ বীজের নাশ নেই। এ জিনিশ এইরকম
করে ছড়াবে। গত নভেম্বর মাসে কতগুলো দৈববাণী হয়েছে। একটা হচ্ছে, আমায় বলছে—আপনি দয়া
করে ইউরোপে যান। পাশ্চাত্য আপনার জন্য কাঁদছে। আমি কী করলুম জানিস? একটা আদাড়ে পাড়া
গাঁয়ে গিয়ে থাকলুম। ভাবলুম সেখানে গিয়ে কী হবে। আমি সেখানে যাব, কতগুলো লোক
আমাকে স্বপ্নে জাগ্রতে সুষুপ্তিতে দেখবে আর অনেক মান টাকা-পয়সা হবে। এসব নিয়ে আমি
কী করব? তারপরে এখানে চারটি টাকা নিয়ে আসব, তা না হলে হয়তো সেখানে মরে যাব। দ্যাখ
না, বুদ্ধদেব প্রচার করতে বেরোলেন। মহম্মদ, যীশুখ্রীষ্ট, মহাপ্রভু সকলেই প্রচার
করলেন। কী করবেন, না মানুষকে এক করবেন। এমনকি ঠাকুর পর্যন্ত প্রচার করতেন। কীরকম
শুনবি? তাঁর আড়াই টাকা তিন টাকা গাড়ি ভাড়া যেতো। এইরকম প্রায়ই করতেন। করে কী
করতেন? ভক্তদের বাড়ি বাড়ি যেতেন। সেখানে কী অন্য কথা হতো? না, সেখানে ভগবানের কথা
হতো, ভগবানের কথা হওয়া মানে প্রচার করা। কিন্তু মানুষকে কি এক হতে পেরেছে? উল্টে
কেউ হাইড্রোজেন বোমা করছে, আর কেউ, (শ্যামবাবুর প্রতি) বলনা রে।
শ্যামবাবু—কেউ
এটম বোমা তৈরি করছে। শ্রীজীবনকৃষ্ণ—এই করে মানুষকে এক করবে। আর এখানে কী হচ্ছে? (ভক্তদের
প্রতি আঙুল দেখিয়ে) তুই আমাকে দেখেছিস? নিতাই পাত্র—হ্যাঁ। তুই আমাকে দেখেছিস?
জাহাঙ্গীর সাহেব—হ্যাঁ। এইরকম আরও দু'জনকে জিজ্ঞাসা করলেন। সকলেই বললেন—হ্যাঁ, আপনাকে দেখেছি।
একটি নতুন
ছেলের প্রতি দৃষ্টিপাত করে বললেন, আচ্ছা এই ছেলেটি ছেড়ে দে। এ নতুন। আর সমস্ত ঘরভর্তি
লোক তো আমাকে দেখেছে। আর একটা কথা শুনবি? শোন। স্বামীজি যখন দ্বিতীয়বার আমেরিকায়
লেকচার দিতে জাহাজে করে যান সঙ্গে নিবেদিতা ছিল। তাকে স্বামীজি বলছেন যে, আমাদেরকে
এই দুর্বল লোকগুলোর মধ্যে জোর করে ঢুকতে হবে। এই কথা কিন্তু স্বামীজি কাউকে বলেননি,
খালি নিবেদিতাকে বলেছিলেন। আর এখানে কী হচ্ছে? রাধু তুই কী স্বপ্ন দেখেছিস বল তো?
রাধুদা—স্বপ্ন
দেখছি যে আমরা একটা ঘরে বসে আছি সেখানে কথামৃত পাঠ হচ্ছে। জিতেনবাবু আমাকে বলছেন—এঁকে
(শ্রীজীবনকৃষ্ণকে) জোর করে লেখানো হয়েছে। আমি বললাম, কেন? জিতেনবাবু বললেন, হ্যাঁ,
লিখতে লিখতে বন্ধ করে দিয়েছিলেন তাই আবার জোর করে লেখানো হয়েছে। অপরে লিখলে ভুল
হতে পারে। তাই ইনি নিজে লিখেছেন। তারপরে আপনি আমাকে বললেন, ঈশ্বরের দুটো কথা বল।
আমি বললুম, ঈশ্বরের ছোট ভাবটা জানিনা, তাঁর বড় ভাবটাও জানিনা। আপনি বললেন, হ্যাঁ
ঠিক বলেছিস। তারপর আমি বললুম, ঈশ্বরের লীলা কিছু বোঝা যায় না। আপনি বললেন, হ্যাঁ
ঠিক বলেছিস। তারপর আবার বললেন, আমার একটা ছেলে আছে। আমি শুনে অবাক হয়ে গেলাম। আর
মনে মনে ভাবছি, ইনি তো বিয়ে-টিয়ে করেননি। এঁর আবার ছেলে কোত্থেকে এলো! এরপর দেখছি,
দেওয়ালের ওপর ঠাকুরের ছবি, নিচে একজন বুড়ো ভদ্রলোক বসে আছেন। আপনি ঠাকুরকে দেখিয়ে
দিচ্ছেন। আমি ঠাকুরকে দেখলুম, তারপরে আপনাকে দেখলুম, আপনি যেন ঠিক মমির মতো। জীবনকৃষ্ণ
স্বপ্ন শুনে বললেন, হ্যাঁ রে বাবা, এখানে যেন একটা কি হচ্ছে। ঠিক এই স্বপ্ন আর একজন
দেখেছে, সে মেটেবুরুজে থাকে। সে স্বপ্ন দেখছে, ভোর বেলা, সূর্য উঠছে, আমি যেন তার
কাছে দাঁড়িয়ে আছি। সে বলছে—আপনি কে? আমি বললাম—আমি রামকৃষ্ণের বাবা। আবার দেখছে
আমার আর একটা মূর্তি দাঁড়িয়ে আছে। সে আবার জিজ্ঞাসা করলো, আপনি কে? আমি তাকে
বললুম, আমি রামকৃষ্ণের বাবা। তারপর আমি ব্যস্ত হয়ে তাকে বললুম, তুই আয়, আমি
যাচ্ছি। আমি এগোচ্ছি, সামনে একটা বড় নদী। সে বলছে, আপনি কী করে যাবেন, সামনে যে নদী
আছে। আমি বললুম ও আমাদের কিছু হবে না। খানিক দূরে সূর্য উঠছে, আমি সেই সূর্যের
ভেতরে ঢুকে গেলুম। এই স্বপ্নটা ও যখন বলল, আমি চুপ করে রইলুম। ভাবতে লাগলুম যে এইখানে
একটা কী হচ্ছে। (বিমানবাবুর প্রতি) দ্যাখ, আমাকে দৈববাণী করে বলল, আপনি দয়া করে
একবার ইউরোপে যান, পাশ্চাত্য আপনার জন্য কাঁদছে। তাইতো আমি এখান থেকে একটা আদাড়ে
পাড়াগাঁয়ে গিয়ে থাকলাম। আবার কেমন বলছে দেখ না—আপনি যান। ভদ্রতা করছে, আজকাল
ভদ্রতা করে।
বিমলবাবু—আপনি
ওই আইবুড়ো ছেলেদেরকে তো নিয়ে গেলেন। আপনি ওদের ভালোবাসেন, আমাদের তো ভালোবাসেন
না।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—(বিমলবাবুর
প্রতি) কেন রে, তোদের তো ভালবাসি, তোদের ভেতরে জোর করে ঢুকে আছি। বিমলবাবু—তবু ওদের
তো নিয়ে গেলেন।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—আচ্ছা,
দেখ তোদের কী করে নিয়ে যাব। তোকে যদি নিয়ে যাই তাহলে বৌমা কী বলবে। তারপর ছেলেমেয়ে
আছে, তারা তো ছাড়বে না।
বিমলবাবু—দেখুন,
আমি আলিপুর কোর্টে গিয়েছিলাম। সেখানে আপনাকে দেখেছি। আপনি ধুতি পাঞ্জাবি পরে একটা
লোকের সঙ্গে কথা কইছিলেন। আমি মনে মনে ভাবছি যে উনি দাঁড়িয়ে আছেন তো, আমি কাজটা
সেরে গিয়ে কথা কইব। তারপর দেখি আর নেই। আমি ভাবছি যে এইমাত্র ছিলেন, কোথায় গেলেন!
সঙ্গে দুই ভাই ছিল, তারাও দেখেছে। তারপর যখন খেতে বসেছি, দুই ভাই বলাবলি করছে যে, দেখ ঠিক যেন
রামকৃষ্ণের মতন।
সন্ধ্যা থেকে
এই কথাই হচ্ছে। ভবানীদা (শ্রীজীবনকৃষ্ণের প্রতি)—আচ্ছা, ওরা কী করে দেখলো? বিমল না
হয় দেখল, কিন্তু ওর ভাইরা কী করে দেখল? ওরা তো আপনাকে আগে দেখেনি। এখানে কোন যোগ
চলে না।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—না
রে বাবা। এটাও যোগ। যোগ ছাড়া ওসব কিছু হবেনা। একটা মানে আছে যে বিমল ভাইদের টানছে।
সন্ধ্যে সাতটা
বাজলো। সকলে কথামৃত মাথায় ধারণ করে শ্রীজীবনকৃষ্ণকে প্রণাম করলেন ও নিজ নিজ গৃহ
অভিমুখে রওনা হলেন।
শনিবার ৫ই এপ্রিল, ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দ। বেলা আড়াইটে
হবে।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ মেঝেতে বসে ধ্যান করছেন। রায়মশাই,
উপেনবাবু, রামকৃষ্ণদা, নিতাই পাত্র, অরুণদা, রঞ্জিতদা, প্রভৃতি বসে আছেন সৌরেনদা
পাঠ করছেন ক্রমে ক্রমে আরো অনেকে এলেন।
শ্রীজীবনকৃষ্ণের
ধ্যান ভাঙলে খাটের উপর উঠে বসলেন।
কথামৃত পাঠ
চলছে। শ্রীরামকৃষ্ণ মনির হাতে চন্দনের পাখাটা দিলেন। শ্রীজীবনকৃষ্ণ—মনির হাতে
চন্দনের পাখাটি দিলেন, এর মানে কি? পাখা অর্থাৎ মহাবায়ু। শক্তি দান করলেন মনিকে।
কিন্তু দান করলে কি হবে? অনেক সময় ভগবান মানুষকে কৃপা করেন। কিন্তু মানুষটা নিতে
পারে না। নিতে পারবে কী করে? আধার অনুপাতে তো হবে।
প্রসঙ্গঃ শ্রীরামকৃষ্ণ—মলয়ের
হাওয়া বইলে সব গাছ চন্দন হয়ে যায়। খালি শিমুল অশ্বত্থ আর কয়েকটা গাছ হয় না।
সব গাছ চন্দন
মানে কুণ্ডলিনী সহস্রারে গিয়ে অ্যানিমালিটিকে নষ্ট করে দেয়। এর মানে যা হয় আর ‘হনুমানের
লংকা দগ্ধ করলেন’ তার মানেও তাই।
শ্রীকান্তবাবু
সত্যবাবুর ছেলেকে সঙ্গে করে রিক্সাতে এলেন। অসুস্থ শরীরে এসেছেন। শ্রীজীবনকৃষ্ণ ভক্তদের
বললেন, ওরে, ধরে ধরে আন।
ভক্তেরা শ্রীকান্তবাবুকে
ধরে এনে ঘরে বসিয়ে দিলেন।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ
শ্রীকান্তবাবুকে জিজ্ঞাসা করলেন—পা’টা কেমন আছে?
শ্রীকান্তবাবু—এখনো
ভালো হতে দিন পনেরো লাগবে। দাদা চলে যাওয়াতে আমার যেন শক্তি চলে গেছে। একটা
স্বপ্ন দেখেছি।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—কি
দেখেছেন বলুন না।
শ্রীকান্তবাবু—দেখছি
যে, একটা খুব বড় পাহাড় তার সামনে দিয়ে একটা রাস্তা গেছে। সেই রাস্তায় আমি আর
দাদা। দাদা আট হাত কাপড় পরে আছে, আমাকে বলছে তুমি এই রাস্তা চিনে রাখ, পরে আসবে।
তারপর আর দেখলুম না, অদৃশ্য হয়ে গেল। এরপরে দেখছি একটা মুরগি, নানা রং, দু'তিনটে ছানা নিয়ে আছে। আর একজন লোক সেই রাস্তা দিয়ে
এলো, ধুতি-পাঞ্জাবি পরা, কাঁধে একটি আড়াই বছরের ছেলে। স্বপ্নটা অনেক দিন আগে
দেখেছি, কিন্তু মানে বুঝতে পেরেছি যেদিন দাদা দেহ রেখেছেন—যে লোকটি আড়াই বছরের
ছেলে কাঁধে নিয়ে এলো, সে আপনি।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ (ভক্তদের
প্রতি)—আচ্ছা আড়াই বছরের ছেলে কাঁধে নিয়ে, সে কে বলতো? কেউ বলতে পারলি না! আড়াই
বছরের ছেলেটা সত্যবাবু। সত্যবাবুকে আমি কাঁধে করে ধরেছি, আর আড়াই বছর কেন বল তো?
সত্যবাবু যে ১২ বছর আমার সঙ্গ করেছে, সেটা ওই আড়াই বছর। কেন শুনবি? আমি জানি যে ২৪
ঘন্টা সঙ্গ করলে তবে সেটা একদিন হবে। তাই ওই ঠিক আড়াই বছর সঙ্গ হয়েছে, তাতেই আমি
কাঁধে করেছি। শুধু ও কেন, প্রত্যেকের ভেতরে আমি ঢুকে আছি তাই তোরা আমাকে কত রকমে
দেখিস। আরও শুনবি? তোরা যে উপার্জন করিস সেটাও আমার।
মঙ্গলবার ১০ই জুন,
১৯৫৮, বেলা প্রায় চারটে। শ্রীজীবনকৃষ্ণ খাটের ওপর হাতে ভর দিয়ে অর্ধশায়িত
অবস্থায় শুয়ে আছেন। রায়মশাই কথামৃত পাঠ করছেন। মেঝেতে বিনয় রায়, দিলীপ ঘোষ, ধনঞ্জয়বাবু,
উপেনবাবু, সুশীলবাবু, শ্রীকান্তবাবু, বঙ্কিমবাবু, অরুণ ঘোষ, ছোট মুরারি বসে কথামৃত
পাঠ শুনছেন। রায়মশাই একটি ১৩/১৪ বছরের ছেলে এনেছেন। ছেলেটি পরশুদিন রাতে শ্রীজীবনকৃষ্ণকে
স্বপ্নে দেখেছে। এই সময়ে নারায়ণ এসে শ্রীজীবনকৃষ্ণকে ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রণাম করে ঘরের
এক কোণে বসল। কিছুক্ষণ পর একে একে অনেকে ঘরে এসে বসলেন।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ
দিলীপ ঘোষকে লক্ষ্য করে বলছেন—আচ্ছা, এই (রায়মশাইয়ের) ছেলেটি কি করে আমাকে আগে না
দেখে স্বপ্নে দেখল? পরে শ্রীকান্তবাবুকে লক্ষ্য করে—আচ্ছা মশাই এই ছেলেটি আমায় কি
করে দেখেছে বলতে পারেন? শ্রীকান্তবাবু চুপ করে থাকলেন। পুনরায়—আমার সেই ড্রাইভারের
(জানকী) কথা মনে পড়ছে, বেদের নিগমের সাধন তার হয়েছিল। আচ্ছা কারুর বেদের নিগমের
সাধনের কথা মনে আছে? বঙ্কিমবাবু—হ্যাঁ, আমার মনে আছে।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—কি
বলুন তো?
বঙ্কিমবাবু—শূন্যতত্ত্ব
থেকে নাদতত্ত্ব, নাদতত্ত্ব থেকে ঈশ্বরতত্ত্ব, ঈশ্বরতত্ত্ব থেকে অবতার তত্ত্ব, অবতার
তত্ত্ব, অবতার তত্ত্ব থেকে আদ্যাশক্তি।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—হ্যাঁ,
ঠিক বলেছেন।
প্রসঙ্গঃ গান—সুরধুনী
তীরে হরি বলে কে, বুঝি প্রেমদাতা নিতাই এসেছে।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—সুরধুনী
তীরে গোটাকতক খোল, গোটা পঁচিশ খঞ্জনি আর দেড়শ লোক নিয়ে কীর্তন করে প্রেম দিচ্ছে।
যার প্রেম দেবার শক্তি হয়েছে সে একটা ঘরে বসে তো দিতে পারে। সে কেন ওই রকম করে
দেবে! আর একটু ঘুরিয়ে দেখতে গেলে দেখা যায় যে বুদ্ধ, যীশুখ্রীষ্ট, মহম্মদও ঠিক ঐরকম
করেছে। এই রকম কীর্তন করে কি প্রেম দিতে পারে? বঙ্কিমবাবু—না, ওদের ব্যষ্টির সাধন।
ব্যষ্টির সাধনে কিছু দান করতে পারে না। শ্রীজীবনকৃষ্ণ—হ্যাঁ, ঠিক বলেছেন তো! ব্যষ্টির
সাধনে কিছু দান করতে পারে না। সমষ্টির সাধন বলে দান করতে পারে।
প্রসঙ্গঃ গান—‘ভাব
ব্যতীত ভাবের বিষয়, অভাবে কি ধরতে পারে?’
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—অভাবে
তাঁকে ধরতে পারে। যে কেউ পারিস বল, প্রমাণ চাই। প্রমাণ না হলে তার কিছুই মূল্য নেই।
কেউ বলতে পারলি না? কেন রে, কেউ বলতে পারছিস না? তোরা সকলে জানিস—যারা আমাকে না দেখে এসেছে, তারা। তাদের কি ভাব টাব
আছে? তাদের কিছুই নেই। দেখ ক্ষিতীশ, সুশীলবাবু একটা স্বপ্ন দেখেছেন। দেখছেন যে
একটা সোলার মানুষ। সেটা আমি। সোলার মানুষটার মুখ দিয়ে খালি কথা বেরোচ্ছে। আর কিছু
তার অস্তিত্ব নেই।
উত্তরপাড়ার কালীবাবু—আপনার
অবস্থা নাদ।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—হ্যাঁ,
ঠিক বলেছিস। আমার অবস্থা নাদ। নাদের ওপরে শূন্য তত্ত্ব, এ কথা আমাদের আগে হয়ে গেছে।
কেউ বলতে পারেনি, বঙ্কিমবাবু বলেছেন।
(ভক্তদের প্রতি)
হ্যাঁরে কটা বাজল? আনন্দদা—পাঁচটা দশ। (এখন চারটে থেকে সাতটা পর্যন্ত কথামৃত পাঠ হয়, কেননা মঙ্গলবার ৩রা জুন হঠাৎ
শ্রীজীবনকৃষ্ণের কলেরার মত হয় তাতে দু-তিনদিন পাঠ বন্ধ থাকে।)
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—তাহলে
হীরু একটু কীর্তন কর না।
এইবার হীরুবাবু
কীর্তন আরম্ভ করলেন—গুরু গৌরাঙ্গ রাধে গোবিন্দ, ব্রহ্ম নারায়ণ হরে কৃষ্ণ রাম।
সকলে এক সুরে
কীর্তন করলেন। কীর্তন সমাপ্ত হলে সকলের প্রণাম করলেন। এবার দিলীপদা কথামৃত পাঠ
করতে লাগলেন।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ (ক্ষিতীশবাবুর
প্রতি)—দ্যাখ, হরেন আমার পা পুজো করতে এসেছিল। আমি না না করি। তারপর সে বলল, আমি
স্বপ্ন দেখেছি যে ঠাকুর আমায় তোমার পা পুজো করতে বলেছেন। তুমি কেন করতে দেবে না?
তখন আমি বললুম, দেখ হরেন, আমায় ঠাকুর পরীক্ষা করছে। আর আমি যদি আমার পা পুজো করতে
দিই তাহলে আমার এইখানে রুদ্ধ হয়ে যাবে। এই কথা আগে বলেছি কিন্তু এখন আর ওই কথা
নয়। এখন নতুন কথা ব্রেনে স্ট্রাইক করছে। কি জানিস? আমার তো আর দুই বোধ নেই, এক
বোধ। এক বোধে কি করে পূজা নেবো? দ্যাখ না, তুই আমাকে দেখেছিস? আনন্দদা—হ্যাঁ। তুই
আমাকে দেখেছিস? দিলীপদা—হ্যাঁ। তুই আমাকে দেখেছিস? সকলেই—হ্যাঁ। (ক্ষিতীশবাবুর
প্রতি পুনরায়)—দেখছিস ঘরশুদ্ধ লোক কি হচ্ছে? আমি—সব এক। তাহলে পুজো নেওয়া চলে না।
আর একটা জিনিস আছে, আমি পূর্ণ, তাই আমার পুজো টুজো কিছুই দরকার নেই। সেটা অজ্ঞাতসারে
চলে এসেছে, তখন বুঝতে পারতুম না। এখন কিন্তু বুঝতে পারছি।
প্রসঙ্গঃ শ্রীরামকৃষ্ণ
বলছেন—গুরুরূপে শ্রীভগবান স্বস্বরূপ দেখাচ্ছেন।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—ক্ষিতীশ,
এর মানে কি বলতো?
ক্ষিতীশবাবু
চুপ করে রইলেন।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—কেন
রে তোরা বলতে পারছিস না? কেন, তোরা কাকে দেখিস? ক্ষিতীশবাবু—আপনাকে।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—তাহলে
এইবার ধর—গুরুরূপে শ্রীভগবান স্বস্বরূপে দেখা দেন। তাহলে তোদের স্বস্বরূপ কে হচ্ছে?
উত্তরপাড়ার কালীবাবু—আপনাকে স্বস্বরূপে পাচ্ছি।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—হ্যাঁ,
ঠিক বলেছিস। তাহলে তোরা যাকে দেহেতে দেখিস সেই তোদের স্বস্বরূপ।
ক্ষিতীশবাবু—তাহলে
গুরুরূপে হচ্ছে।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—হ্যাঁ
রে, গুরু ভগবান, তিনিই তো সব। বুঝতে পারলি না?
কথামৃত পাঠ
সমাপ্ত হলে সকলে কথামৃত মাথায় ধারণ করে শ্রীজীবনকৃষ্ণকে প্রণাম করে নিজ নিজ গৃহে
প্রত্যাবর্তন করলেন।
বৃহস্পতিবার ১২ই
জুন, ১৯৫৮, বেলা চারটে পঁয়তাল্লিশ। শ্রীজীবনকৃষ্ণ খাটের ওপর হাতে হেলান দিয়ে
অর্ধশায়িত অবস্থায় শুয়ে আছেন।
উত্তরপাড়ার কালীবাবু
এসেছেন। ঘর ভর্তি, তাই বাইরে বসলেন। শ্রীজীবনকৃষ্ণ—আহা! কালী বাইরে বসলি? ভেতরে বোস
না। দ্যাখ কালী, ঠাকুর পরমহংস কিন্তু তাঁর ভক্তরা তাঁকে দেখলো না কেন? কিন্তু
এখানে একটা অন্য জিনিস হয়েছে। সেটা কি বল। সেটা কিন্তু আর কোন জায়গায় হয়নি। বল
না রে, তোরা সকলে জানিস। তোরা যে আমাকে দেখছিস এটা কি জগতে হয়েছে? তাহলে পরমহংস
হলে দেখতে পাওয়া যায় না। কিন্তু ঠাকুর প্রেমী পরমহংস। আর একরকম পরমহংস আছে, সে জ্ঞানী।
নিজেরটা হলেই হল। কিন্তু ঠাকুর তা তো নয়, তিনি প্রেমী পরমহংস। প্রেমী পরমহংস মানে
যে কিছু দান করে।
ভোলাদা—পরমহংস
হলেই তাঁকে দেখতে পাওয়া যায় না।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—হ্যাঁ,
পরমহংস হলেই দেখতে পাওয়া যায় না। যদি দেখতে পাওয়া যেত তাহলে তাঁর ভক্তরা দেখত। (রহস্য
করে) তাহলে আমি কি রে বাবা! আমি কি জীবনকৃষ্ণ শালিক, জীবনকৃষ্ণ চড়ুই! না রে বাবা,
এ এক নতুন জিনিস।
প্রসঙ্গঃ শ্রীরামকৃষ্ণ—তুমি
থাকবে ঝড়ের এঁটো পাতা হয়ে। ঝড় যেখানে নিয়ে যায় সেইখানে থাকবে। শ্রীজীবনকৃষ্ণ—ঝড়
মানে মহাবায়ু আর পাতা মানে মন। ঝড়ের এঁটো পাতা হয়ে থাকবে মানে মহাবায়ু মনকে যেখানে
রাখে অর্থাৎ মনকে চতুর্থ ভূমিতে রাখুক, পঞ্চম ভূমিতে রাখুক, আর সপ্তম ভূমিতে রাখুক
সেইখানেই তুমি থাকবে।
প্রসঙ্গঃ শ্রীরামকৃষ্ণ—হাবাতে
কাঠ নিজে যো সো করে ভেসে যায়। কিন্তু যদি একটা পাখি বসে তাহলে ডুবে যায়।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—হাবাতে
কাঠ মানে জীব, পাখি বসল মানে আত্মা সাক্ষাৎকার হলো। জীবের যদি আত্মা সাক্ষাৎকার
হয় তাহলে সে ডুবে যাবে মানে লয় হয়ে যাবে, মরে যাবে।
প্রসঙ্গঃ
শ্রীরামকৃষ্ণ—মনই গুরু।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—(ক্ষিতীশবাবুর
প্রতি), আচ্ছা ক্ষিতীশ এখন আমার গুরু কে বল তো? একটু ভালো করে চিন্তা করে বল। তুই
মনে মনে বিচার করে ধরতে পারবি না। এখানকার বিষয়ে ভেবেচিন্তে বল। (ক্ষিতীশবাবু চুপ
করে থাকায়) আরে বলতে পারছিস না? তোরাই আমার গুরু! (এই কথা শুনে ঘরে দু চারজন হাসছেন)
আরে বুঝতে পারছিস না? তোরা আমাকে দেখছিস আর
আমাকে এসে বলছিস বলে তো আমি বুঝতে পারছি। তা না হলে আমি এ বিষয়ে বিন্দুমাত্র
জানতে পারতাম না। দ্যাখ না, ঠাকুরের ‘মনই গুরু’ কিরকম হচ্ছে শুনবি? ঠাকুর অধরের
চাকরির জন্য মাকে বলছেন। সেখানে কি হচ্ছে? ঠাকুরের মন মায়ের রূপ ধারণ করে বলছে—হ্যাঁ
হবে। কিন্তু হলো না। ঠাকুরকে যখন প্রেসার দেওয়া হলো, তখন ঠাকুর বললেন মহামায়ার জগত
বড় হিজিবিজি। আর ঠাকুরের মতন শুদ্ধ মন আর কারুর নেই। সেখানেও হতে চায় না। তাহলে
কি হচ্ছে? মন গুরু হয় না। আর একটা জিনিস দেখ না। আমাদের চোখের সামনে হচ্ছে আমরা
ধরতে পারছিলাম না। ভাগ্যিস আমার কলেরা হল তাই ধরতে পেরেছি। দেখ না আমরা ভজছি রামকেষ্ট,
পড়ছি রামকেষ্ট, ছবি দেখছি রামকেষ্ট, কিন্তু
দেখছি আমরা জীবনকেষ্ট। এটা সতেরো বছর ধরে চলে আসছে আমরা ধরতে পারিনি। জুন মাসে কলেরা
হবার পর কিরকম দেহটার পরিবর্তন হয়েছিল তাই এটা ধরতে পারছি। কিন্তু এর মানে এখনো
ঠিক ঠিক হয়নি।
প্রসঙ্গঃ গান—করো
তমো নাশ, হও হে প্রকাশ তোমা পদে শরণ চাই।
শ্রীরামকৃষ্ণ
বলছেন—যখন বললে ‘করো তমোনাশ হও হে প্রকাশ’ তখন দেখলুম সূর্য উদয় হলো। আর সকলে তাঁর
শরণাগত হয়ে পড়ল।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—আচ্ছা,
আমাকে কেউ সূর্যের ভেতরে দেখেছিস?
উত্তরপাড়া কালীবাবু—হ্যাঁ,
আপনাকে সূর্যের ভেতরে দেখেছি।
শ্রীজীবনকৃষ্ণ—দেখছিস,
ঠাকুরের অনুভূতির সঙ্গে কি ফারাক! ঠাকুর দেখছেন সূর্য উদয় হলো আর সকলের তাঁর শরণাগত
হয়ে পড়ল। আর এখানে দেখছে সূর্যের ভেতরে পুরুষকে। ঈশোপনিষদে বলছে সূর্যমন্ডলস্থিত
পুরুষকে দেখলে ব্রহ্ম দর্শন করা হলো।