Wednesday, December 9, 2020

শ্রীজীবনকৃষ্ণ পুরীতে

 

   শ্রীজীবনকৃষ্ণ পুরীতে

 প্রতিটি অবস্থান্তরের কালে আমরা দেখেছি শ্রীজীবনকৃষ্ণ নিঃসঙ্গ হয়ে যেতেন। পরিবর্তনের সময়ে বাইরের কোনো প্রেসার তাঁর মাথায় চাপ সৃষ্টি করত। তিনি তাতে কষ্ট পেতেন। তাই তাঁর জীবনের বিভিন্ন পর্যায় তাঁকে এমন করে অন্তরালে নির্জনে যেতে দেখেছি আমরা। জীবনের প্রথম দিকে যখন তিনি সেভাবে মানুষকে তাঁর ঘরে প্রবেশের অনুমতি দেননি, তখন তাঁর এই নিঃসঙ্গ হওয়ার ঘটনা তেমন করে চোখে পড়েনি। কিন্তু পরবর্তীকালে, ১৯৫৪ সালের পরবর্তী সময় থেকে তাঁর দেহান্ত হওয়া পর্যন্ত তাঁকে বহুবার দেখেছি ঘরের দরজা বন্ধ করতে, নয়ত একান্তে অন্য কোথাও দিন কাটাতে। বেঙ্গল বোর্ডিং, শিয়ালদা থেকে মধুপুর ঘাটশিলা পর্যন্ত চলে গিয়েছেন। আবার নতুন অবস্থা দেহে স্থিতিশীল হলে সঙ্গকারীদের প্রবেশের অনুমতি দিয়েছেন। 

১৯৬২ সাল। তাঁর পরমব্রহ্মত্বের অবস্থা। উপনিষদের বহু ওপরের অবস্থা। সে অবস্থায় সাধারণ কথা সাধারণ ব্যবহার তাঁর দেহ নিতে পারছেনা। প্রকাশোন্মুখ সেই সমষ্টি চেতনা তাঁকে ক্রমাগত অসহ গতিতে উর্ধমুখী করছে। কিছুতেই তিনি কদমতলার ঘরটিতে স্থির থাকতে পারছেন না। বহু মানুষের ঢল নামছে। কিন্তু তাঁর অবস্থার সাক্ষী বা ব্যাথার ব্যাথী কেউ হতে পারছেন না। 

       অবশেষে স্থির করলেন তিনি চলে যাবেন পুরী। সমুদ্রের অনন্ত নির্জনতা চেয়েছিলেন তিনি। তিনি এক মহাবিস্ময়। অনন্তকে ধারণা করা অসম্ভব, তবু তাঁর পুরীখণ্ড আমাদের অনুশীলনের বিষয় নিশ্চিত। 

       এই সংকলনে তাঁর পুরীবাসকালে যারা সেখানে তাঁর সঙ্গলাভ করেছিলেন তাদের দিনলিপি ও চিঠির অংশ স্থান পেয়েছে। ভাবলে অবাক লাগে, হাজার হাজার মানুষ তাঁকে দেখছে দেহের ভিতরে, এই অবস্থায়ও মাত্র কয়েকজন তাঁর পুরীবাসের সঙ্গী হয়েছিলেন। সংখ্যাটা কুড়ি পঁচিশের বেশি নয়। এর মধ্যে যারা অবিবাহিত ছিলেন একমাত্র তাঁরাই ওঁর সঙ্গে বসবাস করেছেন। বাকিরা বাসা বা হোটেল ভাড়া করে থেকেছেন। যে যেমন ছুটি পেয়েছেন তেমন ভাবেই গিয়েছেন ওঁর কাছে। 

       এক বছরের কাছাকাছি সময় উনি পুরীতে ছিলেন। এই পর্যায় ওঁর ধর্ম ও অনুভূতি তৃতীয় ভাগ অর্থাৎ বিশ্বব্যপিত্বের পূর্ণ ব্যাখ্যা লেখা হয়েছিল। মাত্র সাতদিনের মধ্যে এই লেখাটি উনি শেষ করেন। 

       এখানে তাঁর পুরীবাসের বিবরণ সংকলিত হল। বিভিন্ন চিঠি ও দিনলিপি থেকে ব্যক্তিগত বিষয়গুলি সরিয়ে রেখে সংকলন করা হল। 

 

 

প্রথম পর্ব (সেপ্টেম্বর ১৯৬২ – ডিসেম্বর ১৯৬২ সাল)

 

৪ঠা সেপ্টেম্বর ১৯৬২, মঙ্গলবার, শ্রীজীবনকৃষ্ণ ঘোষণা করলেন আগামী ৭ই সেপ্টেম্বর শুক্রবার সন্ধ্যের গাড়িতে (পুরী এক্সপ্রেস) তিনি পুরী যাবেন। (অমৃত জীবন)

লিখছেন অবলাকান্ত দত্তঃ ঠাকুরের পুরীগমন স্থির। ভক্তগোষ্ঠী চঞ্চল। সকল ভয় ভাবনা উপেক্ষা করে তিনি রঘুনাথ ও রায়দাকে নিয়ে চলে গেলেন পুরী। এবার ভক্তবৃন্দদের পালা করে যাতায়াত শুরু হল তাঁর সঙ্গলাভের জন্য। রায়দা রইলেন কয়েকমাস শ্রীজীবনকৃষ্ণের সাথী সেবক ও ব্যবস্থাপকরূপে। রায়দার সাহায্যকারীরূপে পরপর গেছে অরুণ, গোবিন্দ, আনন্দ, রামদা, গোপালদা প্রভৃতি। (মাণিক্য ষষ্ঠ বর্ষ ১ম সংখ্যা) 

স্মৃতিচারণে লিখছেন শ্রীদ্বিজেন্দ্রনাথ রায়ঃ কলকাতা থেকে শৈলেন লিখে পাঠাল, -ঠাকুর বোধ হয় শীঘ্র ঘর বন্ধ করবেন। আপনি যদি দেখা করতে চান পত্রপাঠ চলে আসুন। আমার তখন টাকাপয়সার খুব টান। ইচ্ছে থাকলেও যাবার উপায় নেই। বউদির কাছে স্বাভাবিক ব্যবস্থামত ধারে জিনিসপত্র কিনে দিয়েছি। বউদিও বলছেন কলকাতা রওনা হতে। কিন্তু কি করে তা সম্ভব? বিকেলে বেড়াতে বেরুবার সময় অপ্রত্যাশিতভাবে একটি টি এম ও এসে হাজির। হাওড়ায় পৌঁছে স্টেশন থেকে সোজা কদমতলা। গিয়ে দেখি জিনিসপত্র গোছগাছ হচ্ছে। দাদা আমি পুরী যাচ্ছি। আপনি যাবেন?’ জীবনকৃষ্ণ প্রশ্ন করলেন। যাবো তাহলে দাদার একটা টিকিট কাটলেই চলবে’ -রঘুকে নির্দেশ দিলেন। 

৮ই সেপ্টেম্বর পুরী পৌঁছে শ্রীজীবনকৃষ্ণ উঠলেন স্বর্গদ্বারের কাছে প্রিয়ভবনে মাত্র এক সপ্তাহ থেকেছিলেন। সঙ্গে ছিলেন মৃত্যুঞ্জয় রায় দ্বিজেন্দ্রনাথ রায় ও রঘুনাথ সেন। শ্রীদ্বিজেন্দ্রনাথ রায় ওরফে বড়দা ১৩ই সেপ্টেম্বরের (বৃহস্পতি বার) চিঠিতে লিখছেন। ১৫ তারিখ বড়দা ফিরে আসবেন। তার আগে প্রাথমিক চার পাঁচ দিনের কথা লিখছেন।  

       "স্বর্গদ্বারেই বাড়ি আপাতত ঠিক করা গেছে। একটা বড় বাড়ির আউট হাউস। দুখানা ঘর ও সেপারেট রান্নাঘর ও পায়খানা সহ বাড়িটির একাংশ নেওয়া হয়েছে। এখন পুজোর সময়। অন্য বাড়ি পাওয়া দুষ্কর। সবাই চেঞ্জে আসে। বাড়িওলারা অত্যন্ত ভাড়া হাঁকে। বাড়ি ভাড়া পঁচিশ টাকা। একখানা ঘর সকলের জন্য রাখা হল। অপর ঘরটির ভাড়া দেবেন শ্রীজীবনকৃষ্ণ।

       এখানে দ্বিজেন্দ্রনাথ আরও লিখছেন –এখন কার্যত তিনি এখানে পার্মানেন্টলি থাকবেন এমন কথাই কেবল বলছেন।

       এই একটি সপ্তাহ বা প্রথম পাঁচ ছদিনের যে রুটিন দ্বিজেন্দ্রনাথ দিয়েছেন তা এইরূপ। 

       আমরা দুপুরে সমুদ্রের পাড় ধরে বেড়াতে যাই। যথারীতি ধ্যান (যখন তখন) কথামৃত পাঠ ও উপনিষদ পাঠ – তিনবার করে। তিনি বারবার বলছেন, উপনিষৎ এখন প্রকাশ পাচ্ছে ভালো। 

       বস্তুত পুরীবাসের সময় তাঁর ব্রহ্মত্বের বিকশিত রূপ। সেসময় তিনি উপনিষদের অনুভূতি ও ধ্যান, এই দুটি ব্যপারে বেশি জোর দিয়েছিলেন। পরে পরে দেখতে পাওয়া যাবে সমাগত ভক্তবৃন্দের অনুভূতিতেও এই ব্রহ্মত্বের বিকশিত রূপ। 

শ্রীযুক্ত দ্বিজেন্দ্রনাথ রায়ের স্মৃতিচারণ থেকে--

    "পুরীতে পাথরকুটি আউট হাউসে যখন প্রথম গেলাম, রঘু আমি দাদা ও মৃত্যুঞ্জয় ছিলাম। সেখানে মাত্র দুটি ঘর ছিল। একটা মজার প্রসঙ্গ উঠেছিল। দাদা তাঁর সঙ্গে এক খাটে শোয়ার কথা বলায় আমি দাদাকে বললাম--দাদা আমার আবার ঘুমের মধ্যে পা ছোঁড়ার অভ্যেস আছে। দাদা বললেন-তা মারবেন, কি আর করা যাবে, আমিও মারবো। আমি বললাম -ঠিক আছে। অবশ্য ঘুমের মধ্যে নড়াচড়া করিনি। কথাপ্রসঙ্গে দাদা একদিন আমাকে বলেছিলেন-আপনি তো বলছেন আপনার ধ্যানট্যান সেরকম হয় না। আচ্ছা দেখা যাক। আমিও বললাম আচ্ছা দেখা যাক। 

    প্রথম যেদিন পুরী পৌঁছলাম প্রচন্ড বৃষ্টি হচ্ছিল। তার পরেরদিন দাদাকে নিয়ে বেড়াতে বার হয়েছি। পথে একটা দোকানে পুরী ভাজা হচ্ছিল, দেখেই দাদা বললেন -দাদা দেখছেন, কেমন ফুলছে। আমি ভাবলাম সর্বনাশ। যাই হোক, সেখান থেকে ফিরে স্বর্গদ্বারের রাস্তা ধরলাম। সেখানেও দেখি কচুরী ভাজছে। দাদাও দেখলেন। ফিরে এসে বললেন, -দাদা রঘু তো বেরুচ্ছে। বলে দিন যেন ওই দোকান থেকে কচুরী নিয়ে আসে। আমি বললাম আচ্ছা। তিনি তো আবার সেই দিনই খেতেন না, পরের দিন সকালে খেতেন। তাই সেদিন বিকেলে কচুরী আনিয়ে রাখলাম। পরের দিন সেই কচুরী খাওয়া হলো। দুপুরে খাওয়া হলে দাদা বললেন -আচ্ছা দাদা, তাহলে ধ্যান করা যাক। আপনার তো আবার ধ্যান হয় না। আমি বললাম -না। সে রকম হয় না। ওই যে কিসব চিন্তা করতে হয়। 'ওঁ' করতে হয়। ওসব আমার আসে না। দাদা বললেন,  না না, ওসব কিছু আপনাকে করতে হবে না। ও আপনার নিরালম্ব ধ্যান হয়, না? আমি বললাম, হ্যাঁ, কিছু চিন্তা করব না,  চট করে মনটা ভ্যাকেন্ট হয়ে যাবে। বললেন -আরে সর্বনাশ, আপনার তো ফার্স্ট ক্লাস ধ্যান হয়। বললাম দূর ফার্স্ট ক্লাস ধ্যান। বললেন -আচ্ছা আচ্ছা। আপনি সব জানেন না, বসুন। এরপর হঠাৎ প্রশ্ন করলেন -কটা বাজল? আমি বললাম পৌনে তিনটে। চা হয়নি তখনো। উনি বললেন, কাপড়টা একটু ঢিলে দিন, আর আপনি যেরকম মনটাকে ছেড়ে দেন, সেইরকম করুন। আমি একটু ঠাকুর ঠাকুর করেনি। অথচ জানি কিছুই করেন না। খালি আমাদের মন ভুলোবার চেষ্টা। যাই হোক, বসলাম। একটু পরেই সমুদ্রের গর্জন শুনছি। আমার সন্দেহটা থেকে যাচ্ছে, সত্যিই সমুদ্রের গর্জন। অথচ চোখও খুলছি না। দেখছি সব যেন সিনেমার রীল খুলে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পরে দাদা বললেন -দাদা ধ্যান ভাঙ্গলো? আমি বললাম এই একরকম ধ্যান হলো। জিজ্ঞাসা করলেন -কিছু দর্শন হলো? বললাম দর্শনের কথা। সিনেমার মত দেখলাম। হঠাৎ বলে উঠলেন -কটা বাজলো? দেখলাম পৌনে চার। দাদা বললেন -দাদা, ধ্যান তো আপনার হয় না, এইতো একটি ঘন্টা হয়ে গেল। বললাম, ওহো সেই জন্য আপনি ঘড়ি দেখতে বলেছিলেন?"

 বড়দাকে জিজ্ঞাসা করলাম -সেদিন কী দেখেছিলেন বলুন।

 বললেন -প্রথমে দেখলাম একটা প্রকাণ্ড রামধনু। তারপর প্রকান্ড একটা জাল সামনে, যেন ঘুরছে। এইরকম অনেক কিছু দেখলাম পরপর। মাঝে মাঝে আবার সমুদ্রের গর্জনও শুনতে পাচ্ছিলাম। তবে বুঝতে পারছিলাম না সেটা ভেতরে না বাইরে। এরপর দাদা বললেন আচ্ছা একটু উপনিষদ পড়া যাক।

(অষ্টম বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা মানিক্য, স্মৃতিসংগ্রহ, দ্বিজেন্দ্রনাথ রায়।)

       এবারের মতো ফিরে আসছেন রঘুনাথ ও দ্বিজেন্দ্রনাথ। থাকছেন মৃত্যুঞ্জয় রায়। 

যেদিনের চিঠি, তার পরের দিনই, ১৪ই সেপ্টেম্বর শুক্রবার, ওঁরা অন্য বাড়িতে যাবেন। বাসা বদল করবেন। পুরীবাসের প্রথম সপ্তাহটি তাঁরা রইলেন প্রিয়ভবনে 

       এখানে থাকাকালে শ্রীজীবনকৃষ্ণ একদিন দ্বিজেন্দ্রনাথকে জিজ্ঞেস করলেন -আচ্ছা দাদা, আপনাকে বলামাত্র আপনি রাজি হয়ে গেলেন। কেন বলতে পারেন? বড়দা লিখছেন -আমি আর কী বলব? উনিই বললেন -দৈব আপনাকে ঠেলে পাঠিয়ে দিয়েছে। বস্তুত দ্বিজেন্দ্রনাথের পুরীবাসের একটি বিশেষ কারণ, যা আমরা পরবর্তীকালে উপলব্ধি করি, তা হল, শ্রীজীবনকৃষ্ণের এই বিশ্বব্যপিত্বের অবস্থা ও তার অনুভূতির সমর্থনে দ্বিজেন্দ্রনাথেরও উচ্চস্তরের অনুভূতি। ফলে শ্রীজীবনকৃষ্ণ নিজের অবস্থার প্রেক্ষিতে এমন একজনকে পেয়েছিলেন যে তাঁর অবস্থা নিয়ে আর কোনো অস্পষ্টতা ছিলনা। 

বড়দার অসংখ্য অনুভূতির মধ্যে এই পর্যায়ের একটি অনুভূতি উল্লেখ করা যায়। তিনি দেখছেন ব্যালকনিতে শ্রীজীবনকৃষ্ণ দাঁড়িয়ে।  নিচে বহু মানুষ জড়ো হয়ে চিৎকার করছে, “নেমে আসুন। নেমে আসুন মশাই আমাদের মধ্যে। শ্রীজীবনকৃষ্ণ অনেক পরে নিজের কিছু দর্শনের সঙ্গে মিলিয়ে নিয়ে এর ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। ওতে আপনাকে দেখিয়ে দিয়েছে সত্যিকারের ওয়ান এন্ড ওয়াননেসের স্বরূপ। এই বলে বললেন, -ইউ আর দ্যা ভেহিকেল দাদা। আপনাকে প্রণাম হই। (মাণিক্য দশম বর্ষ ৩য় সংখ্যা) 

তাঁর সেই অতি উচ্চ অবস্থা থেকে তাঁকে জনসাধারণের মধ্যে নেমে আসার আহবান জানাচ্ছে জগত। 

এই প্রসঙ্গে মাণিক্যে শ্রীদ্বিজেন্দ্রনাথ রায় পুরীবাসকালে ১৯৬২ সালের কিছু স্বপ্ন মুদ্রিত আছে।  এখানে সেগুলি উল্লেখ করা হলো। 

১) আমার খাটের সামনে ঠাকুর দাঁড়িয়ে আমার দিকে তাকিয়ে হাসছেন। তাঁর মুখে একটি নীল রুমাল কান পর্যন্ত মাথার ওপর থেকে নামানো। আমি তাঁকে ঠাট্টা করে যাচ্ছি, এমন সময় উনি এসেই মুখোশটা আমার মাথায় গলিয়ে দিলেন। আমি বললাম, আরে আরে করছেন কী। ঘুম ভেঙে গেল।

( এই স্বপ্নটা দাদাকে বলতে, বললেন, -দেখুন ঠাকুরের চৈতন্যের অবতরণ সম্বন্ধে আমার সন্দেহ ছিল, কতদূর হয়েছে। আপনার স্বপ্নে এটা বোঝাল ঠাকুরের নীল চৈতন্য দর্শন হয়েছিল। আর আপনারও প্রতীকে দর্শন হলো। আপনার মধ্যে বিশ্বব্যাপিত্বের অনুভূতি বেশি হয়েছে। দেখবেন আপনার নীল চৈতন্য দর্শন হবে কোনো না কোনো সময়ে।

 পরে ১৯৬৯ সালে আমার এই অনুভূতি হয়েছিল। তবে তিনি সেটা জেনে যেতে পারেননি। স্বপ্নটা হল, -দাদা সামনে দাঁড়িয়ে। তাঁর হাতে নীল রং মাখানো আছে। যেমন দোলে রং দেয় তেমনি ভাবে তিনি হঠাৎ আমার মুখে গলা পর্যন্ত রংটা মাখিয়ে দিলেন। আমি বলে উঠলাম, আরে আরে করছেন কী! হঠাৎ দেখি সামনে একটা আয়না। তাতে দেখছি আমার মুখটা গলা পর্যন্ত। স্বচ্ছ কাঁচের মতো। বুঝতে পারলাম, এই হল প্রতীকে নীল চৈতন্য দর্শন। এই দর্শনের পর কতদিন তার রেশ ছিল। কোন হুঁশ থাকত না। তারপর আস্তে আস্তে কমে গেল।)

২)  পুরীতে দাদার কাছ হতে ফেরার সময় ট্রেনের মধ্যে স্বপ্নে সারা রাত ধরে পুরীর বেলাভূমিতে আমি আর দাদা পরস্পরে বালি ছোঁড়াছুঁড়ি খেলছি। যেমন শিশুরা খেলা করে।

৩)  অক্টোবর ১৯৬২। কয়েকদিন নানাভাবে আকাশই কেবল দেখছি। অর্থাৎ গাঢ় নীল, তারা নেই। কখনো ঘোর কালো। আবার দুদিন সমুদ্র দর্শন হলো। একদিন ঘোলা, নদীর জলের মতো বহতা।  আর একদিন শান্ত নীল। তবে রোজই দাদাকে ক্ষণিকের জন্য দেখছি।

৪)  সমুদ্রের তীরে একটি টিলার ওপর একটা শ্বেতপাথরের মস্ত সিংহ। আমার দিকে তাকিয়েই সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়লো, সঙ্গে সঙ্গে আমিও।

৫)  দেখছি চারিদিকে বরফের পাহাড়, আকাশে চমৎকার রঙিন আলোর ছটা ঝিক়্মিক়্ করছে। দাদা বললেন -ওটা কী বলুন তো? আমি উত্তর দিলাম -অরোরা বোরিয়ালিস। দাদা বললেন -ফিজিক্যাল ফেনোমেননটা কিসের জ্ঞাপক? ঘুম ভেঙে গেল।

৬) উজ্জ্বল আকাশে বুদ্ধদেবের মূর্তি (যেন শ্বেতপাথরের) দাঁড়ানো, বরাভয়-কর, চক্ষু স্তিমিত, দেখতে দেখতে উল্টে গেল। দাদা পাশে দাঁড়িয়ে বললেন, -দেখুন দেখুন! উল্টে যাচ্ছে। কেন বলুন তো? এবারও উত্তর দেওয়ার আগে ঘুম ভেঙে গেল।

৭)  সমুদ্রের তীরে একটা প্রকাণ্ড মৃত শূকর--রক্তাক্ত, খন্ডিত।

৮ )  আমি আমার শরীরের ভেতরটা দেখতে পাচ্ছি। তারপর দেখছি আমার ব্রেনের ভেতর একটা বড়সড় পাখি চুপ করে বসে আছে, আর একটা ছোট পাখি খুঁটে খুঁটে খাচ্ছে। দাদাকে স্বপ্নটা বলতেই বলে উঠলেন, -দাদা এ তো আপনার উপনিষদের অনুভূতি হল।

৯) একটা ছোট ঘরের তক্তপোশের উপর দাদা ও আমরা কয়েকজন বসে আছি। পাশের ঘরের দরজার সামনে শ্রীযুক্তা বৌদি দাঁড়িয়ে। দাদা বললেন, -বৌমা কে বসতে বলুন। সমাধি হচ্ছে।

১০)  সমুদ্রের তীরে বালির ওপর সমুদ্রের দিকে পেছন করে  দাঁড়িয়ে দাদা। হিরণ্যশ্মশ্রু, হিরণ্যকেশ, চুলের ও দাড়ির অগ্রভাগ রক্তাভ, হিরণ্যবর্ণ পুরুষমূর্তি। আমি উপনিষদের শ্লোকটি আউড়ে বললাম, -এর চেয়ে আমার দাদাই ভালো।

 (দাদা এই স্বপ্ন শুনে প্রশ্ন করেছিলেন, -আপনি কেন এ কথা বললেন?

 আমি বললাম -তা জানিনা। স্বপ্নে তো একথা বলেছি। দাদা -তাহলেও এখন কী মনে হচ্ছে?

 এই বলেই হুংকার দিয়ে লাফিয়ে উঠে বললেন, -কেন জানেন? মানুষটাই সব।)

১১) ধ্যানে দর্শনঃ পুরীর ঝাউবনে আমি আর দাদা বসে ধ্যান করছি। দর্শন হলো, একটা কালো পাথর বড় সাইজের। তার ওপর কাপড়ের আবরণ দেওয়া। দাদা শুনে ব্যাখ্যা দিলেন, -দাদা আপনার পরমাত্মা দর্শন হয়েছে।

১২)  একটা জ্যোতি ছড়িয়ে আছে। তারপরে দেখি সেটা আমার হাতের তালুতে গম্বুজ আকারে ধরা রয়েছে। দাদা শুনে বলেছিলেন, দাদা এ সবই দেখছি আপনার (আত্মা দর্শন ইত্যাদি) করামলকবৎ। যদিও প্রতীক তবুও একটু উচ্চস্তরের। 

(চতুর্দশ-বর্ষ, স্মারক-সংখ্যা, মাণিক্য, দ্বিজেন্দ্রনাথ রায়ের দর্শন ও অনুভূতি)

১০/৯/৬২ তারিখ। শ্রীজীবনকৃষ্ণ মাত্র তিনদিন পুরীতে গিয়েছেন। সোমবার। কলকাতার মেটেবুরুজে নিজের ঘরে ভোর চারটের সময় স্বপ্ন দেখছেন শ্রীপ্রফুল্ল মণ্ডল। 

       স্বপ্নঃ দেখছি আমার ভেতর ফুঁড়ে একজন বের হল। আমার মতো রোগা। বেরিয়ে নাচতে লাগল। একটা সিল্কের কাপড় পরা। কাপড়টা টেনে  খুলে ফেলল। ভেতরে একটা জাঙ্গিয়া পরা। ভেতরে সব দেখা যাচ্ছে। লিঙ্গ চিহ্ন কিছু নেই। সে ঘর থেকে দালানে গেল আর নাচতে লাগল -আমি মুক্ত হয়েছি, বলে। তারপর এক জোড়া সাদা চটি পায়ে দিয়ে বাইরে চলে গেল বলতে বলতে, মহাপ্রলয় হবে পালাও।  ভাবছি কোথায় গেল তারপরই ভাবছি সবই আমি জীবজগৎ আমি হয়েছি আবার একজন যুবতী মেয়ে আমার ভেতর থেকে বের হলো বেরিয়ে আমাকে গড় হয়ে  প্রণাম করলো। 

 

২৮/০৯/১৯৬২

শ্রীযুক্ত স্মরজিত মন্ডল, যাকে উনি বনগাঁ বলে ডাকতেন, তাঁর চিঠি থেকে পাচ্ছি। 

আজ আমাদের যখন শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত পড়া হচ্ছিল ধীরেনদার  চিঠি এসে পড়াতে শ্রীজীবনকৃষ্ণ সেটা হাতে নিয়ে বলে উঠলেন বললেন, ওরে মৃত্যুঞ্জয়!  তোকে ধীরেন (রায়) চিঠি দিয়েছে। কী লিখেছে পড়। 

       কিন্তু চিঠি খুলে উনি নিজেই পড়লেন।  খুব খুশি হলেন।

দিন কয়েক আগে ইলিশ মাছ এসেছিল।  পাত্র বার করার পর জিজ্ঞাসা করলেন -দেখি কী এনেছে? দেখে রায়দাকে বললেন, দ্যাখ রে, ইলিশ মাছ এনেছে। নিচেরটায় কী রে? দেখেন সন্দেশ। - দেখ  দেখ,  সন্দেশও এনেছে। মাছের কি খাওয়া হবে রে? নিজেই বললেন  তেল  ঝোল কর, আর ভাজা। 

উনি ইদানিং ছ সাত বার ধ্যান করছেন। তবে আধঘণ্টা করে উপনিষদ ও কথামৃত, রায়দা অথবা আমি পড়ি। শ্রীজীবনকৃষ্ণ এখানে এতদিন এসেছেন কিন্তু স্বপ্নে বা ধ্যানে কিছু দর্শন হয়নি। আজ ধ্যানে একটা দর্শন হয়েছে বললেন। (মাণিক্য সপ্তদশ বর্ষ, চিঠি থেকে) 

এই চিঠি থেকে জানা যাচ্ছে যে সেই সময় মৃত্যুঞ্জয় রায়ের সঙ্গে ধীরেন মন্ডল ওনার কাছে ছিলেন।

  

 এই সময় শ্রীযুক্ত আনন্দমোহন ঘোষ পুরীতে আছেন। তিনি কলকাতার সঙ্গকারীদের চিঠি লিখেছেন। সেই সব চিঠির অংশবিশেষ রইল। আনন্দদা চিঠি দিচ্ছেন। 

 

৩/১০/১৯৬২ 

 

গতকালের কথা। কই মাছ মুখে তুলে শ্রীজীবনকৃষ্ণ বললেন, কে মাছ খাচ্ছে বল দিকিনি? আজ কলা মুখে দিয়ে আমাকে বললেন, যেমনি মুখে দিলাম অমনি দেখলাম তোর মুখ। তুই খাচ্ছিস।

       ওঁর এখন যাওয়ার নামগন্ধ নেই। আরো ভালো বাড়ির সন্ধানে আছেন। খুব ধ্যান করছেন ও আমাকে কথামৃত পাঠ করতে বললেন

 

  ৪/১০/১৯৬২

       শ্রীজীবনকৃষ্ণ ধীরেনদার দাদার স্বপ্নের কথা প্রসঙ্গে বললেন,  (স্বপ্নঃ সমুদ্রতীরে দ্বিজেন্দ্রনাথ রায় শ্রীজীবনকৃষ্ণের সঙ্গে বালি ছোঁড়াছুঁড়ি করছেন।) ঐরকম জগন্নাথ সমুদ্রতীরে বালি নিয়ে ছোঁড়াছুঁড়ি করে খেলা করছেন, ভক্তমালে ওই রকম আছে।

 আজ বললেন, আমি ফিরব না, মাস আছি-বাস করবে নগরে, মরবে গিয়ে সাগরে’, আর এ তো দেখিয়েছে (দ্বিজেন্দ্রনাথ রায়ের স্বপ্ন)- সমুদ্রতীরে বালি নিয়ে খেলা।

 উনি বলে দিয়েছেন রায়দাকে-তোমরা যা যা পাঠাচ্ছো তার হিসেব যেন ঠিক মতো রাখা হয়। (মাণিক্য, পঞ্চদশ বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা) 

        উপরের পত্রাংশ দুটি থেকে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে পুরীতে যাওয়ার মাস খানেকের মধ্যেই উনি সেখানে বরাবরের জন্য থেকে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন। সেসময় পুরী সত্যিই নির্জন। এখনকার মতন অজস্র দোকানপাট ও হোটেলে সমুদ্রতীর ভরা ছিলনা। তখনকার পুরী শান্ত ও নির্জন।  সেখানে তিনি  নিজেকে নিয়ে আনন্দে থাকতে পারবেন।

 আরেকটি দেখতে পাচ্ছি, উনি পুরী যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রথম তাঁকে  জগন্নাথ রূপে স্বপ্ন দেখছেন প্রফুল্ল মন্ডল। তিনি কলকাতায় আছেন। সম্ভবত পুরী না যাওয়ার দুঃখ তার মধ্যে থেকে যাচ্ছে। তাই স্বপ্নে তিনি জগন্নাথরূপী শ্রীজীবনকৃষ্ণকে দেখছেন এবং শান্ত হচ্ছেন। দ্বিতীয় স্বপ্ন দেখেছেন শ্রীদ্বিজেন্দ্রনাথ রায়। যার প্রতি শ্রীজীবনকৃষ্ণের ধারণা অতি উচ্চ ছিল। তিনি দেখছেন সমুদ্রতীরে তিনি ও শ্রীজীবনকৃষ্ণ বালি নিয়ে ছোঁড়াছুঁড়ি খেলছেন। এবং জীবনকৃষ্ণ বলছেন ভক্তমালে এমন ঘটনার উল্লেখ আছে, জগন্নাথ সমুদ্রতীরে বালি নিয়ে খেলছেন। এই দুটি স্বপ্ন থেকে আমরা ধারণায় আসতে পারি, পুরী যাওয়ার এক মাসের মধ্যেই তাঁর মধ্যে বিশ্বরূপের প্রকাশ ঘটেছিল। জগন্নাথ বিশ্বরূপের প্রতীক।  

পরে পরে আমরা আরো দেখতে পাবো যে বহু মানুষ তাঁকে জগন্নাথ রূপে স্বপ্নে দেখেছেন এবং বিচিত্র অনুভূতি লাভ করেছেন। এ জগতে এমন নজির আর নেই। এমন ঘটনা এর আগে কখনো ঘটেনি। কিন্তু আত্মার মধ্যে জগত এই অবস্থায় বিরাজিত শ্রীজীবনকৃষ্ণের মধ্যে এ অতি স্বাভাবিক বিকাশ।  সে সময় বলা চলে তাঁর স্বাভাবিক অবস্থার প্রতীক জগন্নাথ। 

       উনি পাথরকুঠিতে আছেন। প্রফুল্লবাবু (মেটেবুরুজের প্রফুল্ল মণ্ডল) চিঠি দিয়েছেন। তিনি স্বপ্ন দেখছেন-

 ভোর পাঁচটা। দেখছি জগন্নাথ সামনে দাঁড়িয়ে, হঠাৎ জীবনকৃষ্ণ ভেতর ফুঁড়ে বার হলেন ও সাদা ধবধবে মূর্তি হয়ে গেলেন। মুখটা গোল। টানা টানা চোখ। আমাকে বলছেন, তুই বারবার পুরী আসবিনা। এই দেখ জগন্নাথ। বলরাম ডান দিকে দাঁড়িয়ে, শ্রীজীবনকৃষ্ণ বললেন, তুই কেমন আছিস? বললাম, শরীর বড়ই খারাপ। বললেন, ভগবানের যতদিন দরকার ততদিন শরীর থাকবে। ৭৬১ নম্বর (ধর্ম ও অনুভূতি) ব্যাখ্যা দেখে নিস। আমি তোর ভেতরে বরটি সেজে মানুষ রতন হয়ে বসে আছি। 

       শ্রীযুক্ত আনন্দমোহন ঘোষ পুজোর কিছু আগে তাঁর কাছে প্রায় চোদ্দ দিনের ছুটি নিয়ে গিয়েছিলেন। সময়সারণি অনুসরণ করলে আমরা দেখতে পাবো যে অক্টোবর মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে চোদ্দ  দিন তিনি তাঁর কাছে ছিলেন। এটি সেইসময়ের স্মৃতিচারণ। তখনও পুরীতে বর্ষা। আমরা দ্বিজেন্দ্রনাথ চিঠিতেও জানতে পারছি যে, সেবার খুব  বৃষ্টি পড়েছে এবং রাস্তাঘাট কাদায় কাদা। এমনকি রিকশায় যেতে যেতে তাঁরা বৃষ্টি পেয়েছেন। আনন্দদাও এসে বলছেন যে এখানে খুব বৃষ্টি হচ্ছে। চারিদিকে ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ছে এবং এতই বর্ষা যে ব্যাং উঠে আসছে দালানে। 

       পুরীতে আনন্দদার প্রথম দিন। ট্রেন থেকে নেমে সকালবেলায় পৌঁছেছেন পাথরকুঠি। 

       আনন্দদা লিখছেন, -“শ্রীজীবনকৃষ্ণ এখানে মাসাধিককাল হলো অবস্থান করছেন। একটু আগে উনি প্রাতঃভ্রমণ সেরে ফিরেছেন। প্রণাম করতে গেলে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। প্রশ্ন করলেন, ট্রেনে কষ্ট হয়নি তো? সকলের খবরাখবর নিলেন। তারপর ব্যস্ত হয়ে বললেন, জামাকাপড় বদলে হাত মুখ ধুয়ে জল খেয়ে বিশ্রাম কর। তখন রায়দা ওঁর সঙ্গে ছিলেন। উনি বললেন, মৃত্যুঞ্জয় একে জলখাবার দে”।  

 আনন্দদা লিখছেন –“একদিন সকালে চা পানের পর বললেন, আয় একটু বেড়িয়ে আসি। আনন্দে ওঁর সঙ্গে সমুদ্রতীর ধরে চলেছি। সবে সূর্য উঠেছে। জেলেরা জালের দড়ি ধরে টেনে সমুদ্রতীরে জড়ো করছে। উনি বললেন, দেখ এই নুলিয়ারা সেই আদিম বৃত্তি নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছে। নেচারকে এক্সপ্লয়েট করে জীবনধারণ করছে। সমুদ্রে মাছ জন্মায়, সেই মাছ ধরে খেয়ে এরা বেঁচে আছে। বুনোরা গাছে ফল হয়, তাই খেয়ে, জন্তু-জানোয়ার শিকার করে বেঁচে আছে। কিন্তু যারা চাষ করছে তারা কি করছে? তারা আর্টিফিশিয়ালি ঋতু অনুসারে ফলাচ্ছে এখান থেকে সভ্যতার সূত্রপাত।

       কথা কইতে কইতে চলেছেন। এত জোরে হাঁটছেন যে পিছিয়ে পড়ছি। একরকম প্রায় আধা দৌড়ে চলেছি। হাঁটতে হাঁটতে ফ্ল্যাগস্টাফ  এর কাছে এসে পড়েছি। সিমেন্ট বাঁধানো বসার জায়গা দেখে বলছেন, আর একটু বসা যাক। কিছুক্ষণ বসার পর বললেন, এই যে সমুদ্র আকাশ দেখিস এসব বাইরে বিক্ষেপ করে দেখছিস। আবার জগত যা দেখছিস সব তোর ভেতরে। আচ্ছা চোখ বুঁজে থাক। তাই করলাম।  কিছুক্ষন চুপ করে বসে আছি। সময়ের কোন হুঁশ নেই। ওঁর কথা কানে এলো। কী দেখছিস? বললাম, যেন দু তিন মাইল ওপর থেকে আকাশ সমুদ্র সমেত পৃথিবীটাকে দেখতে পাচ্ছি। বললেন, এবার চোখ খোল। চোখ চাইতেই দেখি আমার প্রতি অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। বললেন, একেই বেদান্তের অনুভূতি বলে। আজ তোর তা হয়ে গেল এক কথায়”।

এ সময় শ্রীজীবনকৃষ্ণকে কেন্দ্র করে বেদান্তের সাধনের যে পর্যায়গুলি ক্রমশ বিবর্তিত হচ্ছিল তারই একটি প্রকাশ আনন্দমোহন ঘোষের এই অনুভূতিতে। তাঁর কথা অনুসারে এটি বিশ্বরূপ দর্শনের একটি ফুট। আত্মার মধ্যে বিশ্বকে অনুভব হয়, নিজের মধ্যে জগতকে দেখা। 

সেদিন দুপুরে যখন মৃত্যুঞ্জয় রায় রান্নাঘরে কাজে ব্যস্ত তখন শ্রীজীবনকৃষ্ণ ও আনন্দদা পাঠে বসেছেন। আনন্দদা পাঠ করছেন। উনি ধ্যান করছেন। রান্নাঘরে কৌটো বাসনপত্রের শব্দ হতে লাগল। ঝনঝন করে বাসন পড়ার শব্দে ধ্যান করতে করতে উনি চমকে উঠলেন। ধ্যান ভেঙে গেল। কিছুক্ষণ গুম হয়ে বসে রইলেন। বললেন, এতে বৈষ্ণব অপরাধ হয় রে। তারপর বললেন, পড় পড়।  পাঠ করতে লাগলেন আনন্দদা। উনি চুপ করে শুনতে লাগলেন। 

 আনন্দদা লিখছেন -কাল সন্ধ্যেবেলা পাথরকুঠির আউট হাউসে  আমরা ছিলাম। তার চওড়া খোলা বারান্দায় পাঠ শুরু হল। অবিরল ধারায় ঝিম ঝিম বৃষ্টি পড়ছে। রায়দা কথামৃত পাঠ করছেন জীবনকৃষ্ণ ও আমি ধ্যান করছি। ওঁর মুখোমুখি বসেছি। হারিকেনের আলো টিমটিম করছে। কিছুক্ষন পর শ্রীজীবনকৃষ্ণের ওঃ ওঃ শব্দে সচকিত হয়ে দেখি উনি উঠে দাঁড়িয়েছেন ও কাঁপছেন। একেবারে হেলে পড়লেন। উঠে দাঁড়িয়ে দুহাত দিয়ে জাপটে ধরলাম। নয়তো পড়ে যেতেন। ব্যাপারটা বুঝতে পারছিনা, এমন সময় ওঁর পরনে ধুতির ভেতর হতে একটা বড় ব্যাং থপ করে মেঝেয় পড়ল। জোরে লাথি মেরে সেটাকে দূরে ফেললাম। উনি ক্রমে স্থির হয়ে বসলেন। আবার পাঠ শুরু হল।

 ১৯৬২ সালের দুর্গাপুজো।  সম্ভবত সেপ্টেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহ। অষ্টমীর দিন। রায়দার (শ্রীমৃত্যুঞ্জয় রায়) প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও জীবনকৃষ্ণ আনন্দকে নিয়ে চললেন বেড়াতে। ক্রমে মন্দিরের কাছে এলে মন্দির দেখিয়ে উনি বললেন -দ্যাখ না। মন্দিরে কাঠের মুরোদ বসিয়ে পান্ডারা আট শো  বছর ধরে লোক ঠকিয়ে খাচ্ছে।  

আনন্দদার স্মৃতিকথা থেকে জানতে পারছি-

 দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পর বিশ্রাম শেষে আড়াইটে নাগাদ পাঠ শুরু হলো। রায়দা পাঠ করলেন। শ্রীজীবনকৃষ্ণ ও আমি ধ্যান করলাম। সাড়ে চারটে নাগাদ পাঠ সমাপ্ত করে বিস্কুট ও চা খাওয়া হলো। বিকেলে আমি ও রায়দা সমুদ্রের ধারে বসলাম। দোকানে কিছু কেনাকাটা করে সন্ধের আগে ফিরলাম। হ্যারিকেন জ্বেলে বারান্দায় পাঠ ও ধ্যানের আসর বসল। রায়দা পাঠ করলেন সমাপ্ত হল। রাত আটটায় আহারাদির পর শয়ন। অতি ভোরে উঠে আবার পাঠ ও ধ্যান।  কেউ কোন স্বপ্ন দেখেছে কিনা জিজ্ঞাসা করলেন। বললাম। এরপর চা পর্ব। চা খেয়ে উনি বেড়াতে বার হলেন।

ঝাঁটপাট দিয়ে আমাদের কাজ শুরু হলো। বাটনা বাটার কাজ আমার ওপর। কষ্টকর ব্যাপার। উপায় নেই, হুকুম তামিল করতেই হবে। এমন সময় শ্রীজীবনকৃষ্ণ ঘর্মাক্ত কলেবরে বেরিয়ে ফিরলেন। জুতা খুলে হাতে নিয়ে ঘরে ঢোকার আগে তাকালেন। বললেন, ওরে শোন। তাড়াতাড়ি হাত ধুয়ে কাছে এসে তাঁর পাঞ্জাবিটা দড়িতে মেলে দিলাম। একটু মৃদু স্বরে বললেন, বাটনা বাটা শেষ করে হাত ধুয়ে হাতের চেটোয় একটু সরষের তেল মেখে নিবি, হাতের জ্বালা কমে যাবে। 

(কত কথা পড়ে মনে, শ্রীযুক্ত আনন্দমোহন ঘোষ)

 শ্রীজীবনকৃষ্ণ পুরী যাওয়ায় ভক্ত মন্ডলীর মধ্যে অনেকেই তাঁর অদর্শনে কাতর হল। সকলের পক্ষে পুরী গিয়ে হোটেলে থেকে ছুটি নিয়ে তাঁর সঙ্গ করা সম্ভব হয়নি। তাছাড়া তাঁর সঙ্গে একই বাড়িতে কোন বিবাহিত লোক ছিলেন না।

পুজোর সময়ে গিয়েছেন শ্রীযুক্ত অনাথ নাথ মন্ডল। স্মৃতিকথায় লিখছেন -সপ্তাহ খানেকের জন্য আমি, অশোকদা, (অশোক কুমার ঘোষ) ও অনিল (অনিলকৃষ্ণ নাথ) তিনজনে পুরী যাই, ও হাওড়া মোটর কোম্পানির পুরীর বাড়িতে উঠি। আমরা যেদিন পুরী পৌঁছলুম ওই দিন বিকেলে ওঁর কাছে গিয়ে দেখলাম উনি ঘরের সামনে দাওয়ায় শতরঞ্জির ওপর, আর রায়দা ঘরের দরজার চৌকাঠের উপর বসে আছেন। আমাদের দেখে উনি খুব আনন্দ প্রকাশ করলেন। উনি আমাদের কুশল প্রশ্নের পর বললেন, হ্যাঁ রে?  চীনেরা কতদূর এগিয়ে এলো বাবা? সন্ধ্যা হলে শ্রীজীবনকৃষ্ণ আমাকে হ্যারিকেনের আলোয় শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত পাঠ করতে বললেন।

 সাড়ে নটা নাগাদ পাঠ শেষ হলে উনি বললেন, মৃত্যুঞ্জয়ের ছুটি শেষ হলে চলে যাবে। আমাকে একলা থাকতে হবে। তাতে কি হয়েছে?  আমি ঠিক থাকতে পারবো। 

আমরা বুঝতে পারছি যে তিনি কোনো ছেলেছোকরা কি আর কারোকে তাঁর সুবিধের জন্য রাখতে ইচ্ছুক নন। এও এক রকম গ্রহন কিনা। তারা যদি স্বেচ্ছায় তাঁর কাছে থাকে সে কথা আলাদা। না হলে তাঁর সেবার জন্যে তাঁর কাছে থাকায় তাঁর আপত্তি ছিল। যদিও পরবর্তী সময়ে দেখতে পাচ্ছি যে ছেলে ছোকরারা কেউই তাঁকে একা ছাড়েননি। এবং যথেষ্ট সেবা করেছেন। আর সে সেবা তিনি গ্রহণও করেছেন এই কারণে যে এতে করে ছেলেদের তাঁর সঙ্গ লাভ হচ্ছে। সেই সঙ্গলাভে তাদের আত্মিক উন্নতি হচ্ছে, তাঁর কথা ধারণা হচ্ছে, এ তিনি অনুভব করেছিলেন।  

  অনাথ নাথ মণ্ডলের স্মৃতিকথায় এ পর্যায়ে আর বিশেষ কিছু নেই সম্ভবত সে সময় পাথরকুঠিতে পাঠ ও ধ্যান ছাড়া আর বেশি সময় এরা কাটাতে পারেননি। তবে পরে আবার পুরী গিয়েছেন

(শ্রীজীবনকৃষ্ণ সংশ্রয়, শ্রীযুক্ত অনাথ নাথ মণ্ডল)

এই ক্ষুদ্র আলোচনায় একটি জিনিস আমরা দেখতে পাচ্ছি যে বাইরের জগতের সমস্ত খবর থেকে যিনি দূরে সরে থাকতেন তিনি অনাথদাকে  জিজ্ঞেস করছেন যে, হ্যাঁরে বাবা চীনেরা কতদূর এগিয়ে এলো? কেন এই প্রশ্ন? এ কথা মনে করতে গেলে মনে পড়ে ১৯৪৭  সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার আগের কয়েকদিন ওনার মনে এইরকম অস্থিরতা জেগেছিল। ছটফট করছেন কখন দেশ স্বাধীন হবে। এর কারণ হিসেবে বলেছিলেন যে, মাথায় যদি দাসত্বের সেল থাকে তাহলে মুক্তি হয় না। মুক্তির জন্য প্রথম শর্ত হলো মাথায় কোনো রকম পরাধীনতা বোধ থাকবে না। পুরী থাকাকালীন ১৯৬২ সালে ভারতবর্ষ আবার চীন আক্রমণের সম্মুখীন হয়। সম্ভবত তার মনে আশঙ্কা  জেগেছিল যে ইংরেজদের পর এবার কি তবে ভারতবর্ষ চীনের অধীনে যেতে চলেছে? তা যদি হয় তাহলে আবার দাসত্বের সেল জাগবে। সম্ভবত এ কারণেই তিনি চীন কতদূর এগিয়েছে এর সংবাদ বেশ কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করেছেন। এমনকি স্টেটসম্যান কিনে আনা হয়েছে। পড়ে জেনেছেন চীনের অবস্থা কি, যুদ্ধের অবস্থা কি।  

 

২৯শে অক্টোবর ১৯৬২ তারিখে শ্রীজীবনকৃষ্ণের কাছে গেলেন অতীন্দ্রগোপাল সিংহরায়। বৃদ্ধ মানুষ। নবদ্বীপ থেকে হাওড়া হয়ে গেলেন পুরী। 

     তিরিশে অক্টোবর তারিখে শ্রীঅরুণ ঘোষ চিঠি দিয়েছেন ধীরেন্দ্রনাথ রায়কে।

 গতকাল এখানে বেশ দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া গেছে। সারাদিন অবিরাম বৃষ্টি, বিকেলে ঝড় শুরু হল। সারারাত বৃষ্টি। মুষলধারে বৃষ্টি চলেছে আজ সাতদিন ধরে। কাল রাতে আমাদের দুটো ঘরে প্রচুর জল পড়েছে। ঠাকুরের ঘরে এত বেশি বৃষ্টি পড়েছে যাতে তাঁর বিছানা পর্যন্ত কিছুটা ভিজে গেছে। আমরা যতটা পেরেছি চৌকি সরিয়ে ব্যবস্থা করেছিলাম। এখনই অন্য ঘর পাওয়া সম্ভব নয়। আমাদের বাড়ির কেয়ারটেকার বুড়ো বলেছে, সামনে দোতলা বাড়িটা খালি হবে। সে কারণেই হয়তো কিছুদিন থাকতে হবে যতদিন না ব্যবস্থা হয়।

 

        এই মাত্র সিংহরায় মশাই এসেছেন (নবদ্বীপের)। উনি বললেন, ‘এই রে’। অথচ আসতেই একেবারে জড়িয়ে ধরে কত কথা। ‘বেশ হয়েছে, আপনি এসেছেন’, বলে ভাব ও সমাধিস্থ। এ অপূর্ব  দেবচরিত্র কী বুঝবে বল। দু'চারদিনের মধ্যে ভোলাদার বাবা আসবেন। ঘরের সন্ধানে আছেন, আশা করা যায় আজই পেয়ে যাবেন। উঠেছেন ভারত সেবাশ্রম সংঘে। মাসখানেক থাকবেন হয়তো। রায়দা একদিন আগে যাবেন। সেটা নির্ভর করছে রিজার্ভেশন এর ওপর। বেশ আনন্দে আছি। 

 

 

(পুরীধামে শ্রীজীবনকৃষ্ণ সঙ্গে, শ্রীযুক্ত অতীন্দ্রগোপাল সিংহরায়, রচনাটি থেকে দিনলিপি উদ্ধৃত করা হল)

 সেই কার্তিক মাসে প্রায় আট দশ দিন অকাল বর্ষণে বন্যা প্লাবিত।  ৩০শে অক্টোবর পৌঁছে তিনি ভারত সেবাশ্রমে উঠলেন এবং অচিন্ত্যধামের ঘর ভাড়া নিলেন। সেখান থেকে একটু গেলেই পাথরকুঠির গেস্ট হাউস। প্রিয় ভবন থেকে ১৫ই সেপ্টেম্বর এখানেই চলে এসেছেন শ্রীজীবনকৃষ্ণ। এ বাড়ির আউট হাউসে আছেন তিনি।

 শ্রীযুক্ত সিংহরায় লিখছেন -  আজ রোদ উঠেছে।শ্রী জীবনকৃষ্ণ বারান্দায় বসে আছেন এবং মৃত্যুঞ্জয় (রায়) ও অরুণ (ঘোষ) দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে দেখামাত্র অরুণ বলে উঠল, সিংহরায় মশাই এসেছেন। শোনামাত্রই শ্রীজীবনকৃষ্ণ তাড়াতাড়ি উঠে এসে রাস্তার মধ্যে আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।

ওপরের ডায়েরি থেকে জানা যাচ্ছে তখন শ্রীজীবনকৃষ্ণের কাছে আছেন অরুণ ঘোষ ও মৃত্যুঞ্জয় রায়।

 সেদিনই কথামৃত দ্বিতীয় ভাগের দ্বাবিংশ খন্ড থেকে পাঠ করছেন সিংহরায় মশাই। শ্রীজীবনকৃষ্ণ কি একটা ব্যাখ্যা দিতে দিতে মৃত্যুঞ্জয ও অরুন কে ডাকলেন এবং কুণ্ডলিনী শক্তি জাগ্রত হয়ে কিভাবে ব্রহ্মে পরিণত হয় তাই দেখাচ্ছিলেন। ঠিক সেইসময় অরুণের কুণ্ডলিনী শক্তি জাগ্রত হয়ে তার দেহকে তোলপাড় করতে লাগল। শ্রীজীবনকৃষ্ণ প্রকৃতিস্থ হয়ে মৃত্যুঞ্জয়কে তাড়াতাড়ি অরুণকে ধরতে বললেন। আর আমাকে বললেন, ওর ঈশ্বর দর্শন হয়েছে। কিন্তু ও জানে না। তাই এই অবস্থা। আমি দেখে অবাক হয়ে রইলাম। আবার কিছুক্ষণ পাঠের পর কুণ্ডলিনী বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে হঠাৎ জোরে হুংকার দিয়ে খাটের উপর প্রায় একহাত সমস্ত দেহ সমেত লাফিয়ে উঠলেন।৩০/১০/১৯৬২ তারিখে শ্রীঅরুণ ঘোষ চিঠি দিয়েছেন ধীরেন্দ্রনাথ রায়কে।

 গতকাল এখানে বেশ দুর্যোগ পূর্ণ আবহাওয়া গেছে। সারাদিন অবিরাম বৃষ্টি, বিকেলে ঝড় শুরু হল। সারারাত বৃষ্টি। মুষলধারে বৃষ্টি চলেছে আজ সাতদিন ধরে। কাল রাতে আমাদের দুটো ঘরে প্রচুর জল পড়েছে। ঠাকুরের ঘরে এত বেশি বৃষ্টি পড়েছে যাতে তাঁর বিছানা পর্যন্ত কিছুটা ভিজে গেছে। আমরা যতটা পেরেছি চৌকি সরিয়ে ব্যবস্থা করেছিলাম। এখনই অন্য ঘর পাওয়া সম্ভব নয়। আমাদের বাড়ির কেয়ারটেকার বুড়ো বলেছে, সামনে দোতলা বাড়িটা খালি হবে। সে কারণেই হয়তো কিছুদিন থাকতে হবে যতদিন না ব্যবস্থা হয়।

        এই মাত্র সিংহরায় মশাই এসেছেন (নবদ্বীপের)। উনি বললেন, ‘এই রে’। অথচ আসতেই একেবারে জড়িয়ে ধরে কত কথা। ‘বেশ হয়েছে, আপনি এসেছেন’, বলে ভাব ও সমাধিস্থ। এ অপূর্ব  দেবচরিত্র কী বুঝবে বল। দু'চারদিনের মধ্যে ভোলাদার বাবা আসবেন। ঘরের সন্ধানে আছেন, আশা করা যায় আজই পেয়ে যাবেন। উঠেছেন ভারত সেবাশ্রম সংঘে। মাসখানেক থাকবেন হয়তো। রায়দা একদিন আগে যাবেন। সেটা নির্ভর কর ছে রিজার্ভেশন এর ওপর। বেশ আনন্দে আছি। 

 

৩১/১০/১৯৬২ তারিখে আবার রঘুনাথ সেনকে পুরী থেকে চিঠি দিচ্ছেন অরুণ ঘোষ। 

স্টেশনে বসে লিখছি।  রায়দার রিজার্ভেশন এর জন্য এসেছি। ‘বুড়ো বাবা’ সাথে এসেছেন। ওয়েটিং হলে বসতে চেয়েছিলেন। কিন্তু একটু দূরে গাছ তলায় একটা বেদীমতো আছে, সেখানে বসিয়ে দিয়েছি। মাঝে মাঝে অভিভাবকের মতো আচরণ করছি। তোমাদের শুভেচ্ছায় মহা আনন্দে আছি। রায়দার স্টোভটা কি মেরামত করেছ? যদি না করে থাকো অবিলম্বে করবে। আগে যা জিনিসের কথা লিখেছি তার সাথে জারক লেবু সামান্য কিছু পাঠাবে। রায়দার সাথে সমানে তাল দিয়ে চলেছি। খুব ভালো হতো যদি একদিন রাঁধতে দিতেন। মুখে বলেন, কিন্তু কাজের সময় ছাড়তে চান না।

 যাহোক বেশি চিন্তার কারন নেই। সবার পক্ষে ওঁর সাথে তাল মিলিয়ে চলা সম্ভব নয়, বেশ বুঝতে পারছি। সাত-আট দিন বাদে আজ মেঘ কেটে গেছে। রোদ উঠেছে। বুড়োর কী আনন্দ সূর্য দেখে। কারণ দুপুরে বেশ একটা ভেলকি হলো। শোনা গেল, এই ব্রহ্মবিদ্যার নাশ নেই। একান্ত ব্যক্তিগত, তাই এসব কথা পরে বলা যাবে একান্তে। বাজিগরই সত্য। একত্ব, ব্রহ্মত্ব ইত্যাদি তথ্য বোঝাচ্ছেন।

 

 

৩১/১০/১৯৬২ 

(অতীন্দ্রগোপাল সিংহরায়ের ডায়েরি থেকে)

দুপুরে-

 তিনি ধ্যানে বসলেন না কথামৃত পাঠ চলতে লাগলো কত রকম নতুন নতুন ব্যাখ্যা দিচ্ছেন।

 আমাকে উপনিষদ কেন দেখাচ্ছেন সেই কথায় বললেন -কতদিন আমি এইসব কথা বলেছি। কিন্তু কোনোরূপ সাপোর্ট পাইনি।  সেজন্য মনে খুঁতখুঁতানি ছিল। ভগবানের এমনি লীলা যে কালে উপনিষদগুলি আমার হাতে এসে পড়তে লাগলো। তাতে এইসব একত্বের কথা, আমাকে দেখার ফল কী, আপনাদের সব কী হয়েছে ও হচ্ছে, সেইসব মিল দেখে ভাবলুম, যাক এখন একটা প্রমাণ পাওয়া গেল। উপনিষদ না পেলে, কোন অতীতে যে ব্রহ্মজ্ঞান হয়েছিল এবং এখানে যে কী হচ্ছে তার প্রমান পাওয়া যেত না। সেকালে ঋষিদের  একত্ব হোক বা না হোক, তাঁরা ব্রহ্মবিদ ছিলেন সন্দেহ নেই। যদিও প্রমাণ রেখে যেতে পারেননি তবু বলে গেছেন। ... আজকাল কথামৃতের যা ব্যাখ্যা দিচ্ছেন সমষ্টির ওপর।

১/১১/১৯৬২

 দেখুন কত দিন আমি  আমাকে দেখার ফল কি তা বলেছি, কিন্তু জগত নিতে পারছে না। তাই একটা সাপোর্ট খুঁজছিলাম। যাতে প্রমাণ দিতে পারা যায়। ভগবান কৃপা করে তাই উপনিষদ আনিয়ে দিলেন। যাতে আমার অবস্থা আর আপনাদের অবস্থা কি বিশদভাবে সমর্থন পাওয়া গেল।

 পুরীতে আশার কথায় বললেন, তিনি এখন নির্জনে একা একা থাকতে ভালোবাসেন। জিজ্ঞাসা করলাম-আপনি চলে এলেন, ভক্তেরা কি সব নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে? তাতে তিনি বললেন ভগবানের লীলা ভগবানই করবেন। 

২/১১/১৯৬২

মৃত্যুঞ্জয় রায় পুরী থেকে কলকাতা ফিরলেন। তিনি টানা সেপ্টেম্বর থেকে এতদিন রইলেন।

 ব্রহ্মজ্ঞানের কথায় দুজন থাকবে না একজন থাকবে ইত্যাদি নানা কথার পর আক্ষেপ করে বললেন, -কী বলবো সিংহরায় মশাই? যদি কেউ এই ব্রহ্মজ্ঞান কী আর তার পরিণতি কী এবং যারা আমাকে দেখছে তাদের অবস্থা কি বুঝতো তাহলে সে আমাকে জড়িয়ে ধরে থাকতো। আমাকে বললেন, আপনারা আমাকে কী বুঝেছেন আর আমি যা বলে যাচ্ছি তা কি ধারণা করতে পেরেছেন?

 সিংহরায় মশাই -আমরা আর কিছু বুঝি না বুঝি, বেশ একটা কি হচ্ছে - এটা বেশ বুঝছি।

 শ্রীজীবনকৃষ্ণ -তাহলেই বুঝুন, আপনি কোন ভূমি থেকে কথা বলছেন। অর্থাৎ চতুর্থভূমিতে মনে এলে কি হয় - সাধক দেখে আর বলে, বেশ হচ্ছে। কিন্তু এসব কথা হচ্ছে সপ্তমভূমিরও পার।

 দেখুন, আপনারা এতদিন আমার সঙ্গ করছেন, নতুন নতুন লোক এলে তাদের কি অবস্থা হত তাও আপনারা জানেন। এসবের জন্য যারা আসে তাদের কিসে ভগবান লাভ হয়, আমি বিশ বছর ধরে তার জন্য হ্যামার পেটাচ্ছি। এমন কতদিন খাবার সময় পাইনি। ঘুমোবার সময় পাইনি। আর এখন এসব ভালো লাগছে না। এখন নির্জনে একা একা থাকি এই ইচ্ছে। ঝামেলা ভালো লাগেনা।

তাঁর আর হাওড়া ফিরে যাওয়ার ইচ্ছে নেই। তবে যদি এখানে অসুবিধে হয় কাশী গিয়ে থাকবেন। তবে কাশীতে বড় কনজেস্টেড।  আর এখানটা অনেক ফাঁকা। সিজিন টাইম ছাড়া ফাঁকা।

(অরুণ মৃত্যুঞ্জয় কে নিয়ে স্টেশনে যাচ্ছে)

 কেনোপনিষদ বের করে ব্যাখ্যা দিলেন -দেবাসুর সংগ্রামের পর অসুরেরা হেরে গেলে দেবতারা উৎসব করছেন, আর নিজ নিজ শৌর্যবীর্যের জন্য অহংকার করছেন। তখন ব্রহ্ম যক্ষের রূপ ধারণ করে দেবতাদের শক্তি পরীক্ষার জন্য উপস্থিত হলেন। দেবতারা অপারগ হলে হৈমবতী তাঁদের জানিয়ে দিলেন -এ শক্তি তোমাদের নয়, ব্রহ্মের। -লাঠি ধরে নিয়ে যাওয়া অর্থাৎ আমার শক্তিতে আপনারা এগুচ্ছেন। আপনাদের নিজেদের কোনো শক্তি নেই ।

৫/১১/১৯৬২

কলকাতা থেকে চিঠি দিচ্ছেন শ্রীধীরেন্দ্রনাথ রায়। প্রাপক শ্রীঅরুণ ঘোষ। 

(পুরীতে তিনি কীভাবে দিন কাটাচ্ছেন, সকলে তাঁর সাথে কি আনন্দে বাস করছেন, সেই সব খবর পেয়ে ভীষণ আনন্দ পাচ্ছেন সকলে।  মৃত্যুঞ্জয় রায় ফিরে এসেছেন পুরী থেকে। চিঠির অংশ উদ্ধৃত হল।) 

সবাই মিলে এক জায়গায় বসে পুরীর কথা হচ্ছে। অনেক কথা হল ঠাকুরের। শনিবার তার ঘুম হয়নি, হবেও না ক’দিন। মাথার মধ্যে ঠাকুরের জন্য নানা ভাবনা বাস করছে। কী করে বেচারি ঘুমায়? ঠাকুরের প্রতি এঁর  কী দরদ! এঁর পায়ে মাথা খুঁড়তে ইচ্ছে হয়। ... (নিতাই ঘোষ) যাচ্ছে তোমার আসার সময় রামকৃষ্ণকে রিলিফ দিতে। আনন্দ ও দিলীপ বললে, খুব কাজের লোক। সুতরাং নিশ্চিন্ত ১৪ই বা ১৫ই সে এখান থেকে যাবে। সৌরেন ৩রা ডিসেম্বর থেকে পনেরো দিন ছুটি পাবে। সে রঘুর সাথে থাকবে। তুমি ও রামকৃষ্ণ আমার প্রাণভরা প্রীতি ও শুভেচ্ছা নিও। ঠাকুর কে আমার সাষ্টাঙ্গ জানিও।

 পুনশ্চঃ মেজদা এই সপ্তাহে একদিন রওনা হবেন। চার পাঁচ দিন থাকবেন।  চিঠি দিয়ে আগে জানাবো।"

 

১১/১১/১৯৬২

সকালে চা খেয়ে সিংহরায় মশাই, সুশীলবাবু ও শৈলেন কবিরাজকে নিয়ে শ্রীজীবনকৃষ্ণ বেড়াতে গেলেন। সাড়ে আটটা নাগাদ সকলে ফিরে এলেন।

 সিংহরায় মশাই আবার দুটো নাগাদ পাথরকুঠিতে গেলেন। দেখলেন শ্রীজীবনকৃষ্ণ ধ্যানস্থ। তিনটের সময় ধ্যান ভঙ্গ হলো। চারটে পর্যন্ত পাঠ চলল। 

 সন্ধ্যেয় পাঠের সময় শ্রীজীবনকৃষ্ণ বললেন, ঠাকুর যে গুরুগিরি করতেন তার সাপোর্ট দিয়ে বলুন। আমরা কেউই বলতে পারলাম না। তখন নিজেই বললেন, তিনি যে এত উপদেশ দিতেন এই গুরুগিরি। তিনি যদি সকল ভক্তদের দেহে ফুটতেন, অর্থাৎ ভক্তরা সকলে তাঁকে তাদের দেহের মধ্যে দেখতো, তবে তিনি তাদের সঙ্গে এক হয়ে যেতেন। তখন কে কাকে উপদেশ দেয়? তাই ভগবান কৃপা করে এইরূপ লীলা করছেন। আমিও যা আপনারাও তা। কে কাকে উপদেশ দেয়।

৭/১১/১৯৬২ তারিখে মৃত্যুঞ্জয় রায় কলকাতা ফিরে চিঠি দিয়েছেন অরুণকান্তি ঘোষকে। পত্রের অংশ রইল। 

আমি নিরাপদে পৌঁছেছি। গাড়িতে যদিও খুব ভিড় ছিল, তাতে আমার কোন কষ্ট হয়নি। পুরীতে বেশ ছিলাম। সেখানে থাকাকালীন যত না বুঝতে পেরেছি যে, কোথায় ছিলাম আর কোথায় এসেছি, এখানে এসে ভালোভাবেই বুঝছি। মনে হচ্ছে চাকরি ছেড়ে দিয়ে ছুটে চলে যাই। সব সময় মন পুরীতেই পড়ে আছে। এখন কারো সঙ্গ মোটেই ভালো লাগছে না। মনে হয় একলা বসে ঠাকুরের কথা চিন্তা করি।

...তুমি ঠাকুর কে বলবে যে তিনি যেন শীঘ্র চলে আসেন। যদিও জানি যে ব্যবহারিক জীবনে তাঁর এখানে অনেক কষ্ট সহ্য করতে হয়, তবুও তাঁর স্থূল দেহ যতদিন আছে ততদিন আমাদের সঙ্গ ছাড়ার তাঁর কোনো উপায় নেই। তাঁর সঙ্গে সকলেই ছুটোছুটি করে বেড়াচ্ছে। মন স্থির করতে পারছে না। ঠাকুরের আদেশ অনুযায়ী সন্ধ্যার সময় একটু ধ্যানে বসি। কিন্তু মন স্থির হয় না। মন পুরীতে চলে যায়। যাই হোক, যতদিন না তিনি ফেরেন ততদিন অন্তত আমাকে এইরকম করেই কাটাতে হবে। উপায় নেই।

ঠাকুরকে আমার ভক্তিপূর্ণ প্রণাম জানাবে। তুমি ও রামকেষ্ট আমার আন্তরিক স্নেহপ্রীতি জানবে।

আশা করি তুমি ও রামকেষ্ট ঠাকুরের সেবা বেশ ভালোভাবেই করছো। কোনও ভয় নেই। তাঁর কাজটি তিনি নিজেই করিয়ে নেবেন। একটু সময় করে নিয়ে ঠাকুরের খবর সহ তোমাদের কুশল সংবাদ দিও।” 

 

১২/১১/১৯৬২

আজ সুশীলবাবু আমার বাসায় এসেছেন। আমি ও সুশীলবাবু বেরুবার সময় দেখছি শ্রীজীবনকৃষ্ণ আসছেন। তাঁর সঙ্গে শ্রীশ্রীজগন্নাথদেবের মন্দিরের রাস্তা ধরে ঘুরে ফিরে আসা হলো। কথামৃত পাঠের আদেশ দিলেন। কিছুক্ষণ পাঠ চলল।

 দুপুরে যথারীতি পাঠ শুরু হলো বেলা দুটোর সময়। শ্রীজীবনকৃষ্ণ বেশ কিছুক্ষণ সমাধিস্থ ছিলেন। সমাধিভঙ্গের পর বেলা চারটের সময় সুশীলবাবু, রাধিকাবাবু ও আমাকে নিয়ে শ্রীজীবনকৃষ্ণ বেড়াতে বার হলেন। 

 সন্ধ্যার সময় বাসায় ফিরে এসে আবার পাঠ আরম্ভ হল। প্রসঙ্গত বললেন, -ঠাকুর বলেছেন আসল নকল এক দেখলুম। বলেই সমাধিস্থ। সমাধি ভঙ্গের পর বললেন -দ্যাখ সমাধি নকল হতে পারে। যারা অভিনয় করছে তারা নকল করছে। কিন্তু এই যে স্বপ্নের অনুভূতি, ঈশ্বর দর্শন, -- যা তোরা দেখছিস, সেটা কেউ কি নকল করতে পারে না পেরেছে? তাহলে স্বপ্নই সত্য। সেটা কেউ নকল করতে পারবে না বাবা। অতএব স্বপ্নে ভগবান লাভ, নানারূপ অনুভূতি--এটা কত বড় সত্য দেখ।

সন্ধ্যায় পাঠের সময় শ্রীজীবনকৃষ্ণ বললেন -ঠাকুর কেশব সেনকে বলছেন ব্রহ্মজ্ঞান হলে আর দলটল থাকে না। দল মানে কি আপনারা বলতে পারেন? আমরা কেউই বলতে পারলাম না। তখন তিনি নিজেই বললেন -দল মানে ইজম, যেমন হিন্দুইজম ইত্যাদি। তিনি পুনরায় জিজ্ঞাসা করলেন -ঠাকুর কোন দলে ছিলেন? বললাম হিন্দু? তখন তিনি বললেন, তিনি মুসলমান হচ্ছেন খ্রীষ্টান হচ্ছেন, তবে আর হিন্দু কিসে? আর হিন্দু ধর্ম থেকে মুসলমান খ্রিস্টান হলে আর কি হিন্দু ধর্মে ফিরে আসতে পারে? আচ্ছা - আমি কোন দলের? বললাম, আপনি হিন্দু, মুসলমান, পার্সি, খ্রিস্টান, সব দলের, আবার কোনো দলের নয়। তখন বললেন -হ্যাঁ। ভগবান আমাকে কোনো দলেই রাখেননি, আবার সব দলেই রেখেছেন। এই যে ব্রহ্মজ্ঞান  হয়েছে, তা জগতকে জানাবার জন্য। আর তা বলছে কে? প্রত্যেক দলের লোক। তারা বলছে, -ওগো! তুমিই আমি! আপনারা আমাকে জ্ঞান দান করছেন যে, আমি সকলের।

 রামকৃষ্ণ ঘোষ গত রাত্রে স্বপ্ন দেখেছে, তার জামাটা ছোট ছিল বড় হয়েছে। বারে বারে মাপ দিয়ে দেখেছে। শ্রীজীবনকৃষ্ণ ব্যাখ্যা দিলেন, আধার বড় হয়ে গেছে। এটা নীলাচলে এসে হলো। নাহলে ওর একটা খুঁতখুঁতে ভাব থেকে যেত যে, এখানে এসে কি হলো? এখন আর সে সংশয় থাকবে না। 

১৪/১১/১৯৬২

প্রাতঃকৃত্য সেরে এসে দেখি সুশীল বাবু আমার বাসায় এসে হাজির। দুজনে বেরিয়ে শ্রীজীবনকৃষ্ণ সকাশে উপস্থিত হলাম। তিনি আমাদের নিয়ে বেড়াতে বাহির হলেন। শহরের ভিতর এদিক ওদিক ঘুরে তাঁর বাসায় ফেরা গেল। তিনি কথামৃত পাঠের আদেশ দিলেন। ঘন্টাখানেক চলল। প্রসঙ্গক্রমে আবার বললেন -আপনারা ব্রহ্মজ্ঞান মুড়ি-মুড়কির মতো কুড়িয়ে পেয়েছেন কিনা, তাই দাম দিতে পারছেন না। আর সত্যিই তো, আপনাদের ব্রহ্মজ্ঞান হয়েছে কি করে বুঝবেন? বুঝতে পারলে মানুষটা আমাকে আঁকড়ে ধরে পরে থাকত। এই অচিন্ত্যধামের মালির স্ত্রী আমায় স্বপ্নে দেখল। সে কি বুঝল? কিছুই বোঝেনি।

 তাই আপনাদের বারবার কঠোপনিষদের এক বশী সর্বভূতান্তরাত্মা, একং রূপং বহুধা যঃ করোতি...ইত্যাদি শ্লোকের  গূঢ়  অর্থ ধারণা করতে বলেছি। আপনারা সব ধীরঃ। 

 সকালে বেড়িয়ে আসার পর বললেন, -কালী (উত্তরপাড়া) এগারো বছর বয়সে পুরীর শ্মশানে প্রথম আমাকে দেখে। এই সেই পুরী;  এখানে একটি মাত্র শ্মশান। এই সেই শ্মশান। আমি আবার এসেছি পুরীতে। আর সেই শ্মশানের পাশে বাস করছি।

 (স্বপ্নে দর্শনের দীর্ঘকাল পরে ঘটনাচক্রে শ্রীজীবনকৃষ্ণ সমীপে উপস্থিত হলে কালীবাবুর স্বপ্নের কথা জানা যায়)

 আজ সন্ধ্যেবেলা পাঠের সময় শ্রীজীবনকৃষ্ণ কথাবার্তা বিশেষ বলেননি। অধিকাংশ সময় ধ্যানে কাটিয়েছেন। ৮-১৫ মিঃ আমরা যে যার বাসায় ফিরলাম। শেষ রাতে স্বপ্ন দেখি একটি লোক মারা গেছে তাকে সমাধি দেওয়া হবে।

 

 

১৫/১১/১৯৬২

শ্রীঅরুণ ঘোষ পুরী থেকে চিঠি দিচ্ছে ধীরেন মণ্ডলকে  তিনি লিখছেন-

 ডিয়ার ধীরেনদা

 গোবিন্দ আজ ঠিক সময়ে পৌঁছে গেছে। তার সাথে পাঠানো জিনিস গুলো সব পেয়ে গেছি। রাবড়ি আর দুলালের দই খেয়ে বুড়োর কী আনন্দ! বললেন, তোর বাবা জগন্নাথও এমন ভোগ খেতে পায় না। আজ ভাত খেলেন না। পরোটা ভেজে দেওয়া হয়েছিল। গতকাল আমি স্লিপিং বার্থ রিজার্ভ করে এসেছি। আগামীকাল রওনা দিচ্ছি। আবার ফিরে যেতে হবে বাস্তবের রাজ্যে। তবুও বলি ক’টা দিন যেভাবে কাটল তাতে আমার জীবন ধন্য। অধিক আর কী? গিয়ে সাক্ষাতে সব কথা হবে।

 এই চিঠি অনুযায়ী শ্রী জীবনকৃষ্ণ তখনও স্বর্গদ্বারে পাথরকুটির আউট হাউসে আছেন।  শ্রী অরুণ ঘোষ চলে আসছেন পরিবর্তে যাচ্ছেন তাঁর ভাইপো শ্রীযুক্ত গোবিন্দ ঘোষ।  

 

১৬/১১/১৯৬২

 

 আমি বাসা থেকে বের হচ্ছি দেখি, শ্রীজীবনকৃষ্ণ ও সুশীলবাবু এসে হাজির। আমরা চললাম সমুদ্রের ধার দিয়ে দিয়ে পশ্চিমের শেষ বাড়ির পর ফাঁকা জায়গায় পৌঁছনো গেল। সেখানে বসে সকলেই ধ্যানমগ্ন। শ্রীজীবনকৃষ্ণের ধ্যান ভঙ্গ হলো আমাদের কিছু পরে। সেখানে আর কিছুক্ষণ বসার পর বাসায় ফেরা হল।

 বেলা দুটোর সময় যথারীতি শ্রীজীবনকৃষ্ণের বাসায় আমি ও রাধিকাবাবু পৌঁছলাম। চারটে পর্যন্ত পাঠ। শ্রীজীবনকৃষ্ণ ধ্যানস্থ দুটো থেকে প্রায় সাড়ে তিনটে। ইতিমধ্যে সুশীলবাবু এসেছেন। বিকেল চারটের পর আমি রাধিকাবাবু ও সুশীলবাবু বেড়াতে গেলাম। শ্রীজীবনকৃষ্ণ আমাদের সাথে যেতে পারেননি, কারণ আজ অরুণ (সিঁথি) কলকাতায় ফিরে গেলেন। তাকে বিদায় দেবার জন্য রইলেন। আমি, রাধিকাবাবু পথিমধ্যে সুশীলবাবুর হোটেলে গেলাম। তিনিও আমাদের সঙ্গে গেলেন। আমরা গিয়ে দেখি শ্রীজীবনকৃষ্ণ আমাদের আসার আগেই নির্ধারিত স্থানে বসে আছেন। 

সন্ধ্যা ছয়টায় তার বাসায় ফেরা হলো। রাত্রি সাড়ে আটটা পর্যন্ত পাঠ চলল। যাবার আগে অরুণ শ্রীজীবনকৃষ্ণকে জিজ্ঞাসা করলেন কাকে পাঠানো হবে। তিনি বললেন -যদি আমায় জিজ্ঞাসা করিস তবে আমি বলবো আমি নিঃসঙ্গ থাকতে চাই। কাকেও চাইনা। তারপর তোদের যা ইচ্ছা হয় তাই করিস। 

 

১৭/১১/১৯৬২

আজ সকালে সাতটার সময় যথারীতি বেড়াতে যাওয়া হল। বেলা আটটা নাগাদ পাথরকুঠির বাসায় ফেরা হলো। স্বপ্ন প্রসঙ্গে শ্রীজীবনকৃষ্ণ কঠোপনিষদ থেকে উদ্ধৃত করলেন -য এষ সুপ্তেষু জাগর্তি কামং কামং পুরুষঃ নির্মিমাণঃ। তদেব শুক্রং তদ ব্রহ্ম তদেবামৃতমূচ্যতে। 

নিজস্ব ব্যাখ্যা দিয়ে বললেন -দেহী যখন নিদ্রিত থাকে ব্রহ্ম তখন নিজের ইচ্ছানুসারে সৃষ্টি করেন। অর্থাৎ দেহী স্বপ্নে তাঁর লীলা দর্শন করেন। দেহীর চৈতন্য শক্তি তার জড়জ্ঞানের ঊর্ধ্বে, আত্মিক স্বপ্নে দেহীর অনুভূতি হয়।

 ব্যাখ্যা দিয়ে বললেন, মানুষ এই দৈবী স্বপ্ন সম্বন্ধে কী বলবে?

 বিকেলে চারটের পর আমরা বেরিয়ে সন্ধ্যায় ফিরে এসে পাঠ শুরু হলো। পাঠ প্রসঙ্গে শ্রীজীবনকৃষ্ণ বললেন, -দেখুন নতুন লোক থাকলে ভাব আসে না। কথা ও বলতে ইচ্ছা করে না। সাধুখাঁ ছিল। এখন চলে গেছে তাই এইসব কথা হচ্ছে।

 রাত্রি আটটায় পাঠ শেষে বাসায় ফিরে এলাম।

একই তারিখে গোবিন্দ ঘোষ কে লিখিত চিঠির অংশবিশেষ।  তিনি পুরীতে থাকাকালীন চিঠির জন্য উৎসুক হয়ে থাকতেন। কারো চিঠি এলে উৎসাহ নিয়ে  পড়তেন। ধীরেন্দ্রনাথ রায়ের চিঠি তাঁর কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

        চিঠিতে ধীরেনদা লিখছেনঃ

বাজিকরই সত্য।  ওই রক্তমাংসের জীবন্ত মানুষটাই সত্য।  উনি আছেন তাই তো ওঁকে ভেতরে দেখি। বেদ, উপনিষদ, তন্ত্র, পুরাণে যতদূর অধিকার ওঁর জীবনে সে সব ছাড়িয়ে অনুভূতি হয়েছ--নিঃসন্দেহে  তা প্রমাণিত।

বেদে যাঁকে ব্রহ্ম বলে, তন্ত্রে যাঁকে শিব বলে, পুরাণে যাঁকে ভগবান বলে--রক্তমাংসের জীবন্ত জীবনকৃষ্ণেই এ সকল অবস্থা হয়েছে। এ সবই তো বুঝেছি। গিরিশ ঘোষকে ঠাকুর একদিন কি বলতে যাচ্ছিলেন। গিরিশ ঘোষ বাধা দিয়ে বললেন, -উপদেশ চাই না। আমার বইতে অনেক উপদেশ লিখেছি। আপনি আমায় কিছু করে দিতে পারেন?

এখানে উনি সকলকেই এমন বস্তু দিয়েছেন যার অনুশীলনই আমাদের ধর্ম। এঁকে দেখেছি এঁরই কৃপায়। নইলে আমাদের কোন যোগ্যতা নেই”। 

১৯/১১/১৯৬২

সন্ধ্যেয় পাঠ প্রসঙ্গে শ্রীজীবনকৃষ্ণ বললেন, -ওরে আমার দৈববাণী হয়েছে। পানিশমেন্ট বাকি আছে। বাবা কিসের পানিশমেন্ট তাতো বুঝতে পারছি না। শেষ দৈববাণী হয়েছে, দিস ইজ দ্য হাইয়েস্ট। এর কি অর্থ তাও জানি না বাবা।

চিঠি দিয়েছেন অরুনকান্তি ঘোষ। লিখছেন অনাথ নাথ মন্ডলকে। তিনি (শ্রীঅরুনকান্তি ঘোষ) তখন পুরীতে। শ্রীজীবনকৃষ্ণের সান্নিধ্যে। অনাথ নাথ ফিরে গিয়েছেন নিজের বাড়ি। পুরীর কথা জানিয়ে তাকে চিঠি লিখছেন অরুন কান্তি ঘোষ।

১৯/১১/১৯৬২ 

 প্রিয় অনাথ

 দিন কয়েক আগেই অনিলের একখানা চিঠি পেয়েছি। শ্রীজীবনকৃষ্ণকে লেখা। কী সুন্দর ভাবেই লিখেছে।পড়ে শোনাচ্ছিলাম - এই মাথায় ঈশ্বরের ধারণা হয়েছে কথাটা শুনতে শুনতে শ্রীজীবনকৃষ্ণের কয়েকবারই ভাবসমাধি হল। মুখে বলেছেন, আহা আহা। পরে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে এলে (ওঁর) কাজের কথাটা শুনে আশ্বস্ত হলেন।

সেসময় চীন ও ভারত যুদ্ধ চলছে। কিন্তু সমুদ্রের ধারে ও তাঁর সঙ্গলাভে নিরুদ্বিগ্ন আনন্দ ভোগ করছেন সকলে। তাঁর সান্নিধ্যে আসা শত শত লোকের মধ্যে মাত্র ক'জনই পুরীতে যেতে পেরেছিলেন। টানা সঙ্গ করেছেন বা একসঙ্গে একই বাসায় থেকেছেন আরো হাতে গোনা মাত্র কজন।

 চিঠির পরের অংশের লিখছেন -ভারী আনন্দে দিনগুলো কাটছে। এসে অবধি বাইরের জগতের খবর বিশেষ জানতে পারছি না। মাঝে মাঝে যুদ্ধের খবর টুকরো তৎপরতা। ভোর পাঁচটার একটু পরে গম্ভীর স্বরে ভগবান ভগবান বলে আমাদের ঘুম ভাঙলো। সেই সাথে কিছুক্ষণ ভগবানের জয়ধ্বনি। আমরাও সাথে সাথে জয়ধ্বনি  দিতে থাকি। এরপর কিছুক্ষন ধরে মশারির মধ্যে বসে বসেই উপনিষদের ধর্ম আর আমরা কী পেয়েছি, এই নিয়ে আলোচনা। একদিন বললেন, দেখ, সময় করে ধ্যান করবি। কেন এসেছিস বাবা এখানে? একদিন ভোরে উঠে বললেন, আরে তোরা জেগেছিস? আমরা সাড়া দেওয়ায় বললেন, একটু ভগবানের কথা বল। আমি বললাম আজ্ঞে, আপনি বলুন আমরা শুনি। শুরু করলেন নচিকেতার উপাখ্যান।

 ধ্যানের কথায় বললাম, বাড়ি ফিরে ধ্যান করব। এখন একটু কাজ করি। আর সর্বদাই আনন্দে আছি, এতেই খুশি। একটু ভেবে বললেন, আচ্ছা তাই যেন হয়।

 লেখকের নিজের মনে হয়েছে যেন সর্বদাই অদ্বৈতভূমিতে রয়েছেন। ধ্যানের দিকে খুব জোর দিচ্ছেন। কেবলই বলছেন ধ্যানে ডুবে যা। ধ্যানের কথায় বলছেন, দেখ, এই বয়স। খুব করে  ধ্যান করবি। বুড়ো বয়সে আর কিছু হয়না বাবা। যা কিছু এই বয়সে।

 আবার এর মধ্যেই নানা কাব্য সাহিত্যের কথাও হচ্ছে। এক একটা রেফারেন্স দিয়ে বলছেন, এইটা পড়েছিস? ও বইটা পড়িস।

 একদিন মুহুর্মুহু সমাধি হচ্ছে। পরে বলছেন, কুড়ি বছর ধরে অনেক বলেছি। কে কী ধারণা করল! আর আমায় তো অনাথ দেখিয়ে দিয়েছে! এদের কারুর বিবেক বৈরাগ্য হয়নি। সে কী ক্ষোভ আর তার বহিঃপ্রকাশ!

 চিঠির এই অংশে অনুভব করা যায় তার বেদনা। যে উচ্চতায় তিনি ছিলেন তা ধারণা করা কারো পক্ষেই সম্ভব হয়নি। যারা তার সঙ্গে অহোরাত্র থাকতেন তারাই কেবল বুঝেছিলেন খানিক। 

(মানিক্য ত্রয়োবিংশ বর্ষ নব্বই সংখ্যা চিঠিপত্র)

একই দিনে  গোবিন্দ ঘোষ চিঠি দিচ্ছেন ধীরেন্দ্র নাথ রায় কে।

 তিনি লিখেছেনঃ

        “ আমাদের পরম সৌভাগ্য যে এখানে আসার পর ঠাকুরের কিছু কাজ করবার সুযোগ পেয়েছি। ঠাকুর নিজে ইচ্ছে করে আমার জীবনের পরিবর্তন আনার জন্য এখানে এনেছেন। আমাদের রান্নার খবর আর আপনাদের না দিলেও চলবে। রোজ ভোরে ঠাকুর কখনো উপনিষদের শ্লোক আবৃত্তি করছেন, কখনো গান গাইছেন, আর বিছানা থেকে নামবার আগে ‘জয় ভগবান জয় ভগবান’ তো আছেই। 

        আজ দুটোর সময় প্রকাশ ডাক্তার ও খগেন বাবু এসেছেন তারা সী-ভিউ হোটেলে খাচ্ছেন, থাকেন ভারত সেবাশ্রম সংঘের একটা বাড়িতে। এখন রামকৃষ্ণদা কথামৃত পাঠ করছেন আর ঠাকুর আপনার দেওয়া অষ্টাবক্র সংহিতার একটা শ্লোকের ব্যাখ্যা করছেন। আমি ও রামকৃষ্ণদা দুজনেই তো এক্সপার্ট। আপনার পাঠানো গুড়ের কোন সদ্ব্যবহার করা হচ্ছিল না। অনেক চিন্তা করে এবং কি করা যায় চিন্তা করে ঠাকুর শেষ পর্যন্ত ঠিক করলেন সুজির হালুয়া খাবেন…”  

পুরীর স্মৃতিতে লিখছেন বিবেকানন্দ ওরফে গোবিন্দ ঘোষ।

১৯৬২র নভেম্বর মাস। একদিনের ঘটনা। সেদিন অন্যদিনের মত উপনিষদের শ্লোক বা কোনো গান শুনে ঘুম ভাঙেনি। চুপচাপ উঠে উনি আমাদের ডাকলেন। তারপর আমাদের সকালের কাজ শেষ করে রাত্রেকার প্রোগ্রাম অনুযায়ী উর্মিতট হোটেলে কচুরি আনতে চললাম। উনি তখন পায়খানা থেকে এসে হাতমুখ ধুচ্ছিলেন। ঠাট্টা করে কচুরি আনার একটা পদ্য তৈরি করে আওড়াতে লাগলেন -প্রভাতে উঠিয়া গোবিন্দ চলিল কচুরি আনিতে, ইত্যাদি।

কচুরি ভাজিয়ে আনতে সাতটা কুড়ি হলো। উনি একখানা খেয়ে বললেন -তোরা খাঁ, আর আমার জন্য রেখে দে দুপুরের জন্য। তাঁর প্রতি সত্যিই কোনো ভয় বা সঙ্কোচ ভাব ছিল না।

পরাধীন জাতির ব্রহ্মজ্ঞান হয়না। একথা কদমতলার ঘরে ওঁর মুখের অনেকবার শুনেছি। পুরীতে থাকতে লক্ষ্য করেছি উনি চীন-ভারত যুদ্ধ সম্বন্ধে খুব উদ্বিগ্ন ছিলেন। একদিন আমরা রান্না করছি আর উনি বাইরের বারান্দায় বসে তেল মাখছেন আর নানা রকম মন্তব্য করছেন। তারপর স্নান সেরে ধ্যানে বসলেন। আমি তখন স্নান করার জোগাড় করছি বারান্দায় বসে। উনি রামকৃষ্ণদাকে ডেকে বললেন,, আজ আর ধ্যান হলো না বাবা। এই যুদ্ধের খবরে মনটা ঠিক নেই। সেদিন স্টেটসমান কিনে এনেছিলাম, উনি নিজে পড়ে দেখেছিলেন।

২৩শে নভেম্বরের কথা মনে পড়ছে। সেদিন সকালে ঘুম ভেঙেছে পাঁচটায়। উনি জল খেতে উঠেছিলেন, চোখ খুলেই ওঁকে দেখলাম। তাঁর ধ্যান ভাঙ্গার পর হাততালি দিয়ে জয় ভগবান জয় ভগবান করতে লাগলেন। কিছুক্ষণ পরে আমাদের বললেন, তোরা উঠেছিস? এমন মধুর ডাক এমন স্নেহপূর্ণ ভালোবাসা পাওয়ার সুযোগ এবং ঘনিষ্ঠ ভাবে মেশবার সুযোগ আমার জীবনে এই প্রথম।

এর আগের দিনই উনি মানিকবাবুকে একখানা চিঠি লিখলেন। আমাকেই লিখতে হয়েছিল। তার একটা লাইন মনে পড়ছেঃ আমার ফিরবার ইচ্ছা আদৌ নেই। চিঠি লেখার কিছুক্ষণ পরে আমাকে বললেন, মাস ছয়েক যাক। ভালো বাড়ির সন্ধানে আছেন, পেলেই চলে যাবেন।

এই সময়টাতে উনি কলকাতার চিঠির জন্য খুবই উদগ্রীব থাকতেন। রোজই একবার জিজ্ঞাসা করেন, কিরে? আজ আমাদের চিঠি আছে?

আমরা বুঝতে পেরেছিলাম তার এখন ফিরবার কোনো ইচ্ছে নেই। বেশ কিছুদিন থাকবেন অনেককে সুযোগও দেবেন তাঁর কাছে থাকবার।

মনে পড়ছে প্রথমে যখন কাকার (শ্রী অরুণ ঘোষ) চিঠি পাই পুরীতে যাওয়ার জন্য, কী আনন্দ যে হয়েছিল তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। কিন্তু সে আনন্দের সাথে একটু ভয়ও ছিল, কি জানি যদি ওঁকে ঠিকমত খাওয়াতে বা তাঁর ইচ্ছে মতো কাজ না করতে পারি। পুরীতে যাওয়ার পর তিনি এমন বন্ধুর মতো ব্যবহার করেছেন যে ভয় তো দূরের কথা কত সময় তাঁর কাছে আবদার করেছি। কখনো  অভিভাবকের মতো তাঁকে বলেছি। আবার এমনও হয়েছে যে তিনি নিজের খাওয়া কমিয়ে দিয়েছেন। অথচ আমাদের রাত্রের খাবারের জন্য ‘এ তৈরি কর, ও তৈরি কর' এইভাবে নানা রকম করে খেতে বলেছেন।

পুরীর আরেকদিনের ঘটনা বলি। একদিন শ্রীজীবনকৃষ্ণ, চৈতন্যদেব এবং শ্রীরামকৃষ্ণদেবের কথা বলতে বলতে নিজের সমস্ত মাথাটায় হাত বুলিয়ে বললেন, এই মাথাটার সমস্ত ভগবান। সাথে সাথে সমাধি হল। তিনি খাটের উপর পা ঝুলিয়ে বসেছিলেন।

২০/১১/১৯৬২

সকালে বেড়াতে বেরিয়ে সমুদ্রের ধারে ধ্যানে বসা হলো। শ্রীজীবনকৃষ্ণ জিজ্ঞাসা করলেন কার কী দর্শন হয়েছে। মুখুজ্যেমশায় দেখছেন, শ্রীজীবনকৃষ্ণ ধ্যান ভাঙ্গার পর উঠে একে একে সকলের মাথায় হাত দিয়ে বললেন, যাও তোমাদের আর ভাবনা নেই।

 এরপর শ্রীজীবনকৃষ্ণ তাঁর নিজের দর্শনের কথা বললেন। তিনি দেখছেন, তিনি নিজে একা জগত নিয়ন্ত্রণ করছেন আর সারা জগতের লোক জগতটাকে বেঁধে টেনে নিয়ে আসছে।

 বেলা দুটোয় যথারীতি পাঠ শুরু হলো। শ্রীজীবনকৃষ্ণ ধ্যানমগ্ন হলেন। ধ্যানভঙ্গের পর পাঠের শেষে  চারটের পরে আমরা বেড়াতে বের হলাম। ফিরে সন্ধের সময় আবার পাঠ শুরু হল। পাঠ প্রসঙ্গে শ্রীরামকৃষ্ণের দুটি অমৃত বাণীর ভিন্নরূপ আলোকপাত করলেন।

 ঠাকুর বলছেন, -সচিদানন্দ সাগরে 'আমি' ঘট। চারিদিকে জলে জল। তবু ঘট আছে। 'আমি' জ্ঞান যায়না। শ্রীজীবনকৃষ্ণ বললেন, -যখন জলের সঙ্গে এক হয়ে যাচ্ছি তখন আর 'আমি' থাকছে কই? 'আমি' তো জলের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। ঘট যে দেখা যাচ্ছে, ওটা তো দেহ। ওটা না থাকলে 'আমি' মে বৃহৎ 'আমি'র সঙ্গে মিশে যাচ্ছে তার আনন্দ উপভোগ করবে কে? তখন আর এ 'আমি'  থাকবে না। তখন ব্রহ্মের 'আমি' হয়ে যায়। আমি ঘট থাকে না। দেহ ঘট পড়ে থাকে। তবেই ব্রহ্মজ্ঞান। তবেই ব্রহ্মানন্দ।

 ঠাকুরের আরেকটি কথা - অদ্বৈত জ্ঞান আঁচলে বেঁধে নেচেকুঁদে বেড়া। শ্রীজীবনকৃষ্ণ বললেন, অদ্বৈতজ্ঞান হলে সে কি আর নেচে কুঁদে বেড়াতে পারে? না পারেনা। সে তখন চুপ হয়ে যায়। তাহলে দাঁড়াচ্ছে, আঁচলে বেঁধে মানে চাপা দিয়ে, অদ্বৈতজ্ঞান চাপা দিয়ে রেখে নেচে কুঁদে বেড়ানো।

২১/১১/১৯৬২

সকালে রাধিকাবাবু (মুখুয্যেমশাই), সুশীলবাবু, ডাক্তার প্রকাশ আঢ্য, খগেন দাশ ও আমাকে সঙ্গে নিয়ে শ্রীজীবনকৃষ্ণ বেড়াতে বেরুলেন। সমুদ্রের পশ্চিমধারে শেষ বাড়ীটির নিকট আমরা পৌঁছালাম। তখন বেলা পাঁচটা সকলেই ধ্যানে  বসলাম।

আমার ধ্যান ভালো হচ্ছিল না। মনে বিচার উঠল -আচ্ছা আমরা কি ভগবানকে ভালবাসি, যেমন তিনি আমাদের ভালোবাসেন? এই যে জীবনকৃষ্ণ সর্বদা সতর্ক কিসে আমাদের ভালো হয় আমরা তার প্রীত্যর্থে কি করছি? কিছুই না। এই সিদ্ধান্তে এলাম যে, ভগবান আমাদের যত ভালোবাসে আমরা তাঁকে ভালোবাসি না বা বাসতে পারি না। তাঁর ভালোবাসা অহৈতুকী। আর আমাদের ভালোবাসা হৈতুকী বা কামনাযুক্ত।

আজ আমরা তাড়াতাড়ি ফিরলাম, কারণ সুশীলবাবু ডাক্তারবাবু ও খগেনবাবু হাওড়া ফিরবেন। আজ সাড়ে তিনটে পর্যন্ত পাঠ হয়ে পাঠ বন্ধ হল। পাঠে জীব কটি ও ঈশ্বরকটির কথা উঠতে নিজস্ব ব্যাখ্যা দিয়ে বললেন যার ঈশ্বর চৈতন্যরূপে কটিদেশ পর্যন্ত অবতরণ করেছেন তিনিই ঈশ্বরকটি। আর যাদের জীবত্ব কটিদেশেই আবদ্ধ হয়ে আছে, অর্থাৎ চৈতন্য একেবারেই জাগ্রত হয়নি তারাই জীবকটি। কটিদেশ অর্থাৎ লিঙ্গগুহ্য নাভিতেই মন আবদ্ধ।

২২/১১/১৯৬২

সকালে আমি ও মুখুজ্যেমশাই যখন পৌঁছলাম শ্রীজীবনকৃষ্ণের বাসায় তখন বেলা সাতটা। আমাদের বসতে বলে মুখুজ্যেমশাইকে জিজ্ঞাসা করলেন -কাল কোনো স্বপ্ন দেখেছেন কি? মুখুজ্যেমশায় বললেন 

 -ভোরের দিকে দেখলাম এক বিরাট ফ্যাক্টরির জেনারেল ম্যানেজার আমাকে ডেকে পাঠিয়েছেন কাজ দেবেন বলে। গিয়ে দেখি তিনি খুব ব্যস্ত। "তোমাকে কাজের তদারক করতে হবে", বলেই চলে গেলেন। অন্য কর্মচারীদের বললাম, আমি কাদের কাজ দেখব তাতে কিছু বলে গেলেন না? কিছুক্ষণ পরে জেনারেল ম্যানেজার ফিরে এলেন। আমি জিজ্ঞাসা করলাম কাদের কাজ সুপারভাইজ করতে বললেন? তিনি বললেন -আপনি সুপারিনটেনডেন্ট এর কাজ করতে পারবেন না। আমি বললাম -আমার কাজের যোগ্যতা আপনি জানেন। আমি আগেও এ কাজ করেছি। না পারার কোন কারণ দেখছি না। শুনলাম জেনারেল ম্যানেজারের নাম ত্রৈলোক্যনাথ। তিনি আবার ঘুরে আসলে দেখি পুরোনো লুঙ্গি পরা পাঞ্জাবি গায়ে। দেখছি আর ভাবছি, আরে! জেনারেল ম্যানেজার যে আমাদের কদমতলার ঠাকুর জীবনকৃষ্ণ! স্বপ্ন ভেঙে গেল।

 স্বপ্ন শুনে রামকৃষ্ণ ঘোষ বলল তার মা বহু আগে শ্রীজীবনকৃষ্ণ কে জগন্নাথরূপে দেখেছে। এরপর আমরা বেড়াতে বের হলাম। শ্রীগৌরাঙ্গের মন্দির পর্যন্ত ঘুরে যখন বাসায় ফিরলাম তখন বেলা প্রায় সাড়ে আটটা।

 বেলা দুটোর সময় যথারীতি পাঠে গিয়ে দেখি রামকৃষ্ণ শ্রীশ্রীকথামৃত পাঠ করছে আর শ্রীজীবনকৃষ্ণ ধ্যানস্থ। কিছুক্ষণ পাঠের পর রোজকার নিয়মমত  শ্রীজীবনকৃষ্ণ আমাদের সঙ্গে সান্ধ্য ভ্রমণে বেরোলেন। ভ্রমণ থেকে ফিরে পুনরায় পাঠ। রাত্রি আটটার কিছু পরে আমরা বাসায় ফিরলাম।

 রাত্রে স্বপ্ন দেখলাম, শ্রীজীবনকৃষ্ণ আমাদের নিয়ে চক্রতীর্থের পথে বেড়াতে গিয়েছেন। রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়ে বলছেন, চক্র মানে কি জানেন? চক্র মানে এক, অর্থাৎ একত্ব।

২৪/১১/১৯৬২

সিংহরায় মুখুজ্যেমশাই ও শ্রীজীবনকৃষ্ণ ভ্রমণে বেরিয়েছে সকালবেলা।

ভ্রমণে বেরিয়ে শ্রীজীবনকৃষ্ণ এক রাস্তা দিয়ে হাঁটেন না। যে পথ দিয়ে যাত্রা শুরু করেন সে পথ দিয়ে ফেরেন না। আজ চলেছেন শ্রীশ্রীজগন্নাথ মন্দিরের পশ্চিমের রাস্তা ধরে সোজা শহরের বাইরের দিকে। বস্তির মধ্যে দিয়ে ঘুরে নরেন্দ্র সরোবরের তীরে শ্রীবিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী মন্দির। পথ দিয়ে আমরা নরেন্দ্র সরোবরের তীরে এসে পৌঁছলাম। সরোবরের তিন ধারে বাঁধানো ঘাট। মধ্যস্থলে একটি মন্দির। বৈশাখী পূর্ণিমাতে এখানে চন্দন যাত্রা উৎসব হয়। এখানে কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর স্বর্গদ্বারের রাস্তা ধরে আমরা যখন বাসায় ফিরলাম তখন বেলা প্রায় ন'টা।

 বেলা দুটোর সময় যথারীতি পাঠ শুরু হলো। বিকেলে সান্ধ্য ভ্রমণে। সন্ধ্যার কিছু পরে ইষ্টগোষ্ঠীর পর পুনরায় পাঠ। উর্ধ্বরেতা প্রসঙ্গে শ্রীজীবনকৃষ্ণ তাঁর নিজস্ব ব্যাখ্যা দেবেন -যিনি আত্মিক জীবনে সৃষ্টি করেন তিনিই উর্ধ্বরেতা।

 আত্মিক জীবনে সৃষ্টি মানে অসংখ্য মানুষের ভিতরে নিজেকে সৃষ্টি করে জগতের সঙ্গে একত্ব লাভ করা, যা এখানে হয়েছে। জগতের মানুষ তাদের ভেতরে আমাকে দেখে আমার সৃষ্টির প্রমাণ দেয়।

 এবার ঈশোপনিষদের শান্তিপাঠ "ওঁং পূর্ণমদঃ পূর্ণমিদং পূর্ণাৎ পূর্ণমুদচ্যতে। পূর্ণস্য পূর্ণমাদায় পূর্ণমেবাবশিষ্যতে" এই শ্লোকের একটি অভিনব ব্যাখ্যা দিলেন।

 পিতার আত্মা থেকেই পুত্রের জন্ম। তাই ছেলেকে বলে আত্মজ। পুত্র থেকে পৌত্রের জন্ম। বাপ পূর্ণ, ছেলে পূর্ণ, নাতি পূর্ণ-এই হলো "পূর্ণাৎ পূর্ণমুদচ্যতে" আবার থেকে ছেলে,  ছেলের থেকে নাতি হচ্ছে; কিন্তু আত্মার পূর্ণত্ব বজায় থাকছে। তাই পূর্ণস্য পূর্ণমাদায় পূর্ণমেবাবশিষ্যতে। 

 দুপুরে দেখা মুখুজ্যেমশাইয়ের  কথা হলো। তিনি স্বপ্ন দেখছেন তিনি সাগরে ডুবে যাচ্ছেন। জীবনকৃষ্ণ তাঁর হাত ধরেছেন, কিন্তু তুলে দেননি। জীবনকৃষ্ণ ব্যাখ্যা দিলেন -আপনি সমাধিতে ডুবে যাচ্ছিলেন আমি ধরে তুললাম। "একেবারে তুলতে তো দেখলাম না"? তিনি বললেন। -ওই ধরে রাখা মানে ব্রহ্মসমুদ্রে রেখে দিলাম। আরও ব্যাখ্যা আছে।

 আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, - আর কি ব্যাখ্যা হতে পারে বলুন? আমি বললাম ওঁর দেহ যাচ্ছিল, আপনি রেখে দিলেন।

 "তাও একটা বটে তবে আরও আছে" আরো কি ব্যাখ্যা আছে জিজ্ঞাসা করায় তারাবাবু (শ্রীজীবনকৃষ্ণের প্রাক্তন ছাত্র) ও আরো একজনের স্বপ্নের কথা বললেন। ব্যক্তিগত হওয়ায় স্বপ্নগুলির ব্যাখ্যা তাদের বলেননি। এখানেও আর ব্যাখ্যা দিলেন না।

২৫/১১/১৯৬২

শরীর অসুস্থ থাকায় শ্রীজীবনকৃষ্ণ আজ প্রাতঃভ্রমণে যাননি। বেলা নটা নাগাদ তিনি আমাদের বাসায় এলেন। প্রথমে তিনি আমার রান্না দেখছিলেন। পরে আমাদের বিছানায় শুয়ে পড়লেন। কিছুক্ষণ পরে মুখুজ্যেমশায় কে নিয়ে তাঁর বাসায় ফিরলেন। বেলা দুটোর সময় আমি তার বাসায় গেলাম। রামকৃষ্ণ ইতিমধ্যেই পাঠ শুরু করে দিয়েছে। ইষ্ট গোষ্ঠীর পর বললেন -দুটি দৈববাণী হয়েছে। একটি কাল রাতে, “দু-তিন ঘণ্টা পরে হবে আমি বললাম, এখনি হোক। আরেকটি আজ দিনের বেলা ঘুম থেকে উঠে-অনেকদিন  চাপা ছিল, আজ খুলে গেল। দৈববাণীর ব্যাখ্যা কিছু দিলেন না।

 

২৬/১১/১৯৬২

আজ সন্ধ্যায় পাঠ প্রসঙ্গে শ্রীজীবনকৃষ্ণ কয়েকটি মন্তব্য করলেন।  

১) পরাবিদ্যার অর্থ যা অপরের কাছ থেকে পাওয়া যায় না।

২) শাক্ত রঘুনন্দন সতীদাহ সমর্থন করে স্মৃতিশাস্ত্রে একটি ঋকবেদের শ্লোক উদ্ধৃত করেছেন। রাজা রামমোহন রায় বিভিন্ন স্থান থেকে ঋকবেদের বিভিন্ন অংশ সংগ্রহ করে এই শ্লোকের অনুসন্ধান করেন। কিন্তু কোথাও তিনি এই শ্লোক পেলেন না। তিনি লর্ড বেন্টিংককে একথা জানান এবং সতীদাহ প্রথা উচ্ছেদের জন্য আইন প্রণয়ন করতে সাহায্য করেন।

৩)  বুদ্ধ যে মত প্রচার করলেন, পাঁচশ বছর পরে নাগার্জুন সে মত উল্টে দিলেন মহাযানপন্থী সৃষ্টি করে। আর শ্রীরামকৃষ্ণ যে মত প্রচার করলেন স্বামী বিবেকানন্দ সে মত উল্টে দিয়ে গেলেন। ঠাকুর দ্বৈতবাদ এর কথা বললেন। স্বামীজি বললেন আর বললেন, “is not this dualism based on falsehood”? আর বললেন one and oneness এর কথা। ঠাকুর কামিনীকাঞ্চন ত্যাগ করতে বললেন। স্বামীজি মত প্রতিষ্ঠার জন্য এবং প্রচারের জন্য শিষ্যা  করলেন।

৪) লোকের ভগবানকে চায় কেন, যাকে দেখেনি? কারণ ভগবান দেহের মধ্যে আছেন। তাই দেহ এত প্রিয়।

৫)  রবীন্দ্রনাথ রক্তকরবীতে বলছেন, ‘জয় অজানার জয়  As a rationalist, তিনি ঠিক কথাই বলেছেন। তাঁকে দেখেননি বা জানেননি বলে বলছেন অজানা। কিন্তু যাকে জানেননি তাঁর জয় কি করে বলছেন?

৬)  কর্তাভজা সম্প্রদায় অনেককাল থেকেই আছে। মহাপ্রভুর অনেক আগে থেকে। দেহের মধ্যে থেকে যিনি আমাদের চালাচ্ছেন তিনি দেহের কর্তা, সেই কর্তাকেই ভজনা করা। এটা বেদের সাধনের অনুরূপ। কালে মানুষ নিয়ে সাধন করতে গিয়ে ব্যভিচার এনে ফেলেছে এবং বৈষ্ণব ধর্মের সঙ্গে মিশিয়ে একটা জগাখিচুড়ি করে ফেলেছে।

২৭/১১/১৯৬২

আমি ও মুখুজ্যেমশাই শ্রীজীবনকৃষ্ণের বাসায় যাবার পর তিনি আমাদের নিয়ে প্রাতঃভ্রমণে বেরুলেন। পুরী হোটেলের কাছে ভবানীকে (বন্দ্যোপাধ্যায়) সঙ্গে নিলেন। সদর রাস্তা ধরে আমরা চক্রতীর্থে এসে পৌঁছলাম। সেখান থেকে রামকৃষ্ণ মঠের ধার দিয়ে সমুদ্রের ধারে আসা হলো। বি এন আর হোটেলের নীচের সমুদ্র কিনারে একটি বেঞ্চের ওপর খানিকক্ষণ বসা গেল। সমুদ্রের বালিতে সকলেরই জুতা ভর্তি হয়ে গিয়েছিল। সকলে নিজের নিজের জুতা ঝেড়ে নিচ্ছিলেন। ভবানী বসে শ্রীজীবনকৃষ্ণের জুতাজোড়া নিয়ে নিজের পরিহিত শান্তিপুরি ধুতি দিয়ে পরিষ্কার করতে লাগলেন। শ্রীজীবনকৃষ্ণ আপত্তি জানিয়ে বললেন -এসব কি? এসব ভালো নয়। ভবানী তবু শুনলেন না। অল্পক্ষণ পরেই বিএনআর হোটেলের রাস্তা ধরে এসে আমরা বাসায় ফিরলাম।

 বেলা দুটোর সময় যথারীতি পাঠ আরম্ভ হলো। শ্রীজীবনকৃষ্ণ তিনটে পর্যন্ত ধ্যান করে শুয়ে পড়লেন। আজও ঠান্ডার ভয়ে তিনি বিকালে বেড়াতে বেরুলেন না। আমি ও মুখুজ্যেমশাই বেরিয়ে ফিরে সন্ধ্যার পাঠে যোগ দিলাম। মুখুজ্যেমশায় আগের রাতে দেখা একটি স্বপ্ন বললেন।

-তিনি যেন দুটি মেয়ের অভিভাবক হয়ে তাদের নিয়ে পরীক্ষা কেন্দ্রে উপস্থিত হয়েছেন। প্রথম প্রশ্ন পত্রের প্রথম প্রশ্ন এবং অন্যান্য প্রশ্নের উত্তর লেখার পর তারকনাথ এসে শুধালেন -আমার মেয়ে কেমন পরীক্ষা দিয়েছে? পাস করবে তো? “আমি কেমন করে বলব?” মুখুজ্যেমশায় বললেন। তবে তারা বলছে পরীক্ষা ভালই দিয়েছে। তারকনাথ বললেন -আপনি জানেন। পাস করবে কিনা বলুন।

 -একথা বললে শক্তির হানি হবে। আর একে সিদ্ধাই বলে।

 তারকনাথ তবু জেদ করতে লাগলেন। তখন মুখুজ্যেমশায় বললেন -পরীক্ষা যখন ভালো দিয়েছে পাস করবারই সম্ভাবনা। সেখানে আরো অনেকগুলি স্ত্রীলোক ছিল। তাদের মধ্যে অনেকে তাঁর সংকোচ ভাব দেখে হাসছিল।

 স্বপ্ন শুনে শ্রীজীবনকৃষ্ণ বললেন -তারকনাথের দুটি কন্যা লক্ষ্মী ও সরস্বতী। অর্থাৎ জ্ঞানের প্রভাব আরো বাড়বে, এই দেখাচ্ছে। আর লক্ষ্মীর কৃপা পরিবারের সকলের ওপর হবে।

২৮/১১/১৯৬২

সকালে আমি ও মুখুজ্যেমশাই যথারীতি শ্রীজীবনকৃষ্ণের বাসায় উপস্থিত হলাম। ভবানী আসার পর শ্রীজীবনকৃষ্ণ আমাদের নিয়ে প্রাতঃভ্রমণে বেরুলেন। আজ আঠারোনালা অভিমুখে যাত্রা করা হলো। আঠারোনালা ও লক্ষ্মীজলা। সে মাঠে বারো মাস ধান হয় এবং প্রত্যেকদিন নতুন ধান কাটা হয়। সেই চাল থেকে শ্রীশ্রীজগন্নাথদেবের দৈনন্দিন ভোগ হয়। সেখানে খানিকক্ষণ থাকার পর আমরা মন্দিরের দিকে গেলাম। কিছু বাজার করে যখন ফিরলাম তখন বেলা প্রায় ন'টা।

 বেলা আড়াইটার সময় গিয়ে দেখি রামকৃষ্ণ পাঠ করছে ও শ্রীজীবনকৃষ্ণ ধ্যানস্থ। তিনটের সময় তার ধ্যান ভাঙ্গলো। কথামৃতে শ্রীরামকৃষ্ণ বলছেন--

বিষ্ঠার পোকা বিষ্ঠাতেই ভালো থাকে। তাকে ভাতের হাঁড়িতে রাখলে হেদিয়ে হেদিয়ে মরে যাবে

 এই প্রসঙ্গে শ্রীজীবনকৃষ্ণ তাঁর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে বললেন-

কেন মরে যাবে? ভাতের হাঁড়িতে রাখলে ভাত হয়ে বেরিয়ে আসবে। লিঙ্গ গুহ্য নাভি ছেড়ে মন যখন সহস্রারে গিয়ে থাকবে তখন সে ব্রহ্মত্বে পরিবর্তিত হয়ে যাবে এবং ব্রহ্ম হয়ে ফিরে আসবে। অমৃতকুণ্ডে পড়লে অমৃতই হয়ে যাবে, মরবে না।

 বেলা চারটেয় পাঠ বন্ধ হলো। সকালে অনেক হাঁটার দরুন শরীর ক্লান্ত থাকায় শ্রীজীবনকৃষ্ণ সান্ধ্যভ্রমণে বেরুলেন না। আমরা বেরিয়ে ফেরার পর সন্ধ্যে ছটায় পুনরায় পাঠ শুরু হলো।

 শরণাগত হলে তিনি উদ্ধার করেন” - শ্রীরামকৃষ্ণের এই কথা প্রসঙ্গে শ্রীজীবনকৃষ্ণ বললেন -শরণাগত না হলে তিনি উদ্ধার করবেন না কেন? আমরা কেউ জবাব দিতে পারলাম না। হাওড়ার লক্ষণবাবু (ইনি শ্রীজীবনকৃষ্ণের কাছে নবাগত) বললেন -শরণাগত না হলে তিনি যদি উদ্ধার না করেন তবে তিনি কিসের ভগবান?

 শ্রীজীবনকৃষ্ণ বললেন -তোকে প্রণাম হই বাবা। হ্যাঁ। যিনি ভগবান তিনি সবাইকে কৃপা করবেন। ডাকুক আর নাই ডাকুক, তবেই তাঁর মাহাত্ম্য। যেমন আমাকে অনেকে না দেখে দেখছে (স্বপ্নে)। ওমর খৈয়াম বলেছেন, “ভগবান যদি তোমাকে ডেকে তোমার কৃপা পেতে হয় সে তো আমার পরিশ্রমের ফল; তোমার কৃপা কোথায়?”

২৯/১১/১৯৬২

শ্রীজীবনকৃষ্ণের সঙ্গে প্রাতঃভ্রমণ করে আমরা বাসায় ফিরলাম বেলা প্রায় সাড়ে আটটায়। দুপুরে পাঠ আরম্ভ হলো। একটু পরেই অরুণের (সিঁথি) চিঠি এলো। চিঠি পড়ে শ্রীজীবনকৃষ্ণ ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন। বললেন -সে সারা রাস্তা কাঁদতে কাঁদতে গিয়েছে। কেন বলুন তো? আমি বললাম -ঈশ্বরে প্রেম হয়েছে। তিনি বললেন -আপনারাও ওই জবাব দিলেন? সান্নিধ্য থেকে বিচ্যুত হওয়া জীবচৈতন্য জাগ্রত হয়ে জীবের সুখ দুঃখ অনুভব করাচ্ছে।

 সন্ধ্যেবেলায় পাঠপ্রসঙ্গে বললেন -যীশু বলে কেউ ছিলনা। স্বামীজীর কথা উদ্ধৃত করে বললেন, যীশুও ছিলনা জিহোবাও ছিলনা। তারা আসবেও না। ঠাকুর বলেছেন, তিনি যীশুকে দেখেছেন। প্রকৃতপক্ষে তিনি দেখেছেন সক্রেটিসকে। যীশুর যে ফটো আমরা দেখি তা আসলে সক্রেটিসের ছবি। সক্রেটিসের একজন বন্ধু ছিলেন। তিনি প্রায়ই সক্রেটিসের সঙ্গে তর্ক করতেন। কিন্তু প্রতিবারই পরাস্ত হতেন। একদিন সক্রেটিস তাঁর সম্বন্ধে ডেলফির oracle (দৈববাণী) শুনলেন, you are the wisest man in the world. (তুমি পৃথিবীতে সর্বাপেক্ষা জ্ঞানী ব্যক্তি)। সক্রেটিস ভাবলেন -আমিতো জানি আমি কিছুই জানিনা।

 

৩০/১১/১৯৬২

সকাল সাড়ে ছটা নাগাদ শ্রীজীবনকৃষ্ণের বাসায় এলাম আমি এবং মুখুজ্যেমশায়। ভবানীর প্রতীক্ষায় বসে থাকা হলো। ভবানী এলে সকলে বেড়াতে বেরোনো হলো। শহরের মধ্যে দিয়েই ঘুরে ঘুরে আমরা যখন ফিরলাম তখন আটটা বেজে গেছে।

 বেলা দুটোর সময় যথারীতি কথামৃত পাঠ শুরু হলো। শ্রীজীবনকৃষ্ণ এখন সমষ্টিগত অনুভূতির উপর বেশি জোর দিচ্ছেন। কথামৃতের ব্যাখ্যা অনেক সময় দেন নূতন দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে। শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত প্রথম ভাগ থেকে পাঠ হচ্ছে -সাধু মহাত্মারা, যারা ঈশ্বরলাভ করেছেন, তাদের কথা বিশ্বাস করতে হয়। শ্রীজীবনকৃষ্ণ বললেন

 -যাদের ঈশ্বরলাভ হয়েছে তাদের কথায় বিশ্বাস করতে হবে কেন? বিশ্বাস করলে কি ভগবান লাভ হয়? বাস্তবে না প্রতিফলিত হলে কিছুই হবে না। শুধু কল্পনা দ্বারা কিছু হয় না। বাস্তবে না পেলে ভগবান দর্শন হয় না। ঠাকুরের জীবন আর আমার জীবন দেখুন। ঠাকুর সব কথায় বিশ্বাস করতে বলেছেন আর এখানে সব বাস্তবে প্রতিফলিত হচ্ছে। বিশ্বাস করতে হচ্ছে না। একথা আজ বলছি হয়তো আর কখনো বলবো না, আর বোধহয় কেউ শুনতে পাবে না।

 দিনের বেলায় মুখুজ্যেমশায় স্বপ্ন দেখেছেন, -তিনি চিৎ হয়ে শুয়ে আছেন। শ্রীজীবনকৃষ্ণ এসে তাঁর ওপরে শুলেন মুখের ওপর মুখ রেখে জিভে জিভটি দিয়ে। শ্রীজীবনকৃষ্ণ ব্যাখ্যা করলেন, -ব্রহ্মবিদ্যা দান।

 শ্রীজীবনকৃষ্ণের সঙ্গসুখ অভিলাষী অনেকেই আসছেন তাকে নিবিড় ভাবে পাবার আশায়। তাদের ফিরে যেতে হয় বিয়োগব্যথা অন্তরে বয়ে। আজ ভবানী কলকাতায় ফিরে যাবেন। তিনি সমুদ্রতীরে এসেছেন শ্রীজীবনকৃষ্ণের কাছে বিদায় নিতে। শ্রীজীবনকৃষ্ণ তাঁকে  বুকে জড়িয়ে ধরলেন। ভবানী শ্রীজীবনকৃষ্ণের বুকের উপর মাথা রেখে কাঁদতে লাগলেন। ট্রেনের সময় হচ্ছে। এবার যেতে হবে। ভবানী পিছু হেঁটে চলেছেন যতক্ষণ না সেই মুখ দৃষ্টি পথের অগোচর হয়। তারপর রিকশায় উঠে মাথা হেঁট করে চলে গেলেন। আমারও ফিরবার দিন এগিয়ে আসছে। সেদিন কী হবে তাই ভাবছি। ভবানীকে বিদায় দিয়ে সমুদ্রের ধারে বেঞ্চের উপরে আমরা এসে বসলাম। পাঁচটা বাজতে উঠে এলাম। শ্রীজীবনকৃষ্ণ তাঁর বাসায় ফিরে গেলেন। আমরা আমাদের বাসায় এলাম। একটু পরেই আমি পাথরকুটিতে শ্রীজীবনকৃষ্ণর বাসায় এলাম। রামকৃষ্ণ ও গোবিন্দ বেরিয়ে ফিরে এল। শ্রীজীবনকৃষ্ণ কথামৃত পাঠ করতে বললেন। যখন কথামৃত মাথায় ঠেকিয়ে রামকৃষ্ণকে দিলেন, রামকৃষ্ণ বইখানি মাথায় ঠেকিয়ে ডুঁকরে  কেঁদে উঠল। শ্রীজীবনকৃষ্ণ বললেন ওকি রে! বস! আমাকে বললেন -ওর ভাব হয়ে গিয়েছিল।

 এবেলা পাঠের সময় শ্রীজীবনকৃষ্ণ দুটি প্রসঙ্গের উল্লেখ করলেন। মহাপ্রভু ছ বছর দাক্ষিণাত্যে প্রচার করে ফিরে এলে নিত্যানন্দ জিজ্ঞাসা করলেন, তিনি কী দেখে এলেন। মহাপ্রভু উত্তর করলেন -শুন শুন নিত্যানন্দ ভাই। সংসারী জীবের গতি নাই। অর্থাৎ সেখানে কিছুই হয়নি। 

দ্বিতীয় প্রসঙ্গটি কঠোপনিষদের শ্লোক--

একো বশী সর্বভূতান্তরাত্মা একং রূপং বহুধা যঃ করোতি 

ত্বমাত্মস্থম যেহ্নুপশ্যন্তি ধীরা স্তেষাং সুখং শাশ্বতং নেতরেষাম। 

শ্রীজীবনকৃষ্ণ বললেন, “সুখ মানে কি? সুখ মানে জানা--উত্তমরূপে জানা তবেই সুখ

কঠোপনিষদের পরের শ্লোক-

নিত্যোহনিত্যানাং চেতনশ্চেতনানাম

একো বহুনাং যো বিদধাতি কামান

ত্বমাত্মস্থং যেহনুপশ্যন্তি ধীরা

স্তেষাং শান্তিঃ শাশ্বতী নেতরেষাম।

 এই প্রসঙ্গে শ্রীজীবনকৃষ্ণ বললেন, “শান্তি মানে একত্ব। একত্ব না হলে প্রকৃত শান্তি হয়না। 

১/১২/১৯৬২

আমাদের দেরি দেখে শ্রীজীবনকৃষ্ণ আজ নিজেই আমাদের বাসায় চলে এসেছেন। আমরা তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়লাম। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। এক আধ ফোঁটা বৃষ্টিও পড়েছিল। বেশিদূর যাওয়া হলো না। অল্পক্ষণ পরেই আমরা শ্রীজীবনকৃষ্ণের বাসায় ফিরে এলাম। তখন বেলা প্রায় আটটা। শ্রীজীবনকৃষ্ণ নিজেই ঈশোপনিষদ ও কঠোপনিষদ পাঠ করতে লাগলেন। তাঁর পড়ার ভঙ্গিতেই কিছু কিছু অর্থ উপলব্ধি হতে লাগল। তিনি বললেন -ওবেলা থেকে যে কদিন থাকেন ঊপনিষদই পাঠ হোক। 

একদিন জীবনকৃষ্ণ বলেছিলেন -আমি আর উপনিষদের ওপরে যেতে চাই না। এই উপনিষদ পর্যন্তই কেউ ধারণা করতে পারছে না, আবার এর ওপর গেলে সব গুলিয়ে যাবে। এখানে যা ফুটেছে কদমতলায় কতবার বলেছি। এতদিন সে সবের কোনো সাপোর্ট পাইনি। তাই ভগবান কোথা থেকে উপনিষদ এনে আমার সামনে ধরলেন। বেদের এই সাপোর্ট পেয়ে দেখিয়ে দিতে পাচ্ছি এখানে কী হয়েছে আর তাদেরই বা কী হয়েছে।

 আজ দুপুরে পাঠের সময় মুখুজ্যেমশায় ঈশোপনিষদ পাঠ করছেন। জীবনকৃষ্ণ মাঝে মাঝে ব্যাখ্যা দিয়ে চলেছেন। বেলা সাড়ে তিনটার সময় আমাকে কথামৃত পাঠ করতে বললেন। চারটে পর্যন্ত পাঠ করার পর আমরা বেড়াতে বেরুলাম। সন্ধ্যা পর্যন্ত বেড়ানো হলো শহরের ভেতর দিয়ে। আজ আর সমুদ্রের ধারে বসা হয়নি।

২/১২/১৯৬২

আজ প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়ে শ্রীজীবনকৃষ্ণ বললেন, গতরাত্রে রামকৃষ্ণ স্বপ্ন দেখেছে, তার একজন বন্ধু --নাম ভগবান-- তার গায়ে ঠেসান দিয়ে বসে আছে। ব্যাখ্যা বললেন, -ওর ভগবানত্ব লাভ হলো। আমরা ভাবলাম, রামকৃষ্ণ তো ভগবানের কাছেই রয়েছে। সালোক্য  অবস্থা। তবে এটা বোধহয় ব্যবহারিক, আত্মিকে সাযুজ্য লাভ করছে। বললাম, যারা আসছে তারা শুধু ফিরছেনা; বেশ কিছু নিয়ে যাচ্ছে। শ্রীজীবনকৃষ্ণ বললেন, -নিয়ে তো যাচ্ছে। রাখতে পারলে হয়। সংসারের আবহাওয়ায় অনেক সময় উবে যায়। এ প্রশ্ন আমারও। উনি বলেছেন, এখানে এসে থাকতে। আমিও ঠিক করেছি সত্বর বাড়ি থেকে ফিরে এসে ওঁর সঙ্গ করব।

৩/১২/১৯৬২

সকালে শ্রীজীবনকৃষ্ণ আমাকে ও মুখুজ্যেমশাইকে নিয়ে মিউনিসিপ্যাল মার্কেট ইত্যাদি পার হয়ে গুন্ডিচার দিকে অগ্রসর হলেন। তিনি এত দ্রুত চলেন যে তাঁর সঙ্গে তাল রেখে চলা কঠিন। 

গুন্ডিচায় এসে একটি মন্দিরের বারান্দায় বসা গেল। তাঁর একদিকে আমি আর একদিকে মুখুজ্যেমশায়। একটি বিষয়ে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শ্রীজীবনকৃষ্ণের সচিদানন্দ অবস্থা হল। গাল দুটি ফোলা, মুখ দেখে মনে হয় যেন হাসছেন। অনেকক্ষণ এই অবস্থায় ছিলেন। আমরা অবাক হয়ে একদৃষ্টে ওঁর দিকে চেয়ে আছি। কিছুক্ষণ পরে প্রকৃতিস্থ হয়ে বললেন -পূর্বদিকে একটি সরোবর আছে। আমাদের সরোবর দেখাতে নিয়ে গেলেন। সরোবরের স্বচ্ছ জল শান বাঁধানো ঘাট। সিঁড়ি দিয়ে নেমে জলে হাত দিলেন। সেই ঘাটের ওপরে দুপাশে দুটি মন্দির। একটি পূর্বেকার রাজার, আরেকটি তাঁর রানির। সরোবর দেখে স্টেশনের রাস্তা ধরে শ্রীজীবনকৃষ্ণ যখন বাসায় ফিরলেন তখন নটা বেজে গেছে। আমি বাড়ি ফিরবার জন্য স্টেশনে বার্থ রিজার্ভ করতে গেলাম।

 আমি ও মুখুজ্যেমশায় যথারীতি বেলা দুটোর সময় পাথরকুটিতে শ্রীজীবনকৃষ্ণর বাসায় এলাম। দেখি রঘুনাথ (সেন) এসে গেছে। আর রামকৃষ্ণ আজ চলে যাবে, তার আয়োজন হচ্ছে। 

পাঠ আরম্ভ হলো। ঈশোপনিষদ থেকে পাঠ হচ্ছে। অত্যাশ্রমী প্রসঙ্গে শ্রীশঙ্কর তাঁর ভাষ্যে বলছেন যারা অত্যাশ্রমী তাঁরাই ব্রহ্মত্ব লাভ করতে পারেন। শ্রীজীবনকৃষ্ণ বললেন, হ্যাঁ। কিন্তু যারা যারা আশ্রমী তাঁরা ষষ্ঠ ভূমির ওপর উঠতে পারেন না। ষষ্ঠভূমির ওপর উঠলে তবে অত্যাশ্রমী। ঠাকুর অত্যাশ্রমী, শঙ্কর নন।  আরো বললেন, যোগ কয় প্রকার -- লয়যোগ, ধ্যানযোগ, মন্ত্রযোগ, ভক্তিযোগ আর রাজযোগ। একমাত্র রাজযোগের মাধ্যমেই ব্রহ্মত্ব বা একত্ব লাভ হয়।

 প্রকৃতিলীন ও ব্রহ্মলীন প্রসঙ্গ উঠলো। বললেন, প্রকৃতিলীন ও ব্রহ্মলীন একই জিনিস। মানুষের ভিতরে লীন হওয়াকেই প্রকৃতিলীন বলে। মানুষ মাত্রেই প্রকৃতিলীন হয়। তাই মৃত্যুর পরেও পুরনো লোককে লোকে স্বপ্নে দেখে। জগতের যা-কিছু এই দেহের মধ্যে আছে; সময় হলে বা প্রয়োজন হলে মানুষ দেহের মধ্যে দেখতে পায়।

 আত্মা সাক্ষাৎকার প্রসঙ্গে বললেন, ত্রিপুটি অবস্থায় আত্মা সাক্ষাৎকার হয়। সচিদানন্দ গুরু আত্মা সাক্ষাৎকার করিয়ে আত্মায় লীন হন।  দ্রষ্টা আত্মার মধ্যে থেকেই আত্মার সাক্ষাৎকার করেন। তাই আত্মা সাক্ষাৎকারের পর গুরুকে (সচিদানন্দ গুরুকে) দেখা যায় না। আমার আত্মা সাক্ষাৎকারের পর ঠাকুর যখনই এসেছেন, বিকৃত রূপ নিয়ে।

 এবার প্রসঙ্গ নিত্যসিদ্ধ। ঠাকুর বলছেন, নিত্যসিদ্ধ ছেলেবেলা থেকেই ভগবানকে জানতে চান। শ্রীজীবনকৃষ্ণ বললেন, তা হয় না।  নিত্যসিদ্ধ, সে তো সিদ্ধ হয়েই জন্মেছে। তার আর চাইতে হয় না।

 শ্রীজীবনকৃষ্ণের একটি দৈববাণী হয়েছে--সব মাথাটা ধুয়ে ফেল ব্যাখ্যা পাননি, বললেন। আজ রামকৃষ্ণ কলকাতায় চলে গেল। আমরাও সাড়ে চারটের পর একটু বেড়াতে বেরোলাম। শ্রীজীবনকৃষ্ণ সকালে অতিরিক্ত হাঁটার জন্য বিকেলে বেড়াতে যাননি। আজকে শ্রীরামপুরের মানুবাবু ছোট একটি মেয়ে নিয়ে এসেছেন। সন্ধে ছটায় পুনরায় পাঠ আরম্ভ হ, আটটা পর্যন্ত পাঠ চলল।

৪/১২/১৯৬২

আজ সকালে শ্রীজীবনকৃষ্ণের শরীর অসুস্থ থাকায় বেড়াতে যাননি। আমি ও মুখুজ্যেমশাই সমুদ্রসৈকতে বেড়িয়ে এলাম। বেলা দুটোয় আমরা যথারীতি পাঠে গেলাম। চারটে পর্যন্ত পাঠ চলল।  তারপর শ্রীজীবনকৃষ্ণ আমাকে ও মুখুজ্যেমশাইকে নিয়ে ফ্ল্যাগস্ট্যান্ডের কাছে বেড়াতে গেলেন। সমুদ্রতীরে বেঞ্চের ওপর খানিকক্ষণ বসে আমরা ফিরে এলাম। আজ পাঠের সময় উপনিষদ কথাটির অভিনব ব্যাখ্যা দিলেন। বললেন -উপনিষদ মানে ব্রহ্মের নিকট। উপ মানে নিকট, আর নিষদ মানে বসা। সন্ধ্যা থেকে রাত্রি আটটা পর্যন্ত পাঠ চলল। পাঠপ্রসঙ্গে বললেন, “নারদ ও শুকদেব, এদের চেতন সমাধি। এঁরা অবতার নন। যাঁদের চৈতন্য কটিদেশ পর্যন্ত অবতরণ করে, তাঁরাই অবতার। এঁদের চৈতন্য কন্ঠদেশ পর্যন্ত অবতরণ করেছিল। 

কেনোপনিষদ  প্রসঙ্গে বললেন, -আমি কতবার বলেছি, আমাকে যারা দেহের মধ্যে দেখেছেন তাঁরা ব্রহ্মবিদ। এখন উপনিষদে তার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। তারা ধীরঃ, অর্থাৎ জ্ঞানী। আর তাদের সুখ ও শান্তি শাশ্বত।

 ছেলে যদি বাপের হাত ধরে সে পড়লেও পড়তে পারে। কিন্তু বাপ যে ছেলের হাত ধরে তার আর পড়বার ভয় থাকেনা।” --ঠাকুরের এই কথার ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বললেন, “বিবিদিষা ও বিদ্বৎ।

 চৈতন্যদেব কত বড় কামজয়ী। সার্বভৌম যখন তাঁর জিভের ওপর চিনি ঢেলে দিলেন, চিনি ফর ফর করে উড়ে গেল। এই প্রসঙ্গে শ্রীজীবনকৃষ্ণ বললেন, ভক্তেরা ঠাকুরের জিভে একবার চিনি ঢেলে দিয়ে দেখলেন না কেন? তাহলে বুঝতে পারা যেত -- কামজয়ের এই উদাহরণ কি রকম সত্য! 

 ৫/১২/১৯৬২

 সকালে হেঁটে এসে সিংহ রায় মশাই এসেছেন শ্রীজীবনকৃষ্ণের বাসায়।  শ্রীজীবনকৃষ্ণ কথায় কথায় বললেন -দেখুন পুরী থেকে চিরবসন্ত বিদায় নিয়েছিল। আমাদের আগমনে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। গত বছরেও খুব শীত ছিল। এ বছর শেষ হতে চলল এখনো তেমন শীত পড়েনি। বসন্তকালের হাওয়া বইছে। বসন্ত কাল মানে শীত-গ্রীষ্মের সাম্য় ভাব। এবার দেহতত্ত্বে আসুন। কুণ্ডলিনী সাম্য রক্ষা করে দেহে জাগ্রত হয়। তাই দেহেতে সাধন হয়। জগত আমার ভেতরে, তাই আমার হলে জগতের সাধন হবে।

 গতকাল রঘুনাথ স্বপ্ন দেখেছে-- খুব বড় একটা আয়না, তাতে সে মুখ দেখছে। ব্যাখ্যা দিলেন, রঘুর স্বস্বরূপ দর্শন হলো। 

 যথারীতি প্রাতঃভ্রমণ স্নানাহার সেরে দুপুরে পাঠ; আবার সন্ধ্যায় পাঠ। সন্ধ্যায় পাঠের সময় ব্রহ্মবিদ্যা প্রসঙ্গে বললেন--

 এটা একটা বিদ্যা, আপনা-আপনিই দেহেতে স্ফুরিত হয়। প্রথম স্তরে যার দেহেতে হয়, সে দেখে জগতের সঙ্গে এক। দ্বিতীয় স্তরে, যার দেহেতে একত্ব  ফুটে ওঠে, তাকে দেখে বহু লোক তাদের দেহের ভেতরে।  তারা তাকে বলে, ওগো!  তুমি আর আমরা এক। এই বহুত্বে একত্ব।

কঠোপনিষদের ‘তেষাং সুখং শাশ্বতং’ এবং ‘তেষাং শান্তি শাশ্বতী’ এই প্রসঙ্গে বললেন, ‘সু’ মানে সুপ্রতিষ্ঠিত। ‘খ’ মানে জ্ঞান। ‘সুখং’ মানে সুপ্রতিষ্ঠিত জ্ঞান, অর্থাৎ ভগবানকে উত্তমরূপে জানা। ‘শান্তি’ মানে একত্ব। এক না হলে    শান্তি হয় না। বহুত্বে শান্তি হয় না। 

ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের দুধ খাওয়া ছাড়া প্রসঙ্গে বললেন --তিনি তো বাছুরের কষ্ট দেখে দুধ খাওয়া ছাড়লেন, তা দেখে জগতের লোক কি দুধ খাওয়া ছাড়লো? না। তবে তাতে জগতের কি হল?

অনেকে বলে - If you want to set the world right start it with yourself First- এই প্রসঙ্গে বললেন এখানে ভুল বলা আছে, কারণ মানুষ জগতকে সিধে করতে পারেনা। ভগবানই জগতকে সিধে করেন।

 মানু বাবু মেয়ের সঙ্গে আজ কলকাতা যাত্রা করলেন।

শ্রীরামকৃষ্ণ ঘোষ চিঠি দিচ্ছেন শ্রীগোবিন্দ ঘোষকে (বিবেকানন্দ ঘোষ)। তিনি বাড়ি ফিরে গেছেন। পাঁচ তারিখ সকালে বাড়ি পৌঁছেছেন। আপাতত শ্রীজীবনকৃষ্ণের দেখাশোনার জন্য গোবিন্দ রয়েছেন। তিনি লিখেছেন--

 কিছু ভালো লাগছেনা। সেই পুরনো হিসেবে হিসেব আর হিসেব চলেছে। আমার মাথায় সেই পাথরকুটি রয়েছে। সকালবেলা ঘুম ভাঙছে শ্রীভগবানের দর্শনে আর তাঁর মুখে ‘জয় ভগবান জয় ভগবান’, কী অপূর্ব! খাটে বসে ধ্যান করছেন, সেই ধ্যান মূর্তি। কখনো আমাদের ঘরে ঢুকে বলছেন--কি করছিস রে? বাবা তোদের এই খাওয়া হলো? সে কিরে! আমি ভাবছিলাম তোরা বুঝি বিশ্রাম করছিস। চোখের ওপরে ভাসছে। কী সুন্দর দিন কাটছিল! কোথায় ছিলাম কোথায় এলাম এখন এই ভাবছি। বাড়িতে জিজ্ঞাসা করলে, হ্যাঁরে মন্দির গেছিলি? আমি বললাম, না। আমার দরকার ছিল না। আমি জ্যান্ত জগন্নাথকে দেখেছি। যে ভগবান সত্য সত্য খায়, কথা বলে, ঘুমায়, আমি সেই জ্যান্ত ভগবানের কাছে ছিলাম। তিনি কৃপা করে তাঁর পদপ্রান্তে রেখেছিলেন। এই কথা শুনে তারা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। কী ভাবলে কে জানে! ঠাকুর আমার শত ত্রুটি মার্জনা করে যে তাঁর কাছে থাকতে দিয়েছিলেন, এইটাই আমার ভাগ্য কেন পূর্বপুরুষের ও ভাগ্য। আমার কি সাধ্য যে আমি তাঁর কাজ করতে পারি? তিনি দয়া করে থাকতে দিয়েছিলেন এই। তুমি ভাই ঠাকুরের কাছে আছ তা পরম সৌভাগ্য জানবে। ঠাকুরকে আমার শতকোটি সাষ্টাঙ্গ দিও। আর কি লিখব? ঠাকুরকে প্রণাম করে আমার চিঠির শেষ করি। হ্যাঁ, আর তুমি মাঝে মাঝে ঠাকুরের কথা আমাকে লিখে জানাও, যদি পারো তো সপ্তাহে একবার করে লিখে জানাবে। তুমিও জানো, আমি চিঠি লিখতে পারিনা। চিঠি লেখা আমার আসে না। তুমি আমার ভালোবাসা জানবে।”  



৬/১২/১৯৬২

 প্রাতঃভ্রমণের জন্য যথারীতি শ্রীজীবনকৃষ্ণসকাশে উপস্থিত হলাম আমি ও মুখুজ্যেমশাই। চা পান করতে করতে শ্রীজীবনকৃষ্ণ প্রশ্ন তুললেন --শংকর ও রামানুজ বলেছেন, মানুষের ব্রহ্মত্বলাভ পর্যন্ত হতে পারে কিন্তু সর্বশক্তিমানত্ব হয়না। তার সর্বশক্তিমানত্ব হয় যদি সব শক্তি এক স্থানে কনসেনট্রেটেড হয় তবে।  কিন্তু একত্ব হলে শক্তি বহুতে ছড়িয়ে পড়ে। এক জায়গায় সংকলিত হলে একজনেরই হয়। ব্রহ্মত্ব একজনের হলে বহুলোক তার আনন্দ উপভোগ করে। অতএব সর্বশক্তিমানত্ব কালেকটিভ আর ব্রহ্মত্ব বা একত্ব ইউনিভার্সাল।

 ভ্রমণে বেরিয়ে উর্ধ্বরেতা ও নিম্নরেতার প্রসঙ্গ তুলে বললেন--

 মানুষ মাত্রই ব্রহ্ম, সে জানুক আর নাই জানুক। তবে কেউ উর্ধ্বরেতা আর কেউ নিম্নরেতা। দুটোরই প্রয়োজন। দুজনেই সৃষ্টি করছেন। কেউ নিজেকে একইরূপে বহুর মধ্যে সৃষ্টি করেছেন; আর কেউ নানারূপে নানা আকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন।

 দুপুর দুটোর সময় কথামৃত থেকে পাঠ শুরু হল।

প্রসঙ্গঃ  শ্রীরামকৃষ্ণ--ব্রহ্ম আকাশবৎ।

 শ্রীজীবনকৃষ্ণ বললেন, “ব্রহ্ম আকাশবৎ কি?  আকাশবৎ মানে শূন্যম, অর্থাৎ নেই। এটা কি ঠিক? না। ব্রহ্ম একজন জ্যান্ত মানুষ। আর প্রত্যেক মানুষটিই ব্রহ্ম।  যার ভেতরে প্রকাশ পান তিনি ও মানুষ। অতএব এটা ঠিক নয়।  

        প্রসঙ্গঃ শ্রীরামকৃষ্ণ--ভগবান যাকে যা দেবার তা দিয়েই রেখেছেন। 

        শ্রীজীবনকৃষ্ণ বললেন, হ্যাঁ। ভগবান যাকে যা দেবার তা দিয়েই রাখেন। সেই জন্য কেউ ব্রহ্মত্ব লাভ করছেন, আর কারোর দেহে ফুটছে না। কোন দার্শনিক বলেছেন, ফ্রী উইল নেই, সবই প্রিডেস্টিনেশন। অর্থাৎ ভগবান যা করেন তাই হয়।

 সন্ধে ছটার সময় শ্রীজীবনকৃষ্ণের বাসায় এসে দেখি, দুজন অপরিচিত ভদ্রলোক এসেছেন। শ্রীজীবনকৃষ্ণ জিজ্ঞাসা করলেন--একটা লোককে হাজার হাজার লোক দেখে (স্বপ্নে) কেন? তারা বললেন --সুপার-কন্সাসনেসের জন্য হয়। অনেক লোককে না দেখে স্বপ্নে দেখতে পাওয়া যায়।

 শ্রীজীবনকৃষ্ণ --এই যে অতীনবাবুর বাড়িওয়ালী তিন মাস আগে আমাকে দেখলেন, যখন তার খুব কষ্টের মধ্যে দিন কাটছিল--এ কী করে হয়? তিনি কত কেঁদেছিলেন। সেই রাত্রেই দেখেছেন, আমি হাত তুলে তাকে অভয় দিচ্ছি।

 ভদ্রলোক দুটি কি জবাব দেবেন স্থির করতে পারছিলেন না। এমন সময় তড়িৎবাবু (তড়িৎ কুমার পাল) প্রশ্ন তুললেন, -কারো ব্রহ্মত্ব ফুটে ওঠে, কারো হয় না কেন? এই অবসরে ভদ্রলোক দুটি চলে গেলেন। শ্রীজীবনকৃষ্ণ আগের প্রসঙ্গ তুলে বললেন, “ওই যে ঠাকুর বলছেন, যাকে যা দেবার তা ভগবান দিয়ে রেখেছেন”।

প্রসঙ্গঃ  শ্রীরামকৃষ্ণ--ঈশ্বর দর্শন হলে সব সংস্কার আপনি চলে যায়।

শ্রীজীবনকৃষ্ণ বললেন,  -আচ্ছা ঠাকুরের ঈশ্বর দর্শন হয়েছিল নিশ্চয়ই। তার কোনো ভুল নেই। কিন্তু ঠাকুর কী করে কালী ঘরে গিয়ে মা কালীর সামনে চামর দুলোচ্ছেন?  এটা কি অসত্য নয়? তিনি পুজো করছেন কী করে তাই আশ্চর্য হচ্ছি। সত্য দেহেতে জাগলে অসত্য দেহ ছেড়ে চলে যায়।

 আমি বললাম -আপনি তো বোধিসত্ত্বে দেখিয়েছেন, বোধি যখন লাভ হচ্ছে, তখনও সংস্কার ছাড়তে চাইছে না। শ্রীজীবনকৃষ্ণ - হ্যাঁ, সংস্কার যাওয়া বড় কঠিন। কিছুতেই যেতে চায়না। এইভাবে ব্রহ্মজ্ঞান লাভ না হলে সংস্কার যায় না।

 কথামৃতের একটি গানের প্রসঙ্গে শ্রীজীবনকৃষ্ণ বললেন -সদাশিবপ্রিয়া কেন? দেহ না থাকলে শিবের অস্তিত্ব থাকে না। দেহ থাকলে তবে তো শিব সেখানে বাস করবেন? তাই দেহ হল সদাশিবপ্রিয়া।

 অনাদ্যা--অর্থাৎ চিরকালই আছেন। এই জগত সত্য, এই মানুষ চিরকাল আছে, তাই  অনাদ্যা।

৭/১২/১৯৬২

সকালে আমি ও মুখুজ্যেমশাই শ্রীজীবনকৃষ্ণের বাসায় এলাম।  উনি স্বপ্নের কথা জিজ্ঞাসা করায় আমরা গতরাত্রে দেখা আমাদের স্বপ্ন নিবেদন করলাম।  আমি স্বপ্ন দেখছি--

 নিমতিতা স্টেশনে শেখ বদরুদ্দিনের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছি। শেখ বদ্রুদ্দিন নিমতিতা রেলস্টেশনে আমার এ এস এম ছিলেন। এখন স্টেশনমাস্টার হয়েছেন। তাকে বদ্রুদ্দিন বলে ডাকছি কেউ সাড়া দিচ্ছেনা।  লোককে জিজ্ঞাসা করায় তারাও কিছু বলতে পারছেনা। পরে দেখছি বদ্রুদ্দিন তার বাসা থেকে বেরিয়ে এসে বলছে, -দাদা কেমন আছেন? যে লোকটি দাঁড়িয়েছিল, সে বললে,  আপনি বদ্রুদ্দিন বদ্রুদ্দিন বলছেন? এর নাম তো ভগবান। আমি বদ্রুদ্দিনকে জিজ্ঞাসা করলাম, -এ নাম তোমায় কে দিয়েছেন?  বদ্রুদ্দিন উত্তর করল, ঠাকুর দিয়েছেন। ঘুম ভেঙে গেল।  

শ্রীজীবনকৃষ্ণ বললেন, -বাঃ! বেশ তো! অর্থ জিজ্ঞাসা করায় বললেন, -মুসলমানদেরও ভগবানত্ব লাভ হবে তাই দেখাচ্ছে। 

মুখুজ্যেমশায় দেখছেন একটি লোক হাত দিয়ে সমুদ্রে মাছ ধরছে। লোকটি মাছ ধরে তাঁকে এনে দিলো। একটি  রূপোর মতো উজ্জ্বল মাছ, আর দুটি ছোট মাছ। শ্রীজীবনকৃষ্ণ ব্যাখ্যা দিলেন, আবার নতুন করে সাধন হবে। 

মুখুজ্যেমশায় আরেকটি স্বপ্নে দেখছেন, একটি মরা মোষকে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। মোষটা এত বড় যে রাস্তা ব্লক হয়ে যাচ্ছে।  শ্রীজীবনকৃষ্ণ ব্যাখ্যা দিলেন, -ক্রোধের নাশ হচ্ছে, তাই দেখাচ্ছে। 

মুখুজ্যেমশায় আরেকটি স্বপ্ন দেখেছেন। রাস্তায় টাকা ছড়ানো রয়েছে তিনি তার ওপর দিয়ে মাড়িয়ে চলে যাচ্ছেন। শ্রীজীবনকৃষ্ণ ব্যাখ্যা দিলেন, -ঐশ্বর্যে  আসক্তি নেই তাই দেখাচ্ছে।

 শ্রীজীবনকৃষ্ণ রঘুনাথের প্রশংসা করে বললেন, -সে যে আমায় কীভাবে রাখবে তা ভেবে ঠিক করতে পারছে না। 

৮/১২/১৯৬২

আজ বেলা দুটোর সময় শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত পাঠ শুরু হলো। পাঠের মাঝে প্রসঙ্গক্রমে শ্রীজীবনকৃষ্ণ বললেন, এই প্রাণশক্তি সমস্ত জীবের মধ্যে, এমনকি তরুলতার মধ্যেও আছে। কিন্তু আত্মিক শক্তি একমাত্র মানুষের দেহেতে আছে। সেই আত্মিক শক্তি সবাইকে এক করে।

 সূর্যমণ্ডলস্থিত পুরুষের কথায় বললেন, -উপনিষদের ঋষি বলে গেছেন, হে সূর্যমণ্ডলস্থিত পুরুষ! তুমি আর আমি এক। তাঁরা বলে যাননি সেই পুরুষের আকৃতি কী রকম। একটা কল্পনা মাত্র। আর এখানে ১৪/১৫ জন লোক আমাকে, একজন জ্যান্ত মানুষকে, সূর্যমণ্ডলে দেখেছে। তাহলে সূর্যমণ্ডলস্থিত পুরুষ কে হল? আমি বললাম--আপনি।

 শ্রীজীবনকৃষ্ণ--হ্যাঁ, তাঁরা একটা কল্পনা করে গেছেন। আর এখানে বাস্তবে একটা জীবন্ত মানুষকে দেখছে। অর্থাৎ তারা বাইরে সূর্যমণ্ডলে সেই পুরুষকে দেখতে চেয়েছে, আর এখানে লোকে নিজেদের দেহের ভিতর সূর্যমণ্ডলস্থিত পুরুষ কে দেখছে। কত তফাৎ! একটা কল্পনা,  আর একটা বাস্তব।

বেলা চারটের পর সান্ধ্যভ্রমনে যাওয়া হল। সন্ধে ছটায় বেরিয়ে এসে পুনরায় পাঠ আরম্ভ হলো।  রাত্রি আটটা পর্যন্ত পাঠ চলল।

 কথায় কথায় উঠল, আমাদের অচিন্ত্যধামের বাড়ির মালিক শ্রীমতি ষোড়শী দেবী শ্রীজীবনকৃষ্ণকে পুরীতে ‘অনাথবন্ধু’ বাড়িতে আসার প্রায় তিন মাস আগে স্বপ্নে দেখেছেন। তিনি তখন খুব কষ্টে ছিলেন। ভগবানকে ডেকে কেঁদেছিলেন। রাতে স্বপ্ন দেখছেন, শ্রীজীবনকৃষ্ণ তাঁকে হাত তুলে অভয় দিয়ে বলছেন, ‘আমি আছি, তোর ভয় নেই’। যেদিন শ্রীজীবনকৃষ্ণ (৩০/১০/১৯৬২) আমার জন্য বাসা ঠিক করতে আমার সঙ্গে তাঁর বাড়িতে গিয়েছিলেন সেই দিন শ্রীজীবনকৃষ্ণকে দেখে তিনি মনে করেছিলেন, এঁকে কোথায় যেন দেখেছি। পরে মনে পড়ল, স্বপ্নে দেখেছেন। সেই কথা একদিন মুখুজ্যেমশায়কে বলেছিলেন। 

ভোর রাত্রে স্বপ্ন দেখলাম, বাড়ি যাবার জন্য সব জিনিসপত্র গোছাতে যাচ্ছি। আলমারি খুলে দেখছি কিছুই নেই। খালি কয়েক খানি ধোপার বাড়ির কাচানো কাপড় আছে। সেগুলি নিয়ে যাবার জন্য বার করে নিলাম। ঘুম ভেঙে গেল। শ্রীজীবনকৃষ্ণ ব্যাখ্যা দিলেন, খালি দেহ নিয়ে বাড়ি যাচ্ছেন, তাও আবার ধোয়া।  

৯/১২/১৯৬২

 সকালে শ্রীজীবনকৃষ্ণের বাসায় এসে চা পানের পর আমরা ভ্রমণে বেরুলাম।  সমুদ্রের ধার ধরে অনেকদূর বেরিয়ে শ্রীশ্রী জগন্নাথ মন্দিরের পাশ দিয়ে আরও খানিক ঘুরে আমরা বাসায় ফিরলাম। শ্রীজীবনকৃষ্ণ পরপর দুদিন এক রাস্তা দিয়ে যেতেন না। আজ এ রাস্তা কাল ও রাস্তা এইভাবে চলতেন।  

 আজ সন্ধ্যায় কথামৃত পাঠ এর সময় উপনিষদের সূর্যমন্ডলস্থিত পুরুষের কথা উঠল। আমাকে শ্রীজীবনকৃষ্ণ জিজ্ঞাসা করলেন, উপনিষদের ভাষ্যকারেরা সূর্যমণ্ডলস্থিত পুরুষের বিষয় কী লিখেছেন? 

 আমি--তাঁরা পরমপুরুষ বলে লিখেছেন।

 শ্রীজীবনকৃষ্ণ--সে পরমপুরুষটি কীরকম দেখতে তা কিছু বলেছেন কি?

 আমি--না।

  শ্রীজীবনকৃষ্ণ--পরমপুরুষ মানে শ্রেষ্ঠ পুরুষ, অর্থাৎ উত্তম পুরুষ। এ সম্বন্ধে প্রশ্ন করলে সঠিক উত্তর দিতে না পারায় তিরস্কার করে বললেন, ভালো করে না বুঝে উত্তর দেবেন না।

 তারপর কথায় কথায় বললেন, --বেয়ন্ড উপনিষদ নোবডি উইল বি এবল টু আন্ডারস্ট্যান্ড। ইট ইজ সাফিশিয়েন্ট ফর দ্য হিউম্যান রেস। এর জন্যে আমাকে কতদূর নেমে এসে কথা বলতে হচ্ছে জানেন? যা ফুটেছে তা বললে এক বিন্দুও কেউ ধারণা করতে পারবে না, সব গুলিয়ে ফেলবে। তাই উপনিষদ পর্যন্তই দিয়ে গেলাম।

 শ্রীজীবনকৃষ্ণ--কালাতীত ও গুণাতীত মানে কি বোঝেন?

 আমি--আপনি। কত আগে লোকে আপনার এই রূপ দেখেছে। এই কালাতীত।

শ্রীজীবনকৃষ্ণ--আরো আছে। আমার অল্প বয়সে এমনকি আমার জন্মাবার আগে হয়তো আমাকে এই রূপে দেখেছে। আর গুণাতীত?

 আমি বলতে পারলাম না। গোবিন্দ বলল, --তিনপুরুষে আপনাকে দেখে--বৃদ্ধ দেখছে, জোয়ান দেখছে এবং শিশুও দেখছে--এই গুণাতীত।

 কথামৃতে ঠাকুরের কথা--মরা মন্ত্র--’ম’ মানে ঈশ্বর, ‘রা’ মানে জগত। এই প্রসঙ্গে বললেন, --আগে আত্মার সাক্ষাৎকার, তারপর আত্মার মধ্যে জগত দর্শন। পরে জগত বীজে পরিণত হয়। বীজ স্বপ্নে পরিণত হয় এবং স্বপ্ন মিলিয়ে গিয়ে বোধাতীত অবস্থা। বুদ্ধের ‘শূন্যং’।   

 মুখুজ্যেমশাই ট্রান্সে দেখছেন, একটি স্নিগ্ধ জ্যোতি সামনে ঘুরছে--চাঁদের মত মনে হল। কিন্তু জ্যোতির মধ্য থেকে কথা কয়ে বলছে--আমি সূর্য। মুখুজ্যেমশায় বলছেন, তুমি সূর্য কি করে বুঝবো? তোমার তেজ নেই। জ্যোতি বলছে, আমি তেজ সংবরণ করে নিয়েছি, তুমি আমার মধ্যস্থ পুরুষকে দেখবে বলে। তখন তার মধ্যে ভেসে উঠলো শ্রীজীবনকৃষ্ণ মূর্তি।

 শ্রীজীবনকৃষ্ণ শুনে বললেন, আপনি সেই সূর্যমণ্ডলস্থিত পুরুষকেই দেখেছেন। ঋষিরা প্রার্থনা করেছিলেন, আর সূর্য কৃপা করে আপনাকে দেখাচ্ছেন। কত ফারাক বলুন দেখি! এই নিয়ে ১৬ জন আমাকে সূর্যমণ্ডলে দেখল।

১০/১২/১৯৬২

সকালে শ্রীজীবনকৃষ্ণের বাসায় পৌছে দেখি, তিনি জলযোগ করছেন। চা দিয়ে গেল। চা খেতে খেতে হঠাৎ তাঁর গা পাক দিয়ে উঠল এবং তিনি বাইরে গিয়ে বমি করলেন।

 অসুস্থতাবশত শ্রীজীবনকৃষ্ণ ভ্রমণে বেরোলেন না। আমি ও মুখুজ্যেমশায় সমুদ্রের ধার দিয়ে খানিকটা বেড়িয়ে বাসায় ফিরলাম। আগামীকাল আমাদের কলকাতা ফিরতে হবে। মুখুজ্যেমশায়ের ইচ্ছেমতো মন্দিরের কাছ থেকে প্রসাদ কিনে আনলাম। শ্রীজীবনকৃষ্ণ বৎসরাধিককাল পুরীধামে আছেন। কোনদিন তিনি মন্দিরের মধ্যে প্রবেশ করেননি, শ্রীশ্রীজগন্নাথদেবের মূর্তি দর্শন করেননি, প্রসাদও খাননি। আমরা কিন্তু এখনো সংস্কারমুক্ত হতে পারিনি। দুপুরে দুটোর সময় যথারীতি কথামৃত পাঠ শুরু হল।

 আজ দিবানিদ্রার মধ্যে মুখুজ্যেমশায় স্বপ্ন দেখেছেন--আকাশ থেকে শ্রীজীবনকৃষ্ণের গোলাকার জ্যোতির্ময় মুখ ও উঁচু করা ডান হাত (যেন অভয় দিচ্ছেন) রকেটের মতো দ্রুতগতিতে নেমে কাছে এসে ‘মাভৈ’ বলে মুখুজ্যেমশায়ের দেহেতে মিশে গেল।

 শ্রীজীবনকৃষ্ণ স্বপ্ন শুনে বললেন--সহস্রার থেকে নেমে এসে অভয়দান করলেন। শ্রীজীবনকৃষ্ণ আজ সারাদিন কিছু খাননি। পাঠের সময় প্রায় মৌন  ছিলেন। চা পানের পর কয়েকটি প্রসঙ্গ তুললেন। যোগের কথায় বললেন--যোগ চার রকম। লয় যোগ, হঠযোগ, রাজযোগ এবং মন্ত্রযোগ বা ভক্তিযোগ। লয়যোগ--ব্যাসদেবের নির্বিকল্প সমাধি। হঠযোগ--ফিজিক্যাল কালচার। রাজযোগ--যা এখানে হচ্ছে। আর মন্ত্রযোগ--তন্ত্রের সাধন ও ভক্তিযোগ। এঁরা দ্বৈতবাদী, ষষ্ঠভূমির ওপর যেতে পারেন না।

 একটু পরে প্রশ্ন করলেন--ঠাকুর বলছেন--গীতায় বলেছে যাকে অনেকে গণে মানে তার মধ্যে ঈশ্বরের শক্তি আছে। তা যদি হল, তাহলে যাকে অসংখ্য লোক তাদের দেহের মধ্যে দেখে তার কী হয়?

 তাঁর এ প্রশ্নের উত্তর কেউ দিতে পারলেন না। পুনরায় বললেন, কয়েক হাজার বছর আগে ঋষি বললেন অহং ব্রহ্মাস্মি। তারাও মানুষ ছিলেন। আর কয়েক হাজার বছর পরে আমরা দেখছি, গরুর গু মুত খেয়ে মানুষের ধর্ম হচ্ছে। এই একালের ধর্ম!



১১/১২/১৯৬২

 আজ সকালে ভ্রমণে বেরিয়ে শ্রীজীবনকৃষ্ণ ফ্ল্যাগস্টাফ এর কাছে  বেঞ্চটিতে আধঘন্টার উপর বসে ছিলেন। বললেন, কাল থেকে একা একা ঘুরব। বেড়ানোর পর এই বেঞ্চই সম্বল হবে। 

  বাসায় ফিরে শ্রীজীবনকৃষ্ণ কয়েকটি প্রসঙ্গ তুললেন, তার মধ্যে কয়েকটি মনে আছে। কাশ্মীরি শৈববাদ সম্বন্ধে বললেন, কাশ্মীরি শৈববাদে শিবের পাঁচটা মুখের ব্যাখ্যা করেছে--পরমশিব, শিবশক্তিতত্ত্ব, সদাশিব, ঈশ্বরতত্ত্ব, সদাখ্যাতত্ত্ব বা সদবিদ্যাতত্ত্ব। এই পাঁচটিই এখানে ফুটেছে।

 আমাকে বললেন--আমাদের যা হয়েছে, একে ব্রহ্ম জ্ঞান বলব? না ব্রহ্মবিদ্যা, না পরাবিদ্যা? না, তাও ঠিক বলা হচ্ছে না। সত্য--এও ঠিক এপ্রোপ্রিয়েট হচ্ছে না। এই সত্যলাভ যাদের হয়েছে, তাদের কথা ভাবুন, দেখুন তারা কত বড় ভাগ্যবান!

 আমি--সে তো একজনেরই হয়।

 শ্রীজীবনকৃষ্ণ--সে কি! কালেক্টেড ইন ওয়ান প্লেস। কিন্তু সবাইকে নিয়ে। আপনারা কি ছাড়া? আপনাদেরও হয়েছে, এগুলো কি ব্রহ্মজ্ঞান নয়? এই আপনি বসে আছেন--এ কে! ওই রঘু রান্না করছে--ও কে? সকলে কি এক হচ্ছে না? তবে বলতে পারেন ইন্ডিভিজুয়ালের নারিসমেন্ট হচ্ছে।

 বেলা ন’টার সময় আমি আমার বাসায় ফিরে এলাম। আজ আমাদের বাড়ি ফিরতে হবে। বেলা দুটোর সময় যথারীতি শ্রীজীবনকৃষ্ণের কাছে এলাম। তিনি ধ্যানে বসলেন। আমিও ধ্যানে বসলাম। ধ্যানে দেখলাম আমি সমুদ্রে স্নান করছি। খুব বড় বড় ঢেউ আসছে। আমি অচল অটল হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। ঢেউ আমাকে নড়াতে পারছে না। আবার সমুদ্রের তীরে দাঁড়িয়ে জলে আমার রূপ দেখছি। শ্রীজীবনকৃষ্ণ দর্শন শুনে বললেন, আপনার স্বস্বরূপ দর্শন হল।

 বেলা চারটার সময় পাঠ শেষ হলে আমাদের বিদায় দেবার জন্য শ্রীজীবনকৃষ্ণ আমাদের বাসায় এলেন। অল্পক্ষণের মধ্যেই আমরা রওনা হলাম। আমি দুটি রিকশা নিয়ে পাথরকুটিতে শ্রীজীবনকৃষ্ণের বাসায় এসে রঘুনাথকে ডেকে তুলে নিলাম। শ্রীজীবনকৃষ্ণ ও মুখুজ্যেমশায় হেঁটে আসছিলেন। এবার শ্রীজীবনকৃষ্ণ আমাকে ও মুখুজ্যেমশাইকে বিদায় আলিঙ্গন দিলেন। আমাদের চোখ জলে ভরে উঠল। শ্রীজীবনকৃষ্ণ বললেন--যখনই সময় পাবেন, চলে আসবেন। দ্বার খোলাই রইল।

 রাস্তা দিয়ে চলেছি। রাস্তা দেখে শ্রীজীবনকৃষ্ণের কথাই মনে পড়ছে। দেড় মাস ধরে তাঁর সঙ্গের কথা মনে করতে করতে স্টেশন এলাম। রঘুনাথ আমাদের ট্রেনে চাপিয়ে দিল। খুরদা রোড থেকে ভুবনেশ্বর--অল্পক্ষণের জন্য নিদ্রার আবেশ এসেছিল। তার মধ্যে স্বপ্ন দেখলাম শ্রীজীবনকৃষ্ণ সমভিব্যাহারে চলেছি।  একটু পরে আর তাঁকে দেখছি না। দেখছি এক জ্যোতির সমুদ্র, তাতে বেশ বড় বড় ঢেউ উঠছে।

 এরপর যতবার ঘুম ভেঙেছে শ্রীজীবনকৃষ্ণের কথাই মনে হয়েছে, চোখের সামনে ভেসে উঠেছে কেবল তাঁরই মূর্তি। 

 


 


প্রথম পর্ব সমাপ্ত

 



 

শ্রীজীবনকৃষ্ণের অমৃত কথাসার প্রথম অংশ

১৯৫০ থেকে ১৯৫৩ সালের কিছু কথা সংকলিত করা হয়েছে শ্রীজীবনকৃষ্ণ সংশ্রয় থেকে। যেহেতু সেখানে দিনলিপিতে তারিখের উল্লেখ নেই, তাই এখানে তারিখের উল্ল...