Wednesday, August 21, 2024

শ্রীজীবনকৃষ্ণের অমৃত কথাসার প্রথম অংশ


১৯৫০ থেকে ১৯৫৩ সালের কিছু কথা সংকলিত করা হয়েছে শ্রীজীবনকৃষ্ণ সংশ্রয় থেকে। যেহেতু সেখানে দিনলিপিতে তারিখের উল্লেখ নেই, তাই এখানে তারিখের উল্লেখ সম্ভব হলনা। মাস অনুসারে মোটামুটি একটা ভাগ অনুসরণ করা হল। এই দিনলিপির লেখক শ্রীঅনাথ নাথ মণ্ডল। এছাড়া শ্রীযুক্ত আনন্দমোহন ঘোষের স্মৃতিকথা, ‘কত কথা পড়ে মনে’ থেকেও উক্ত সময়ের স্মৃতির উল্লেখ রইল। বলা বাহুল্য, উনিও দিনের সূচী রাখেননি। বর্ষক্রম অনুসরণ করে ও অন্যান্য লেখার সঙ্গে মিলিয়ে এখানে সামঞ্জস্য রেখে উদ্ধৃতি দেওয়া হল।  ১৯৫৩ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত শ্রীজীবনকৃষ্ণের কথাগুলি একত্র করার জন্য মাণিক্যে প্রকাশিত যাবতীয় দিনলিপি থেকে সংকলিত করা হলো। এর ফলে তাঁকে কেন্দ্র করে এই বারো বছরের আধ্যাত্মিক বিবর্তনের একটি স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যাবে। যেহেতু দিনলিপিগুলি আলাদা করে প্রকাশিত হয়েছে তাই ব্যক্তিগত স্বপ্নদর্শন ও কথা এই সংকলনে যোগ করা হয়নি। দিনলিপিগুলির দিনানুক্রমিক সূচী, মাণিক্য বর্ষ ও সংখ্যা, লেখকের নাম, ও পৃষ্ঠাসহ পরিশিষ্টে উল্লেখ রইল। ইচ্ছে হলে যাতে মাণিক্য থেকে অংশটি পড়ে নেওয়া যায়।     

১৯৫০ খৃষ্টাব্দ

ডিসেম্বর মাস

১) সে সময় শ্রীজীবনকৃষ্ণের মুখ প্রায় অপর কারোর মুখ হয়ে যেত। উনি ঘরের সকলকেই প্রায় জিজ্ঞাসা করতেন,’'বলুন তো এবার কার মুখ হয়েছি?” গৌরবাবু (বড় গৌর) সঙ্গে সঙ্গে বলে দিতে পারতেন। এ অবস্থাটা গৌরবাবুর মাস ছয়েক স্থায়ী হয়েছিল।

(শ্রীজীবনকৃষ্ণ তখন চাকুরিজীবি। সেসময় তিনি কেবল শনি রবি ও ছুটির দিনগুলোতে মেলানি দিতেন। ঘরে আসছেন অনাথ নাথ মণ্ডল, নগেনবাবু, সত্যবাবু, বিষ্টুবাবু (পাল), গৌরবাবু, লোকেনবাবু, প্রমুখ হাতে গোনা কয়েকজন।)

       ২) এক রবিবার। সত্যবাবু ওঁর খাটে মাথা ঠেকিয়ে দাঁড়াতেই উনি বললেন, ‘আসুন আসুন, খাটে বসুন।‘ সত্যবাবু বললেন—না না, আমি চেয়ারেই বসছি। সত্যবাবু চেয়ারে বসার পর উনি বললেন—দেখুন, যাদের অহংকার আছে তাদের আমি খাটে বসাই। তা দেখলুম আপনার অহংকার নেই।

(ঘরে আরও যারা সেসময় এসেছেন, তারা আগে উল্লিখিত মানুষ ছাড়াও ফেলুবাবু, মহারাজদা (কেষ্ট মহারাজ), বসন্তবাবু, নিমাই ইত্যাদি)

       লোকেনবাবু তাঁর একটি স্বপ্ন নিবেদন করলেন। স্বপ্নটি আমার মনে নেই। স্বপ্নটি শুনে উনি খাটে বসে একরকম ব্যাখ্যা করলেন। তারপর খাট থেকে নেমে মেঝেতে দাঁড়িয়ে আর একরকম ব্যাখ্যা করলেন। আবার বাইরে থেকে ফিরে এসে অন্যরকম ব্যাখ্যা করলেন। তারপর খাটের দক্ষিণদিকে জল খেতে গিয়ে একরকম ব্যাখ্যা করলেন, আবার জল খেয়ে খাটে বসে আর একরকম ব্যাখ্যা করলেন। সবশেষে বললেন, ‘দেখ, স্বপ্নের ঠিক ঠিক ব্যাখ্যা করা ভারি শক্ত। ও যে দেখিয়েছে, সেই ব্যাখ্যা দিয়ে দেবে। স্বপ্নের কোনোদিন যেন ব্যাখ্যা করতে যেও না।‘  

       কথা প্রসঙ্গে বললেন—যে চৈতন্য মসেসের ভেতর অবতরণ করেছিল, সেই চৈতন্য মহম্মদের ভেতর অবতরণ করেছিল, সেই চৈতন্য ঠাকুরের ভেতর অবতরণ করেছিল আবার সেই চৈতন্য এখানে অবতরণ করেছে। আমরা দেখতে পাচ্ছি কী? না, ফারদার ফারদার ডেভলাপমেন্ট হয়ে চলেছে।

বললেন, অবতারত্ব সাধনের একটা শ্রেষ্ঠ অঙ্গ।

‘সক্রেটিসও অবতার’, এই কথা বলে তিনি একদিন সমাধিস্থ হয়ে গেলেন।

বললেন—জগতের আর কোনও আচার্যের (ঠাকুরের মতো) এরকম ঘন ঘন সমাধি হতে দেখা যায় না। মহাপ্রভুর হতো, তবে বেশির ভাগ সময়েই দশাপ্রাপ্তি। আর ইউরোপে দেখা যায় সক্রেটিসের ছ সাত ঘণ্টা ধরে অজ্ঞান হয়ে থাকা, যাকে ওরা নাম দিয়েছে এপিলেপ্টিক ফিট। ঋষিদের মধ্যে এসব ছিল। তাঁরা বলছেন শারীরী বিদ্যা। তাঁদের কাছে এ বস্তু করামলকবৎ ছিল। অর্থাৎ করতলে একটা আমলকীকে রেখে যেমন ইচ্ছে নাড়াচাড়া করা যায়, তেমনি এই বিদ্যাকেও তাঁরা কন্ট্রোল করতেন।

জানুয়ারী ১৯৫১

মাস্টারমশাই কথামৃতে একজায়গায় বলছেন, ‘নরেন্দ্র যখন আসে যেন একটা কাণ্ড সঙ্গে করে আনে।’ ঠাকুর তার উত্তরে বলছেন—হ্যাঁ, একটা কাণ্ডই বটে। শ্রীজীবনকৃষ্ণ শুনে বললেন—এখানে ঠাকুর বলতে চাইছেন, তিনি যেন গুঁড়ি, আর স্বামীজি যেন তাঁর কাণ্ড। মাস্টার মশাই কিন্তু অন্য কথা বলেছেন। (সম্ভবত মাস্টার মশাই বলতে চেয়েছেন একটা হইহই ব্যাপার)।

কথায় কথায় বললেন, মাস্টার মশাই খুব ইনটেলিজেন্ট ছিলেন।

এক জায়গায় পড়ছি, ঠাকুর স্বামীজিকে বলছেন—নরেন্দ্র, ধর এক খুলি রস রয়েছে, আর তুই মাছি হয়েছিস। তুই কোথায় বসে রস খাবি? স্বামীজি উত্তরে বলছেন—কেন? আমি খুলির কিনারে বসে রস খাব!

উনি তখনই বললেন—দেখুন দেখুন, স্বামীজির কতদূর হবে, ঠাকুর সেকথা স্বামীজির মুখ দিয়ে বলিয়ে নিচ্ছেন। মশাই, মানুষ জানে না যে, সে যখন কথা বলে, তার কথার মধ্য দিয়েই তার অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে সমস্ত বলে যায়। এ বড় অদ্ভুত কথা।

ঘরে লোকেনবাবু হরেনবাবু ইত্যাদি সব আছেন। একটি প্রসঙ্গে লোকেনবাবু ওঁকে প্রশ্ন করলেন—আচ্ছা, যদি আমাদের কেউ আপনার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে, উনি আপনাদের কে হন? তখন কী বলব? উনি উত্তরে বললেন—কেন গো? বলবে যে, “উনি আমাদের পরম বন্ধু।”

মে ১৯৫১

হরেনবাবু এসময় প্রায়ই নিজেকে রাধা রূপে ও ওঁকে কৃষ্ণ রূপে দেখতেন। নানারকম দর্শন হয়েছে ওঁর। এ প্রসঙ্গে উনি একদিন বললেন—গত পরশুদিন ধ্যান করছি। হঠাৎ ধ্যান ভেঙে গিয়ে দেখি ‘হরেন হরেন’  জপ করছি। তারপর ‘রাধা রাধা’ জপ করছি। তখন ভাবলুম তবে কি হরেন ‘শ্রীরাধা’? ও মশাই, কিছুই বলা যায় না। দেখুন না, মহাপ্রভু অমন দশাসই গদাধর প্রভুকে বলছেন—তিনি শ্রীমতীর অবতার। যাই হোক, আপনি কিছু বলবেন না। হরেন আজ এলে আমিই ওকে জিজ্ঞেস করব, দেখি ও কী বলে।

হরেনবাবু এসে ডেক চেয়ারে বস্তে যেতেই উনি চিৎকার করে বললেন—এই হরেন, বল তুই কে? …হরেনবাবু কাঁপা গলায় জবাব দিলেন—আমি মেয়ে। উনি আবার প্রশ্ন করলেন—ঠিক করে বল, তুই কে? হরেনবাবু ভাবস্থ হয়ে বললেন—আমি শ্রীমতী।

অক্টোবর ১৯৫১

শারদীয়ার পর বিজয়া দশমীতে লোক সমাগমের পর হরেনবাবু একগ্লাস সিদ্ধি ও একবাক্স সন্দেশ নিয়ে গিয়ে ওঁর খাটের ওপর রাখলেন। উনি ওই দেখে ভীষণ রেগে গিয়ে বড় গৌরবাবুর জামাই শৈলদাকে বললেন—বাবা শৈল, এসব নীচে সরিয়ে রাখ তো। …কেউই সন্দেশ নিলে না। সকলের মাথায় তখন অপরিগ্রহের বীজ গজগজ করছে। এরপর হরেনবাবু যখন বিদায় নেবার সময় ওঁকে প্রণাম করতে ওঁর সম্মুখে দাঁড়ালেন, তখন বললেন—জীবুদা, তুমি আমার সন্দেশ খেলে না। ও যে ঠাকুরের প্রসাদ। আজ সকালে ধ্যান করার সময় ঠাকুর দৈববাণী করে বলেছিলেন, তুই ওখানে প্রসাদ নিয়ে যাস।

…উনি সন্দেশের কোণা ভেঙে জিভে ফেলে বললেন—হরেন তুই আজ আমার মাথা হেঁট করালি।

এরপর সকলেই সেই প্রসাদ গ্রহণ করলেন।

ডিসেম্বর ১৯৫১

ওঁর ঘরে কিছুদিন যাবার পর উনি সুধীনদাকে ‘আপনি’ থেকে ‘তুমি’ বলে সম্বোধন করতে লাগলেন। এক শনিবার পাঠের পর সুধীনদার সঙ্গী হয়ে জি টি রোড পর্যন্ত গিয়েছি। সুধীনদা বললেন—উনি অমূল্য রতন নিয়ে বসে আছেন।

একদিন কথামৃতে পড়া হচ্ছে—শঙ্করাচার্য চণ্ডালকে বলছেন, ‘এই তুই আমায় ছুঁলি!’ তখন উনি সুধীনদাকে বললেন—“দেখো দেখো সুধীন, শঙ্করের ব্রহ্মজ্ঞান হয়নি।” এ প্রসঙ্গে জগু (বারীন চট্টোপাধ্যায়, প্রায় এই সময়েই ওঁর কাছে গেছিলেন) ওঁকে বলেছিল, “আচ্ছা, শঙ্করের তো ব্রহ্মজ্ঞান হয়নি?” সে কথা শুনে বলেছিলেন—“কে তোকে বলেছে যে, শঙ্করের ব্রহ্মজ্ঞান হয়নি? শঙ্করের ব্রহ্মজ্ঞান হয়েছিল, তবে দেহে বর্তায়নি।”

(এই সময় দুলাল ও জগু আসে।)

১৯৫২

এক গ্রীষ্মের রবিবারে প্রায় দুপুর আড়াইটে নাগাদ আমি আর জগু গিয়েছি। উনি খাটে বসেছিলেন। আমরা দরজার সামনে দাঁড়াতেই বললেন—আয় বাবা আয়। …ওরে, ঋষিরা ব্রহ্মবিদ্যা দান করার জন্য এইরকম ‘হাঁ’ করে বসে থাকত। তবে ব্রহ্মবিদ্যা দানগ্রহণকারীর বয়স কত হওয়া চাই জানিস? আট বছর।

তারপর বললেন, “খাওয়া দাওয়ার পর একটু কাত হয়ে শুয়েছি। অমনি ট্রান্সে দেখছি যে তোদের, নব আর দুলালকে নিয়ে জগতের লোকের দ্বারে দ্বারে অতি দীনহীনভাবে ঘুরে ঘুরে ভিক্ষা করে বেড়াচ্ছি। আর গতকাল রাত্রে স্বপ্নে দেখলুম, আমি দুলালের হাত ধরে একটা বাড়ির ছাদে ঘুরে বেড়াচ্ছি। আর জগু সেই বাড়ির দেওয়ালে লাগানো রাজমিস্ত্রিদের ভারার ওপর দাঁড়িয়ে নানারকম অঙ্গভঙ্গি করছে আর আমরা হাসছি।”

(প্রসঙ্গত, জগুর মধ্যে মুসলমানি সংস্কার খুব প্রবল ছিল। ভারি সরল ছিল। সে ঠাকুরের মুখে দৈববাণী শোনে যে সে শিবরামদাদা, ঠাকুরের ভাইপো, আবার জন্মেছে। এসব বিশদে শ্রীজীবনকৃষ্ণ সংশ্রয়তে আছে।)

১২ই জানুয়ারি ১৯৫৩

কথামৃত পাঠ করছি। এক জায়গায় পড়ছি, যেখানে ইঁদেশের গৌরী পণ্ডিত দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে এসে ঠাকুরকে উদ্দেশ করে বলছেন—কোথা গো পরমহংস বাবু? উনি এই কথা শুনে বললেন—“একে বলে দৈব। এই কথা রেকর্ড রেখে যাচ্ছে যে, এযুগে আর গেরুয়া পরা পরমহংস হবে না। বাবুর বেশে পরমহংস আসবে।”

এক জায়গায় পড়ছি, ঠাকুর বলছেন—“দেখ, সাগর পার হবার জন্য স্বয়ং রামচন্দ্রকে সাগর বাঁধতে হল। কিন্তু তাঁর ভক্ত হনুমান শুধু ‘রাম’ নামের জোরে একলাফে সাগর পার হয়ে গেল।” উনি ঘরে বসা হিন্দুস্থানি সাধুটিকে সহজ ভাষায় বলতে লাগলেন—সুনিয়ে মহারাজ, ভগবানকো সাধন কর কে তব ভগবান হোনে হোতা হ্যায়। পরন্তু উনকা ভকত উনকা নাম লেকে ভগবান বোন জাতা। ভগবান কিধার হ্যায় জি? ভগবান অন্তরমে হ্যায়। এই কটি সে লেকর মস্তক তক ভবসাগর কহতা হ্যায়। জব মনুষ্য কা মন কটি মে রহেতা হ্যায় উসকো কহতা হ্যায় সাধারণ মনুষ্য। কিন্তু জব মনুষ্য কা মন মস্তক মে আতা হ্যায়, তব উহ ভগবান জাতা।”

মার্চ ১৯৫৩

“জড় সমাধিতে সমস্ত প্রাণশক্তি একটি মাত্র বিন্দুতে জড়ো হয়। ঠিক যেন ইউক্লিড’স পয়েন্ট। দ্য পয়েন্ট হ্যাস আ পজিশান, বাট নো ম্যাগ্নিচিউড। …আপনারা ঠাকুরের যে ছবি দেখেন সে হল জড় সমাধির ছবি। কম্ত এর ফিলোসফি ওই ইউক্লিড এর পয়েন্ট এর ওপরে বেস করে। কম্ত বলছেন—পয়েন্ট এন্ড ইটস এক্সিস্টেন্স। আমার সামনে এই বিরাট বিশ্ব। আমি জগত থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে একটি মাত্র পয়েন্ট এ ফিক্সড করছি। তাহলে কী দেখতে পাচ্ছি? এই বিরাট বিশ্বের আরেকটি রূপ হল একটি পয়েন্ট মাত্র। ঠিক বেদান্তের বিরাট ও বীজ।”

ঘর নিস্তব্ধ। বিষ্টুবাবু পাঠ করছেন—কলিতে নারদীয় ভক্তি। উনি বলে উঠলেন—ও মশাই…নারদীয় ভক্তি মানে কি? আমি চুপ করে আছি দেখে বললেন—ওরে বাবা, নারদ ভদ্রলোকের কটা বাড়ি আর কত টাকা ব্যাংক ব্যালেন্স ছিল বল না। নারদীয় ভক্তি মানে সর্বত্যাগীর ভক্তি। …তবে বাবা, ঠাকুরের শিক্ষা হল, খেটে খেতে হবে। রোজগার পেট চলা পর্যন্ত। তা নইলে সর্বত্যাগী সেজে জোচ্চুরি করে পেট চালাতে হবে। বুঝলি?

পড়া হচ্ছিল, কাম যেন মূল, কামনা তার ডালপালা। উনি শুনে বললেন, “আহা ঠাকুরের কী অদ্ভুত দৃষ্টি! ঠাকুর এখানে ফ্রয়েডিয়ান লাইটে কথা বলছেন। এটাই ফ্রয়েডিয়ান সাইকলজির মূল তত্ত্ব। আজ যদি ফ্রয়েড বেঁচে থাকত, আমি তার কাছে গিয়ে বলতুম, দেখো তুমি ঠিক ধরেছ। কিন্তু আরেকটা বস্তু তুমি ধরতে পারো নি। সে বস্তু সম্বন্ধে ঠাকুর যা বলেছেন—কামের উল্টো রাম। তুমি রাম অর্থাৎ ডিভিনিটি সম্বন্ধে কিছুই জানো না।

এপ্রিল ১৯৫৩

বৌদ্ধ দর্শনে বলছে, মানুষ মরে গেলে তার দেহের ফাইভ এলিমেন্টস ডিসইন্টিগ্রেটেড হয়ে যায়। অথচ তারা বলতে পারেনি যে আবার কী করে সেগুলো ইন্টিগ্রেটেড হয়। অথর্ব বেদে কিন্তু একটা উদাহরণ দিচ্ছে, সেটা হল ‘জলৌকা’। জলৌকা (জোঁক) যেমন পরের স্থানটা ধরে তবে পূর্বের স্থানটা ছাড়ে, সেইরকম মানুষেরও দেহের পঞ্চভুত ডিসইন্টিগ্রেটেড হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আবার ইন্টিগ্রেটেড হয়। (পরবর্তী কালে এই অভিমত তিনি আর পোষণ করতেন না।

মশাই এক কথা বারবার বলা মানে অনুশীলন হওয়া। আর, এককথা বারবার বলে আপনাদের মাথায় হ্যামার না করলে আপনারা বুঝতেন আমার ‘যৌগিক রূপ’?

(এই পর্যায়ের সংকলন শ্রীঅনাথ নাথ মণ্ডলের দিনলিপি থেকে।)

****      

  

১৯৫৩ খৃষ্টাব্দ

১৪ই জুন

গতকাল সুধীনবাবুর বন্ধু এসেছিলেন। তিনি স্বপ্ন দেখেছেন, মা কালী ছোট হয়ে এসে কাটারি দিয়ে তাঁকে কোপাচ্ছেন। তারপর দেখছেন মাথার ওপর পায়রার ঝাঁক। শ্রীজীবনকৃষ্ণ আগের দিন এর ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন, কাটারি দিয়ে কোপানো অর্থাৎ গাঁট ছাড়াচ্ছেন, দেহ আত্মা পৃথক। পায়রার ঝাক—বড় আধার।

       আর একটা স্বপ্নে দেখছেন—দক্ষিণেশ্বরের মন্দির প্রাঙ্গনে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর আগে আগে চলেছেন। মা কালী ছোট মেয়ের রূপে পেছনে, ও তার পেছনে তাঁর মৃতা স্ত্রী। উনি ব্যাখ্যা দিলেন, বিদ্যাস্ত্রী। স্ত্রী হচ্ছে ধর্মের সহায়।

১৫ই জুন

       শ্রীজীবনকৃষ্ণ—মহাপ্রভু নদীয়ায় বিষ্ণুপ্রিয়া ছাড়া সকলকে দর্শন দিলেন। আর ঠাকুর—তিনি যখন শুনলেন যে মা (সারদা) দক্ষিণেশ্বরে এসেছেন, চটি পায়ে গলবস্ত্র হয়ে মাকে আহবান করছেন আর বলছেন—তুমি এসেছ? মথুর নেই, কে তোমার আদর আপ্যায়ন করবে? তোমার কত কষ্ট হবে—বলে নিজে ঘরে মাকে তুললেন। আর তার কিছুদিন পরে সেই মাকে ষোড়শী পূজা করলেন।  

       “ভক্ত নিজেকে যত গোপন রাখে তার পক্ষে ততই ভালো।”

       “মন যোগযুক্ত হলে অজ্ঞাতে মনের মধ্যে নামজপ সদা সর্বদা হতে থাকে।”

১লা জুলাই

শ্রীজীবনকৃষ্ণ মিডল্যান্ড হোটেলে উঠেছেন। বেঙ্গল বোর্ডিং এ অসুবিধে বুঝে সুধীনবাবু ও কেষ্টদা বহু চেষ্টা করে ওঁকে এখানে আনেন।

       রাত আটটা। শ্রীজীবনকৃষ্ণের ভাবাবস্থা। …

       বলছেন—বাবুরাম মহারাজের সচ্চিদানন্দগুরু লাভ হয়েছিল। সচ্চিদানন্দগুরু লাভ হবার পর যদি সাধন হয় তাহলে দেহে সব ঠিক মত ফোটে। …মুরারি গুপ্তকে মহাপ্রভু রামনাম ছেড়ে কৃষ্ণনাম করতে বলেছিলেন। কিন্তু সারারাত চেষ্টা করে বিফল হয়ে মহাপ্রভুর কাছে গেলেন। মহাপ্রভু তখন তাঁকে রামনাম ছেড়ে কৃষ্ণনাম জপতে বারণ করেন।

       মহাপ্রভুর বিবিদিষার কথায় বললেন—মহাপ্রভু নদীয়ায় এলেন, কিন্তু এক কড়ারে—বিষ্ণুপ্রিয়া ছাড়া আর সকলকে দর্শন দেবেন। আর সে জায়গায় সন্ন্যাসী ঠাকুর নিজের স্ত্রীর জন্য গয়না গড়াতে দিচ্ছেন। মা দক্ষিণেশ্বরে এলেন, ঠাকুর তখন চটি পায়ে গলবস্ত্র হয়ে অভ্যর্থনা করছেন। ওই আমাদের ঠাকুর। মহাপ্রভুকে প্রণাম। এরকম বিবিদিষা মহাপ্রভুর পক্ষেই সম্ভব।

       ২রা জুলাই

       শ্রীজীবনকৃষ্ণ—পুঁথিতে এমন অনেক কথা আছে যেগুলো কথামৃতে নেই। মাস্টার মশাই শিক্ষিত লোক ছিলেন কিনা, তার ওপর লজিকের মাস্টার ছিলেন। যে জন্য অনেক জিনিস লজিক দিয়ে বিচার করে লেখা। পুঁথি লেখক মুখ্যু লোক কিনা, তাই যেমনটি শোনা তেমনটি লেখা।

       …ধ্যান ভাঙার পর জিজ্ঞেস করলেন, কিছু দেখলি নাকি? বললাম—দেখলাম যে অনাথ আপনাকে কথামৃত পড়তে দিচ্ছে। ব্যাখ্যা দিলেন—কথামৃত ছাড়া আমি অনাথ রে।

       …কথামৃত পাঠের মাঝে বললেন—ঠিক সাধন হয়ে সহস্রারে মন চলে গেলে সাধারণ মানুষ বাঁচে না। ব্রহ্মজ্ঞানের পর একুশ দিন বাঁচে। যারা বেঁচে থাকে জীবন্মুক্ত হয়ে থাকে আর সদাসর্বদা ঈশ্বরীয় আনন্দ ভোগ করে। তারপর বললেন—কৃষ্ণ অর্থ শূন্য। নির্গুণ ব্রহ্ম। কালো কখন? যখন লাল নয় হলুদ নয় বেগুনি নয় নীল নয়, অর্থাৎ কিছুই নেই।

       চাটুজ্যে একখানা গীতা এনেছে। শ্রীজীবনকৃষ্ণ বললেন—গীতা কী হবে? না, পকেটে রাখ। যখনই কারুর হাতে একখানা বই দেখবি সে রাজর্ষি জানবি।

       ৭ই জুলাই

       শ্রীজীবনকৃষ্ণ—যদি তোর ১৮/১৯ বছর বয়সে এইসব অনুভুতি হতো তাহলে জিজ্ঞাসার দরকার হতো না। এ সমস্ত আপনিই দেহে ধারণা হয়ে যেত। বয়সের জন্য এগুলো ভেতরে অনুভুতি হলেও দেহে ঠিক মতো ফোটে না। রোজ একটু ধ্যান করবার সময় করে নিবি। আর তা নাহলে এখানে সন্ধ্যেবেলা চলে আসবি।

       …দাশুবাবু, ফেলুদা ও হরেনবাবুর আসা সম্বন্ধে বললেন, ওদের আর আসবার দরকার নেই। শুধু ভিড় বাড়িয়ে কী হবে? ফেলুবাবুর স্বপ্নে সিস্টেমেটিক (ধারাবাহিক) অনুভুতি প্রসঙ্গে বললেন, ভদ্রলোক ঠাকুরের কৃপায় একেবারে স্বপ্নসিদ্ধ। ওরকম আর দেখা যায়না।

       ২০শে জুলাই

       শ্রীজীবনকৃষ্ণ—ভগবান ভক্তের ভার নেওয়া মানে তার খাওয়া পরার ভার নেওয়া নয়, দেহকে তাঁর ভার বহনের উপযোগী করার ভার নেন—অর্থাৎ গুরুদেহে সাধন।

       ২৩শে জুলাই

       শ্রীজীবনকৃষ্ণ—ঠাকুর গেরুয়াধারী লোক পছন্দ করতেন না। মহাপ্রভু সন্ন্যাস নিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দণ্ড কমণ্ডলু ও গেরুয়া ছেড়ে যেটুকু প্রয়োজন অর্থাৎ শ্মশানের ন্যাকড়া ব্যবহার করতেন। মহাপ্রভুই প্রথম বেদের ধর্ম বুঝতেন আর কিছুটা প্রচার করেছিলেন। তাঁর সাধন কিন্তু তন্ত্রমতে। শঙ্করকে যদিও বেদের প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়, কিন্তু বেদের কোন ধারণা তাঁর ছিল না। প্রচ্ছন্নভাবে তিনি বৌদ্ধ ধর্মই প্রচার করেছেন। নারদের ছিল বিজ্ঞানীর অবস্থা। বিজ্ঞানীর অবস্থা নিগমে হয়।

       এখন দেখতে পাচ্ছি, ঠাকুর আবার একটা নতুন ফেজ দেখাচ্ছেন। এখানে না এলে কারো দর্শন হচ্ছে না।

       ২৪শে জুলাই

       ভেকের কথায় শ্রীজীবনকৃষ্ণ বললেন—মহাপ্রভু গর্দভকে ভেক দিয়ে প্রণাম করেছিলেন, অর্থাৎ যারা ভেক নেয় তারা গর্দভ।

       ঠাকুর পাঁচ টাকা দিয়ে, টাকা মাটি মাটি টাকা, বলে জলে ফেলেছিলেন। আমি দশ টাকা দিয়ে তাই করেছিলাম।

       শিবজ্ঞানে জীব সেবা সম্বন্ধে বললেন—আগে শিবজ্ঞান লাভ করো, তারপর না হয় সর্বজীবে দয়া করো। ভগবানকে লাভ করবার পর লোকের আর কি কিছু চাইবার না থাকে, না চায়?

       আড়াই হাজার বছর আগে বুদ্ধ বলেছিলেন, যেখানে বোধিসত্ত্ব লাভ হয়, সে স্থান ত্যাগ করে আর কোথাও যাওয়া উচিত নয়। অর্থাৎ বলতে চাইছেন, সেখানে সাধনের উচ্চ অবস্থায় আসা যায়। অন্য জায়গায় গেলে তার হবে না। ঠাকুরও কাশী গিয়ে এই কথা বলেছিলেন—এ আমায় কোথায় নিয়ে এলি মা, দক্ষিণেশ্বরে ছিলাম, বেশ ছিলাম।

          পরে বললেন—মহাপ্রভুর মুহুর্মুহু সমাধি হতো। তবে ঠাকুরের সমাধি ও মহাপ্রভুর সমাধিতে তফাত আছে।

       ঋষি অরবিন্দের প্রসঙ্গ ওঠায় বললেন—অরবিন্দের তন্ত্রের সাধন। ইষ্ট সাক্ষাৎকার হয়েছিল। এসব হলে কেউ কেউ ভবিষ্যৎ বলতে পারে। তবে সে খুব নীচু অবস্থা। ভগবান লাভের পর কি কেউ আশ্রম করতে চায়? ঠাকুর শম্ভু মল্লিককে বলছেন না, ঈশ্বর যদি সাক্ষাৎকার হয়, তুমি কি হাসপাতাল ডাক্তারখানা এই চাইবে?

       সাধুর ব্যবহারিক লক্ষণ দুটো। ১) স্ত্রীলোক হতে সর্বদা দূরে থাকবে। ২) কারো কিছু গ্রহণ করবে না। ঠাকুর এতবার বলে গেছেন এসব কথা। বিজয় গোঁসাইকেও বলছেন—গুরুগিরি বেশ্যাগিরি। কিন্তু শিষ্যরা কি ঠাকুরের কথা বুঝেছিল? বিজয় গোস্বামী কি গুরুগিরি বাদ দিয়েছিল? আর বর্তমানেই বা মঠে আমরা কী দেখছি? সবই উল্টো।

       স্বামীজী অত অল্প বয়সে দেহ রাখলেন। তিনি যখন বুঝলেন কর্মই সব নয়, তখন খুবই দেরি হয়ে গেছে। নরনারায়ণের সেবা। নিজে কি নরনারায়ণ হতে বাদ?

       ২৫শে জুলাই

শ্রীজীবনকৃষ্ণ—বুদ্ধদেব বেদবিদ্রোহী ছিলেন। আড়াই হাজার বছর আগে বুদ্ধের সময় হতে এই গুরুগিরি চলে আসছে। একমাত্র মহাপ্রভু খানিকটা ভুল বুঝতে পেরেছিলেন। তাই নিজের স্বপ্নে পাওয়া মন্ত্র কেশব ভারতীকে দিয়ে নিজে গ্রহণ করেছিলেন। কঠোর বিবিদিষার মধ্যে থাকতেন বলে কেউ বুঝত না।

       শঙ্করের মত প্রতিভাবান পুরুষ আজ পর্যন্ত বোধ হয় কেউ জন্মগ্রহণ করেনি। বেদেতে যে আত্মার মধ্যে জগত এর কথা আছে, সেটাকে তিনি নেবেন না বলেই ‘মনেই জগত’ বলছেন। ঠাকুর এক জায়গায় বলছেন, শঙ্করের ব্রহ্মজ্ঞান হয়নি।

       ঠাকুরই এই অদ্ভুত অর্থ করলেন যে ‘ম’ মানে ঈশ্বর, ‘রা’ মানে জগত।

       ২৬শে জুলাই

       শ্রীজীবনকৃষ্ণ—সচ্চিদানন্দগুরু লাভ হলে অবতার পর্যন্ত সাধন হয়। আত্মা সাক্ষাৎকার না হলে সব সংশয় যায় না। ঈশ্বর কৃপা করে দেহ থেকে মুক্ত হলে তবে মুক্তি। আত্মার মধ্যে জগত দর্শনের নাম বিশ্বরূপ দর্শন। এই যে তোরা দেখছিস, এ একটা কত বড় অদ্ভুত বল তো! ঠাকুর যা সব বলে গিয়েছিলেন, তাই এখন সব তোদের মধ্যে দিয়ে ফুটে উঠছে। ঠাকুরের সময় এসব অনুভূতি কারো হয়নি।

       ওসবে কোনও প্রয়োজন নেই। শুধু দুবেলা হাত জোড় করে বেশ করে ঠাকুরকে দুটো প্রণাম করবি। আর শুধু ঠাকুর ঠাকুর করবি।

       ওরে সব শেষে কর্ম থাকে না। তোদেরও একসময় কর্ম ত্যাগ হয়ে যাবে। এমনি ছাড়বে না।

       ৩০শে জুলাই

       শ্রীজীবনকৃষ্ণ—সহস্রারে মন গেলে আর দেহ থাকে না। তাই নগেনবাবু যখন জ্যোতি দেখেছিল আমার ভয় হয়েছিল। আবার নব’র (ত্রিলোচন দত্ত) কথায় বলছেন—ওর প্রাক্তন সংস্কার আছে বুঝতে পারছি। কিন্তু লন্ঠনের চিমনীর কাঁচ ফাটলে আর জোড়া লাগেনা।

       আমাদের কথায় বললেন—তোরা নিত্যসিদ্ধ আবার ঈশ্বরকটিও। তবুও আমার ভয় হয়।

       আবার নব’র কথায় বলছেন—ওর এই অল্প সময়ের মধ্যে অনুভূতি। ঠাকুরের কথা আছে না—একরকম তুবড়ি আছে, খুব জোরে উঠে হঠাৎ ভস করে ফেটে যায়। বলছি, এত অনুভূতিও ভালো নয়। ও আবার একেবারে নেমে যায়।

       …স্ত্রীলোকের সাধন কত দূর—ঠাকুর গোপালের মা’র দ্বারা তার উদাহরণ সৃষ্টি করে গেছেন।

       মঠের কথায় বললেন—ওঁরা সব মাস্টার মশায়ের ওপর সদয় ছিলেন না। কারণ কথামৃত বিক্রির টাকা মঠ তৈরিতে দেননি। মাস্টার মশাইকে ঠাকুর রসদদারদের একজন বলে গেছেন। কিন্তু মঠের ওরা অন্য একজনের নাম করে।

       ঠাকুর বলেছিলেন, অনুভূতির কথা বলতে নেই। সেই কথাটা কীরকম ভাবে হয়ত বের হয়ে গিয়েছে। ওরা (মঠ) ওই কথাটাই এখন নিজেদের সুবিধেয় লাগাচ্ছে…।

       ১লা আগস্ট

       শ্রীজীবনকৃষ্ণ—বৈরাগ্য, সংসারে বিরাগ, ঈশ্বরে অনুরাগ। সংসারে যে বিরাগ এসেছে অনেকে বুঝতে পারেনা। তাই ঠাকুর ঈশ্বরে অনুরাগের কথা দিয়ে বুঝিয়ে গেছেন। ঈশ্বরে অনুরাগ হবার সাথে সাথে সংসারে বিরাগ এসেছে বুঝতে হবে।

       সহজিয়া সমাধি একমাত্র ঠাকুর ছাড়া পূর্ববর্তী কোনও অবতারের দেখতে পাওয়া যায় না। ঋষিদের মধ্যে দুরকম ছিলেন। একরকম, যারা ঈশ্বর সম্বন্ধে প্রশ্ন করলে বলেন। আর একরকম, যারা কিছুই বলেন না। দাঁতে দাঁত দিয়ে থাকেন। এঁরা বলেন যে, এদের এসব ধারণা হবার নয়। সক্রেটিসের জীবনে দেখতে পাই, তাঁর অনেকদিন অন্তর মাঝে মাঝে সমাধি হতো আর দীর্ঘস্থায়ী হতো। সমাধি মহাপ্রভুর জীবনেও দেখা যায়।

       ঠাকুর এই সচ্চিদানন্দগুরুর কথা বলেছিলেন, তা কি তাঁর শিষ্যরা বুঝেছিল? না, বোঝেনি। তাহলে তারা এরকম গুরুগিরি করত না। ঠাকুর জানতেন যে এ যুগে মানুষের অন্নগত প্রাণ। সেইজন্য তিনি স্বপ্নসিদ্ধের প্রচলন করে গেলেন। সাধন ভজন করবার মতো সময়ের অভাব।

       আমি একসময় সকলকে বলতাম যে এ হয় না (ওঁর নিজের অবস্থা)। এমনকি আমার কাছে কাউকে আসতেও দিতাম না। তারপর যখন ঠাকুর সব আস্তে আস্তে বোঝালেন, তখন তোদের আসতে দিই।

       ২রা আগস্ট

       সুধীনবাবু কথামৃত পড়ছেন—ঈশ্বরকটি যেমন চৈতন্য ছিলেন।

       শ্রীজীবনকৃষ্ণ বললেন, চৈতন্য শ্রীকৃষ্ণ রূপে কটিদেশ পর্যন্ত অবতরণ করেন। রামানুজের কথায় বললেন, রামানুজকে যারা খাবার পরিবেশন করত তারা তাঁকে দু’বার বিষ খাইয়েছিল। প্রথমবারে যখন খাওয়ায় তিনি যোগবিভূতির দ্বারা বিষের ক্রিয়া নষ্ট করেছিলেন। যারা খাইয়েছিল তাদের বলেছিলেন, ওটা এবার হজম করে নিলাম। দ্বিতীয়বার ওঁর বৃদ্ধ বয়সে খাইয়েছিল। তখন উনি কবিরাজ ডাকতে বলেছিলেন। কবিরাজ ওষুধ দিয়ে সে যাত্রা রক্ষা করেছিলেন।

       …নিজের ছেলেকে দেখে আনন্দ হয়, কারণ সে তো তোরই অংশ। এটি হল বাইরের আনন্দ। আবার এই আনন্দ যখন অন্তর্মুখী হয়ে সহস্রারে অবস্থান করে তখন ব্রহ্মানন্দ অর্থাৎ বাইরের এই দেহব্যাপ্ত আনন্দকে যখন সহস্রারে সন্নিবেশিত করা যায় তখনই সমাধি।

       ১৬ই আগস্ট

       শ্রীজীবনকৃষ্ণ সুফী সম্প্রদায়ের কথায় বললেন—মনসুরকে মরুভূমির মাঝে বেঁধে আজ এই অঙ্গের কিছু অংশ কাল অন্য অঙ্গের কিছু অংশ কেটে ফেলে তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল। তাঁকে যখন এইরকম করে হত্যা করা হচ্ছিল তখনও তিনি ‘আনউল হক’ (আমিই সত্য) একথা বলতে ছাড়েননি। এমনকি তাঁর প্রতি রক্তবিন্দু মরুভূমির বালির ওপর যেখানে যেখানে পড়েছিল সেখানেও এই কথা লেখার অক্ষরে ফুটে উঠেছিল।

       ২২শে আগস্ট

       শ্রীজীবনকৃষ্ণ আজ দু তিনদিন হল হাওড়ায় ফিরেছেন।

২৬শে আগস্ট

শ্রীজীবনকৃষ্ণ লীলাপ্রসঙ্গ পড়ছিলেন। বললেন, লীলাপ্রসঙ্গ পড়ি না কে জানিস? ঠাকুরের কথাগুলো বেশ বিশদে বলে যাচ্ছে, কিন্তু যখন নিজে কিছু বলতে যাচ্ছে তখনই সব গোলমাল করে ফেলছে। তাই এই বই পড়তে বসে ভদ্রলোকের আদ্যশ্রাদ্ধ করছি।

এই দেখ না, ঠাকুর নিজে বলছেন আত্মা সাক্ষাৎকার না হলে সব সংশয় যায় না, কিন্তু ভদ্রলোক সে কথা না বলে অন্য বোঝাবার চেষ্টা করছেন। ঠাকুর কি সব খুলে বলতেন যে সকলে সব বুঝবে? ঠাকুর বিশ্বরূপের কথা বলতে ‘মরা’ বললেন। ‘ম’ মানে ঈশ্বর, ‘রা’ মানে জগত। আত্মার মধ্যেই জগত।

এখানে সকলের বেদান্তের অনুভূতি হয়েছে। বেদমতে পঞ্চকোষের সাধন না হলে আত্মা সংকলিত হয়না। সে কি জোর করে কেউ করতে পারে? ঠাকুর যেরকম কৃপা করবেন তা দিয়ে ঠিক সেরকম করিয়ে নেবেন।  

       ২৭শে সেপ্টেম্বর

       শ্রীজীবনকৃষ্ণ—আমি দেখলাম আমার বাঁ পাশের একটা দরজা খুলে গিয়েছে (অনুভূতিতে)। তাতে দেখলাম বহু লোক। …এখন যারা আসছে তারা সবাই ঠাকুরের কৃপা পেয়ে আসছে বুঝছি, কিন্তু তাদের এদিককার কত দূর কী হবে বুঝতে পারছিনা।

       মহাপ্রভুর কথা হল। বললেন, নীলাচলে থাকার সময় একদিন মহাপ্রভু দেবদাসীদের গান শুনে মনে করলেন শ্রীকৃষ্ণ বাঁশি বাজাচ্ছেন। ছুটলেন মন্দিরের দিকে। গোবিন্দ গিয়ে তাঁকে ধরতেই মহাপ্রভু তাঁকে বললেন, কৃষ্ণ আমায় ডাকছিলেন, তুমি কেন আমায় ধরলে? গোবিন্দ বললেন, ও কৃষ্ণের বাঁশি নয়, দেবদাসীদের গান। তখন মহাপ্রভু বললেন, তুমি আমায় বাঁচালে গোবিন্দ। কারণ মহাপ্রভু সেই ভাবাবস্থায় শ্রীকৃষ্ণ বলে দেবদাসীদের আলিঙ্গন করতেন, আর নারীস্পর্শে তাঁর দেহ চলে যেত।

       ঠাকুর তো বার্নিশ করা জুতো পরতেন, মোজা পরতেন, আবার বনাতের কোট পরতেন। মা ঠাকরুন, মা, ভাইপো, নিয়ে দক্ষিণেশ্বরে থাকতেন। ঠাকুর কি সন্ন্যাসী? শুধু তাই নয়, মা ঠাকরুনকে বলছেন, দেশে তিনখানা ঘর আছে, একখানা তোমার। যা জমি আছে তাতে বছরেরটা হয়ে যাবে। তবুও কি ঠাকুর সন্ন্যাসী? এ তো পুরো সংসারীর কথা—তাই কি? না, তা নয়। ঠাকুর সন্ন্যাসী। তিনি এর দ্বারা বোঝাচ্ছেন যে বিবিদিষার দ্বারা সন্ন্যাসের কোনও প্রয়োজন নেই। মহাপ্রভুর সঙ্গে ঠাকুরের এইখানে তফাৎ। মহাপ্রভু বলছেন, ‘শুন শুন নিত্যানন্দ ভাই, সংসারী জীবের কভু গতি নাই’। এই বলে মহাপ্রভু অভিসম্পাত করছেন বলা চলে। কিন্তু ঠাকুরের যুগে ঠাকুর সেই কথাকে একেবারে উল্টে দিলেন।

       ২রা অক্টোবর

       কথামৃত পাঠের সময় বললেন, ঠাকুরের কথা আছে, কালো পাঁঠা, তার গায়ে একটুও ঘা থাকলে চলবে না। আমি বলি, দেহের প্রত্যেকটা ফাইবারটা (তন্তু) পর্যন্ত শুদ্ধ হওয়া চাই। তবেই সেরকম সিদ্ধ হওয়া যায়। আমি দেখেছিলাম, আমি যেন অবতারদের ঘরে গিয়েছি। আমার গায়ে কোট। তাঁরা যেন দেখে বলছেন, এরকম কাপড় আজকাল হয়না।

       ১৪ই অক্টোবর

       এই মনুষ্যদেহ না হলে ভগবানকে লাভ করা যায়না। ভগবানকে লাভ করার উপযোগী একমাত্র এই দেহ।

       ১৮ই অক্টোবর, বিজয়া দশমী

       শ্রীজীবনকৃষ্ণ একসময় বললেন, দেখ, ঠাকুরের সময় সূর্যমণ্ডল থেকে লোক এসেছিল তার রেফারেন্স পাই। একদিন দক্ষিণেশ্বরে হৃদয়বাবু মায়ের পুজো করছেন, এমন সময় একজন সুপুরুষ লোক, বাঙালির মতো ধুতি পরা, গায়ে একটা চাদর, এসে জিজ্ঞাসা করছে, এখানে রামকৃষ্ণ পরমহংস কোথায় থাকেন? হৃদয়বাবু ওইরকম সুন্দর চেহারা দেখে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কোথা থেকে আসছেন? তার উত্তরে সেই লোকটি বললে, সূর্যলোক থেকে আসছি। হৃদয়বাবুর প্রথমে একথা ঠিক স্ট্রাইক করেনি। তিনি তো তাকে ঠাকুরের ঘর দেখিয়ে দিলেন। তারপর সেই লোকটি প্রাঙ্গণ পার হয়ে ঠাকুরের ঘরের কাছে গেছে, তখন হৃদয়বাবুর হঠাৎ স্ট্রাইক করাতে ছুটে বাইরে এসে দেখলেন, ঠাকুর যেন আগেই দরজা খুলে ওই লোকটির জন্য অপেক্ষা করছিলেন। লোকটি ঘরে ঢুকতেই ঠাকুরও ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলেন। প্রায় তিন ঘণ্টা সেইভাবে ঘরের মধ্যে তাঁদের কথাবার্তা হল। তারপর কেউ সেই লোকটিকে ঘর থেকে বার হতে দেখেনি। কোথায় গেল কেউ বলতেও পারেনি। পরবর্তীকালে ঠাকুরের ছোকরা ভক্তরা হৃদয়বাবুর কাছ থেকে এসব শুনে ঠাকুরকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন। কিন্তু ঠাকুর বলেছিলেন, সে সময় ওরকম অনেক অলৌকিক ব্যাপার ঘটত। সে সমস্ত কথা বলতে নেই।

       বললেন—ঠাকুরের দেহ হতেই ওই লোকটি বের হয়েছিল।

       ২৫শে অক্টোবর

       এ যুগে শুধু প্রার্থনা করা। ঠাকুর তোমায় যেন ভাবতে পারি। ডাকতে পারি। এই সুযোগ করে দাও। আর কিছু চাই না। আর এ যুগে সাধন হবেই বা কেমন করে! একদিন না খেতে পেলে সব সাধন উবে যায়। কলিতে ক্ষীণজীবী, অন্নগত প্রাণ, তাই ঈশ্বরকে ডাকা আর তাঁর নাম করা ছাড়া আর কোনও গতি নেই। বুদ্ধের আগে পর্যন্ত সব বিদ্বতে সাধন। অর্থাৎ আপনা হতে সাধন হয়েছে। বুদ্ধ হতেই বিবিদিষার শুরু।

       বুদ্ধ বলছেন, এ দেহ পাত হোক অথবা বোধি লাভ হোক। এই বিবিদিষা আমরা মহাপ্রভুর জীবনেও দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু আমাদের ঠাকুর আমাদের এই ক্ষীণজীবী প্রাণ দেখে নরম বন্দোবস্ত করে গেলেন। তিনি সংসারে থেকে ঈশ্বরকে লাভের কথা আমাদের কৃপা করে বলে গেলেন। শুধু তাই নয়, আশীর্বাদ করে গেলেন।

       (রামানুজের কথা প্রসঙ্গে একটি কাহিনী বললেন।)   

       শ্রীরঙ্গমের মন্দিরের পাশে তিন চারটে কবর আছে। তার মধ্যে একটা আলভারের। একটা পাঠান রাজকুমারীর, আর একটা পালোয়ানের স্ত্রীর। এই আলভার একদিন শ্রীরঙ্গমের মন্দিরের বাইরে (মন্দিরে ঢোকার অনুমতি নেই তাঁদের), কাবেরী নদীর ধারে শ্রীরঙ্গমের ধ্যানে মগ্ন। ওই সময় মন্দিরের পূজারী শ্রীরঙ্গমের পুজোর জন্য নদী থেকে জল নিতে গিয়ে দেখে যে আলভারের ছায়া নদীতে পড়েছে। অতএব নদীর জল তো ঠাকুর পুজোর জন্য নেওয়া চলে না যতক্ষণ ছায়া রয়েছে। তখন তাকে সেখান থেকে সরাবার জন্য ডাকাডাকি করতে লাগল। তাতে সাড়া না পেয়ে তাকে একটা পাথর ছুঁড়ে মারল। পাথরের আঘাতে আলভারের মাথা দিয়ে রক্ত ছুটতে লাগল। ধ্যান ভাঙতেই সে বুঝতে পারল কী ঘটেছে। কিছু না বলে সে সেখান থেকে চলে গেল। সেই রাতে সেই পূজারী স্বপ্ন দেখল, শ্রীরঙ্গম এসে তাকে ভর্ৎসনা করে বলছেন, তোরা কি? আমার একজন পরম ভক্তকে এরকম ভাবে আঘাত করলি? তোরা এখনই আমাকে যেরকম ভাবে ঢাক ঢোল বাজিয়ে রোজ নদীতে নিয়ে যাস আবার আসিস, সেরকম করে ওই আলভারকে অভ্যর্থনা করে এই মন্দিরে নিয়ে আয়। তা নাহলে বৈষ্ণব অপরাধে অপরাধী হয়ে যাবি। তখন সেই পুরোহিত পরদিন সেই আলভারকে খুঁজে সেই রকম জাঁকজমকের সঙ্গে মন্দিরে নিয়ে এল। সেই থেকে সেই আলভার মন্দিরে বাস করতে লাগল। দেহ যাবার পর তার কবর সেখানেই দেওয়া হয়।

        পাঠান রাজকুমারীর সম্বন্ধে বললেন, দিল্লির প্রাসাদে (পাঠান যুগে) এক রাজকুমারীর খেলনা পুতুলের সাথে এক গোবিন্দ মূর্তি ছিল। রাজকুমারীর এই মূর্তিটি খুব প্রিয় ছিল। সারাদিন রাত এইটে নিয়ে ব্যাস্ত থাকত। এই সময় রামানুজ একদিন স্বপ্ন দেখলেন, গোবিন্দ এসে বলছেন, তুই আমায় এই দিল্লির প্রাসাদ থেকে নিয়ে যা। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। আমি পাঠান রাজকুমারীর খেলার পুতুল হয়ে বাস করছি। রামানুজ স্বপ্নের কথা বুঝতেন। তখনই তিনি শ্রীরঙ্গম থেকে দিল্লি রওনা হয়ে গেলেন। দিল্লি এসে সম্রাটকে রাজি করিয়ে সেই গোবিন্দ মূর্তি নিয়ে যাবেন। কিন্তু রাজকুমারী সেই মূর্তি দিতে কিছুতেই রাজি হলেন না। তিনি তো খাওয়াদাওয়া বন্ধ করে খুব কান্নাকাটি করতে লাগলেন। তখন এইসব দেখে রাজকুমারীর ভাই রাজকুমারীর সাথে যুক্তি করে রামানুজের পিছু নিলেন কাউকে না জানিয়ে। তারপর একেবারে শ্রীরঙ্গমে এসে সেখানেই থেকে গেলেন। রামানুজের দেহ যাবার আগে রাজকুমারী মারা যান। এই ভক্তিমতী রাজকুমারীর কবর এইখানেই দেওয়া হয়। রামানুজ তাঁর দেহ যাবার আগে বুঝতে পেরেছিলেন রাজকুমারকে তাঁর শিষ্যরা যবন বলে ঘৃণা করতে পারে, তাই তিনি রাজকুমারকে পুরী গিয়ে থাকতে বলেন।

       শেষে পালোয়ানের প্রসঙ্গে বললেন, একদিন শ্রীরঙ্গমের মেলায় রামানুজ মন্দিরের ভেতর থেকে দেখলেন ওখানকার যে সবচেয়ে পালোয়ান, সে তার স্ত্রীর মাথায় ছাতা ধরে পেছন পেছন মেলা থেকে ফিরছে। তাদের দেখেই রামানুজ বুঝতে পারলেন যে এদের সময় হয়েছে আর এরা পরম ভক্ত। তিনি তো তাদের ডেকে কাছে বসালেন। তারপর সন্ধ্যে হয়ে রাত হয়ে গেল, তারা আর উঠতে চায় না সেখান থেকে। তখন রামানুজ অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দিলেন। কিন্তু তারপর থেকেই তারা রোজ সকালে ওই মন্দিরে আসতো আর সন্ধ্যে না হওয়া পর্যন্ত বাড়ি ফিরত না। এই রকম ভাবে দিন যেতে লাগল। রামানুজের শিষ্যরা তো রামানুজের তাদের ওপর স্নেহ দেখে মনে মনে খুব চটে গেল।

রামানুজ একদিন তাদের ডেকে বললেন, তোমরা এক কাজ করো। আজ রাতে এই পালোয়ানের বাড়িতে চুরি করো। তাহলে পালোয়ান খুব জব্দ হয়ে যাবে। শিষ্যরা তো কখনও চুরি করেনি। তার ওপর পালোয়ানের বাড়ি, আবার খুব ধনী লোক। তাই তাদের বাড়িতে ঢোকাও খুব সহজ নয়। এইসব কারণে তারা ইতস্তত করতে লাগল। কিন্তু রামানুজ তাদের বোঝালেন, তোমাদের কোনও ভয় নেই, দেখ না কী হয়। তাই শুনে তারা সেই রাতেই পালোয়ানের বাড়ি চুরি করতে গেল। কিন্তু চুরি করতে গিয়ে তারা তো আশ্চর্য হয়ে গেল। দেখে বাড়ির সব দরজা খোলা রয়েছে। পালোয়ান এক ঘরে ঘুমোচ্ছে। তার স্ত্রী আর এক ঘরে ঘুমোচ্ছে। তারা তখন ভাবছে কী করা যায়। দেখল যে পালোয়ানের স্ত্রীর গায়ে অনেক গহনা। অপটু হাতে তারা তো গয়না খুলতে লাগল। তারপর এক পাশের গয়না খোলার পর ভাবতে লাগল কী করে আর এক পাশের গয়না খোলা যায়। ভাবছে, এমন সময় পালোয়ানের স্ত্রী পাশ ফিরে শুলো। তখনই সুযোগ বুঝে তারা সে পাশের গয়নাগুলো খুলে নিলো।

তারপর দিন সকালে আবার যখন পালোয়ান আর তার স্ত্রী রামানুজের কাছে গেলেন। তিনি পালোয়ানের স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন, তার গায়ে গয়না নেই কেন? স্ত্রী তখন গতরাতের ঘটনা বলে বললেন, আমি ঘুমোইনি, ভান করে পড়েছিলাম। যখন দেখলাম তারা দুঃখী, তখন তাদের চুরি করার সুযোগ করে দিলাম। এখন আমার আর অলংকারের প্রয়োজন নেই। ওগুলো গিয়েছে ভালোই হয়েছে।

এদের কবরও ওখানেই আছে।

৬ই নভেম্বর

কদমতলার নতুন বাসাবাড়ি। রঞ্জিত কথামৃত পাঠ করছে। ব্রহ্মবিদ্যার কথা ওঠায় বললেন, এ কীরকম জানিস? কেউ যদি মুখে বলে বা কানে শোনে সঙ্গে সঙ্গে দেহে ফুটে উঠবে। স্থান কাল পাত্র কিছু মানে না। একদিন, লন্ডনে পিকাডিলি সার্কাসের মতো জায়গায় একটা বড় রেস্টুরেন্টে বসে আছি আমার রুমমেট এস বি সিনহার সঙ্গে, আর এইসব কথা হচ্ছে। কিন্তু তার মাঝেই আমার মুহুর্মুহু ভাব পুলক হচ্ছে। তাহলে বুঝে দেখ…।

একসময় ভাবতাম এসব তোদের সকলের হোক। কিন্তু দেখ ঠাকুর হরেনকে দিয়ে জানিয়ে দিলেন এসব হবার নয়। হরেন দেখেছিল, আমি যেন তাকে ধরে ঠাকুরের কাছে নিয়ে গেছি, আর ঠাকুরকে বলছি, হরেনের যদি হয় তো হোক না। ঠাকুর কিছুতেই রাজি হলেন না।

মহেন্দ্র সরকারের কথায় (কথামৃতের ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকার) বললেন, ভ্যানিটি। ভদ্রলোক মেথরকে ঘৃণা করেন না বললেন, কিন্তু যদি মেথর এক পাতে খেতে চায় তাহলেই সব গোলমাল।

মহাপ্রভু ওই রূপ নিয়ে শ্মশানের ন্যাকড়া পরে আছেন, এর মধ্যেও ভ্যানিটি। আপনি আচরি ধর্ম শিখায় অপরে। এসবের মধ্য হতেই অহংকার এসে যায়। কাউকে শিক্ষা দিতে গেলেই তাকে ছোট বলে গ্রহণ করা হয়ে যায়। আর নিজেকে বড় মনে করা হয়। এইখানেই ভুল। তত্ত্বজ্ঞান হলে ‘আমি’ বোধ থাকে না। তখন সব তিনি। সাধু অপরকে বলবে, ঈশ্বর তোমার মধ্যে, আর তিনি যদি কৃপা করেন তাহলেই মুক্তি। তাই ঠাকুর আমাদের সোজা ভাষায় বুঝিয়ে গেলেন—ঈশ্বর কৃপা করে দেহ হতে মুক্ত হলে তবেই মুক্তি।

আত্মা সাক্ষাৎকার হবার পর সাধক তত্ত্বজ্ঞানে না নামা পর্যন্ত ‘আমি’ আর ‘তুমি’ বোধ থাকে। তারপর যখন তত্ত্বজ্ঞানে আসে তখন আর আমি থাকে না, সবই ‘তুমি’। নিজে কেবল দ্রষ্টা।

এই যে গুরুগিরি বা ধর্মগ্লানি, এই ভারতে আড়াই হাজার বছর আগে বুদ্ধ প্রতিষ্ঠা করলেন। আর এই ধর্মগ্লানি ঠাকুরের আগে পর্যন্ত চলে আসছে। ঠাকুর এলেন এই ধর্মগ্লানি বিনাশের জন্য। আর এই সচ্চিদানন্দগুরুর কথা বলে গেলেন। মনুষ্য দেহেই তিনি গুরুরূপে সাক্ষাৎকার হন। তারপর আধার বিশেষে যার যা সাধনের প্রয়োজন তিনি দেহমধ্যে অবস্থান নিজেকে দিয়ে করে নেন। গুরুদেহে সাধন।

তুলসীদাসের কথায় বললেন, তিনি বাড়ির দরজা কখনও বন্ধ করতেন না। এমন কি বাইরে যখন যেতেন তখনও খোলা থাকত। এক ভক্ত তুলসীদাসকে কিছু বাসন দিয়েছিল। তিনি সেগুলো ব্যবহার করতেন। এক চোর জানত যে তুলসীদাস দরজা খুলে বাইরে যায়। চোর একদিন সুযোগ বুঝে ঘরে ঢুকে পড়ল, কিন্তু যেমন ঢোকা, দেখল যে দরজার দু পাশে দুজন তীরধনুক নিয়ে তাকে মারবে বলে বসে আছে। সে তাই দেখে ছুটে পালাল। পথে তুলসীদাসের সঙ্গে দেখা। তখন চোর তাকে বলল—এদিকে দেখি দরজা খুলে রাখা হয়, কিন্তু ওদিকে সাধু ঠিক আছে, ভেতরে আবার দু’জন পাহারা বসিয়ে এসেছে। তুলসীদাস একথা শুনে চোরকে দু’জনের চেহারা কী রকম জিজ্ঞাসা করল। সে বলল, একজনকে দেখলাম শ্যামবর্ণ আর একজনকে দেখলাম গৌরবর্ণ, দু’জনের হাতে তীরধনুক। তুলসীদাস তখন বলল, আমি রামলক্ষণকে দেখতে পেলাম না, আর তুমি দেখতে পেলে? চলো আমার বাড়ির সব দিয়ে দিচ্ছি। … একেই বলে প্রারব্ধ। বা, ঈশ্বর নিজে চোর হয়ে এসে তুলসীদাসকে বুঝিয়ে দিয়ে গেল।

অমূল্যবাবু আশীর্বাদ চাওয়ায় বললেন, এই যে এতক্ষণ ঠাকুরের কথা বলছিস, এর চেয়ে আর কি বেশী আনন্দ আছে বল? এই যে বাড়িতে না থেকে কিংবা অন্য কোথাও না গিয়ে এখানে এতক্ষণ রয়েছিস এর চেয়ে বড় জিনিস কী আছে? শুধু প্রার্থনা কর—ঠাকুর তোমাকে যেন সর্বদা ডাকতে পারি, এর বেশি আর কিছুরই প্রয়োজন নেই।

১৫ই নভেম্বর  

নানকের কথায় বললেন, নানক কখনও কারোর সাহায্য নিতেন না। পরিব্রাজক অবস্থায় নিজের অন্নের সংস্থান নিজেই করতেন। বড় ভালো সাধু ছিলেন। অপরকে কষ্ট দিতে চাইতেন না। তবে শেষ সময়ে আশ্রমে তাঁর একজন শিষ্যের সেবা নিতেন।

২২শে নভেম্বর

শ্রীজীবনকৃষ্ণ—ভক্তি-সকাম, নিষ্কাম, অহৈতুকী। সকাম ধ্রুবের, নিষ্কাম প্রহ্লাদের, অহৈতুকী হল গোপীদের—প্রেমাভক্তি। এর পরও আর একপ্রকার আছে, সে খুব কম—ত্রিগুণাতীত। গোপীরা যেখানে চোখের জলে ভাসছে রাধার সেখানে চোখে এক বিন্দু জল নেই।

তুলসীদাস প্রসঙ্গে, তাঁর সন্ন্যাসের বারো বছর পর দেশে ফেরার কথা বললেন। তুলসীদাস তাঁর সেই পূর্বসংস্কার মতো ভুল করে শ্বশুরবাড়িতেই বিশ্রামের জন্য অতিথি হলেন। …তিনি নিজের ঝোলাতে যা আছে তাই দিয়েই একটু রান্না করে খেয়ে বিশ্রাম নিয়ে চলে যাবেন জানালেন। আর কেউ চিনতে না পারলেও তাঁর স্ত্রী তাঁকে চিনতে পেরেছিলেন। তিনি এসে বললেন, ঝোলায় সব আছে ঠিক শুধু বানানোর লোকের অভাব। তাঁকে যদি ঝোলায় নেওয়া হয় তাহলে সে অভাব পুরন হয়। তুলসীদাস বুঝতে পেরে তখনই সেখান থেকে দৌড় দিলেন।

*নভেম্বর ১৯৫৩

(কত কথা পড়ে মনে)

তখন কেবল রবিবার বিকেলে কদমতলার ঘরে যেতাম। একদিন শনিবার সন্ধ্যায় বিনয়ের (রায়) বাড়ির কাছে দিলীপ, বিনয়, রঞ্জিত, ও সৌরেনের সঙ্গে দেখা। ওরা ঘিরে ধরল—কী দাদা? আপনি ঠাকুরের ঘরে যান না কেন? বললাম—রবিবার যাই তো! ওরা বলল—একদিন গেলে কী হবে, রোজ যেতে হয়। …রোজ যাওয়া শুরু হল।

সেসময় অনেক নতুন ও আশ্চর্য ঘটনা ঘটত। অনেকে ওঁকে নানা স্থানে সশরীরে দর্শন করতেন। উনি শুনে বলতেন, সেই সময় আমি বাবা এই কদমতলার ঘরে, তাছাড়া এই দিন আমি বাড়ির বাইরে বের হইনি। উপেনবাবু যেমন দেখেছিলেন চলন্ত বাসে। তিনি পলার আংটি দেখে বলেছিলেন এসব প’রে কী হয়? তারপর বাসের ভাড়াও দিয়েছিলেন।

একথায় শ্রীজীবনকৃষ্ণ বলেছিলেন—তোর দেহ থেকে ওই মূর্তি বেরিয়েছিল।

উপেনবাবু—কিন্তু বাসের ভাড়া দিয়েছিলেন?

শ্রীজীবনকৃষ্ণ—ভগবানে সবই সম্ভব।

পাড়ার মণিবাবু অনেক পূর্বে তাঁকে দেখেছিলেন চেতলার হাটে। …শ্রীজীবনকৃষ্ণ হেসে বলেছিলেন, মণিদা, চেতলার হাটে তো গরু বিক্রি হয়। এই প্রসঙ্গে উনি বলেছিলেন—লোকে তো জানে না, ওই সূর্যমণ্ডলের লোক, ভৈরবী, ন্যাংটা, তোতাপুরী, এরা সকলে ঠাকুরের দেহ থেকে বেরিয়েছিল। পুঁথিকার (শ্রীঅক্ষয় সেন) ঠিক ধরেছিল।

****

Thursday, November 3, 2022

কাশীতে শ্রীজীবনকৃষ্ণ

 

কাশীতে শ্রীজীবনকৃষ্ণ

 

       ১লা অক্টোবর ১৯৫৬ সালে শ্রীজীবনকৃষ্ণ কাশী যান। দুর্গাপুজার সময় তাঁর কাশীযাত্রা হয়। সেখানে স্থায়ী বসবাসের ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন তিনি। এমনটা আমরা লক্ষ করেছি যে তাঁর আত্মিক জীবনের বড় কোনো পরিবর্তনের সময় তিনি নির্জনে চলে যেতেন। ঘর অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ হয়ে যেত। এবং প্রত্যেক বারেই তিনি বলতেন এবার তিনি একলা থাকবেন।

       ১৯৫৬ সালের অক্টোবর মাসে কাশী যাবার কথা ও দিনলিপির অংশ থেকে সেসময়ের বর্ণনা তুলে আনা হল।

 


       পয়লা অক্টোবর সোমবার ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দ

 

বেশ কিছু লোক সন্ধ্যার পর সমবেত হয়েছেন হাওড়া স্টেশনের নির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্মটিতে। আজ শ্রীজীবনকৃষ্ণ অনির্দিষ্টকালের জন্য সকলকে ছেড়ে চলেছেন। আপাতত তিনি কিছুদিন থাকবেন কাশীধামে। পরে অন্য কোথাও চলে যাবেন। আজ সকলের বিষন্নবদন। কারো বা চোখ দুটি অশ্রুসজল। কোনো কোনো বাড়ির মেয়েরা এসেছেন সকলের অলক্ষ্যে থেকে শ্রীজীবনকৃষ্ণকে একটু দর্শনের আশায়। তৃতীয় শ্রেণীর নির্দিষ্ট কামরায় বসে আছেন তিনি। তাঁর পরনে ধুতি পাঞ্জাবি পায়ে জুতা। সকলের সঙ্গে কথা বলতে বলতে মুখমন্ডল রক্তিমাভ হয়ে উঠেছে। আজ সারাদিন অগণিত মানুষ এসেছে তাঁর কাছে। তবু ক্লান্তি নেই অবসাদ নেই। স্টেশনে এসেও সকলকে হাসিমুখে কাছে ডাকছেন সকলের সঙ্গে কথা বলছেন। কথাপ্রসঙ্গে বারবার ফিরে আসছেন তাঁর জীবন সংগীতের মূল সুরে। “বাবা ভগবান বাইরে কোথাও নেই, ভগবান তোর ভেতরে।” ক্রমশ ট্রেন ছাড়ার সময় হয়ে এলো কিন্তু প্রাণের দেবতাকে বিদায় দিতে মন চায় না। বিচ্ছেদের চরম সময় অনেকে অশ্রু সংবরণ করতে পারলেন না। শ্রীজীবনকৃষ্ণ মুহুর্মুহু সমাধি মগ্ন হতে লাগলেন। জয় রামকৃষ্ণ জয় ঠাকুর জয় জীবনকৃষ্ণ ধ্বনিতে মুখরিত হলো রেলওয়ে প্লাটফর্ম। ট্রেন ধীরে ধীরে গতি বাড়িয়ে এগিয়ে চলল গন্তব্য পথে।

শ্রীজীবনকৃষ্ণের অনুমতি পেয়ে তাঁর সঙ্গে চলেছেন আরও সাতজন। কেষ্ট মহারাজ, মৃত্যুঞ্জয় রায়, রঘুনাথ সেন, সৌরেন ভট্টাচার্য, কালিপদ বন্দ্যোপাধ্যায়, জিতেন চট্টোপাধ্যায় ও সৌমেনবাবু। নবাগত সৌমেনবাবুর এক নিকটাত্মীয়ের বাড়িতে শ্রীজীবনকৃষ্ণের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। এবার যারা সঙ্গে চলেছেন তাদের মধ্যে কয়েকজন বিবাহিত লোক আছে। এটি এক উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম।

ট্রেনটি স্টেশন এলাকা ছেড়ে যাবার পর সকলে জিনিসপত্র একটু গুছিয়ে নিয়ে শ্রীজীবনকৃষ্ণের সামনের সারিতে আশেপাশে নিবিড় হয়ে বসলেন। সকলকে উদ্দেশ্য করে তিনি বললেন—দেখলি বাবা! এই হচ্ছে মায়ার রাজ্য। আরেক মায়ার বন্ধনের মধ্যে ঠাকুর ফেলেছিলেন। এদেরকে যে ছেড়ে পালিয়ে আসতে হয়নি, বলে জানিয়ে আসতে পেরেছি, এই ঠাকুরের অশেষ কৃপা। তারপর প্রবাহিত হলো ভগবৎকথার মন্দাকিনী ধারা।

শ্রীজীবনকৃষ্ণ বললেন—দেখ আজ পাঁচশ বছর ধরে ভগবান বাঙালি জাতকে কৃপা করে আসছেন। পাঁচশ বছর আগে এই বাঙালির ঘরে জন্মেছিলেন মহাপ্রভু। আবার পাঁচশ বছর পরে এই বাংলাদেশেই লীলা করলেন ঠাকুর। বাঙালির ওপরে ভগবানের কী কৃপা বল তো!

ট্রেনের গতির মতোই আলোচনার ধারাও বিভিন্নমুখী হতে লাগলো। আজ এক স্বর্গীয় আনন্দের বাহন হয়েছে ট্রেনের কামরাটি। বর্ধমানের কাছে আসতে গাড়ির গতি মন্দীভূত হলো শ্রীজীবনকৃষ্ণ পকেট থেকে তিনটি টাকা বার করে মহারাজদাকে সীতাভোগ মিহিদানা আনতে বললেন। মাত্র দেড় টাকাতে দু চ্যাংড়া মিষ্টি পাওয়া গেল। শ্রীজীবনকৃষ্ণ সকলকে একরকম জোর করেই সীতাভোগ মিহিদানা খাওয়ালেন। বর্ধমান স্টেশন ছাড়লে তিনি বিছানার এক প্রান্তে ঠেসান দিয়ে বসে রইলেন। নিজের জায়গাটি ছেড়ে দিলেন অপর সকলের শোবার জন্য। রিজার্ভ সিটের কামরা। অনুরোধ-উপরোধ করেও কোন ফল হলো না। শ্রীজীবনকৃষ্ণ অতন্দ্র প্রহরীর মতো সারা রাত জেগে বসে রইলেন। তাঁর কাছে শোনা শ্রীরামকৃষ্ণের কথা মনে পড়ে গেল। একদিন রাত্রে সেবক লাটু (পরে স্বামী অদ্ভুতানন্দ) ঠাকুরের পদসেবা করছেন। শ্রীরামকৃষ্ণ স্নেহ মাখা স্বরে প্রশ্ন করলেন—হ্যাঁরে লেটো? ভগবান কখন ঘুমোন বল তো? লাটু বললেন, হামনে ক্যামনে জানবে। শ্রীরামকৃষ্ণ বললেন—ওরে লেটো ভগবান কখনো ঘুমোন না রে। তাইতো আমরা সকলে ঘুমিয়ে বাঁচি।

ভোর প্রায় ছটার সময় একটি স্টেশনের কাছে এসে সিগন্যাল না পাওয়ায় গাড়ি থেমে গেল। একাদিক্রমে প্রায় ৪০ মিনিট গাড়ি এখানে দাঁড়িয়ে রইলো। শোনা গেল আমাদের আগের ট্রেনের ইঞ্জিন বিকল হয়ে যাবার জন্যই এই অবস্থা। পরে গাড়ি ছাড়লো বটে কিন্তু যত বেলা বাড়ে তত আরো দেরি হয়। নির্দিষ্ট সময়ের প্রায় চার ঘণ্টা পরে বেলা ১ টা ৩৫ মিনিটে কাশীধামে এসে পৌঁছনো গেল। মৃত্যুঞ্জয়বাবুর তত্ত্বাবধানে সমস্ত জিনিসপত্র নামিয়ে দুখানি গাড়ি ভাড়া করা হলো। পথ দেখিয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় নিয়ে যাবার জন্য একটি গাড়িতে রইলেন সৌমেনবাবু, আর একটি গাড়িতে রঘুনাথ। রঘুনাথ কয়েকবার কাশীতে এসেছেন এবং এখানে অনেক দিন কাটিয়ে গেছেন। তাই শ্রীজীবনকৃষ্ণ তাকে বলেছিলেন কাশী-এক্সপার্ট। রঘুনাথ ভাই নিজেই আরেকটি উপাধি গ্রহণ করেছিলেন। এই দলে ছিলেন মোট আটজন। রঘুনাথ ভাই নিজের সম্বন্ধে বলতেন আট পাগলের এক পাগল। ক্রমে দুটি গাড়ি এসে পড়ল ২০৯ নম্বর রামাপুরায় শ্রীনাথ ভবনে। উঁচু ভিতের ওপর বাড়িটি উত্তর-দক্ষিণে লম্বা। উঁচু রক। মাঝখান দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করার সিঁড়ি। সিঁড়ির কোলে বড় দালান। দালানের ডানদিকে দোতলায় ওঠার সিঁড়ি। দোতলায় দু’খানি ঘরেই আপাতত সকলের থাকার ব্যবস্থা। পাশাপাশি দু’খানি প্রশস্ত ঘর। ঘর দুটির পূর্বদিকে লোহার রেলিং দেওয়া সুন্দর বারান্দা। ভিতরের দালান দিয়ে ও বাইরের বারান্দা দিয়ে ঘর দু’খানির মধ্যে যাতায়াত করা যায়। দালানের উত্তর পশ্চিম প্রান্তে স্নানঘর, ও পরে রান্নাঘর। বাড়িটির পূর্ব দিকে রাস্তার পারে একটি ছোট মন্দির ও মন্দির সংলগ্ন একটি ধর্মশালা। কিন্তু এই বাড়িতে এসে শ্রীজীবনকৃষ্ণ খুব আনন্দিত হতে পারলেন না। বাড়ির একতলায় যারা থাকে তারা সংসারী মানুষ। মেয়েরা ওই দালান ব্যবহার করে। তাদের মধ্য দিয়ে যাতায়াত করা শ্রীজীবনকৃষ্ণের আদৌ মনঃপুত নয়।

নিবেদিতপ্রাণ মৃত্যুঞ্জয়বাবু শ্রীজীবনকৃষ্ণের অসুবিধার কথা উপলব্ধি করে বাড়ির লোকদের সঙ্গে কথা বললেন। ঠিক হলো যে শ্রীজীবনকৃষ্ণের যাতায়াতের সময় মেয়েরা দালান থেকে সরে যাবেন। আপাতত একটি কঠিন বাধা অতিক্রম করা গেল। উত্তর প্রান্তের ঘরটি তাঁর জন্য নির্দিষ্ট হলো। এবার ধোয়া মোছা ও পরিষ্কার করার পালা। সকলের আপ্রাণ চেষ্টায় বাড়ির এই অংশটি এক নতুন শ্রী ধারণ করল। ক্রমে স্নানাদি-পর্ব শেষ হলে দোকান থেকে খাবার কিনে আনা হল। সামান্য জলযোগেই সারাদিনের মতো শ্রীজীবনকৃষ্ণের আহার শেষ হলো। তিনি একটু স্থির হয়ে বসেছেন বিছানা পাতা চৌকির ওপর। ঘরে দু’তিন জন লোক আছেন। এমন সময় কোথা থেকে তিনটি ছোট বড় হনুমান তাঁর ঘরের উত্তরের জানালায় এসে হাজির হলো। হনুমান দর্শন মাত্র চোখের নিমেষে শ্রীজীবনকৃষ্ণের সমস্ত দেহ তোলপাড় করে মহাবায়ু জাগ্রত হয়ে উঠলো। তাঁর বরবপু এক বিচিত্র রূপ ধারণ করল। তাঁর এই রকম অবস্থা আর কখনো দেখার সৌভাগ্য হয়নি। কিন্তু কী আশ্চর্য! হনুমানগুলোকে তাড়িয়ে দেওয়া হলে তিনি আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এলেন।

একদিন হাওড়ায় কেদার দেউটি লেনের ঘরখানিতে তিনি বলেছিলেন, দেখ গঙ্গায় কেউ স্নান করে নিজে পবিত্র হবার জন্য, আবার কেউ স্নান করে গঙ্গার জলকে পবিত্র করার জন্য। বারানসী তীর্থভূমির মহিমা অম্লান উজ্জ্বল রাখার জন্যই যেন শ্রীজীবনকৃষ্ণ এখানে আগমন করেছেন। উল্লেখযোগ্য যে এর আগেও শ্রীজীবনকৃষ্ণ একবার কাশীধামে এসেছিলেন। মানিক্য পত্রিকার ষষ্ঠ বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা হতে তাঁর নিজের কথার উল্লেখ করা যেতে পারে এই প্রসঙ্গে—১৯২৬ সালে যখন কাশী যাই তখন একদিন মাত্র বিশ্বনাথ দর্শনে গিয়ে ছিলাম। কচুরি গলির ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছিল। খুব ভিড় ছিল। তাই আর কখনো মন্দিরের দিকে পা বাড়াই নি। তবু দেখতুম যখনই বেরোতুম, আপনা হতেই জপ হতো। অহল্যা বাই ঘাটে ধ্যান করতে বসতুম। মন আপনা থেকে হু—হু করে উঠে যেত। খুব ধ্যান হতো। তখনই বুঝেছিলাম যে স্থান মাহাত্ম্য আছে।

শ্রীজীবনকৃষ্ণের ইচ্ছানুসারে অনেকে বিকালের দিকে একটু বেড়াতে বেরোলেন। ক্রমে দিবা অবসান হলো। মন্দিরে মন্দিরে সন্ধ্যারতির মাঙ্গলিক ধ্বনিতে বারানসী মুখরিত হলো। শ্রীজীবনকৃষ্ণের নির্দেশে যথারীতি পাঠ শুরু হবার সঙ্গে সঙ্গে জীবন নাট্যের আরেকটি অংকের যবনিকা উত্তোলন হলো। এবার নিরবচ্ছিন্নভাবে শ্রীজীবনকৃষ্ণের সঙ্গসুখ উপভোগ এবং তাঁর শ্রীমুখ নিঃসৃত বাণী সুধা পান।

রাত্রি সোয়া আটটার পর পাঠ শেষ হলো, এক নতুন পরিবেশে শ্রীজীবনকৃষ্ণের সান্নিধ্যে ভজনানন্দের পর ভোজনের জন্য আবার বাইরে বেরোতে হবে। কাশী ভ্রমণের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল যে এবার রান্নার কোনো আয়োজন ছিল না। মা অন্নপূর্ণার ভাণ্ডার কাশী। এখানে অন্নের অভাব নেই। প্রচুর হোটেল, খাবারের দোকান, ভাত, রুটি, পুরি, লুচি, মাছ, মাংস, দই-মিষ্টি—যার যেমন অভিরুচি, যার যেমন সামর্থ্য, যার যেমন ইচ্ছে। শ্রীজীবনকৃষ্ণের জন্য আলাদা কোনো ব্যবস্থা করতে তিনি দেননি। এমনকি দুবেলা চায়ের জন্য তাঁর নির্দেশে জামার পকেট থেকে পয়সা নিয়ে রাস্তার দোকান থেকেই চা কিনে আনা হয়েছে, মহানন্দে তাই তিনি গ্রহণ করেছেন। শ্রীজীবনকৃষ্ণ প্রায়ই বলতেন—ওরে, আমি তোদের মতোই একজন সাধারন মানুষ, সামান্য, নগণ্য আমি। শুধু মুখের কথায় নয়, ব্যবহারিক জীবনের সর্বক্ষেত্রে সে প্রমাণ তিনি রেখে গিয়েছেন।

এক নতুন আনন্দে অনাস্বাদিত মাধুর্যে প্রথম দিনটি অতিবাহিত হল। পরদিন বুধবার তেসরা অক্টোবর ১৯৫৬। ভোররাত্রে শ্রীজীবনকৃষ্ণের কণ্ঠস্বর শুনে ঘুম ভেঙে গেল, বারানসী তখনও নিদ্রামগনা, আকাশ অন্ধকার। দূর হতে পাখির কলগীতিতে ভেসে আসছে ঊষার আগমনী সংগীত, পূবদিকের বারান্দা দিয়ে তাঁর ঘরের বাইরে গিয়ে দাঁড়ালাম। তাঁর ঘরের পশ্চিম দেওয়ালে শ্রীরামকৃষ্ণ ও সারদামণি দেবীর দুইটি ক্যালেন্ডারের ছবি টাঙ্গানো হয়েছিল। সেই ছবি দুটির কাছে গিয়ে শ্রীজীবনকৃষ্ণ হাত তুলে নাচছেন আর বলছেন— জয় ঠাকুর, জয় মা, জয় ঠাকুর, জয় মা! নাচের ভঙ্গি বিচিত্র। দু’পায়ের গোড়ালি তুলে আঙুলের উপর ভর দিয়ে দুই হাত তুলে নৃত্য। নৃত্যের পর প্রণাম। ছবির পা দু’খানিতে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম। কী প্রাণঢালা আত্মনিবেদন। প্রণামের সঙ্গে যেন তাঁর সমস্ত সত্তাকে নিবেদন করছেন ঠাকুরের শ্রীচরণে, এমনিভাবে কয়েকবার। শ্রীরামকৃষ্ণ বন্দনা শেষ হলে ঘরের মধ্যে প্রবেশ করলাম। খাটে বসিয়ে ধ্যান করতে বললেন। তিনিও ধ্যান শুরু করলেন। ধ্যানে কিছু দর্শন হলো না। কিন্তু অনুভব করলাম ধীরে ধীরে জৈবী অস্তিত্ব লোপ পাচ্ছে। হাত নেই, পা নেই, কোন অঙ্গ প্রত্যঙ্গ নেই, কিছু নেই। শুধু আছে একটু বোধমাত্র। এই বোধটুকু যেন অসীম আনন্দলোকে ভেসে বেড়াচ্ছে। সেদিন বিশেষভাবে উপলব্ধি করেছিলাম যে শ্রীজীবনকৃষ্ণ-সান্নিধ্যই হচ্ছে স্বর্গ এবং তাঁর পূত সঙ্গে যে আনন্দ অনুভূতি তাই স্বর্গসুখ।

ধ্যান ভাঙলে সকলকে ঘরে ডাকা হল। শ্রীজীবনকৃষ্ণ নিজে কথামৃত পাঠ শুরু করে অপরকে পড়তে দিলেন। প্রায় সোয়া ছটা পর্যন্ত পাঠ চলল। তারপর প্রাতঃকৃত্য আদি সারা হলে ভ্রমণের পালা। সকলে একসঙ্গে বেড়াতে গেলে কাজের অসুবিধা হবে, তাই পালা করে দুজন বাড়িতে থাকতেন। তারা ঘর ঝাঁট দিয়ে ধুয়ে মুছে পরিপাটি করে ঘর গুছিয়ে রাখতেন। আজ মহালয়া। শ্রীজীবনকৃষ্ণ ও অপর সকলে গঙ্গাস্নান সেরে বিশ্বনাথ দর্শন গেলেন। ফিরে এসে শ্রীরামকৃষ্ণ পুঁথি পাঠ চলল বেলা প্রায় দশটা পর্যন্ত, তারপর মধ্যাহ্ন আহারের বিরতি।  কেষ্ট মহারাজ ও আরো কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে শ্রীজীবনকৃষ্ণ চললেন ‘বেনারস লজ’ নামে এক হোটেলে। পথে এক ভাঁড় করে দই কেনা হলো, হোটেলের খাবার খুব ভালো নয়, কোনরকমে খাওয়া চলে এইমাত্র। শ্রীজীবনকৃষ্ণ সেই অন্নই গ্রহণ করলেন। সাধারণ মানুষের মতোই খাওয়া তাঁর। কেবল এক টুকরো করে মাছ অতিরিক্ত নেওয়া হয়েছিল। খাওয়া শেষ হলে সকলে নিজের নিজের পয়সা মিটিয়ে দিয়ে বাড়িতে ফিরে এলেন। এরপর বেলা প্রায় আড়াইটা পর্যন্ত বিশ্রাম। কিন্তু শ্রীজীবনকৃষ্ণ একটানা এতক্ষণ বিশ্রাম করতেন না। একটু বিশ্রাম করে অবশিষ্ট সময় তিনি ধ্যান করে কাটাতেন। বিকেলে পাঠ শেষ হলে তিনি আর বেড়াতে বের হতেন না। কিন্তু অপর সকলকেই বেড়াতে যেতে বললেন।

সন্ধ্যায় বেড়িয়ে ফিরলে তাঁর কাছে বিবরণ দিতে হতো-- কোথা দিয়ে কিভাবে বেড়িয়ে আসা হলো। শুনে হয়তো বলতেন—ওঃ, ওখানে গিয়েছিলি, বাঃ বেশ হয়েছে! তাঁর এই আনন্দ-উচ্ছ্বাসে বিকালের বেড়ানোটাও আনন্দময় হয়ে উঠত। সকলের দিকে সমান নজর। নৈশ আহার শেষ করে এসে প্রত্যেককে তাঁর কাছে খাওয়ার পূর্ণ বিবরণ দিতে হতো। কোথায় খাওয়া হলো, কেমন দোকান, কি খেলি, রুটি? বেশ বেশ। ক’খানা রুটি খেলি? ওমা! মোটে চারখানা—ওতে কি হবে রে? কালকে খাওয়া আর একটু বাড়াবি। মাংস খেয়েছিস? খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সমস্ত বিবরণ দিতে হতো। তবে সেদিনের মতো সবার ছুটি। সন্তানের কাছ থেকে সব খবর নেওয়ার জন্য বাবা-মা কি প্রতিদিন এই ভাবে প্রতীক্ষা করেন? কাশীতে শ্রীজীবনকৃষ্ণ এক অভিনব সংসার পেতেছিলেন—কিছুই নেই অথচ সবই আছে!

৪ঠা অক্টোবর, বৃহস্পতিবার, শেষ রাত্রে দর্শন হল, বিশ্বনাথ শিবলিঙ্গের ভিতর থেকে উদয় হলেন শ্রীজীবনকৃষ্ণ, পরনে ধুতি পাঞ্জাবি। স্বপ্নটি নিবেদন কড়া হলে শ্রীজীবনকৃষ্ণ বললেন—কাশী আসার ফল পেলি। আজ সকালে অসি নদীর সঙ্গমস্থল পর্যন্ত বেড়াতে যাওয়া হলো। শ্রীজীবনকৃষ্ণের সঙ্গে চলেছেন কেষ্ট মহারাজ, সৌরেন, সৌমেনবাবু ও আরো কয়েকজন। ইতিমধ্যে প্রভাতের স্নিগ্ধ বাতাস প্রখর হয়ে উঠেছে। চোখে মুখে রোদ লেগে শ্রীজীবনকৃষ্ণের কষ্ট হচ্ছে দেখে একজন তাঁর মাথায় ছাতা ধরলেন। অমনি তিনি প্রতিবাদ করে উঠলেন। তাঁর নির্দেশে ছাতা বন্ধ করতে হল। শ্রীজীবনকৃষ্ণ বললেন, মথুরবাবু যখন কাশীতে এসেছিলেন তখন পাইক বরকন্দাজ তাঁর মাথায় ছাতা ধরত। তিনি এখানে রাজার মতো থাকতেন। তা বাবা, তোরা যে আমাকে রাজা মহারাজা করে তুলতে চাস। একথা বলেই মৃদু হাস্যে পরিবেশটিকে হালকা করে দিলেন।

৫ই অক্টোবর সকালে বেড়াতে বেরিয়ে কয়েকজনের ইচ্ছা হলো আজ শ্রীরামকৃষ্ণের সেবাশ্রমে যাওয়া যাক। শ্রীজীবনকৃষ্ণ প্রথমে একটু ইতস্তত করলেন, বললেন— ওদের (মঠের স্বামীজীদের) সঙ্গে দেখা হলে ওদের যে সব টেনে নেব রে। কিন্তু সকলের আগ্রহ দেখে তিনি রাজি হলেন। সকলকে একটি করে টাকা প্রনামী দিতে বললেন। নিজের পকেট থেকে একটি টাকা বার করে দিলেন। মঠের প্রাঙ্গণে প্রবেশ করার আগে প্রধান ফটকের দুটি থামেই মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করলেন। মঠের উত্তর-পূর্ব দিকের পথ ধরে মন্দিরে আসা হল, মন্দিরে ওঠার সিঁড়ির কাছে আসামাত্র শ্রীজীবনকৃষ্ণের শ্রীঅঙ্গে ভাবাবস্থা প্রকাশ পেল। কম্পমান বরতনু কোনরকমে সিঁড়ি কয়টি অতিক্রম করে আসার পরই, ভূলুণ্ঠিত প্রণতি। উপরে শ্রীরামকৃষ্ণের নয়নাভিরাম মূর্তি, নীচে প্রণাম শয়ানে শ্রীজীবনকৃষ্ণ। পিছনের পা দুটি তোলা অবস্থায় হাত দুটিও করজোড়ে নমস্কার নিবেদন করার সঙ্গে সঙ্গে সমাধি। প্রণাম নিবেদনের এই অপরূপ দৃশ্যটি কখনো ভোলার নয়। ফেরার সময় দেখা গেল দালানে দুর্গা প্রতিমা রং করা হচ্ছে। স্বামীজীরা দূরে আছেন, বড় বড় হাঁড়ি কড়ার বিলি বন্দোবস্ত করছেন, কেউ কিছু বুঝতে পারলেন না, জানতেও পারলেন না। শ্রীজীবনকৃষ্ণের ইচ্ছাই পূর্ণ হল।

শ্রীজীবনকৃষ্ণের খাওয়ার অসুবিধা হচ্ছে দেখে গতকাল বিকেল থেকে মৃত্যুঞ্জয়বাবু রঘুনাথ ভাই ভালো হোটেলের সন্ধানে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। আজ সকালে বেরিয়ে আসার পর যখন শ্রীরামকৃষ্ণ পুঁথি পাঠ চলছে, তখন রঘুনাথ ফিরে এসে এক আনন্দ সংবাদ জানালো। বীরেশ্বর পাঁড়ের ধর্মশালা সংলগ্ন হোটেলে আজ থেকে খাবার ব্যবস্থা হয়েছে। স্পেশাল খাবার। লোক পিছু দু’টাকা। বীরেশ্বর পাঁড়ে ছিলেন নিষ্ঠাবান হিন্দু, সুসাহিত্যিক এবং শিক্ষাব্রতী (১৮৪২—১৯১১)। তাঁর নামাঙ্কিত এই ভোজনশালাটি পরিচালনা করেন তাঁর এক প্রপৌত্র। এখানে খাবার সুব্যবস্থা হবে এই আশায় সকলে আনন্দিত হলেন। পাঠ শেষ হলে স্নানাদি সেরে যথাসময়ে খেতে যাবার জন্য শ্রীজীবনকৃষ্ণ প্রস্তুত হলেন। কিন্তু যখন শুনলেন যে আজ প্রথম দিন বলে বিশেষ খাবারের ব্যবস্থা করতে আরো আধঘণ্টা দেরি হবে, তখন তিনি অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হলেন এবং কারো কথায় কর্ণপাত না করে আজও বেনারস লজে মধ্যাহ্নভোজন সমাধা করে এলেন। অপ্রত্যাশিত এই পরিস্থিতিতে সকলের মন ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল। আগে থেকে ব্যবস্থা করা আছে বলে অনিচ্ছাসত্ত্বেও কয়েকজনকে যেতে হল ধর্মশালা সংলগ্ন ওই হোটেলে। এখানেও আরেক বিস্ময়। হোটেল পরিচালকটি বয়সে তরুণ, সুদর্শন, বিনয়-নম্র তার ব্যবহার। দেখা গেল ভালোভাবে খাওয়াবার ব্যাপারে তার আন্তরিকতার অভাব নেই। রান্নাগুলিও বেশ সুস্বাদু। হৃষ্টচিত্তে ভোজনপর্ব সমাধা করে শ্রীজীবনকৃষ্ণের কাছে সমস্ত বিবরণ নিবেদন করা হলে সব শুনে তিনি পরদিন থেকে ওখানে যেতে রাজি হলেন। রঘুনাথ ভাইয়ের বুক থেকে যেন একটা ভারী পাথর সরে গেল। পরিবেশ আবার আগের মত আনন্দোচ্ছল হয়ে উঠলো।

৬ই অক্টোবর শনিবার সকালে ঠিক হল যে আজ বরুনা নদীর সঙ্গমস্থল পর্যন্ত বেড়াতে যাওয়া হবে। পায়ে হেঁটে চলা শুরু হয়ে গেল। চকের ধার দিয়ে যাবার সময় বিশ্বনাথের মন্দির ভেঙে মসজিদ তৈরির কথা উঠল, অনেকে হয়তো জানেন যে পুরাতন বিশ্বেশ্বরের মন্দিরটি সম্রাট আওরঙ্গজেবের রাজত্বকালে বিধ্বস্ত হয়। পুরাতন মন্দিরের গায়েই গড়ে ওঠে একটি নতুন মসজিদ। শ্রীজীবনকৃষ্ণ আগ্রহ প্রকাশ করায় পুরাতন মন্দির প্রাঙ্গণে আসা হলো। পুরাতন মন্দিরের ভগ্নাবশেষ, রত্নবেদী, মসজিদ, নুতন মন্দির, সবই ওই জায়গা থেকে ভালোভাবে দেখা যায়। দেখতে দেখতে শ্রীজীবনকৃষ্ণ ভাবাবিষ্ট হলেন। বদ্ধাঞ্জলি হয়ে বলছেন—জয় মহম্মদ। জয় বিশ্বনাথ। জয় ঠাকুর। আর ক্ষণে ক্ষণে তিনি ভাবসমাধিতে মগ্ন হচ্ছেন। সে এক অপূর্ব দৃশ্য। অপূর্ব পরিবেশ। শ্রীজীবনকৃষ্ণের কন্ঠে একসঙ্গে বিশ্বনাথের, ঠাকুরের, ও মহম্মদের জয়ধ্বনি শুনে বলতে ইচ্ছে হলো—হে ভগবান তোমারই জয়, তোমারই জয়।

কিছুক্ষণ পরে আবার পদযাত্রা শুরু হয়ে গেল। ক্রমে গঙ্গানদীর মূল সেতুটির কাছে আসা হল। বড় সেতুটিতে ওঠার আগে আর একটি ছোট সেতুর উপর উঠতে হয়। রঘুনাথ ভাই এবার সানন্দে ঘোষণা করলেন এই পোলটির নীচেই বরুনা নদী। সকলে বরুনা নদী দেখার আগ্রহে নীচের দিকে চেয়ে চেয়ে পোলে উঠছেন, কিন্তু নদী কই! প্রথমে দেখা গেল সারি দেওয়া ল্যাম্প পোস্টের চূড়া, পরে ল্যাম্প ফিট করা ব্র্যাকেট গুলি, পরে গোটা ল্যাম্পপোস্ট গুলি এবং সবশেষে নীচে পিচের রাস্তা। রগুনাথ ভাই ভুলে গেছেন যে বরুনা নদী সেতুর এপারে নয়, ওপারে। হাস্য পরিহাসের এই দুর্লভ সুযোগ কেউ হারাতে রাজি নয়। সকলের সঙ্গে রঙ্গনাথ শ্রীজীবনকৃষ্ণও যোগ দিলেন। তারপর বড় পোলটির মাঝখানে আসা হল। এখান থেকে কাশীর দৃশ্য বড় নয়নাভিরাম। অসংখ্য মন্দির, ঘাট, গম্বুজ, মিনার; প্রভাতের স্নিগ্ধ আলোকে গঙ্গার জলে তার প্রতিবিম্ব। যেন মায়াময় স্বপ্নপুরী। ভারতীয় ধর্ম ও সংস্কৃতির যেন এক প্রস্ফুটিত পুষ্প। এই নয়নবিমোহন দৃশ্যাবলী দেখতে দেখতে শ্রীজীবনকৃষ্ণ সমাধিমগ্ন হলেন। স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এলে তিনি সূর্য-প্রণাম করে ফেরার পথে পা বাড়ালেন। এবারে বাসে করে ফেরা হলো। শ্রীজীবনকৃষ্ণ সকলের ভাড়া দিলেন।

গতকাল ক্ষিতীশবাবুর দাদা জ্যোতিষবাবু এবং তাঁর সঙ্গে নীরোদ ও বরাট নামে দুই ভদ্রলোক এসেছেন এলাহাবাদ থেকে, আজ বিকেলে তারা চলে যাবেন। আজ সকালে ক্ষিতীশবাবুও এসেছেন। সকলের খাবার ব্যবস্থা হল বীরেশ্বর পাঁড়ের ধর্মশালা সংলগ্ন ওই হোটেলে। যথাসময়ে আজ শ্রীজীবনকৃষ্ণ সকলের সঙ্গে সেখানে খেতে গেলেন। খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা ও আপ্যায়নে সকলেই খুব খুশি হলেন। যে যুবকটি হোটেলটি পরিচালনা করেন তাকে ডেকে শ্রীজীবনকৃষ্ণ ভোজনকক্ষে শ্রীরামকৃষ্ণের একটি ছবি রাখতে বললেন।

 দেখতে দেখতে মহা সপ্তমীর দিন এসে গেল। ১১ই অক্টোবর, বৃহস্পতিবার। শ্রীজীবনকৃষ্ণ অদর্শনে কাতর বহু লোক ঠিক করেছেন এবার পূজার ছুটির কয়েকটি দিন তাঁরা কাশীধামে শ্রীজীবনকৃষ্ণ-সঙ্গে কাটাবেন। গতকাল হাওড়া থেকে এসেছেন গণেশ, অজিত, জলধর। তাদের স্টেশন থেকে আনার জন্য কালী বন্দ্যোপাধ্যায়কে তিনি পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু ট্রেন অনেকক্ষণ লেট ছিল। তাঁদের আসতে দেরী হচ্ছে দেখে শ্রীজীবনকৃষ্ণ ব্যাকুল হয়ে উঠেছিলেন। তারা আসতে তিনি শান্ত হলেন। আজ কলকাতা থেকে বহু ভক্ত আসছেন। রঘুনাথ ভাই ও সৌরেনকে স্টেশনে যেতে নির্দেশ দিলেন শ্রীজীবনকৃষ্ণ। নিজেও যাবার জন্য খুব আগ্রহ প্রকাশ করলেন। কিন্তু সকলের ইচ্ছানুসারে তিনি স্টেশনে না গিয়ে কেষ্ট মহারাজ ও আরেকজনকে নিয়ে বেড়াতে বেরোলেন। অদ্বৈত আশ্রম ও থিওসফিক্যাল সোসাইটির পথ ধরে ক্রমাগত পশ্চিমের পথ ধরে চলতে লাগলেন। পথিমধ্যে কত কথা, কত আলোচনা। মানুষের দেহের মধ্যে ভগবান—এ কথা যখনই সে জানবে তখনই সর্ববিধ বন্ধন থেকে তার মুক্তি। কথা বলতে বলতে রেললাইনের কাছে তিনি এসে পড়লেন। নিজেই খোঁজ নিলেন বেনারস স্টেশন কতদূর? যখন শুনলেন যে পায়ে হাঁটা পথে মাত্র মাইল দেড়েক দূর আর ট্রেন আসার নির্দিষ্ট সময়ের আরও ৩৫ মিনিট বাকি, তখন ধরে বসলেন স্টেশনেই যাবেন, রেললাইনের পথ ধরে। “আহা ওরা আসছে কত কষ্ট করে, হঠাৎ যদি আমাদের স্টেশনে দেখতে পায় ওদের কত আনন্দ হবে বলতো”।

শ্রীজীবনকৃষ্ণর ইচ্ছা। ‘না’ বলে কার সাধ্য? সবাই আনন্দ পাবে তার জন্য শত কষ্ট স্বীকার করতেও রাজি। চললেন লাইন ধরে, বৃষ্টিতে পিছল পথে। কোথাও কাদাজল, কোথাও বা নানা আবর্জনা, কোনও ভ্রুক্ষেপ নেই। সেই অবস্থাতেই কথা বলতে বলতে চলেছেন। দৃষ্টি কেবল সামনের দিকে। স্টেশনের কাছে যখন এসেছেন তখন ঘামে গায়ের পাঞ্জাবিটা ভিজে গেছে। কিন্তু এখানে এসে হতাশ হতে হলো। গাড়ি আজও লেট। বেলা সাড়ে দশটা নাগাদ ট্রেন পৌঁছবার সম্ভাবনা। এই অবস্থায় অপেক্ষা করা নিরর্থক। তাই বাসে করে তিনি বাড়ি ফিরে এলেন, অধীর আগ্রহে সকলের আগমনের প্রত্যাশায় অপেক্ষা করতে লাগলেন, ট্রেনযাত্রীরা শ্রীনাথ ভবনে এসে পৌছলেন বেলা ১১টায়। এলেন সুধীনবাবু, অনাথ, অরুণ, গোপাল, জ্যোতির্ময়, দিলীপ, মুরারী, ধীরেন (বনগাঁ), বিমলবাবু এবং আরো অনেকে। সে এক অপূর্ব দৃশ্য। এতদিন অদর্শনের গোপন ব্যথা আজ আর কোনো বাধা মানে না। তাঁরা কাঁদেন, শ্রীজীবনকৃষ্ণের চোখেও জল, বেদনার্ত কণ্ঠে তিনি বললেন— ওরে তোদের সকলকে ছেড়ে আমি এতদিন কি করে ছিলুম রে!  

 (সংগৃহীতঃ বরযাত্রী, জিতু চট্টোপাধ্যায় লিখিত)  

 

১১ই অক্টোবর ১৯৫৬

বারানসী স্টেশনে শ্রীযুক্ত সৌরেন পায়চারি করছেন, আর ঘনঘন বড় ঘড়িটি দেখছেন। গত ২রা অক্টোবর ওঁরা জনা ছয় মিলে শ্রীজীবনকৃষ্ণসহ কাশীধামে আসেন। আজও হাওড়া থেকে শ্রীজীবনকৃষ্ণ সন্দর্শনে একটি দলের আসবার কথা। তাদের জন্য তিনি অপেক্ষমান। দুন এক্সপ্রেস কিছু দেরিতে প্রায় সকাল সাড়ে দশটার সময় স্টেশনে প্রবেশ করল। সৌরেন! সৌরেন! শ্রীযুক্ত অরুণের ডাক শুনে তিনি একটি কামরা দরজায় এসে দাঁড়ালেন। গাড়ি থেকে নেমে এলেন শ্রীযুক্ত সুধীন, তাঁর এক কবিরাজ বন্ধু, মৃত্যুঞ্জয়, হীরু, অমল, মুরারি, জ্যোতির্ময়, ধীরেন (বনগাঁ), অরুণ, গোবিন্দ, খগেন, অনাথ, গোপাল রায়, নিতাই ঘোষ, বিনয়, আনন্দ, রামকৃষ্ণ ও দিলীপ।

সৌরেন, দিলীপের প্রতি --তুই সবশেষে নামলি?

দিলীপ—কেন ভুলে গেলি এর মধ্যে উনি সেদিন কী বললেন মনে নেই? মা ঠাকুরানীর প্রতি ঠাকুরের উপদেশ—গাড়িতে উঠবে আগে, নামবে সবার শেষে।

সৌরেন --তোরই দেখছি ঠিক ঠিক।

সকলের কলহাস্যে প্ল্যাটফর্ম মুখরিত হলো।

শ্রীযুক্ত মৃত্যুঞ্জয় গত পয়লা অক্টোবর তারিখে শ্রীজীবনকৃষ্ণকে নিয়ে হাওড়া থেকে বারানসী আসেন ও তাঁর বসবাসের সব ব্যবস্থা করে কলকাতায় ফিরে যান। আজ আবার ছোকরাদের দলটিকে নিয়ে ফিরে এসেছেন।

মৃত্যুঞ্জয়, ছোকরাদের প্রতি --তোমরা মালপত্তর গুলোর ব্যবস্থা করে বাইরে এসো, আমি রিক্সার ব্যবস্থা করি গিয়ে। নতুন লোক দেখলে ওরা বেশি ভাড়া আদায় করবে।

অতঃপর মৃত্যুঞ্জয়ের ভাড়া করা ন’খানি রিকশো সকলকে নিয়ে গোধূলিয়া শ্রীনাথ ভবনের দরজায় এলো। তখন বেলা সাড়ে এগারো কি বারোটা। শ্রীজীবনকৃষ্ণ এই বাড়িতে এখন বাস করছেন। সৌমেনবাবু, সুধীনের বন্ধুলোক, এই বাড়ি ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।

দরজায় কোলাহল শুনে শ্রীজীবনকৃষ্ণ দোতলার ঘর থেকে দ্রুত নিচে নেমে আসছিলেন কিন্তু তার আগেই ছোকরাদের অনেকে এক রকম লাফিয়ে লাফিয়ে ওপরে উঠে এলো। তাদের মনের ভাব সচল ও জীবন্ত বিশ্বনাথকে দর্শন করে কে কত আগে ধন্য হবেন। কারণ হাওড়া ত্যাগের পূর্বে তিনি বলেছিলেন কাশীতে আমায় যে দেখবে তার বিশ্বনাথ দর্শন হবে।

শ্রীজীবনকৃষ্ণ—তোরা এসেছিস! তোরা এসেছিস! বলতে বলতে প্রেমাশ্রু বিসর্জন করতে লাগলেন। তিনি অর্ধবাহ্য অবস্থায় করজোড়ে দাঁড়িয়ে আছেন। বেত পাতার মতন পুলকে কাঁপছেন। ভাবাবেগ কিছু কমলে কম্পিত কন্ঠে বলছেন—কত কষ্ট হয়েছে, কত কষ্ট সব পেয়েছিস, বাবা! আহা! ঘুম নেই, খাওয়া-দাওয়া নেই।

সুধীন—না, তেমন আর কী কষ্ট হয়েছে! সবাইতো শুয়ে-বসে এসেছি। পুজোর সময় ভিড়ে একটু কষ্ট হবেই। আপনাকে দেখে এখন আমাদের একটুও আর কষ্ট নেই।

সকলে একে একে ভূমিষ্ঠ প্রণাম করলেন।

শ্রীজীবনকৃষ্ণ—ওরে, তাড়াতাড়ি চানটান সেরে নে। হোটেলে সব ব্যবস্থা করা আছে। চারটি খেয়ে শুয়ে পড়। খানিকটা ঘুম হয়ে গেলে সব ঠিক হয়ে যাবে।

কয়েকজন গঙ্গাস্নানের কথা পাড়লেন।

শ্রীজীবনকৃষ্ণ স্বয়ং গঙ্গা স্নান করতে খুব ভালোবাসেন। তবুও বললেন, ওরে কাল থেকে করবি খন। আজ সব ক্লান্ত, খাওয়া-দাওয়া সারতে অনেক দেরি হয়ে যাবে। তারপর বললেন, আচ্ছা তা যাবি যা। যার যা ইচ্ছে কর।

অনেকেই কোমরে গামছা বেঁধে দশাশ্বমেধ ঘাটের দিকে যাত্রা করলেন। স্নানান্তে মনোমোহন পাঁড়ের ধর্মশালা সংলগ্ন হোটেলে পরম তৃপ্তি সহকারে ভোজন পর্ব সমাপন করলেন। পাঁড়েজি ইতিমধ্যে শ্রীজীবনকৃষ্ণের কৃপাধন্য হয়েছেন।

আজ দুর্গা অষ্টমী, ২৫শে আশ্বিন, ১৩৬৩ বঙ্গাব্দ, বৃহস্পতিবার। স্বপ্নে সোনার অন্নপূর্ণা ‘মা মা বলে চিঠি দিয়েছে’—এই দৈববাণী শুনবার কিছুদিন পর ১৫ই আশ্বিন, সোমবার কৃষ্ণা একাদশীর দিন কাশীবাসের সংকল্প নিয়ে শ্রীজীবনকৃষ্ণ হাওড়া ত্যাগ করেন। সঙ্গীদের মধ্যে ছিলেন কেষ্ট মহারাজ, জিতেন (তিন নম্বর), মৃত্যুঞ্জয়, সৌমেনবাবু, রঘুনাথ ও সৌরেন। তারা ছাড়া কালী (২), গণেশ মান্না, অজিত (তবলচী), সন্তোষ গুছাইত ও জলধর টাকী কয়েকদিন পর এসে ধর্মশালায় ওঠেন। আজ তাঁরা হাওড়ায় ফিরে যাবেন। শ্রীজীবনকৃষ্ণ তাঁদের বিদায় দিচ্ছেন। ছোকরাদের তখন ঘুম ভেঙেছে। পাশের ঘর থেকে কথামৃত পাঠের শব্দ শুনে সকলে এসে বসলেন। শ্রীজীবনকৃষ্ণ একখানি তক্তপোশে কয়েকজনকে নিয়ে উপবিষ্ট। জানলার ধারে ইজিচেয়ারে বসে জিতেন (৩নং) কথামৃত পড়ছেন, মেঝেতে কম্বল শতরঞ্জির ওপর বাকি সবাই বসে আছেন।

হাওড়া যাওয়ার জন্য বাকি সকলে রওনা হয়ে গেলে শ্রীজীবনকৃষ্ণ ডান হাতটি মুখের কাছে এনে সহাস্যে দিলীপের প্রতি বললেন, কেমন হলো?

দিলীপ—ভালোই। ভাত, তরকারি, মাছ দুটো দিয়েছিল। ভাত-তরকারি রিপিট করেছিল। শুনলাম নাকি আবার স্পেশাল ও আছে।

শ্রীজীবনকৃষ্ণ—হ্যাঁ। স্পেশালে আট আনা বেশি চার্জ করে কিন্তু ভালো খাওয়ায়। আরো এক খানা মাছ বেশি দেয়, দু তিন রকমের বেশি দরকারি, একটা বড় মিষ্টি দেয়। দই মিষ্টি খেতে ইচ্ছে হলে জলযোগ থেকে হাতে করে নিয়ে যাবি।

এরপর আর প্রশ্ন নেই, উত্তর নেই, পাতার পর পাতা পড়া চলল। বিকেল যখন প্রায় সাড়ে পাঁচটা তখন তিনি পাঠককে বললেন, বন্ধ করে দে। এরা এসেছে। এদিক-ওদিক একটু বেড়াক।

কথামৃত মাথায় ঠেকিয়ে সকলে উঠে পড়লেন এবং বেড়াতে বের হলেন। তবে সুধীন, রঘুনাথ, দিলীপ ও জিতের শ্রীজীবনকৃষ্ণের সঙ্গে নানা আলাপ আলোচনা করতে লাগলেন। 

দিলীপ—আপনি চলে আসার পর থেকে আমাদের দিন যেন আর কাটতে চায় না। বিনয়, আনন্দ, নিতাই, আমি হয় গঙ্গার ঘাটে, না হয় হাওড়া ময়দানে বসে থাকতাম। আর দিন গুনলাম কবে ১০ তারিখে আসবে। আপনার কদমতলার কথা মনে পড়ে না?

শ্রীজীবনকৃষ্ণ, নারে! এই বলতে মনে পড়ল। বলে মৃদু মৃদু হাসতে লাগলেন।

ধীরে ধীরে চারদিক আবছা করে সন্ধে নামল। ঘরে বিদ্যুতের আলো ছিল। সন্ধ্যা প্রণাম হল। শ্রীজীবনকৃষ্ণের ইচ্ছে ঘরের কোলে ভেতরের দালানে সন্ধ্যাকালীন পাঠের ব্যবস্থা হোক। দালানটি বড়, সকলে হাত পা মেলে বসতে পারবে। ধ্যান জপ করার স্থান এর অভাব হবে না। তবে আলো নেই। রঘুনাথ অবিলম্বে বাইরে থেকে একটি ল্যাম্প জোগাড় করে আনলেন। সঙ্গে সঙ্গে দালান আলোয় ভেসে গেল। তারপর শতরঞ্জি পাতা হল শ্রীজীবনকৃষ্ণের পছন্দমতো। কোথাও একটু ফাঁক বা ভাঁজ নেই, মসৃণ ও সুবিন্যাস্ত। মাঝামাঝিস্থানে পাতা হলো কয়েক পাট করে একটি তোষক আর তার ওপরে একটি চাদর। স্থানটি বেদীর মত একটু উচু ও নরম হয়েছে। রঘুনাথ সকলের আড়ালে সযত্নে রচনা করলেন, ঠাকুরের যাতে বসতে কষ্ট না হয়।

শ্রীজীবনকৃষ্ণ দালানে এসেই উঁচু আসুন দেখে বুঝলেন এ কার কাজ। তারপর রঘুনাথের প্রতি বিরক্ত হয়ে বললেন, আরে এসব কী করেছিস! তুই আগে তোল ওসব! তোশক তোলা হলে শ্রীজীবনকৃষ্ণ সকলের মতো শুধু শতরঞ্জির উপর বসলেন। সাম্য বোধ তাঁর মজ্জাগত--সকল বিষয়েই। এইবার কথামৃত প্রণাম করে জিতেনের হাতে তুলে দিয়ে বললেন, পড়। 

পাঠ শুরু হলো—শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত—

কিছুক্ষণ পাঠের পর দিলীপের কয়েকটি প্রশ্ন মনে হলো। শ্রীজীবনকৃষ্ণ আধশোয়া অবস্থায় সে সবগুলোর উত্তর দিলেন। তারপর ধীরে ধীরে উঠে বসে বললেন, আরো প্রশ্ন কর, তোর যা খুশি।

প্রশ্নঃ- আত্মা সাক্ষাৎকার সম্বন্ধে কিছু বলুন।

শ্রীজীবনকৃষ্ণ তখন সচ্চিদানন্দ চিৎঘনকায় লাভ ও কুণ্ডলিনী জাগরণ থেকে একটি একটি করে পঞ্চকোষের সাধন কিরূপে হয়, প্রত্যেক কোষের বিশিষ্ট দর্শন ও অনুভূতি কী কী মোটামুটি বললেন। তারপর জ্ঞান জ্ঞেয় জ্ঞাতা যা ত্রিপুটি অবস্থায় এই ভগবান! এই ভগবান দর্শন!! এর কথা—বিশ্বরূপের কথা ও শেষে বীজে, বীজ স্বপ্নে, কিছু-না—বোধাতীত অবস্থায় পরিবর্তিত হওয়া পর্যন্ত—আগম সাধনের সকল রহস্যের ওপর অনর্গল আলোকপাত করলেন।

 এসব কথা আজই যে তিনি বললেন তা নয়। কিন্তু আজকের বাচনভঙ্গি, বিশ্লেষণ রীতি যেমন অনবদ্য, তেমনি হৃদয়গ্রাহী।

শেষে একটু থেমে বললেন, দেখ, আত্মা সাক্ষাৎকার একটা নির্দিষ্ট বয়সে হয়। ঠাকুরের কৃপায় জানলুম, চব্বিশ বছর থেকে পঁচিশ বছর বয়সের মধ্যেই হয়। ঠাকুরের হয় বাইশ তেইশে। আমার হয় ২৪ বছর ৮ মাস বয়সে। এই সময়ে ঠিক ঠিক সমাধি হয়। (সমাধিস্থ)।

প্রশ্নঃ- আচ্ছা ওই বয়স উত্তীর্ণ হয়ে গেলে কি আর আত্মা সাক্ষাৎকার হয় না?

শ্রীজীবনকৃষ্ণঃ- না। সে ঠিক ঠিক হয় না। তবে আ্যকিন টু (প্রায় কাছাকাছি) আত্মা সাক্ষাৎকার বলতে পারা যায়। যেমন তোদের এখানে ঠাকুর তিনটি রেফারেন্স রেখেছেন। ওই কেষ্টদা, নিমাই, আর শিবপুরের কিশোরী মুখুজ্জে বলে একজনের। তারপর বললেন, আত্মার সাক্ষাৎকার সাধন জগতে ফান্ডামেন্টাল (প্রধান)। যার পুরো সাধন হবে তার আত্মা সাক্ষাৎকার অবশ্যই হবে। আর পৃথিবীতে এক যুগে একজনেরই হয়। ঠাকুরের যুগে এক ঠাকুরেরই আত্মা সাক্ষাৎকার হয়। আর নজিরের জন্য মাষ্টারমশায়ের। যদি আর কারো হতো তাহলে অবশ্যই তাঁকে (অন্তরে) বারংবার দেখতুম।

প্রশ্নঃ- আচ্ছা। আত্মাসাক্ষাৎকার না-হলেও কি সমাধি অবস্থা লাভ করা যায়?

শ্রীজীবনকৃষ্ণঃ- কেন যাবে না। পুরীমহারাজের, স্বামীজীর—এঁদের তো (জড়) হয়েছিল। তবে কি জানিস—(স্বামীজীর বস্তুতে ব্রহ্মসাক্ষাৎকার প্রসঙ্গে বললেন) সে এক ঠাকুরের কৃপাতেই হয়েছিল। এখানে নগেনবাবুর তার চেয়েও উঁচু অবস্থা লাভ হয়েছিল, তার সহজিয়া সমাধি হত। (সমাধিস্থ)। কিন্তু কি জানিস, হওয়া শক্ত, তার চেয়ে আরো শক্ত বজায় রাখা। নগেনবাবুর আর সে জিনিস নেই।

তারপর গোড়ার কথায় ফিরে গিয়ে বললেন—

শ্রীজীবনকৃষ্ণঃ- আত্মা সাক্ষাৎকারই কিন্তু শেষ কথা নয়। সাধনের ইতি করা যায়না। কবে সেই ১২ বছর ৪ মাস থেকে শুরু হয়েছে। দেখ না আজ ৬৪ বছর বয়স পর্যন্ত তার ছাড়ান নেই। এখনো নতুন নতুন দর্শন অনুভূতি হয়। কিছুদিন আগেও মাথায় ব্রহ্মজ্ঞানের ফুট কেটেছে। এই ফুট কাটলেই বুঝতে পারি আবার অবস্থান্তর ঘটবে। এ তারই ইঙ্গিত। তাইতো ঠাকুর এই কাশীতে টেনে আনলেন।

তিনি বলে চললেন, আত্মা সাক্ষাৎকারের পর যদি আত্মা কৃপা করে সাধন করেন তবেই সাধন। তারপর বেদান্তের সাধন। বিদেহ সাধনও বলে। যেমন টাইম এন্ড স্পেস—এর (কাল ও স্থান) উচ্ছেদ সম্বন্ধে বহু বহু ফুট কাটতে থাকে। বিলেত যাবার আগে যে জাহাজটা করে যাব সেই জাহাজটি পর্যন্ত স্বপ্নে আগেভাগে দেখিয়ে দিয়েছিল। এছাড়া আরও বহুবিধ অনুভূতি হয়।

প্রশ্নঃ- কতদিন ধরে এই অবস্থা থাকে?

শ্রীজীবনকৃষ্ণঃ- তা ১২ বছর ৪ মাস। বিশ্বরূপদর্শন, বীজ, স্বপ্নবৎ--এই তিনটি অবস্থা একটু তাড়াতাড়ি হয়।

খানিকটা সময় একটু নিস্তব্ধতায় কাটলো। তিনি শিশি খুলে বাঁ হাতের চেটোয় নস্যি ঢাললেন। তারপর এক টান দিয়ে আবার বললেন।

শ্রীজীবনকৃষ্ণঃ- এরপর হলো চৈতন্যের অবতরণ। এই সময়ে বলে যায়। আমাকে ঋষি আকাশ পথে এসে বলে গেছিল চৈতন্যের অবতরণ হচ্ছে। তা আমি তখন কিছুই বুঝতে পারিনি। মনে করেছিলাম চৈতন্যদেব বুঝি কোথাও ফের অবতার হয়েছেন বা হবেন। পরে হতে তবে বুঝলাম। চৈতন্যের অবতরণ সম্বন্ধে বললেন, চৈতন্য সহস্রারে লাল দীপকের আলোর মতো দপ করে জ্বলে উঠে একেবার সহস্রার থেকে কন্ঠ, আরেকবার সহস্রার থেকে কটি দেশ পর্যন্ত অবতরণ করে। ঠাকুরের ছিল লাল চীনে দেশলাইয়ের আলো। তবে অবতরণের সময় লাল নয়, জ্যোতি। 

তারপর ভাবাবিষ্ট হয়ে বললেন, হ্যাঁরে! কত কী যে দেখতাম শুনতাম, তা কিছুই গ্রাহ্য করতাম না। কী হচ্ছে তো কী হচ্ছে! কী শুনছি, তো কী শুনছি! তখন বুঝতাম না কেন অমন ভাব আসতো, কেন কিছুই গ্রাহ্য করতাম না। এখন বুঝি যে, অমন ভাব ঠাকুর যদি আমায় না দিতেন তাহলে অহংকারে ফেটে মরে যেতুম। শালা, মানুষ রে, মানুষ। 

... এরপর হলো মানুষ রতন—অবতারত্বপ্রাপ্তি। ওই চৈতন্য কপালে শ্বেত চন্দনের ফোঁটা পরে (বামনমূর্তিতে) তিনি হাততালি দিয়ে বিভোর হয়ে হরিনাম করছেন, আর আমার এই দু’হাতের চেটো কর কর করছে। এই অবতরণ ব্যাপারটা দেহী দেখতে পায়। ঠাকুর এইজন্যই বলছেন—অবতার প্রত্যক্ষসিদ্ধ। দেখো সুধীন, নিগমের যা কিছু, আগাগোড়া জাগ্রতে হয়। তোমাদের এটা আগে বলিনি। এই প্রথম বলছি। তোমরা বোধহয় ভেবেছিলে এও বুঝি স্বপ্নে হয়?

সুধীন (সবিস্ময়ে)—আজ্ঞে হ্যাঁ। কোনদিন তো বলতে শুনিনি।

শ্রীজীবনকৃষ্ণ— (হাসতে হাসতে) হ্যাঁ, এই প্রথম বললুম, কীরকম মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল। অবতারত্বের পর আরো আছে—ভগবানত্ব।

সুধীনঃ- হ্যাঁ, ওকথা জানি, কদমতলায় বলেছিলেন—আমার অবতারত্ব চলে যাচ্ছে, জওহরলালের রূপ ধরে (স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী) ম্লানমুখে। আপনি তখন রাস্তার ধারে গ্যাসপোস্টের কাছে দাঁড়িয়ে। আর ভগবানত্ব আসছে।

শ্রীজীবনকৃষ্ণঃ- হ্যাঁ। এরপরেও না-জানি আরো কত কী আছে।

অনেকক্ষণ একটানা কথা বলবার পর এবার তিনি নীরব হলেন। আবার পাঠ শুরু হলো। বাইরে বেশ রাত্রি। মন্দিরে ও দেবালয়ে আরতি চলছে। দূরাগত শঙ্খ ঘণ্টা ও বাদ্যধ্বনিতে শীতের আকাশ-বাতাস মুখরিত। মন ঊর্ধ্বমুখী—ধ্যানের আমেজ আসছে। এমন সময় জুতোর মসমস ও মৃদু কথাবার্তা শোনা গেল। ছোকরারা ভ্রমণ শেষে ফিরেছেন। শ্রীজীবনকৃষ্ণ তাদের সস্নেহে নিকটে ডেকে বসিয়ে কে কোথায় গিয়েছেন কী দেখেছেন ইত্যাদি জিজ্ঞেস করতে লাগলেন। 

(সুধাকুম্ভ, দিলীপ কুমার ঘোষ লিখিত)



কোনো কারণবশত শ্রীজীবনকৃষ্ণ স্থির করলেন তিনি বেনারাস যাবেন, আর ফিরবেন না। বললেন, যারা বেনারসে তাঁকে দর্শন করবে তাদের সাক্ষাৎ শিব দর্শন হবে। আমরা ছোকরারা অকূলপাথারে পড়লাম। প্রথমতঃ, তাঁর সঙ্গসুখ হতে বঞ্চিত, দ্বিতীয়তঃ কোথায় অবসর সময় কাটাই। সকাল সন্ধ্যা রামকেষ্টপুরের গঙ্গার তীরে ও সৌরেনের ভগ্নিপতির বাসায় কথামৃত পাঠ ধ্যান ইত্যাদিতে কাল কাটাতে লাগলাম। কিন্তু শান্তি মিলছিল না। শ্রীজীবনকৃষ্ণ বিরহে কাতর। রামকেষ্টপুরের গঙ্গার জল হাতে নিয়ে মাথায় দিতাম এই ভেবে যে শ্রীজীবনকৃষ্ণ বেনারসের গঙ্গায় স্নান করেছেন, তাঁর শরীর ধৌত করে সেই গঙ্গাবারি বয়ে এসেছে, অতএব এই পূত জল আমরা মাথায় ঠেকাই।

 তাঁর যাত্রার দশদিন পর পূজা উপলক্ষে আমরা প্রায় ১৬/১৭ জন বেনারসে যাত্রা করলাম ও গোধূলিয়ার কাছে শ্রীনাথ ভবনে তিনি যেখানে অবস্থান করছিলেন সেখানে উপস্থিত হলাম। কয়েকদিন পর শ্রীযুক্ত সুধীনদার বন্ধু সৌমেনবাবু তিনি শ্রীনাথ ভবনে থাকার ব্যবস্থা করেছিলেন, বললেন বাড়ির মালিকের আত্মীয়-স্বজনদের আসার কথা আছে, অতএব শ্রীনাথ ভবন খালি করতে হবে। শ্রীজীবনকৃষ্ণ মহারাজদা ও রঘুনাথকে সঙ্গে নিয়ে কাশী যোগাশ্রমে চলে গেলেন ও দোতলায় একটি ছোট ঘরে রইলেন। আমরা ছোকরারা নিচের ছোট ঘরটিতে থাকলাম। আমরা চোদ্দজন ছিলাম ও বাকিরা শ্রীনাথ ভবনেই রয়ে গেলেন। সকাল-সন্ধ্যায় শ্রীজীবনকৃষ্ণের ঘরে কথামৃত পাঠ ও ধ্যানের সভা হতো। একদিন সকালে স্নানাদির পর শ্রীজীবনকৃষ্ণের সঙ্গে কাশীর পথে বেরিয়ে পড়লাম। আশ্চর্যের বিষয় শ্রীজীবনকৃষ্ণ ঘনঘন সমাধিস্থ হচ্ছিলেন। কিন্তু রাজপথের মাঝখান দিয়ে চলেছিলেন। মহা মুশকিল। একে তো গাড়িঘোড়ার ভিড়, তারপরে মেয়েদের যাতায়াত—আমরা কোনরকমে তাঁকে বেষ্টনী দিয়ে চলছিলাম কারন বেনারসের বড়বাজার এলাকা খুবই জনবহুল দিনের বেলায়। যাইহোক আমরা মণিকর্ণিকার শ্মশানে উপস্থিত হলাম। তখন শবদাহ চলছিল। শ্রীজীবনকৃষ্ণ দাঁড়িয়ে সমাধিস্থ হলেন, একেবারে স্থির, নিস্পন্দ। বেশ কিছু সময় পরে সমাধি ভঙ্গ হলো। এরপর কেদার ঘাটে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠলেন। পরে নানা পথ ঘুরে যোগাশ্রমে ফিরে এলেন।

 এবার বিদায়ের পালা। শ্রীজীবনকৃষ্ণকে একে একে আমরা প্রণাম করছি। বললাম, কবে আপনি কদমতলায় ফিরে যাবেন? বললেন—আমি কদমতলায় ফিরব না। সকলের চোখে জল। দিলীপ বললে—আপনি আমাদের আশীর্বাদ করুন। তিনি বললেন—ঠাকুর তোদের আশীর্বাদ করবেন। দিলীপ নাছোড়বান্দা। কিন্তু শ্রীজীবনকৃষ্ণের মুখে এক কথা। ঠাকুর তোদের আশীর্বাদ করবেন। তোরা সব ঠাকুরের ভক্ত। মহারাজদার চোখে জল। কিন্তু আশ্চর্য শ্রীজীবনকৃষ্ণের চোখে এক ফোঁটা জল নেই। সকলে ভারাক্রান্ত হৃদয়ে সজল চোখে নিচে নেমে গাড়িতে বসলাম। যে যার বাড়ি ফিরে যাবার পর হা-হুতাশ শুরু হলো। জীবন যেন দুর্বিষহ বোধ হতে লাগল। অবশেষে কালীপুজোর দিন শ্রীজীবনকৃষ্ণ কদমতলায় ফিরে এলেন। পুনরায় তাঁর ঘরে যাওয়া শুরু হল।

(কত কথা পড়ে মনে—শ্রীযুক্ত আনন্দমোহন ঘোষ)

 

১৯৫৬ সালের পয়লা অক্টোবর শ্রীজীবনকৃষ্ণ কাশীধামে যান। সেদিন ওঁর সঙ্গে যান মহারাজদা, জিতেনদা (তিন নম্বর), রঘুদা, সৌরেন, ও সুধীনদার বন্ধু সৌমেনদা, যিনি কাশীর ‘শ্রীনাথ ভবন’ ওঁর থাকার জন্য ঠিক করেন। এরপর সপ্তমীর দিন সুধীনদা ও আরো অনেকে গিয়েছিলেন। ওই দিন রাত্রে দুন এক্সপ্রেসে, আমি, গোপালদা, অরুন, রামকৃষ্ণদা ও মুরারিদা রওনা হই। আমরা বেনারসে শ্রীনাথ ভবনে ওঁর কাছে যখন পৌঁছলাম তখন সময় সকাল প্রায় সাড়ে দশটা। সেদিন ছিল দূর্গাষ্টমী তিথি। সেদিনই কালীবাবু, গণেশদা, অজিতদা সন্তোষদা,  জলধরদা প্রমুখ কয়েকজন কাশীধাম ত্যাগ করেন কলকাতা ফেরার জন্য।  রঞ্জিত বেনারসে যায় ওদের বাড়ির দূর্গাপূজার বিজয়াদশমীর পরদিন।

শ্রীনাথ ভবনের দোতলায় তিনখানি ঘরের মধ্যে সিঁড়ি দিয়ে উঠে প্রথম ঘরখানিতে শ্রীজীবনকৃষ্ণ থাকতেন। আমরা যাওয়ার পর স্থান সংকুলান না হওয়ায় জিতেনদা ও মহারাজদা ওঁর ঘরে রাত্রে শুতেন।

শ্রীজীবনকৃষ্ণ সংসর্গে আমাদের বেশ আনন্দেই দিন কাটতো। ভোর চারটের সময় উনি আমাদের কখনও কখনও ডেকে ঘুম থেকে তুলতেন, আবার কখনো আমাদের মধ্যে অনেকে আগেই ঘুম থেকে উঠে পড়ত। ভেতর দিকের দালানে রায়দা একা শুয়ে থাকতেন, ভোর থেকেই পাঠের ব্যবস্থা ওই দালানেই করা হতো। প্রথমে শ্রীরামকৃষ্ণের ভজন গান ও পরে কথামৃত পাঠ হত। পাঠক ছাড়া আর সকলেই ধ্যান করতেন। প্রায় ছ’টার সময় পাঠ ভঙ্গ হতো। তারপর প্রাতঃকৃত্য আদি সমাপন ও বাইরে বেরিয়ে যার যেমন ইচ্ছা চা দুধ জল খাবার খেতেন। কেবল ওঁর ও মহারাজদার জন্য চা-জলখাবার আনা হতো। কখনো কখনো উনিও আমাদের সঙ্গে বের হতেন এবং পথেই চা-পান শেষ করে বেড়াতে বের হতেন। তারপর বাসায় ফিরে ন'টা থেকে পুনরায় পাঠ শুরু হতো এবং বেলা এগারোটার সময় পাঠ বন্ধ হলে স্নানাদি সেরে দুপুরের আহারের জন্য আমরা সকলে যেতুম মনোমোহন পাঁড়ের ধর্মশালার সংলগ্ন হোটেলে। শ্রীজীবনকৃষ্ণও আমাদের সঙ্গে ওখানেই খেতেন, তবে তারা ওঁর জন্য একটি পৃথক ঘরের ব্যবস্থা করেছিল। অপরাহ্য আড়াইটা থেকে পাঠ শুরু হতো। বিকেল পাঁচটা থেকে ছ’টা বা সাড়ে ছ’টা পর্যন্ত বিরতি। সে সময় আমরা বাইরে বেড়াতে যেতাম ও চা জলখাবার ইত্যাদি খেতুম। আবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা থেকে রাত নটা পর্যন্ত পাঠ ধ্যান চলতো।

সন্ধ্যায় পাঠের আসরে স্থানীয় দধি ডাক্তার, মনোমোহন পাঁড়ে, হোটেলের মালিকদের একজন, রায়দার দাদা কবিরাজমশাই এবং আরো কয়েকজন আসতেন। রাত্রে পুনরায় আমরা সকলে হোটেলে খেতে যেতাম, অবশ্য শ্রীজীবনকৃষ্ণ রাত্রে আহার করতেন না। 

বিজয়াদশমীতে ওনার এবং আমাদের সকলের পয়সাতেই মিষ্টি আনা হয়েছিল। ঐদিন ওঁকে প্রণাম করে আমরা নিজেদের মধ্যে কোলাকুলি করি। মিষ্টির একটা ঠোঙ্গা দেওয়া হয়েছিল ওঁর হাতে। ওইখানেই প্রথম দেখলাম ওঁর কুণ্ডলিনী কীরকম প্রথম গ্রাসটি গ্রহণ করে। পূর্বে কালী ব্যানার্জি লেনে ও কদমতলায় ওঁকে শুধু জল খাবার সময় দেখতুম, সে সময় ঠিক বোঝা যেত না। সেদিন দেখলাম ওঁর বাঁহাতে খাবারের ঠোঙ্গা মুখ থেকে প্রায় ছ’ আট আঙুল নীচে। উনি সোজা হয়ে বসেছিলেন। সবেমাত্র ডান হাতটি দিয়ে কিছু মিষ্টি তুলেছেন, ওঁর মাথাটি সাপুড়েদের সাপের ছোবল মারার মতো ঘাড় থেকে ভেঙে ডান হাতে খাবারের ওপরে মুখটি পড়লো ও সঙ্গে সঙ্গে মাথাটি সোজা হয়ে গেল। কেবলমাত্র চায়ে চুমুক দেওয়ার মত একটা আওয়াজ আমার কানে এলো। আমি অবাক হয়ে ওঁর দিকে তাকিয়ে আছি। উনি আমার দিকে চেয়ে বললেন— “কীরে, খাবি তো”।

দ্বাদশীর দিন সংবাদ পাওয়া গেল, বাড়ির মালিকদের লোকজন আসবেন শ্রীনাথ ভবনে। আমাদের ওপরতলা ছেড়ে দিতে হবে বলে, কাছেই কৃষ্ণানন্দজীর যোগাঁশ্রমে দু’খানি ঘর ভাড়া করা হলো। ওপরের ঘরখানি ওঁর ও মহারাজদার জন্য। আর নীচের ঘরখানি আমাদের জন্য ঠিক হলো। যোগাশ্রমের বাড়িতে অন্নপূর্ণার মূর্তিপূজা হয়। ওখানে আমাদের স্থান সংকুলান না হওয়ায় সুধীনদা, অমলদা, কলকাতার কবিরাজমশাই প্রভৃতি শ্রীনাথ-ভবনের নীচের যে ঘরটিতে ছিলেন সে ঘরেই থেকে যান। আর আমি, গোপালদা, রঘুদা ও পরে আগত ললিতবাবু এবাড়িরই নীচের সদর ঘরে আশ্রয় নিই। যেদিন উনি শ্রীনাথ-ভবন ত্যাগ করে যোগাশ্রমে আসবেন, সেদিন সকালে  বিছানা ও মালপত্র নামিয়ে নীচের সদর ঘরে স্তূপাকার করা হয়েছে। কয়েকজন টাঙ্গা ডাকতে গেছে। আমি ওঁকে নিয়ে নীচে নামছি এমন সময় বিনয় এসে ওঁকে নিয়ে গিয়ে সদরঘরে বসালে ও বাইরে চলে গেল। উনি বিছানায় হেলান দিয়ে আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন—সুধীনের ঘর কোনটা? আমি বললুম—আমরা তো সুধীনদার ঘর পেরিয়ে এখানে এলুম। উনি বললেন—তবে আমাকে এখানে বসালো কেন? আমি বললাম—চলুন সুধীনদার ঘরে যাই। উনি বললেন—না। আর নাড়ানাড়ির দরকার নেই। ঠাকুর প্রথমে দক্ষিণেশ্বরের দক্ষিণ দিকের নহবতখানার কাছে থাকতেন। একবার মথুরবাবু কলি ফেরাবার জন্য ঠাকুরকে এখনকার যে ঘর সেই ঘরে স্থানান্তরিত করেন। তারপর পূর্বের ঘরটা কলি ফেরানোর পর মথুরবাবু ঠাকুরকে ওই ঘরে ফিরে আসতে বলেন। তখন ঠাকুর বলেছিলেন, “মথুর, আমাকে বিড়ালছানার মতো সাত নাড়ানাড়ি কোরো না। আমি এখানেই থাকব”। মথুরবাবু ‘তাই হবে বাবা’ বলে চুপ করে যান। আমি শুনে ভাবলুম ওঁদের নড়াচড়ায় নিশ্চয়ই শরীরে কোন কষ্ট হয়।

যোগাশ্রমের বাড়িতে পূর্বের মতোই দিন কাটতে লাগল। অন্নপূর্ণা মূর্তি দেখে উনি ভাবস্থ হয়ে যান। উনি বেনারাস রওনা হওয়ার কিছুদিন পূর্বে দৈববাণী শোনেন— “সোনার অন্নপূর্ণা মা মা বলে চিঠি দিয়েছে”।

কোজাগরী লক্ষ্মীপূজার দিন আমরা কয়েকজন বাড়ি ফেরার জন্য ওঁর কাছ থেকে বিদায় নিই। বিদায়ের প্রাক্কালে আমাদের সকলের চোখে তখন বিচ্ছেদ ব্যথার অশ্রুধারা বইছে। দিলীপ ওঁকে বলে – “আমাদের আশীর্বাদ করুন”। উনি ওর অশ্রুসিক্ত নয়নের ওপর বিনম্র দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললেন – “আমাকে আশীর্বাদ করতে নেই বাবা”।

উনি কাশীতে স্থায়ীভাবে থাকবেন স্থির করায় দিলীপ প্রশ্ন করলে, তাহলে আমরা কি রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াবো? উনি বললেন, সে কিরে, তোরা কেন রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াবি! রাস্তার লোক তোদের কাছে আসবে।

শ্রীজীবনকৃষ্ণ বলতেন, “বাবা, যখনই আমার কোনো বড় অনুভূতি হয়েছে, তখনই আমাকে নিঃসঙ্গ করেছে বা নির্জনে নিয়ে গেছে।  ১৯৫৬ সালে বেনারসে থাকাটা ঠিক নিঃসঙ্গ জীবন ছিল না, কারণ আমরা বা আমাদের মধ্যে আরো অনেকে ওঁর সঙ্গে ছিলুম। বেনারসে থাকাকালীন উনি মাঝে মাঝে বলতেন, “তোরা সব বাড়ি ফিরে গেলে আমি আর কেষ্টদা দুজনে আরো আপ-এ চলে যাব”। যাই হোক, উনি বেনারাস ত্যাগ করে অন্য কোথাও যাননি। ওই বছরেই নভেম্বরে কালীপুজোর দিন কিঞ্চিৎ শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে আবার ফিরে আসেন কদমতলা কেদার দেউটি লেনের ঘরটিতে। 

(শ্রীযুক্ত অনাথ নাথ মণ্ডল লিখিত শ্রীজীবনকৃষ্ণ সংশ্রয় থেকে সংগৃহীত)

       ৩০শে সেপ্টেম্বর, ১৯৫৬

       কাশী যাবার আগের দিন। শ্রীজীবনকৃষ্ণের কাছে যেতে আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন—হ্যাঁ রে বিমল, তোদের কবে দেখতে পাবো? আমার একটু চিন্তা ছিল যে কাশীতে ওঁর কাছে যেতে পারব কিনা। উনি নিজেই সন্দেহ ভঞ্জন করলেন। কৃপা করে উনি যাবার আদেশ দিলেন।

       ১লা অক্টোবর, ১৯৫৬

       অমৃতসর মেলে শ্রীজীবনকৃষ্ণ কাশী রওনা হলেন। সৌমেনবাবু, কেষ্টদা, মৃত্যুঞ্জয় রায়, জিতেন (৩ নং), সৌরেন ভট্টাচার্য ওঁর সঙ্গে কাশী রওনা হলেন।

       ১২ই অক্টোবর ১৯৫৬

       আমি, আমার বাবা ও পরিবারবর্গকে নিয়ে ৮/১০/১৯৫৬ তারিখে কাশী গেলাম। ১৮/১০/১৯৫৬ পর্যন্ত কাশীতে অন্য একটা বাড়িতে ছিলাম। আমরা কাশী যাবার দু’দিন পরেই শ্রীজীবনকৃষ্ণের কাছে সুধীনবাবু, অমল, অনাথ, গোপাল ও আরও কয়েকজন ছোকরা ভক্ত গেলেন। সকলকে কাছে পেয়ে ওঁর এত আনন্দ হয়েছিল যে আমাকে বললেন— দেখ বিমল, ঠাকুর আমাকে পাষাণ করে দিয়েছেন। কিন্তু কী আশ্চর্য! আজ এদের সকলকে কাছে পেয়ে আমার চোখ দিয়ে জল পড়ছে। ওরে, এরা আজ পাষাণকেও গলিয়ে দিয়েছে!

       (সংগৃহীতঃ মহাপুরুষ সঙ্গ, বিমলাকান্ত ঘোষ রচিত)

v তাঁর কাশীতে যাবার ট্রেনের টিকিট ও রিজার্ভেশানের দায়িত্ব নিয়েছিলেন শ্রীরামপুরনিবাসী শ্রীযুক্ত নীরদ বরণ রায়।

১৪ই অক্টোবর, ১৯৫৬ তারিখে শ্রীযুক্ত বিমল সরকার লিখিত এই চিঠিটি কাশীতে পৌছয়। শ্রীজীবনকৃষ্ণ তখন কাশীতে অবস্থান করছেন। চিঠিটি উদ্ধৃত করা হল।

জয় জীবনকৃষ্ণ

হে আমার সচ্চিদানন্দগুরু, হে আমার ভগবান! আজ এই বিজয়ার দিন আপনাকে শতকোটি প্রণাম নিবেদন করি। হয়ত এই বাহ্যাড়ম্বরের কোনো প্রয়োজন ছিল না। আমার মনে হয় আপনি চান না যে ভগবানের পূজা কেবল কোনো বিশেষ দিন ও সময়ের জন্য বিধিবদ্ধ থাকে। সেইজন্য এই বাহ্য শিষ্টাচার দেখাইতে আমি ইতস্তত করিতেছিলাম। যাহা হউক, সংস্কারবশত এই দিনের এই লোকাচার ত্যাগ করিতে পারিলাম না, ক্ষমা করিবেন। আমরা জানি, এই বিশেষ দিনে কেন, সকল সময়েই আমাদের অন্তরে সকল সময় বিরাজ করিতেছেন তবুও চাক্ষুষ দর্শন হইতে বঞ্চিত হইয়া আমি অত্যন্ত কাতর হইয়াছি।

   আমি অতি মূঢ়মতি, আপনার চরণে দিবার মতো হয়ত আমার সেরূপ ভক্তি নাই, তবুও আপনার পদতলে নিবেদন যে, আপনি নিজগুণে আমায় দয়া করুন এবং শীঘ্রই যেন আপনার সঙ্গ পুনরায় লাভ করি। আপনি একসময় বলেছিলেন, যতক্ষণ ঠাকুর ঠাকুর করা যায় ততক্ষণই যোগ, আর বাকি সময় বিয়োগ। আমার এখন মনে হয় আপনার সঙ্গ যতক্ষণ লাভ হয় ততক্ষণই যোগ। আর কি বলিব, আপনি আমার বিষয় সবই জানেন। আশীর্বাদ করুন মনুষ্যজন্মের উদ্দেশ্য যেন সফল হয়। ইতি

সেবক—বিমল কুমার সরকার

শ্রীঅরুণকান্তি ঘোষের বয়ানে—

 (শ্রীবিমল কুমার সরকারকে) কাশীতে আমরা আছি। আপনার একটা চিঠি এসেছে। চিঠিটা পড়ে শোনালাম তাঁকে। আপনি লিখেছিলেন, ‘এই বুঝেছি যতক্ষণ আপনার কাছে ততক্ষণই যোগ, দূরে থাকলেই বিয়োগ’। শুনেই ঠাকুর হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলেন। আমরা তো অবাক। তাঁকে কখনও এভাবে কাঁদতে দেখিনি। চণ্ডীদাসের পদাবলী পড়ে প্রেমাশ্রু দেখেছি, তবে এরকম কান্না নয়। কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘বিমল, বিমল, ওরে ওর তুলনা হয় না’।    

 

[শ্রীজীবনকৃষ্ণ কাশীতে যান ১৯৫৬ সালের শারদীয়া পূজার ঠিক আগে। সে বছর মার্চ মাসে তিনি কয়েকজন অকৃতদার যুবককে নিয়ে আলপুকুরে, তাঁর মাসিমার দেশের বাড়িতে নির্জনে বাস করেছিলেন। বিবাহিত লোকেদের সেখানে যাওয়া নিষেধ ছিল। সেই বছরেই কাশী যাবার সময় তিনি এই বাধাটি দূর করলেন। সংসারী মানুষের যাওয়ার অনুমতি দিয়ে তিনি ব্যষ্টির যে কঠোর নিয়ম, কামিনীকাঞ্চন ত্যাগ, তাকে নস্যাৎ করলেন। সেই সময় সঙ্গকারীরা এটি এভাবে উপলব্ধি না করলেও আজ আমরা যখন পিছন ফিরে চাই দেখতে পাই তিনি কেমন করে তাঁর দুয়ার জগতের জন্য ধীরে ধীরে উন্মুক্ত করছিলেন। কাশী থেকে ফেরার তাঁর ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু ফিরে এলেন। তবে তাঁর অবস্থান্তরের পরিচয় নিজ অন্তরে পেয়েছিলেন তিনি। ৫৬ সালের কালীপুজোর দিন ফিরে এলেন। ৫৭ সালের শারদীয়া পর্যন্ত তাঁর নতুন অবস্থা প্রকাশ পেল না। কিন্তু তারপরেই ঘরের দরজা পুনরায় বন্ধ হল। অসীম বিশ্বাস নামে কিশোরকে পরপর দেখেছিলেন ঠোঁটে আঙুল দিয়ে তাঁকে চুপ করতে বলছে। তিনি এর অর্থ করেছিলেন, তিনি চুপ করলে এ জিনিস অসীমে ছড়াবে। ৫৮ সালে আরও একবার আলপুকুর ভ্রমণের পর তাঁর নতুন স্বরূপ উন্মোচন হল। তিনি সমষ্টির গণ্ডি কাটলেন। কোনো বাধাই যে ব্রহ্মত্বকে আটকাতে পারে না, সেই কথা বলতে শুরু করলেন। তাঁর বিশ্বব্যাপিত্বের সাধনের সূত্রপাত হল। সেদিক দিয়ে দেখতে গেলে কাশীযাত্রা সমষ্টির সাধনের শেষ পর্যায়। এরপরেই তাঁর বিশ্বব্যাপিত্বের সূত্রপাত।]

শ্রীজীবনকৃষ্ণের অমৃত কথাসার প্রথম অংশ

১৯৫০ থেকে ১৯৫৩ সালের কিছু কথা সংকলিত করা হয়েছে শ্রীজীবনকৃষ্ণ সংশ্রয় থেকে। যেহেতু সেখানে দিনলিপিতে তারিখের উল্লেখ নেই, তাই এখানে তারিখের উল্ল...